প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

জন্মশতবর্ষে বিকাশ রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫

 

বাংলা সিনেমার একটি অভিজাত চরিত্র

সুগত মারজিৎ


আজ যাঁর সম্পর্কে লিখতে বসেছি, তাঁর অভিনয়ক্ষমতার মূল্যায়ন আমার পক্ষে ধৃষ্টতা কারণ আমি কোনো অর্থেই চলচ্চিত্র বিশারদ নই। তাছাড়া তাঁকে সবাই খ্যাতনামা অভিনেতা বলে সম্মান করে, বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের তিনি এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা। লক্ষ লক্ষ বাঙালির মতো আমিও আশৈশব গোগ্রাসে তাঁর অভিনয় দেখে আপ্লুত হয়েছি, কিন্তু আর একবার একজন সাধারণ গুণগ্রাহীর মত তাঁর প্রশংসায় ভরা আরো একটা লেখা লিখতে বসিনি। মাননীয় বিকাশ রায়কে আমি একটু অন্যভাবে, একটু অন্যকারণে শ্রদ্ধা করি। সেই দৃষ্টিভঙ্গীকে দশজনের কাছে খোলসা করে বলার জন্যই এই লেখা। বলা বাহুল্য সুমিত রায় মহাশয়ের উৎসাহ ছাড়া এই কাজটি করতে আমি শঙ্কিত হতাম। আমার কথা বলতে তিনি আমাকে উজ্জীবিত করেছেন।

সাদা-কালো বাংলা ছবি দেখে জীবন শুরু আমার সেই ষাটের দশকে। আমার মা আমাকে সিনেমা দেখতে নিযে যেতেন -- সব ধরণের সিনেমা। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়ের বিপুল জনপ্রিয় বাংলা ছবিতে বিকাশ রায়কে প্রায়ই দেখা যেত। গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র এবং কিছু সময় নায়ক এবং খল চরিত্রে চরিত্রায়ণ -- এই ভাবেই তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ। ছোট বেলা থেকেই তাঁকে আমি উপেক্ষা করতে পারতাম না। সেইবয়সে সিনেমায় কেন একজনকে ভাল লাগে তার বিশ্লেষণ করা দুষ্কর। যত বড় হয়েছি, তাঁকে বারে বারে পর্দায় দেখে আনন্দ পেয়েছি। সিনেমার চরিত্র আর তিনি -- দুটো কখনই আলাদা বলে মনে হয়নি, সবসময় মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকত বলেই আমার মত নিতান্ত সাধারণ চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে বিকাশ রায় ছিলেন মনে রাখার মত অভিনেতা। কিন্তু চেতনা যত উজ্জ্বল হয়েছে, জগতটা যত দেখেছি, বিদেশের বহু ছবি যত দেখেছি, নিজের বুদ্ধিবেচা সত্ত্বার সঙ্গে যত পরিচয় হয়েছে ততই বিকাশ রাযকে অন্যরকম ভাবে ভালো লেগেছে। আজ উত্তরফাল্গুনী বা বাঘিনী দেখতে বসে তাঁকে আমি অন্যরকম ভাবে দেখতে পাই, আরো অন্যরকম, আরো গভীর ভাবে শ্রদ্ধা করতে পারি।

সিনেমায় এবং জীবনে আমি কিছু "অভিজাত" মানুষকে দেখেছি, গল্প-উপন্যাস পড়তে গিয়েও অনেক "অভিজাত" লেখক-লেখিকার সঙ্গে আলাপ হয়েছে, আবার একেবারে কলকাতার সাবেকি মধ্যবিত্ত পাড়াতেও দু-একজন "অভিজাত" মানুষ চোখে পড়েছে। এই আভিজাত্য ঠিক বাপ-ঠাকুর্দার জমিদারিজাত কিম্বা নবাব-বাদশার নীল রক্ত দিয়ে তৈরী নয়। এ এক অদ্ভুত আভিজাত্য -- এক নিরঙ্কুশ বাঙালি আভিজাত্য।

সিনেমার পর্দায় তেমন কোন অভিনেতা এলে, চলাফেরা করলে, কথা বললে, ঘাড় ঘোরালে, জ্বলন্ত কিম্বা অশ্রুসিক্ত চাউনি দিলে, ওজস্বী কণ্ঠে শুদ্ধ বাংলা এবং ইংরেজী উচ্চারণ করলে, ছবির পর্দায় এক ধরণের আভিজাত্য ফুটে ওঠে। আমরা যত বুড়ো হই, নিজেদের মত করে প্রাজ্ঞ হই আমরা বুঝতে পারি ঠিক যতটুকু বললে বা যতটুকু উচ্ছল এবং দুঃখিত হলে কিম্বা যতটুকু রাগ দেখালে যথার্থ হতো তা আমরা করে উঠতে পারিনি। অর্থাৎ অতীতের অনেক কিছু পারলে শুধরে নিতাম।

মানুষ সচেতনে বা অচেতনে সবসময় একটা ভারসাম্য খোঁজে। খুব ক্ষমতাশালী মানুষের প্রতি পদক্ষেপ ভারসাম্যে ভরা। আমাদের মত মানুষেরা ওই ভারসাম্য কোনভাবে কায়দা  না করতে পারলে অখুশি হয়। চাই কিন্তু সবসময় পারিনা। যতটুকু উচ্ছ্বাস হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশী উচ্ছ্বাস, যতোটা রাগ করা উচিত ছিল না তার চেয়ে বেশী রাগ করে ফেলি, ইংরেজী উচ্চারণে সাহেবি কৃষ্টি মেশাতে গিযে বেশী বা কম হয়ে যায়। আদ্যন্ত বাঙালি ভদ্রলোক হবার চেষ্টা করলে খানিকটা মুর্শিদাবাদের ফেকু মিঞা আর খানিকটা ন্যু ইয়র্কের হোসে গন্‌জালেসের কনভেক্স কম্বিনেশন হয়ে যায়। কোথাও যেন একটা চেষ্টার ত্রুটি থেকে যায়। অবশ্য অচেতন মানুষজনের এসবের বালাই নেই, নিজেদের মোটা দাগের জগতে আনন্দে মশগুল তাঁরা। যত চেতনা তত বেদনার লজিক সেখানে কাজ করে না।

যাক, যা বলছিলাম। ভারসাম্য কি চাট্টিখানি কথা। সিনেমা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে যাঁদের দেখে ঐ ভারসাম্যের কথা বারে বারে মনে পড়ে যায়, -- যাঁদের দেখে মনে হয় ঠিক এমনটাই হয় ব্যারিস্টার, পুলিশ ইন্‌স্‌প্ক্‌টর এবং বদমাইশ মানুষ -- তাঁরা ওই ভারসাম্যটি অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছেন কিম্বা নিয়ে জন্মেছেন, তাই তাঁরা অভিজাত।

বিকাশ রায়ের মত একজন অভিনেতাকে সিনেমায় দেখলে প্রথমেই যেটা মনে হয় সেটা হল আমাদের মত দু-দশটা ডিগ্রিধারী হোমরা-চোমরা মানুষদের চেয়েও এঁরা এক অর্থে বেশী শিক্ষিত, বেশী ঝকঝকে, বেশী স্মার্ট। আমি নিশ্চিত যে তিনি যদি কখনও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভূমিকায় অভিনয় করতেন আর আমি সেই ছবি দেখতাম, আমি নির্ঘাৎ পরের দিন থেকে আমার আদবকায়দা পাল্টে নিতাম। সেই অর্থেই তাঁর মত মানুষেরা চটজলদি ভারসাম্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পারতেন। সব চরিত্রেই একটা আভিজাত্য থাকে। সেই চরিত্রায়ণে ভারসাম্যের অভিব্যক্তি, আর যাঁদের দেখে মনে হয় তাঁরা জন্মসূত্রে এর সন্ধান পেয়েছেন, তাঁরাই অভিজাত।

"এলিট" কথাটা বাঙালিরা সাধারণত গালাগালি হিসেবে চিহ্নিত করে, যেমনভাবে "ভদ্রলোক" কথাটিকে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা চিহ্নিত করে। তা করুন ক্ষতি নেই, কিন্তু "এলিটদের" ঠেকায় কে? সারাক্ষণ সিনেমায় "নন্‌-এলিট" বা এলিট নন, এঁদের দেখে গেলেই যে নান্দনিক চেতনা পাশবালিশ নিয়ে আরাম করবে এমনটা তো নয়। বিকাশ রায়ের মত মানুষেরা ছিলেন বলে চরিত্রায়ণে এলিটিজম টিঁকে ছিল। মাননীয় বিকাশ রায় সেই এলিট যুগের এক এলিট অভিনেতা।

বাঙালি খানিকটা আবেগপ্রিয়, কাঁদতে ভালোবাসে, কাঁদার অভিনয় করতে হলে বেশী কাঁদে, বেশী রাগ দেখায়, বেশী রোমাণ্টিক হয়ে পড়ে। নন্‌-এলিট অভিনেতারা নিজেদের বাহ্যিক চেহারাটাকে অভিনয়ের উপযুক্ত করার জন্য হয় না খেয়ে কিম্বা বেশী খেয়ে, হয় দাড়ি কেটে বা না কেটে মহাপুরুষের পর্যায়ে পৌঁছনর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁরা হয়তো জানেন না যে অভিনয়টা অনেক সময়েই -- অবশ্য সব ক্ষেত্রে নয় -- একটা চিন্তা, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের ব্যাপার, যেমন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশন। কালোয়াতিকে নান্দনিক চেতনা নিয়ন্ত্রণ করবে এটাই স্বাভাবিক, যেমন ক্রিকেট ব্যাটের উল্টোদিক দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে হয়ত আপনি আজ কোটি টাকার মালিক হতে পারেন, কিন্তু যে মানুষটা ব্যাটকে তুলির মত ব্যবহার করে, তার ধারে কাছে আপনি পৌঁছতে পারবেন না। "এলিটিজম"ই শেষ কথা, তার জন্য গ্যাঁটের আয়তন আবশ্যিক শর্ত নয়, সেটা বামপন্থীরা গুলিয়ে ফেলেন।

আমি অপণ্ডিত এক মানুষ, একটি-দুটি বিষয় ছাড়া আর আমি কিছুই জানিনা, আর যা জানিনা তার মধ্যে চলচ্চিত্রের খুঁটিনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। আমি একজন বাঙালি, বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বেঁচে থাকা এক পশ্চিমবঙ্গবাসী। আমার কাছে উত্তমকুমার, ছবি বিশ্বাস, বিকাশ রায়, জ্ঞান গোঁসাই, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি কিছু মানুষ স্ব স্ব ক্ষেত্রে "এলিটিজম"কে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই সেরকম কিছু মানুষ ছিলেন এবং আছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে সংখ্যায় নগণ্য। এঁরা কেউই মোটা দাগের মানুষ নন। তাই আমরা বসে থাকি বিকাশ রায়ের জন্য, যদি বাংলার চলচ্চিত্রের তেমন সুদিন কোনদিন আসে, সেই দিনটার অপেক্ষায়।


লেখক পরিচিতিঃ যশস্বী অর্থনীতিবিদ। কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ফর সোশ্যাল সায়ন্সের শিল্প অর্থনীতির 'রিসার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া' অধ্যাপক। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তবর্তীকালীন উপাচার্য। গবেষণাসংক্রান্ত রচনা ছাড়াও বাংলা পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেনতার সঙ্কলনও কয়েকটি বই হয়ে ছাপা হয়েছে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসাবেও খ্যাতি আছে।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।