প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

জন্মশতবর্ষে বিকাশ রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫

 

বিকাশদা

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

 

১৯৫৯ সাল। সত্যজিৎ রায়ের  পরিচালনায় অপু ট্রিলোজির শেষ পর্ব 'অপুর সংসার' রিলিজ করল। আমার প্রথম ছবি। সিনেমায় আসার আগে বিকাশ রায়ের সঙ্গে আমার কোনও পূর্বপরিচয় ছিল না। আমার প্রথম ছবি রিলিজ করার পরে পরেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হবার একটা সুযোগ হল। সবচেয়ে মজার কথা হচ্ছে, সেই প্রথম আলাপটা প্রায় একটা সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে হয়েছিল। যে বছর অপুর সংসার রিলিজ করে, সেই বছর পশ্চিমবাংলায় খুব বড় বন্যা হয়েছিল। সেই বন্যাত্রাণে অর্থ সংগ্রহে পথে নেমেছিল সমস্ত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। ত্রাণ সংগ্রহে বেরোনোর আগে আমরা সকলে সমবেত হয়েছিলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এর সামনে একটা জায়গায়। আমরা সবাই ট্রাকে।

অসিত চৌধুরী ছিলেন প্রোডিউসার আর বিকাশ রায়ের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অপুর সংসারেও যুক্ত ছিলেন। ট্রাকে তাঁর একদিকে আমি আর একদিকে বিকাশ রায়। তখন ‘চলচ্চিত্র’ বলে একটা পত্রিকা বেরোত  সত্যজিৎ রায় আর কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়-এর সম্পাদনায়। সেদিনই বেরিয়েছে কাগজটা। বিকাশ রায় সেই কাগজটা দেখছিলেন আর নানা রকম টিপ্পনী কাটছিলেন। আমি কিছু বলছিলুম না, চুপ করেই ছিলুম। কেন না, আমাকে তো আর কিছু বলছেন না। তবে ওতে আমার একটা লেখা ছিল। খানিক পরে বিকাশদা মন্তব্য করলেন, ‘একটা ছবিতে অভিনয় করলেই বুঝি আজকাল কাগজে লেখা বের হয়’! তখন আমি আর চুপ করে থাকতে পারলুম না। বললুম, ‘না তা হয় না। তবে, আশৈশব অভিনয় করলে আর আশৈশব লেখার চর্চা করলে হয়। যেটা আমি করেছি’। এইরকম ভাবে খানিকটা ঝগড়ার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের ভাবটা। তারপর বিকাশদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূচনা হল। একটা পারিবারিক হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠল। প্রায়ই তাঁর বাড়িতে যেতাম। বিকাশদাও আসতেন আমার বাড়িতে।  বৌদির সঙ্গেও খুব ভাল সম্পর্ক ছিল।

নানারকম ঘটনা ঘটেছে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। একসময় একটা বিরাট আন্দোলন হল সেখানে। অভিনেতৃ সঙ্ঘ ভেঙ্গে শিল্পীরা দুটো  আলাদা শিবিরে ভাগ হয়ে গেছেন। একসময় অভিনেতৃ সঙ্ঘ গড়ে তোলার মূল আর্কিটেক্ট ছিলেন বিকাশদা, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আর ছবি বিশ্বাস। পরবর্তীতে যখন অভিনেতৃ সংঘ যে নীতিতে চলছিল সেটা মেনে নিতে পারলেন না, তখন বিকাশদা ও আরো অনেকে বেরিয়ে গেলেন। তৈরি হল শিল্পী সংসদ। সেখানেও মূল কাণ্ডারী বিকাশদাই। আমি আর বিকাশদা দুটো আলাদা শিবিরে ছিলাম অনেকদিন। কিন্তু তাতে করেও আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কে কোনরকম ছেদ পড়েনি। আসলে ছোট্ট ইন্ডাস্ট্রি তো, তখন সকলের সঙ্গে সকলের পারিবারিক সম্পর্ক হত।

বিকাশদার সঙ্গে একসঙ্গে অভিনয় করেছি। বিকাশ রায়ের সঙ্গে আমার একটি উল্লেখযোগ্য ছবি প্রবোধ কুমার সান্যালের কাহিনি অবলম্বনে 'কাঁচ কাটা হীরে'। এ ছবির আর দুই স্তম্ভ ছিলেন চিত্রনাট্যকার মৃণাল সেন ও পরিচালক অজয় কর। শিল্পপতি বাবার চরিত্রে বিকাশদা আর সদ্য বিদেশ থেকে ফেরা ছেলে আমি। ছেলেকে বাবা নিজের মত নিয়ন্ত্রণ করতে চায় কিন্তু বাবা আর ছেলের মূল্যবোধের অনেক তফাৎ। তাই সংঘাত অনিবার্য। নানা শেডস ছিল  বাবার চরিত্রে। অসামান্য অভিনয় করেছিলেন বিকাশদা। এই ছবির আউটডোরে শ্যুটিংয়ে গিয়ে চমৎকার সময় কেটেছিল বিকাশদার সঙ্গে।

 যতদিন যাচ্ছিল ওঁর অভিনয় আরো ধারালো আর পরিণত হচ্ছিল। ‘পরিণীতা’ ছবিতে বয়স্ক মানুষের ভূমিকায় কি দারুণ অভিনয়। ‘আরোগ্য নিকেতন’-এ কি অপূর্ব অভিনয়।  সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তিনি কোনও ছবি করেননি। কেন হয়নি জানি না, নিশ্চয়ই ভাল কিছু দেখার সুযোগ হতে পারত। আমি নিজে ফিল্মে আসার বহুদিন আগে থেকেই ওঁর ছবি দেখেছি। সেই ‘বিয়াল্লিশ’ দিয়ে শুরু। তখন পর পর অনেক গুলো ছবিতে দুষ্ট লোকের চরিত্র এত ভাল অভিনয় করেন যে ওইসব চরিত্রে প্রায় স্ট্যাম্পড হয়ে গিয়েছিলেন। পর্দায় ওঁকে দেখলেই লোকের একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়ে যেত যে এ-ই ছবির ভিলেন। কিন্তু তাঁর প্রতিভা শুধু ভিলেন চরিত্রে অভিনয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। চলচ্চিত্রে আসার বহু আগে থেকেই তিনি রেডিওতে অভিনয় করছেন। তাঁর কন্ঠস্বর খুব ভাল ছিল। স্পষ্ট, সুন্দর উচ্চারণ। বেশ কিছুদিন তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে চাকরি করেছেন। ওই একই জায়গায় আমিও চাকরি করেছি। প্রায় সাড়ে তিনশো চারশো লোকের ইন্টারভিউ হল। একটি মাত্র ভ্যাকেন্সি। যে তালিকা বেরোল তাতে প্রথম নাম অনিল চট্টোপাধ্যায়-এর আর দ্বিতীয় নাম ছিল আমার। অনিল চাকরিটা নেয়নি বলে আমি পেলুম। বছর দেড়েক চাকরি করেছিলুম অল ইন্ডিয়া রেডিওতে। এও এক মিল আমার তাঁর সঙ্গে।

একসঙ্গে ছবি করলেও বিকাশদার সঙ্গে আমার সবচেয়ে রিমার্কেবল কাজ কিন্তু ফিল্মে নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’-র শ্রুতি অভিনয় হবে। ওঁরই আইডিয়া আর ডিরেকশন। বিকাশদা আমাকে বললেন- 'শেষের কবিতার শ্রুতিনাট্য রূপ করব। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। করতে পারি একটাই শর্তে - যদি তুই অমিত চরিত্রটা করিস'। আমি বললুম, করব। আমার কাছেও বেশ অন্যরকম চ্যালেঞ্জ। করতে গিয়ে দেখলাম অসম্ভব ভাল এডিট করেছেন বিকাশদা। আর খুব সুন্দর একটা ব্যাখ্যা তৈরি করেছেন।  সেটা আমাকে সত্যি খুব ইন্সপায়ার করেছিল। খুব ভাল লেগেছিল কাজটা করতে। তখন ওঁর বয়েস হয়েছে। একটানা রিহার্সাল দিতে কখনো কখনো ক্লান্ত বোধ করতেন। তখন আমাকে বলতেন, ওদের তুই একটু দেখিয়ে দে। আমাকে তখন সেটা করতে হত। একদিক থেকে দেখতে গেলে এই শ্রুতি অভিনয়টা একটা অসামান্য কাজ। সকলে মিলে এভাবে নাট্যপাঠ আগে হয়নি। একক ব্যক্তির নাট্যপাঠ হয়েছে আগে। শম্ভু মিত্র নাট্যপাঠ করেছেন; তারও আগে শিশির ভাদুড়ি করেছেন। কিছু মানুষের সামনে হয়তো তাঁরা প্রাইভেটলি পড়ে শুনিয়েছেন। কিন্তু সমবেত ভাবে মঞ্চে নাট্যপাঠ প্রথম তাঁর পরিকল্পনা আর পরিচালনাতেই হল। কিন্তু সাধারণ মানুষের এন্টারটেইনমেন্ট এর সমস্ত শর্ত মেনে, টিকিট বিক্রি করে, সমবেত ভাবে শ্রুতিনাটক হিসেবে নাট্য পাঠকে মঞ্চে উপস্থাপন করা- এটা বিকাশদারই কৃতিত্ব। সমস্ত ভাবনাটা বিকাশদারই। আমি সাধ্যমত পাশে ছিলাম। প্রস্তুতি চলছে, হঠাৎ বিকাশদা বললেন সংস্থার তো একটা নাম চাই, যে সংস্থার নামে উপস্থাপনা করা হবে। আমাকে বললেন নাম দিতে। নাম দিয়েছিলাম "কথক", যারা কথা বলে। বিকাশদা খুব খুশি হয়েছিলেন। পরে এইচ এম ভি থেকে রেকর্ড করা হয়েছিল। 

আরও অনেক আগে, তখনও আমি স্কুল ছেড়ে কলেজে আসিনি - সেই সময় রেডিওতে শেষের কবিতা হয়েছিল আর তাতে বিকাশদা অংশ নিয়েছিলেন। বিকাশদার অনেক রেডিও নাটক শুনেছি সেইসময়। তখন তো বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে শুধু রেডিওই ছিল। তাই রেডিও শোনার, রেডিওতে নাটক শোনার খুব চল ছিল বাড়িতে। পরে যখন শেষের কবিতা রেডিওতে হল, তখন অমিত করেছিলেন জয়ন্ত চৌধুরী। যতদূর মনে পড়ে দুবারই লাবণ্য করেছিলেন নীলিমা সান্যাল। 

বিকাশদা সুলেখক ছিলেন। কিছু বই লিখছেন। মূলত স্মৃতিকথা। সে সবই পড়েছি। বেশ কিছু ছবি ডিরেক্ট করেছেন বিকাশদা। কিন্তু যখন উনি ছবি করেছেন, আমার দুর্ভাগ্য সেসব ছবিতে আমার কাজ করার সুযোগ হয়নি। তাঁর বেশিরভাগ ছবিতেই কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকতেন উত্তমদা। একটি ছবি খুব নাম করেছিল - মরুতীর্থ হিংলাজ। সেখানেও উত্তমদারই এক মূল চরিত্র। 

আজকালকার দিনে তাঁর এমন কমপ্লিট আর কমপ্রিহেনসিভ ট্যালেন্ট নিয়ে খুব কমজনই কাজ করছেন, যিনি লিখতে পারেন, অভিনয় করতে পারেন, পরিচালনা করতে পারেন, এমনকি প্রযোজনাও করেন।  আমাদের দুর্ভাগ্য যে তাঁর মত এমন মাল্টি-ট্যালেন্টেড মানুষের কথা এখনকার প্রজন্ম সেভাবে জানতে পারেনি। মূল্যায়ন হতে গেলে যা দরকার তা হয়নি সেভাবে। আসলে মূল্যায়ন হতে গেলে লিখিত সমালোচনার ধারায় একজন শিল্পীর কথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে তার চল খুব কম, নেই বললেই চলে। তাঁর ছবিও সেভাবে বেশি দেখানো হয় না। সব ছবি পাওয়া যায় কিনা তাই সন্দেহ! আসলে ছবি প্রিজারভেশনের ব্যাপারটা আমাদের এখানে এত খারাপ, ভাবা যায় না। বেশিরভাগ ছবিই নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীকালে সে ছবি শুধু নয় - তার নেগেটিভ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। এর ফলে নতুন যাঁরা অভিনয়ে আসছেন বা নতুন দর্শক - সকলেই বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁর শতবর্ষের কথাও চর্চিত নয়। এখন তাঁর কাজ সম্পর্কে মূল্যায়নের চেষ্টা হলে পরের প্রজন্ম উপকৃত হবে।

অনুলিখন - কেয়া মুখোপাধ্যায়


লেখক পরিচিতি - ছায়াছবি ও নাট্যজগতের খ্যতনামা আভিনেতা। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চোদ্দটি ছবির উনি নায়ক। অভিনয়ের জন্যে পদ্মভূষণ ও ছায়াছবি বিভাগে কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান 'দাদা সাহেব ফালকে' পুরস্কারে ভূষিত এই অভিনেতা কবি হিসেবেও প্রথিতযশা। নাট্যজগতে ওঁর অবদানের জন্যে পুরস্কৃত হয়েছেন সঙ্গীত নাটক আকাদেমি থেকে।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।