অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

এপ্রিল ১৪, ২০১৮

 

বিন্দুতে সিন্ধুসম হর্ষ-বিষাদ উপাখ্যান

অনীশ মুখোপাধ্যায়


(১)

অ্যাডিলেড ওভালে সেদিন শেষ বিকেলে কি সিগালেরা খেলতে এসেছিল?

আজ আর মনে নেই।তবে যদি তারা এসেও থাকে তাহলেও এক অনির্বচনীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে হয়ত এসে থাকবে।

ক্রিকেটের ইতিহাসে টেস্ট ম্যাচ তো সংখ্যায় নেহাত কম হয়নি।অত্যাধিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এমন ম্যাচের সংখ্যাও প্রচুর।তবু অ্যাডিলেডে সেদিন যা ঘটেছিল তা হয়ত একশো বছরে একবার দেখা যায়।অথবা যায় না।খেলার শেষে একটা ফলের মাধ্যমেই নিশ্চিতভাবে জয়ী-বিজিত নির্ধারিত হয়।কিন্তু জয়-পরাজয়ের বাইরেও তো কিছু থাকে।একটা টেস্ট ম্যাচকে ঘিরে কত রং,রূপ,উত্তেজনা, হা-হুতাশ,উল্লাস,ক্ষণিক আনন্দ বা দুঃখ,কারুর ভাগ্যাকাশে এই মেঘ তো পরক্ষণেই আবার ঝলমলে রোদ এবং এমন আরো কত কী নিয়ে একটা ছবির কোলাজ সৃষ্টি হয়। সেই ছবিতে এত রকমের আলোছায়ার শেড মিশে ছবিকে জীবন্ত করে তোলে।একটা থ্রিলারধর্মী উপন্যাসের বিভিন্ন পর্বের আচম্বিত বাঁক পাঠককে পরের অধ্যায়ে চোখ রাখতে বাধ্য করে। এই টেস্ট ম্যাচটাও বোধহয় তেমনভাবেই দর্শককে মাঠে টেনে এনেছিল।সর্বকালের সেরা পাঁচ বা দশটি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে যদি একে না রাখা যায় তবে কোন টেস্টকে রাখা যাবে?

জেতা হারার হিসেব এমন সব মুহুর্তে বহুদূরে কোথায় যেন পাড়ি জমায়। ক্রিকেট মাঠ থেকে উদ্ভূত এক অন্য ধরনের জীবনবোধ কখনো কখনো এমনি অবিস্মরণীয় কিছু নির্বাক মুহুর্তকে অন্তরের অন্তস্থলে জন্ম দেয়।

আর তারপর দিনের শেষে যা পড়ে থাকে তার নাম অখন্ড নিস্তঃব্ধতা।

(২)

রিচি রিচার্ডসনের দল ১৯৯২-৯৩ সালের অস্ট্রেলিয়া সিরিজে এমন কিছু ভাল খেলছিল না।অ্যালান বর্ডারের দলও নয়।বর্ডার নয়, তিনি তো ড্রেসিংরুমে ‘এবি’ নামে বেশি খ্যাত।রিচি রিচার্ডসন ছাড়াও সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের দলটায় তারকার অভাব ছিল না।ততদিনে ত্রিনিদাদের রাজপুত্র ব্রায়ান চার্লস লারার অবিস্মরণীয় ২৭৭ রানের ইনিংস খেলা হয়ে গেছে।সেই সিরিজেই।সিডনির নিউ ইয়ার্স টেস্টে।গোটা বিশ্ব নড়েচড়ে বসেছে।দু বছর আগেই আঠারোর বিস্ময় বালকের দর্শনপ্রাপ্ত অজি ক্রিকেট কূল লারাকে দেখার পরে রায় দিলেন যে মূলতঃ এই দু’জনেই নব্বইয়ের দশক ব্যাট হাতে শাসন করবেন।কিন্তু সে কথা থাক।রিচার্ডসনের টিমের কথায় আসি।

উল্লসিত অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডাররা

টিমে বিগত দশকে ক্লাইভ লয়েডের বিশ্বজয়ী দলের অপরিহার্য সদস্য তথা কিংবদন্তী ওপেনার ডেজি হেইনস আছেন।লারার পরে আছেন কার্ল হুপার।যাঁকে ছাড়া ক্যারিবিয়ানরা তখন একটি ম্যাচেও নামার কথা ভাবতে পারত না।জিমি অ্যাডামস আর কিথ আর্থারটন চলে এসেছেন। বল হাতে আছেন ভূবনবিজয়ী তিন ফাস্ট বোলার।কার্টলে অ্যামব্রোজ,কোর্টনি ওয়ালশ আর ইয়ান বিশপ। সঙ্গে কেনেথ বেঞ্জামিন।সিরিজে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় উনিশশো তিরানব্বই সালের তেইশে জানুয়ারী শুরু হওয়া টেস্টের প্রথম দিনে ক্যারিবিয়ানরা আগে ব্যাট করতে নামেন।পিচ ব্যাটিং সহায়ক ছিল বলে জানা যায়। ক্যারিবিয়ানরা তখনো প্রবলভাবে বিশ্ব ক্রিকেটে পরাক্রমশালী।বকলমে এক নম্বর দেশ। হেইনস আর ফিল সিমন্স মিলে শুরুটা ভালই করেছিলেন।৮৪ রানের মাথায় যখন প্রথম উইকেট পড়ল তখন সিমন্স ৪৬ করে আউট হচ্ছেন।কিন্তু বেশ অদ্ভূতভাবেই লারা (৫২) আর জুনিয়ার মারে (৪৯ নট আউট)বাদে আর কেউই বড় রান করে উঠতে পারলেন না।বলা ভাল দৈত্যাকৃতির মার্ভ হিউজ করতে দিলেন না।মূলতঃ তাঁর(৬৪/৫) এবং খানিকটা টিম মে-এর(৪১/২)নৈপূণ্যে ক্যারিবিয়ানরা আড়াইশোর সামান্য বেশি রানেই ফুরিয়ে গেলেন।

তুলনায় অজিদের ব্যাটিং শক্তিও নেহাত কম ছিল না।মার্ক টেলর ততদিনে বিখ্যাত হয়ে গেছেন।ফুরিয়ে এলেও টিমে আছেন ডেভিড বুন।পরবর্তীকালে ঝড় তুলবেন এমন একজনের এই টেস্টেই অভিষেক হল।এঁর নাম জাস্টিন ল্যাঙ্গার।ওয়া ভাইরা ছিলেন।ইয়ান হিলি উইকেটের পেছনের মতন সামনেও সদা বিশ্বস্ত, এটা তখন নিয়মিত প্রমাণ করছেন।আর অবশ্যই ‘এবি’ নিজে আছেন।বরং অজিদের বোলিং শক্তি খানিক দুর্বল ছিল।ক্রেগ ম্যাকডারমট আর হিউজ ছাড়া নামিদামি কেউই নেই তখন।শেন ওয়ার্ন সবে এসেছেন।তবে তখনো শচীনের কাছে মার খাওয়ার হ্যাংওভার থেকে বের হতে পারেননি।ফলে টিম মে,স্টিভ ওয়াদের ভাল মতন হাত ঘোরাতে হচ্ছে।তবে তাতে বিক্ষিপ্তভাবেই কেবল সাফল্য আসছে। অজিদের শুরুটা কিন্তু ভাল হল না।মার্ক টেলরকে দ্রুত তুলে নিলেন ইয়ান বিশপ।দিনের শেষে ল্যাঙ্গার আর বুন ফিরলেন বোর্ডে দুই রান নিয়ে।সমস্যা দেখা দিল পরেরদিন সকালে। বুন আহত হয়ে ফিরে গেলেন ১৬ রানের মাথায়।তাঁর কনুইয়ে চোট লাগল।মার্ক ওয়া আসা মাত্র অ্যামব্রোজ তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন।ওই ১৬ রানেই।আর এর খানিকবাদে যখন মনে হচ্ছে যে ল্যাঙ্গার আর স্টিভ ওয়া জমে গেছেন তখনই কেনেথ বেঞ্জামিনের বলে আউট হলেন জাস্টিন।অস্ট্রেলিয়া ৪৬/৩ না আসলে ৪৬/৪ –প্রশ্ন তখন সেটাই।অতীতে বহুবার এমন সঙ্কট থেকে যাঁরা টিমকে উদ্ধার করেছেন এবারে সেই দু’জন ক্রিজে।বর্ডার এবং স্টিভ ওয়া।চেনা চিত্রনাট্য বলবে যে এখান থেকে ধীরে ধীরে এঁরা একটা বিরাট বড় রানের পার্টনারশিপ করে টিমকে বিপন্মুক্ত করে দেবেন।সেই পথেই গল্প এগোচ্ছিলও।দ্বিতীয় দিনে অনেকটা সময় বৃষ্টির জন্য খেলা হতে পারেনি।ফলে এই দু’জনে মিলে ১০০ রানের গন্ডি পেরিয়ে নিরাপদে দ্বিতীয় দিন ফিরেও এসেছেন।সমর্থকেরা ভাবছেন যে যাক!ঝামেলা থেকে রেহাই মিলেছে।কিন্তু অ্যামব্রোজ অন্য রকম ভেবেছিলেন।আগেরদিন সাড়ে তিন ঘন্টার বৃষ্টি যে পিচকে ড্যাম্প করে দিয়েছিল সেই সুবিধাটাই পরেরদিন সাত সকালে নিয়ে নিলেন।প্রথমে বর্ডার,তারপরে হিলি এবং সবশেষে স্টিভ ওয়া-পরপর তিনজনকে তুলে নিয়ে অজিদের কোমর ভেঙ্গে দিলেন তিনি।কোথায় লিড?দ্রুত অস্ট্রেলিয়া ১১২/৭-এ নেমে এল।একটাই ভরসার কথা।ডেভিড বুন আবার ব্যাট হাতে নামলেন।কিন্তু পাশে কে আছেন?কেন মার্ভ হিউজ!যিনি বল নয় ব্যাট হাতেও টিমকে বাঁচাতে মরীয়া হয়ে উঠবেন।

অজিদেরও বেশি বাড়তে দিইনি। বাঁদিক থেকে অ্যামব্রোজ,সিমন্স,বিশপ আর লারা

গোটা অ্যাডিলেড ওভাল এরপরে দেখল বুন আর হিউজের লড়াই।আসলে বুন একটা দিক আটকে পড়ে রইলেন।হিউজ গোটা চল্লিশের কিছু বেশি তুলে দিয়ে যখন আউট হলেন ততক্ষণে অজিরা দু’শো দেখতে পাচ্ছে।ম্যাকডারমটের ১৪টা রানের সুবাদে ২১৩তে টিম ‘এবি’ থামল।ডেভিড বুন ৩৯ রানে অপরাজিত থেকে গেলেন।তবে বল হাতে অজিদের যেমন হিউজ,ক্যারিবিয়ানদের তেমনি অ্যামব্রোজ।উনি যদি পাঁচটি তুলে থাকেন তো ইনি নিলেন ছ’টি।

চিন্তাক্লিষ্ট অ্যালান বর্ডার

উনচল্লিশ রানের লিড পকেটে নিয়ে ক্যারিবিয়ানরা নামলেন দ্বিতীয় দফায়।এবং এবারে একেবারে প্রথম থেকেই মুশকিলে পড়ে গেলেন।রিচি রিচার্ডসন(৭২)ছাড়া কিঞ্চিৎ ভদ্র রানের অবদান একমাত্র কার্ল হুপারের (২৫) রইল।এই দু’জনের ৫৯ রানের একটি পার্টনারশিপ ছাড়া গোটা ইনিংসে ক্যারিবিয়ানদের বলার মতন কিছুই নেই।কিন্তু অজিদের দিক থেকে বলার মতন এক বিরাট ঘটনা ঘটল। ১২৫/৪ যখন স্কোর, বর্ডার টিম মে-কে ডাকলেন।মে আগের টেস্টে টিমে ছিলেন না।স্বল্পখ্যাত এই বোলিং অলরাউন্ডার এই টেস্টে ডাক পেয়ে বোধহয় অবাকই হয়েছিলেন।যাইহোক,এরপরে প্রথম ইনিংসে বল হাতে সাফল্য পাওয়ায় আবার যখন বল করার সুযোগ পেলেন তার খানিক আগে হাতে একবার চোট পান।ফলে তখন মোটেও প্রত্যাশা করেননি যে ঠিকভাবে আবার বল করতে পারবেন।আর এরপরেই ম্যাচে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেল।মে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, “There are days when you just struggle to hold on to the ball – you can’t put as much zip on it as you want because the seam is flat or the field has made the ball slippery. But that day it felt terrific. It was the third day, and the Adelaide Oval pitch had bounce and a bit of turn. It was a good wicket to bowl spin on, and things just went my way.”

২২ রানে শেষ ছ’টি উইকেট হারাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যার মধ্যে মে একাই তুলে নিলেন পাঁচটি।তাঁর স্বপ্নের বোলিং স্পেল দাঁড়াল ৬.৫-৩-৯-৫!মে ঐ প্রবন্ধেই খানিকবাদে বলেছিলেন, “I bowled a ridiculously small number of overs (6.5) for a ridiculously large number of wickets (five).

অন্যদিকে রিচার্ডসন আউট হলেন ওয়ার্নের বলে।কোনঠাসা হয়ে থাকা একটা টিম অকস্মাৎ জয় দেখতে পেল কি?সেই সঙ্গে সিরিজটাও? টার্গেট?মাত্র ১৮৬।হাতে দু’টি গোটা দিন সময়।আর টিমে হাফ ডজন তারকা ব্যাটসম্যান মজুত যাঁরা নিশ্চিতভাবে আরেকবার সবাই মিলে ব্যর্থ হবেন না। কী হল তারপর?

(৩)

লয়েডের আমলে সেই সত্তর দশকের একেবারে শেষের দিকে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে দুর্ভাগ্যবশতঃ হারতে বাধ্য হওয়া বাদ দিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখনো অবধি অপরাজেয় ছিল।উল্টোদিকে প্রায় সমস্ত অজি সমর্থক প্রবল উৎসাহে এই ভেবে মাঠে ভীড় জমিয়েছিলেন যে অস্ট্রেলিয়া দুনিয়ার এক নম্বর দলকে হারিয়ে এবার ফ্র্যাংক ওরেল ট্রফি ঘরে তুলবে।

রিচার্ডসন তেতে থাকা অ্যামব্রোজের হাতে নতুন বল তুলে দিলেন।ডিন জোন্স অ্যামব্রোজের রিস্ট ব্যান্ডের জন্য বল দেখতে অসুবিধা হচ্ছে এটা সফরের শুরুর দিকে জানান।বলা বাহুল্য সেটা এই দীর্ঘদেহী ফাস্ট বোলারকে আরো বেশি তাতিয়ে রেখেছিল।শার্টের একেবারে ওপরের বোতাম খোলা এবং দুই হাতেই রিস্ট ব্যান্ডের উপস্থিতিসমেত বোলিং রান আপের প্রান্তসীমায় কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষামান অ্যামব্রোজের শরীরী ভাষাই জানান দিচ্ছিল তিনি অজিদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে উন্মুখ হয়ে আছেন।আর সেটা যে কতটা সত্যি তা বোঝা গেল প্রথম বলটি করে ফলো থ্রুতে এগিয়ে আসা দেখে।ওয়ালশ নয়,ইয়ান বিশপের সঙ্গে জুটি বেঁধে একটা ভয়ঙ্কর স্পেল দিয়ে শুরু করলেন অ্যামব্রোজ,যা থেকে নীরব বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল-একটি রানও সহজে করতে দেব না।

১৬তম রানটায় বোধহয় ফাঁড়া ছিল! তা না হলে দ্বিতীয় ইনিংসেও অজিরা ১৬/২ হয়ে যায় কেমন করে?

টেলর আর বুন বেঞ্জামিন আর অ্যামব্রোজের বলে ফিরে গেলেন।তবে তাতে চিন্তা ছিল না।কারণ এবারে জাস্টিন ল্যাঙ্গার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন।পাশে পেয়ে গেছেন মার্ক ওয়াকে।তরতরিয়ে স্কোর বাড়ছে।দু’জনে জমে গেছেন ক্রিজে।বিশেষ করে মার্ক।অসামান্য সুন্দর কিছু শট খেললেন।টিমের রান যখন ৫৪ ঠিক সেই সময় দ্বিতীয় স্পেলে বল করতে এলেন ওয়ালশ।যিনি সারা ম্যাচে তখনো মনে রাখার মতন কিচ্ছু করেননি।আর এবারেই করলেন।মার্ক ওয়ার ক্যাচ চলে গেল হুপারের হাতে।পরের ওভারেই অ্যামব্রোজ ফিরিয়ে দিলেন স্টিভ ওয়াকে।একেবারে জুটিতে লুটতে শুরু করলেন দু’জনে।আপাত নিরীহ একটা টার্গেট দ্রুত ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে মনে হল যখন বর্ডার,হিলি,হিউজ আর ওয়ার্ন একে একে ড্রেসিংরুমে ফেরত গেলেন।অস্ট্রেলিয়া ৫৪/২ থেকে এত দ্রুত ১০২/৮-এ আছাড় খেয়ে পড়বে –এটা অতি বড় ক্যারিবিয়ান সমর্থকও ভাবেননি।ক্রিকেট মহান অনিশ্চয়তার খেলা বোধহয় এইজন্যই।কেউ জানে না কখন কীভাবে পট পরিবর্তন হয়ে যায়।একটা সহজ টার্গেট যা তাদের হাতে পাওয়ারই কোন কারণ ছিল না,সেটা এভাবে পেয়েও যে হারাতে হবে সেটা লাঞ্চের সময়েও কেই বা জানত?জাস্টিন ল্যাঙ্গারের অভিষেক টেস্ট যে যে কারণে চিরস্মরণীয় তার শেষের আগেরটি এবারে দেখা গেল যখন এরপরেও তিনি নতুন করে লড়াই শুরু করলেন।কারণ ল্যাঙ্গার আবিস্কার করলেন যে হঠাৎ হিরো বনে যাওয়া বোলার মে এবারে ব্যাট হাতেও ভরসা যোগাতে পারছেন।ঠিক যেমন প্রথম দফায় হিউজ দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। পরের কয়েক ঘন্টায় একটা অমানুষিক লড়াই দেখলেন অ্যাডিলেড ওভালের সাতান্ন হাজার দর্শক।অজিরা হারার আগে তো হারেই না,বরং হারতে হারতে ফের উঠে দাঁড়িয়ে জেতার হাইওয়েতে চলে আসে-এই ধারণাটা সেদিন আরো একবার প্রতিষ্ঠা পেলো।আচমকা খুলে দিল জয়ের দরজা।ল্যাঙ্গারের চার ঘন্টা তেরো মিনিটের লড়াই ব্যক্তিগত ৫৪ রানে যদিবা ইয়ান বিশপ থামিয়ে দেন(১৪৪/৯)অজিদের লড়াই আটকাতে পারলেন কোথায়?বাকি আর মাত্র ৪২ রান।কিন্তু বাইরে আর কেউ নেই যে!টিম মে-এর শেষ সঙ্গী ক্রেগ ম্যাকডারমট।

গেম অন!

জন নামে এক সমর্থকের একটি প্রতিক্রিয়া একবার ইন্টারনেটে পড়েছিলাম।এই অবধি এসে মনে হল তাঁর সেই মুহুর্তের প্রতিক্রিয়াটি জানালে ভাল হয়।জন বলছেন যে তিনি টিভি বন্ধ করে সেই মুহুর্তে বেরিয়ে গিয়েছিলেন অন্য কাজ সারবেন ভেবে।তাঁর মনে হয়েছিল টিম মে ল্যাঙ্গারের সঙ্গী হিসেবে হয়ত ভাল খেলছিলেন কিন্তু সেই হিসেবে তিনি অতটা স্বীকৃত ব্যাটসম্যান নন।ম্যাকডারমটের কিছু যোগ্যতা হয়ত ব্যাট হাতে ছিল।কিন্তু তাতে এত ভরসাও মনে আসে না যে তিনি মে-এর পাশে দাঁড়িয়ে বাকি রান ক’টি তুলে দেবেন।ঘন্টাখানেকবাদে ফিরে এসে তিনি টিভি খুলে হতবাক হয়ে দেখেন যে খেলা তখনো চলছে এবং জয়ের প্রায় কাছে পৌঁছে গেছে অস্ট্রেলিয়া।

রিচার্ডসন সব রকমভাবে চেষ্টা করেও জুটিটা ভাঙতে পারছিলেন না।পরিভাষায় যাকে বলে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’- সেখান থেকে দুর্দান্তভাবে ম্যাচে আরো একবার ফিরে এল অস্ট্রেলিয়া।ম্যাকডারমট আর মে দেড়টি ঘন্টা লড়ে গিয়ে টিমকে জয়ের মুখে নিয়ে এলেন।একজন ৪৪ আর আরেকজন ১৮ রানে তখন খেলছেন।বল হাতে ওয়ালশ।ততক্ষণে দশ উইকেট তুলে নেওয়া কার্টলে অ্যামব্রোজ নন।ইয়ান বিশপ নন।এমন থ্রিলার দেখার জন্য যে কোন মূল্যের টিকিট কাটা যায়।এই না হলে টেস্ট ক্রিকেট?যখন স্কোর ১৮৪ রানে নয় উইকেট,তিন দশকেরও বেশি আগে এই দুই দেশের মধ্যে ব্রিসবেনে খেলা প্রথম টাই টেস্টের স্মৃতি ফিরে আসছিল।দুই ব্যাটসম্যানই আউট হতে হতে বেঁচে গেছেন কয়েক ওভার আগে।তবে কি তিন নম্বর টাই টেস্ট দর্শকদের জন্য অপেক্ষমাণ?কী হল তারপর? ওয়ালশের একটা হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বলের সামনে থেকে ব্যাট সরাতে গিয়েও যেন পারলেন না ক্রেগ ম্যাকডারমট।জুনিয়র মারের বলটা তালুবন্দী করতে কোন অসুবিধা হয়নি। অস্ট্রেলিয়া জয় থেকে তখন এক রান দূরে।

স্রেফ একটি রান।

টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ন্যূনতম ব্যবধানে কারুর হার।অথবা কারুর জিত।

পেরেছি। অবশেষে জয় ছিনিয়ে নিতে পেরেছি।

(৪)

“To this day,I really don’t think, I hit it”.
"Over a few beers that night I watched it on the big screen about 400 times trying to work out if I'd hit it.”

ম্যাচ শেষ হওয়ার দশ বছর বাদেও এমন কথা বলেছেন ক্রেগ ম্যাকডারমট।সত্যিই কি তিনি আউট ছিলেন?বল ব্যাটে বা গ্লাভসে লেগেছিল?ডারেল হেয়ার ছিলেন আম্পায়ার।তিনি মনে করেন ক্রেগ আউট ছিলেন।ম্যাকডারমটের আউট সম্পর্কে টিম মে খুব নিশ্চিন্ত ছিলেন না।তাঁর ভার্সন হল,

“I was in a poor position to judge because when Craig tried to avoid the ball, his back was towards me. There was definitely a noise, and lots of people had plenty to say later about what exactly the ball hit.”

আজকের যুগ হলে ডিআরএস,স্নিকোমিটার,এসব মিলে ম্যাকডারমটের আউট নিয়ে ধোঁয়াশা কাটাবার আপ্রাণ চেষ্টা হত।কিন্তু তারা না থাকায় চিরদিনের মতন রহস্যেই ঘেরা থাকল সেই প্রশ্ন-বলটা ম্যাকডারমটের ঠিক কোথায় লেগেছিল।ব্যাটে?গ্লাভসে?নাকি আরো ওপরে? দিনটা ছিল ২৬শে জানুয়ারী।অস্ট্রেলিয়া ডে!

কিন্তু সত্যিই কি সেদিনটা অন্তত অস্ট্রেলিয়ার দিন ছিল?অজি খেলোয়াড়দের কেউ কেউ সেটা মনে করেন না।বলেন দিনটা নিজেদের হলে কাউকে এভাবে হারতে হয় না।যেখানে সিরিজ জিতে নেওয়ার কথা সেখানে সিরিজের ফল হয়ে যায় ১-১ এবং এরপরের টেস্টে (সিরিজের শেষ টেস্ট)ওয়াকায় ক্যারিবিয়ানরা(নাকি অ্যামব্রোজ একাই?!)বর্ডারদের আড়াইদিনে পিষে দিয়ে সিরিজটা জিতে চলে যান।এটাই আজ অবধি ক্যারিবিয়ানদের শেষবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপেনার ফিল সিমন্স লিখেছেন,

“For me it was a moment of disbelief. Twenty runs earlier I had gone for a catch off Tim May, but I wasn't sure if it was taken cleanly. That would have been the last wicket. I got anxious with every run and every ball after that. It had been a hard day, and both Curtly Ambrose and Courtney Walsh had bowled their hearts out. Finally Craig McDermott edged a ball as he tried to leave it. When Junior Murray caught him, there wasn't a West Indian there who was not at least two feet above the ground because of the intensity and emotion of the situation. It was a relief for me, and there was joy as well, because if we had lost, we would've lost the Frank Worrell Trophy.”

স্টিভ ওয়া,জাস্টিন ল্যাঙ্গাররা পরে বলেছেন যে এই হার অস্ট্রেলিয়াকে মানসিকভাবে এতটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করতে শুরু করে যে নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে তাদের অপ্রতিহত জয়যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর এখানেই স্থাপিত হয়ে যায়।কোনরকম কঠিন পরিস্থিতিতেই হেরে ফেরা যাবে না-এই জায়গাটায় দলের সকলকে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়।যে অন্ধকার অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে সেদিন খেলা শেষে নেমে আসে তার মধ্যেই দীর্ঘস্থায়ী সূর্যালোকের সম্ভাবনা সুপ্ত ছিল।এমনিতেও এক নতুন যুগের শুরু হওয়ার সময় তখন সমাগতপ্রায়।বর্ডার পরের বছর অবসর নিয়ে ফেললেন।বর্ডারের আমলের পেসাররাও কেরিয়ারের শেষের লগ্নে চলে এসেছিলেন।ডেমিয়েন ফ্লেমিং আর পল রাইফেল আসি আসি করছেন।

তাই অ্যাডিলেড বা তারপরে পার্থ টেস্টের হার এক অর্থে বর্ডার যুগের বিদায়ঘন্টাকে ত্বরান্বিতই করেছে।

বর্ডার অবসর নিতেই মার্ক টেলরকে নতুন অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত করা হল।শেন ওয়ার্ন সমহিমায় তখন আস্তে আস্তে আবির্ভুত হচ্ছেন।অন্যদিকে নিঃসাড়ে নিজেকে তৈরি করছেন তিনি-গ্লেন ম্যাকগ্রা।

নিজের জন্মদিনে এত লড়াইয়ের পরে মাথা নিচু করে হেরো দলের ড্রেসিংরুমে যদি ফিরতে হয় তবে ঠিক কেমন লাগে??তাও এমন একটা দিনে যার সঙ্গে দেশের নামটাই জুড়ে আছে।ক্রিসমাস ডে,বক্সিং ডে-এর পরেই আসছে দিনটা।নিজের একতিরিশতম আবির্ভাবলগ্নে সবটুকু দিয়েও ভিক্টরি স্ট্যান্ডের শেষতম সিঁড়িতে ওঠার আগে সঙ্গীর এক লহমার ভুলে যদি থেমে যেতে হয়, তখন মনে হয় না যে সমস্ত পরিশ্রম,প্রচেষ্টা,লড়াই,স্বপ্ন অর্থহীন হয়ে গেল? সেদিন অ্যাডিলেডের বিষাদভরা ড্রেসিংরুমের অন্ধকারে বসে টিম মে-এর নিশ্চয় এমন কিছুই মনে হয়েছিল।

নির্বাচিত তথ্যসূত্রঃ
John,B(2012): Shades of ’92-93 in Australia’s loss to Proteas, www.theroar.com.au May, Tim (2010): No Australia Day In Adelaide,thecricketmonthly.com.
Mukherjee, Abhishek(2016):West Indies pip Australia at the post to win by narrowest of margins, in cricketcountry.com.
Saltau,Chole(2003): It wasn’t Australia’s Day, www.theage.com.au.
Simmons,Phil(2008):In through the slamming door,www.espncricinfo.com
ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত।
ভিডিও লিঙ্কঃ ইউটিউবে পাওয়া যায়।

লেখক পরিচিত - পেশায় অর্থনীতির অধ্যাপক। ন'হাটা কলেজে কর্মরত। লেখালেখি নিয়ে চি


ন্তাভাবনার শুরু ২০১০-এ। প্রথম উপন্যাস 'জগতরত্ন রক্তনীল' আনন্দমেলায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ২০১৪-২০১৫ সালে। শারদীয় আনন্দমেলায় ওঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। ক্রিকেট নিয়ে লেখালেখিতে আগ্রহী। ফেসবুকে এ ব্যাপারে নিজস্ব পেজ 'বাইশ গজের ডাইরি'তে নিয়মিত লিখে থাকেন।

Copyright © 2018 Abasar.net. All rights reserved.