অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


খেলা‘ঘর’ বাঁধতে লেগেছি

অবসর বিশেষ সংখ্যা সেপ্টেম্বর ১, ২০১৭

 

১৯৮৮, উইম্বলডন ফাইনাল এবং আমাদের কৈশোর

সৌরভ মজুমদার

আমাদের ছোটবেলায় টিভিতে খেলা দেখার সুযোগ খুব বেশি আসত না। খেলার চ্যানেল বলতে তো ছিল না কিছু, সবেধন নীলমণি ওই ন্যাশানাল চ্যানেলে মাঝে মধ্যে কৃপা করে যেটুকু যা দেখাত সেটুকুই আমাদের সম্বল ছিল। তবে এত অল্প দেখতাম বলেই হয়ত যা দেখেছি তার নানা টুকরো স্মৃতি আজও মনের মধ্যে রয়ে গেছে। তা ছাড়া তখন প্রায়ই বন্ধুরা একসঙ্গে দল বেঁধে খেলা দেখতাম, সেই সব ফেলে আসা দিনও সুখস্মৃতি হয়ে ফিরে আসে মনে। এরকমই এক স্মৃতির রোমন্থন করি আজ। সময়টা ১৯৮৮, উইম্বলডনে উইমেন্স টেনিস ফাইনাল, প্রতিদ্বন্দ্বী স্টেফি গ্রাফ এবং মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা।

তখন আমার ক্লাস ইলেভেন। নরেন্দ্রপুরে হস্টেলে থাকি। শনি রোববার সন্ধেবেলায় হস্টেলের কমন রুমে টিভি দেখার অনুমতি পাওয়া যেত তখন । সেরকমই এক শনিবারে জুলাই মাসের দু' তারিখে টিভির সামনে আমরা অনেকে জড়ো হলাম উইম্বলডনে মেয়েদের ফাইনাল ম্যাচ দেখতে। টেনিস নিয়ে তখন আমাদের অনেকের মধ্যেই দারুণ উদ্দীপনা। খেলাটার নিয়ম-কানুন শিখে নিয়েছি টিভি দেখেই, আর খবরের কাগজ বা খেলার নানা পত্রিকা পড়ে টেনিসের সাম্প্রতিকতম হাল-হকিকতও অনেকের কণ্ঠস্থ। তবে, সেই ১৯৮৮তে টেনিস নিয়ে আমাদের অনেকের অত উৎসাহের একটা বিরাট কারণ ছিল অবশ্যই স্টেফি গ্রাফ।

আজ ফিরে দেখলে মনে পড়ে আমাদের সেই কিশোর বয়সে স্টেফি ছিল যেন রূপকথার এক রাজকন্যা। ১৯৮৮র সেই সময়টা স্টেফির তুমুল উত্থানের বছর। ১৯৮৭তে ফরাসী ওপেনে প্রথম গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম জেতার পর ১৯৮৮তে বছরের প্রথম দুটো গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টেই (অস্ট্রেলীয় ওপেন আর ফরাসী ওপেন) চ্যাম্পিয়ন হয় স্টেফি। গোটা পৃথিবীর টেনিসপ্রেমিকরাই তখন গভীর আগ্রহে নবীন এই তারকার অগ্রগতি লক্ষ করে চলেছে। সেই উৎসাহের আঁচ আমাদের মধ্যেও নিশ্চিত ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে তার সঙ্গেই স্টেফির প্রতি আকর্ষণের মধ্যে আমাদের অনেকেরই মনে কাজ করত কৈশোরক এক মুগ্ধতা যা হয়ত অনেকটা রক্তকরবীতে নন্দিনীর প্রতি কিশোরের রোমান্টিক আকর্ষণের সঙ্গে তুলনীয়। অতি উৎসাহী আমরা কেউ কেউ খেলার পত্রিকা থেকে জোগাড় করতাম স্টেফির ছবি। খুব সম্ভবত স্পোর্টস উইকলিতে তখন বেরিয়েছিল স্টেফির একটা বড় পোস্টার সাইজ ছবি। ওটা আমি সংগ্রহ করেছিলাম, হস্টেলে অনেককে দেখিয়েওছিলাম ছবিটা আর আকর্ষণ করেছিলাম ওদের ঈর্ষামিশ্রিত প্রশংসা।

স্টেফি গ্রাফ

হার্ড কোর্টে সেবছর অপ্রতিরোধ্য লাগলেও উইম্বলডনের ঘাসের কোর্টে স্টেফি কতটা কী করতে পারবে তা নিয়ে আমাদের অনেকেরই সংশয় ছিল। কিন্তু সব আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে স্টেফি সেবার ফাইনালে ওঠে একটা সেটও না হারিয়ে। কিন্তু ফাইনালে ওর প্রতিপক্ষ পড়ল মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা উইম্বলডনে যার শ্রেষ্ঠত্ব তখন অবিসংবাদী। গত ছ' বছর ধরে এখানে মার্টিনা চ্যাম্পিয়ন, আর সেবছর রেকর্ড সংখ্যক ন' বার চ্যাম্পিয়ন হবার হাতছানি ওঁর সামনে। গত বছরে এই উইম্বলডনেই মার্টিনার কাছে স্টেফি হেরে গিয়েছিল নিতান্তই একপেশে ম্যাচে, স্ট্রেট সেটে। আমরা যারা স্টেফির সমর্থক তারা তাই কিছুটা আশঙ্কা নিয়েই বসেছিলাম খেলা দেখতে।

প্রথম সেটের খেলা শুরু হওয়ার কিছু পর থেকেই আমাদের আশঙ্কা সত্যি হয়ে উঠতে লাগল। ঘাসের কোর্টে নেটের কাছে এগিয়ে এসে মার্টিনার সার্ভ এবং ভলিনির্ভর খেলার সামনে মূলত বেসলাইন-নির্ভর খেলায় দক্ষ স্টেফির অস্বস্তি তখন বার বার প্রকট হয়ে উঠছিল। এছাড়া স্টেফির দুর্বল ব্যাকহ্যাণ্ডকে আক্রমণ করার যে কৌশল নিচ্ছিল মার্টিনা তা-ও ঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারছিল না স্টেফি। তবু বেসলাইন থেকে অসামান্য কিছু ফোরহ্যাণ্ড শটের সুবাদে স্টেফিই প্রথম বার মার্টিনার সার্ভিস ব্রেক করে ৪-২ গেমে এগিয়ে যায়, কিন্তু এরপরেই পর পর দুটো সার্ভিস ব্রেক করে মার্টিনা চটপট ৭-৫ গেমে জিতে নিল প্রথম সেট। এর পরের সেটেও স্টেফির প্রথম সার্ভিস ব্রেক করে মার্টিনা যখন ২-০ এগিয়ে গেল তখন স্টেফির আর কোনো আশা আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে স্টেফির জন্য হতাশ বোধ করলেও মনে মনে আমরা তখন স্যালুট জানাচ্ছিলাম মার্টিনার স্ট্যামিনাকে। ঘাসের কোর্টের রানি বত্রিশ বছরের মার্টিনার সামনে উনিশের স্টেফিকে তখন মনে হচ্ছিল যেন অনেকটাই শিক্ষানবিশ।

কিন্তু এরপরই কি আচমকা ক্লান্তি ছায়া ফেলে গেল মার্টিনার স্কিলে আর পরিণত টেনিসমননে? না কি দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর স্টেফির টিন-এজ যৌবনে দক্ষতা আর শক্তিমত্তার ভূমিতে ঝাঁঝিয়ে উঠল সেই আক্রমণাত্মক কিলার ইন্সটিংক্ট যা অদূর ভবিষ্যতেই ওকে করে তুলবে অবিস্মরণীয় এক কিংবদন্তি! দ্বিতীয় সেটের তৃতীয় গেমই এর পর হয়ে উঠল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। ওই গেম থেকেই আমরা দেখলাম স্টেফি ওর মন থেকে ঘাসের কোর্টে নিজের আপেক্ষিক দুর্বলতার ভাবনা যেন ঝেড়ে ফেলেছে, ব্যাকহ্যাণ্ড শটও কমিয়ে দিয়েছে আর অসামান্য গতি আর ফুটওয়ার্ক সম্বল করে একের পর এক ফোরহ্যাণ্ড শটে মার্টিনাকে বিধ্বস্ত করে তুলছে। তৃতীয় গেমে সার্ভিস ব্রেকের পর থেকেই মার্টিনা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল খেলা থেকে, আর পর পর ন' টা গেম জিতে স্টেফি ৬-২তে দ্বিতীয় সেটের দখল নিয়ে তৃতীয় সেটেও ৩-০ এগিয়ে গেল।

আমরা তখন দু'চোখ ভরে স্টেফিকে দেখছিলাম। ওকে কখনও মনে হচ্ছিল আগ্রাসনে উন্মুখ ক্ষিপ্র এক বাঘিনী, কখনও বা মনে হচ্ছিল নৃত্যরতা এক ব্যালেরিনা যার ছন্দোময় পদচারণায় স্পন্দিত হয়ে উঠছে ঘাসের কোর্ট। অবশেষে ৬-১এ তৃতীয় সেট শেষ হতেই আমরা চেঁচিয়ে অভিনন্দিত করলাম নতুন উইম্বলডন চ্যাম্পিয়নকে, তারপর টিভিও বন্ধ হল, আর আমরা সবাই গল্প করতে করতে হাঁটা লাগালাম কিচেনের দিকে।

খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজের রুমে ফিরে আসতেই চমকে গেলাম। দেখি, আমার কাঠের লকারের তালাটা ভাঙা, আর ভেতর থেকে স্টেফির পোস্টার উধাও। রাগে দুঃখে উত্তেজনায় কতখানি বিক্ষুব্ধ যে তখন হয়ে উঠেছিলাম তা আজ মনে পড়লে হাসি পায়। ছবিচোর যে কে তা আর জানতে পারি নি পরে। তবে স্টেফিভক্ত কোন্ বন্ধু যে তখন এই কাণ্ড ঘটিয়েছিল তা আজ জানতে পারলে মজাই লাগত বেশ।



লেখক পরিচিতি: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক এবং সর্বভুক এক পাঠক। খেলা ভালোবাসেন।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.