হকিস্টিক গ্রাফ

 

প্রথম পাতা

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

বিবিধ প্রসঙ্গ

মার্চ ৩০, ২০১৭

 

হকিস্টিক গ্রাফ

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়


কথাটা খুব ভাবাচ্ছে। বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা বিরল, যে শাখার বিজ্ঞানীরা এটা ভাবেননি। একবিংশ শতকেও আপনাকে যদি কেউ শিখিয়ে থাকে, “বছরে ৬টা ঋতু”, কিংবা বিংশ শতকের মাঝামাঝি এটা শিখে যদি একবিংশ শতকে আপনি বাস করেন – কথাটা স্রেফ ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, এই শতাব্দীতে ষড়ঋতু আর নেই, থাকবে না। কারণ অপ্রত্যাবর্তনশীল (irreversible) ভূ-উষ্ণায়ন(global warming)। মহাশক্তিশালী প্রকৃতির আর ক্ষমতা নেই মানুষের কল্যাণে একে বিপরিতমুখী করা। অবিশ্বাসীদের মুখ বন্ধ করতে বিজ্ঞানী মাইকেল মান(Michael E Mann) তার সমস্ত র ডেটা তাঁর পেজে তুলে দিয়েছেন। দয়া করে সময়ে শীত পড়ছে না, কী এবার বর্ষা ঠিক সময়মত এল না, কিংবা বর্ষা “বাড়াবাড়ি” না “বাড়ন্ত’ এসব বলে আর বাচ্চাদের বিভ্রান্ত করবেন না। অনেকদিন ধরে আপনারা তো শরত-বসন্তের, কিংবা বসন্ত-গ্রীষ্মের পার্থক্য বুঝতে পারেন না, হেমন্তকাল খুঁজে পান না, এবার বাকি অভিযোগগুলোও ভুলে যাবেন। এটা আমার বিনীত অনুরোধ।

ভারী যন্ত্রশিল্পের যুগ, পরিবেশ দূষণের যুগ ধরা হয় ১৭৬৫ তে জেমস ওয়াটের স্টীম ইঞ্জিন মডেল তৈরীর সময় থেকে। তার আগে পর্যন্ত যা ঘটেছে প্রকৃতি আপন ক্ষমতায় তার পূর্ণ প্রতিকার করতে পেরেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা-গণনার মাধ্যমে জানা গেছে বিগত ২৫০ বছরের ভারী যন্ত্রশিল্পের উপস্থিতির আগে প্রকৃতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে সমগ্র পৃথিবীর গড় স্বাভাবিক উষ্ণতা হওয়ার কথা ১৫০ সেলসিয়াস(অথবা১৪.৮০ সেলসিয়াস), এবং ২ লক্ষ ২০ হাজার বছর আগে থেকে প্রাক-শিল্পবিপ্লব যুগ পর্যন্ত তাই ছিল। যন্ত্রের পাঠে আবহাওয়ার নথি রাখা শুরু হয় ১৮৫০এ। তার আগের কথা কি করে জানলাম? গ্রিনল্যান্ড ও দক্ষিন মেরুর বরফের তলে আবদ্ধ বায়ু বুদ্বুদের রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিল্পবিপ্লবের আগে বায়ুতে CO2 এর শতাংশ নিরূপন করা যায় এবং ২২০০০০ বছর আগে পর্যন্ত এই পদ্ধতি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফলপ্রসূ। দীর্ঘ অতীতের উষ্ণতাও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে নিখুঁতভাবে। দেখা গেছে বায়ুতে CO2 এর গাঢ়ত্ব এবং বাতাসের উষ্ণতার মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্ক (Positive correlation)আছে। দীর্ঘ সময়কালীন একটা ধারণা পাওয়া যাবে ২ লক্ষ বছরের উষ্ণতার নথি থেকে। দেখা যাচ্ছে গত ২২০০০০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা মোটামুটি সুস্থিত ছিল।

২০০১ সালে IPCC (Intergovernmental Panel on Climate Change)-report এ জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একটি লেখচিত্র(graph)প্রকাশিত হয় যা আজ “হকিস্টিক গ্রাফ” নামে প্রচলিত। এই গ্রাফে দেখা যায় প্রায় হাজার বছর ধরে ১৮৬০ সাল অবধি বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা খুবই মৃদুহারে নিম্নগামী ছিল, হঠাৎ করে ঐ সময় থেকে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা অতি ধীরগতিতে, আর ১৯০১ থেকে দ্রুতলয়ে বাড়তে থাকে। এই হকিস্টিক গ্রাফ ও তার পিছনে সমস্ত গাণিতিক তত্ত্ব ও তদন্ত`র হোতা “মাইকেল মান ও সম্প্রদায়”। তাদের মডেলে (energy balance model) ৮৫০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত বার্ষিক প্রাকৃতিক(natural) ও মনুষ্যসৃষ্ট (anthropogenic) প্রভাবসমূহ (forcing) বিবেচনা করেছেন।

১৮২৪-এ প্রথম একজন অখ্যাত রসায়নবিজ্ঞানী বিভিন্ন গ্যাসের তাপবহির্গমণ বিরোধী প্রভাব বা গ্রীন হাউস প্রভাবের কথা বললেন, সেদিন আমরা সবাই উপেক্ষা করলাম(জোসেফ কুরিয়র)। রসায়নবিদরা চিরকাল উপেক্ষার পাত্র হতে হতে শেষে অপব্যবহারের মাধ্যম হয়েছেন রাষ্ট্র আর শিল্পপতিদের হাতে। ১৮৯৬ সালে বিশ্ববিশ্রুত রসায়নবিজ্ঞানী আরহেনিয়স পরিমাপ ও পরিসংখ্যান এর মাধ্যমে ভূ-উষ্ণায়ন (global warming)-এর প্রেক্ষাপট, কারণ, মেকানিজম, পরিণতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন অকুন্ঠভাবে, ততদিনে আধুনিক আবহবিদ্যা (Climatology) গড়ে উঠেছে, আবহবিদরা সংগঠিত হয়েছেন, কিন্ত সবাই উপেক্ষা করল আরহেনিয়সের ব্যাখ্যাকে। তখনো প্রকৃতির ব্যাধি সা্ধ্য (curable), কিন্তু সাধ্য অসাধ্যর সীমারেখার নিকটে। হয়ত উপেক্ষিত রসায়নবিদদের প্রতি কৃপা করেই প্রকৃতি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল আরো সময় দিতে। বিংশ শতকের প্রথমে ব্যাধি তখনো যাপ্য (maintainable)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর পরেও যদি বিশ্বময় সবাই সংযত হতে পারত, ভূ-উষ্ণায়নের (global warming) গতি হতো স্তব্ধ। উন্নয়নের দুরন্ত লোভ, বিজ্ঞানকে বিলাসের উপায় করার দুরন্ত লোভ – জলবায়ুর যাপ্য (maintainable) ব্যাধিকে ২০ বছরের মধ্যেই রূপান্তরিত করলো অসাধ্য (non-maintainable = incurable) ব্যাধিতে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কিছুই জানতে পারলো না; অর্থনৈতিক ও সামরিক সাম্রাজ্যলোভী রাষ্ট্র, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের চটকদারিতে মুগ্ধ হয়ে রইলো।

১৮৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর বায়ুতে CO2 ছিল ০.০২৮% মাত্র (২৮০ ppm), ১৯৫৮ সালে CO2 হল ০.০৩১৫%, ২০০৫ এ ০.০৩৮%। ১৮০১ থেকে ১৯০০ এই ১০০ বছরে গড় পার্থিব উষ্ণতার বৃদ্ধি ০.৪০ সেলসিয়াস। ১৯০০ সালে স্বাভাবিক গড় পার্থিব উষ্ণতা ছিল ১৫.৫০c, কিন্তু ১৯০১ থেকে ১৯৯০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে গড় বার্ষিক পার্থিব উষ্ণতার বৃদ্ধি ১০ সেলসিয়াস। জলবায়ুর রেকর্ডে ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বার্ষিক গড় পার্থিব উষ্ণতার গড় ১৬.৫০ সেলসিয়াস। জলবায়ুর পরিবর্তনে আতঙ্কিত আবহবিদরা (climatologists) তাদের বিবেচনার মূলবিন্দু, মুনাফাভোগীদের চাপে, পিছিয়ে আনলেন এই ১৯৯০ এর গড় উষ্ণতায়(কিয়োটো প্রোটোকল ১৯৯৭)। যদি গড় পার্থিব উষ্ণতা ১৬.৫০ অতিক্রম করে তবে তা ভূ-উষ্ণায়ন ধরা হবে এবং প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে। ভূ=উষ্ণায়ন গত ৩০ বছরে একটি আতঙ্কজনক সত্য। এখন শুধু একলক্ষ্যে সমবেত প্রচেষ্টার সময় – অনিবার্য দুঃসহ উষ্ণমৃত্যুকে দূরে ঠেলে দিতে হবে, “মরার আগে না মরা”র সাধনায় বাঁচাতে হবে পৃথিবীকে।

তাপশোষণকারী গ্রীনহাউস গ্যাস ৫ রকম: কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2), মিথেন, ওজোন, নাইট্রাস-অক্সাইড, ও ফ্রেয়ন। ট্রপোস্ফিয়ারে(অর্থাৎ বায়ুমন্ডলে ১৫-১৬ কিমি পর্যন্ত) এই সকল গ্যাসের সমষ্টি পরিমাপ করা হয় বায়ুর “CO2-তুল্যাঙ্ক” দ্বারা। শিল্পবিপ্লব এর আগে গ্রীনহাউস ক্রিয়া করত শুধু CO2, হাবিজাবি গ্যাসগুলো ধর্তব্যের মধ্যে ছিল না। এখন এই হাবিজাবিগুলোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হয়েছে যাদের এক এক জনের গ্রীনহাউস ক্ষমতা এক এক রকম। যেমন ১ ppm ফ্রেয়ন, ১৭৫০০ ppm CO2 এর সমান তাপশোষণ করে। কাজেই ৫টি গ্রীনহাউস গ্যাসকেই CO2-তুল্যাঙ্কে প্রকাশ করে বায়ুমণ্ডলের CO2-তুল্যাঙ্ক দ্বারা বায়ুতে উপস্থিত গ্রীনহাউস গ্যাসের গাঢ়ত্ব(CO2e) প্রকাশ করতে হয়।

তাপ-প্রতিফলকতল-আবরক ও তাপশোষক এরোসল হলো বায়ুতে প্রলম্বিত অদৃশ্য কঠিন-তরল কণা। এরা ভূত্বকে(মেরুবরফে, শৈলতুষারে, গাছের পাতায়)থিতিয়ে তাপশোষণ করে ভূত্বকের তাপ বাড়ায়,বরফ গলিয়ে দেয়, মসৃণ তল ঢাকা দিয়ে তাপের প্রতিফলন কমায়। যে সৌরতাপ পৃথিবীতে আপতিত হয় তদপেক্ষা বৃহত্তর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তাপ পৃথিবী হতে বর্হিমুখী বিক্ষেপ হয়। আপতিত তাপের যে অংশ (albedo)ভূত্বকের বা বায়ুমন্ডলের বাইরে যেতে পারে না, তার দ্বারা পৃথিবীর সর্বত্র তাপমাত্রা বাড়ে। এরোসল(aerosol) ভূত্বকের স্বাভাবিক তাপ প্রতিফলনাঙ্ক (ALBEDO) কমায়। এরোসলের প্রভাব(forcing by aerosols) নির্ণয় করে কার্যকর তাপ-প্রতিফলনাঙ্ক (effective albedo)। এরোসলের প্রধান উপাদান ১-১০০ nm মাপের কণা(PM = particulate matter)।

প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বল প্রয়োগের(natural and anthropogenic radiative forcing) মিলিত প্রভাবে জলবায়ুর পরবশ প্রতিক্রিয়া(forced response of the climate):

CdT/T = S(1-α)/4 + FGHG-A-BT+w(t)

পৃথিবীতে আপতিত সূর্যকিরণের বিপরীতে পৃথিবী হতে বহির্গামী যে দীর্ঘতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যর তাপ(LW) তাকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে ধূসর বস্তু(grey body)মডেল রৈখিক সমীকরণ LW=A+BT দ্বারা, যেখানে A এবং B শক্তিসাম্য সংশ্লিষ্ট দুটি ইচ্ছাধীন পদ যথাক্রমে WM-2 ও WM-2K-1 এককে প্রকাশিত। গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রভাব(forcing by greenhouse gases),FGHG=5.35log (CO2e/280), CO2e হলো CO2-তুল্যাঙ্ক। C= সমুদ্রের তাপীয় জড়তার পরিমাপক কার্যকর তাপধারকত্ব(effective heat capacity accounting for thermal inertia of mixed layer ocean)। S = 1370 Wm-2 is a solar constant। α =পৃথিবীর ফলপ্রসূ প্রতিফলনাঙ্ক(is effective surface albedo) যার মান জলবায়ুর উপর মনুষ্যসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক(যেমন আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তাগত) এরোসল দ্বারা যে তাড়ণা (northern hemisphere anthropogenic tropospheric aerosol forcing and volcanic aerosol forcing)তাকে অন্তর্ভূক্ত করে। w(t)অনিয়মিত কিন্তু প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ক্রিয়ার মান(random weather effects/so called natural weather fluctuation)। T হলো ভুপৃষ্ঠের উষ্ণতা (approximated as the surface of a 70m depth, mixed layer ocean covering 70% of earth`s surface area)।এই সমস্ত একত্র বিবেচনায় বর্তমান জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই সরল শূণ্যমাত্রিক শক্তি সাম্য মডেল(simple zero dimensional Energy Balance Model, EBM) প্রয়োগ করেন।

২০১৪ সালের এপ্রিলে Scientific American পত্রিকায় ও তার নিজের web-page এ জনগণের বিবেচনার জন্য তথ্যসহ হিসাবনিকাশ মেলে ধরেছেন বিজ্ঞানী মান। দেওয়া হয়েছে MatLab software, জলবায়ু-data ও software নামিয়ে যে কেউ যাচাই করে নিতে পারেন মডেলটি। দেখতে পাবেন IPCCর পরিমাপগত তথ্যের সঙ্গে বারবার এই মডেলের পূর্বাভাষ বা গণনালব্ধ তথ্য মিলে গেছে।



The original northern hemisphere hockey stick graph of Mann, Bradley & Hughes 1999, smoothed curve in blue with its uncertainty range in light blue, overlaid with green dots showing the 30-year global average of the PAGES 2k Consortium 2013 reconstruction. The red curve shows measured global mean temperature, according to HadCRUT4 data from 1850 to 2013.

১৯৮৮ সাল থেকে IPCC, ভূ-উষ্ণায়ন সম্পর্কিত যাবতীয় গবেষণা পর্যালোচনা করে ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত চার বার তাদের রিপোর্ট পেশ করে। সেখানে নীতিনির্ধারকদের জন্য সংক্ষিপ্তসারে (Summary for policy-makers, 4th report 2007) প্রধান বক্তব্যের চু্ম্বকসার নিম্নরূপ:

  • ভূ-উষ্ণায়ন সন্দেহাতীত ঘটনা, বিশ শতকে জলবায়ুর গড় তাপমাত্রার যে বৃদ্ধি তা নিঃসন্দেহে মনুষ্যসৃষ্ট গ্রীনহাউস গ্যাস ও এরোসল এর জন্য। এখানে মানুষের প্রভাব বহির্ভূত কোন প্রাকৃতিক কারণ সামান্য। ১৯৫০ সাল থেকে পৃথিবীর যে উষ্ণতাবৃদ্ধি তাতে সূর্যর সক্রিয়তাবৃদ্ধি বা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এর মত প্রাকৃতিক কারণের দায় নগণ্য।
  • ১৯৯০ সালের গড় উষ্ণতা ১৬.৫০ সেলসিয়াস-এ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়।
  • পরিবেশের উষ্ণতার বৃদ্ধি অনিবার্য। সমুদ্রতলের উন্নয়ন বন্ধ করা যাবে না।
  • সচেতন প্রচেষ্টায় গ্রীনহাউস গ্যাস বা এরোসল নির্গমন কমানো যেতে পারে। এতে উষ্ণায়নের হার কমবে। গড় উষ্ণতা কিন্তু পরবর্তী কয়েক শতক ধরে বাড়তে থাকবে।
  • বিগত সহস্রাব্দী পরিচিত ঋতুচক্র বিপর্যস্ত হয়ে বছরে বারবার প্রবল দাবদাহ ও প্রবল বৃষ্টিপাত একসময়ে অভ্যস্ত ঘটনা হয়ে যাবে।
  • যাবতীয় ঝড়-ঝঞ্ঝার ও খরা-দাবদাহের প্রাবল্য বাড়বে।
  • বছরে কতবার এবং কখন নিম্নচাপের উদয়, কতবার কী মাত্রার বৃষ্টি- এর কোন ঠিকঠিকানা থাকবে না।
  • অনুরূপ সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছাস গড় বার্ষিক সংখ্যা ও প্রাবল্য উভয়ই বাড়বে।
  • বাড়বে সময়ের সাপেক্ষে অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্পের সংখ্যা( frequency of earth-quake all over the globe)

জলবায়ু সংক্রান্ত মাইকেল মান এর Energy Balance Model দেখায় বিশ্বে যদি বর্তমান হারে গ্রীনহাউস গ্যাস ও এরোসল নির্গত হতে থাকে তবে ২০৩৬ এ উষ্ণতা ১৯০০ অপেক্ষা ২০ সেলসিয়াস বেশি হয়ে একটি বিপদসীমা অতিক্রম করবে যা মানবসভ্যতার সব বিষয় বিপর্যস্ত করবে- খাদ্য পানীয়জল স্বা্স্থ্য বিদ্যুৎ অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা। বিজ্ঞানী মাইকেল মান বলেন,

“The computer model determines how the average surface temperature responds to changing natural factors, such as volcanoes and the sun, and human factors —greenhouse gases, aerosol pollutants, and so on. Although climate models have critics, they reflect our best ability to describe how the climate system works, based on physics, chemistry and biology. And they have a proved track record: for example, the actual warming in recent years was accurately predicted by the models decades ago”.

২০১৩র সেপ্টেম্বরে IPCC রিপো্টে বলা হয় গত ১০ বছরে বিশ্বের উষ্ণতাবৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার কমা কিন্তু তাপমা্ত্রা বৃদ্ধি বন্ধ হওয়া নয়, তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। বিজ্ঞানী মাইকেল মান বলেছেন,

“The recent slowdown in the rate of temperature- increase, if it continues, will only buy us another 10 years”.

গরমে ত হাঁসফাস করছেন, পারলে বাড়িতে AC লাগিয়ে, AC গাড়ীতে যাতায়াত করে পুনরায় অজান্তে উষ্ণায়নে অবদান রাখছেন, জানেন ঋতুচক্র না থাকায় কী কী হতে চলেছে? গুনে শেষ করা যাবে না, কয়েকটি জানাচ্ছি – গত ২০বছরে ৩০টি রোগ নতুন করে দেখা দিচ্ছে। যথা-

  • সমুদ্রে কিছু ব্যাকটিরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে- ফুড পয়জনিং, সেপটিসিমিয়া, গ্যাসট্রোনটেরাইটিস এর ব্যকটেরিয়া আক্রান্ত সামুদ্রিক খাবার খেলে মানুষের শরীরে এই রোগগুলি দেখা যাবে।
  • বিশ্বময় বছরে ৪০ লক্ষ টিবি আক্রান্ত লোক পাওয়া যায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ভারতে টিবির প্রসারে আতঙ্ক ও সাবধানবাণী জানিয়েছে।
  • সারা বিশ্বে বছরে ১০-২০ লক্ষ মানুষ ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। বিশ্বের অর্ধেক মানুষের(প্রায় ৩২০ কোটি)ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি আছে। ১০৬টি উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ দেশে। ২০০৯ সালে ২২.৫ কোটি ম্যালেরিয়া সনাক্ত হয় ,তার মধ্যে ৪ লক্ষ মারা যায়। রোগীদের ৯০% আফ্রিকা ও এশিয়ায়। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে এই রোগ নেই, কিন্তু উষ্ণায়নের জেরে চিত্র বদলে যেতে পারে। ৫০ বছর পরে ম্যালেরিয়া ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়াতে পারে। ২১ শতকের প্রথম ৫ বছরে ম্যালেরিয়া ৪ গুণ বেড়েছে। এর সঙ্গে উষ্ণায়ন ও আর্দ্রতার সরল সম্পর্ক আছে, বর্ধিত উষ্ণতায় মশার জনন-হার বাড়ে, তারা বেশি করে রক্ত খায়, তাদের প্রজননঋতু দীর্ঘ হয়, লার্ভা দ্রুত বড় হয়ে পরিণত মশা তৈরী করে, তারা যে জীবাণু বহন করে তার পরিণমন দ্রুত হয়।
  • উষ্ণায়নের জেরে উত্তর আমেরিকায় ইডিস ইজিপ্টাই ও ইডিস এ্যালবোপিকটাস মশার বংশবিস্তার ঘটবে। এরা পীতজ্বর ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বহন করে। যদিও ক্রান্তীয় উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ দেশে এদের বসবাস , শীতলতর দেশেও এরা সফল অভিযোজিত হয়েছে। পীতজ্বর ও ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস এর মশার দেহে পরিণতি ও বংশবৃদ্ধি উষ্ণতর আবহাওয়ায় ভল হয়, মশা দ্রুততর রোগবিস্তার ক্ষমতা অর্জন করে। একবিংশ শতকের প্রথম ৭ বছর পর্যন্ত আমেরিকাতে ডেঙ্গুজ্বরের খোঁজ মিলেছে ৩২০০০!
  • রক্তমোক্ষণকারী নতুন রোগ যেমন এবোলা, ম্যাকুপো, হান্টা ভাইরাস উষ্ণায়নের কুফল। আমেরিকায় ১৯৯৩ সালে যেখানে হান্টা প্রথম ধরা পড়ে সেখানে তার আগে ৬ বছর খরা হয়েছিল, এর পর শূরু হয় প্রচড বৃষ্টি যা রোগের বাহক ইঁদুরের ১০ গুণ বংশবৃদ্ধি করে।
  • কলেরার ব্যাকটিরিয়া জলের বেশী তাপমাত্রায় ভাল থাকে বেশি বংশবিস্তার করে। দক্ষিন আমেরিকায় ১৯৯১ সালে কলেরার মড়কে ৫০০০ মানুষ মারা যায়। কলেরার ব্যাকটিরিয়া ভিব্রিও কলেরি। ভিব্রিও প্যারাহিমোলাইটিকাস ঘটিত আন্ত্রিক রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ২০০৫ সালে। এর জন্য বর্ধনশীল সমুদ্র উষ্ণতাকে দায়ী করা হয়।
  • ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পালিত পশুর নীলজিভ(blue tongue) রোগ ছড়ানোর মূলে উষ্ণতা, যে কীটের দংশনে এই রোগ ছড়ায় সেই কীট উষ্ণতর জলবায়ুতে বেশি বংশবৃদ্ধি করে।
  • রাশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে হান্ট ভাইরাসের সংক্রমণ, ক্রিমিয়ান কঙ্গো, টুলারেমিয়া এবং জলাতঙ্ক বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ রয়েছে ইঁদুর(rodenta) জাতীয় প্রাণীর সংখ্যাবৃদ্ধির।
  • চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে উষ্ণায়নের জেরে তাপীয় পীড়ন বাড়বে বিশেষত ক্রান্তীয় শহর অঞ্চলে , দরিদ্র মানুষ বেশি অসুস্থ হবে হিট স্ট্রোকে বা চামড়ার ক্যানসারে বা ডায়াবেটিসে। বাসস্থানের যথাযথ সুবিধার অভাবে তারা বেশী করে তাপ প্রবাহের সংস্পর্শে আসেন।
  • নতুন নতুন আলোক-সংবেদী চর্মরোগ ও আলোকসংবেদী অসুস্থতার উদয় হবে, গরিব ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে যার প্রকোপ বেশি হবে।

আরো বলি ২০৪০সালে ভারতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে না। কারণ হিমালয়ে বরফ থাকবে না। ২০৫০ সালে ভারতে ৫৭০০ বর্গকিমি কৃষিজমি ও ৪২০০ কিমি রাজপথ জলের তলায় মিলিয়ে যাবে, খাদ্য উৎপাদন ৫০% কমবে। তাহলে উপায়?

1. যেখানে কোন গ্রীন হাউস গ্যাস বা এরোসল নির্গত হয় সেখানেই পরিকাঠামো ও প্র্রযুক্তির পরিবর্তন করে গ্রীনহাউস গ্যাস ও এরোসল নির্গমন কমানো এবং সবশেষে একেবারে বন্ধ করা।
ক) CCS(Carbon capture and storage) প্রযুক্তিতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের CO2 নির্গমণ ৯০% কমানো যায়।
খ)ESP (electrostatic precipitator) প্রযুক্তিতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বা রাসায়নিক শিল্পকেন্দ্রের (chemical hub)বাতাসে ধোঁয়া ও ধূলি (smokes and dusts)-তে PM-নির্গমণ বন্ধ করা যায়।
গ) CNG, LNG, LPG ইত্যদি যা কম গ্রীনহাউস গ্যাস উৎপন্ন করে সেগুলির ব্যবহার বাড়িয়ে অন্য জীবাশ্ম জ্বালানী বাতিল করতে হবে।
ঘ) হিমায়ক (freezer), অগ্নিনির্বাপক, শীতাতপনিয়ত্রক (air-conditioner) ইত্যদিতে ফ্লুয়োরো কার্বনকে অন্য বিকল্প দ্বারা প্রতিস্থাপিত করতে হবে।
ঙ)প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোর পরিবর্তন করে জৈব জ্বালানীকে হাইড্রোজেন জ্বালানী ও সৌরশক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করাতে হবে।
চ) ভারতে আজকাল প্রচার হচ্ছে পরমানু বিদ্যুৎ দূষণমুক্ত। তাপবিদ্যুতের মত জল ও বায়ু দূষিত করবে না, জলবিদ্যুতের মত নদী-বনাঞ্চল-মাটির অবক্ষয়-অপমৃত্যু ঘটাবে না। হতে পারে যদি তার জন্য অবিরত অসীম ও অনন্ত সতর্কতা নেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রচুর তাপের অপচয় হয়, যা বাতাবরণে ও সমুদ্রে মিশে বিশ্ব উষ্ণায়নের কুফল দেয়। হাইড্রোজেন সেল ব্যাটারী ও সৌর বিদ্যুতের প্রয়োগ বাড়ালে সবচেয়ে ভাল হয়।
ছ)কিছু তেলখেকো ব্যাকটিরিয়া জেনেটিক প্রযুক্তিতে তৈরী করা সম্ভব যা সমুদ্রজলে ভাসমান তেল droplet ক্ষয় করতে পারে।
জ)ব্যাক্তিগত পরিবহন(personal car, byke) কমিয়ে গণ-পরিবহন বাড়ানো
ঝ)LED ও সৌরবাতির ব্যবহার বাড়ানো। ঞ)বাতি, পাখা, জলের কল, বাড়ী বা গাড়ীর এসি বাড়তি সময় ধরে না চালানো।

2. প্রকৃতির গ্রীনহাউস গ্যাসশোষক বা অপসারক পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা - সমুদ্র্র ও পুকুরকে দূষণমুক্ত রেখে ফাইটো-প্লাঙ্কটন বা জলজ উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি, স্থলভাগে বনাঞ্চলের বিস্তার, পথের ধারে ও লোকালয়ে বৃক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি। আগুন লেগে যাওয়া ও অন্য কারণে পরিত্যক্ত কয়লাখনি ও তৈলকুপ দ্রুত নির্বাপিত ও বন্ধ করতে যত্নশীল হতে হবে। প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে দাবানল দ্রুত নির্বাপিত করে বনাঞ্চল হ্রাসের গতি থামাতে হবে।

মোট কথা রাষ্ট্রের বরিষ্ঠ নীতি নির্ধারক (highest policy-makers, private sector or govermental) থেকে কনিষ্ঠ শিশু কেউ জেগে ঘুমিয়ে থাকবেন না। নিজে যাচাই করে নিন জলবায়ুর পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী এবং তা কোন প্রাকৃতিক কারণে(natural forcing) নয়, মনুষ্যসৃষ্ট কারণে(anthropogenic radiative forcing)। তারপর সযত্ন আন্তরিকতায় সতর্ক হোন। মাইকেল মান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সমস্ত আবহবিদ এর হয়ে সতর্ক করেছেন যে, কোন পূর্বাভাষে তারা সবচেয়ে কমটাই বলেন, মন্তব্যে রক্ষণশীলতা বিজ্ঞানীর অন্তলীন ধর্ম, অতএব যা বলা হয়েছে হয়ত তার চেয়ে আগে, তার চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে।

সূত্র -
http://www.scientificamerican.com/article/mann-why-global-warming-will-cross-a-dangerous-threshold-in-2036/
False Hope ; April 2014 , Scientific American https://www.scientificamerican.com/article/earth-will-cross-the-climate-danger-threshold-by-2036
রোগগুলো আগেও ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে তাদের বিস্তারের গতিবেগ ও আক্রান্ত রোগীর অসুস্থতার প্রাবল্য কমে আসছিল। ভূ-উষ্ণায়ন এই রোগগুলির তিব্রতা বা প্রাবল্য এবং বিস্তারের গতিবেগ বাড়াতে সাহায্য করছে। একেই বলেছি পুরনো রোগের নতুন করে দেখা দেওয়া। নতুন রোগ নয়। অবশ্য কিছু কিছু নতুন রোগের আবির্ভাব হয় নি তা নয়।এই সব রোগ জীবাণু পরিবেশের বেশি করে আনুকূল্য পাচ্ছে।
Summary for the policy-makers - IPCC 4th report 2007


লেখক পরিচিতি - কেমিস্ট্রি ও এডুকেশনে মাস্টার্। পেশায় শিক্ষক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ওয়েব-এ শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2015 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।