অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


প্রিয় চরিত্র

অবসর বিশেষ সংখ্যা এপ্রিল ১৫, ২০১৮

 

মাধুকরীর ‘পৃথু’–এক আধুনিক অরণ্যচারী -

ভাস্কর বসু

বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক বা প্রযুক্তিবিদ চরিত্রের সংখ্যা বড় কম নয় কি? আমার কিন্তু এই অবিচার নিয়ে সাহিত্যিকদের প্রতি বেশ অভিযোগ আছে। ওদিকে ডাক্তারদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই দেখে আসছি সেটা। তারাশঙ্কর, মানিক বা বিভূতিভূষণের গল্প-উপন্যাসেও বেশ দেখা মেলে তাঁদের। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘ডাক্তার’ উপন্যাস রীতিমতো সিনেমা হয়ে খ্যাতি লাভ করেছিল। পরে আবার উত্তমকুমার অভিনীত ‘আনন্দআশ্রম’ও প্রভূত জনপ্রিয় হয়। তারপর বনফুল এসে তো একেবারে ঝড় বইয়ে দিলেন। নিজে ডাক্তার বলে রীতিমতো দারুণ সব ডাক্তারদের দেখা গেল তাঁর কলমে। সদাশিব বা অগ্নীশ্বর ডাক্তার রীতিমতো জনপ্রিয়, ছবিও হয়েছে সেসব কাহিনী নিয়ে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারদের কপাল –‘ঠনঠন গোপাল’! যতীন সেনগুপ্ত মশাই তো কিছু করতে পারতেন, না তিনি কবি হয়ে গেলেন, কৈফিয়ৎ চাইলেন – “চেরাপুঞ্জীর থেকে, একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি সাহারার বুকে’। বোঝো কাণ্ড। বাদল সরকারও বড় নাট্যকার, বিনয় মজুমদারও ব্যতিক্রমী কবি। তাঁদের নেকনজর একটু তো গদ্য সাহিত্য পেতে পারতো! কপালে না থাকলে-! সবচেয়ে আশা ছিল যাঁর ওপর তিনি কিন্তু নিরাশ করেননি।

‘সত্যকাম’ উপন্যাসে নারায়ণ সান্যাল এক সত্যকারের জীবন্ত ইঞ্জিনিয়ারকে দেখিয়েছেন, সত্যপ্রিয় আচার্য। অসাধারণ মর্মস্পর্শী এই কাহিনী হিন্দিতে হলেও বাংলা চলচ্চিত্রকারদের তা মন জয় করে উঠতে পারেনি। এছাড়া তাঁর অন্যান্য উপন্যাসেও কিছু ইঞ্জিনীয়ারের ছায়া এসেছে। ‘নাগচম্পা’ উপন্যাসের নায়ক কৌশিক আসলে ইঞ্জিনিয়ার, প্রথম কাজটিও তার ছিল অধীত বিদ্যাকে অবলম্বন করেই রহস্যের জাল ভেদ। কিন্তু পাকেচক্রে সে ব্যারিস্টার পি কে বসুর সঙ্গে জড়িয়ে গেল ‘কাঁটা’ তুলতে। বকুলতলা পি এল ক্যাম্প, দণ্ডক শর্বরী – এহেন উপন্যাসেও এসেছে বেশ কিছু চরিত্র। তবে আপশোষ এই যে - তারা কিন্তু তাদের প্রযুক্তি প্রয়োগের জন্য সেভাবে স্মরণীয় নয় যেভাবে ডাক্তার অগ্নীশ্বর, সদাশিব বা আরোগ্য নিকেতনের জীবনমশায় বা প্রদ্যোত ডাক্তার স্মরণীয়।

এই ব্যাপারে আমার কৃতজ্ঞতা সাহিত্যিক শংকরের কাছে। ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’ ও ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি; - বাংলা সাহিত্যের দুই অনন্যসাধারণ উপন্যাস। কমলেশ রায়চৌধুরী ও জীমূতবাহন – দুই উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলি ইঞ্জিনিয়ার ও বৈজ্ঞানিক। এবং তাঁরা কর্মে নিবেদিতপ্রাণ, প্রায় সাধক। এরকম আর একটি চরিত্র তাঁর ‘এক যে ছিল দেশ’ এর নায়ক। এটি অবশ্য তপন সিংহ চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন।

সম্ভবত পাঠকের এবার ধৈর্যচ্যুতি হবে, শীর্ষ নামকরণের সাথে এখনো কোন মিল খুঁজে পাননি বলেই। আসলে এটা অনেকটা স্বীকারোক্তি বা জবানবন্দী। আমার মনে হয় কোন মানুষের প্রিয় চরিত্র হয়ে উঠতে গেলে সেই চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের বাস্তব অভিজ্ঞতার একটু মিল থাকা প্রয়োজন। লক্ষ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে কাছের চরিত্র মানুষকে তার দুর্বল জায়গাতে ছুঁয়েছে, গায়ে হাত দিয়ে হয়তো বলেছে –‘তুমি একা নও, আমি আছি পাশে’। এই জায়গাতেই পৃথু আমার সবচেয়ে কাছের। সে নিজে এক বিলেতফেরৎ ইঞ্জিনিয়ার, চাকরি করে এক জার্মান কোম্পানিতে। নিজের কাজের প্রতি সে বিশ্বস্ত – তার প্রমাণ সে তার উধাম সিংজির স্ত্রীকে পরম মমতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করে তাদের কোম্পানির শেল্যাক তৈরীর পদ্ধতি ও তাদের উপযোগিতা। কিন্তু তার অন্তরে বাস করে, তার নিজের ভাষায় –‘এক ব্যর্থ কবি’।

‘মাধুকরী’ উপন্যাসের পটভূমি মধ্যপ্রদেশ। এখানেই উপন্যাসের অভিনবত্ব। বাংলার বাইরের কোন জায়গাকে কেন্দ্র করে উপন্যাস আগে হয়নি, তা নয়। কিন্তু আটের দশকে চল অনেকটা কমে এসেছিল। “দেশ” পত্রিকাতে প্রকাশিত অধিকাংশ ধারাবাহিক বিশালাকার উপন্যাসগুলির অধিকাংশের পটভূমিই ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ‘মাধুকরী’র পটভূমির জন্য পৃথুর চরিত্রের অনেকগুলি দিক এমনভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে যা বাংলার মধ্যে থাকলে হতনা। কানহা অরণ্য, বানজার নদী, সীওনি, জব্বলপুর ইত্যাদি পরিচিত জায়গার মধ্যেই তিনি সৃষ্টি করে নিয়েছেন তাঁর উপন্যাসের মূল পটভূমি ‘হাটচান্দ্রা’ ও ‘রাইনা’ কে।

বইয়ের ব্লার্বে পৃথু ঘোষের যে বাঘের মত বেঁচে থাকার কথা বলা হয়েছে, তা আসলে কাহিনীর শেষাংশে পৃথুর নিজের কথা। কাহিনীটি ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকাতে – তার প্রথম কিস্তিতেই পৃথুকে পরিচিত করিয়েছিলেন লেখক-

“পৃথু মানুষটিই একটু আশ্চর্য প্রকৃতির। ও এক আলাদা মানুষ। অন্য কারোর মতই নয়। কারো সংগে মেলে না ওর স্বভাব। তাইই, বড় একা।”

এই প্রসঙ্গে একটি কথা মনে আসে। বুদ্ধদেব স্বীকারই করেছেন বিভূতিভূষণের প্রতি তাঁর ঋণের কথা। একবার সাহিত্যিক সুনীলের সঙ্গে আলাপচারিতাতে আক্ষেপ করেছিলেন, ঐরকম লিখতে না পারার জন্য। সুনীল তাঁকে জানিয়েছিলেন তাঁর নিজের মত লেখা উচিত, বিভূতিভূষণের মত নয়। তিনি সে অর্থেই আধুনিক বিভূতিভূষণ – আমার বারেবারে মনে হয়েছে ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের কথক সত্যচরণের পুনর্জন্মের নাম মাধুকরীর ‘পৃথু’। মাধুকরীর মতই আরণ্যকেও বহু চরিত্র – ধাওতাল সাহু, ধাতুরিয়া, যুগলকিশোর, কুন্তা, গোষ্ঠবাবু, গনোরী তেওয়ারী, ভানুমতী।

আরণ্যকের পটভূমিও বাংলার বাইরে – বিহারের পূর্ণিয়া অঞ্চল। ‘মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্ট’ এর ধারে কাছেই চলাফেরা করেছেন সত্যচরণ – পৃথুর বিচরণক্ষেত্র মধ্যপ্রদেশের ‘কানহা রিজার্ভ ফরেস্ট’। সত্যচরণ সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন, তাঁর শিক্ষার কথা -

“যদি সত্য কথা বলিতে হয়, জীবনে ভাবিয়ে দেখিবার শিক্ষা এইখানে আসিয়াই পাইয়াছি।”

‘মাধুকরী’ তেও তাই – এই আরণ্যক জীবনে পৃথুর জীবনপথে চলা, জীবনভোর শিক্ষা – তার নিকটজনের কাছে, প্রকৃতির কাছে, জীবনের কাছে- অনেকটা পরিব্রাজকের মতই। তার বৃত্তি – পারিব্রজ্য আর তার কাহিনী – ‘মাধুকরী’ – সেই শিশুকালে যাকে আমরা জেনে এসেছি – ‘পরিব্রাজকের ভিক্ষা’।

তবে বড় তফাৎ এক জায়গাতে। সত্যচরণ অবিবাহিত, কাজেই তার জীবনে দাম্পত্য জটিলতার বা আধুনিক সভ্যতার প্রবেশ ঘটেনি। জীবন অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বহীন। ভানুমতীর অনুরাগকে স্বীকার করতে দ্বিধাগ্রস্ত সত্যচরণ। এছাড়া সত্যচরণের জীবনে পৃথুর মত এত তীব্র সংঘাতের সৃষ্টি হয়নি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক ও অষ্টম দশকের অনেক তফাৎ। পৃথুর বিচরণক্ষেত্র সত্যচরণের চেয়ে অনেক বিস্তৃত, অনেক জটিল। দুই অরণ্য তার সামনে – দুই বিপদসংকুল। পদে পদে প্রাণের ভয়, মানের ভয়।

‘মাধুকরী’র কাহিনী যতই এগোতে থাকে, আমরা পরিচিত হতে থাকি পৃথুর আশ্চর্য প্রকৃতির সাথে। তার অনন্য স্বভাব, তার প্রকৃতি প্রেম, সাহিত্য ও সঙ্গীতানুরাগ, প্রবাসী হয়েও দুর্বার বাঙালিয়ানা আর সর্বোপরি, তার একাকীত্ব – সব কিছুকে বড় আপন করে জানি আমরা। জানতে পারি তার নিকটজনকে – স্ত্রী রুষা, সন্তান মিলি-টুসু, প্রেমিকা কুর্চি ও তার স্বামী ভাটু, সাহিত্যপ্রেমী প্রতিবেশী গিরিশদা, মণি চাকলাদার, বন্ধু ভুচু, রুষার প্রেমিক ইঁদুরকার, বাইজী বিজলী, শামীম, মৌলভী, ড্রাইভার অজাইব সিং, তার উপরওয়ালা উধাম সিং --- এমন বহু বহু চরিত্র। আর এর সঙ্গে থাকে তৎকালীন অবিভক্ত মধ্যপ্রেদেশের বিস্তীর্ণ পটভূমি।

পৃথু ইঞ্জিনিয়ার – বিলেৎফেরত। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল। কিন্তু তার কাছে জীবনের অর্থ ছিল অনেক বড়। যে কারখানাতে সে কাজ করে সেখানে সে অনেকের প্রিয়, কিন্তু তার খামখেয়ালীপনার জন্য উপহাসের পাত্রও বটে। তাকে তারা বলে – পাগলা ঘোষা, রুষার মতে উচিত নাম ছিল ‘পাগলা গোসসা’। তার সৎ, নৈতিক জীবনের জন্য কর্মক্ষেত্রেও তার অনুরাগী আছে আবার আছে প্রতিদ্বন্দীও। অবিন্যস্ত স্বামী হলেও কর্মক্ষেত্রের প্রতি পৃথুর দায়িত্ববোধ রুষাকে মুগ্ধ করে। অনেক কিছু জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার মাঝেও তার খেয়ালী স্বভাবের জন্যে সে যেন ঘরছাড়া পথিক, সেই ‘আংটি চাটুজ্জের ভাই’ ভবঘুরে বসন্তর মত। ‘খেয়ালপোকা যখন আমার মাথায় নড়ে চড়ে, আমার তাসের ঘরের বসতি যে অমনি ভেঙে পড়ে’ – এ যেন প্রায় পৃথুর মনের কথা। আমরা সেই যাত্রার সঙ্গী হয়ে আবিষ্কার করি এক নতুন ভুবন।

স্ত্রী রুষা কিন্তু একেবারেই অন্য ধাতুতে গড়া। সুন্দরী, পরিশীলিত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী রুষাকে নিয়ে পৃথুও গর্বিত। রুষা বিয়ে করেছিল এক বিলেতফেরৎ ইঞ্জিনিয়ারকে, স্বপ্ন দেখেছিল এক বিলাসবহুল তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ জীবনের। কিন্তু এই মানুষটি তার জীবনের সব হিসেব ওলট পালট করে দিল। কি অদ্ভুত, অনন্য তাদের দাম্পত্যজীবন! বড় মর্মস্পর্শীভাবে তা বিধৃত হয়ে থাকলো বুদ্ধদেবের কলমে। আধুনিক মানুষ যখন সভ্যতার শিখরে উঠতে চায় তাদের দাম্পত্য সম্পর্কেও আসে বড় পরিবর্তন। এ হয়তো সভ্যতারই অঙ্গ। তাই মনে হয় সার্থক এর উৎসর্গীকরণ – ‘একবিংশ শতাব্দীর নারী ও পুরুষের কাছে’! পৃথুর ‘রুষা’ আবিষ্কার ‘মাধুকরী’র এক উচ্চাঙ্গের অধ্যায়।

‘কুর্চি’ – যাকে লেখক পরিচয় করিয়েছেন পৃথুর একমাত্র আনন্দ বলে। রুষার ভাষায় সে পৃথুর একমাত্র দুর্বলতা – ‘একিলিজেজ হীল’। পৃথুর দূর সম্পর্কের আত্মীয় এই মেয়েটিকে পৃথু ভালবাসতো কিন্তু জানিয়ে উঠতে পারেনি। এরপরে সে যখন রুষার হাত ধরেছে, তখনই আবার ফিরে এল দুঃখিনী কুর্চি। অসুখী দাম্পত্যজীবন, স্বামী একেবারেই অন্যরকম। পৃথু আবার তার মধ্যে খুঁজে পেল তার কৈশোর আর যৌবনকে।

কুর্চির আতিথ্য একেবারে সাবেক বাঙালী নারীর মতই। সে পৃথুকে নিজের হাতে কফি করে খাওয়াতে চায়। আর বলে নারকোলের নাড়ুর কথা! সঙ্গে সঙ্গে পৃথুর কাছে এক রাশ অতীত ভিড় করে আসে।

“নারকোলের নাড়ু! মায়ের মৃত্যুর পর খায়নি। পৌষ পার্বণে পিঠে খায়নি। তেল কই খায় নি। ধনে পাতা, কাঁচা লঙ্কা কালোজিরে দিয়ে। ভেটকি মাছের কাঁটা চচ্চড়ি খায়নি। বড় চিতলের তেলওয়ালা পেটি খায়নি, ধনে পাতা , কাঁচা লঙ্কা দিয়ে। ভাপা ইলিশ খায় নি। বড় গলদা চিংড়ির মাথা ভাজা খায়নি।”

প্রবাসী পৃথুর মধ্যে আমরা আবিষ্কার করি এক সাবেকি, দুর্বার বাঙালিয়ানা। তিন পুরুষ ধরে সে প্রবাসী, কিন্তু সে কবিতা ভালবাসে। নিজের পয়সাতে ছাপিয়েছিল কবিতার বই, নাম ‘অসূয়া’। তার কবিতাপ্রেম! কোন একদিন তার ছেলে টুসুর সঙ্গে নিভৃত আলাপে সে জেনে যায় তার প্রতি তার স্ত্রী রুষার মুগ্ধতার কথা। রুষা ছেলে মেয়েকে বলেছে – তার বাবা ইঞ্জিনিয়ার নয়, সে কবি। পৃথু স্তব্ধ হয়ে যায় যখন সে জানে যে তার ছেলে মেয়েকে রুষা জানিয়েছে – ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, উকিল বা একাউন্ট্যান্ট হওয়া সোজা – তারা যেন তাদের বাবার মত ভাল মানুষ হয়। পৃথু এই আবিষ্কারে মাতাল হয়ে যায়। পৃথু এতদিন জানতো সে কবিতার জন্য রুষার কাছে নিগৃহীত। আজ সে ভাবে, সে কি চিনেছে তার স্ত্রীকে? ছেলে মেয়ে কে? এমনকি নিজেকে? সে কি কবি? আসলে যে লেখে সে পৃথু নয়, সে ‘অন্যলোক’!! সঙ্গে সঙ্গে পৃথুর মনে ভিড় করে আসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা –

যে লেখে, সে আমি নয়
কেন যে আমায় দোষী করো!
যে লেখে, সে আমি নয়
কেন যে আমায় দোষী করো!
সে এখন নীরার সংশ্রবে আছে পাহাড়-শিখরে
চৌকশ বাক্যের সঙ্গে হাওয়াকেও
হারিয়ে গেয় দুরন্তপনায়
কাঙাল হতেও তার লজ্জা নেই
এবং ধ্বসের জন্য তার এত উম্মত্ততা
দূতাবাস কর্মীকেও খুন করতে ভয় পায় না
সে কখনো আমার মতন বসে থাকে
টেবিলে মুখ গুঁজে?

রুষার কাছে সে জনান্তিকেই ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে এতই আত্মমগ্ন! চোখেই পড়েনি তার যে রুষা এমন করে ভরে আছে তাকে? সে কবি? ছি, ছি! কবিরা তো অমৃতের পুত্র।

পৃথুর আর এক খুব কাছের মানুষ গিরিশদা। গিরিশদা কবি হিসেবে ব্যর্থ হলেও মানুষ হিসেবে পৃথুর খুব প্রিয়। তিনি পৃথুকে নিমন্ত্রণ করে মাঝে মাঝে ভালো খাবার খাওয়ান। অদ্ভুত সব খাবার – যেমন শম্বরের আচার! সে শম্বর শিকার করা হয়েছিল নাইনটীন সেভেন্টিতে। আবার গিরিশদা পৃথুকে সুজির খিচুড়িও বানিয়ে খাওয়ান, সুন্দর সুন্দর ড্রিঙ্কও খাওয়ান।

“পৃথুর একঘেয়ে, ক্লান্তিকর মন-খারাপ বিষণ্ণ দিনগুলি আনন্দের ফুলফোটা সোনাঝুরি গাছ হয়ে ওঠে যেন গিরিশদার কাছে এলেই। এখানে এসে নিজেকে নবীকৃত করে ও। বারে বারে।”

তা সত্ত্বেও সে গিরিশদার কবিতার কাব্যমূল্যের কদর করতে পারেনা, জানিয়েও দেয় তাঁকে। দুঃখিত হয়, কিন্তু তার মনে হয় সে এই সততা ছাড়া বাঁচতে পারবে না। পৃথুর জীবনের এক বড় অংশ জুড়ে আছে বিভিন্ন অবাঙালীরা – ঠুঠা বাইগা তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। আছেন দিগা পাঁড়ে। কোম্পানির রেসিডেন্ট ডিরেক্টর উধাম সিং তাকে খুবই পছন্দ করেন। তার এক বড় দুঃসময়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। পৃথুর এক সঙ্গী ভুচু। তার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র এই ছেলেটি পৃথুর জীবনের শেষপর্বে তার স্ত্রী রুষার প্রতি অনুরক্ত হয়। যন্ত্রণাতে ক্ষত বিক্ষত হয় সে। এই সময়ে সে এক চিঠিও লেখে পৃথুকে। পৃথু মুগ্ধ হয়, ভাবে স্কুলের শিক্ষাতে শিক্ষিত না হয়েও কি অসাধারণ জীবনবোধ ভুচুর।

জীবনের চলার পথে এক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয় পৃথু। তার অন্তরাত্মার ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সে খুইয়ে বসে তার একটি পা। যে পায়ে ভর করে চলেছে, ফুটবল খেলে গোল করেছে, ফুলশয্যাতে আপাত অসুন্দর পৃথুর পা দেখে সুন্দরী রুষা মুগ্ধ হয়েছিল – ‘বাঃ! কি সুন্দর তোমার পা!’

কিন্তু কিছু না গেলে কি কিছু পাওয়া যায়! এই ক্ষতিই রুষা ও তার ছেলেমেয়েকে সরিয়ে নিয়ে গেল তার কাছ থেকে। আবার তাই কাছে এনে দিল কুর্চিকে, পুরোপুরিভাবে। হয়তো কুর্চিকে পেতে গেলে এই মূল্য তাকে দিতেই হত। কিন্তু সে কি কুর্চিকেই পেল সেভাবে?

পৃথুর জীবনের তিন নারীই যেন তিন ভিন্ন চেতনার দ্যোতক – রুষা – আধুনিক, শহুরে পরিশীলতার, বিজলী – ‘আরণ্যক’ সারল্য, উদ্দাম বেলাগামপনার আর কুর্চি – নিখাদ বাঙালী রুচিবোধ ও মাধুর্যের। তারা তাকে পরিপূর্ণ করেছে, তার কাছ থেকেও পেয়েছে।

পৃথু সম্ভবত এক, স্বপ্নালু, ক্লাসলেস সমাজের প্রতিনিধি। সে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিশেছে সমানভাবে। উধাম সিং, গিরিশদা, ভুচু আর দিঘার মধ্যে সে তফাৎ করেনি। তার জীবনের তিন নারীকেই সে দিয়েছে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান। কিন্তু সে নিজেও জানেনা নিজেকে, বোঝে তো নাই।

অন্তিমমুহূর্তে সে হাত ধরেছে আলখাল্লা পরা বুড়ো মানুষটির যাঁর কাছে সঞ্চিত আমাদের ‘সকল রসের ধারা’। আজানের সঙ্গে মনে পড়ছে একটি গান – ‘ওগো দয়া দিতে হবে যে মোর জীবন ধুতে / নইলে কি আর পারবো তোমার চরণ ছুঁতে’। সেই যে ছোটবেলাতে পড়েছিলাম আমরা,

“The quality of mercy is not strain'd. It droppeth as the gentle rain from heaven!”

সেই কবিতাটিই রাবীন্দ্রিক স্পর্শে এক অলৌকিক, গান হয়ে গিয়েছিল। জীবন দিয়ে, অনেক পথ পেরিয়ে পৃথু যেন তার অর্থ উপলব্ধি করতে পারলো।

তাঁর সঙ্গে এক অদ্ভুত মানুষের পরিচয় হয়েছিল। সেই মানুষটি হয়তো পৃথুর জীবনে নিজের অজান্তে এক গভীর ছাপ রেখে গেলেন। হাটচান্দ্রার ক্লাবে কবি সম্মেলনের পর বক্তৃতা দিয়েছিলেন ডক্টর চৌধুরী। শেষ করেছিলেন বক্তৃতাটি এক শব্দ তিনবার উচ্চারণ করে - ‘আনন্দম, আনন্দম, আনন্দম’ !! বহু দুঃখের মধ্যেও এই কথাটি ছিল তার অনুপ্রেরণা।

শেষপর্বে আমরা তাকে দেখি নিঃসঙ্গ। সঙ্গে আছে ঠুঠা বাইগা, যে তার আবাল্যসঙ্গী। জীবনের শেষপর্বে মানুষ কি ফিরে যেতে চায় সেই জন্মমুহূর্তেই? তার ‘চলতে বড়ই লাগে’।

সে বুঝতে পেরেছে বাঘের মত বাঁচা কোন সভ্য মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। মানুষের জীবনবোধ অন্যমাত্রার। তাকে বা তাদেরকে-

‘প্রীতি, প্রেম, কাম, অপত্য, ভক্তি, শ্রদ্ধা, ঘৃণা, বৈরিতা, ক্রোধ, সমবেদনা এবং এমনকি ঔদাসীন্যরও বোধগুলিকে দেওয়ালির রাতের অসংখ্য প্রদীপের কম্পমান শিখারই মতো অনুভূতির দ্বিধাগ্রস্ত আঙুলে ছুঁয়ে ছুঁয়ে জীবনকে পরিক্রমা করে যেতে হয়।’

শেষে তার অমোঘ প্রশ্ন -

এই পরিক্রমার আর এক নামই কি মাধুকরী?” –

সাহিত্যের কিছু চরিত্রের কাছে মানুষ বার বার ফিরে আসতে চায়। তার মনে হয় এর কাছে সে আবার নতুন করে কিছু পাবে যা তার জীবনকে ভরিয়ে দেবে। নতুন এক আলো – ‘ছিল মন তোমারই প্রতীক্ষা করি / যুগ যুগ দিন রাত্রি ধরি।’

আমার কাছে পৃথু তাই। শুরু করেছিলাম যাদের দিয়ে, সেই কমলেশ রায়চৌধুরী, সত্যপ্রিয় আচার্য, জীমূতবাহন,- আমার বিনীত শ্রদ্ধার মানুষ। কিন্তু মনের মানুষ?

সফল কবিরা মিলে পাগল করে দেওয়া এক ব্যর্থ কবি, এক জংলী উদ্দাম জীব, আবার এক সৎ মানুষ, নিজের কাজে দায়বদ্ধ ইঞ্জিনিয়ার পৃথু ঘোষ! তার ‘চলতে বড় লাগে’ – কিন্তু তাও সে চলতে চায়, ধীর পায়ে হলেও।

তোমার চরিত্রে দাগ আছে – জেনেও – আমি মুগ্ধ! আলখাল্লার হাত তুমিও ধরেছ বারেবারে, শেষে আমিও ধরি-

‘তোমার পথের কাঁটা করব চয়ন,
যেথা তোমার ধুলার শয়ন,
সেথা আঁচল পাতব আমার—,
তোমার রাগে অনুরাগী,
আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী,
সকল দাগে হব দাগী।’

লেখক পরিচিত - জন্ম কলকাতায়, বেড়ে ওঠা দক্ষিণ চব্বিশ-পরগনার রাজপুর-সোনারপুর অঞ্চলে। ১৯৮৩ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেক্ট্রনিক্স ও টেলিকম্যুনিকেশন ইঞ্জিনীয়ারিং পাস করে কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোরে। শখের মধ্যে অল্প-বিস্তর বাংলাতে লেখা - অল্প কিছু লেখা রবিবাসরীয় আনন্দবাজার, উনিশ-কুড়ি, নির্ণয়, দেশ, ইত্যাদি পত্রিকায় এবং বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগাজিন (সৃষ্টি, অবসর, ইত্যাদিতে) প্রকাশিত। ।

 

Copyright © 2018 Abasar.net. All rights reserved.