প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

জন্মশতবর্ষে বিকাশ রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫

 

আমার আমি-র বিকাশে

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়


‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ’ আর ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’- এই দুটো গান সেই কোন ছোটবেলা থেকে আমার মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে আছে। তখন কিসের গান তা জানতাম না। সেই ছোটবেলায় বেশি কিছু জানার অবকাশই বা কোথায়! রেডিয়োতে শুনতাম। বারবার শুনতাম আর প্রতিবারই আরো আরো মুগ্ধ হতাম। পরে কার কাছে যেন শুনলাম অবধূতের মরুতীর্থ হিংলাজ বইটি নিয়ে যে সিনেমা হয়েছে, এ হল তার গান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া, তা আর বলে দিতে হয়নি। আরও পরে জানলাম, গানদুটো লিখেছেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। তারও পরে জানলাম সেই মরুতীর্থ হিংলাজ সিনেমার পরিচালক বিকাশ রায়। শুনেই বিস্ময়। ওমা, উনি তো অভিনয় করেন! আবার ডিরেক্টরও!

সেই ছোটবেলায় তো প্রশ্নই ছিল না। তারপর বড় হয়ে যখন সিনেমা-টিনেমা দেখছি তখন উত্তমকুমার তো মনের দশ দিগন্ত জুড়ে ছেয়ে আছেন। তার পাশাপাশি যেসব অভিনেতাদের রীতিমতো নজরকাড়া অভিনয়, শুধু আমাকেই নয় - সবাইকে মুগ্ধ করে রাখত তার মধ্যে ছিলেন ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র, পাহাড়ী সান্যাল, জীবেন বসু এবং বিকাশ রায়। ছবি বিশ্বাসের আভিজাত্যই আলাদা। কমল মিত্র-র ব্যক্তিত্ব তুলনাহীন। পাহাড়ী সান্যাল যেন ভালবাসা আর সারল্যের মূর্ত প্রতীক। জীবেন বসু সেই সময়ের নিরিখে স্বতঃস্ফূর্ত, ন্যাচারাল অ্যাক্টিং-এ অদ্বিতীয়।

তবে সবাইকে ছাপিয়ে যিনি আমার হৃদয়াকাশে, মনের মণিকোঠায়, মুগ্ধতার মিনারের চূড়ায় বসে থাকতেন- তিনিই বিকাশ রায়। এত বৈচিত্র্য, এত অনায়াস চরিত্রচিত্রণ, একাধিক চরিত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী অভিনয় - আর সবকটাই দুর্ধর্ষ। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়- ছেলে কার, ’৪২, আরোগ্য নিকেতন, শ্রীকান্ত ইন্দ্রনাথ ও অন্নদাদিদি, ছদ্মবেশী - শুধু এই পাঁচটা ছবিকে যদি আলাদা করে চুম্বক-দৃষ্টিতে ধরি, বিকাশ রায় সম্পর্কে ‘ভার্সেটাইল অভিনেতা’- এই দুটো শব্দ বোধহয় সাতরঙা রামধনু হয়ে দেখা দেবে দিগন্ত জুড়ে। অবিশ্বাস্য, অতুলনীয় , দুরন্ত, অভাবনীয় - বিশেষণ খুঁজে শেষ করতে পারব না। 

তখন একটু একটু করে অভিনয় করার ইচ্ছে, যাকে বলে ‘অভিনয়ের ভূত’ মাথার মধ্যে ঢুকছে। ছোট খাট থেকে মাঝারি মানের গ্রুপ থিয়েটারে ঘোরাঘুরি করছি।  ভাল ভাল অভিনয় দেখে শুনে কিছু শেখার চেষ্টা করছি। অভিনয়ের বৈচিত্র্যের ক্লাস নিতাম বিকাশ রায়ের কাছে। না না, সরাসরি নয়। সবার চোখের আড়ালে, তাঁর অভিনীত ছবিগুলো বারবার দেখে দেখে। ওই বয়েসে হাতে দুটো বাড়তি পয়সা এলেই সচরাচর সিগারেটে টান দেয় বেশিরভাগ বন্ধুরা। আমার সিগারেট খাওয়ার প্রতি কোন আসক্তি ছিল না। টিউশনি করে বা খুচরা কোন কাজ করে দুটো পয়সা হাতে পেলেই সিনেমা দেখতাম পাগলের মত। কখনো কখনো দিনে তিন চারটে, এমনকি পাঁচটাও- মর্নিং, নুন, ম্যাটিনি, ইভনিং, নাইট। যুব উৎসবের সময় তো পরপর পাঁচটা সিনেমা দেখেছি টানা এক জায়গায় বসে আর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এ হল, ও হল ঘুরে ঘুরে।

সেই সময়েই আমার কন্ঠ বেশ ভাল- এমনটা শুনতাম অনেকের কাছে। ভাল কন্ঠ তো খুঁজলে পাওয়া যায়ই। কিন্তু সেই কন্ঠের সঠিক প্রয়োগ, চরিত্র অনুযায়ী কন্ঠ বদলে ফেলা, মোক্ষম ভয়েস থ্রো আর তাই দিয়েই একটা চরিত্রকে একশোভাগ বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা- বাংলা সিনেমায় কন্ঠের এমন বহুমাত্রিক ব্যবহারে বিকাশ রায়ের তুল্য আর কাউকে আমি খুঁজে পাইনি আজ পর্যন্ত।  

প্রথম দর্শন ঘটেছিল এক বিচিত্র পরিস্থিতিতে। সকালবেলা জানলাম বাংলা চলচ্চিত্রের যশস্বী অভিনেত্রী অনুভা গুপ্তা আর নেই। পাড়ার ক’জন বন্ধু বলল, চল, সকাল সকাল কালীঘাটে মহিম হালদার স্ট্রীটে যাই। অনুভা গুপ্তা তখন এক বিখ্যাত অভিনেতা রবি ঘোষের ঘরণী। যাওয়ার উদ্দেশ্য আর কিছু নয়। অনেকেই নিশ্চয়ই খবরটা জেনে বাড়িতে আসবেন। কাজেই অনেক আর্টিস্ট দেখা যাবে। চললাম। 

ভবানীপুর থেকে মহিম হালদার স্ট্রীট মেরেকেটে ১০ মিনিটের পথ। গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে বেশ ভিড়। ওরই মধ্যে ঠেলেঠুলে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। পাঁচিল ঘেরা খানিকটা চৌকো জায়গা। সেখানে চার কোণে ফুল বাঁধা একটা শববাহী খাট রাখা। তারপর দু’তিন ধাপ উঠে একটা বড় দরজা। সেই দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে রবি ঘোষ। একজন দুরন্ত কমেডিয়ানকে ঐরকম সিরিয়াস মুখে আর কখনও দেখিনি। বলতে বলতে এলেন অপর্ণা সেন। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। খানিক বাদেই নির্মলকুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায় আরো কয়েকজন। সবাইকে তেমন ঠিক চিনিও না। আর একটু পরেই এলেন বিকাশ রায়। জানুয়ারি মাস। গায়ে শাল জড়ানো। থমথমে মুখ। বিমুগ্ধ বিস্ময়ে চাক্ষুষ দেখলাম তাঁকে। সেই আমার প্রথম বিকাশ-দর্শন। 

এক একবার এইরকম শিল্পীরা আসেন আর সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতার মধ্যে শোরগোল শুরু  হয়ে যায়। ঐ যে, ঐ দ্যাখ, ঐ  যে, আসছে রে- ইত্যাদি। বিকাশ রায়কে প্রথম দেখার পর আমার মধ্যে যা যা হবার ছিল, তাই হল। তার সঙ্গে আরো একটা ব্যাপার হল নিদারুণভাবে। চারপাশে তাকিয়ে আমার বন্ধুরা আর ঐসব অত্যুৎসাহী লোকজনদের দেখে হঠাৎই মনে হল, আরে! এ আমি কী করছি! আমি তো এদের দলে নই! আমি তো আলাদা। আমি না একদিন এইসব আর্টিস্টদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এঁদেরই মত হওয়ার স্বপ্ন দেখি!  এখানে এখন আমাকে কেউ চেনে না, জানে না। একজন যশস্বী শিল্পী মারা গেছেন। আর আমি কিনা হ্যাংলার মত নেচে নেচে আর্টিস্ট দেখতে চলে এলাম! মনে হওয়া মাত্রই ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসছি, হঠাৎ ‘হরিধ্বনি’ উঠল। দেখলাম ঐ বড় দরজা দিয়ে ধরাধরি করে কয়েকজন অনুভা গুপ্তাকে নিয়ে আসছেন বাইরে। দাঁড়িয়ে গেলাম। সেই সাজানো খাটে শুইয়ে  দেওয়া হল তাঁকে। আর্টিস্টরাও আবার সব দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। একে একে। সবারই চোখে জল। মাধবী মুখোপাধ্যায়কে দেখলাম দুহাত দিয়ে ধরে আছেন বিকাশ রায়কে। অনুভা গুপ্তার ব্যক্তিত্ব ছিল চমৎকার। খুব যে সুন্দরী ছিলেন বলা যায় না। তবে সেদিন ফুলে ফুলে সাজানো, দুই ভুরুর মাঝখানে বড় লাল টিপ আর কপাল থেকে মাথার মাঝখান পর্যন্ত চওড়া করে লাল সিঁদুর লেপা। তাঁর মুখটা যে কি অপরূপ লাগছিল তা আজো মনে গাঁথা হয়ে আছে। তাঁকেও জীবনে সেই প্রথম দেখা মৃত্যুশয্যায়। ভেতরে ভেতরে ধিক্কার দিচ্ছিলাম নিজেকে। আজ এখানে এভাবে দুম করে আর্টিস্ট দেখব বলে চলে আসাটা আমার একেবারেই উচিৎ হয়নি। খুব খারাপ লাগছিল। আর দেরি না করে বেরিয়ে এলাম একা। বন্ধুদের কিছু না বলেই। ফেরার পথে ভাবছিলাম, অনেক খারাপের মধ্যেও তো একটু কিছু ভাল লুকিয়ে থাকে। আজ আমার এই অসম্ভব খারাপ লাগা অনুভবের মধ্যে ভাল লাগার একটাই। স্বচক্ষে প্রথম দেখলাম স্বপ্নের মানুষ বিকাশ রায়কে। আরও পরে যখন কখনো এই ঘটনাটার কথা আবারো মনে পড়েছে, ভেবেছি- আমাদের বোধহয়  মনের ওপর সত্যিই কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই! ঐ অত খারাপ লাগার অনুভবের পরেও একা একা ফেরার পথে ফিরে ফিরে আসছিল ছদ্মবেশী সিনেমার নানা দৃশ্য। অনুভা গুপ্তা, মাধবী মুখোপাধ্যায়, বিকাশ রায়- তিনজনকেই দেখলাম একসঙ্গে। নেই শুধু উত্তমকুমার। 

‘মৃত্যোর্মা অমৃতম্‌ গময়ঃ’- মৃত্যুর মধ্যে অমৃতে গমনের স্বাদ। সেই যদি হয় প্রথম, এর পরের বিকাশ-দর্শন এবং বলা উচিৎ, স্থান মাহাত্ম্যে পুনঃ পুনঃ দর্শন ঘটল ‘বিষ’-এ।  হ্যাঁ, বিষ নাটকে।  না না, টালা ব্রিজের নিচে শ্যামাপ্রসাদ মঞ্চে গিয়ে নয়। এক্কেবারে আমার পাড়ায়, ভবানীপুরে। 

কি ভাগ্যি আমার, জন্মেছিলাম ভবানীপুরে। পড়েছিলাম মিত্র ইন্সটিটিশনে। স্কুলের ঠিক পশ্চিমে হরিশ মুখার্জি রোড পেরিয়ে আদি গঙ্গার দিকে চলে গেছে বলরাম বসু ঘাট রোড। সে রাস্তায় ঢুকেই দুটো বাড়ি, তারপরই ডানহাতে জোড়া পোড়ো মন্দিরের কোল ঘেঁষে পেল্লাই তিনতলা বাড়ি। সেইখানেই থাকতেন বাংলা অভিনয়জগতের মাতৃরূপা মলিনা  দেবী। থাকতেন আর এক অসামান্য অভিনেতা গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বাড়িতেই একতলায় বিশাল হলঘরে বসত এম জি এন্টারপ্রাইজের মহলা। তখন এম জি এন্টারপ্রাইজ মানেই ভক্তিরসাশ্রিত নাটকের পয়লা নম্বর দল। মুখ্য ভূমিকায় মলিনা দেবী, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। 

পেশাদারী রঙ্গমঞ্চে যেমন হয়, একাধিক বিখ্যাত শিল্পীদের সমন্বয়ে নতুন নাটক। তো সেই ‘বিষ’ নাটকে এম জি এন্টারপ্রাইজের বাইরে অভিনয়ে নতুন করে মলিনা দেবী, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।  বাড়ির নীচের মহলা কক্ষে নিত্য আসছেন বড় বড় সব শিল্পীরা। চার ধাপ লাল মেঝের সিঁড়ি টপকে উঠে তারপর মহলা কক্ষের দরজা। দু’পাশের লম্বা লম্বা দুটো দুটো করে চারটে জানলার নীচেটা জুড়ে বেশ বড় সড় দীর্ঘ রোয়াক। কিন্তু সে অবধি পৌঁছনোর সাহস ছিল না। আরো ১০-১২ ফুট আগেই রাস্তার ধারে উঁচু পাঁচিল। বিশাল কালো গেট। তাকে টপকে ভেতরে ঢোকে সাধ্য কার! তবু ভাগ্যের জোরে, ঐ পাড়ায় থাকি বলেই, গাড়ি থেকে নেমে ঐ বিশাল গেট দিয়ে ঢোকার মুখে তাঁকে দেখেছি বেশ কয়েকবার।

মহলা চলাকালীন দীর্ঘসময় গেটের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছি। কানে ভেসে এসেছে টুকরো টুকরো সংলাপ। যখনি বিকাশ রায়ের সংলাপ শুনেছি, হাতের লোম খাড়া হয়ে গেছে। গেটে দাঁড়ানোও যে খুব সুখের ছিল তা নয়। ভেতর থেকে মাঝে মাঝে তাড়ার হুঙ্কার এবং রেলিং ছেড়ে পিছিয়ে চলে আসা।  আবার রাস্তার দিক থেকেও বিপদ। পাড়ার কোনও শুভানুধ্যায়ী বাড়ি গিয়ে মা-র কাছে আমার ঐ গেট-আশ্রিত অবস্থান জানিয়ে দিলে বাড়ি ফিরে বকুনি সমভিব্যাহারে চপেটাঘাত এড়ানো বড়ই কঠিন। তা হোক, তবু সব মাথায় নিয়েও দাঁড়িয়ে থেকেছি। ততদিনে তো জেনে গেছি ওঁরও জন্ম ভবানীপুরে। উনিও পড়েছেন মিত্র ইন্সটিটিউশনে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত। অজান্তে কেমন একটা স্কুলতুতো সম্পর্কে নিজের কেউ ভাবতে শুরু করে দিয়েছি বিকাশ রায়কে। হবে নাই বা কেন!  ভেতরে ভেতরে তাঁর অভিনয় থেকে আমার শিক্ষাগ্রহণের যে প্রক্রিয়া, সেটা তো ততদিনে রীতিমত সচল।

কতরকমভাবে যে শিখতাম! রেডিয়ো নিয়ে আমার একটা প্যাশন ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। আমার অভিনয় শিক্ষার প্রথম পাঠ রেডিয়োর শুক্র, শনি, রবিবারের নাটক। ঘোষক এবং প্রযোজক হিসেবে বিকাশ রায়ও কিছুদিন রেডিয়োর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গোড়ার দিকে। পরবর্তীকালে রেডিয়োর নাটকে অভিনয়ও করেছেন। আর সব বাদ দিলেও, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ-কাহিনি ‘অচিন পাখি’ জীবনে ভুলব না। ব্যোমকেশ জয়ন্ত চৌধুরী, অজিত শৈলেন মুখোপাধ্যায় আর নীলমণি দারোগা বিকাশ রায়। গল্প যে ব্যতিক্রমী তাতে তো সন্দেহ নেই আর অভিনয়! বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে বিকাশ রায়ের ঐ সংলাপ- উঃ! এখনো মনে পড়লে রোমাঞ্চ হয়। মন প্রাণ ঢেলে উৎকর্ণ হয়ে শুনতাম। বাধ্য ছাত্রের মত যতটুকু পারি গ্রহণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম। সেই সময়ে এই ভাবে ছাড়া আর তো আমার পাঠ নেওয়ার অন্য কোন রাস্তাও ছিল না। অনেক পরে রেডিয়োতে হাল আমলে ব্যোমকেশ সিরিজে কখনো অজিত কখনো ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ যখন পেয়েছি, মনে হয়েছে অন্তর থেকে চাইলে জীবনে কোন না কোন সময়ে এইভাবেই বোধহয় বিধাতা অঙ্ক মিলিয়ে দেন। সেই নাটক শোনা, আর এই নাটক করা।

বিবিধ ভারতীর বিজ্ঞাপন কার্যক্রম তখন চলেছে রমরম করে। গোগ্রাসে গিলি নাটকগুলো। যেসব ধারাবাহিক শুনতে না পেলে মনে হত খাওয়া হয়নি, ঘুম হয়নি- তার মধ্যেই ছিল শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’। সিংহ-মার্কা নারকোল তেলের প্রযোজনা। আজো মনে পড়ে জিঙ্গলটা- ‘সিংহ-মার্কা নারকোল তেল ষোল আনা খাঁটি, সেই তেলে কেশবতী বাঁধেন খোঁপাটি’। সিংহবিক্রমে পথের দাবী-র সব্যসাচী চরিত্রে আর কে অভিনয় করবেন বিকাশ রায় ছাড়া! এক এক সপ্তাহের এক একটা এপিসোড আমার এক একটা লেসন্।

লিভিং সাউন্ড-এর তখন বিশাল নামডাক। বাংলার যত সেরা সব কন্ঠ, প্রায় সবাই লিভিং সাউন্ড-এর অহঙ্কার। বেশ ক’বছর ধরে, বহু চেষ্টা চরিত্তির করে অবশেষে চৌকাঠ ডিঙিয়ে আমিও সেখানে ঢুকতে পেরেছি। বিকাশ রায়ের সঙ্গে সরাসরি দেখা, সরাসরি কাজের সুযোগ পেয়েছিলাম সেই সূত্রেই। নিজে যেমন মাইকের সামনে হাতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে অভিনয় করছি, যখন উনি বলছেন আকুল হয়ে দেখছি আর শুনছি। তবে ওঁর দিক থেকে সেটা ‘তোমার হল শুরু আমার হল সারা’ পর্ব। ’৮০-র দশকের প্রথমদিকে আমার সেখানে হাতেখড়ি। উনি তখন পাততাড়ি গোটানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। ঐ পরিণত বয়সেও অহমিকার লেশ দেখিনি তাঁর মধ্যে। আমরা খুবই সমীহ করে কথা বলতাম। উনি কিন্তু সদালাপী। প্রাণচাঞ্চল্য আর রসিকতায় ভরপুর। সেই সব টুকরো টুকরো ভাল লাগার মুহূর্ত জীবনের পরম সঞ্চয়।

কোন একদিন, একটা বিদেশী কাহিনির ধারাবাহিকের রেকর্ডিং হচ্ছে। একটা দৃশ্য শেষ হওয়ার পর শ্রাবন্তীদি কনসোল থেকে বেরিয়ে এসে পেন্সিল হিল-এর খটখট আওয়াজ তুলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় বিকাশ রায়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। উনি বসেই রেকর্ডিং করতেন। নাকের ডগায় চশমাটা টানা। তার ওপর দিয়ে চোখ তুলে তাকালেন বিকাশ রায়। কপালে দেখা দিল ক’টা বাড়তি ভাঁজ।
-কি রে? কিছু বলবি?
-হ্যাঁ বাবু। তোমার নাম তো বিকাশ রায়!
মুখে হালকা হাসি, চোখে মৃদু বিস্ময়। একেবারে ওই গলার অ্যাডামস্ অ্যাপলটা যেখানে স্বরের ব্যবহারের সঙ্গে ওঠানামা করে, সেখান থেকে অসাধারণ একটা কন্ঠ বের করতেন তিনি, বহু অভিনয়ে দেখেছি। ঠিক সেই কন্ঠের অসামান্য প্রয়োগে বললেন,
-হ্যাঁ, লোকে তো তাই জানে!
-তুমি তো বিখ্যাত অভিনেতা, বিশাল নামডাক তোমার।’
কপালটা আরো একটু কুঁচকোল, ভুরু জোড়া উঠে গেল ওপরে। পর্দার বিখ্যাত ক্লোজ আপ যেন।
-হ্যাঁ, তাই সবাই বলে বটে। তোর কি সন্দেহ আছে?
-না, তাই ভাবছি আর কি!
হঠাৎ যেন অন্য কেউ। সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্র। অদ্ভুত একটা হাসির ঝিলিক।
-আরে দূর পোড়া! কী বলছিস বল না!
-না, বলছি... এই যে এত বড় সীনটা হল, যদি বল..., যা করেছি বেশ আছে, ওটাই চলবে, আমি তাই রেখে দেব। আ-র যদি বল ...
আবার মুখের রেখাগুলো গেল পাল্টে। স্নেহশীল জেঠু যেন। একরাশ মমতা আর ভালবাসা মিশিয়ে বললেন,
-আচ্ছা আচ্ছা; আচ্ছা বাবু, বুঝতে পেরেছি। আর বকিস না। নে নে, সীনটা শুরু থেকে নিয়ে নে আর একবার। বৎসগণ! চলো ভাই, প্লিজ আর একবার যাই। ভেরি স্যরি। এটা মাই ফল্ট।
একগাল হেসে বিকাশ রায়ের মাথার চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিয়ে শ্রাবন্তীদি অদ্ভুত হেসে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি রে! কী বুঝলি!’ আসলে বলতে চাইল, ‘কী শিখলি’!
বনেদিয়ানা আর আভিজাত্যের সঙ্গে বিনয় আর কাজের প্রতি আন্তরিকতা মিলে একাকার হলে যা হয়, এই ছোট্ট ঘটনা যেন তারই শিক্ষা।

চরিত্রের প্রয়োজনে উদ্ধত, দাম্ভিক, কুটিল, অমানবিক, অহঙ্কারী- কী না হয়েছেন বিকাশ রায়! ছবির নাম বলে শেষ করা যাবে না। আবার রোম্যান্টিক, আদ্যন্ত আদর্শবাদী ভালোমানুষ, এমনকি কমেডি, সবেতেই অব্যর্থ। সন্ধ্যাদীপের শিখা, বিন্দুর ছেলে, আরোগ্য নিকেতন, উত্তর ফাল্গুনী, ছদ্মবেশী- পর পর ছবিগুলো মনে আসছে। আর শিল্পী সংসদের প্রযোজনায়, উত্তমকুমারের পরিচালনায় রমাপদ চৌধুরীর ‘বনপলাশীর পদাবলী’! সেই যে মলিনা দেবী ‘অট্টা মা’ আর বিকাশ রায় ‘পেসাদ’। চোখের সামনে বনপলাশী গ্রামের একটু একটু করে পালটে যাওয়ার নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছেন, ‘যখন উদাস বাউল নেই কো বাউল আর...’

অনেক অনেক বছর পরে নিজেও যুক্ত হয়েছি শিল্পী সংসদের সঙ্গে। মৌলালির মোড়ের কাছে লেনিন সরণীর দোতলায় সেই ঐতিহাসিক, নানা উজ্জ্বল স্মৃতিঘেরা ঘরে বসে শুনেছি এই সংগঠনের জন্মের কথা। খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে কাটে শিল্পীদের জীবন। ভাবতে অবাক লেগেছে যে এমন দিনও এসেছে টালিগঞ্জের ইতিহাসে যখন কুৎসা রটানো হয়েছিল এমনকি উত্তমকুমারের নামেও, যিনি শুধু অভিনেতা হিসেবেই নন, মানুষ হিসেবেও কিংবদন্তী। চোর প্রতিপন্ন করা হয়েছিল তাঁকে! নীরবে চোখের জল ফেলেছিলেন তিনি। সহমর্মী হয়ে সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন বিকাশ রায়। শিল্পীদের সংগঠন হিসেবে তখন অভিনেতৃ সঙ্ঘ বেশ শক্তিশালী। বিকাশ রায় নিজেও তার সঙ্গে যুক্ত। তবু তাঁদের ওয়েলিংটন স্ক্যোয়ারের দপ্তর থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পরিস্থিতির প্রয়োজনে তৈরি হল শিল্পী কলাকুশলীদের দুঃখের দিনের সাথী ‘শিল্পী সংসদ’। মধ্যমণি উত্তমকুমার। অনুপ্রেরণা এবং কার্যকরী সমতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বিকাশ রায়।

কালস্য কুটিলা গতিঃ। সেই নিয়মেই অভিনেতৃ সঙ্ঘের অস্তিত্ব আজ বিলুপ্তই বলা যায়। বেঁচে আছে শুধু কিছু মানুষের স্মৃতিতে। উত্তমকুমার, বিকাশ রায় প্রমুখ মানবদরদী শিল্পীদের হাতে গড়া শিল্পী সংসদ আজো দুর্গত শিল্পীদের পাশে একইভাবে তাদের প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়েই আছে অবিচল।
অনেক আনন্দঘন আর অশ্রুসজল মুহূর্তের সাক্ষী ঐ ঘরে বসে একদিন অতীতের অ্যালবামের পাতা ওলটাচ্ছিলাম।  কত কত বিদগ্ধ শিল্পী, কলাকুশলী, প্রযোজক, পরিচালকের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ধরা আছে সেখানে। ধরা আছে একটা কাল। একটা ছবি দেখে খুব কৌতূহল জাগল। বোঝাই যাচ্ছে কোন মঞ্চের ওপর মাইক্রোফোনের পেছনে হাতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে দুই দিকপাল- উত্তমকুমার আর বিকাশ রায়। খোঁজ নিয়ে জানলাম, একবার শিল্পী সংসদ থেকে মূলত বিকাশ রায়, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও উৎসাহী আরো কয়েকজনের উদ্যোগে রবীন্দ্রসদনে আবৃত্তির আসর বসানো হয়েছিল তিনদিনের জন্যে। আবৃত্তিকে সাধারণের কাছে জনপ্রিয় করাই উদ্দেশ্য ছিল। প্রথম দু’দিন বিক্রিবাটা তেমন হয়নি। তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠানে উত্তমকুমারকেও সেই আসরে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানালেন বিকাশ রায়। রাজী হলেন মহানায়ক। মুহূর্তে বিজ্ঞাপন চলে গেল খবরের কাগজে। একদিনে বিক্রি হল পাঁচ হাজার টাকার টিকিট। উত্তমকুমারের অনুরোধে সেই সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে দ্বৈতপাঠে অংশ নিলেন বিকাশ রায়। মুগ্ধ দর্শক-শ্রোতারা!

এখন তো অভিনয়ের পাশাপাশি মঞ্চে সঞ্চালনা আবৃত্তি নাটক বা গল্পপাঠ আমার জীবন এবং জীবিকা। এইসব গল্প আর সোনালি ইতিহাস শুনলেও রোমাঞ্চ হয়। সেদিন চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়তো হয়নি, তবু অনুমান করতে পারি বিকাশ রায়ের অসামান্য কন্ঠস্বরের নিপুণ প্রয়োগে কতটা আপ্লুত হতেন শ্রোতারা।
অজস্র সিনেমায় চরিত্র অনুযায়ী তাঁর কন্ঠস্বরের ব্যবহারের বৈচিত্র্যও আলাদা করে এখনো টানে আমাকে, এখনো শিখি।

একেবারে গলা থেকে, যে অংশ দিয়ে কন্ঠবর্ণের উচ্চারণ, তার একটুও নীচে না নেমে, কন্ঠের যাকে বলে গ্রেন, সেই গ্রেন-কে কি দারুণ কাজে লাগাতেন! শব্দগুলো যেন রয়ে গেল মুখের মধ্যেই। খুব একটা জোরে নিক্ষেপ করা হল না, কিন্তু উচ্চারণের মুনশিয়ানায় সংলাপের যে অভিঘাত, তা ফুটে উঠল একশো ভাগ। এই ধরণটায় কোথায় যেন হলিউডি অভিনয়ের ব্যতিক্রমী বাংলা সংস্করণ খুঁজে পাই। তবে কোথাও তেমন প্রকট নয়। বলা যায় এফর্টলেস্। বাঙালিয়ানার মোড়কে তা এমনভাবেই সাজানো- বুঝ লোক, যে জান সন্ধান। আর কারোর কথা জানি না, আমি তো বেশ বুঝতে পারি।

তাঁর বাঙালিয়ানার মধ্যে সাহেবিয়ানার প্রমাণ অজস্র। ধুতি পাঞ্জাবী বা স্যুট- পরিধানে যে পোষাকই থাক, সবেতেই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। কি একটা অদ্ভুত স্বাতন্ত্র্য ছিল তাঁর হাঁটায়, হাঁটার সময় হাতের সঞ্চালনায়। শরীরি ভাষায় সিচুয়েশন অনুযায়ী ব্যস্ততার প্রকাশ- এ সবই একেবারে মোক্ষম। সে কম বয়সের ছবিই হোক বা পরিণত বয়েসের।

এক্সপ্রেশনে সবসময়েই নিখুঁত বিকাশ রায়, এবং সবচেয়ে বড় কথা- কোনও রিপিটেশন নেই। অজস্র ছবিতে প্রায় প্রত্যেকটা চরিত্রেই একটা স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন অসামান্য দক্ষতায়। এমন অভিনেতা বাংলার অভিনয় জগতে বসত করে কয়জনা! ইনোসেন্স আর শ্রুডনেসের এমন অব্যর্থ এবং বিস্ময়কর সহাবস্থান- ঈর্ষা নয়, সমীহ জাগায়। আর এইসব দেখতে দেখতে নীরবে একটু একটু করে এমন ভাব, এমন নৈপুণ্য আত্মস্থ করার প্রক্রিয়াটা কতবার কতভাবে যে আমার কত কাজে লেগেছে!

বেশ কিছু বছর আগে, পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের সুপারহিট পরিচালক সমর মুখোপাধ্যায় ঠিক করলেন সারকারিনায় তাঁর মঞ্চসফল ‘ব্যভিচার’ নাটকটা নতুন করে আবার নামাবেন। প্রযোজক প্রবীর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল। সমরদাও আমাকে খুবই ভালবাসতেন। যোগাযোগের এই যুগলবন্দীতে কুশীলবদের মধ্যে আমিও একজন। বড়লোক পরিবারের ছোট ছেলে শুভ। যে সর্ব অর্থেই ভাল ছেলে। সেই চরিত্র আমার। দ্বিতীয়দিন রিহার্সালেই সমরদা বললেন, ‘সতীনাথ তুই এটাই করবি না ঐ বড় ছেলে ধান্দাবাজটা! গেরুয়া পরে,  সর্বক্ষণ মুখের বুলি ‘জয় রাধে’,  আর ভেতরে এক নম্বর দু-নম্বরী’।
ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ‘মানে....হ্যাঁ .... মানে... ইয়ে... আপনি বললে নিশ্চয়ই করব’।
‘ইয়েস্, তুই ওটাই কর। তোর ফেসিয়াল ইনোসেন্সটা কাজে লাগা। প্রথমবার অজয় গাঙ্গুলী এই রোলটা করেছিল। তুই একটু অন্যভাবে কর দেখি। বিকাশদার কথা ভাব। বিকাশ রায়। ওঁর ক্যারেক্টারাইজেশনগুলো দেখেছিস তো’!

সারকারিনা মঞ্চের ওপর বসে আমার শরীরে যেন শিহরণ লাগল। সমরদা ওই ধূর্ত চরিত্রের অফারটা দেওয়ামাত্র আমার স্মরণে এসেছিলেন বিকাশ রায়। ওঁর কাছ থেকে গোপনে নেওয়া অভিনয়ের শিক্ষা কাজে লাগানোর এ এক মোক্ষম সুযোগ। এমনটাই ভাবছিলাম। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পাকা জহুরীর মত সমরদার ভাবনাতেও বিকাশ রায়!

বেশ মনে পড়ে পরিচিত অপরিচিত বহু মানুষের কাছ থেকে ব্যভিচার নাটক চলাকালীন এমনকি তার পরেও যেসব মন্তব্য শুনেছিলাম, তা কতকটা এইরকম:
‘এই রোলটা তুই করতে পারলি! এই রকম একটা জঘন্য ক্যারেক্টার!’ ‘এটা তুই! ভাবতে পারছি না!’ ‘এরকম একটা কুৎসিত রোল!  আপনার মুখের দিকে তাকাতেও ঘেন্না হচ্ছে।’
আসলে তখন টিভিতে সংবাদপাঠক হিসেবে দর্শকদের কাছে অন্যরকম পরিচয়। পাশাপাশি অভিনেতা হিসেবে সজ্জন, ভদ্রলোক, শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল, উদার- এমন সব চরিত্রই করছি।  সেখানে এমন ‘এক নম্বর দু-নম্বরী’! মেনে নেওয়া কঠিন বইকি!
‘ব্যজস্তুতি’ বলে একটা কথা আছে না! নিন্দার ছলে প্রশংসা! যতবার এমন কথা যতজনের কাছে শুনেছি, আমার শ্রদ্ধা আমার প্রণাম বিকাশ রায়ের চরণ ছুঁয়ে গেছে। তাঁরও তো এরকমই অভিজ্ঞতা হয়েছিল ’৪২ ছবিতে অভিনয়ের পর!

প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল তৃপ্তি মিত্র-র কাছে রক্তকরবী নাটক করতে করতে। প্রথম ক’দিন ছোট সর্দার। তারপর গোকুল। বলা বাহুল্য, আমার ঠিক মন ভরছিল না। ভরার কথাও নয়। তবু তৃপ্তি মিত্র-র মত অসামান্য শিল্পীর সান্নিধ্যে থেকে শেখা নিয়মিত অভিনয় চর্চা করার সুযোগ, সেও কি কম পাওয়া! অবশ্য কয়েকটা শো হবার পর, অবশেষে নিয়তির বিধানেই হয়তো, আমি হলাম রাজা। কীভাবে, কেমন করে- সে অন্য গল্প। কিন্তু এর মাঝে আর একট অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সন্ধেবেলা রিহার্সাল চলছে। হঠাৎ দিদি বললেন, ‘হ্যাঁ রে ৩২১ টা তো তোর মুখস্থই আছে।’
একটা অলিখিত শর্ত ছিল ওঁর। ছোট, বড়, মেজ, সেজ যে রোলই তুমি কর না কেন-  গোটা নাটকটা মুখস্থ রাখতেই হবে। যেভাবে নাগাড়ে রিহার্সাল হত- না থাকাটাই অস্বাভাবিক। সব রোলই মুখস্থ ছিল আমাদের সব্বার।
‘দিদি, ৩২১?’
‘হ্যাঁ। তোর এই ব্যারিটোন গলা একদম ভুলিয়ে দিয়ে, নতুন রকম কিছু করতো! শুনলেই, দেখলেই যেন ঘৃণায় গা গুলিয়ে ওঠে।’ এবারও প্রথমটায় একটু কেমন যেন লাগল। আহা রে! আমার যে কন্ঠসৌন্দর্য নিয়ে প্রশংসার এত বাণী শুনি, সেই সব চুকিয়ে বুকিয়ে কিনা রক্তকরবীর অতীব ঘৃণ্য ৩২১! ত্রাণকর্তা হয়ে মুহূর্তে স্মৃতিপটে ভেসে উঠলেন বিকাশ রায়। চকিতে মনে পড়ে গেল ‘শ্রীকান্ত ইন্দ্রনাথ ও অন্নদাদিদি’। মনে পড়ল সেই সেই সাপুড়ে, সেই শাহজী।

আর কোনও দ্বিধা রইল না মনে। ওই অনুপ্রেরণায় এমন একটা গলা বের করলাম, নিজেই প্রায় ঘাবড়ে গেলাম। দিদি তো হেসেই ফেললেন। বললেন, ‘ওরে বাপ রে! এটাই মেন্টেন করতে পারিবি তো পুরোটা? ভেবে দ্যাখ!’
‘হ্যাঁ দিদি, পারবো’।
‘বাঃ! তবে তো কথাই নেই। দারুণ’!

বাকি আর সবাই-ও রীতিমত অবাক। বললেন, আর এক লহমায় হয়ে গেল! সেদিন রিহার্সালের শেষে যখন বাড়ি ফিরব, দিদি বললেন, ‘ওঃ! ওই খ্যাঁকখ্যাঁকে হাসিটা কিন্তু বড় জব্বর দিয়েছিস তুই। ঐরকম কুটিল নোংরা চরিত্রের যারা হয়, হাসি দিয়েই তাদের চট্ করে চিনে নেওয়া যায়। দ্যাখ, তোর পরিচিত কন্ঠের আড়ালে যে এমন একটা কন্ঠও লুকিয়ে আছে, আগে জানতিস? এই করেই কিন্তু একজন অভিনেতার ভার্সেটিলিটি বাড়ে, বুঝলি’?

বুঝলাম তো বটেই। দিদি কিন্তু বোঝেননি, ওঁর বলা আর আমার করার মধ্যে সবার অগোচরে কে আমাকে যুগিয়েছিলেন ভরসা, কে আমায় দিয়েছিলেন শক্তি, কে আমার মাথায় রেখেছিলেন তাঁর আশীর্বাদের হাত। ওইরকম কুচুক্কুরে হাসির পাঠ আমি দিনের পর দিন একটু একটু করে নিয়েছি বিকাশ রায়ের কাছে। প্রয়োগের অপেক্ষায় ছিলাম। সুযোগ করে দিলেন দিদি। মনে মনে আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম দুজনকেই।

আশ্চর্যজনকভাবে অনেকগুলো বিষয়ে আমি বিকাশ রায়ের সঙ্গে আমার মিল খুঁজে পাই। কাকতালীয় নিশ্চয়ই, তবু মিল তো বটেই। ভবানীপুরে জন্ম আর মিত্র ইন্সটিটিউশনে পড়াশুনো- সে তো আগেই বলেছি। প্রথম চাকরি উনি শুরু করেছিলেন বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি. জে. কিমারে তারপর রেডিয়ো আর অন্য মাধ্যম। আমারও কলেজ ছাড়ার পর প্রথম চাকরি আডভার্টাইজিং-এ। তার অনেক পরে রেডিয়ো, মঞ্চ, টিভি, ফিল্ম। এসব যদিও ঘটনাচক্রে মিলে যাওয়া, সচেতন মিল তো আমি নিজেই। মিলিয়ে মিলিয়ে রচনা করেছি, করে চলেছি। কন্ঠস্বরের বৈচিত্র্যময় ব্যবহারে উনিই যে আমার আদর্শ, সে কেউ না জানুক আমি তো জানি। নকল করিনি কখনো, প্রশ্নই ওঠে না- কিন্তু নানাভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে কন্ঠ যে প্রয়োগ করা যায়, এই প্রত্যয় তো তিনিই জাগিয়েছেন মনে। সাহসী হতে শিখিয়েছেন। আমার সত্যিই মনে হয় আরও কতরকমভাবে কন্ঠ ব্যবহার করতে পারি, দেখি। করিও তাই। নানারকম মানুষের গলা করার এক্সপেরিমেন্ট-এ আমার ড্রাইভিং ফোর্স, প্রেরণা বিকাশ রায়। নাট্যকার, অভিনেতা বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ মঞ্চ সফল নাটক ‘একটি অবাস্তব গল্প’। মোট দশটা চরিত্র।  ছজন পুলিশ আর চারজন সিভিলিয়ান। পুরোটা অডিওতে একক অভিনয় করতে আমি পারবই- এই আত্মবিশ্বাস আমার মধ্যে এনে দিয়েছেন বিকাশ রায়। প্রায় টানা দু'বছর এফ এম চ্যানেলে রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ ‘আসছে সে আসছে’ করার সময় অসংখ্য গল্পে একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেছি অক্লেশে, নির্দ্বিধায়। এমন সুযোগ কখনো আসবে- তাই ভাবিনি। এলো যখন, তা পুরোপুরি উশুল করার মত মনের জোর আর প্রত্যয় প্রতি মুহূর্তে আহরণ করেছি যাঁর কাছ থেকে, তিনি বিকাশ রায়।

তাঁর প্রভাব আমি এতরকমভাবে আমার মধ্যে জমিয়ে রেখেছি, বলে শেষ করা যাবে না। অভিনয় করার সময় অভিনেতার প্রপস্-এর সঠিক ব্যবহার একটি শিল্প, সন্দেহ নেই। আপাদমস্তক বাঙালি হয়েও সিগার, চুরুট, বিশেষ করে পাইপের ব্যবহার- সে হাতেই হোক, বা ঠোঁটে- তাকে একটা অনিন্দ্যসুন্দর শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বিকাশ রায়। আর কেউ তাঁর ধারেকাছে পৌঁছতে পারেননি। একই কথা বলা চলে অভিনয়ে মদ্যপানের দৃশ্য সম্পর্কে। পরিচালক পিনাকী চৌধুরীর একটা টিভি সিরিয়ালে এক আত্মভোলা বিজ্ঞানীর চরিত্রে রূপদান করতে গিয়ে নিরন্তর চুরুট খাওয়ার অভিনয় আবশ্যিক হয়ে পড়েছিল। কোনকালে আমার ধূম্রপানের অভ্যেস না থাকা সত্ত্বেও মাসের পর মাস বিশ্বাসযোগ্যভাবে সে অভিনয় করতে পেরেছিলাম রোল-মডেল হিসেবে বিকাশ রায়কে সামনে রেখে। দূরদর্শনের একটা টেলিফিল্ম ‘অপচয়’-এ লাবণি সরকারের সঙ্গে চূড়ান্ত মদ্যপানের দৃশ্যে অভিনয় ছিল। কেউ জানতে পারেনি, সেখানেও একজন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সবার অলক্ষ্যে আমাকে টিপস্ আফটার টিপস্ আফটার টিপস্ দিয়ে যান। তাঁর নাম বিকাশ রায়।

রেডিয়োয় চাকরি করার সময়েই বিকাশ রায়ের আলাপ হয়েছিল জ্যোতির্ময় রায়ের সঙ্গে। তাঁর হাত ধরেই একদিন বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অভিযাত্রী হয়েছিলেন বিকাশ রায়। তারপর শুধুই এগিয়ে চলা, নতুন নতুন অভিযানে- তুখোড় অভিনয়ে, আন্তরিক প্রযোজনায়, নিপুণ পরিচালনায়। প্রেসিডেন্সির পাস-আউট, পড়াশুনো করা মানুষ, চিন্তা ভাবনায় এগিয়ে ছিলেন তিনি নিজেও। তাঁর প্রথম ছবি ‘নতুন প্রভাত’- তাতেও ভাবনার নতুনত্ব অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আবার অনেকেরই সে ভাবনাকে গ্রহণ করার মত মানসিকতা তখনও তৈরি হয়নি। তবুও বিষয়বৈচিত্র্য বার বার ধরা দিয়েছে তাঁর পরিচালনার ছবিতে। এইভাবেই এসেছে বসন্ত বাহার, কেরী সাহেবের মুন্সী, মরুতীর্থ হিংলাজ, সূর্যমুখী, এমনি আরও কত ছবি। অভিনয়কেই পেশা হিসেবে নেবেন মনস্থ করার সঙ্গে সঙ্গে বিখ্যাত সব বিদেশি অভিনেতা, পরিচালকদের বইপত্র আনিয়ে বেশ ভাল রকম পড়াশুনো করে তৈরি করেছিলেন নিজেকে। এমন দৃষ্টান্তই বা টালিগঞ্জের আবহাওয়ায় আছেন ক’জন?

এখনো ভেবে অবাক লাগে, নায়ক তো নায়ক, ভিলেন তো ভিলেন, এমনকি কাহিনি আর চরিত্রের প্রয়োজনে, যাকে বলে ক্যারেক্টার রোল, যে কোন সময়ে, যে কোন বয়সের, সব ধরণের চরিত্রেই অনায়াস, স্বতঃস্ফূর্ত- এক কথায় ‘যেমনটি চাই, ঠিক তেমন,’ সর্ব অর্থে জনচিত্তজয়ী ও চূড়ান্ত সফল হওয়া সত্ত্বেও কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বা সরকারী পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটেনি তাঁর। একালের নয়, তাঁর সময়ের সেকালের বাংলা বলেই বোধহয় সম্ভব হয়েছিল এটা। চলচ্চিত্র-অভিনয় জগতের এমন একজন বহুমুখী প্রতিভার বিষয়ে এতটা উদাসীন ছিলেন রাজ্যের সরকার, এ সত্যিই অবিশ্বাস্য। বর্তমান সরকার গুনীজনের স্বীকৃতি প্রদানে খুবই সংবেদনশীল, তৎপর সন্দেহ নেই। আমার খুব আশা, বড় মাপের মরণোত্তর কোনও সম্মান প্রদান করা হোক বিকাশ রায়কে। পূর্বসূরীদের অন্যায়, অবিচার, উদাসীনতার প্রায়শ্চিত্ত হোক এভাবেই। শতবর্ষপূর্তি উৎসব বিকশিত হোক নবারুণ রাগে, সবুজের শ্যামলিমায়। কিংবা, না! সেটা হয়তো একটু বালখিল্যতা মনে হবে। মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরে মরণোত্তর স্বীকৃতি নয়। তাঁর নামে প্রদান করা হোক এক অনন্য সম্মান। অভিনয় জগতে সবরকম অভিনয়, সব ধরণের চরিত্রে যিনি পারদর্শিতায় শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে পারবেন, এ সম্মান জানানো হবে তাঁকে। যেখানেই থাকুন, পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিভার এমন স্বীকৃতি বিকাশ রায়কে তৃপ্তি দেবে নিশ্চয়ই।

‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ, একি অভিশাপ, নাই প্রতিকার/ মিথ্যারই জয় আজ সত্যের নাই তাই অধিকার’। মরুতীর্থ হিংলাজ সিনেমার জন্যে এ গান যখন লিখে এনেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, স্তম্ভিত হয়েছিলেন নাকি সবাই। কী সুর দিয়ে, কি মমতায় গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়- আহা! সিনেমার ওই সিচুয়েশনের জন্যেই নয়, এ কথা, এ সুর যেন অব্যর্থ হয়ে রইল অনাগত কালের জন্যেও। পরিচালক হিসেবে বিকাশ রায় তাঁর ছবির সঙ্গীতসৃজন যে কত গভীরতা দিয়ে ভাবতেন, এইসব কালজয়ী গান যেন তারই পরিচয়।

‘সূর্যমুখী’ বললেই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে আকাশের অস্তরাগে আমারই স্বপ্ন জাগে যেন ঝলমলিয়ে ওঠে। একই কথা বলা চলে ‘বসন্ত বাহার’ নিয়েও। কতখানি আন্তরিক এবং আপোস না করার মনোভাব না থাকলে তবে না ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ-র কন্ঠে ‘বসন্ত বাহার’ ছবির গান রেকর্ডিং হয়ে যাবার পরেও, মনোমত না হওয়ায়, সবিনয়ে ছবির গান আর সিচুয়েশন তাঁকে এমনভাবে শুনিয়েছিলেন, চোখে জল এসে গিয়েছিল ওস্তাদজীর। নিজেই উপলব্ধি করেছিলেন, এই মুডটাই তো নেই তাঁর গানে, তাঁর গায়কীতে! নতুন উদ্যমে আবার শুরু হল রেকর্ডিং। ওস্তাদজী আবার গাইলেন গান। নতুন প্রাণ পেল ‘আয়ে না বালম্’।

আজ প্রায় বাংলার পাড়ায় পাড়ায় শ্রুতিনাটকের চর্চা। ঘরে ঘরে শিল্পী। এই উদ্যোগেরও পথিকৃৎ বিকাশ রায়- একথা বলাই যায়। কি কান্ডটাই না ঘটিয়েছিলেন শেষের কবিতা নিয়ে! মঞ্চে রবীন্দ্রসঙ্গীত, রবীন্দ্রকবিতা আবৃত্তি, রবীন্দ্রনাট্য, রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য- এসব তো দীর্ঘদিনের চর্চিত শিল্প। শ্রুতিনাটকের অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এলেন বিকাশ রায় এবং ‘কি মহা সমারোহে’। নিখুঁত সম্পাদনা, শিল্পী নির্বাচন, পাঠ, পরিচালনা, অবশেষে মঞ্চায়ন আর ডিস্ক, ক্যাসেট, সিডি– যার কদর রয়েছে আজও।

১৯৮৪ সালেই স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছিলেন তিনি। প্রবল বিদ্রোহে, নাকি গভীর অভিমানে? যাইহোক, সমস্তরকম সৃজনশীল কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন সোচ্চারে প্রেস কনফারেন্স করে। এমন স্বঘোষিত বিদায় এ জগতে সেই প্রথম। টালিগঞ্জের ইতিহাসে এত বড় বুকের পাটা আর কেউ দেখাতে পেরেছেন, বিকাশ রায়ের মত? অনভিপ্রেত অবহেলা, উপেক্ষার বিরুদ্ধে এ এক সুতীব্র প্রতিবাদ। অনমনীয় উদারচেতা ব্যক্তিত্বের মানুষ না হলে কেউ এমন করতে পারেন?

তাঁর কাছ থেকে আমার প্রাপ্তির শেষ নেই। নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পেয়ে চলেছি আজও। কাজের মধ্যে দিয়েই বারে বারে নিবেদন করি আমার কৃতজ্ঞতা। বিগত ২৫ বছরে শুধু ‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ’- এই গানটা যে কত অনুষ্ঠানে ক’শো বার গেয়েছি- ইয়ত্তা নেই। আমার প্রতিটি কাজ ঈশ্বরের উদ্দেশে আমার অর্ঘ্য। ‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ’, আমার জীবনের প্রার্থনা-সঙ্গীত। এ গানের মধ্যে দিয়েই প্রণাম জানাই মা-কে - ঈশ্বরকে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে। সর্বোপরি, একলব্য হয়ে আমার দ্রোণাচার্যকে। ‘চরণতীর্থে তব এবার শরণ লব, দুর্গম এই পথ হব পার।’ এই উচ্চারণের মধ্যে দিয়েই অভিনয়ের অঙ্গনে আমার অবিসম্বাদিত আদর্শ, বিকাশ রায়ের চরণ ছুঁয়ে যাই।



লেখক পরিচিতি - ছোটবেলা থেকে ইচ্ছে ছিল ছবি আঁকাকেই জীবিকা করার। ঘটনাচক্রে তা হয়ে ওঠেনি। রংতুলির প্রতি সেই ভালবাসা ফিরে এল একটু অন্যভাবে। ক্যানভাসে রং বোলানোর বদলে অভিনয়ের মাধ্যমে নানা রঙ্গের চরিত্র রূপায়ন। নেশা থেকে কখন সেটাই হয়ে গেল পেশা।
ঈশ্বরপ্রদত্ত কন্ঠের সুচারু ব্যবহার সকলকেই মুগ্ধ করে। দূরদর্শনে সংবাদপাঠ, মঞ্চে আবৃত্তি, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা এবং অভিনয়ের সব কটি মাধ্যমেই সমান স্বচ্ছন্দ। দেশে-বিদেশে অসংখ্য অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের মন জয়। সাহিত্যের প্রতি অপরিসীম অনুরাগ। গল্প পড়া এবং শোনানোর প্রতি গভীর ভালবাসা। আর একটা ভালবাসার জায়গা গান। প্রাণের আনন্দে গেয়ে ওঠেন যখনই সময় পান।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।