প্রবাসে স্মৃতির পুজো

 

প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

শারদ অর্ঘ্য

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬

 

প্রবাসে স্মৃতির পুজো


শরৎ এসেছে। আজ মহালয়া। এসে গেল দুর্গাপুজো। শরতের এই উৎবকে মনে রেখেই অবসর-এর এই সংখ্যাটি সাজানো হল কয়েকটা বিশেষ লেখা দিয়ে। 'শারদপ্রাতের আলোর বেণু'-তে ধরা আছে রেডিয়োর 'মহিষাসুরমর্দিনী'- আর আমাদের ব্যক্তিগত মহালয়ার কথা। 'মেয়ে চলেছে মহাস্নানে'-র বিষয় ঘরের মেয়ে আদরের ঊমার মহাস্নান। প্রবাসের স্মৃতির পুজো-তে ধরা পড়েছে বাংলার বাইরে প্রবাস পুজোর ইতিকথা, কখনো মুম্বাই, কখনো জামসেদপুর, রাঁচি, কিংবা পণ্ডিচেরি আর তেহরানের কথা। ব্যাঙ্গালোর-এর পুজোর কথা জানতে একটা লেখার পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। অবসর-এর শারদ অর্ঘ্য নিয়ে আপনাদের মতামত জানতে পারলে ভাল লাগবে।

আপনাদের উৎসবের দিনগুলো সকলকে নিয়ে আনন্দে কাটুক, এই শুভকামনা রইল।


মুম্বাই

পুজোর গন্ধ

অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

 

প্রবাসী হবার পর প্রথম কয়েক বছর পুজোর ক’টা দিনের জন্য প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে কলকাতা যেতাম। প্রথমবার তো  দমদম বিমানবন্দরে নেমে ট্যাক্সিতে উঠেও আর সময়মত হাওড়া স্টেশনে গিয়ে পৌঁছতে পারিনি, পঞ্চমীর রাত্রে এমনই ছিল রাজপথে জনস্রোত। পরের দিন ভোরে নিজের শহরে গিয়ে পৌঁছই।
আসলে আমি তার আগে কখনো কলকাতার পুজো দেখিইনি। আর বাংলার আমাদের মফস্বলে  পুজো মানে শরতের আকাশ, বাতাসে এক অদ্ভুত পুজো-পুজো গন্ধ। খোলা মাঠের এক কোণে সাদাসিধে প্যান্ডাল, হাওয়ায় ভেসে আসা ঢাকের বাদ্যি। মন্ডপে পা না দিয়েও ভেসে যাওয়া যায় সেই আবহে। কখনো কখনো সেই আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে উঠতো পিসতুতো বোনেরা পুজোর ক’টা দিন কাটাতে আমাদের বাড়ি এলে, কী আমরা মামাবাড়ি গেলে। সেসব মফস্বলেও পরিবেশ প্রায় একই থাকতো। বাতাসেই পুজো পুজো গন্ধ।

মুম্বাইয়ের পুজো

মুম্বাইতে পুজো মন্ডপে না গেলে বাতাসে সেই ধুনোর গন্ধ পাওয়া যায় না। আপিসে সবাই গোমড়ামুখে কাজ কাজ ভাব নিয়ে বসে। যেবার প্রথম পুজোয় কলকাতা যাওয়া হল না, সেবার সপ্তমীর দিন এক সহকর্মী এসে বললো, চল ভোগ খেয়ে আসি। ভোগ! আপিসের কাছে সান্তাক্রুজে সেন কলোনীতে গিয়ে দেখি, মন্ডপে মা দুগ্গা, অনেক লালপেড়ে শাড়ি পরিবৃতা মহিলাদের মধ্যমণি হয়ে শোভমানা। ছোট বাচ্চাদের ছুটোছুটি, সদ্য তরুণীদের গ্রামভারি ভাব দেখতে দেখতে ভুলেই গেলাম আমি বর্ধমান কি বাঁকড়োয় বসে নেই। এরই মধ্যে লোকেরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, বালতিতে বালতিতে করে খিচুড়ি, লাবড়া তরকারি, বেগুনভাজা, চাটনি, পায়েস এসে গেল। ভোগের লাইনে যে শুধু বাঙালিরা ছিলেন তা নয়, প্রচুর স্থানীয় লোকজন এসে পড়লেন, নির্দ্বিধায় প্রসাদ নিয়ে খেলেন। মাঝে মাঝে ভলানটিয়ারদের ডাকে সাড়া দিয়ে, দুর্গা মাঈ কি জয়ও বললেন। পরিচিত অপরিচিতের এই ভেদরেখা মুছে যাওয়ার ব্যপারটা আমি প্রবাসে প্রথম দেখলাম, মুম্বাইয়ের পুজো আমার মন জয় করে নিল প্রথম চালেই।  নাই বা থাকলো সেই ধুনোর গন্ধ।

সেবার থেকেই আমরা ঘুরে ঘুরে খারে রামকৃষ্ণ মিশন, আর মুখুজ্জেদের  (পড়ুন কাজলের পুজো) বান্দ্রায় নতুন পল্লী, দাদারে শিবাজী পার্ক এইসব ঠাকুর দেখে বেড়াতে লাগলাম। ভাসান দেখতে জুহু। কলকাতার পুজোর ধারেকাছে না হলেও এইসব পুজোর জাঁকজমক নেহাত ফেলনা ছিল না। তাও তো ফিল্মস্টারে গিজগিজ করা লোখন্ডওয়ালায় অভিজিতের পুজো তখনও লৃটলকারে নিমজ্জিত।

পরে যখন সদ্য পওয়াইতে থাকতে এলাম, তখন মনে হল, কী করে অতদূরে যাব! পুজো এবার আর দেখা যাবে না।  কিন্তু জানা গেল পওয়াই-এর মালভূমি থেকে নামলেই একটা পুজো।

পাওয়াইয়ের পুজো

একটা বিশাল খোলা মাঠের একটেরে এক প্যান্ডাল। খুবই সাদাসিধে। একচালা ঠাকুর, ডাকের সাজ, ঢাকের বাদ্যি। জানা গেল বর্তমান ঠাকুরমশাইয়ের বাবাও এখানে পুজো করে গেছেন, প্রায় চল্লিশ বছর ধরে চলছে পুজোটি। মানুষজন খুব সাদাসিধে, আন্তরিক। পুজার শেষে আরতি, অন্যধারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রসাদগ্রহণ। খাওয়ার শেষে শালপাতা ফেলতে এক কোণায় গিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখি– কাশফুলে ভরে গিয়েছে সেই দিকটা। অমনি সেই না পাওয়া ধুনোর গন্ধটা পেলাম। এরকম পাওয়া যায় বলেই কি জায়গাটার নাম পওয়াই !

এসব অনেক দিনের কথা। পওয়াইতে এখন তিনটে পুজো। পুরোনো পুজোর এবার সুবর্ণজয়ন্তী। কিন্তু সেই পুজো আগের মতই সাদাসিধে,শাস্ত্রনিষ্ঠ আর আন্তরিক রয়ে গেছে। নতুন শুরু হওয়া দুটো পুজো তো কলকাতার চ্যানেলেও দেখায়, প্রবাসের পুজো বলে। দশমীর দিনে মহিলারা লালপাড় শাড়িতে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। চ্যানেলে চ্যানেলে দেখাবে যে!

কিন্ত  না, না, সেটাই, মানে ওই দেখানোটাই সব নয়, এমনকি দল ভাঙাভাঙি বাঙালির মজ্জাগত বলেও ব্যাপারটা ঠিকঠাক ব্যাখ্যা করা যায় না। আসলে আমাদের বুকের মধ্যে একটা করে চণ্ডীমন্ডপ আছে। সক্রিয় অংশগ্রহণে সেখানে এক বোধন ঘটে। পুজোটা বেড়ে উঠতে উঠতে যখন সেই জাগানোর শক্তিটা দুর্বল হয়ে আসে, তখনই আর একটা পুজোর প্রয়োজন হয় মনে হয় ।

সে যাই হোক আমার বাড়ি থেকে তিনমিনিটের দুরত্বে দুটো পুজো। জানালা থেকে প্যান্ডাল দেখতে পাই, ঢাকের বাদ্যিও শুনি। আসলে আমি মনেপ্রাণে সেই মফস্বলের ছেলেটাই রয়ে গেছি। কাজেই আমি কৃতজ্ঞ ।  


লেখক পরিচিতি : জন্ম ও বেড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গে, পড়াশোনা বিই কলেজ। চাকরিসূত্রে মুম্বাই। প্রবাসজীবনের অবলম্বন বাংলা গান, সাহিত্য।অল্পস্বল্প লেখালিখি, বেরিয়েছে পরবাস, কৌরব ইত্যাদি আন্তর্জাল পত্রিকায়। ছোটদের জন্য কিছু কিছু লেখা প্রকাশিত জয়ঢাক পত্রিকায়। প্রকাশিত কবিতার বই, ‘আপাত সুখের দৃশ্য’ ।





জামশেদপুর

আসছে বছর আবার হবে

আইভি চট্টোপাধ্যায়

লম্বা লাঠির আগায় ছোট কাঠের টুকরো লাগিয়ে একটা জিনিস। সবাই বলে ‘লগা’… সেই ‘লগা’ দিয়ে উঁচু উঁচু ডাল টেনে এনে পাড়ার সব গাছ থেকে ফুল তুলে নিয়ে যাচ্ছেন রায়জ্যেঠিমা। শুধু আমাদের বাগানের ফুল গাছগুলো বাদ । কারণ আমার ঠাকুমা। ভোররাত থেকে উঠে বারান্দায়। রায়জ্যেঠিমা চলে গেলেই পাশের বাড়ি থেকে দোলাদিদি দুব্বোঘাস আর তুলসীপাতা তুলতে আসবে, আর আমিও ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়াব। এমনি করে রোজ ভোর হয় আমার।

শুধু একদিন অন্যরকম ভোর হয়। আগের রাতে শোবার সময় রেডিও-র নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ‘কলকাতা ক’ সেট করে রাখেন। তখনো ভোর হয়নি, অন্ধকার আকাশটা, ঠাকুমা ডাকবেন, ‘মহালয়া শুরু হল, ওঠ বাবা, উঠে পড়’… আমি সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠব। পুরোটা শুনছি না কিন্তু, মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ছি। উদাত্ত গলায় চণ্ডীপাঠ.. গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’.. এইসময় টুপ করে সূর্য উঁকি দেবে, আর আমি চাদর ফেলে বারান্দায় চলে যাব। পুজো এসে গেল ।

‘রূপং দেহি, যশো দেহি’ শুরু হল, আর রায়জ্যেঠিমা বেরিয়ে পড়েছেন। কিন্তু আজ হাতে লগা নেই। ফুল চুরি হবে কী করে, পাড়ার সব বাড়িতেই তো সবাই উঠে পড়েছে। এমনকী সতনাম আঙ্কল, শর্মা আন্টি, শ্রীবাস্তভ আঙ্কলও। “বাঙালিদের এই মহালয়া ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালো।” দাদী প্রতিবছর আজকের দিনে কথাটা বলবেনই। দাদী আসলে প্রীতি-হরিশদের ঠাকুমা, সতনাম আঙ্কলের মা। আমার ঠাকুমার বন্ধু।

রেডিও-র মহালয়া শেষ, মন্টুজ্যেঠুদের বাড়িতে দোলনদাদা নতুন টেপ-রেকর্ডারে ‘মহালয়া’-ক্যাসেট চালিয়ে দিয়েছে, সারা পাড়া গমগম করছে। দোলনদাদা কলকাতায় শিবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, পাড়ায় সব ছোটদের আদর্শ, কলকাতা থেকে নতুন ক্যাসেট নিয়ে এসেছে। বাবা তর্পণ করবেন, ঠাকুমার সঙ্গে আজ আমিও বাগানে যাব দুর্বাঘাস তুলতে। ওমা, শিউলি ফুলে সাদা হয়ে আছে বাগানের একটা কোণ। মনটায় সুন্দর একটা আলো-আলো আনন্দ। পুজো এসে গেল।

ঠিক মুখোমুখি বাড়ির আঙ্কল আর আন্টি, উমেশ আর গৌরব আগরওয়ালের বাবা-মা ভিজে কাপড়ে ঘটভর্তি জল নিয়ে তুলসীতলায় কয়েকপাক ঘুরে গেলেন। ক’দিন ধরেই ওদের বাড়ি মাজা-ঘষা চলছে। ওদের দুর্গাপুজো আজ থেকেই শুরু। ওরা বলেন, ‘দশেরা’। আজ থেকে নবরাত্রি শুরু।

নবরাত্রির ঘট-স্থাপন হয় সতনাম আঙ্কলের বাড়িতেও। খুব নিয়ম। মিনি শ্রীবাস্তবদের বাড়িতে নবরাত্রি হয় না, কিন্তু ওরা এই দশদিন নিরামিষ খাবে। মিনি অবশ্য আমাদের সঙ্গে দুর্গাপুজোর মেলায় ঘুরতে গিয়ে এগ-রোল খাবেই।

তবে সবচেয়ে মজা হবে বিজয় দশমীর দিন, দেশাই আঙ্কলের বাড়ির পেছনের মাঠে। রঘুনাথ আঙ্কলরা সবাই মিলে, পাড়ার সব গুজরাটি-মারাঠী বাড়ির লোকজন মিলে ব্যবস্থা করেন। রাবণ-বধ। ওহ, সে যে কী মজার ব্যাপার!

তবে আজকের ব্যাপারটা শুধুই আমাদের। বাঙালিদের মহালয়া।

সবুজ সঙ্ঘের দুর্গাপুজোর মূর্তি তৈরী হয় ক্লাবের মঞ্চেই। একটা মস্ত তেরপল দিয়ে ঢাকা থাকে সামনেটা। বৃন্দাবনদাদা বাবাকে বলছেন, “দেখবেন কাকু, এমন মূর্তি হবে এবার! কোথায় লাগে কুমোরটুলি!”

জামশেদপুরের পুজো

বাবা সবুজ সঙ্ঘের সেক্রেটারি, আমাদের শহরের পুরোনো বাঙালি ক্লাব। দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে লক্ষ্মীপুজো হয়ে কালীপুজো পর্যন্ত সব আয়োজন চলবে। বৃন্দাবনদাদা এমনিতে আমাদের দেখলেই তাড়া করেন, আজ বাবার বলে বলীয়ান হয়ে আমরা প্রতিমা গড়ার জায়গায় ঢুকে পড়েছি। বেশিক্ষণ থাকা হল না, অলককাকু এসে ডাকলেন। অলককাকু সবুজ সঙ্ঘের কালচারাল সেক্রেটারি। পুজোর অনুষঙ্গে মেলা, যাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কত কাজ!

অলককাকু শিখিয়েছেন যাত্রা বলা চলবে না, বলতে হবে ‘পালা’। সামাজিক পালা-য় আমাদের ছোটদের যাওয়া বারণ। আমরা দেখি পৌরাণিক পালা, ঐতিহাসিক পালা। শান্তিগোপালের নেতাজি, শান্তিগোপালের স্পার্টাকাস। আমাদের ছোট্ট শহরে তখন শান্তিগোপাল হাওয়া। পুজোর আগে থেকেই ছাপা কাগজ বিলি হত, নটসূর্য ইন্দ্র আসছেন শহরে। কিংবা নাট্যাচার্য সূর্যকুমার। চতুর্থী থেকে যাত্রা। হলের মাঝখানে স্টেজ বেঁধে চারদিকে সারি সারি চেয়ার। ঠিক চারদিকে নয়, একদিকে পর্দাফেলা লম্বা রাস্তা.. যাত্রার কুশীলবরা ঢুকবেন। ডানপাশে বাজিয়েরা। প্রথম ঘন্টার আগে থেকেই আমরা কুচোকাঁচারা একেবারে সামনের সারিতে। দ্বিতীয় ঘণ্টা বাজতেই একসঙ্গে ঝাঁ ঝমাঝম, অমনি ছোট্ট বুবুন এসে কোলের কাছে ঘেঁষে বসল। তৃতীয় ঘণ্টা পড়তেই পর্দা সরিয়ে লম্বা রাস্তা দিয়ে অন্ধমুনি। দৃশ্যের পর দৃশ্য। হাতে একটা করে কাগজ আছে আমাদের, একেবারে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত কে কখন আসবে পড়ে ফেলছি। আহা কী রোমাঞ্চ!

বুবুনটা খালি ভয় পায়, বড়দিদির গাম্ভীর্যে সাহস দিই, “এই দ্যাখ, পরের দৃশ্যেই রাম আসবেন, ভয় কী?”
বুবুন গ্রীনরুমের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে, ‘ওই দ্যাখো দিদিভাই, রাম বিড়ি খাচ্ছে’.. আশেপাশে সবার সচকিত একত্র দৃষ্টিপাত। দেখি গ্রীনরুমের পর্দা সরে গেছে, শ্রীরামচন্দ্র মাটির ভাঁড়ে চা খেতে খেতে বিড়িতে সুখটান দিচ্ছেন।

পঞ্চমীর দিন থেকে স্কুল ছুটি। সকাল সকাল ঢাকের শব্দে ঘুম ভাঙা। আহ, পুজো এসে গেল।
ষষ্ঠীর দিন মা হলুদ-তেল মাখানো সুতো বেঁধে দেবেন হাতে। প্রীতি-উমেশরা এসে বারবার ছুঁয়ে দেখবে সেটা। এই ষষ্ঠীপুজো, ষষ্ঠীর দিন নতুন কাপড়জামা, এটা শুধু আমাদের। বাঙালিদের।

সপ্তমীর সকাল থেকে আবার অন্য মজা। ঢাকের শব্দে ঘুম ভাঙতেই মা-জ্যেঠিমারা তাড়া দেবেন, “শিগগির জামাকাপড় ছেড়ে রেডি হয়ে নে, পুজোর থালা পৌঁছতে হবে না?” অমনি আমরাও, ছুটির দিন মানেই গড়িমসি ভাব, সেসব ছেড়ে দাঁত মেজে ফিটফাট।

মণ্ডপে গিয়ে রাণাদার হাতে থালা জমা দেব, আর জিজ্ঞেস করে নেব, “বলি কখন? অঞ্জলি ক’টার সময়?”
রাণাদার ঠোঁটের কোণায় হাসি, কিন্তু দু’চোখ বড় করে কড়া গলায় বলবেন, “সেজেগুজে মেলায় ঘুরলে চলবে না । এদিকে আয়, ফল কাটতে হবে না?”

ফল কাটার সময় ছেলেদের কাজ নেই, ওরা ঢাকীর কাছ থেকে কাঠি চেয়ে নিয়ে ঢ্যাং কুড়াকুড় ঢ্যাং কুড়াকুড় ঢাক বাজাবে। পপাইয়ের খুব ইচ্ছে ঢাকের কাঠিটা হাতে নেবে, কিন্তু ছেলেরা সবাই বলবে, “যা যা, ফল কাটতে যা।”

চন্দননগর থেকে ঢাকী এসেছে, নেচে নেচে ঢাক বাজাতে বাজাতে একজন বললেন, “এসো গো মেয়ে, তুমি এইটা বাজাও”… অমনি পপাই ট্যাং ট্যাং করে কাঁসর বাজাতে লাগল।

আমরা করুণ মুখে কলার খোসা ছাড়াচ্ছি। পাড়ার বড় দিদি-বৌদিদের সঙ্গে অলকদার নতুন বউ ঘোমটা দিয়ে বসে ফল কাটছে পাশেই, রাণাদা মানসদা সবাই এসে নতুনবৌদির খবর নিয়ে যাচ্ছে.. বৌদি কলকাতার মেয়ে, আমাদের প্রবাসের পুজোর সব কলকাতার চেয়েও ভালো, এমন একটা ছবি না দেখালে চলে? বৌদিই একবার রাণাদাকে ডেকে কী বলল, আমাদের দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলও। ঠিক সামনের লক্ষ্মী ঠাকরুনের মত হাসিটা। ওপাড়ার হাসিজ্যেঠিমা “ও ঠাকুরমশাই, ও বৌমারা, ও রতন, ও রাণা” করছিলেন এতক্ষণ, তিনিও হেসে ফেললেন। “যা যা পালা, আর মুখ শুকনো করে বসে থাকতে হবে না। একদম ঢাক বাজাবি না এখন, বাড়ি গিয়ে মায়েদের পাঠিয়ে দে।”

আমরা সঙ্গে সঙ্গে নেমে এসেছি, মল্লিকা সেই ফাঁকে একবার ঠাকুরমশাইয়ের ঘণ্টাটা টুংটুং করে নেড়ে দিয়ে এল। আর বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে? আমরা মেলায় এক চক্কর দিয়ে তবেই বাড়ি ফিরব।

রামকৃষ্ণ মিশনের পুজো

আমাদের সব বড় বড় পুজোয় মেলা একেবারে মাস্ট। সন্ধেবেলা সাকচীর বেঙ্গল ক্লাবের মেলার মাঠে, সার্কিট হাউসের পুজোর মেলার মাঠে, বিষ্টুপুরের মণিমেলা গ্রাউন্ডের মেলা, টেলকোর এন-এম-পি টাইপের পুজোর ছোট্ট মেলায়, ছাব্বিশ নম্বরের পুজোর মেলায় সব বন্ধুবান্ধবের মিলনমেলা হয়ে উঠবে। বেশ সময় দিয়ে দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আমাদের ছোটদের অত দূরে দূরে যাবার অনুমতি নেই। যে যার এলাকার মেলায় যাই।

বেলডি কালীবাড়ির পুজো

আমাদের পুজোগুলো সবই সাবেকি ধরণ, থিম পুজো টুজো বিশেষ চল নেই। হয় একচালা ঠাকুর, নয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন ঠাকুর সপরিবারে। একদিন যাব বিষ্টুপুরের রামকৃষ্ণ মিশনের পুজোয়, সন্ন্যাসীরা পুজো করেন কেমন। আরেকদিন যাব বেলডি কালীবাড়ি, দুর্গামূর্তি ডাকের সাজ। ডাকের সাজ জিনিসটা অবশ্য ঠিক বুঝতাম না আমরা। তবে এই কয়েকটা বাঙালি দুর্গাপুজো দেখা নিয়ম,এখানের সব বাঙালিরই। বড়রা বলেন, সাত্ত্বিক পুজো। সেটা কী জিনিস আমরা বুঝি না। সব মণ্ডপের  পুজোয় তো বেশ পবিত্র পবিত্র ভাব হয় মনে।

না, সব পুজোয় হয় না অবশ্য। মেলায় এক চক্কর দিয়ে বাড়ি ফিরছি, পুর্বাঞ্চলের মন্ডপ। সুরুচি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে সারাদিন আড্ডা দেয় দাদারা, ঠাকুমা বলেন ‘অকর্মার ঢেঁকি’, জোরে মাইক চালিয়েছে ‘পগ ঘুংরু বাজে মীরা নাচে রে’.. সঙ্গে বচ্চন-স্টাইল নাচ। রুমা বলবে, “এই, একদম হাসবি না কেউ।”  আমরা গম্ভীর হয়ে জায়গাটা পেরিয়ে আসব।

এ আবার কেমন পুজো? হিন্দী গান নাচ.. যত বাজে ব্যাপার। আমাদের বাঙালি পুজোয় এসব হয় না। আমাদের পুজোয় কেমন গান বেরোয় বছর বছর। দাদা এবছর একটা সন্ধ্যা, একটা শ্যামল মিত্র, একটা মানবেন্দ্র এনেছে। আর সেজজ্যেঠু এনেছেন পান্নালাল ভট্টাচার্য। আহা।

ছোট্ট পপাই-টুনু-মিমি-বুবুনও জলবেলুন নাচানো বন্ধ করে বেশ ভারিক্কি চলনে হেঁটে আসবে। হিন্দী নাচ-গান আমরা দেখব না, শুনব না। যদিও মহিমাময়ী ভঙ্গীতে জায়গাটা পেরিয়ে এসেই আমরা একপাক নেচে নিই। ‘পগ ঘুংরু বাজে...’

বাড়ি ফিরে নতুন জামা। বাঙালিরা আমরা সবাই। প্রীতি অনুজ থেকে হরিশ প্রিয়াঙ্কা ওরা সবাই একটু একটু হিংসে করে। ওদের একটা করেই জামা হয়েছে। অষ্টমীর সন্ধ্যেয় পরবে। সতনাম আঙ্কল বলবেন, “দুর্গাপুজোয় তো আমরা নতুন কাপড় কিনি না, এখানে কিনতে হয়। আপ সবলোগ বঙ্গালী হ্যায় না? নহি তো বচ্চালোগ দুখী হোতা হ্যায়।”

নতুন জামা না-ই হোক, গুটিগুটি পায়ে ‘বচ্চালোগ’ যে আমাদের সঙ্গেই ঘুরবে এখন সারা সকাল, এমনকি শর্মা-কাউর-দেশাই-পান্ডে আন্টিরাও অনেকেই মায়েদের সঙ্গে মন্ডপে কাটাবেন, আঙ্কল তো জানেন না। একটু পরেই তো মা দুর্গাকে অস্ত্র-সাজ দেওয়া হবে।

সকালের নামাবলী জড়ানো জবুথবু ঠাকুরমশাইকে আর চেনাই যাচ্ছে না। বীরবিক্রমে উদাত্ত গলায় মন্ত্রপাঠ চলছে। একযোগে ঢাক কাঁসর ঘণ্টা বেজে চলেছে। মা-জ্যেঠিমা-কাকিমারা সবাই দুর্গাঠাকুরের মতই তেল-তেল মুখে শঙ্খ বাজাচ্ছেন, কাটাফল সাজিয়ে রাখছেন পেতলের থালায়। পাড়ার সব ঠাকুমারা গলায় আঁচল জড়িয়ে জোড়হাতে, কারো কারো চোখ থেকে জলের ধারা নেমে এসেছে.. আমরা মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে আছি। একদিনে কেমন বদলে গেল সব। প্রতিমা মন্ডপ মানুষজন, সব।

বাইরে বেরিয়ে মেলার মাঠে কাঠি-আইসক্রিম খাবার কথা। কমলা সাদা হলুদ কাঠি। পপাই-টুনু মেলায়  মেরি-গো-রাউন্ডে চড়ার বায়না করছিল। কালো চশমা চোখে দিয়ে অরুণদা কাঠের পুতুলের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে, শিখাদিকে চুপিচুপি খবর দিতে বলেছিল। ওই তো শিখাদি আর বুনুদি দাঁড়িয়ে আছে, দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে.. ঠিক মা সরস্বতীর মতো লাগছে। সব ভুলে গেলাম।

পিসিরা সব এসেছেন পুজোর সময়, ভিলাই দুর্গাপুর বর্ধমান থেকে, কলকাতা থেকে এসেছে কাবলুদাদা। “ভালো করে শোন, ঢাকের আওয়াজ কি বলছে!”

শুনছি তো। ঢ্যাং কুড়াকুড় ঢ্যাং কুড়াকুড়।

“আরে ধুস। তোদের মত হিন্দুস্তানীরা আর ঢাকের ভাষা শিখবি কী করে? আমাদের দর্জিপাড়ার ছেলেরা মাযের পেটে থাকতে থাকতেই এসব শিখে যায়।”

‘হিন্দুস্তানী’ খোঁটা উপেক্ষা করে ফেলি, ঢাকের ভাষা শিখতেই হবে। “ওই শোন, বলছে ঠাকুর আসবে কতক্ষণ ঠাকুর যাবে কতক্ষণ।”

তাই তো। সত্যিই তো। আমরা তালে তালে গাইতে থাকি, “ঠাকুর আসবে কতক্ষণ ঠাকুর যাবে কতক্ষণ।”
ভিলাই থেকে এসেছে বালাজী-বুলবুলি, ওরা আমাদের চেয়েও বেশি ‘হিন্দুস্তানী’, বোকার মত বলে, “ঠাকুরকে যেতে বলছে কেন? আজ তো সবে সপ্তমী।”

দর্জিপাড়ার আগেই বোলপুরের বিশুদাদা আর বর্ধমানের চাঁদুদাদা হৈ হৈ করে উঠল, “এই বুদ্ধি নিয়ে লেখাপড়া করিস? আয় এদিকে, গাঁট্টা মেরে দেখতে হবে কতটা ঘিলু আছে মাথায়।”

খাস কলকাতার দর্জিপাড়ার কাবলুদাদা কথাটা সমর্থন করল, “যার মাথায় যত বড় আলু উঠবে, তার ঘিলু তত বেশি। আয় এক এক করে। এই নীতু, ওই মেড়োটাকে আন দেখি। তারপর খোট্টা আসবে।” মেড়ো মানে বিক্রম দেশাই, খোট্টা মানে প্রীতি আর হরিশ। গুরপ্রীত হল পাঁইয়া। ওরা অবশ্য এত বাংলা কথা বোঝে না। তাই অক্লেশেই উড়ে-খোট্টা-মেড়ো-পাঁইয়া-হিন্দুস্তানী। দুর্গাপুজো এলেই তো আমরা এত সব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাই। বছরভর অপেক্ষায় থাকি তাই।

উষা নায়ার একটু মিটমিট করে হেসে বলে উঠল, “তাহলে কাবলুদাদা, তোমার ঘিলুটাই আগে চেক করি?”

কাবলুদাদা তো জানে না, উষার মা খাঁটি বাঙালি, আমাদের স্কুলে ড্রয়িং-দিদিমণি। শমিতাদি আর বুনিদি অঞ্জলি দিতে এসেছিল, আমাদের আগের চেয়ারে বসে আছে, ফিকফিক করে হাসতে লাগল।

“কী ই ই ই” বলে লাফিয়ে উঠল দুর্গাপুর বর্ধমান কলকাতা, “যা তাহলে। এত পেকে গেছিস তোরা? আসিস ফ্রানকেনস্টাইনের গল্প শুনতে!”

বাববা, কলকাতায় ‘মেট্রো’-য় ‘ইংরেজি বই’ দেখে আসা দাদাদের মুখে ‘সিন বাই সিন’

ফ্রানকেনস্টাইনের গল্প! ভ্যাম্পায়ারের গল্প! ফসকে গেল! ওরা রাগ করে উঠে গেল যে।

হরবিন্দর আর গুরপ্রীতও ফিসফিস করে উষার সঙ্গে কী সব বলে উঠে গেল। যাঃ, আমাদের দলটাই ভেঙে গেল। পপাই বলে উঠল, “দ্যাখ দিদি, মহিষাসুরের মুখটা ঠিক কাবলুদাদার মত না?”’

মোটেই না, বরং কাবলুদাদা ঠিক কার্তিক ঠাকুরের মতো সুন্দর। আর বিশুদাদা একটু মোটা হলেও শিবঠাকুরের মতো সুন্দর। আমরা বলি না, পাড়ার সবাই বলে। পুজোর সময় পাড়ার বড় দিদিরা ঘন ঘন আমাদের বাড়ি আসে। এই দাদাদের জন্যেই। ছোট বলে কি কিছুই বুঝি না?

তবে এই মূহুর্তে আমরা একমত হই। বুলবুলি সবচেয়ে জোরে জোরে ঘাড় নাড়ে। ঠিক ঠিক, কাবলুদাদা একটা মহিষাসুর। পুজোর মজাটা মাটি করে দিল।

এই যে ওরা অ-বাঙালিরা রাগ করে উঠে গেল, যদি আর কথা না বলে? এই তো ক’দিন পর দেওয়ালি আসছে, তারপর লোড়ি, শীত এলেই ক্রিসমাস, ওনাম, তারপর বসন্ত এলেই হোলি। ওদের পুজো-উত্‍সবে যদি আমাদের না নেয়!

কদমার রতনের পুজো

অষ্টমীর সকালেই আমরা ভাব করে নিই। বাঙালি পুজো এমন কিছু না, মালখান সিং-এর পুজোয় জাঁকজমক অনেক বেশি, জোর করে সায় দিই। হ্যাঁ, এরকম কয়েকটা পুজো শুরু হয়েছে এখন। মালখান সিং-এর পুজোয় চন্দননগর থেকে আলোর কাজের লোক আসে, কদমার রতনের পুজোয় দশ হাত নাকি বারো হাতের দুর্গামূর্তি হয়। বিহারী পুজোয় বাঙালিকে টেক্কা দেবার ব্যাপারটা বেশি। আদিবাসীদেরও একটা পুজো আছে, শিব-দুর্গার মূর্তি পুজো। উড়িয়া মন্দিরেও তাই, শুধুই শিব-দুর্গা। দু’দিন ধরে হেঁটে হেঁটে সব মন্ডপ ঘুরে আমরা একমত হই, বাঙালি সাবেকি পুজোটাই সবচেয়ে সুন্দর।

“আটটার মধ্যে বইখাতা নিয়ে চলে আসবি, দশটায় কিন্তু ঠাকুর বেরিয়ে পড়বে,” বাবা বলে দিয়েছেন। আমাদের এখানে বিসর্জন হয় দিনে দিনে। সন্ধেবেলা শান্তিজল নিয়ে বিজয়া শুরু। সব ঠাকুরের পায়ে বইখাতা ছুঁইয়ে আমি এক ফাঁকে অসুরের পায়েও বই ঠেকিয়ে নিয়েছি। সবার চোখ বাঁচিয়ে অবশ্য। কী দরকার বাবা রিস্ক নিয়ে!

মল্লিকা কার্তিকের ময়ূরের পালক নিয়েছে, রুবি সরস্বতীর হাঁসের পালক। পপাই শিবের হাতের ডমরু নিয়েছে, সোনা-মিমি মা দুর্গার হাতের চাঁদমালা ছিঁড়ে নিল। মায়েরা সিঁদুর খেলছেন সবাই, আমরা মুখ শুকনো করে বসে থাকি। পুজো শেষ।

কাবলুদাদা আর বিশুদাদা এসে পাশে বসল, “মনখারাপ করছিস নাকি? ঢাকের ভাষা শুনছিস না?”

আমরা একটু তটস্থ, এই বুঝি আবার হিন্দুস্তানী বলে মজা করবে। কেমন অন্য গলায় কাবলুদাদা বলল, “মন দিয়ে শোন, ঢাক বলছে.. আসছে বছর আবার হবে।”

বিশুদাদা হেসে আমার মাথায় হাত রাখল, “মা দুর্গারও মনখারাপ। দেখছিস না, চোখে জল?”

ওমা, তাই তো। স্পষ্ট জল দেখছি। না না, মনখারাপ নিয়ে যেও না ঠাকুর। আমরা হাসিমুখে হাত নাড়তে লাগলাম। কেঁদো না মা, আসছে বছর আবার এসো।


লেখক পরিচিতি : আইভি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থান–জামশেদপুর, ঝাড়খণ্ড। পেশায়– ব্যাঙ্ককর্মী আর নেশা- লেখালেখি, বেড়ানো ও বাগান করা। গদ্য, ছোটগল্প, বড়গল্প,উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ-কথা লিখতে ভালবাসেন। প্রকাশিত বই – নিরবলম্ব (উপন্যাস), রাতপাখি এবং অন্যান্য (ছোটগল্প সঙ্কলন), ছায়াতে আলোতে (ছোটগল্প সঙ্কলন),অপারেশন স্বর্গদ্বার (উপন্যাস), অনির্বাণ এবং (ছোটগল্প সঙ্কলন), রামধনুর দেশে (ছোটদের জন্যে গল্প সঙ্কলন),ভাবনার নানা প্রসঙ্গ (প্রবন্ধ সঙ্কলন) নদী যেমন (ছোটগল্প সঙ্কলন) মহাজীবন (ছোটগল্প সঙ্কলন)।





মুম্বাই ও তেহরান

জগজ্জননী

দীপা দাস

আকাশ যখন ঝকঝকে নীল, সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের গুচ্ছ শরতের জয়গান গাইছে, বাতাসে কেমন পুজো পুজো গন্ধ তখন মনটা বাড়ীর জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু জীবিকা আর ভালোলাগার টানাপোড়েন। বাংলার বাইরে অনেক জায়গাতেই দুর্গাপুজো কাটিয়েছি, যোগদান করেছি স্থানীয় পুজোয়। একটা দু’টো আজ লিখি।

মুম্বাই

ব্যঙ্গালোর থেকে সদ্য এসেছি মুম্বাই তেমন কাউকেই চিনিনা। কিছুদিন আগেই আলাপ হয়েছে ভ্রাতৃপ্রতিম স্নেহাশিসের সঙ্গে। ফোনে জিজ্ঞেস করলাম -পুজোতে কী কর তোমরা। লাফিয়ে উঠলো স্নেহাশিস -এখুনি এসে যোগ দাও আমাদের ক্লাব "স্পন্দন"এ। মূলত বাঙালিদের ক্লাব। এবছরই আমাদের প্রথম পুজো। পওয়াই এ কাফে মনজিনিস এর পাশের মাঠে। একটু ইতস্তত করছি। আন্ধেরীতে থাকি, একটা কলেজে পার্টটাইম পড়াই আর ছুটি পেলেই ছেলের কাছে ব্যঙ্গালোরে। অরূপ আজ সাউথ আফ্রিকা, কাল ইন্দোনেশিয়ায় কাজে ব্যস্ত। একটু সংকোচ নিয়েই গেলাম প্রথম মিটিং-এ। কয়েকজনের সঙ্গে সামান্য পরিচয় ছিল কিন্তু সবাই খুব আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলো আমাকে। এ এক মজাদার গ্রুপ। প্রণোচ্ছল সব সদস্য , সদস্যা। বয়স যাই হোক, হাহাহিহি করতে এদের জুড়ি নেই। আবার কাজের সময় সবাই খুব সিরিয়াস। যতই হোক পেশাগত জীবনে সবাই প্রায় সফল। প্রত্যেক মিটিং এর শেষেই আড্ডা আর রাতের খাওয়া দাওয়া। স্পন্দন লেখা টি-শার্ট ছাপানো হলো। রাস্তায় গাড়ী দাঁড় করিয়ে সুন্দরী সুবেশা সব মহিলা সদস্যারা চাঁদা আদায় করলো যেটা আমি আমি আগে (পরেও) দেখিনি। হৈহৈ করে যাওয়া হলো প্রতিমার অর্ডার দিতে। খুঁটি পুজোও হল ধুমধাম করে।

এবার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। কেউ নাচে , কেউ গায়, নিজেদের ব্যান্ডের গান,নাটক সবই চলছে। সঞ্চালনায় আমি আর অর্পিতা। বাইরের শিল্পীরাও আছেন এক দুজন। ব্যস্ত দিনের শেষে মুম্বাইয়ের ভয়ংকর জ্যাম আর ভিড় ঠেলে বাড়ী ফিরে ও সবাই কিন্তু রিহার্সালে হাজির। রাতের খাবারের ভার স্থানীয় বাঙালী ক্যাটারারের হাতে। তাই প্রাণ খুলে গান। দেখতে দেখতে মহালয়া এসে গেলো। ভোর রাতে আমরা হাজির পুজোর মাঠে।  নির্মীয়মান প্যান্ডেলের নীচে বসে সবাই মিলে মহালয়া শোনা। শেষে গরম চা আর লুচি তরকারি খেয়েই সবার দৌড়ানো নিজের নিজের কাজের জায়গায়।

ষষ্ঠী পুজোর দিন। পুজোর থিম - একঝাঁক মেয়ে ও মহিলাদের সম্মানিত করা হল। পরের দিন থেকে পুজো সরগরম। পুজোর আয়োজন, ভোগ তৈরিতে সুসজ্জিতা মহিলাদের উৎসাহ একটু কম। ম্যানিকিউর করা নখ খারাপ হয়ে যাবে না! কাজেই আমরা মাত্র কয়েকজন ব্যস্ত সেকাজে। বাকি সব কাজ, যেমন ভোগ বিতরণ, গণ্যমান্য অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা, দর্শনার্থীদের লাইন ঠিক করা, সেসব কাজে সবার খুব উত্সাহ। দুপুরে জমিয়ে খাওয়া হল ভোগ। একটু বিশ্রাম নিয়েই আবার সন্ধেবেলায় অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, আরতি। রাতের খাওয়া আশপাশের স্টলে। কোলকাতার ও স্থানীয় খাবারের দোকানে কী নেই। ইলিশ মাছর পাতুরী থেকে পিঠে পুলি পর্যন্ত। দাম আগুনছোঁয়া কিন্তু তার পরোয়া কেই বা করে পুজোর দিনে। পুজাবার্ষিকী আর শাড়ীর স্টলেও ভিড় কম নয়। মাঝে মাঝেই ক্যামেরা কাঁধে হাজির বাংলা টিভি চ্যানেলের লোকজন। আর সবার সে কী আনন্দ। আমরা সবাই তাড়াতাড়ি মেকআপ ঠিক করে নিই। দু চারকথা ক্যামেরার সামনে বলতে হবে তো। কেটে গেলো এভাবেই চারটে দিন। দশমীর সকালে সে কি সিঁদুর খেলার ধুম। পওয়াই লেকে বির্সজন দিতে গিয়ে আর এক প্রস্থ নাচ। দুদিন পরে বিজয়া সম্মেলনীর খাওয়া-দাওয়া। পুজো শেষ, কিন্তু এর রেশ থেকে গেলো অনেকদিন।


তেহরান

দুর্গাপুজো এসে গেলো, আর একদিন বাকি। পুজোর আনন্দ, অনুষ্ঠান, সে যেন অন্য কোন এক জন্মের ঘটনা। মাথার চুল দেখানোর উপায় নেই যে দেশে, সেখানে আবার পুজো। ভারতীয় দুতাবাসের কর্ণধার মিঃ মোহান্তি ও মিসেস মোহান্তি অবশ্য দশমীর দিনে একটা ছোট অনুষ্ঠান রেখেছেন, কিন্তু সে তো পুজোর শেষে।
বিষণ্ণ বসে আছি, হঠাৎ্ মালহোত্রা আন্টির ফোন। মালহোত্রা আঙ্কেল অনেকদিন ধরে এখানে ব্যবসা করেন, প্রাসাদোপম অপুর্ব সুন্দর এক বাড়ীতে ভাড়া থাকেন (কেনার কোন উপায় নেই)। ল্যান্ডলেডি এক বয়স্ক মহিলা, নীনা মীরশাহি একা থাকেন। আমরা আন্টির বাড়ী গিয়ে বাগানে আড্ডা দিলে একটু বিরক্ত হন। আজ আন্টি ফোন করেছেন, নবরাত্রির জন্য। আমাকে চুপিচুপি দুর্গাস্তুতি গাইতে হবে, চুপিচুপি পাঠ করতে হবে দুর্গা সপ্তশতী থেকে। বাড়ীওয়ালী বুড়ি জানলে মুশকিল। হয়তো বা বাড়ীই ছেড়ে দিতে বলবে!

পরের দিন আমরা সাত আটজন মহিলা ভাল শাড়ি যার কাছে যা আছে পরে পৌঁছে গেছি। রাস্তায় কিন্তু তার উপরে লম্বা কোট আর মাথায় স্কার্ফ দিয়েই এসেছি। গিয়ে দেখি সুন্দর আয়োজন। দেবীর ফোটোর সামনে রঙ্গোলি। একটি চওড়া পাত্রে মাটির উপর কিছু শস্যদানা ছড়িয়ে দেওয়া হয়,যার থেকে অঙ্কুর বের হয়। অঙ্কুরিত সেই পাত্রকে দেবীজ্ঞানে (শাকম্ভরী কি না জানিনা) পুজো করা হয়। সেরকম এক পাত্র সামনে রাখা। পাঠ শুরু করতে যাব, কলিং বেলের ঘন্টি। আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি। আন্টি দরজা খুলতেই দেখি ল্যান্ডলেডি, হাতে এক বিশাল ট্রে, লেসের সুন্দর ঢাকনার উপরে ননারকম কুকীজ, ড্রাই ফ্রুটস এবং একটি বিশাল বেকড ফিস। ঘরে ঢুকেই বৃদ্ধা তার অনবদ্য ফারসী মেশানো ভাঙা ইংরেজীতে বললেন - জানতে পারলাম আজ তোমাদের ফেস্টিভ্যাল। এই যে তোমাদের জন্য সামান্য কিছু এনেছি। সবাই মিলে খেও।

নবরাত্রির উপহার মাছ!

আদ্যোপান্ত নিরামিষ খাওয়া মহিলারা আঁতকে উঠলেও আমি বেশ হৃষ্টচিত্তেই ট্রেটি টেবিলে রাখি।
নীনা মীরশাহি জমিয়ে বসেন। বললেন, তোমরা গাও, আমি শুনি। মেয়েরা যা কিছু প্রার্থনা করে সবই তো পরিবারের মঙ্গলের জন্য।

আমি সাহস করে বলি, এই পুজো দেবীমার, এক স্বর্গীয় নারীর। উনি বললেন- ঐ যে শস্যদানা গজিয়েছে তাতো, উর্বরতার প্রতীক। নারীত্বের প্রতীক। আমাদের নওরোজেও এরকম অঙ্কুর ফলানোর রেওয়াজ আছে। তোমরা কী করছো করো, আমি দেখি। আমার তো পরিবারে কেউ নেই। স্বামী মারা গেছেন অসুখে, দুই পুত্র যুদ্ধে। তোমাদের পরিবারের মঙ্গল হোক।

উনি বসে পড়েন। আমাদের শাড়ি গয়না নেড়েচেড়ে দেখেন, প্রশংসা করেন।

এক মুসলিম দেশে, এক মুসলিম ধর্মপ্রাণা বিধুর মাতৃহৃদয়ের সামনে বসে সমস্ত আকুতি দিয়ে পাঠ করতে থাকি -

দেবি প্রপন্নার্তি হরে প্রসীদ
প্রসীদ মাতোর্জগতোহখিলস্য
প্রসীদ বিশ্বেশরী পাহি বিশ্বং
ত্বমীশ্বরী দেবি চরাচরস্য... 


লেখক পরিচিতি : রসায়ন ও শিক্ষণপদ্ধতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর। স্বামীর কর্মসূত্রে বারবার ঠাঁইবদল। স্কুল, কলেজ, বি-এড কলেজ, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে দীর্ঘ সাতাশ বছর ধরে পড়ানো আজও চলছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহনের জন্য শুধু বৌদ্ধিক নয়, মানসিকভাবেও প্রস্তুত করার প্রয়াস ছাত্রছাত্রীদের। সারা পৃথিবী জুড়ে সফল অজস্র ছাত্রছাত্রীদের ভালবাসাই জীবনের মূলধন। পাশাপাশি গান গাওয়া, আঁকাজোকা, অজস্র পড়া আর একটুখানি লেখা।



মুম্বাই, পণ্ডিচেরি....

প্রবাসে দুর্গাপুজোয়

পল্লব চট্টোপাধ্যায়


(১)

আমি ১৯৮৩ সাল থেকেই ছিন্নমূল প্রবাসী। অবশ্য তার আগেও কখনও ঠিক বাংলায় থাকিনি, তবে বিহার (অধুনা ঝাড়খণ্ড) হলেও তাকে ঠিক প্রবাস বলা যায়না। ধানবাদ, বোকারো, রাঁচী, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, আসানসোল ও কালেভদ্রে কলকাতার পূজো দেখেছি জন্ম থেকে, সেগুলোকে সে অর্থে প্রবাসের পুজো বলতে চাই না। ৮৩ সালে চাকুরিসূত্রে মুম্বাই(তখন বোম্বে) এসে পড়লেও ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পুজোয় প্রতিবার বাড়ি ফিরে গেছি, ৮৯তেই প্রথম দেখি বোম্বের পূজা।

তখন বোম্বাই শহরে বাঙ্গালিরা অধিকাংশই ছিলেন খানদানী ও উচ্চশিক্ষিত, কারণ পশ্চিমবঙ্গে তখনও শিল্পোদ্যমে ভাঁটা পড়েনি, বঙ্গের সব ক্ষেত্রের সেরা বাঙ্গালিদের টেনে নিয়ে যেত ভারতের অন্য বড় শহরগুলি। অল্পশিক্ষিতদের মধ্যে ফিল্মের টেকনিসিয়ান লাইনে আর সোনা-চাঁদী-হীরের কারিগরদের বড় কিছু দল ছিল সেখানে। তাদের হাত ধরেই বোম্বাই দুর্গাবাড়ি প্রথম দুর্গোৎসব শুরু করে ১৯৩০ সালে, ঝাবেরি বাজারে, সেখান থেকে ১৯৭১এ তা স্থানান্তরিত হয় কেম্পস কর্ণারের তেজপাল হলে। ১৯৮৯- আমার সেটা বিয়ের বছর, স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি বেঙ্গল ক্লাবের পুজো দেখতে, দাদারের শিবাজী পার্কে। হঠাৎ কানে এল পাশের স্টেজে কেউ যেন মান্না দের নকল করে 'ও আমার মন যমুনার' গানটি গাইছেন। একজনকে শুধোতে তিনি বললেন, মান্না দের মত নয়, দাদা, মান্না দেই গাইছেন। মফঃস্বলে মানুষ, আমি তখনও ভাবতে পারতাম না যে হেমন্ত-কিশোর-লতা-মান্নাদেরও টিকিট না কেটে গাইতে দেখা যায়। আমাদের ছোট শহরেও একবার মান্না দে গেয়ে গেছেন, টিকিটের জন্যে সে কি হুড়োহুড়ি-মারামারি। যাই হোক, সেদিন প্রাণ ভরে মান্না দের সেরা বাংলা গানগুলো শুনেছিলাম।

না, কিশোর-লতা-আশাজীরা বারোয়ারি পুজোয় এভাবে গাইতেন না, তাছাড়া কিশোরজী তখন গত হয়েছেন কয়েক বছর আগে। ১৯৮৪ সালে মুম্বাইয়ের ব্রাবোর্ণ স্টেডিয়ামে কিশোর-লতার শেষ যুগ্ম অনুষ্ঠান হয়েছিল, উচ্চদরের টিকিট থাকা সত্ত্বেও অতবড় স্টেডিয়ামে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ভাল গান শুনতে চাও ত শক্তি সামন্তের পুজোয় ঘুরে এস, এক বন্ধু বললেন। শক্তি সামন্ত-প্রমোদ চক্রবর্তী-বাসু চ্যাটার্জি-শচীন ভৌমিক সবাই মিলে পুজো করে আসছেন বহু বছর ধরে, বম্বের সিনেমা জগতের বাঙালীদের সেটা প্রথম বারোয়ারি প্রয়াস। তার আগে প্রবাদপুরুষ শশধর মুখার্জি ও অশোককুমাররা নিজেদের বিশাল পরিবারকে একত্র করে সান্তাক্রুজে শুরু করেন শারদীয়া পূজা, যা এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন কাজোল, রানী, দেবশ্রী, অমিতকুমার-বাপি লাহিড়ীরা,  এখন শুধু ভেন্যু বদলে হয়েছে বহু বছর ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা জুহুর সাহারা টিউলিপ স্টার হোটেলে।  

আমি কিন্তু এখনও ৮৯তেই পড়ে আছি। বন্ধুর কথা শুনে ট্যাক্সি নিয়ে যখন বান্দ্রার পটবর্ধন পার্কের কাছে নতুন পল্লী সার্বজনীনে পৌঁছলাম তখন অনুষ্ঠানের শেষ গান ধরেছেন তরুন গায়ক শৈলেন্দ্র সিংহ- 'ম্যয় শায়র ত নেহি'। এই ফাঁকে বলে রাখি, প্রবাসের শহরগুলোতে, এমনকি দিল্লি-বোম্বাইয়েও তখনও কেউ দেবী-মূর্তি বা তার ডেকোরেশন, লাইটিং কেমন হল তা নিয়ে অত মাথা ঘামাত না, থীম নামক বস্তুটির কথা ত ছেড়েই দিলাম। সবাই মিলে আড্ডা-সহ খাওয়া ও খাওয়ানো আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- এই দুটোই ছিল প্রধান বিচার্য। তাছাড়া জানতাম- জুহু স্কীমের জগন্ময়-বিশ্বজিতের পুজোতে ওঁদের দুজন গাইবেন। আন্ধেরি ওয়েস্টের প্রগতি সংঘ মানে মুম্বাইয়ের আরেক পুরনো অথচ বেশ ঘরোয়া পুজো, মহিলারাই সেখানে অগ্রণী ভূমিকায়। সান্তাক্রুজ সেন কলোনীর পুজো মানে মুম্বাইয়ের ওয়েস্টার্ণ রেলে যত বাঙালী কর্মী আছেন তাঁদের পুজো, যদিও প্রভাত কলোনী, ভাকোলা, কালিনা, গোলিবার- এই সমস্ত অঞ্চলের প্রায় সব বঙ্গবাসীই থাকেন এ পুজোর সাথে। আমরা দু-দিন ধরে ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। এছাড়া সেবার দেখেছিলাম এয়ারপোর্ট কলোনীর পুজো 'ঐকতান', চেম্বুর, অণুশক্তিনগর, ভাসি, সিবিডি বেলাপুর আর নিউ পানভেলের পুজো। সেই সময় আমি পানভেল ওএনজিসি কলোনিতে থাকতাম বলে আমাদের কোনও পাড়ার পুজোয় ইনভলভমেন্ট ছিল না। তবে প্রায় প্রতি পুজো প্যান্ডালেই পেয়েছি আন্তরিকতা ও আপ্যায়ন।

পরের বছর আমার বদলি হয় কাছাড় জেলার শিলচরে। বাঙ্গালিপ্রধান এলাকা, বাংলার যে কোনও জেলা শহরের সাথেই তুলনীয়, পুজোটাও মনে হয়নি প্রবাসের পুজো বলে। ১৯৯৪ থেকে ৯৯ ছিলাম দক্ষিণের পন্ডিচেরি রাজ্যের কারাইকালে, কাছাকাছি বলতে দুর্গাপূজা হত চেন্নাই-পন্ডিচেরিতে। একবার কলকাতা আসা হয়নি, দুই জায়গার পুজো দেখে এলাম, তবে চেনাশোনা কেউ ছিল না বলে কেউ কোনোরকম অন্তরঙ্গতা বা আন্তরিকতা দেখায়নি সেখানে। থাকতে থাকতে পণ্ডিচেরির বাঙ্গালিসমাজের সাথে কিছুটা চেনা-শোনা হয়ে যায়, তাই ১৯৯৯ সাল থেকে আমাদের কারাইকাল অঞ্চলের বাঙ্গালিদের যোগদান বেড়ে যায়। '৯৯তে আমাদের বাচ্চারা মিলে অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর নাটক 'হীরু ডাকাত' মঞ্চস্থ করে অষ্টমীর সন্ধ্যেয়, সবার বেশ পছন্দ হয় নাটকটি। ২০০০এ বদলী হয়ে আমি ফিরে আসি মুম্বাই।

(২)

মহাকালী পূজা মণ্ডপ, ২০১৫

২০০০ সালে আর মুম্বাইকে চেনা যায় না। পূর্ব আন্ধেরীর যে মহাকালী অঞ্চলে পাহাড়-গুহা-জঙ্গলের মাঝে কেউ থাকতে চাইত না, সে জায়গা এখন জমজমাট। জায়গাটা আমার এত ভাল লেগে গেল যে ২০০১ সালে আমি একটা ফ্ল্যাটই কিনে ফেললাম সেখানে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাঙ্গালীর সাথে আলাপ হয়েছে। একদিন কথাটা পাড়লাম কয়েকজনের মধ্যে। কাছাকাছি পুজো পাঁচ কিলোমিটার দূরের ঐকতান বা ছয় কিলোমিটারে প্রগতি। মহাকালী অঞ্চলে এত বাঙালী, এখানে একটা দুর্গাপুজো নামানো যায় না! ব্যাপারটা নিয়ে ইতিমধ্যে ভাবতে শুরু করেছেন অঞ্জন চ্যাটার্জী, তপন দাশগুপ্ত, মলয় চক্রবর্তী, হাজরা মাসিমা, ডাঃ মণিদীপা রায়, শ্রীকান্ত পাড়ুই প্রমুখ স্থানীয় বিশিষ্ট বাঙালিরা। সে বছরই পত্তন হল 'মহাকালী সার্বজনীন দুর্গোৎসব সেবা সমিতি' বা MSDSSএর। ইতিমধ্যে ১৯৯৬ সালে শুরু হয়েছে লোখণ্ডওয়ালা বা অভিজিতের পুজো- বিশাল জাঁকজমকের সাথে। গোরেগাঁও ওয়েস্টে কল্লোল কালীবাড়িতে শুরু হয়েছে শুদ্ধাচারে পুজো। এছাড়া কান্দিবলি, মালাড, ভায়েন্দরের বঙ্গসঙ্ঘ, গোরেগাঁওএর গোকুলধামে অল উইমেন্‌স্‌ পুজো- দেখি বৃহত্তর মুম্বাই সব মিলিয়ে পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে। যদি বা কিছু কম ছিল, পরের বছর, মানে ২০০২ তে শুরু হল পাওয়াই হীরানন্দানির 'এলিট' পুজো, আর চার বছর আগে সেটা ভেঙে হল দুটো। অনুরূপ ঘটনা ঘটল থানে, ভাসি, কান্দিবলির ঠাকুর ভিলেজ সর্বত্র- জানি না তা ভাল হয়েছে না মন্দ। তবে আমার আনন্দ বাড়ির কাছেই নিজেদের পুজো শুরু করতে পেরে।

ধুনুচি নাচের দৃশ্য, মহাকালী, মুম্বাই

এখন আমাদের শারদোৎসব শুরু হয় মহালয়ার ভোর থেকে শারদপ্রভাতের পুণ্য শঙ্খধ্বনির সাথে পুজো-প্যান্ডালে সভ্য-সভ্যারা একত্রিত হয়ে রেডিওতে 'মহিষাসুরমর্দিনী' শুনে। সাথে আনুষঙ্গিক থাকে চা-সিঙ্গাড়া-জিলিপি গরমাগরম। চতুর্থীর সকালে হয় সত্যনারায়ণ পূজা, সেদিনই দেবীমূর্তি এনে স্থাপন করা হয় পূজামণ্ডপে। পঞ্চমীতে আনন্দমেলা- সদস্যরা কিছু মুখরোচক রান্না করে নিয়ে আসে, তা বিক্রী করা হয়, লাভ নয়, নিছক আনন্দের জন্যে। মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী পুজো হয় যথারীতি। বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা হয় দেখবার মত, তারপর প্রতিমা বিসর্জিত হয় জুহুর সমুদ্রে। ফিরে আসার পর শান্তিজল, বন্ধুদের মধ্যে কোলাকুলি, তারপর শেষপাতে থাকে সবার জন্যে মিষ্টি।

আনন্দমেলা, চতুর্থীর সন্ধ্যে, মহাকালী সমিতি, আন্ধেরি, মুম্বাই

আমাদের এখনও 'থীম' বস্তুটি ঠিক হৃদয়ঙ্গম না হলেও একটা না একটা বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে থাকে প্রায় সব পুজোর সাথে। স্টার দেখতে চাও- চলে যাও অভিজিতের লোখণ্ডওয়ালায় (এবার নাকি হচ্ছে না পুজোটা- প্রায় ৩ কোটি টাকার পুজো, এবার মেজর স্পনসর নেই), নাহয় শশধর মুখার্জিদের, নয় জুহু বিশ্বজিতের পুজোয়। গান শুনতে হলে, বান্দ্রা শক্তি সামন্তের বা অভিজিতের বা সেন কলোনী। এমনি নামকরা স্থাপত্যের নিদর্শন দেখা যাবে পাওয়াই বা চেম্বুরের পুজোয়, শুদ্ধ সাত্বিক মতে পুজো দেখতে হলে কল্লোল কালীবাড়ি বা খার রামকৃষ্ণ মিশন। আরে বাবা রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গাপূজোতে একটা দিন অন্ততঃ না কাটালে, সেখানে লাইন দিয়ে অমৃতসমান ডোঙ্গাভর্তি খিচুড়ি ভোগ না দেখলে আর মুম্বাইয়ের পুজো দেখলেন কি? আর আমাদের মহাকালী অঞ্চলের পুজোর বৈশিষ্ট্য? 'আনন্দ পাবলিশার্স' আর 'উদ্বোধন প্রকাশনী’ থেকে বইপত্র এনে একটা স্টল খুলে বসি শুধুমাত্র আড্ডার খাতিরে, হ্যাঁ, পুরোটাই কমিটির খরচায়, লভ্যাংশও পুজোর খাতাতেই যায়। এছাড়া বাঙ্গালি-রসনার তৃপ্তির জন্যে স্পনসর্ড ফুড-স্টল ত থাকবেই, কলকাতা-মুম্বাই থেকে নামী-দামী লোকেরা এসে নেচে-গেয়েও যান। এছাড়া আর কিছু না, কিচ্ছু না, নো পম্প অ্যান্ড শো- শুধু জীবে প্রেম আর জিভে প্রেম। নিজে খাও আর গরীব-বড়লোক-ভিখারি-মধ্যবিত্ত-নির্বিশেষে নির্বিচারে তিনদিন ধরে পেট পুরে খাইয়ে যাও। আমরা স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের একটি কুকুরকেও অভুক্ত রাখতে চাইনা পুজোর এই তিনটে দিন!

মহাকালী সমিতি পুজোর ফুড স্টল

ঠাট্টা নয়, আলোক-সজ্জা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে খরচ করতে চাইলে কোটি টাকাও কম, অথচ মুম্বাইয়ের মত মহানগরের কেন্দ্রস্থলেই আমরা দেখতে পাই প্রতি বছর ২০% থেকে ২৫% ছাত্র বেসরকারি স্কুলগুলি ছেড়ে কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ছে, দরিদ্র বাবা-মা পড়ার খরচ জোগাতে পারছেন না। এদিকে আমরা ত সুখে আছি, আমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল-কলেজে পড়ছে, মেধা কম থাকলেও কোচিং বা ডোনেশনের দৌলতে তারা ভাল ভাল ওপেনিং পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু 'যারে তুমি পিছে রাখ সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে'- সবাইকে একসাথে টেনে নিয়ে না চললে সত্যি কি এগোন যায়, তাকে কি চলা বলে? তাই আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার উদ্দেশ্যপূরণের জন্যে এই দুর্গোৎসব সমিতির শক্ত ভিতের উপর আমরা একদিন শুরু করলাম 'শিক্ষা কি আশা', আশেপাশের আন-এইডেড স্কুলগুলিতে ড্রপ-আউট যাতে না হয়, মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যেন শেষ পর্যন্ত তাদের যোগ্যতানুযায়ী পড়ার সুযোগ পায় এবং বিশেষ করে, কোনও ছাত্রীকে যেন দারিদ্র্য বা অন্য কারণে পড়া না ছাড়তে হয় মাঝপথে। আমাদের এই কার্যক্রম ২০০৯ থেকে শুরু হয়েছিল দুটি বিদ্যালয়ের দশটি ছাত্রকে অনুদান দিয়ে, এখন তার পরিধি প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য ও সহৃদয় বন্ধুদের একান্ত সহযোগিতায়। জানি এসবের সাথে আমার প্রবাসে পূজা দেখার অভিজ্ঞতার কোনও সম্বন্ধ নেই, তবে মুম্বাই যে শুধুমাত্র 'বানিয়া' দের শহর নয়, এর একটা হৃদয় আছে জানতে পারি যখন আমাদের সাহায্য পেয়ে পরীক্ষায় সফল কোনও ছাত্রীর বাবা বা সেই স্কুলের হেডমাস্টার এসে ধন্যবাদ জানিয়ে যায়। প্রত্ত্যুত্তরে তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে বলি মা আনন্দময়ীকে, যাঁর আগমনে আনন্দে দেশ ছেয়ে গেছে। তাঁর পুজো ত তখনই সার্থক হবে যখন কোনও কাঙালির মেয়ে শুধুমাত্র মুষ্টিভিক্ষার জন্যে ধনীর দুয়ারে এসে আর দাঁড়াবে না।        

(শেষ)

লেখক পরিচিতি : জন্ম ও বেড়ে ওঠা বিহার (অধুনা ঝাড়খন্ডের) ধানবাদ কয়লাখনি ও শিল্পাঞ্চলে, সেখানে 'নানা জাতি, নানা মত, নানা পরিধান' হলেও বাংলা ও বাঙালিদের প্রাধান্য ছিল একসময়। ১৯৮২ সালে রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং পাস করে পেট্রোলিয়াম লাইনে চাকুরী, বর্তমানে কুয়েত অয়েল কোম্পানিতে কর্মরত। শখ-গান-বাজনা আর একটু-আধটু বাংলাতে লেখালেখি। কিছু লেখা ওয়েব ম্যাগাজিনে (ইচ্ছামতী, আদরের নৌকো ও অবসর) প্রকাশিত ।



রাঁচি

দুর্গাপুজোর স্মৃতি

শশাঙ্কশেখর লাহিড়ী

আমার ঠাকুরদার নাম ছিল দুর্গানাথ লাহিড়ী। তাই ঠাকুমাকে কখনো দুর্গাপুজো বলতে শুনিনি আমরা! উনি বলতেন ভগবতী পুজো। যেহেতু আমার ঠাকুরদার নাম ছিল দুর্গানাথ তাই মায়েরাও সচারচর দুর্গাপুজো কথাটা মুখ দিয়ে বের করতেন না! তাই আমাদের কাছে দুর্গাপুজো মানে ভগবতী পুজো!

বাণীমন্দির ক্লাব

চাকুরী সূত্রে বাবা প্রবাসে এসে কয়লা খনিতে কাজ নিয়েছিলেন! তবে জায়গাটা বাংলা-বিহারের সীমান্তবর্তী হওয়ায় প্রচুর বাঙালি থাকতো। আশেপাশের কলকারখানা ও খনিতে প্রচুর বাঙালি কাজ করতো। বার্ড কোম্পানির বাবুদের আবাসনে একটা ক্লাব ছিল। নাম ছিল বাণী মন্দির ক্লাব। সেই ক্লাবের সামনেই ছিল মন্দির। সাবেকি আটচালার দুর্গাপুজো দিয়ে শুরু হতো। ঠিক তার পরেই লক্ষী পুজো। তারপর কালী পুজো। আষাঢ়ে বিপদতারিনীর ব্রত পুজো দিয়ে শেষ।

১৯৭৫ সালে পাড়ার কিছু দাদারা শুরু করলো একটা বারোয়ারি পুজো। বড় রাস্তার ধারে প্যান্ডেল করে পুজো হতো। বারোয়ারি পুজোর কাছেই আমরা থাকতাম বলে ওটা ছিল আমাদের নিজস্ব পুজো। মায়েরা অবশ্য পুরোনো মন্দিরেই পুজো দিতে যেত। বর্ষার শেষে কোন এক দিনে ঠাকুর যিনি গড়তেন তিনি এসে খড় দিয়ে ঠাকুরের কাঠামো বানিয়ে এক মাটি করে চলে যেতেন। খবরটা কানে কানে পৌঁছেই যেত আমাদের কাছে। স্কুল ফাঁকি দিয়ে এক ঝলক দেখে আসতাম। বাড়ি ফিরেই মা'কে খবর দিতাম যে ঠাকুর তৈরী হচ্ছে। বন্ধুদের জামাকাপড় কি কি হচ্ছে জানার একটা কৌতূহল থাকতো। তবে অপশন খুব একটা ছিল না। একেবারে বাঁধা দিন মানে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে বাবা সবাইকে নিয়ে বাজারে যেতেন। দোকান ঘুরে ঘুরে কেনা কাটার চল তখন ছিল না। বাঁধা দোকান আর সেই দোকানেই যা পাওয়া যায় তাই কিনতে হবে। বেশ বড় হওয়া অব্দি হাফ প্যান্টই পরতাম। ক্লাস এইট এ প্রথম ফুল প্যান্ট পরা। প্যান্টের নীচে চেন লাগানোর বায়না দর্জির কাছে। গ্যাভাডিং কাপড়ের প্যান্ট। মায়ের কাছে আবদার করে করে আদায় করতাম। একটা প্যান্ট আর একটা জামা হতো। জেঠু ও কাকারাও পুজোতে আমাদের ভাইবোনদের নুতন জামাকাপড় দিত। তাতেই কী আনন্দ।

পাড়ার বারোয়ারি পুজো

উত্তরবঙ্গে বর্ষাকালে খুব বৃষ্টি হতো বলে ঠাকুমা কয়েকমাস আমাদের কাছে থাকতেন। ঠাকুমা থাকা মানে পুজোর চারদিন ২৫ পয়সা করে পাওয়া। দশমীর দিন ঠাকুমাকে হাত ধরে মন্দিরে নিয়ে গেলে বাড়তি ২৫ পয়সা। ১৯৭৮ সালে পুজোর চারদিন অঝোরে বৃষ্টি। পুজো হবে কিনা সন্দেহ সবার মনে। যাই হোক শেষ পর্যন্ত পুজো হলো। মাস খানেক ধরে আলো ছিল না। বেঙ্গলে ভয়াভয় বন্যা হওয়াতে জিনিসপত্রের ভীষণ আকাল। পুজোর চারদিন রাতে হ্যাজাক জ্বালিয়ে কোনক্রমে পার হলো। মহালয়ের আগের দিন বাবা ফিলিপ্স কোম্পানির একটা ব্যাটারি চালিত ফিলিটা ট্রান্সিস্টার কিনে আনলেন। ব্যাটারি পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই মিলে ভোর রাতে মহালয়া শুনলাম। মহালয়া আসলেই পড়াশুনো বন্ধ। ছোট বেলায় মহালয়ার সকালে বাবা বাড়ির বাইরে যেতে দিতেন না। মহালয়া শুনতে শুনতেই আবার ঘুমিয়ে যেতাম। বাইরে পটকার আওয়াজ কানে আসতো। যত্ন করে রেখে দেওয়া পটকা সকালে উঠে ফাটাতাম। মাধ্যমিক দেওয়ার পর আর নিষেধ মানিনি। দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলাম।

ছোট বেলায় আমরা মানে ভাই বোনেরা যার কোলে চড়ে পাড়া ঘুরে বেড়িয়েছি সেই বিনু ঠিক প্রতিবছর পুজোর আগে হাজির হতো আমাদের বাড়িতে। একটা কাপড় আর কিছু টাকা মা বিনুকে দিত। বিনু আসতে দেরি করলেই মা খোঁজ খবর করা শুরু করে দিত। বিনু আসছে না কেন? প্যাঞ্চেত পাহাড়ের কোলে এক গ্রামে নাকি বিনু থাকতো। জানিনা আমাদের সবার বিনু এখন কোথায় আছে ও কেমন আছে। একটা সময় বিনুর কোলেই ঘুমোতাম আমরা। তাই পুজো আসলেই বিনুর কথা খুব মনে পড়ে।

বাঁকুড়ার কোন এক গণ্ডগ্রাম থেকে ঢাকি তার দুই ছেলেকে নিয়ে ঠিক ষষ্ঠীর সকালে পৌঁছে যেত। এসেই সোজা সবার বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেখা করা। শাঁখারি ঠিক পুজোর আগে এসে মাকে শাঁখা ও পলা পরিয়ে যেতেন। এতো এক সর্বজনীন পুজো। বাবাকে দেখতাম সবাইকে বকশিস দিচ্ছেন। সামান্য কিছু টাকা তবুও দিতে হবে এই সময়। পুজোপার্বনে সবাই আনন্দ করবে এই আর কী। 

এক সময় বাবা ও মা চলে গেলেন কৈলাসে। বাবা মারা যাওয়ার পরের পুজোয় ঢাকি এসে আমার মাকে দেখে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মা.. বাবু চলে গেছেন! আর সে আসে না আমাদের বাড়িতে। শাঁখারি এসে হাঁক দেয় দরজায়। মা’কে দেখে সেও চলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার ছোট বেলার জায়গা ছেড়ে চলে আসি। মনে হয় চৌকাঠে সিঁদুর দিয়ে লেখা মায়ের হাতের “শ্রী শ্রী দুর্গা মাতা সহায়” আজও আছে সেই রকমই।
ভাবি এবার মায়ের সাথে আমার মাও আসবে। মহালয়ার সকালে নাকি পুর্বপুরুষেরা সবাই এই ধরাধামে আসেন জল নিতে। সরলমনে জল দিই আমি তাদের। আমি তো ওঁদের দেখতে পাইনা তবে অনুভব করি ওনারা আমায় ঠিক দেখছেন। এই চারটে দিন মনে হয় মা আমার আছেন আমাদের কাছেই।         

লেখক পরিচিতি : শৈশব কেটেছে তৎকালীন বাংলা-বিহার সীমান্তবর্তী খনি অঞ্চলে। বাংলা মিডল স্কুলে হাতেখড়ি। হিন্দি আগ্রাসনে স্কুল ছেড়ে বাংলায়। ১৯৮১ সালে ক্লাস ফাইভ থেকে রামহরিপুর রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেলে। ১৯৮৯ এ উচ্চ মাধ্যমিক-এর পর মাইনিং-এর শাখায় পড়া ও কাজ। খনিতে কাজ। পালামৌ জঙ্গলের খনি ঘুরে এখন রাঁচিতে বছর পাঁচেক সেন্ট্রাল কোলফিল্ডস লিমিটেড কোম্পানির মুখ্যালয়ে থিতু। 





মুম্বাই

মুম্বাই পুজোর ভালোমন্দ

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

লোখাণ্ডবালার পুজো মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে গিয়ে মেয়ে খুব এক্সাইটেড, মাকে হাত টেনে দেখাচ্ছে জনপ্রিয় হিন্দী সিরিয়ালের কোনো বঙ্গ-ললনা অভিনেত্রীকে। সে বেচারিও বোধ হয় রাতের শিফটের প্যাকআপের পর ফুরসৎ পেয়েছে ঠাকুর দেখতে বেরোনোর। রাত জেগে, গাড়ি ভাড়া করে মণ্ডপে মণ্ডপে পরিক্রমা চলছে আমাদের। দিনেরবেলা যানজটে শহরে ঘোরার উপায় নেই। নভি মুম্বাই থেকে বেরিয়ে পাওয়াইয়ের প্রতিমা দর্শন করে রাতের খাওয়া সারা হয়েছে মণ্ডপের দুধারে সারি দেওয়া খাওয়ারস্টলে। চিংড়ির মালাইকারী, কষা মাংস, চিকেন বিরিয়ানী দিয়ে বাঙ্গালীর হ্যাংলা রসনা পরিতৃপ্ত করে সোজা লোখাণ্ডবালায় অভিজিতের পুজো। এখান থেকে বেরিয়ে যাববান্দ্রায় শক্তি সামন্তর পুজোয়। অনেক দিনের পুরনো পুজো, চালু করেছিলেন প্রবাদপ্রতিম প্রযোজক পরিচালক নিজে। এর পরের স্টপ মুখার্জী বাড়ির পুজো। মেয়ের খবর - চলচিত্রাভিনেত্রী বোনেরা এবং তাদের বান্ধবীরা প্রতি বছর নিয়ম করে এখানে পুজো দিতে, ভোগ খেতে আসে। এত রাতে উঁকিঝুঁকি দিয়ে কাউকে খুঁজে না পেয়ে মেয়ে নিরাশহল। মাঝরাত পার হয়ে গেছে। ফিরতি পথে শিবাজী পার্ক ঘুরে, চেম্বুরের পুজোয় পৌঁছোতে পৌঁছোতে ভোর হয়ে আসবে।

মুম্বাইয়ে কেটে গেল প্রায় তিরিশ বছর। যখন এসেছিলাম তখন এই শহরের নাম ছিল বম্বে। থাকতাম মূল শহরের চহলবহলের উপান্তে সিডকোর একটা নোডে। পশ্চিমঘাটপাহাড়ের কোলে, গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকা গঞ্জ শহর বেলাপুর। হাইওয়ে পার হয়ে ম্যানগ্রোভ, সমুদ্র। জায়গাটার তখনও রূপান্তর হচ্ছে। পাহাড় কেটে কংক্রিটেরবহুতল তৈরি হচ্ছে। তাদের কাছ বরাবর পৌঁছোনোর জন্য পিচের সড়ক। সেক্টর পাঁচের রাস্তায় সব্জির বাজার বসত। সবেধন নীলমণি এক মৌসি উইকেণ্ডের বাজারে মিষ্টিজলের মাছের পশরা সাজিয়ে বসত। মাছ কিনতে এসে বাঙালি বাবুরা তাকে সঠিক পদ্ধতিতে মাছ কাটার উপদেশ দিতেন,

“আরে মৌসি থ্যাঁত্লাকে থ্যাঁত্লাকে কিঁও কাট্ রহেহো? পিত্তি গলা দেগা ক্যা?”

রাস্তাঘাটে বাংলা কথা শুনে বাঙালি উপযাচক হয়ে এসে আলাপ করত। বাড়িতে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করত। পাহাড়ের নীচে খোলা মাঠে, প্যাণ্ডেল বেঁধে দুর্গা পুজো হত।চারদিন মোচ্ছব, পাত পেড়ে পরিবেশন করে খিচুড়ি ভোগ খাওয়া। বৌদিদের ঘরে ওই চারদিন হাঁড়ি চড়ত না। রাত্রে স্টলে মোঘলাই পরোটা, ফিস্ ফ্রাই, মোচার চপ। সন্ধে লাগতে না লাগতেই মণ্ডপের লাগোয়া স্টেজে বাচ্চাদের আবৃত্তি, লোকাল শিল্পীদের গান। রাত বাড়তে পুজোর প্রোগামের মূল আকর্ষণ - নাটক। মাস খানেক ধরে তার রিহার্সাল চলেছে। পালা করে কারো না কারো ঘরে। যার ঘরে যেদিন রিহার্সাল রাবণের গুষ্টির খানপানের দায়িত্ব তার। বিসর্জনের রাত্তিরে প্রোজেক্টর ভাড়াকরে, সাদা চাদর টাঙিয়ে বাংলা সাদা কালো সিনেমার স্ক্রীনিং হত। একটা বাংলা সিনেমা দেখার জন্য তখন আমরা হাপিত্যেশ করে বসে থাকতুম। মনে আছে ‘বাক্স বদল’ দেখেছিলুম অমনই এক ঘুম ঝিম ঝিম রাতে।

অক্টোবরে মুম্বাইতে দ্বিতীয় গ্রীষ্ম আসে। পুজোর চারদিন ভোগ খাওয়া এখনও হয়, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে এক হাতে থার্মোকলের থালায় ভোগ ব্যালান্স করে চেয়ার আর ফ্যানখুঁজে পেতে মাথার ঘাম পায়ে পড়ে। দুর্গাপুজোর সঙ্গেই চলে নবরাত্রির উৎসব। কম বয়সী ছেলে মেয়েরা জমকালো পোষাক পরে ডাণ্ডিয়া খেলতে মাঠে নেমে পড়ে। নাচের তালে তাদের সুঠাম শরীর ঘিরে লাঠি ঘোরে। মধ্যরাতে ডাণ্ডিয়ার গত্‌বাঁধা বোল ছাপিয়ে বেজে ওঠে সন্ধি পুজোর ঢাক। ধুনুচি নাচের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন প্যাণ্ডেলে শাঁখে ফুঁপড়ে। কোন গৃহিণী কতক্ষণ একটানা শাঁখ বাজাতে পারেন তার প্রতিযোগিতা। আমি প্যাণ্ডেলের পাশে বাংলা বইয়ের স্টলে গিয়ে দাঁড়াই। চারটি ছেলে কলকাতা থেকে গাঁট্ রি বেঁধে বই নিয়ে এসেছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম ভালই বিক্রিবাটা হয়েছে চারদিন। আমার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের বইয়ের সব র্যা ক উপচে পড়ছে। নেব না নেব না করেও দুটো বই নেওয়া হয়ে গেল। বউয়ের কাছে নির্ঘাত বকুনি খেতে হবে। বাঁচানোর জন্য মেয়েটাও নেই। এবারের পুজোয় সে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশছাড়া। অন্যান্য বার নতুন পোষাকে প্রজাপতির মতন উড়ে উড়ে বেড়ায়।

বউ এসে বলল, “চল, অন্য পুজোটায় ঘুরে আসি।”

এই এক বিপত্তি। সংখ্যা বাড়লেই বাঙালির যূথবদ্ধতা ভেঙ্গে যায়। গজিয়ে ওঠে নতুন কালীবাড়ি, নতুন দুর্গা পুজোর মণ্ডপ। আপাতত মুম্বাইতে পুজোর সংখ্যা নেহাত কম নয়। কলকাতা থেকে আশা শিল্পীরা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়ান। সপ্তমীর দিনভাসিতে তো অষ্টমীর দিন চেম্বুরে, নবমীর দিন শিবাজী পার্ক। সন্ধেবেলা সেজেগুজে জামদানী, বোমকাই, কাঁথাস্টিচ, বালুচরীরা প্যাণ্ডেলে জমায়েত,

“কতদিন পরে দেখা। আয়, এখানে বস পাশে। শাড়ির আঁচলটাতো ভারি সুন্দর। কোথা থেকে কিনলি? নাল্লী না ভারত ক্ষেত্র?”

“না গো, একটা বাঙালি ছেলে দিয়ে যায় ঘরে।”

ইতোমধ্যে ব্যান্ডের গান শুরু হয়ে গেছে। সেদিকে কারো মন নেই। জমজমাটি আড্ডা শুরু হয়ে গেছে। গড়াবে সেই মাঝরাত পর্যন্ত। উৎসবের কোলাহল কমে আসবে। প্যান্ডেল-চত্বর ফাঁকা হয়ে যাবে। মাঠের মধ্যে চেয়ার টেনে আড্ডা চলবে। কল্যাণ বা ডোম্বিভিলি থেকে বাস ভরে একঝাঁক বাঙালি এসেছে প্রতিমা দর্শনে। তারা বাস থেকে নেমে শ্লথ পায়ে হেঁটে আসছে। চোখে রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি কিন্তু কন্ঠে উৎসাহের কল্লোল। এক অশীতিপর বৃদ্ধাকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে এক উনিশ কুড়ির তরুণী, সম্ভবত নাতনি। সম্পর্কের এমন মায়াজাল দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।

পুজো তো আদতে সম্পর্কের চিরন্তন উৎসব। বৎসরান্তে উমা চারদিনের জন্য বাপের বাড়ি আসছেন। ঘরে সবাই আনন্দে আটখানা। চারদিন হুল্লোড় যাপন করে নবমীর নিশি পোহালে সিঁদুর খেলা। মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে চোখের জলে তাঁকে বিদায় জানানো।

“আসছে বছর আবার এসো মা।”

ঠোঁটে সন্দেশ ছোঁয়াতে হবে। প্রতিমার মুখের নাগাল পাওয়ার জন্য ভারা বেঁধে সিঁড়ি লাগানো হয়েছে। মা মাসীদের বেতো হাঁটু মড়মড়। তাতে কী যায় আসে? আমাদের প্রতিমা তোদের প্রতিমার থেকে উঁচু। কলকাতার থিম পুজোর ছোঁয়াচ এখানেও। প্যান্ডেলে প্যাগোডা, এবারের প্রতিমা থাই দেবীমূর্তির আদলে। কোথায় সেই পানপাতা মুখে ক্রোধ ও করুণা মেশানো বড় বড় টানা টানা চোখ? কোথায় সেই ভালবাসার পুজো? পণ্যসংস্কৃতি অধিকার করে নিচ্ছে আমাদের সর্বস্ব। এমনকী পুজোও।


লেখক পরিচিতি : মুম্বাইতে প্রায় তিরিশ বছরের প্রবাস জীবন। পেশা বিজ্ঞান গবেষণা। নির্ভেজাল সংসারী। যৎসামান্য অবসরে পেশার বাইরের পড়াশুনো, লেখালেখি। অধিকাংশই আন্তর্জালে, লিটল ম্যাগে। কোনোমতে বাংলা সাহিত্যর মূল স্রোতের জল ছুঁয়ে থাকার চেষ্টা।

 





ব্যাঙ্গালোর

শিউলিফুলের গন্ধ

ঈশানী রায়চৌধুরী

 

(এই গল্প বছর তিন চার আগের। তবে ছবি একই। প্রবাসের পুজোর ছবির রদবদল হয় না তেমন। )

পুরোনো পেন্সিল স্কেচ দিয়েই শুরু করা যাক। দেবীপক্ষ শুরু হল। মহালয়া। আমার সত্যি আক্কেল হল না। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকল, এখনও ঠিকঠাক সময়ের কাজ সময়ে করে উঠতে পারলাম না। মহালয়ার ভোরে মহালয়া শুনিনি। অথচ কত পাঁয়তারা কষেছি...না:, এইবার ঠিক উঠে পড়ব ঘুম থেকে। এই তো অ্যালার্ম দিলাম, উঠে মুখ হাত ধুয়ে পায়ের ওপর হালকা চাদর বিছিয়ে এক পেয়ালা গরম চা আর বীরেন ভদ্র। সঙ্গে সুরেলা সুপ্রীতি। পাড়া কাঁপিয়ে রেডিও বেজেছে ছোটবেলায়। তারপর টিভির আমল। বাড়িশুদ্ধু লোক গুছিয়ে বসেছে। আমি সেই কানে বালিশ চাপা, চোখ টিপে বন্ধ। "উঠছি রে বাবা উঠছি..এক্ষুণি। এই ধরুক একবার... জাগো দশপ্রহরণধারিণী..." 
জানলার বাইরে দিয়ে চুঁইয়ে আসে হিমেল তরল অন্ধকার... আমার দু'চোখে রাজ্যের ঘুম। কী মহালয়া, কী পরীক্ষা! অথচ অ্যালার্ম দিতে হয় না, ডাকতে হয় না, বকুনি খাই না..পরীক্ষার পরের দিন থেকে ঘুম ভেঙে যায় ঠিক ব্রাহ্মমুহূর্তে। ষষ্ঠীর ভোরে ঢাকে প্রথম কাঠি পড়ার আগেই শিউলির খুব আবছা গন্ধ আমার গায়ে দিব্যি জড়িয়ে যায়। তড়িঘড়ি উঠে পড়ে দৌড়ে আসি বাইরে। ঘন নীল রাতটি পোশাক পালটে গোলাপী আঁচল জড়ায়। সাত তাড়াতাড়ি আমি চায়ের টেবিলে। হরিণ পায়ে মণ্ডপে। কই, কাউকেই তাগাদা দিতে হয় না তো! 
কারণ জানি, মহালয়া মানে এখনও পুজো শেষ হতে দশ দশটা দিন। ঢের দেরী। একটু শুয়ে বসে আলিস্যি করে নিই। পুজো তো আসছে, পুজো তো থাকবে... সময় অনেক। আর ষষ্ঠী...ঘুম নেই, ঘুম নেই। ঘুমোলেই সময় কমে যাবে। আবার একটা বছর! মহালয়া মানে পুজোর ধ্বনি। আর ষষ্ঠী মানে পুজোর আলো। প্রতিমার মুখ। ঘামতেলে, স্নেহে আর আসন্ন বিসর্জনের বিষণ্নতায় সে এক অন্য প্রসাধন। সেই মুখ থেকে স্বপ্নে বা জাগরণে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না! 
তাই আমার আর মহালয়ার দেবীবন্দনা, স্তোত্রপাঠ শোনা হয় না। শুধু একটি গান যখন.....আমার ঘুমে ভেজা চোখের পাতা আপনিই খুলে যায়.. যখন আকাশ বাতাস জুড়ে আলোর বেণু বেজে ওঠে... শুধু ওই সময়টুকুই।

কিন্তু এখন ? এখানে ? ব্যাঙ্গালোরে ? এই পরবাসে ? শিউলির গন্ধ খুঁজে ফেরা শুধুই স্বপ্নে। এখানে অন্যরকম ছবি। এঁকে ফেলি ? রঙিন পেন্সিলে ...

ষষ্ঠীর গল্প
=======

ছাই বিচ্ছিরি তেঁতুলের দেশ! তেমনি বিদিকিচ্ছিরি জায়গায় আমার বাড়ি। সকাল থেকে হাওয়ায় পুজোর গন্ধ নেই! পাশের ফ্ল্যাটের সম্বর রসমের গন্ধে ম ' ম। ঢাকের বাদ্যি, কাঁসর ঘন্টা..শেষ পর্যন্ত এস টি ডি করে শুনলাম। মাকে বললাম, "কোনো কথাটি নয়। এখন ঢাক শুনব।" 
আমার প্রজেক্টের কাজ বাড়ি থেকে করছি। প্রফেসরকে ফোন করতেই বললেন, "ওই শোনো, ঢাক বাজছে।" শুনেই বলেছি,"তাহলে এই পাঁচদিন আমিও একপাতাও ইলেকট্রনিক্স-এর কচকচি লিখব না। দুগ্গা ঠাকুর পাপ দেবেন।" 
ছুটি পেয়েছি। কী মজা!

এখানে এমনিতে অফিস খোলা। ফলে বাড়ির মালিক অফিসে। আরও আনন্দ। বলেছি, "আমার ষষ্ঠী। আজ লাঞ্চ অফিসেই কিনে খেও।" 
ব্যস, অফিস চলে গেল। আমিও খুচখাচ কাজকম্ম সেরে গপ্পের বই নিয়ে বসেছি। দুপুরে খাইনি। পুজোর কলকাতার জন্য মনকেমনে। আকাশ আর নীলের জন্যেও। অবশ্য এই মনখারাপের বাই সারা বাড়িতে আমার একার। বাকি তিনজনের তেমন হেলদোল নেই। বিকেলে দেখি তিনি অফিস থেকে এলেন সন্ধে সাতটায়। আমি বললাম, "শারজাপুর -এর দুগ্গাঠাকুর দেখব।" খুব অবাক হয়ে বলল, "সে তো ঢের দূর। এই ট্র্যাফিকে যেতেই একঘন্টার ওপর।" 
বললাম, "যাব। শুধু তাই নয়, ওখানেই তুমি রাতের খাওয়াও খাবে। কারণ আজ আমার ইচ্ছে করেনি, রাঁধিনি।" 
জানি, খুব সাতপাঁচ ভাবছে, কেন শারজাপুর। কারণ ওখানে পুজো পাঁচ বছরের পুরোনো। যাই না কখনোই। আমিও কারণ বলিনি।

একে ওকে জিজ্ঞেস করে পৌঁছলাম প্রায় সাড়ে আটটায়। খুব শাসিয়েছিল, "পার্কিং না পেলে কিন্তু অ্যাবাউট টার্ন।" 
দুর্গতিনাশিনী দুগ্গামাঈকী জয়! পার্কিং মিলে গেল।

কী বলব, মণ্ডপে ঢুকে চোখ জুড়িয়ে গেল আমার। এই প্রথম দেখি মা আর মায়ের দুই কন্যে সাদাসিদে লালপেড়ে তাঁতের শাড়িতে! দুই পুত্তুর আটপৌরে তাঁতের ধুতিতে। জরি পুঁতি বেনারসীর ঠাটবাট নেই! এক্কেবারে ছিমছাম আটপৌরে।

আমার আসলে কিছু অন্য ধান্দাও ছিল। কলকাতা থেকে দে'জ পাবলিশিং জানিয়েছিল..আসছে ওখানে। আমার জন্য বই ছিল। ওটা নিতে হবে তো! ও মা, তারপর দেখি, ঝর্ণা ঘি, গণেশ মার্কা ছোলার ছাতু, ষোলো আনার পাঁচরকমের চানাচুর...বিক্রি হচ্ছে। হামলে পড়ে কিনলাম।

খাবার স্টল অনেক। আমার তো ওসব আমিষ চলবে না। কল্লোল দেখলাম আমাকে একটা পেপসির বোতল ধরিয়ে হাওয়া। খানিক বাদে এসে বলল, "খাসা খেলাম। চিংড়ির চপ, ফিস ফ্রাই, মোগলাই পরোটা।" 
আমি বললাম, "ইস, কিনে নিলে হত। কাল সকালে খেতাম।" 
তখন বলে কিনা, "কাল সকালে তো তুমি রান্না করবে। রোজ রোজ আর ফাঁকি দেয় না অত!"

যাকগে, যাকগে! দেখি অন্যদিকে নাচ গান হচ্ছে স্টেজ বেঁধে। প্রথমে পাড়ার প্রতিভা! অমন আমরাও ছিলাম। কচিবয়সে। আমার উৎসাহ ছিল, শ্রীকান্ত আচার্য। সে শুরু হতে হতে রাত সাড়ে ন' টা। এসে বসলই না, অনুরোধের চিরকুটের পাহাড় জমে গেল। আগমনী গান দিয়ে শুরু। ও মা, তারপরেই "সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে "। সেখান থেকে বাংলা হিন্দি ফিউশন করে "আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা'' আর "কহি দূর জব দিন ঢল যায়ে''... তারপর জাম্পকাট করে "এ পথ যদি না শেষ হয়"। সেটায় আবার একটু ইনোভেটিভ সুর। এখন তো কেউ কোনো গান আর পুরো চেনা সুরে গায় না দেখি! যে যার মতো রান্না খাবারে আলাদা আলাদা গার্নিশিং! মজা হল...চলছে কিন্তু সেই পুরোনো গান। আমি বলি, নতুন বোতলে পুরোনো  মদ! আমার তখন একটু একটু রাগ বাড়ছে। কারণ একে তো এইসব এক্সপেরিমেন্ট আমার ভালো লাগে না ; তার ওপর ছানাপোনারা সব স্টেজের সামনে দিয়ে ছুটে ছুটে আসে আর যায়। এদিকে গান, ওদিকে আমার পাশে শাড়িতে হিল্লোল তুলে দুই মহিলা গয়নার ডিজাইন নিয়ে মত্ত। কল্লোল উশখুশ করছিল। না না, পরের দিন অফিস আছে বলে নয়, রেকর্ডে বসিয়ে এসেছে...বিগ বস আর সাল্লুকে দেখবে বলে।

উঠেই পড়লাম। ষষ্ঠী ফুরোলো। ফুরোলো প্রবাসে পুজোর প্রথম দিনটি। এই বছরে। আজ জানি না, পুজোর বাকি ক'দিনের সন্ধেগুলো কোথায় কেমন কাটবে । কাল লিখব। আর...বলতে ভুলেছি, নতুন শাড়ি পরিনি। পুরোনো পোশাক। কিনিনি নতুন কিছু। সাজগোজের বালাই ছিল না।

সপ্তমীর গল্প
=========

আজ আর খোঁটা খেতে রাজী নই। খুব সকাল সকাল উঠেছি। চা খেয়েই রান্নাঘরে। আজ অফিস খোলা। টিফিন বানাতে পারব না..আগেই বলে দিয়েছিলাম। আর এখানে কিন্তু পুজোয় সব প্যাণ্ডেলে দিব্যি পংক্তিভোজ হয়। আরে আজ না হয় অফিস। কাল পরশু? সবাই কী মজা করে বসে খায়। আমার বরাবরের পাথরচাপা কপাল। কিছুতেই খাবে না। ফলে আগে দিল্লিতে, এখন ব্যাঙ্গালোরে আমার বাড়িতে রেহাই নেই। হেঁসেলে রাবণের চুলো। নারকেলকুচি দিয়ে ছোলার ডাল, বেগুন ভাজা, মটর পনীর, ভাপা ইলিশ, চাটনি। এই রান্নার চক্করে চিরটাকাল আমার চা ঠাণ্ডা হয়ে যায়! ব্রেকফাস্টের ঝামেলা নেই। আমি একমগ ঠাণ্ডা চা আর দুটো ক্রীম ক্র্যাকার খেয়ে চালিয়ে দিয়েছি। আর কল্লোল তো ওটমিল। আমি বলি বড়দের সেরেল্যাক! আজ সপ্তমী। কলকাতায় থাকলে এতক্ষণে ঢাকের বাদ্যিতে কানে তালা। এখানে মাঝেমাঝে গাড়ির শব্দ আর গ্রিলের গেট খোলার ক্যাঁচকোঁচ। মেজাজ খাট্টা হয়ে যায়! অঞ্জলি দেবার পাট নেই। মণ্ডপে যাবার সুযোগ দিচ্ছে না কেউ। রান্ধন আর খাওন। 
কল্লোল বেরিয়ে গেল। আমি খিটকেল মার্কা মুখ করে জিজ্ঞেস করলাম, "কখন ফেরা হবে?" 
ও ততোধিক খিটকেলমার্কা মুখে উত্তর দিল, "কাজ মিটলে। কেন, কাল কী বই কিনতে ভুলে গেছ? নাকি
 আজ আচার আর হজমিগুলি? আমি কিন্তু ওই মুল্লুকে উজিয়ে আজ আর যাচ্ছি না।" 
বোঝো, আজ ওখানে যাব কেন? আজ এ তল্লাটে দেখি ক'টা হয়। 
মুঠিফোন। ছুট্টে গিয়ে ধরি। আমার ইস্কুলের বন্ধু পাপিয়া। যে একদিন ছুটি করলে আমার পেটের ভাত হজম হত না। যার সঙ্গে মিশনারী ইশকুলে সিস্টারদের লাল চোখ তুড়ি মেরে উড়িয়ে ডেস্কের তলায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে জীবনানন্দ - সুনীল - মাণিক - সমরেশ ( মজুমদার নয়, বসু )। ও ব্যাঙ্গালোর এসেছে। ছেলের কাছে। আমার বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। ওকে কতদিন দেখিনি? ও কতদিন দেখেনি আমায়? বেশি না। মাত্র তিন দশক। নতুন করে খুঁজে পাওয়া ফেসবুকে। আর এখন তো রোজ তাই নিশালাপ। 
এল। সময় পিছিয়ে গেল এক লহমায়। ইস্কুলের বেঞ্চে, সিঁড়িতে বসে টিফিন, একসঙ্গে বিচ্ছিরি সেলাই করার জন্য সেলাই দিদিমণির কাছে জন্মের হেনস্তা। দুজনে যখন দু'জনকে জড়িয়ে ধরলাম, বুঝলাম...বয়স বাড়লেও মন থমকে আছে বীডন স্ট্রীটের লাল ইস্কুলের চারতলার ক্লাসরুমে। ক্লাস টেন। সেকশন "এ"। পাশাপাশি ডেস্কে। 
আড্ডা। সুখ অ-সুখের গল্প। আঁচলভরা ভাঙা খেলনা। ছেঁড়াফাটা চিরকুট। সব গুছিয়ে কুড়িয়ে জড়ো করতেই তো দুপুর ফুরিয়ে বিকেল।

বিকেল। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে। কলকাতার ফোন, "কী খবর?"

আলসুরের প্রতিমা সপরিবারে দুর্গাঠাকুর

হাড় জ্বলে গেল। আজ শাড়ি পরব ঠিক করেছি। ও হরি। আমার আলমারি খুললে তো বাঘ বেরোয়, এমন অগোছালো। তা ঠিক দেখি, যেটা পছন্দ, সেটা ফ্রেশ ফ্রম মুড়ির টিন। অগত্যা অন্য একটা।

আজ আলসুর। বেঙ্গলি এসোসিয়েশন। এক সময় এটা সবচেয়ে ঠাটবাটের পুজো ছিল। এবার কেমন একটু কম ঝিনচ্যাক! আসলে এখন এত্ত বাঙালি, যে গুচ্ছ পুজো। ঠাকুর সুন্দর। তবে সে তো সব ঠাকুরই সুন্দর। মহিলারা সব গয়না লকার থেকে বের করে এনেছেন। সব্বাই মোহিনী। স্বামী বা প্রেমিকরা এই তিনদিন বশংবদ। পেছন পেছন তল্পিবাহক! মেয়েরা মেয়েদের চোরাচোখে মাপছেন সমানে। এ কথা পুরুষমানুষ বুঝলই না, যে মেয়েরা মেয়েই দেখে। সারাজীবন ভুলভাল ভেবে বুক বাজিয়ে বলে এল, "আমরাই মেয়ে দেখ "। 
আজ ফাংশন খাজা মার্কা! ঢুকিনি। কী ভাগ্যিস, এবারে বৃষ্টি নেই। প্রতিবার চটি ছপছপ, কাদা মাখা শাড়ির পাড় আর দাঁত কিড়মিড়। 
খাবার স্টলে গাদা ভীড়। বসে খাব কী, চেয়ার নেই। দুটো বিরিয়ানি আর ফিস ফ্রাই প্যাক করলাম। স্টলের ছেলেটা সমানে "কাকিমা, কাকিমা" বলে গেল। কল্লোলকে বললাম, "পুজোগণ্ডার দিন, তোমার ভাইপো ফ্রীতে খাওয়াবে না?"

জয়মহলের পুজো

এরপর গেলাম জয়মহল। প্রথম যখন আসি, কী যে জাঁকজমকের পুজো হত এখানে জয়মহলে। এবারে কেমন জানি একটা। সব আছে, কিন্তু ওই জৌলুস নেই। প্রতিমা ভারী সুন্দর। কী মজা হয়, খুব পাঁয়তারা কষি, কী কী চাইব..ঠাকুরের কাছে...সেই ছোটবেলায় একরকম চাহিদার লিস্টি হত, দিনের দিনে বদলে গেছে প্রায়রিটি,। এখন এই বেলা শেষের বেলা যখন, চাইতে গিয়ে দেখি..কী যে চাইব, মনেই পড়ে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে মুখখানি দেখে ধীরে ধীরে ফিরে আসি। 
এখানে জয়মহলে খুব মনে কষ্ট হল। মণ্ডপে একটা লোক নেই। ঠাকুর নিঝুম একা। সবাই দূরে গাঁকগাঁক করে খাচ্ছে। যারা খাচ্ছে না, তারা অন্য জায়গায় আর একটু দূরে কলকাতা থেকে আসা এক "আশাকণ্ঠীর" গলায় "হৃদমাঝারে রাখব" শুনে বেসুরে সুর মেলাতে মত্ত। 
আমার ওই শূন্য মণ্ডপ দেখে কেমন একটা গলার কাছটা দলা পাকিয়ে উঠছিল। খানিক ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে এলাম। কী কাণ্ড! বিশ বচ্ছর এই শহরে। হাজার হাজার বাঙালি, আমার চেনা মুখ নেই কোত্থাও। আমি কি এতই অসামাজিক? প্রতিবারই পুজোয় থাকলে এই এক জিনিস আমি আবিষ্কার করি। আমার চেনা মুখ যত, কোথায় যে চলে যায়!

রাত অনেক হল। বাড়ি ফেরা। কাল তো অষ্টমী। অঞ্জলি..দেখি দিতে পারি কিনা। সন্ধিপুজো কাল। সব ক'টি প্রদীপ কেমন অন্যরকম আলো ছড়াবে। প্রতিবার আমি ওই মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকি। সন্ধেতে হয়ত অন্য একটা দুটো মণ্ডপে যাব। বৃষ্টিবাদলা না হলে। কালকে আর মুড়ির টিন নয়। কাল তো লালপাড় সাদা শাড়ি। অবশ্য আজকেও সাদাই। আমার সবচেয়ে প্রিয় রং। 
কবে থেকে? সেই যবে প্রথম শীর্ষেন্দুর "যাও পাখি" তে সোমেন - রিখিয়ার কথোপকথনে জেনেছিলাম,  "হোয়াইট। দ্য কালার অফ সারেণ্ডার...''

অষ্টমীর গল্প
=========

আজ সকালটা একটু আলিস্যিমাখা। ঝুটঝামেলার রান্না রাখিনি। খিচুড়ি, ভাজাভুজি, চাটনি আর মিষ্টি। পাঁপড়ভাজাও ছিল। আমার আবার চিটচিটে চাটনি মাখিয়ে মুচমুচে পাঁপড় দারুণ লাগে। এ সবেরও দরকার ছিল না। এই এক মেনু সব মণ্ডপে। তবু...। পুজোর দিনেও ডেগমাস্টারির কপাল আমার। তাও এবার খাটুনি কম, ছানাপোনারা এখানে নেই। আমার বাবাও কলকাতায়। দাদু আর দুই নাতি..খিচুড়িকে বিষনজরে দেখে। তখন আবার দু'রকমের ব্যবস্থা করতে হয়।

সব জায়গাতেই পুষ্পাঞ্জলি বেলা সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে। রাজ্যের ঠেলাঠেলি। ওর মধ্যেই কিছুকিছু পুরুতের ভুলভাল উচ্চারণে "শরণ্যে ত্রম্ব্যকে গৌরী" আর জগজ্জননীর শিউরে শিউরে ওঠা। প্রসঙ্গত বলি, এক পুরুতমশাইকে বলতে শুনেছি পুজোর ফর্দ করছেন.."এবার কিন্তু আমার স্ত্রীকে নাল্লির শাড়ি আর আমাকে স্যুট লেংথ দেবেন। এই লিখে দিলাম।" 
এমনও দেখেছি, এই এখানেই..পুরুতমশাই শ্রাদ্ধ করতে বসে সিগারেটে শেষ সুখটান দিচ্ছেন বা কালীপুজোর ফাঁকে চায়ের কাপে চুমুক। দেখেশুনে ভক্তি চটে যায়। গায়ে বিছুটিজ্বালা। তা আজকের গল্পতেও অমনটাই।

ঠিক করেছিলাম, ত্রিপুরা মণ্ডলীর পুজোয় অঞ্জলি দেব। এখানে অঞ্জলি দিচ্ছি গত দু'চার বছর ধরে। আগে দিতাম বিবেকানন্দ আশ্রমে। সেখানে পুজো অন্যরকম। স্বামীজীরা করেন। মিশনের পুজো। মন ভ'রে যায়। কিন্তু বড্ড ভীড়। আর একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে। দফায় দফায় অঞ্জলির পাট নেই। ঘরকন্নার পাট সেরে যদি পৌঁছতে সময় ফুরোয়, অঞ্জলি দেওয়া হয় না। এই ত্রিপুরার পুজো খুব ঘরোয়া। যাঁরা করেন, শতকরা আশিভাগ ত্রিপুরাবাসী। এখানে একটি দু'টি পরিবারকে চিনি। প্রতিবার ওরা ফোনে যেতে বলে খুব আন্তরিকভাবে। অন্যান্যবার যেখানে হয়, এবারে সেখানে জায়গা মেলেনি। একটু দূরে চমৎকার একটি কল্যাণমণ্ডপ পেয়েছে ওরা। ওল্ড ম্যাড্রাস রোড। এই রাস্তার নাম এখন স্বামী বিবেকানন্দ রোড। সময় লাগে যেতে। পার্কিং মিলতে আরও কিছু সময়।

আজ আর মুড়ির টিন কেস নয়। আমি একটা ইস্তিরি করা গতবছরের পুরনো শাড়ি পরেছি। বেশ গঙ্গাজলী রং, লাল-কমলা পাড়। ফুলিয়ার তাঁত। পুজো পুজো শাড়ি। গিয়ে দেখি, আমি ছাড়া কেউ আর অমন পুজো পুজো শাড়ি পরেইনি। সব্বাই ঝিকমিক ঝলমল। রংবাহারে, গয়নায়, মুখপালিশে, ঠোঁটপালিশে...একেবারে সোহাগ চাঁদবদনী ধনি...। 
একজন বলল, "বৌদির বুঝি শরীর ভালো নেই? কেমন শুকনো শুকনো।” 
আসলে বলছে, "কী এলোমেলো সাজপোশাক রে বাবা। বাড়ির শাড়ি পরেই চলে এসেছে।" 
তা বাপু আমি চিরকাল একবগ্গা টাইপ। বয়েই গেল। আমার বাংলার মিহিজমিনের তাঁত, টাঙ্গাইল বেঁচে থাক! এমন শাড়ি আর আছে নাকি ভূ ভারতে?

অঞ্জলি দেবো। গণেশের ভুঁড়ি আর পুরুতমশাইয়ের ভুঁড়ি দেখে মনে হয় "শ্যামদেশীয় যমজ"। হাতে হৃষ্টপুষ্ট "পুরোহিত দর্পণ"। সিস্টেম খুব ভালো। অঞ্জলির পর ঝুড়িতে ফুল সংগ্রহ করা হয় আজকাল। দেবীকে আর পুষ্পাঘাত সইতে হয় না। তা দিলাম। মন্ত্রপাঠে অঞ্জলি সারা হল। সাবেকী ধাঁচের প্রতিমা। এখানে এখনও থিমের অত্যাচার নেই, কী ভাগ্যিস! মা হবে মায়ের মতো। কাছের, আটপৌরে। সে মুখে লেগে থাকবে বাৎসল্য আর বিষণ্ণতার ঘামতেল..তবেই না! আমার বাপু অমনটাই পছন্দ। এখানেও দেখি তেমনটাই। এখনও পর্যন্ত যা দেখেছি, নাথিং টু কমপ্লেন অ্যাবাউট। ও মা, অঞ্জলির পর নমো করতে করতে শুনি, পুরুত মাইকে বলছে, "নারায়ণী নমস্তুতে...আপনারা কেউ কিন্তু অঞ্জলির পয়সা না দিয়ে যাবেন না। পুরোহিতকে পয়সা না দিলে অঞ্জলি সম্পূর্ণ হয় না।" একেবারে এক নি:শ্বাসে! আমার সারা গায়ে চিড়বিড়ানি। এ কী রে বাবা! আমার চেনা একজন আমার পাশেই ছিল। তাকে বললাম, "এই হ্যাংলা পুরুত ছাড়া আর পাওনি কাউকে? অঞ্জলির মন্ত্র শেষ করছে টাকা দাও টাকা দাও বলে?" পরে অবশ্য মনে হল, আমরাও তো তাই। অঞ্জলি দিই আর ক্রমাগত বলে যাই, "রূপং দেহি, ধনং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষোজহি.." শুধুই তো অন্তহীন বাস্তব অবাস্তব চাহিদার পাহাড়। কখনও তো বলি না, "কিছু দিতে হবে না। তুমি এমনিই এসো"।

ভোগ খাইনি। বাড়িতেই তো ব্যবস্থা ছিল। সন্ধিপুজো আজ দুপুর-বিকেলের সন্ধিক্ষণে। বিকেল ৩ টে বেজে ৪৮ মিনিট থেকে ৪ টে বেজে ২২ মিনিট পর্যন্ত। আমি যখন ওখান থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠছি, পাঁজা করে নামানো হচ্ছে কমলকলি। এই ১০৮ টি পদ্ম ফোটানোর যে কী নেশা ছিল আমার! আর থালাভরা মাটির প্রদীপে সলতে সাজিয়ে পলায় করে সর্ষের তেল ঢেলে আলো জ্বালানোর। যত নিশুতি রাত, তত সন্ধিপুজোর মজা। গত বছর ছিলাম কলকাতায়। পদ্ম ফুটিয়েছি, প্রদীপ জ্বেলেছি। পাড়ার পুজোয় এখনও আমি ডাকনামে, এখনও আমি ওই বয়সে। গতবার পাড়ার মাসীরা কাকিরা বলেছে, "দে দে, ওকে করতে দে। আহা সাত বচ্ছর বাদে মেয়েটা পুজোয় এখানে। বড্ড ভালোবাসে এ সব"। এখানে আমি ম্লানমুখে ফিরে আসি।

অনেকটা দূর। যাওয়া হয়নি সন্ধিপুজোয়। তবে মায়ের ফোন এসেছিল। "ওরে, ঢাকের বাজনা শুনতে পাচ্ছিস? এই সন্ধিপুজো চলছে। একশ' আট প্রদীপ জ্বলেছে। প্রতিমার মুখে হাজার বাতির রোশনাই।'' আমি চোখ বুজে দেখেছি সেই উদ্ভাসিত মুখ। প্রতিমার। 
কোরামঙ্গলা। প্রথম যখন আসি...বিনবিনে মশা। বাড়ি খুঁজতে এসে পালাবার পথ পাই না। যেখানে যেতে চাইব, মশারাই উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলবে প্রায়। নির্জন। অল্প কিছু বসতি। আমরা বলেছিলাম,"এই গণ্ডগ্রামে কে থাকবে!" 
আর এখন? থিকথিকে বাড়ি আর গিজগিজে লোক! জয় আই টি ইন্ডাস্ট্রির জয়! আগে একটাই পুজো হত এখানে। তারপর যা হয়। যেখানে বেশি বাঙালি, সেখানেই দু'দিনে স্বজাতিপ্রীতি চটকে যাওয়া। ঝগড়া,পরনিন্দা পরচর্চা। এখন দু' টো পুজো। রাস্তার এধার ওধার।

আমি গিয়েছিলাম পুরোনোটাতে। "সারথী" -র পুজো। আহা, চোখ জুড়িয়ে গেল প্রতিমা দেখে। আর সলমা চুমকি জরি শোলা নয়, সাজিয়েছে রংমিলান্তি নানা মরশুমী ফুল আর অর্কিডে। আর এখানে মণ্ডপে অনেক মানুষ। প্রতিমা জলভরা চোখে একা নয়!

খাবারদাবারের স্টল আছে। কিন্তু লোকে দেখি ভীড় করেছে গানের আসরে। আজ শ্রীকান্ত আচার্য এখানে। জয় সরকার -লোপামুদ্রা আলসুরে। অন্য পুজোগুলোতে কিছু স্থানীয় প্রতিভা, কিছু অমুক কন্ঠী। আমি ভাবলাম, শ্রীকান্তকে আর একটা চান্স দিই। আজ কী সৌভাগ্য, বেশি সুর নিয়ে কালোয়াতি নেই। চেনা গান সব। যতই ওই জীবনমুখীর জয়গান করি, এরা সব এসে দেখি পাবলিক ডিমান্ডে সেই পুরোনো  কোথায় পুরোনো  সুরেই ঘোরাফেরা করে। হিন্দি, বাংলা...এমনিতে সব ভালই গাইল। কিন্তু ঝমর ঝমর যা যন্ত্রানুসঙ্গ, আমার কান কটকট। গান শুনব বলে বসেছি। বাজনায় যে সব চাপা পড়ে যায়! তবু পুরোনো  গান সব। আমাদের ছোটবেলার। কিশোরী আর তরুণীবেলার। নস্ট্যালজিয়া। এটাকেই বুঝি মধ্যবয়সের বিপন্নতা বলে? তা বলুক গে যাক! আমার পুরোনো  গান শুনে আজও মন আনচান করে। শুধু আমার নয়। বুঝলাম..যখন শ্রীকান্ত ধরল, "হয়ত তোমার জন্য..." এ শহর মান্না দে-র। এই শহরেই মানুষটি এখনও মৃত্যুর সঙ্গে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে যাচ্ছেন। পুরোনো  গান, হাজার বার শোনা, গানের কলি মুখস্ত..তবু তো পুরোনো  হয় না! প্রথম কলিটি যেই শ্রীকান্ত ধরল...সমুদ্রগর্জন আছড়ে পড়ল যেন। গানের শেষে উড়ে গেল হাজার হাজার পায়রা। ডানা ঝাপটিয়ে। অনুষ্ঠানের শেষে যখন ফিরছি..বেশ কিছু গান শুনে...যে সব গান মিশে আছে রক্তে.. তখন মনে হল, পুজো আর তো ফুরিয়েই এল। এই সব গান এই সব স্মৃতি..আজ কেমন গাইছিল শ্রীকান্ত..চোখ দু'টি বুজে.."বঁধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায়, বিনা কারণে..."

আচ্ছা, সব সময়েই বুঝি শুধু বিনা কারণেই?

নবমীর গল্প
=========

সকালে আজ ভালো লাগছিল না। পুজো শেষ। চিরকাল আমার নবমীর সকালে মন খারাপ থাকে। ছোটবেলায় থাকত, পুজোর পরেই পড়তে বসতে হবে বলে। এখন মনে হয়, আয়ু থেকে আরও একটা পুজো কমে গেল।

রান্নাবান্না তো আছেই। থাকেও। নবমী মানেই মুচমুচে পরোটা, কষা মাংস ( পাঁঠা। এ নিয়ে আবার বলার কী আছে! )। বাড়তি বায়না চিকেন শাম্মি কাবাব আর প্রণ পকোড়া। শখের প্রাণ গড়ের মাঠ! বাজার করব আমি, রান্না করব আমি। ইল্লি আর কী! রান্না করতে খারাপ বাসি না। বাজার করতেও ভালোই বাসি খুব। কিন্তু এই নবমীতে রান্নাঘরে যখন...উনুন নয়, ধোঁয়ার বালাই নেই..তবু কেন চোখ জ্বালা করে টুপটাপ জল? আজ একটা জিনিস বানিয়েছি। বাজারে দেখি কী সুন্দর বড় বড় কামরাঙা। সবজেটে হলুদ, মোলায়েম। আমি জিরিজিরি করে কেটে লাল লঙ্কার পাউডার, নুন, চিনি আর কাসুন্দি দিয়ে বেশ করে জারিয়ে রেখেছি। যে খাবে খাবে, যে খাবে না..তার ভাগেরটাও আমিই খাব। আর চাইলে আছে নিখুঁতি আর ক্ষীরকদম। বাথরুম স্কেল পলিথিনে মুড়ে লফটে তুলে রেখেছি। এখন নামাবই না..দীপাবলি পর্যন্ত।

আজ নবমী। আজ কেন, সে তো কাল বিকেলেই দরজায় এসে কড়া নেড়ে গেছে সন্ধিপুজোর পর। অঞ্জলি দেব। ওই ত্রিপুরা মণ্ডলীতেই। আজকেও শাড়ি। পুরোনো। তবে বিদিকিচ্ছিরি ইস্তিরিবিহীন নয়। সেই টাঙ্গাইল। আমার কী জানি কেন, পুজোয় সুতীর শাড়ি ছাড়া সিল্ক, জর্জেট... মন ওঠে না।

অঞ্জলির সময় কালকের মতোই। আজ আর পুরুত বেচারীকে হ্যাংলা বলব না। তবে আমি আজকাল প্রার্থনার সময় কিছুমিছু "চাওয়া" ছেড়ে দিয়েছি। চেয়ে না পেলে খুব কষ্ট আর অভিমানে থাকি। সে দেবীই হ'ন বা রক্তমাংসের মানুষ। তার চেয়ে না -চাওয়া ভালো। তখন যা পাই, যেটুকু পাই...তাতেই মনে হয় "এতখানিও তো আমার পাওনা ছিল না..." সন্তুষ্টি আর তৃপ্তি বাড়ে।

আজও সবাই কী সাজগোজ ! জগজ্জননীর দিকে চোখ পড়ার আগে অন্য সব মা -জননীদের দিকে চোখ যায় আমার। উফ, কী দিয়েছে এক এক জন। কত সকালে উঠে আয়নাকে সাক্ষী করেছে কে জানে! গুনগুন গুনগুন.."বল তো, আরশি তুমি মুখটি দেখে..." তবে কাজল, কবরী সমেত। একটা জিনিস আমাকে বরাবরই খুব ভাবায়। যে প্রসাধন বলে দেয় নিরুচ্চারে, যে এই সব রংবাহার নিজস্ব নয়, কৃত্রিম...। এই ত্বকের রং, এই চোখের পাতা, চোখছায়া, গালের লালিমা, ওষ্ঠরঞ্জনী...কিচ্ছুই নিজের নয়, সব সাজানো, সব মেকী..সে প্রসাধনে লাভ কী? প্রত্যেকেই তো যে যার নিজের মতোই সুন্দর। যত পরিশ্রম আমরা বাইরেটাকে সাজিয়ে তুলতে করে থাকি, তার সিকির সিকি করলে তো ভেতরটা সুন্দর হয়ে যায়! কী জানি! আমার যত সৃষ্টিছাড়া চিন্তা ভাবনা!

অঞ্জলি হল। আমি দেখেছি, কোনো দুটো জায়গায় হুবহু এক মন্ত্র কিন্তু পড়া হয় না। কিছু ফারাক থাকে। দেখেছি, কারণ দেখব বলে আমি আগে আগে সময় হিসেব করে একাধিক জায়গায় একই দিনে অঞ্জলি দিয়েছি। বারোয়ারী পুজোর ওই মজা! কেউ সময় মেপে চলতে পারে না। ঠিক এদিক ওদিক হয়ে যায়। এবার কলকাতায় গিয়ে একটা "পুরোহিত দর্পণ" কিনব। চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করতে।

মণ্ডপে সব কেমন মজা করে খায়দায়। আমার বাড়ি গোত্রছাড়া। অঞ্জলি দিয়েই "চল চল"। 
আমি মিনমিন করে বললাম, "বিকেলে যাব কিন্তু, তিনটে চারটে ঠাকুর দেখতে।"
"সে দেখা যাবে। এখন বাজারে চল। কাল দশমী। স্পেশাল কিছু হবে তো!" 
বোঝো!

এখানে আজ নবমীতে আয়ুধ পূজা। "অস্ত্র" অর্থে যাবতীয় যন্ত্রপাতি। কলকারখানায় তো বটেই, বাড়িতেও। আর সেই সঙ্গে গাড়ির পুজো। ফুলের দাম তুঙ্গে। চাই কলাগাছ, পাতিলেবু, নারকেল, চালকুমড়ো, কুমকুম, হলুদ, মুড়ি, আর যা হোক কিছু মিষ্টি..লাড্ডু,, মাইসোর পাক বা অন্য কিছু। গাড়ির পুজোটাই বলি। সংস্কার হল, গাড়ির পুজো করা মানে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ। । আমার চালক ছিল যদ্দিন, সে করত। এখন নেই; কিন্তু কল্লোল করবে। কিছু না হলেও চারটে চাকার নীচে চারটে পাতিলেবু সাজিয়ে হুশ করে গাড়ি চালিয়ে দাও। ফ্যাচ করে পাতিলেবু ফেটে চেপ্টে যাবে। একচোটে চারটে লেবু অক্কা পেল মানে গাড়ি নিরাপদ। আর কী সুন্দর করে ফুল দিয়ে গাড়ি সাজায় এরা। লাল, সাদা, ম্যাজেন্টা, হলুদ নানা ফুল আর মালায়। অনেক সময় বনেটে  দু'দিকে কলাগাছ বাঁধে। গাড়িকে কুমকুম-হলুদের টিপ পরায়, স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকে। সে বেশ লাগে। সাজুগুজু করা গাড়ি আজ রাস্তায় রাস্তায়। অনেক সময় নারকেল ফাটানো হয় বা চালকুমড়ো ফাটিয়ে কুমকুম ঢেলে দেওয়া হয়। ঠিকই আছে। যার যার সংস্কার তার তার কাছে। কেউ না মানতেই পারে। কিন্তু তা নিয়ে অযথা বিদ্রূপ বা তামাশার আমি বিপক্ষে। 
গাড়ি পুজো হয়, আবার গরু পুজোও হয়। এখানে ঠিক দেখি সকালবেলা টুংটুং। আমি তো জানি, সাজুগুজু করা গরু বেরিয়েছে। ঠিক তাই। তেল চুকচুকে বাঁকানো শিং, তাতে হলুদ- কুমকুমে দিব্যি চিত্তির বিচিত্তির, আগে কী সুন্দর চকচকে পিতলের টুপি ( রুপোরও হয় )। তাতে ছোট্ট ছোট্ট ঘুন্টি বাঁধা। গরু মাথা দলে, টুংটুং বাজনা বাজে। গরুর পিঠে কখনো কখনো কাপড় দিয়ে আসনের মতো করে ফিতে দিয়ে বাঁধা। অনেকে পয়সা দেয়। এও কিন্তু পূর্ব বা উত্তর ভারতে দেখিনি।

আজ বেরোতে বেরোতে প্রায় রাত আটটা। ব্রুকফিল্ড যাবার খুব ইচ্ছে আমার। বেশ দূর। তা হোক গে। বছরে তো একবারই পুজো। রবিবার জ্যাম কম। পৌঁছে তো গেলাম। এবার ওখানে ১০ বছর পূর্ণ হল। মা গো মা, ঢুকেই মনে হল..এক্ষুনি জিভের তলায় সর্বিট্রেট চাই। একে তো হলঘরে দমবন্ধ করা ভীড়। তার ওপর পাশাপাশি ঝিমিয়ে থাকা দুগ্গা ঠাকুর আর উদ্দাম রক নাইট। সাইকেডেলিক আলো, ছুট্টে গিয়ে ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিই..এমন পাগলা করা জগঝম্প বাজনা। না -আঁচড়ানো এক বোঝা চুল ( দেখলেই মনে হয় ঝাড়া দিলেই মুখরোচক কোম্পানির চানাচুরের মশলা পড়বে ) নিয়ে এক রূপম ইসলামের নকলনবীশ ছোঁড়া চিল্লামেল্লি করে যাচ্ছে। আমার মনে হল, দুগ্গা ঠাকুর অজ্ঞান হয়ে গেছেন নির্ঘাত! এক্ষুনি আমার সঙ্গেই হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে ভর্তি হতে হবে। এরা পারেও। উফ, কেন যে দু'টো জায়গা একটু আলাদা করে না! কে জানে, পরেরবার হয়ত দেখব, ওইখানেই ঠাকুরের সামনে রোল আর মোগলাই পরোটা বিক্রি হচ্ছে! কিছুই বিচিত্র নয়! আমি পালিয়ে বাঁচলাম। 
থাকি ইন্দিরানগরে। এখনও পাড়ার ঠাকুর দেখিনি। আজ যাব ভেবেই রেখেছিলাম। তাই এবার ওখানেই গেলাম। দিব্যি ডাকের সাজ। তবে একচালার নয়। মণ্ডপ প্রায় ফাঁকা। তা আর হবে না। ওদিকে মাঠে এক শ্রেয়া ঘোষাল কন্ঠী তখন কোমর দুলিয়ে গান..চিকনি চামেলি... আর সে কী উর্ধ্ববাহু হয়ে নৃত্য..আমজনতার। এ অবশ্য ইন্দিরানগরের প্রতি বছরের দৃশ্য। আমি তো জানি, এখনই কী! কাল আবার মোনালি ঠাকুর। তখন ছয় থেকে ষাট..সবাই প্রভুদেভা আর মালাইকা অরোরা খান। আজ ঢের রাত হল, এবার বাড়ি যাবার পালা। 
পুজো শেষ। "নবমীর নিশি পোহায়ো না"..এ তো প্রতি বছরই বলি। তবু জানি কাল সকালে যেই তিরকাঠির লাল সুতোর বন্ধন খোলা হবে, দর্পণ বিসর্জন হবে..পুজো শেষ। আজকাল আর শোভাবাজারের রাজবাড়িতে নীলকন্ঠ পাখি ওড়ানো হয় না। মাটির পাখি গড়িয়ে প্রতিমা নিরঞ্জনে ব্যবহার করা হয়। তবুও নীলকন্ঠ পাখি মনে মনে উড়িয়ে দেব আমি। আর তার পায়ে বেঁধে দেব ছোট্ট চিরকুট..ঠিকানা কৈলাসের। কালকেই পাঠিয়ে দেব আমার নেমন্তন্নের চিঠি। পরের বছরের জন্য। দুগ্গাঠাকুরের কাছে। চুপিচুপি।

আজ দশমী
========

আজ আমি মনে মনে কথা বলেছি। আমি কি ঈশ্বরবিশ্বাসী? আমি কি খুব ধর্মাচরণ করি? জানি না। মনে তো হয় না। আমার পুজো যা কিছু নিজের মতো করে। নিজের মনে। এবং সে এক অন্তহীন কথোপকথন। সেখানে ঈশ্বর বা ঈশ্বরী আমার ভয় -ভক্তি -ভাবনার আশ্রয় নয়। বন্ধু। কথা, অভিযোগ, অভিমান..এমনকি রাগ করে মাঝেমাঝে বাক্যালাপ বন্ধ। আজকেও তাই। মণ্ডপে যাইনি। বিসর্জনের সুর আমার ভালো লাগে না। তিরকাঠিতে বাঁধা লাল সুতোর বন্ধন খুলে দেওয়া হবে। দর্পণ বিসর্জন। মাটির সরায় হলুদ জল। দর্পণে বিম্বিত প্রতিমার আলতা পরা পা। আজ পায়ের ছায়া পড়বে। কিন্তু বিষণ্ণ মুখটির?

ফুল মালা শুকিয়ে গেছে। প্রদীপে তেল ঠেকেছে তলানিতে। বরণ হবে। প্রতিমার মুখে পান-সুপুরি-মিষ্টি। আঁচল দিয়ে মুখটি মুছিয়ে সিঁথিতে আর নোয়াতে সিঁদুর ছুঁইয়ে চিবুকে আঙুল আর চুমো "আবার এসো"। এ সব পুরনো ছবি। আমার খুব চেনা ছবি। প্রবাসে আসার আগে প্রতি বছর এই একই ছবি। রঙিন থেকে এখন সিপিয়া রঙের। রঙের আলো বদল হয়েছে। মনের আলো সেই আগের মতোই।

তাই আমি আজ নিজের সঙ্গেই থাকব। বেলপাতায় দুর্গানাম লেখা আর হয় না আজকাল। তার বদলে লিখব নেমন্তন্নর চিঠি। ওই বন্ধুকে। যার ডাগর দু'টি চোখ ভরেছে জলে। সারা বছরে বাপের ঘরে থাকার মেয়াদ মাত্রই চারটি দিনের। যাকে কখনও কেউ জিজ্ঞেসই করেনি কক্ষনো.."আর ক'টা দিন থাকবে?" যাকে আমরা কখনও খালি হাতে এমনি আসতে বলি না। সব সময়েই বলি, এটা চাই, সেটা চাই। এবার আমি আগাম লিখব। নেমন্তন্নর চিঠি। তারপর তাতে নিজের নাম সই করে নীলকন্ঠ পাখির পায়ে বেঁধে সে পাখি উড়িয়ে দেব নিমেঘ নীল আকাশে। দুগ্গাঠাকুরের নাম ঠিকানা লিখে।

সূত্রঃ "ম্যাজিক লণ্ঠন" গদ্য সংকলন থেকে। প্রকাশক : দে'জ-কমলিনী , কলকাতা বইমেলা 2014)


লেখক পরিচিতি : বিজ্ঞানের ছাত্রী। কিন্তু প্রথম ভালোবাসা সাহিত্য। তিন দশক ধরে ভাষান্তরের কাজে যুক্ত। বেশ কিছু অনূদিত বই প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্য অকাদেমি, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইত্যাদি বিখ্যাত সংস্থা থেকে। ভাষান্তরের পাশাপাশি নিজস্ব লেখালেখির ঝোঁক। তবে খুব নিয়মিত নয়। ভালোবাসেন টুকরো গদ্য, পদ্য লিখতে। নানা স্বাদের লেখা নিয়ে গত বছর প্রকাশিত হয়েছে ওঁর আরেকটি বই 'ম্যাজিক লণ্ঠন। এ বছর প্রকাশিত হচ্ছে আরও তিনটি বই।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।