প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

জন্মশতবর্ষে বিকাশ রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫

 

বিকাশ রায়কে নিয়ে লেখা -- সঙ্কলন

 

[চার দশক পর্দা আর মঞ্চের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, কাগজে-পত্রে এমন লোককে নিয়ে অনেক কিছু লেখা থাকার কথা, বিকাশ রায়ের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। তার বেশীর ভাগই হারিয়ে গেছে, পাওয়া গেলেও প্রসঙ্গ-বহির্ভূত সেসব লেখার আজকে খুব একটা দাম হতো না। তবে তাঁর তদানীন্তন সহকর্মীদের মতামত থেকে শিল্পী ও মানুষ বিকাশ রায়ের একটা ছবি পাওয়া যায়, তাঁর চরিত্রের কিছু নতুন দিকও প্রতিভাত হয়। বিকাশ রায়ের বই "কিছু স্মৃতি কিছু কথা"-তে সম্পাদক অমিয় সান্যাল মশায় পরিশিষ্ট হিসেবে তার এক সঙ্কলন দিয়েছেন, সেখান থেকে কিছু (এবং অন্য দুয়েকটা) উদ্ধৃতি দেওয়া হলো।

বিকাশ রায়ের প্রয়াণ ১৯৮৭ সালের ষোলোই এপ্রিল। পশ্চিমবাংলার ইংরেজী আর বাংলা সব পত্র-পত্রিকায় সে সংবাদ দেওয়া হয়েছিলো, অনেক বিশেষ স্মরণ সংখ্যাও প্রকাশ করা হয়। সংক্ষিপ্ত কিন্তু সেই কালের বিচারে তাঁর উৎকৃষ্টতম কাজের হদিশ পাওয়া যায়। সন্ধানী পাঠক তাঁর শৈলীর ব্যাপ্তির একটা আন্দাজ পাবেন। প্রয়াণনৈকট্যের কারণে সব বিবরণ শাণিত নাও হতে পারে কিন্তু গভীর অনুভূতিস্পৃষ্ট।]

 

উত্তমকুমার :

“..... বিকাশদার কণ্ঠস্বর এবং পাশাপাশি বলিষ্ঠভাবে শুদ্ধ উচ্চারণ যে কোনো শিল্পীর কাছেই শিক্ষণীয় ব্যাপার বলেই মনে করি। তিনি আমাকে বিখ্যাত রুশ অভিনেতা স্ট্যানিশ্লাভস্‌কি প্রণীত ‘An Actor Prepare’ বইটি উপহার দিয়েছিলেন। অভিনয় জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও আমি এই বইটি পড়েছি। ... বিকাশদার কণ্ঠস্বর প্রক্ষেপণের ব্যাপারটা [তাই] আমি কখনোই অনুকরণ করিনি—অনুসরণ করে নিজের একটা স্টাইল তৈরি করেছি মাত্র। ... এবার আসি সাংগঠনিক ব্যাপারের কথায়। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বিকাশদা ছিলেন অপরিহার্য। শিল্পীসংসদের Constitution তৈরির সময় খুবই পরিশ্রম করেছিলেন। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ যখন সংসদ থেকে আমি পরিচালনা করি, তখন বিকাশদা আমার পাশে সবসময় ছিলেন। আমার Friend philosopher এবং Guide। ...  বিকাশদার সঙ্গে বহু ছবিতেই আমি অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছি। তাঁর সঙ্গে এখনও পর্যন্ত আমার কোনোদিনই কোনো ব্যাপারে মতের অমিল হয়নি। অবসর সময়ে খুবই পড়াশোনা এবং নিয়মিত গীতাপাঠ করতেন।

 

কাননদেবী :

[‘শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’ ছবিতে শাহজীর চরিত্রটা খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু আমার স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য বিকাশকে দিয়ে চরিত্রটা খুব সুন্দর ভাবেই ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। বিকাশ খুবই মেথোডিক্যাল প্রকৃতির। সঙ্গত কারণে তাই পরিচালক হরিদাস ভট্টাচার্যের চাহিদাটা কী সহজেই বুঝতে পেরেছিল। সত্যিকারের বড় অভিনেতা ছিল বিকাশ।

 

রঞ্জিত মল্লিক :

আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, এত বড় মাপের শিল্পী, কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোনোরকম অহংবোধ ছিল না। যে ছবিতেই তিনি অভিনয় করতেন, সেই সমস্ত ছবির সহ-শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা ছিল আমার মতে শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। আসলে এঁরা দারুণভাবেই ছিলেন দায়বদ্ধ এবং Totality -তে বিশ্বাস করতেন।

 

সন্ধ্যা রায় :

বিকাশদার সঙ্গে অনেক ছবিতেই কাজ করেছি।  ওঁর মতো গুণী মানুষের সঙ্গে কাজ  করার মধ্যে ছিল আলাদা একটা আনন্দ। কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্যতায় মনে হত যে ব্যক্তিটি খুব রাশভারী এবং অহঙ্কারী। কিন্তু মোটেই তিনি অহঙ্কারী ও রাশভারী ছিলেন না। শুটিংয়ের অবসরে ঠিক ঘরোয়া মানুষের মতোই কথা বলতেন। খুবই স্নেহপ্রবণ ছিলেন।

 

মৃণাল সেন :

বিকাশবাবু আমার ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে একটি বড় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। চিত্রনাট্যের চাহিদা তিনি পূরণ করে দিয়েছিলেন তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয়ের গুণে। খুব সিরিয়াস মানুষ। শুধু সিরিয়াসই ছিলেন না, তাঁর ডিসিপ্লিনড্‌ ভাবটা আমাকে খুবই আকৃষ্ট করেছিল। শটের ডিটেল্‌স অর্থাৎ আমার তরফের চাহিদাটা কোন্ পর্যায়ের সেটা খুব মনোযোগ সহকারে শুনে নিতেন। তারপর সহশিল্পীদের সঙ্গে সংলাপ উচ্চারণ করে নিতেন। এরপর ক্যামেরা মুভমেন্টের সঙ্গে দু’-একটা মনিটর হবার পর ফাইনাল টেকিং হত। ওঁর সঙ্গে কাজ করতে কোনো সময়েই আমাকে সমস্যায় পড়তে হয়নি।

-- কিছু স্মৃতি কিছু কথা

তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সভ্য, সচেতন এবং সজাগদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। আমার সঙ্গে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।-- আজকাল পত্রিকা, ১৭ই এপ্রিল ১৯৮৭, বিকাশ রায়ের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর।

 

তপন সিংহ :

বিকাশবাবু আমার দুটো ছবিতে অভিনয় করেছেন-‘জতুগৃহ’ এবং ‘আরোহী’। ... বিকাশবাবু বরাবরই খুব মেথোডিক্যাল। একবারের বেশি দুবার তাঁকে কোনো কথা বলতে হত না। ফিল্ম-সেন্সটা ছিল প্রখর। অভিনয়শিল্পী তো ছিলেন প্লাস্‌ ছবি পরিচালনার কাজে ছিলেন দক্ষ। তিনি কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় যোগ্য সম্মান অর্থাৎ রাষ্ট্রের সম্মান পাননি।

 

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় :

(প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সুলেখক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, ঢুলুবাবু) ... নিজে তো বড় অভিনেতা ছিলেনই, তাছাড়া ছবি পরিচালনার ক্ষেত্রেও তার গুণপনা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সুভদ্র এই মানুষটি ছিলেন ‘কলালক্ষী অঙ্গনে’র’ অন্যতম বরপুত্র। সব রকমের অভিনয় করতে পারতেন। এছাড়া তার পড়াশোনা ছিল দারুণ। শেষ জীবনে মঞ্চাভিনয়ে জড়িয়ে পড়েন। এছাড়া তিনি শ্রুতিনাটকের ক্ষেত্রে কনোসিওর।

 

অনিল চট্টোপাধ্যায় :

বিকাশদার সঙ্গে বহু ছবিতেই একসঙ্গে কাজ করেছি। উনি খুব মেথোডিক্যাল মানুষ ছিলেন। সংরক্ষণ আন্দোলনের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে খুবই দুঃখ হয়। শিল্পীদের নিজস্ব দাবিদাওয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কীভাবে সংরক্ষিত করা যেতে পারে -- এই ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতেই বিকাশদা এবং ভানুদা (ভানু ব্যানার্জী) ছবিদার সহযোগিতায় ‘অভিনেতৃ সংঘ’ গঠন করেছিলেন। ... আমরা যখন শিল্পী সংসদের পক্ষ থেকে ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবির শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত, তখন বিকাশদা আমাদের পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো ছিলেন। অভিনয়শিল্পী হিসাবে ছিলেন খুবই উচ্চ শ্রেণীর-সব রকমের চরিত্রে অভিনয় করতে পারতেন। ... বিকাশদার স্পেশালিটি যেটা সেটা হচ্ছে, ওঁর কণ্ঠস্বরের বলিষ্ঠতা এবং শুদ্ধ উচ্চারণ। অবসর সময়ে খুবই পড়াশোনা করতেন। নিয়মিত গীতাপাঠ করতেন। বই এবং রেকর্ড সংগ্রহের বাতিক ছিল। জীবনচর্চায় কোনোরকম বাড়াবাড়ি ছিল না। আদ্যন্ত ঘরোয়া মানুষ ছিলেন। ... বেশ কিছুদিন বিকাশদার সঙ্গে বউদি আউটডোরে যেতেন। এ ব্যাপারে জহরদা, ভানুদা দুজনেই বিকাশদার পেছনে লাগতেন। বিকাশদাও তো কম যেতেন না। উনিও বেশ মজা করে বলতেন, “ I am the only husband of my only little wife.” -- কিছু স্মৃতি কিছু কথা

সব ধরণের চরিত্রে তিনি ছিলেন সাবলীল। বিকাশদা আসলে খুব উঁচুমাপের অভিনেতা। খারাপ চেহারা নিয়েও শুধু ভাল অভিনয়ের গুণেই বিকাশ রায় বিকাশ রায় হতে পেরেছিলেন। আজকে যারা চেহারা না থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র অভিনয়ের জোরে জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে তুলনা না করেও বলা যায় বিকাশ রায় অনেক আগেই এটা প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু সে ধরণের সম্মান তিনি পাননি এটাই বড় দুঃখের। -- আজকাল পত্রিকা, ১৭ই এপ্রিল ১৯৮৭, বিকাশ রায়ের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর।

 

তরুণকুমার :

বিকাশদার সঙ্গে আমার দাদার সম্পর্কটা খুবই অন্তরঙ্গ ছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই অন্তরঙ্গতা বজায় ছিল। ... বিকাশদাকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হত খুবই কাঠখোট্টা প্রকৃতির। কিন্তু ওটা তাঁর বাইরের রূপ। অন্তরটা ছিল খুবই কোমল।

 

বসন্ত চৌধুরী :

... বিকাশদা আমার দেখা One of the powerful artistes। ওঁর সঙ্গে অভিনয় করার একটা আলাদা স্বাদ ছিল। একসময় নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করলেও পরবর্তীকালে তিনি চরিত্র-অভিনেতা রূপেই জনপ্রিয়তা অর্জন কবেছিলেন। ওঁর অভিনয়ের একটা নিজস্ব স্টাইল ছিল। অভিনয় ছাড়া বেশ কয়েকটা ছবিও পরিচালনা করেছিলেন। সেইসব ছবিতে তিনি আবার  simultaneously পরিচালনার পাশাপাশি বেশ বড় ভূমিকায় অভিনয়ও করেছেন- একসঙ্গে এইরকম কাজ করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তা উনি একসঙ্গে এধরনের দুটো কাজে খুবই সফল ছিলেন। তিনি সবরকমের অভিনয়ে ছিলেন পারদর্শী ।

 

অসিতবরণ :

বিকাশ খুবই বড় মাপের অভিনয়শিল্পী। সবরকম চরিত্রে মানিয়ে নিতে পারে।  আমার নিজের ধারণা, বিকাশ যখন যে চরিত্রে অভিনয় করে তখন সেটা ওর অন্তরে আগে থেকেই প্রোথিত করে নিত। শিল্পীসংসদ তৈরি হবার সময় খুবই পরিশ্রম করেছে। শিল্পী এবং কলাকুশলীদের সঙ্গে ওর খুবই সুন্দর সম্পর্ক রয়েছে। সিনিয়র আটিস্টদের সঙ্গে ওর র‌্যাপোর্টটা দেখার মতো ছিল। ছবিদা, পাহাড়ীদা বরাবরই বিকাশকে স্নেহের চোখে দেখতেন।

 

রামানন্দ সেনগুপ্ত :

(প্রখ্যাত আলোকচিত্রগ্রাহক)... ওঁর কাজ দেখেছি ক্যামেরাম্যান হিসাবে। আমার নিজের ধারণা, যোগ্যতানুসারে বিকাশবাবুর রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু পাননি। সে যাই হোক, তাঁর কণ্ঠস্বর তো বটেই, বাচনভঙ্গি ও সংলাপ উচ্চারণের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ একটা শুদ্ধ বলিষ্ঠতা ছিল। অনেক সময় সেটের মধ্যেই সংলাপের শুদ্ধ উচ্চারণ এবং অ্যাকসেন্ট প্রসঙ্গে উত্তমকুমারের মতো শিল্পীকেও তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে দেখেছি। আমার মতে, বিকাশবাবুর শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে চিত্ত বসু পরিচালিত ‘ছেলে কার’, অগ্রদূত পরিচালিত ‘ছদ্মবেশী’, মৃণাল সেন পরিচালিত ‘নীল আকাশের নীচে’, অসিত সেন পরিচালিত ‘‘উত্তরফাল্গুনী,’ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত 'না'। বিকাশবাবুর নিজের চিত্রনাট্য ও পরিচালনার ছবি ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’। এই ছবিতে ওঁর রূপায়িত অবধূত চরিত্রটি আউটস্ট্যাডিং। ... ওঁর আরেকটি আউঢস্ট্যান্ডিং কাজ যেটা দেখেছিলাম, সেটা শ্রুতিনাটক-রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’। স্রেফ মঞ্চের পেছনে কালিম্পং পাহাড়ের ব্যাকড্রপের স্কেচ। স্টেজের ওপর লম্বা টেবিলে টেবিলল্যাম্পের সামনে মাইক্রোফোনে প্রত্যেক শিল্পীর কাছে নিজের নিজের সংলাপ প্রক্ষেপণের স্ক্রিপ্ট। বিভিন্ন চরি্ত্রের সংলাপ পাঠ করেন ঠিক ঠিক সময়ে। ... এই শ্রুতিনাটকের পর অনেকেই ব্যাপারটি করতে শুরু করেছিলেন।

 

বেলা মুখোপাধ্যায় :

নতুন ছবির খবর এল বিকাশ রায়ের হাত দিয়ে। ছবির জগতে বিকাশ রায় ছিলেন যেমন মিশুকে, তেমনই বন্ধুবৎসল। কিভাবে যেন ওঁর সঙ্গে আমার স্বামীর একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অত বড় অভিনেতা। অথচ এতটুকু অহঙ্কার নেই। রুচিশীল মানুষ বলতে যা বোঝায় বিকাশ রায় ছিলেন একশো ভাগ তাই। ... একদিন বিকাশ রায় ওঁকে ডেকে বললেন -- জ্যোতির্ময় রায় নতুন ছবিতে হাত দিচ্ছেন তোমাকে খুঁজছিলেন। জানি না কী জন্য। একবার দেখা করো। (৭৬)

বিকাশ রায়ের ছবি। ওঁর ছবি মানেই গানের ব্যাপারে পরীক্ষানিরীক্ষার চূড়ান্ত। পর পর একই সুরকারকে দিয়ে কাজ করানোর পক্ষপাতী নন বিকাশবাবু। সূর্যমুখী-র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমার স্বামীকে। পরের ছবি নতুন প্রভাত। দায়িত্ব পেলেন নচিকেতা ঘোষ। পরের ছবি -- বসন্তবাহার-এর সঙ্গীত পরিচালক আবার ধ্রুপদী সঙ্গীতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, যিনি সদ্য প্রয়াত হলেন। আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনা হল তার পরের ছবি মরুতীর্থ হিংলাজ-এ। (১৩১) --, "আমার স্বামী হেমন্ত", সাহিত্যম্‌, ১৯৯৯

 

প্রয়াণের পরে ....

(পত্রপত্রিকা থেকে সংগৃহীত)

 

ভুলি নাই, '৪২ ছবিদুটিতে অসামান্য অভিনয়... এরপর প্রথম নায়কের ভূমিকায় রত্নদীপ .. । তাঁর অভিনীত [অন্যান্য] স্মরণীয় ছবিগুলির মধ্যে জিঘাংসা, রাত্রির তপস্যা, টাকা আনা পাই, কীর্তিগড়, না, বনহংসী, কাঁচকাটা হীরে, জ্যোতিষী, সূর্যমুখী, ছেলে কার, আরোগ্য নিকেতন, জীবন কাহিনী, মরুতীর্থ হিংলাজ, কেরী সাহেবের মুন্সি প্রভৃতি।

সৌমিত্রবাবু বলেন, অভিনয় ছাড়াও বিকাশদা অসাধারণ আবৃত্তিও করতে পারতেন। শ্রুতিনাট্য যে আজ অত জনপ্রিয় হয়েছে, তার পিছনে বিকাশদার অবদান কম নয়। আরো বলেন ১৯৫৮/৫৯ সালে এক ভয়াবহ বন্যা হয় পশ্চিমবঙ্গে। বন্যার পর অর্থ সংগ্রহের জন্য তখনকার দিনের খ্যাতনামা শিল্পীরা পথে নেমেছিলেন। শিল্পীদের সেই মিছিলেই বিকাশ রায়ের সঙ্গে তাঁর প্রথম আলাপ। অসিতবাবু [অসিত চৌধুরী, নামকরা পরিবেশক] বলেন, সেদিনের সংগ্রহ করা টাকা দিয়ে হাওড়া-আমতায় দুটি গ্রামকে তাঁরা নতুন করে দাঁড় করিযেছিলেন। বিকাশবাবু তখন ওই গ্রামে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

 -- আনন্দবাজার পত্রিকা

এক নিঃশ্বাসে মনে পড়ার মত কয়েকটা [ছবির] নাম আরোগ্য নিকেতন, উত্তরফাল্গুনী, কাঁচকাটা হীরে, মরুতীর্থ হিংলাজ.  কেরী সাহেবের মুন্সি। ... ওঁর অভিনয়ের স্বীকৃতি সম্পর্কে সত্যজিৎ রায় বলেছেন, ক্ষমতাবান শিল্পী ছিলেন তিনি চরিত্রাভিনয়ের ক্ষেত্রে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বিকাশ রায় পরিণত হয়েছিলেন।

সিনেমা  পরিচালক হিসাবে বিকাশ রায়কে প্রথম দেখা গেল "অর্ধাঙ্গিনী" ছবিতে। রুচিপূর্ণ ব্যবসায়িক ছবির নির্মাতা হিসাবে তাঁর নাম টালিগঞ্জে অস্বীকৃত নয়। "বসন্ত বাহার"-এর মতো মিউজিকাল, "রাজা সাজা"-র মতো ব্ল্যাক কমেডি কিংবা "কেরী সাহেবের মুন্সি"-র মতো ইতিহাস আশ্রিত আবেগধর্মী আমোদদায়ী ছবি করায় তিনি ছিলেন অনন্য। "মরুতীর্থ হিংলাজ"-ও তাঁর একটি জনপ্রিয় ছবি।

 --যুগান্তর (নির্মল ধর)

 

ভুলি নাই, জিঘাংসা, শ্রীকান্ত-ইন্দ্রনাথ-ও-অন্নদাদিদি, সাজঘর, সূর্যমুখী, বসন্তবাহার, রাজাসাজা, উত্তরফাল্গুনী, কাঁচকাটা হীরে, অভয়া ও শ্রীকান্ত, অগ্নিসংস্কার, দাদু, না, মেঘ ও রৌদ্র, সব্যসাচী প্রভৃতি অসংখ্য ছবির কথা উল্লেখ করা যায় যা তাঁর অভিনয়-প্রতিভার স্বাক্ষরে ভাস্বর হয়ে আছে।

 -- আজকাল নিজস্ব সংবাদদাতা, আজকাল

 

বাংলা চলচ্চিত্রাকাশের সর্বজনপ্রিয় বিকাশ রায় দুশোর বেশী বাংলা ছবিতে অভিনয় করেন। পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তর দশকের বিশাল দর্শকের কাছে বিকাশ রায় ছিলেন মধুর স্মৃতি ও কিংবদন্তীতুল্য অভিনেতা। তাঁর ভুলি নাই, রত্নদীপ, উত্তরফাল্গুনী, কে তুমি, কাঁচকাটা হীরে, শ্রীকান্ত-ইন্দ্রনাথ-ও-অন্নদাদিদি, '৪২, আরোগ্য নিকেতন, মরুতীর্থ হিংলাজ প্রভৃতি ছবির অভিনয় দর্শকেরা কখনো ভুলবেন কি? ... [এছাড়া] পরিচালক ও প্রযোজক হিসাবে ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসাবে বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বিকাশ রায়ের নাম দীর্ঘদিন উচ্চারিত হবে।

  -- বর্তমান

 

SKILLED ACTOR

In 1984, Bikash Roy did something unheard of for a film actor. He called a press conference and announced his retirement frrom the show business. ... Since he had hs training in the days of live broadcsats, his subsequent success in "Shruti Natak" became a foregone conclusion.

Though Roy was not particularly good-looking, through sheer acting skill he could play hero to Suchitra Sen in Amar Bou.  ...  [Carey Sahhber Munshi] features his memorable Ramram Basu. Equally impressive is his portrayal of an insurance agent in Jiban Kahini. ... On the commercial stage, Roy's credits consist of Arogya Niketan (he also appeared in the film), Chowringhee and Nahabat. His Rasik in a play-reading of Chirakumar Sabha found many admirers.

---STATESMAN April 18, 1987

 

HERO AND VILLAIN PAR EXCELLENCE

With the death of Bikash Roy, the golden era of Bengal film industry ends. The versatile hero who could play villain and hero wth equal ease retired three years ago, but remained an inspiration to aspiring stars. The Bikash Roy-Chhabi Biswas duo was a power to reckon with for over three decades and today Tollygunge loses one of its last stalwarts. ... When he retried from films in 1984, critics and filmgoers alike were dismayed. His death brings down the curtain on an illustrious career and the Bengali screen, crippled as it is by lack of virtuoso performers, loses an actor with parallel.

 -- Telegraph April 18, 1987

 

On hearing of his death Satyajit Roy said though he never worked with Bikash Roy, he  had a great regard for him. Mrinal Sen said  "as an actor Bikash Roy made his mark. He was a pleasant, civilised, and informed person with whom one could talk for hours."

Some of his notable films include Jighansa, Saajghar, Chheley Kar, Carey Sahaber Munshi, Uttar Phalguni, Marutirtha Hinglaj, Kanch Kata Heeray, Jatugriha, Arogya-Niketan, Arohi, Prastar Swakhar.  ... The popular image of Bikash Roy had been that [of] a villain and his portrayals in such roles were indeed remarkable. He had also brought out with ease the intricacies of human emotions as evinced by his performances in Arogya Niketan and Ratnadeep. Not quite handsome in the conventional sense, his face did demonstrate a measure of plastic sensibilities complemented by his sonorous voice.

-- AmrtiaBazar Patrika

 

প্রযোজক, পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, এডিটর থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই একবাক্যে বিকাশ রায়ের সুন্দর ব্যবহারের কথা বলেছেন। শুধু এঁরা নন, স্টুডিওর সাধারণ কর্মী, প্রোডাকশন এ্যাসিস্টাণ্টদের সাথেও বিকাশ রায়ের ছিল এমনি মধুর ব্যবহার। সে কথাই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানালেন প্রোডাকশনের লক্ষ্মীকান্ত দত্ত। স্টুডিওতে কাজে লেগেছেন সেই বড়ুয়া সাহেবের আমল থেকেই। কর্মসূত্রে বহুবার বিকাশ রাযের সংস্পর্শে এসেছেন। কতবার কত অভাব অভিযোগে বিকাশ রায় মুক্তহস্তে সাহায্য করেছেন। শোনা ছিল বড় শিল্পীরা নাকি নানা রকম বায়না করেন। তাই এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করতেই লক্ষ্মীদা জানালেন -- না বাবু। অমন নিপাট ভালমানুষ আমার এই স্টুডিও-জীবনে খুব কমই দেখেছি। ... বাবু, ওনার মত বড় মনের মানুষ আজ আর দেখি না। কখনও আমাদের হেনস্তা করতেন না। ভাল মুখে বাবা-বাছা বলে কথা কইতেন। কাজ ছেড়ে চলে যাবার পরও যখনই ওনার সাথে দেখা হযেছে আমাদের সবার কুশল জিজ্ঞেস করেছেন। এমন কজন হয় বলুন?

 -- মানব ব্রহ্ম, প্রসঙ্গ বিকাশ রায়, উল্টোরথ, মে ১৯৮৭

 

বিকাশবাবু চার বছর সংকল্প নিয়ে দুর্গাপূজা করেছিলেন। দ্বার খোলা ছিলো, সবাই আসতে পারতেন, পর্দা-মঞ্চ-বেতারজগতের অনেকেই আসতেন।

সবচেয়ে জমকালো আসাটা ছিলো বিজয়া দশমীর দুপুরে। সেদিন আসতেন কোলকাতার সমস্ত স্টুডিও আর মঞ্চের কর্মীরা, সপরিবার ও সবান্ধবে। এঁদের প্রোডাকশন অ্যাসিস্‌টেণ্ট বলা হতো, কায়িক শ্রমের সব কাজ করতেন এঁরা, লাইট ফেলা থেকে শুরু করে ফ্লোর ঝাঁট দেওয়া। প্রথম পুজোতে বিকাশবাবু সব স্টুডিও-মঞ্চ ঘুরে এঁদের নিমন্ত্রণ করে এসেছিলেন। ভিয়েন করে, ম্যারাপ বেঁধে তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা হতো -- খিচুড়ি, বেগুনী, পাঁচমিশালী তরকারী, চাটনি, পাঁপড়, দই, বোঁদে আর পানতুয়া। বিকাশবাবুর অন্য কোনো সহকর্মী -- অনিল চ্যাটার্জি, অসীম পাল, গুরু বাগচীর কথা মনে আসছে -- পান সিগারেট জোগান দিতেন। আমাদের বাড়ী ছিলো তখন ফাঁকা যোধপুর পার্কে, মাঠের শেষে। নিমন্ত্রিতরা আসতেন সদলে মাঠ পেরিয়ে, কোনো কোনো দল হতো দশ-পনেরো জনেরও বেশী। তারপর দীয়তাং ভুজ্যতাম্‌, আমরা পরিবেশন করতে হিমসিম খেয়ে যেতাম, আমন্ত্রিতদের মধ্যেই জোয়ান যাঁরা তাঁরা আমাদের সরিয়ে দিয়ে কাজে লেগে যেতেন। খাওয়ার পর "দুর্গামাইকী জয়" বলে তাঁরা ঠাকুর বিসর্জন দিতে চলে যেতেন, পরের বছরে আসার নিমন্ত্রণ নিয়ে। এঁদের মধ্যে অনেকের এটিই ছিলো বছরে সপরিবারে ভূরিভোজনের একমাত্র সুযোগ।

-- সুমিত রায়, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ

 

সেবার একই বছরে বাংলা তথা ভারতীয় সংস্কৃতির জগৎ হারাল বেশ কয়েকজনকে। প্রথমেই বিদায় নিলেন বিকাশ রায়। সুভদ্র, সুরসিক, সংস্কৃতিবান হিসেবে বাংলা ছবির জগতে যে হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব আছেন, বিকাশ রায় তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য।(২২৫)

  -- বেলা মুখোপাধ্যয়, "আমার স্বামী হেমন্ত", সাহিত্যম্‌, ১৯৯৯

 

বিকাশ রায় ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন অভিনেতা। তাঁর অভিনয় ছিল বহুমাত্রিক। বাংলা ছবির গড্ডলিকা প্রবাহে বহু আজে বাজে ছবিতে কাজ করলেও, বিকাশ রায়ের অভিনয় বরাবরই ছিল অসাধারণ।

--অনুপকুমার, আজকাল



(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।