অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


প্রিয় চরিত্র

অবসর বিশেষ সংখ্যা এপ্রিল ১৫, ২০১৮

 

আমিই সে, অথবা সে-ই তো আমি

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য্য


“যখন গল্প লিখলুম, লোকে বললে, এসব আমার নিজের কথা। আর যখন আত্মজীবনী লিখলুম, সবাই বললে গল্প লিখছি”।


শিবের গীত

ছোটবেলায়, মানে যখন আমি ছেলে কি মেয়ে সে বোধ তৈরিই হয়নি, আমি একটি ‘মেয়েদের’ ইস্কুলে পড়তাম, পোষাকী নামে যাকে ‘মিক্সড প্রাইমারি ইংলিশ মিডিয়াম’ স্কুল বলা হতো। ক্লাস পিছু তিরিশ-চল্লিশ শতাংশ ছেলে ভর্তি হলেও আদতে কিন্তু ওটা মেয়েদেরই স্কুল – জাঁদরেল পাঞ্জাবি হেডমিস্ট্রেস মিসেস লালের নেতৃত্বে এক দল দাপুটে আন্টি (ওঁদের ‘সিস্টার’ বলে ডাকতে শেখানো হয়েছিল আমাদের) আমার ছোটবেলার শিক্ষা ও দীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। ক্লাসে মনিটর হতো সবচেয়ে ডাকাবুকো মেয়েটি, ‘সিস্টার’ ক্লাসে উপস্থিত না-থাকার ফুরসৎগুলো যে ত্রাসে ভরিয়ে রাখতো। পাশে বসা বন্ধুর সঙ্গে কথাটি বলেছি কি সঙ্গে সঙ্গে ব্ল্যাক বোর্ডের কোণে নাম টুকে রাখতো। এবার সিস্টার ক্লাসে এসে ওই নামের তালিকা ধরে শাস্তির বন্দোবস্ত করতেন। সর্বনিম্ন শাস্তি ছিল, নামের ইংরেজি বানানে যতগুলো অক্ষর, ততবার কান ধরে উঠবোস করা। আমার নামটি দীর্ঘতর, অন্তত জিগরি দোস্ত সুমন দে-র তুলনায়, ফলে ক্লাস-ভর্তি ষাট-সত্তরটি ছেলেমেয়ের সকৌতূক চাহনির সামনে আমায় প্রায় নিয়মিত যখন কান ধরে উঠবোস করতে হতো, সুমন ব্যাটা মাত্র আটবার করেই ছাড়া পেয়ে যেতো, কিন্তু আমার চলতো কুড়িবার!

তাও ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে কোনোরকমে চলছিলাম, কিন্তু ক্লাস ফোরে উঠেই এক মারাত্মক অভিযোগ এলো আমার নামে। আমি নাকি একটি সহপাঠিনীর স্কেচপেন চুরি করেছি! ট্র্যাডিশন্যাল পাঞ্জাবি সালোয়ার-কামিজে ভূষিতা বিরাট খানদানি চেহারার ক্লাসটীচার ‘কালসি সিস্টার’ এমনিতেই ব্রহ্মদৈত্যের মহিলা-সংস্করণ ছিলেন, তার উপর ক্লাসের সবচেয়ে আদুরে মেয়েটির সাশ্রু অভিযোগ বলে কথা, যার বাবা স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে ছিলেন! ফলে অভিযোগ মানেই অপরাধ স্যব্যস্ত হয়ে যাওয়া! আমার ছোট্ট স্কুলব্যাগ আর ডেস্ক তল্লাশিতে বমাল খুঁজে না পাওয়া গেলেও ‘কালসি সিস্টার’এর চড়চাপাটি কানমলা দিয়ে শুরু হয়ে হেডমিস্ট্রেসের ঘরে ক্রন্দসী বাদী ও বেয়াড়া ‘ছেলে’ অপরাধীকে পেশ করা ও বেশ কয়েকজন ‘সিস্টার’এর সহমতের ভিত্তিতে ঠিক হলো, ‘গার্জিয়ান কল’! সেই আট-নয় বছর বয়েসে সেই ইস্কুলে ওটাই ছিল ফাঁসীর হুকুম!

সেইদিন স্কুল-ফেরত আমি ঠিক করি যে আমি মরে যাব, মানে সন্ধ্যেবেলায় বাবা অফিস থেকে ফিরে এসে ওই ‘গার্জিয়ান কল’এর চিঠি হাতে পাওয়ার আগে আমায় মরে যেতেই হবে!

এই ঘটনার পাঁচ বছর পরে এক গ্রীষ্মের ছুটিতে আমার হাতে আসে মান্ধাতার আমলে ছাপা একটি বই। ১৯৮২ সাল, তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। ‘মেয়েদের স্কুল’ ছেড়েছি ওই পাঁচ বছর আগে, ছেড়ে ভর্তি হয়েছি আরেকটি ভারতবিখ্যাত বাংলা মিডিয়াম ইস্কুলে। তা গ্রীষ্মের সেই সুনসান দুপুরে চিলেকোঠায় জানালার গোবরাটে বসে সেই বইটির কয়েকপাতা পড়তে না পড়তেই আমি শিউরে শিউরে উঠে ভাবতে থাকি, এ কি! আমার পাঁচ-ছয়-সাত বছর আগে ফেলে-আসা, ভুলে-যেতে-চেয়েও কিছুতেই ভুলতে-না-পারা কাহিনিগুলো লেখক এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ জানলেন কি করে ? মেয়েদের ব্রাহ্ম ইস্কুলে সহপাঠিনীর তিন পয়সা চুরির মিথ্যে অভিযোগ মাথায় নিয়ে আট বছরের ‘স্থবির’ও মরে যেতে চেয়েছিল? আশি বছর আগে সেই ব্রাহ্ম ইস্কুলের আদুরে মেয়ে ‘সুবর্ণ’ যেন আমার সামনে ‘মিক্সড প্রাইমারি স্কুল’-এর নেভি-ব্লু স্কার্ট পরে ‘বব’-কাট চুলে ঘেরা মুখখানায় অভিযোগের অশ্রু মেখে এসে দাঁড়ায়, যে আমার দিকে আঙুল তুলে বলছে – ‘সিস্টার, দ্যাটস হিম, হি হ্যাজ স্টোলেন মাই স্কেচ পেন’! যে মিথ্যে অভিযোগের অভিঘাতে আট বছরের আমি আমার মা’কেও ছেড়ে মরে যেতে চেয়েছিলাম!

পাঁচ-পাঁচটা বছর পরেও সেই ঠা-ঠা দুপুরে চিলেকোঠায় একলা আমি ছটফটানো বুক-ফাটানো চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বইটি বুকে চেপে ধরি, এ বই আমার চিরসঙ্গী হবে যে। আসলে যেন বুকে চেপে ধরি আশি বছর আগেকার আরেক ‘আমি’-কে, যে নিজেই লিখেছে -

“...জন্মের ইতিহাস আমার জানা নেই। শুনেছি, প্রারব্ধ কর্মফলভোগের কিছু বাকি ছিল, তাই আমাকে জন্মাতে হয়েছে, নইলে আমি মুক্তপুরুষ। মৃত্যুর ইতিহাস লেখবার অবকাশ আমার হবে না – কারুরই হয় না”।

মহাস্থবির

এই ‘আমি’ কে ? ছত্রে ছত্রে এমন করে কে এঁকে গেল অমোঘ ভুয়োদর্শিতার এমন তন্নিষ্ঠ অথচ নিপাট সাদায়-কালোয় জাতক-কথামালা ?

যে ‘আমি’ আশ্চর্য এক গন্ডিছুট জীবনে পদে পদে আবছা ছায়া ছায়া অনুভব করে “...চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা, ত্বক, মন ও বুদ্ধির অগোচরে যে আরো একটা রহস্যলোক আছে...”, এবং যে লোকে প্রবেশ করবার চাবি সে খুঁজে ফেরে অক্লান্ত পরিক্রমায় – জীবনদরিয়ায় ভাসতে ভাসতে সে চাবির হদিস না-ই বা পেল সে! কিন্তু উথালপাথাল মহাজীবনস্রোতে সাঁতার কেটে সে-ই হয়ে ওঠে ‘মহাস্থবির’! অন্তরঙ্গ এক আপ্তস্বরে আমায় বলে যায় – সো’হম্ – ‘আমিই সে’, অথবা ‘সে-ই তো আমি’!

১৯৪৫এ ছাপা সেই বই, ‘মহাস্থবির জাতক’, লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। আদতে চার খন্ডের বই, পরে জেনেছিলাম এই মহাজীবনগাথার চতুর্থ ও সর্বশেষ খন্ডটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯এ, লেখক প্রয়াত হওয়ার পাঁচ বছর পরে। ১৯৮৬তে চার খন্ড একত্রে অখন্ড সংস্করণ বার করেন দে’জ প্রকাশনী, নব্বই দশকের শুরুতে জীবনে প্রথম আমার নিজের পছন্দে নিজে বেছে কেনা বইগুলোর মধ্যে প্রথমটি হ’লো ওই প্রায় সাড়ে ছ’শো পাতার অখন্ড ‘মহাস্থবির জাতক’। ‘মহাস্থবির’এর হাত শক্ত করে ধরে জীবন কাটানো শুরু হয়ে গিয়েছে এর অনেক আগেই, সেই ক্লাস নাইনের গ্রীষ্মের ছুটির দিনটি থেকে, আমি যখন চৌদ্দ।

****

ধান ভানা

সাহিত্যের কোন চরিত্র পাঠকের প্রিয়তম হয়ে উঠবে তার জন্যে লেখক-সৃষ্ট চরিত্রটির সঙ্গে পাঠকের জীবনকাহিনির সাদৃশ্য যে একান্ত প্রয়োজন তা মনে করবার কোনো কারণ দেখিনা। তবে একটা বড় কারণ সেটা হ’লেও হ’তে পারে। চরিত্রের সংগঠনে পাঠক যদি নিজস্ব অস্তির সামান্যতম প্রক্ষেপ খুঁজে পান; অথবা জীবনে যা চেয়েছেন বা যা চাইতে পারতেন, চারপাশে যা দেখেন আর যা দেখতে চান – তার অল্প খানিকটাও যদি কোনো চরিত্রের কার্যকলাপ-ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় প্রতিভাত হয়, সে চরিত্র স্বাভাবিক কারণেই হৃদয়গ্রাহী হয়ে ওঠে। এর অর্থ কখনোই এই নয় যে, তেমন চরিত্রকে অতি অবশ্য মরমানব অথবা অতিমানব হ’তেই হবে।

অখন্ড দে'জ সংস্করণ শ্রাবণ ১৪১৮ এর প্রচ্ছদ

সেই কোন ছেলেবেলা থেকেই আমার মনে হ’তো, কেন যে চুড়ান্ত ‘পরাধীন’ বাল্যকালকে মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বলা হয়! ‘ওদিকে যাবে না’, ‘ওটা খেতে নেই’, ‘সেটা করবে না’ – ইত্যকার হরেক রকমের ‘না’এর সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জেলখানায় বাল্যজীবন কাটে, অন্তত আমার তাই কেটেছে। আমার বিশ্বাস, আজো যে কোন শিশু নিশ্চিত একই অভিমত দেবে, কিন্তু বাচ্চাদের মতামত কবেই বা বড়দের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে? আমার তো মনে হয়, ছেলেবেলার চেয়ে যন্ত্রণাময় জীবনের আর কোনো পর্ব নয়; বড় হয়ে দায়দায়িত্ব বাড়ে ঠিকই, নানান অশান্তিও কম এসে জোটে না; কিন্তু বাল্যকালের চেয়ে ঢের বেশি স্বাধীনতা তো পাওয়া যায়! এবং আশ্চর্য, সিকি শতাব্দী আগে ‘স্থবির’এরও এমনটাই মনে হ’তো – “বাল্যকাল মোটেই সুখের কাল নয়। মানুষ, পশু, পক্ষী, বৃক্ষ, লতা প্রভৃতি এই ধরণীতে প্রাণবন্ত যা কিছু আছে, তার সম্যক বিকাশের জন্য চাই স্বাধীনতা। বাল্যকালের প্রতি মুহূর্তেই সেই স্বাধীনতা আহত হয়।...অবজ্ঞা, অবহেলা ও শারীরিক শাসনে যার সমস্ত সত্তা পীড়িত হয় সে বাল্যজীবনে সুখ কোথায়?” (জাতক প্রথম পর্ব)। কিন্তু শুধু মিলই বা কেন, অমিলও তো কম ছিল না! বাবার দোর্দন্ডপ্রতাপ থাকলেও তাঁকে কিছুতেই মহাদেব শর্মা ভাবা যাবে না। প্রথম সন্তান বলে বাবার শাসনের দাবদাহের মধ্যেও কিছুটা অহেতুক স্নেহমেঘচ্ছায়া আমি পেয়েছি, মহাদেব শর্মার দ্বিতীয় সন্তান (প্রেমাঙ্কুর আদতে ছিলেন পিতা মহেশ আতর্থীর দ্বিতীয় পুত্র ও তৃতীয় সন্তান) হিসেবে ‘স্থবির’ যা পায়নি কোনোদিন। মেয়েদের ইস্কুল পার করে নিমতলা ঘাটের ডফ সায়েবের ইস্কুলে ভর্তি হয়ে ‘স্থবির’ সেখানকার শিক্ষাদান পদ্ধতির যে দিকটার কথা সবচেয়ে বেশি করে বলেছে সেটা হ’লো সে স্কুলে বেশির ভাগ শিক্ষকের ছাত্র-প্রহারে অগাধ বুৎপত্তি। এই পর্বের সঙ্গেও আমি সম্যক পরিচিত, হাতের বেত অর্কেস্ট্রার হারমনি-মাস্টারের ভঙ্গিতে চালনা-করা শিক্ষক আমি দেখেছি। আদিম মানবকে আলতামিরার দেওয়ালে ছবি আঁকতে দেখিনি, তবে আমাদের এই ‘প্রহারপ্রিয়’ মাস্টারমশাইরা বোধহয় সেই আদিম চিত্রকরদের তুলি চালানোর ভঙ্গিতেই বেত্রচালনা করতেন, ছবি আঁকা হ’তো ছাত্রের হাতের তালুতে আর পিঠে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায়োজন পর্ব বর্ণনায় ‘স্থবির’ শুধু এ হেন মাস্টার-অবতারের হাতে ছাত্র-বধ পালা গেয়ে ক্ষান্ত দেননি, তিনি মার-খাওয়া অত্যাচারিতের পালটা প্রতিঘাত করবার ছবিও এঁকেছেন, তাঁর জাতকে মাস্টার-পেটানোর কাহিনিও বেশ বিস্তারিত ভাবেই আছে। ডফ সায়েবের স্কুলে ‘স্থবির’এর ক্লাসমেট আহেরীটোলার ছেলে সুরেশ্বরের অপরাধটা হ’লো যে সে নাটকে অভিনয় করেছে, আর সেটা জানা মাত্র চরম থিয়েটার-বিরোধী ব্রাহ্ম মাস্টার শ্যামবাবুর ক্রোধাগ্নি দ্বিগুণিত হয় – সুরেশ্বরকে তিনি অহেতুক আমানুষিক প্রহার করলেন ক্লাসের মধ্যে। তারই প্রতিক্রিয়ায় আহেরীটোলার ডাকাবুকো ছেলের দল (সুরেশ্বর অবশ্য তাদের কাউকে চেনে বলে স্বীকার করেনি) স্কুল-ছুটির পরে “শ্যামমাস্টারের বাপের বিয়ে দেখানো”-র বন্দোবস্ত করে। এবং, প্রকাশ্য রাজপথে শ্যামমাস্টারের তিন-মণি বপুটিকে তারা সবাই মিলে যা করে, তাকে আক্ষরিক অর্থে বলা চলে ‘কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো’। (জাতক প্রথম পর্ব)

এই জায়গাটা আমার যাকে বলে ‘unseen’, সম্পূর্ণ অজানা ছিল ইস্কুল-জীবনে। অথচ বিশেষ কয়েকজনের (তাঁদের শিক্ষক বলে মেনে নিতে পারিনি কোনোদিন) অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এমন কিছু করবার ছবি রাতের পড়া শেষে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসবা র আগে মনে-মনে যে কখনো কল্পনা করিনি তা নয়, কিন্তু দিনের আলো ফুটতেই সে সব বেমালুম বাষ্পীভূত হয়ে যেতো। সেই দিক থেকে ‘স্থবির’ আমার একরকম ইচ্ছে-পূরণের ‘আমি’।

‘বিদ্যালয়-দিনলিপি’ বলে একটা ব্যাপার আমাদের এই নামজাদা বাংলা মাধ্যম ইস্কুলে ছিল। ছাত্র কোনোদিন ইস্কুলে অনুপস্থিত থাকলে তাতে অনুপস্থিতির কারণ লিখে জানাতে হ’তো অভিভাবকের। আমার কোনো অনুপস্থিতিতেই বাবা কোনো মিছে অজুহাত ওতে লিখতেন না, কারণ মিথ্যাচরণ দিয়ে আর যা-ই করা যাক, ছেলে মানুষ করা যায় না (হায় পিতঃ, সে সব দিন হয়েছে গত)! স্রেফ ‘শারীরিক অসুস্থতা’ লিখলেই যেখানে ঝামেলা মিটে যায়, একবার উনি সেখানে বিস্তারিত লিখেছিলেন – ‘মাতুলের বিবাহ উপলক্ষ্যে কলিকাতায় অবস্থান করিবার কারণে বিগত দুই দিন শ্রীমান বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইতে পারে নাই। দয়াপূর্বক উহার অপরাধ মার্জনা করিবেন। ইতি ভবদীয় - ’! সে লেখা পড়ে ভারতবিখ্যাত বাংলা মিডিয়াম ইস্কুলে হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল! শ্রীমান তখন মাত্র দশে পড়েছে।

ওদিকে একবার ‘ওড়ন গচ্চা’য় ‘স্থবির’এর লাট্টু হাত থেকে উড়ে গিয়ে মা’য়ের পায়ের পাতায় পড়ে রক্তারক্তি কান্ড; তার ফলে পরম ব্রাহ্ম ও সত্যনিষ্ঠ পিতা মহাদেব শর্মা রবিবাসরীয় নীতিশিক্ষা বিদ্যালয়ে ‘স্থবির’এর ‘চরিত্র-পুস্তকে’ লিখে দিয়েছিলেন – ‘এই ব্যক্তি অত্যন্ত আত্মসুখপরায়ণ দুর্বৃত্ত। ক্ষণিক সুখের জন্য নারীহত্যা, এমনকি মাতৃহত্যায়ও পরাঙ্মুখ নহে’! ‘স্থবির’এর বয়েস তখন সাত কি বড়জোর আট! জাতকে স্থবির লিখেছে, তার চরিত্র-গঠনকালে পিতার এ জাতীয় বস্তুনিষ্ঠ পক্ষপাতশূণ্য মূল্যায়ন পড়ে তার সেই ‘সানডে’ মর‍্যাল স্কুলেও থেকে থেকেই বিদ্রূপহাস্যের অট্টরোল উঠতো! (জাতক প্রথম পর্ব)

এবং, বয়ঃসন্ধি! সে যে এক উন্মনা সময়; তার ভাবনাচিন্তার জগত, দুঃখ-বেদনা, চাহিদা, শরীর, মন-মননে কত অজানার ছায়াপাত – সে সবের গভীর-গোপন কথাগুলো পাই কোথায় ? দৌড় যে তখনো পর্যন্ত রবিঠাকুরের ‘ছুটি’র ফটিক অবধি। এই পরিস্থিতিতে ‘স্থবির’-রা তিন ভাই (বয়ঃক্রম অনুযায়ী স্থির-স্থবির-অস্থির) এবং আরো বিশেষ করে বললে, ‘স্থবির’ আর ‘অস্থির’এর কীর্তিকলাপ (জাতক প্রথম পর্ব) বয়ঃসন্ধির উজানগাঙে হাবুডুবু-খাওয়া এক বালকের হাত ধরেছিল ভারি সহজে। সেই ‘মেয়েদের ইস্কুল’ থেকে শুরু করে নারীকে প্রথম ‘নারী’ হিসেবে চেনার বয়ঃকালে পৌঁছনোর গপ্পটা সোজা বলে দেওয়া কি সহজ কথা নাকি? ‘স্থবির’ কিন্তু অবলীলায় তা করেছে। প্রথম প্রেম ও যৌনতার উন্মেষ এত অকপটে যে বলে ফেলা যায় তা ‘স্থবির’এর সঙ্গে পরিচয়ের আগে জানা ছিল না। সেই যে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘরে পড়ে-থাকা টিনের বাক্স থেকে একদিন নাম-না-জানা কবির লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘ফুলের মালা’ আবিষ্কার, তারপর একে একে অবনীন্দ্রের ‘ক্ষীরের পুতুল’, বঙ্কিমের ‘চন্দ্রশেখর’, রমেশ দত্তের ‘মাধবীকঙ্কণ’, মাইকেল, বিদ্যাপতি, চন্ডীদাসের কাব্যগ্রন্থ – ‘স্থবির’এর মানসলোকে এক অনাস্বাদিত-পূর্ব রশ্মিপাত। পঙ্গু বালিকা ভিখারিনী থেকে শুরু করে নন্দা, লোকা হয়ে ‘লতু’! তারপর, বলা নেই, কওয়া নেই আচমকা এক শুক্লা-ত্রয়োদশীর জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে ছাতের এক বিজন কোণে বুকের মধ্যে থেকে একখানি মোটা বেলফুলের মালা বার করে ‘স্থবির’-এর গলায় পরিয়ে দিয়ে স’বার অগোচরে লতু ‘স্থবির’কে বিয়ে করলো! তখন লতু তেরোতে আর চৌদ্দ বছরের ‘স্থবির’ –

“চারিদিকের সেই জ্যোৎস্নারাশির সঙ্গে আমি যেন রেণু রেণু হয়ে একাকার হয়ে গেছি। ফুলমালার স্পর্শে অস্থিমাংসের অস্তিত্ব যেন আমার লোপ পেয়েছে, বায়বীয় শরীর নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ... সেই জ্যোৎস্নাসাগরে আমরা দু’টিতে ভেসে চলেছি - ... সেই বিরাট নিস্তব্ধতার মধ্যে কানে শুধু একটা আওয়াজ শুনতে লাগলুম, ধক-ধক-ধক। সেটা কার বুকের আর্তনাদ, তা ঠিক বলতে পারিনা।”

আমার নিজের চৌদ্দ বছর বয়েসে এই কাহিনি পাঠকালে আমি চরাচরে স্পষ্ট শুনেছিলাম সে ‘ধক-ধক-ধক’...তখন বুঝিনি, আজ বুঝতে পারি ওটা আমারই বুকের আর্তনাদ ছিল!

তারপর আসেন ‘পাগলা সন্ন্যেসী’, উগ্রক্রোধী পিতা মহাদেব শর্মার আসুরিক শাসনবহ্নি থেকে ‘স্থবির’ আর ‘অস্থির’কে যিনি রক্ষা করেন। শুধু রক্ষা করাই বা কেন, সন্তানদের শাসনের নামে মহাদেবের অমন পাশবিক প্রহারের বিরুদ্ধে তাঁর যুক্তিপূর্ণ সওয়ালের কোন সদুত্তর মহাদেব দিতে পারেননি। সদ্য লতুর প্রেমে-পড়া ‘স্থবির’এর আচরণে সামান্য উচাটন ভাব লক্ষ করেছিলেন একমাত্র তিনিই – “...তোমাকে ব্রাদার কিছুদিন থেকে যেন কেমন-কেমন দেখছি! লভে-টভে পড়েছ নাকি?” তারপর ‘অস্থির’এর কাছে ‘লতু’-বৃতান্ত জেনে নিয়েই তাঁর উল্লাস – “সাবাস ব্রাদার! কাল থেকে বায়রন পড়া যাবে, কি বল?” ‘লভ’এ পড়লে কেন ‘শেলী’ নয়, কেন ‘বায়রন’, সে খোঁজেই তো মনের বয়েস বেড়ে গেল অনেক! তিয়াত্তর বছরের ‘পাগলা সন্ন্যেসী’র দুই চুড়ান্ত অসমবয়েসী বন্ধু ‘স্থবির’ আর ‘অস্থির’, যাদের সঙ্গে তাঁর শেলীর কবিতা আলোচনা, বায়রন-পাঠ আর, মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে তিনজনে একত্রে মদ্যপান! যেন অনেকটা তাঁর প্রিয় কবি শেলীরই মত, স্বেচ্ছায় যাচ্ছেন এবং আর ফিরবেন না জানেন সুনিশ্চিত, কিন্তু তিনি প্রত্যয়ী –

“...Death cannot part us - we must meet again
In all in nothing in delight in pain
How, why or when or where – it matters not
So that we share an undivided lot….” (জাতক, প্রথম পর্ব)

ভরা জোছনায় অলীক স্বপ্নের মতো সেই গান্ধর্ববিবাহের একবছর পরেই যখন এলো ‘লতু’র সঙ্গে অনিবার্য বিচ্ছেদক্ষণ, বেদনার বিষনীল অন্ধকারে ‘স্থবির’এর ‘মহাস্থবির’এ উত্তরণমন্ত্র তো শিখিয়ে দিয়ে গেলেন সেই ‘পাগলা সন্ন্যেসী’ই!

****

এবং, নটে গাছটি মুড়োনো

মাত্র পনেরো বছর বয়সে প্রথমবার গৃহত্যাগ করে (এইখানেই ‘জাতক’-এর প্রথম পর্বের ইতি টেনেছিলেন লেখক) কাশীধামে উপস্থিত হয় ‘স্থবির’। ভারত-মর্মকথা শিক্ষা শুরু করবার জন্যে কাশীর চেয়ে ভালো পাঠশালা আজও আছে কি? ‘স্থবির’এর ‘মহাস্থবির’ হয়ে উঠবার বর্ণময় পরিক্রমণপথের শুরু থেকে শেষ অবধি আঁকেবাঁকে তাই রকমারি চরিত্রের সন্নিবেশ। তারা সক্কলেই যে যেমনটি পারে তেমন আলো দিয়ে ‘মহাস্থবির’এর যাত্রাপথ সাধ্যমত আলোকিত করেছে। স্বাভাবিক, আপন হ’তে বাহির হয়ে দাঁড়াবার স্পর্ধা যে ধরে, তারই সে আলোকসরণী পরিব্রাজনের সৌভাগ্য হয়। চেনা পথ, চেনা মানুষ, চেনা পরিবৃত্তের গন্ডী ছেড়ে চুড়ান্ত অচেনায় অবগাহন করবার নিশির ডাক তো সবার কানে বাজে না। অথচ, সেই তো প্রকৃত জীবনায়ন, সেই তো জীবনে পরম ঋদ্ধ্বিলাভের পথ!

আসলে ‘স্থবির’ তো সেই নির্বেদী ঘোড়সওয়ার যে গোপন করেনা কিছুই। জীবনপথে চলতে চলতে অগণিত নরনারীর বর্ণাঢ্য মিছিলে ‘যদ্‌দৃষ্টং তল্লিখিতম’ – ‘যা দেখলাম, তাই লিখলাম’ করে অকপটে সে লিখে গিয়েছে তার অত্যাশ্চর্য কাহিনি অদ্ভুত এক স্বাদু ভাষায়! সে কাহিনির বাঁকে বাঁকে আমার চেনা নানা নক্সা দেখতে পাই, অচেনাও প্রচুর।

‘জাতক’-এর চারটি পর্বেই উদাসী রাজপুত্রের হেলায় ছড়িয়ে ফেলা মণিমাণিক্যের মতো ছড়িয়ে আছে আনন্দে-অশ্রুতে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার হীরেমানিক। পড়তে পড়তে চমকে উঠে ভাবতে বসতে হয় যে কোন দৈবশক্তিতে নশ্বর মানবের এ হেন অন্তর্ভেদী দৃষ্টিলাভ সম্ভব! ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে যিনি বলতে পারেন – “...আজ ভারতবাসী পূর্ণস্বাধীনতা প্রয়াসী, অর্থে সামর্থ্যে তারা আজ অনেক উন্নত, অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ব্যবহার – সে দিক থেকে তারা যে কত দরিদ্র হয়ে পড়েছে, তা আমার মত অভিজ্ঞতা যার আছে, সে-ই জানে” (জাতক, দ্বিতীয় পর্ব), তাঁর দৃষ্টির দূরগামিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে কি? ‘জাতক’এর তৃতীয় পর্বে স্বদেশী আন্দোলনের অজানা কাহিনি। ঠিক প্রামাণ্য ইতিহাস হয়তো নয়, এক সদ্য তরুণের নজরে দেখা স্বদেশী আন্দোলন। যিনি দেখেছেন ইংরেজের তৈরি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে “গোলামখানা” বলে ধিক্কারের হুজুগে মেতে ‘স্বদেশী বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের প্রয়াস; এবং কৌতূকের সঙ্গে লক্ষ করেছেন সেই ‘স্বদেশী’ প্রয়াসের কর্তাব্যক্তিদের নিজের ছেলেমেয়েদের ওই ‘গোলামখানা’তেই পড়তে পাঠাবার সুচারু বন্দোবস্ত! চতুর্থ পর্ব শুরু হচ্ছে আরব-সাগরের তীরে, অশান্ত ঊর্মিমালার “অবিশ্রান্ত হাহাকার” আর তার পানে বিপুল সন্ধ্যাকাশের নির্মোহ চেয়ে থাকার বর্ণনা দিয়ে। সে মোহমুক্ততার শিক্ষা সার্থক হয় যখন আগ্রায় ‘নতুন-মা’এর অফুরান ধনরাশি থেকে মাত্র “পঁচিশটে টাকা” ‘স্থবির’ হাত পেতে নেন, ‘নতুন-মা’র শত উপরোধেও আর একটি কানাকড়িও নিতে চাননি! তাঁর ‘জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা’ - কত বয়েস তখন তাঁর, হ’তে পারে মাত্র ঊনিশ, কিন্তু ততদিনে তিনি যে ‘মহাস্থবির’!!

‘মহাস্থবির জাতক’ আদ্যন্ত প্রেমাঙ্কুরের আত্মকথন, কিন্তু তার রূপটি অতি আকর্ষণীয় উপন্যাসের। তাই উপন্যাসের কেন্দ্রে ‘স্থবির’, প্রথম পুরুষে তারই যেন মুখে মুখে বলে যাওয়া কাহিনি। অথচ লেখকের মুন্সিয়ানা এই যে, কোথাও সে ‘আমি’ সোচ্চার যেমন নয়, আবার অগণিত চরিত্রের বর্ণালির মাঝে সে ‘আমি’ তার স্ব-ভাব, তার স্বকীয়তা হারিয়েও ফেলেনি কখনো। বার বার সে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে, রবীন্দ্রনাথের ‘অতিথি’র ‘তারাপদ’র মতো। তার পাঠ সম্পূর্ণ হয়েছে ইস্কুলের চার-দেওয়ালের বাইরে, বহমান মহাজীবনের সান্নিধ্যজনিত অভিজ্ঞতার কড়া পাক আর নরম পাকে। তার চুড়ান্ত নৈর্ব্যক্তিক অথচ তীব্র অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি অর্জিত হয়েছে বহুবিচিত্র জীবনরস আস্বাদনে। প্রতিদিনের চেনাপথের সমতল আটপৌরত্বে সে বিচিত্রতা কোথায়? সে দিক থেকে শরৎচন্দ্রের অমর সৃষ্টি ‘শ্রীকান্ত’এর সমগোত্রীয় হয়েও প্রেমাঙ্কুরের ‘মহাস্থবির জাতক’ আপন বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। সে ‘মহাস্থবির’ - সহস্র মানুষের মিছিলে সে এক নিঃসঙ্গ পথিক, যেন দেবতার মতো, অভিশাপের মতো একা - শেলীর Alastor-এর মতো সে ক্লান্তিবিহীন খুঁজে চলেছে তার শেষ আশ্রয় -

“…One silent nook
Was there. Even on the edge of that vast mountain
….that seemed to smile
Even in the lap of horror - ”

‘মহাস্থবির জাতক’ মানবজীবনের সেই চিরন্তন আপ্তস্বর অনুসন্ধানের এক চিরস্মরণীয় আখ্যান।


লেখক পরিচিত - পেশা - কলকাতার উপকন্ঠে একটি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপনা, নেশা - হিমালয় আর থিয়েটার। বাংলায় লেখালেখির অভিজ্ঞতা - না-থাকার মত, ইদানীং দু'চারটি পত্রপত্রিকায় অনিয়মিত কিছু লেখা ছাপা হয় বলে উত্তরোত্তর স্পর্ধা বাড়ছে। তবে সময়ের দাম সম্পর্কে ধারণা না থাকায় উত্তরণ হ'বার নয়। একটা পাহাড়-জঙ্গল জায়গায় হলুদ পাতায় ছাওয়া বনে মরবার ইচ্ছে।

 

Copyright © 2018 Abasar.net. All rights reserved.