প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

জন্মশতবর্ষে বিকাশ রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫

 

বিকাশ রায় আমার অনুভূতিতে

বিমোচন ভট্টাচার্য


আমার জন্ম এক নাট্যকারের পরিবারে যিনি আবার সিনেমার গল্প লিখতেন, ছবি পরিচালনা করতেন। এইরকম একটি পরিবারে জন্ম বলে একেবারে শিশুকাল থেকেই বাড়িতে থিয়েটার সিনেমার লোকজন দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। সেই রকমই একজন অভিনেতা বিকাশ রায়। তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভাবছি কি ভাবে শুরু করি লেখাটা। লেখাটিকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করি আমি বরং। আমার লিখতেও সুবিধে হবে না হলে এলোমেলো হয়ে যেতে পারে এই স্মৃতিনির্ভর লেখা। তাই শুরু করি আমার বিকাশ-তর্পণ অভিনেতা বিকাশ রায়কে দিয়ে।।

আমি একেবারে শিশুকালে মনে হয় যে অভিনেতার নাম প্রথম শুনি তিনি বিকাশ রায়। আমার বাবা সেই উনিশ শো পঞ্চাশ সালে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন। "অন্ধ দেবতা" ছিল সেই ছবির নাম। নায়ক বিকাশ রায়। দুজন নায়িকা ছিলেন, প্রণতি ঘোষ আর সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। আমার ঠিক দু বছরের বড় দাদা করেছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে। কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপও ছিল আমার বাবার। ফলে বিকাশ রায় আমার জ্ঞানতঃ সিনেমার প্রথম নায়ক যদিও আর একবার বলি আমি তখন দুগ্ধপোষ্য শিশু। কিন্তু বড় হয়েছি সেই সিনেমার কথা শুনতে শুনতে। একটু হিংসেও করতাম দাদাকে। শেষ পর্যন্ত সেই ছবি মুক্তি পায় নি। কারণ আমার জানা নেই। একেবারে সেই সময়ের কোন সিনেমার কথা আমার মনে নেই। প্রথম ছবি দেখি "ভুলি নাই"। কেমন অভিনয় করেছিলেন বিকাশ রায়? অনেকেই জানেন। আমার অনুভূতি ছিল বড় হয়ে যে কাজটা প্রথম করবো সেটি হল, বিকাশ রায়কে খুন। ভেবে দেখুন কি অভিনয় করেছিলেন বিকাশ রায়, যাতে এক দশ বছরের বালক তাঁকে খুন করার কথা ভেবেছিল!

এরপর ওই সিনেমা থিয়েটারের বাড়ির ছেলে বলেই সিনেমা দেখার ওপর কোন বাধা নিষেধ ছিল না আমাদের। অধিকাংশ ছবি, ছোট ছেলে হবার সুবাদে বাবা মার সংগেই দেখতে যেতাম আমি নাইট শো তে। বিকাশ রায় এর অভিনীত ছবি দেখার শুরু আমার সেই ভাবেই। তালিকা দিয়ে লেখা দীর্ঘ করবো না। আমি শুধু আমার মনে যে ছবিগুলি চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে সেগুলির কথা লিখি।

প্রথমেই বলি জীবনকাহিনীর কথা। রাজেন তরফদারের পরিচালনায় এই ছবিতে বিকাশ রায়, আমার মতে তাঁর জীবনের সেরা অভিনয় করেছিলেন। পাঠক, যদি না দেখে থাকেন সেই ছবি, জোগাড় করে এক্ষুনি দেখে ফেলুন সেই ছবি। সংক্ষেপে গল্পটা - বিকাশ রায় এক গরিব ইন্সুরেন্স এজেন্ট। অনুপকুমার হাওড়া ব্রীজ থেকে আত্মহত্যা করতে চান। বিকাশ রায় বললেন আত্মহত্যাই যখন করবে তখন আমি একটা পলিসি করে দিচ্ছি তারপর মরো। আমি নমিনি। বিকাশ রায়ের পয়সায় অনুপকুমারের পলিসি হল। অনুপকুমার বিকাশ রায়ের বাড়ি থাকতে শুরু করলেন। আজ এই খেতে চান, কাল ওই। সন্ধ্যা রায় বিকাশবাবুর মেয়ে। এক একবার অনুপকুমার আত্মহত্যা করতে যান কিন্তু শেষে আর করেন না। শেষমেশ মধুর সমাপ্তি। বিকাশ রায় অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন ছবিটিতে। নিজের ইমেজ, ভিলেন এবং নায়কের দূরে সরিয়ে এক বৃদ্ধের ভূমিকায় সিরিও কমিক অভিনয় করে মুগ্ধ করেছিলেন আপামর বাঙালীকে। এরপর এক এক করে আমার পছন্দের ছবিগুলির নাম করি - মরুতীর্থ হিংলাজে অবধূতের ভূমিকায়, অদ্ভুত এক নিরাসক্ত ভাব নিয়ে অবধূতের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিকাশ রায়। আরোগ্য নিকেতনে "জীবনমশাই"। অপূর্ব মুনশীয়ানায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন তারাশংকরের জীবনমশাইকে বিকাশ রায়। উত্তরফাল্গুনী, রাজাসাজা, মায়ামৃগ, কেরী সাহেবের মুনশী, এমন অগুনতি ছবি করেছেন বিকাশ রায়। সেই বিভিন্ন ছবিতে আলাদা আলাদা চরিত্র করেছেন। আমাদের মুগ্ধ করেছেন।

বিকাশ রায়কে কিন্তু ছবিতে গান করতে খুব কম দেখেছি আমরা। উনি যে সমস্ত চরিত্র করতেন তাদের মুখে গান খুব একটা থাকতো না। একটি ছবির কথা মনে আছে আমার। অদ্বিতীয়া। আমি তখন কলেজে পড়ি।একটি মাতালের চরিত্র করেছিলেন বিকাশ রায়। গানটি ছিল "এই মাল নিয়ে চিরকাল যত গোলমাল "। এই গানটির কথা এখনো আমার মনে আছে। -

"আত্মপর ভেদ রাখিনি মা সবই নিজের মনে করি
কামিনীকাঞ্চনে লোভ নেই মা তবে, অসময়ে সামলে মরি
আমার মত হাফগেরস্থ পরের বোঝাই বয়ে মরে চিরকাল।
এই মাল নিয়ে চিরকাল যত গোলমাল।।"

একদিন বাড়িতে এই গানটি গাইছি, এই লাইন গুলো, বাবা ধমক দিলেন। মায়ের কাছে ধমক খেয়েছি। মারও খেয়েছি মাঝে মাঝে কিন্তু বাবা? না, নৈব নৈব চ। মা বললেন ওই "হাফগেরস্থ" নাকি শ্লীল শব্দ নয়। বাবাকে মা বললেন এটা একটি ছবির গান, বিকাশবাবু লিপ দিয়েছেন। বাবা বিকাশ রায়কে ফোনে ধরলেন, বললেন- কি এক গানে তুই লিপ দিয়েছিস, ছোট ছেলেটা গাইছিল, মাল নিয়ে গোলমাল, হাফ গেরস্থ... কিছুক্ষণ কথা বলে হাসিমুখে ছেড়ে দিলেন ফোন। আমাদের বললেন- বিকাশ বলছে, পরের লাইনটা শুনেছো? আমার মত হাফগেরস্থ পরের বোঝাই বয়ে মরে চিরকাল। তোমার আমার কথা নয়?

বাংলা পেশাদারী থিয়েটারের যখন স্বর্ণযুগ বিকাশ রায় তখন থিয়েটারে অভিনয় করতেন না। কারণটা আমার জানা নেই। আমরা বিশ্বরূপা থিয়েটারের ভেতর একটা বাড়িতে থাকতাম। বাবার লেখা ক্ষুধা, সেতু, লগ্ন তখন ওখানে রমরমিয়ে চলছে। কিন্তু ছেষট্টিতে এক অবাঞ্ছিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের সেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়। তার পর আর কোনদিন ওই থিয়েটারে ঢুকিনি আমরা কিন্তু ওখানকার জন্যে মনখারাপ করতো আমাদের। কিছু মানুষজনেরও মন খারাপ করতো আমাদের জন্যে মনে হয় তাই লাইটম্যান নারায়ণদা, শিফটার বিনোদকাকা, দরোয়ান সিপাই সিং, আসতেন ওই থিয়েটার থেকে তাদের বিধায়কদার সাথে দেখা করতে। ওখানে থাকার সময় যে কোন প্রয়োজনে বিধায়কদা আর বৌদি ছিলেন তাদের আশ্রয়স্থল। বলতেন বিকাশ রায় করছেন "স্যাটা বোস" চৌরঙ্গী নাটকে। ওঁরা বলতেন ওই একজনই আছেন এখন যিনি আপনাদের কথা মনে করিয়ে দেন। বংশীকাকার মেয়ের বিয়েতে পুরো বিয়ের খরচ তুলে দিয়েছিলেন বিকাশ রায়। ওঁদের কাছেই শোনা। যেহেতু বিশ্বরূপায় আর যাই নি আমি তাই চৌরঙ্গী বা আসামী হাজির নাটকে ওঁর অভিনয় দেখা হয় নি আমার কিন্তু নহবৎ নাটকে বিকাশ রায় এর অভিনয় দেখেছি আমি। "মুর্গীহাটার জমিদার" এর চরিত্রে। কি সাবলীল ছিল সেই অভিনয়।

আমার বাবা প্রয়াত হন উনিশশো ছিয়াশি সালে। আমরা কাউকে জানাই নি কিন্তু খবরের কাগজ বা টেলিভিশনে সেই মৃত্যুসংবাদ পৌঁছে যায় বিকাশ রায়ের কাছে! উনি ফোন করলেন আমাদের বাড়িতে। আমিই ধরেছিলাম সেই ফোন। সেটা ছিল নভেম্বর মাস। আমি কে বলছি জেনে নিয়ে বললেন- শোনো বাবা। খবরটি শুনে ইস্তক মন ভাল নেই। প্রায় চল্লিশ বছর তোমার বাবাকে চিনতাম আমি। তোমাদের বাড়ি যাওয়া উচিৎ ছিল আমার নিজেরই কিন্তু শরীরটা একদম ভাল নেই আমার। একদম ভাল নেই। সাবধানে থেকো। সেই ম্যাজিকাল কন্ঠস্বর। ফোনের এ পারে আমি মন্ত্রমুগ্ধ। আপনি জানতেও পারলেন না স্যার, এক সদ্য পিতৃহারা যুবক তখন ভাবছে তার পিঠে হাত রেখে তার নিজের কাকা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এত, এত আন্তরিক ছিল সেই কথাগুলি। সত্যিই ভাল ছিলেন না বিকাশ রায়। বাবা চলে গিয়েছিলেন উনিশশো ছিয়াশী সালের ষোলোই নভেম্বর। মাত্র পাঁচ মাস বাদে ষোলোই এপ্রিল উনিশশো সাতাশীতে বিকাশ রায়ও পাড়ি দিলেন অন্যলোকে। আরো অনেকের সাথে তার "বিধায়ক"দার সংগেও হয়তো দেখা হয়েছিল তাঁর সেদিন।

লেখা শেষ করি এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। বিকাশ রায় কে অনেকবার দেখেছি আমি আমাদের বাড়িতে। প্রত্যেকবারই তার পরনে ধুতি- পাঞ্জাবী দেখেছি আমি। খুব সুন্দরভাবে নিজেকে "ক্যারি" করতেন তিনি। এই ঘটনার সময় আমার বয়েস দশ কি এগারো। দুর্গাপুজোর তৃতীয়া বা চতুর্থী ছিল সেদিন। আমাদের নতুন জামাকাপড় কেনা হয় নি সেবার। মার মুখ গম্ভীর। বাবাও চিন্তায়। ছোট ছেলে আমি বাবা মার সঙ্গে রাত্রে শুতাম। শুনতাম বাবার অসহায়তার কথা। এত বড় সংসার, দুবেলা দুমুঠো অন্ন সকলের মুখে তুলে দেবার সামর্থ্য নেই। সকালবেলা বিকাশ রায় এলেন বিশ্বরূপার বাড়িতে। "রাজাসাজা"র চিত্রনাট্য, সংলাপ লেখার জন্যে অ্যাডভান্স করলেন বাবাকে। যাবার সময় বললেন - যাও, এবার ছেলেমেয়েগুলোকে পুজোর জামা কাপড় কিনে দাও। তবে দেখো বাবা, লেখাটা কিন্তু দশদিনের মধ্যে দিও। তুমি যা কুঁড়ে। মাকে বললেন - পেন্নাম হই বউদি। একটু তাড়া দেবেন এই বড়বাবুকে, তারপর বাবাকে বললেন- ভাগ্য করে এমন অন্নপূর্ণার মত বউ পেয়েছিলে বিধায়কদা। তরে গেলে এজন্মে। সেই টাকা দিয়ে বাবা আমাকে একটা টেরিলিনের সাদা ডোরাকাটা শার্ট আর একটা খয়েরী রঙের কর্ডের হাফপ্যান্ট কিনে দিয়েছিলেন। মনে আছে রাত্তিরে মাথার কাছে নিয়ে শুয়েছিলাম আমি সেই জামাপ্যান্ট। খুব, খুব পছন্দের ছিল সেই জামাপ্যান্ট আমার।

কত, কতদিন, মাস, বছর কেটে গেছে তারপর। মা চলে গেছেন প্রথমে, তারপর বাবা, মেজদি, দাদা। তবু সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মন ভারী হয়। চশমার কাঁচ ঝাপসা। সেদিন আপনি আমার বাবাকে ভিক্ষা দেন নি। দিয়েছিলেন তাঁর পারিশ্রমিক। কিন্তু একটা বিষণ্ণ পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আপনি। আট সন্তানের মা বাবার এক দুঃস্বপ্নের পুজো, খুশীর পুজোয় পরিণত হয়েছিল সেই টাকায়। সেদিনের সেই দশ/ এগারো বছরের কিশোর আজ ষাটোর্ধ বৃদ্ধ। তবু আজ আপনাকে নিয়ে লিখতে বসে সে বারবার ফিরে যাচ্ছে তার শৈশবে। যেখানে তার মা আছেন, বাবা আছেন, আছে তার মেজদি, দাদা। আর আছেন আপনি। আপনারা কেউই আর বাস্তবে নেই পৃথিবীতে। দেখতে পাচ্ছি সেই কিশোর পরম মমতায় ভাঁজ করে রাখছে তার সেই সাদা ডোরাকাটা টেরিলিনের শার্ট আর খয়েরী কর্ডের প্যান্ট। গন্ধ শুঁকছে সেই নতুন জামাকাপড়ের। আমার প্রণাম নিন বিকাশকাকা। রক্তের সম্পর্ক ছিলো না আপনার সংগে আমার কিন্তু আমি তো আপনার "বিধায়ক"দার সন্তান।

সম্পর্কে, যে যাই বলুক, আপনি তো ছিলেন আমার কাকাই। কি বলেন?


লেখক পরিচিতিঃ নাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচার্যের ছোট ছেলে। লেখালিখি সিরিয়াসলি শুরু করেছেন একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের চাকরী থেকে ২০১০ সালের অবসর নেয়ার পর। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে। কবিতা ছাপা হয়েছে দেশ এবং শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায়।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।