প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

জন্মশতবর্ষে বিকাশ রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫

 

স্মৃতির সরণি বেয়ে

অরবিন্দ দাশগুপ্ত

 

জীবনের সুদীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করতে করতে পুরোনো অভিজ্ঞতাগুলিকে মাঝে মাঝে ঝালিয়ে নিতে হয়। এ শুধু অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য নয়, অতীতের অনুপ্রেরণায় নিজের বেঁচে থাকাকে অর্থময় করে তোলার জন্যও বটে। লাভ-লোকসানের ক্লান্তিকর কর্মকাণ্ডে হাঁফিয়ে উঠে যখন মনটা নিষ্কৃতি চায়, তখন কৈশোর আর যৌবনের সোনালি দিনগুলির কথা মনে পড়ে। ভাবি যে তখনকার দিনের বিরল অভিনেতা বিকাশ রায়ের সাথে আমার পরিবারের কী মধুর হার্দিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে কতই না স্নেহ করতেন। এখন যে সব সিনেমা-থিয়েটার প্রেমীদের ষাটের ওপর বয়স, তাঁরা সবাই বিকাশকাকাকে এক কথায় বড় অভিনেতা হিসাবে স্বীকার করেন। আমি তাঁর জীবনের অন্য একটি দিকের অন্তরঙ্গ প্রত্যক্ষদর্শী।

"অবসর" থেকে যখন আমাকে বিকাশ কাকাকে নিয়ে কিছু লেখার অনুরোধ এলো তখন আমার প্রথমে মনে হল আমি তো বই প্রকাশ করি, লিখি কম। বই বিক্রির হিসেব নিকেশের মধ্যে এ কাজ খুব কষ্টসাধ্য হবে। তারপর ভেবে দেখলাম বিকাশ কাকার কথা লেখা আমার কাছে যথেষ্ট সম্মানের। পরবর্তী কালে আমার মনে হল, স্মৃতি থেকে যদি বিকাশ কাকাকে নিয়ে দুচার লাইন লিখতে পারি , তাহলে সেই মহান শিল্পীর প্রতি যোগ্য শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার সুযোগ আমি পাব।

আমার যখন দশ-বারো বছর বয়স তখন আমার কলেজ স্ট্রীটের পাশে বেনিয়াটোলা লেনের বাড়িতে আমি বিকাশকাকাকে প্রথম দেখি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন মানুষ। ওই বাড়িতে পঙ্কজকুমার মল্লিক সহ অনেক গুণীজনকেই দেখেছি। বিকাশ রায় আসলে আমার সেজ কাকা প্রয়াত শচীন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের বন্ধু ছিলেন। সেই বন্ধুত্বই ক্রমপ্রসারের মাধ্যমে আমাদের পারিবারিক বন্ধুত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের ছিল তখন যৌথ পরিবার। উনি সোফায় পা তুলে বসে বাবা-কাকাদের সঙ্গে গল্প করতেন। বিকাশকাকা তখন খ্যাতির তুঙ্গে। বড়দা কমল দাশগুপ্তের কাছে শুনেছি ১৯৫৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ যখন এসেছিলেন, তখন বিকাশকাকা সস্ত্রীক আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বিশেষ অতিথি হিসেবে।

এক সময় কলেজ জীবন শেষ করে আমি "দাশগুপ্ত এ্যান্ড কোম্পানি"-র কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়লাম। তখন উনি নিয়মিত আমাদের দোকানে আসতেন। আমার বাবা প্রয়াত অমূল্যচন্দ্র দাশগুপ্তের সাথে তিনি আড্ডা দিতেন। ধীরে ধীরে কাকার থেকেও বাবার সাথে ওনার বন্ধুত্ব বেশি প্রগাঢ় হতে থাকে। বইয়ের খবর আমাকে যথেষ্টই রাখতে হতো। তখন আমাকে বাবা বললেন কোন বই প্রকাশিত হযেছে, কোন বই প্রকাশিত হয় নি, সেই সম্পর্কে বিকাশ কাকাকে তাঁর প্রয়োজনমতো অবহিত রাখতে। সেই থেকে আমি ওনার স্নেহের পাত্র হয়ে উঠলাম।

বিকাশ কাকার কণ্ঠস্বর ছিল অসম্ভব সুন্দর। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি মঞ্চনাটক ও বেতারনাটকেও অভিনয় করতেন। মনে আছে তখন বৃহস্পতিবার ছিল ওনার নাটকের দিন। উত্তর কলকাতার বিভিন্ন নাট্যমঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি কিছুক্ষণ আমাদের দোকানে সময় কাটাতেন, বেশীর ভাগ সময়ই বইয়ের খবর নিয়ে আলোচনা করে -- কী বই এলো, কী বই গেলো, কী বই আসছে, তার খবর নিয়ে। তুলনামূলক সাহিত্য ও তুলনামূলক বাংলা প্রবন্ধের প্রতি ওনার ঝোঁক ছিল। মাঝে মাঝে কিছু ইংরেজী বই আনানোর ফরমাসও তিনি করতেন। নিয়মিত "দেশ" পড়তেন তিনি। বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা ও নতুন প্রকাশিত বইয়ের ব্যাপারে তিনি বিশেষ ওয়াকিবহাল ছিলেন।

এরই ফাঁকে একদিন আলাপ হল ওনার সুযোগ্য পুত্র আমেরিকাবাসী সুমিত রায়ের সাথে। প্রসঙ্গত, বিকাশ কাকা খুবই পড়াশোনার ভক্ত ছিলেন, তাঁর বইয়ের সংগ্রহ ছিল নজরে পড়ার মত। সেই পড়াশোনা আর বই সংগ্রহপ্রীতি বিকাশ কাকা বংশসূত্রে সুমিতদাকেও দিতে পেরেছিলেন। বাবা ও ছেলে, দুজনের মধ্যে জ্ঞানচর্চার আদানপ্রদান হত খুব। বিশেষত বইয়ের কথা। সুমিতদা যখন আমেরিকা থেকে দেশে আসতেন তখন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বিকাশ কাকা আমাদের দোকানে এসেছেন পছন্দমত বই কিনে দেবার জন্য। সুমিতদার কাছে শুনেছি যে তাঁর বই কেনার তালিকা, বিশেষ করে বাংলা বই কেনার তালিকা বিকাশ কাকাই তৈরী করে দিতেন। তার একটা কারণ ছিল যে সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলা বই নিয়ে বিকাশ কাকা ছিলেন খুবই ওয়াকিবহাল আর ওঁদের দুজনের রুচিরও চমৎকার মিল ছিল। ওঁরা দুজনে বই কিনতে এসেছেন, সে সময়ের একটা ছবি আমার মনে আসছে। সুমিতদা আমাদের দোকানের ওপরতলায় গেছেন স্বচক্ষে দেখে শুনে কেনবার বই পছন্দ করবেন আর বিকাশকাকা নীচে বসে বাবার সঙ্গে গল্প করছেন। কিছুক্ষণ পরে সুমিতদা নেমে এলেন এক গোছা বই নিয়ে, "বাবু এই বইগুলো নিয়ে তুমি কি বলো, নেবো, না নেবো না?" তারপর দুজনে মিলে সেসব বইয়ের আলোচনায় মেতে উঠলেন, আমার বাবাও তাতে মাঝে মাঝে যোগ দিলেন। এক প্রজন্মের তফাৎ কিন্তু তিন শিক্ষিত মননশীল প্রাপ্তবয়স্কদের এই সুন্দর আঁতাৎ মনে রাখার মত।

এই দোকানের আর একটা ঘটনা: একদিন বাবা দোকানে নেই। আমি সাধারণত বাবা দোকানে না থাকলেও বাবার চেয়ারে বসতাম না। সেদিন একটা কারণে বাবার চেয়ারে বসে হিসেব দেখছি। হঠাৎ দেখি বিকাশকাকা দোকানে ঢুকছেন। বোধহয় বাবার সঙ্গে গল্প করতেই এসেছিলেন, আমি বসে আছি দেখে শুধু বললেন, "এই চেয়ারে তোমাকে মানায় না।" আর ঢুকলেন না, চলে গেলেন! এর পর বহুদিন বাবার ঐ চেয়ারে আমি বসতে পারিনি, কেমন জানি নিজেকে অপরাধী লাগত। এখনও সে কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে।

একবার শুরু করে একটার পর একটা ঘটনা মনে এসে যায়। তেমনই আর একটা ঘটনা: বিকাশ কাকা আমাদের দোকানে এসেছিলেন। এক সময়ে তিনি আমাকে বললেন যে সামনের আর একটা বইয়ের দোকানে তিনি যাবেন। সেখান থেকে "মহাভারতম্‌"-এর বহুখণ্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল তাঁকে সেই প্রকাশনা সংস্থায় নিয়ে যাওয়ার (পরে জেনেছি যে সুমিতদাকে ওই বই পাঠাবার তাগিদা দেবার জন্যই যাওয়া)। আজও স্পষ্ট মনে আছে সে রাস্তায় বহু মানুষ তখন দাঁড়িয়ে পড়ল তাঁকে দেখার জন্য। ওনার কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ ছিল না। এখনকার গড়পড়তা সেলিব্রেটিদের মত ওনার মানসিকতা একেবারেই ছিল না। উনি ছিলেন সত্যিকারের মেধাবী পাঠক, যিনি বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। আমাদের দোকানে তখন সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো আরো অনেক লোকের যাতায়াত ছিল। তাঁদের মতো সাহিত্যপ্রেম এখনকার জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে আর চোখে পড়ে না। আজকাল সেলিব্রেটিরা আত্মপ্রচারেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।

বেশ অল্প বয়সেই বিকাশ কাকা ইহলোক ছেড়ে অনন্তলোকের দিকে পা বাড়ান। শেষের দিকে তিনি অসুখে খুব কষ্ট পেয়েছেন। হৃদপিণ্ডের রোগে তিনি ভুগছিলেন। সেই অবস্থাতেই প্রতিদিন সকালে আটটা/সাড়ে আটটা নাগাদ তিনি আমাকে ফোন করতেন বইয়ের খবর নেওয়ার জন্য। আমি নিয়মিত ওনার বাড়িতে বই পাঠাতাম। বিকাশ কাকা মারা যাওয়ার পরের একটি ঘটনার কথা লিখতে ইচ্ছে করছে। ওনার যোধপুর পার্ক বাড়িতে গিয়ে দেখলাম সেখানে বহু কলাকুশলী উপস্থিত হযেছেন। আমি সিনেমা-থিয়েটারের বিশেষ ভক্ত নই, তাই ওই জগতের কারোর সঙ্গেই আমার পরিচয় ছিল না। বিকাশ কাকার ছবির সামনে দেখলাম তাঁর স্ত্রী মাটিতে বসে আছেন। আমি কাকিমাকে নিজের পরিচয় দিলাম। উনি বললেন, "তুমিই অরবিন্দ! উনি তোমাকে রোজ ফোন করতেন।" কাকিমা উপস্থিত সবার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং নিজের পাশে আমাকে বসালেন। বিকাশ কাকার ছবির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল যে উনি বলছেন, "অরবিন্দ, তুমি হাতে করে আমার জন্য কী কী বই এনেছ?"

 


পরিচিতি -পুস্তক প্রকাশক ও ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজ স্ট্রিটের প্রাচীনতম পুস্তক বিক্রেতা 'দাশগুপ্ত এন্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড'-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।