অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


প্রিয় চরিত্র

অবসর বিশেষ সংখ্যা এপ্রিল ১৫, ২০১৮

 

আগ্রা যখন টলমল এবং চাটুজ্জেদের রোয়াক

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল

‘এদের গল্প শোনবার জিনিস, বিশ্বাস করবার নয়। তবে বিশ্বাস করাই ভাল, নইলে ঠকতে হয়’ – মন্তব্যটি করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী তাঁর সৃষ্ট নীললোহিত চরিত্রের পরিচয় দিতে গিয়ে।

শিশু-কিশোর সাহিত্যের যাঁরা মুগ্ধ পাঠক, তাঁরা জানেন প্রমথ চৌধুরী কি অপূর্ব নৈপুণ্যে তাঁর নীললোহিত চরিত্রটি সৃষ্টি করেছিলেন। তবে এ-কথাও ঠিক যে, এখনকার পাঠক অনেকেই কিন্তু নীললোহিতের কথা জানে না। যাই হোক, তিনি কি তাঁর আগে এ-রকম কোনও চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন?

ঘনাদার জন্ম অনেক পরে হয়েছে তা অবশ্যই ঠিক, কিন্তু ব্যারন মাঞ্চোসেনের কথা চৌধুরী মশাইয়ের মাথায় ছিল না, এমন নয়৷

চৌধুরী মশাই জানিয়েছিলেন, “কাইজার নাকি তাঁকে বলেছিলেন যে নীললোহিত যদি তাঁর সঙ্গে জার্মানিতে যান, তাহলে তিনি তাঁকে সাবমেরিনের সর্বপ্রধান কাপ্তেন করে দেবেন। যে মাইনে কাইজার তাঁকে দিতে চেয়েছিলেন তাতে তাঁর পোষায় না বলে তিনি সে প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন৷”

ওদিকে প্রেমেনবাবু ঘনাদাকে দিয়ে বলান,

“সেই যে সাংকুর নদীর ধারে এম বুজি মাঈ থেকে হিরে পাচার করার জন্য আমায় ম্যাজিকের ধোঁকা দিয়ে এপুলু-তে নিয়ে গিয়ে মিথ্যে খবরে ইতুরি-র গহন বনে পাঠিয়ে জংলিদের ঝোলানো ফাঁসিতে লটকে মারার চেষ্টা করেছিল, আর যার মতলব হাসিল হলে পৃথিবী আরও বিরাট হয়ে দুনিয়ার কি দশা হত জানি না, সেই মালাঞ্জা এমপালে ভেবেই আপনাকে একটু তাচ্ছিল্য করেছিলাম গোড়ায়৷”

গল্প পরিবেশনে এই দুরন্ত অননুকরণীয় ভঙ্গি বাংলা সাহিত্যে বিরল।

বাংলা সাহিত্যে যাকে টলস স্টোরি বা টল টেলস-এর মর্যাদা দেওয়া হয়, তাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন প্রমথ চৌধুরীই, মাঞ্চোসেন বা নীললোহিত যে-কৌলীন্য অর্জন করেছিল, তার উত্তরসূরি হল ঘনাদা।

মশা

১৯৪৫ সালে দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী “আলপনা” য় ঘনাদা সিরিজের প্রথম গল্প "মশা" প্রকাশিত হয়।

অজিত গুপ্ত চিত্রিত – ঘনাদা

এই সিরিজের প্রথম বই ঘনাদার গল্প ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত। এই বইতে অজিত গুপ্ত চিত্রিত ঘনাদার চেহারাই বাঙালীর মনে জায়গা করে নিল।

লম্বা, হাড়-জিরজিরে দেহের গড়ন। আর ইয়া লম্বা তার নাক। বয়স? সে কথা আর না বলাই ভালো, আন্দাজ করাই ভার! ৩৫ থেকে ৫৫- এর মধ্যে একটা কিছু হবে। জিজ্ঞাসা করবে কে? অমনি বলবেন, এত দেশ ঘুরেছি, বয়সের হিসেব রাখবো কি করে? এমন লোককে কি, ঠিক গুলবাজ বলা যায়!

ঘনাদার গল্পগুলি দুটি বর্গে বিভক্ত - কল্পবিজ্ঞান আর ঐতিহাসিক গল্প।

ঘনাদা প্রেমেন্দ্র মিত্রের সৃষ্ট চরিত্র। পুরো নাম ঘনশ্যাম দাস। থাকেন, বেহালার - ৭২ নং বনমালী নস্কর লেনের একটি মেসের তেতলার এক চোরা কুঠুরিতে। খালি সকলকে গল্প শোনান, আর শিশিরের কাছ থেকে ধার করে সিগারেট খান, কোনো কাজই করেন না।

প্রেমেন্দ্র মিত্র

তবে, তিনি কিন্তু অকৃতজ্ঞ নন, প্রতিবার ধার করেন আর শিশিরকে বলেন কত তম সিগারেট ধার করলেন। আর তিনি যে অনেক সিগারেট ধার করেছেন তাও কিন্তু নয়, এক গল্পে দেখা গেলো সংখ্যাটা ২৮৫৭, কয়েক গল্প পরেই সেটা ৩৮৯৯, এ আর কতো-ই বা!

এখানেই তাঁর কীর্তির শেষ নয়। দু:খের বিষয় – প্রায় প্রতিটা গল্পের শেষেই শিশিরের সিগারেটের টিনটা ঘনাদার হস্তগত হয়ে যায়, সেটা আর ফেরত পাওয়ার কোনো আশা থাকে না। ওনার মেস ভাড়া বলতে গেলে বাকিই পড়ে থাকে।তবু মেসের বাকি সদস্যরা, মানে শিবু, শিশির, গৌর আর সুধীর তাকে বেশ পছন্দই করে। তাঁকে আরাম কেদারা ছেড়ে দেয়, তাঁর জন্যে দুইদিন পরপর নবাবী খানার ব্যবস্থা করে দেয়, কেবল তাঁর গল্প অর্থাৎ গুল-গল্প শোনার জন্যে।

এই মেসের অন্যান্য চরিত্রদের মধ্যে আছে রামভুজ নামের রাঁধুনি ঠাকুর আর সর্ব ঘটের কাঁটালি কলা ফরমাইস খাটা- বানোয়ারী – মেসের বাবুদের ফাই-ফরমাস খাটিয়ে – মাঝে মাঝেই বনোয়ারীর ওপর দায়িত্ব পড়ে চ্যাঙ্গারী চ্যাঙ্গারী সুখাদ্য সরবরাহ করার।

এই অদ্ভুত মজার আর গুলবাজ (?) ঘনাদা কিন্তু বেশ জ্ঞানী। তিনি বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন সব বিষয়ে এতো বেশি জানেন, তাঁকে টেক্কা দেবে কে?

আর তাই তো তাঁর গুল্প গল্প শুনে এত মজা। গল্পে গল্পে কখন যে বিজ্ঞানের মজার মজার সব ব্যাপার শিখিয়ে দেবেন, কেউ টেরও পাবে না। আর সে তিনি যে কি ভয়ানক সাহসী আর বীর, তার আর কি বলবো! কত পালোয়ান দেখা যায় তাঁর কাছে মার খেয়ে চিৎপটাং। কত বিপদে কত ভয়াবহ কাজ করার কথা আছে তাঁর গল্পে।

অথচ একবার যখন মেসের সবাই মিলে ঘুরতে বের হলো, প্লেনে চড়তেই তাঁর সে কই ভয়! অবশ্য গল্প শুনিয়ে তিনি প্রমাণ করে দিলেন, তিনি মোটেই ভয় পাচ্ছেন না। তিনি আসলে অতো বাজে প্লেনে চড়েনই না! আবার মাগুর মাছ ঘনাদা কেন খাননা তা তিনি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন, অবশ্য তা রোববারের দুপুরের ভুরিভোজের পরে। একপ্রকার মাগুরমাছ নাকি ভূমিকম্পের পূর্বাভাষ দিয়ে তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিল, সেই থেকে তিনি মাগুরমাছের প্রতি কৃতজ্ঞ।

বনমালী নস্কর লেনের এই মেসবাড়ি ছাড়াও কয়েকটি গল্পে বা উপন্যাসে লেকের ধারের সান্ধ্য-আড্ডায় ঘনাদাকে আসর জমাতে দেখা যায়। এখানে ঘনাদা আর সাধারণ ঘনাদা নয় – ইনি এখন ঘনশ্যাম বাবু। এই সব গল্পগুলিতে মেসবাড়ির মজলিশি আড্ডার পরিবর্তে গুরুগম্ভীর আলোচনার মেজাজ লক্ষ্য করা যায়।

কথা-সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখনীর মুনশিয়ানা দাপটে এখানে এসে হাজির হন ঘনাদার পূর্বপুরুষরা – ঘনাদা এই সব গল্পগুলির নায়ক নন, পরিবর্তে পৃথিবী রক্ষার দায়িত্বে আসেন ‘তস্য তস্য’ ব্যক্তিরা।

ইনকা সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে শিবাজীর আগ্রা থেকে পলায়ন – এইসব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনায় ঘনাদার পূর্বপুরুষ গানাদো বা ঘনরাম দাসের অবদান - লেকের ধারের এই আড্ডা ছাড়া জানা কখনই সম্ভব ছিল না।

স্মরণ করা যাক, ঘনাদার প্রবীণ বন্ধুদের পরিচয়৷ যাঁরা একটি জলাশয়ের ধারে একটি নাতি বৃহৎ পর্কটী বৃক্ষকে কেন্দ্র করে সমবেত হন৷ তাঁরা কে? না – মেদভারে হস্তীর মত বিপুল সেই সদা প্রসন্ন ভবতারণ বাবু, উদরদেশ যাঁর কুম্ভের মত স্ফীত সেই রামশরণবাবু, মস্তক যাঁর মর্মরের মত মসৃণ সেই শিবপদবাবু, মাথার কেশ যাঁর কাশের মত শুভ্র সেই হরিসাধনবাবু এবং উষ্ট্রের মত শীর্ণ ও সামঞ্জস্যহীন – আলোচনার প্রাণ ও প্রাণান্ত ঘনশ্যাম দাস ওরফে কোনও মহলে যিনি ঘনাদা৷

লেকের ধারের এই আড্ডার গল্পগুলিতে নায়িকার আবির্ভাব ঘটেছে ও কিছু পরিণত দৃশ্যেরও সূচনা হয়েছে, সেকারণে বলা যেতে পারে যে এই গল্পগুলি পরিণত বয়স্ক পাঠকদের কথা মাথায় রেখেই প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন। এই ঘনশ্যাম দাস অতি উচ্চস্তরের মানুষ – তিনি নিঃসংশয়ে ড্যানিয়েল ডিফোর ভুল ধরে জানিয়ে দেন –“রবিনশন ক্রুশো মেয়ে ছিলেন।”

এই সব গল্পের যিনি লেখক, সেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের ডাক নাম ছিল – সুধীর । শিবু, গৌর ও শিশির চরিত্রগুলি যথাক্রমে লেখক শিবরাম চক্রবর্তী, চলচ্চিত্র পরিচালক ও সম্পাদক গৌরাঙ্গ প্রসাদ বসু এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক ও অভিনেতা শিশির মিত্র ।

ঘনাদা ও সাথীরা

এই চারজন সত্যিই বেহালার একটা মেসে থাকতেন, একসঙ্গে। এই সূত্রেই অনেকের জানতে ইচ্ছে করে ঘনাদা, চরিত্র কল্পনাকালে লেখক কোনও বাস্তব চরিত্র অবলম্বন করেছিলেন কি না।

এ নিয়ে বেশ মজার ইতিহাস আছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর ঘনাদা চরিত্র কল্পনা করেছিলেন দুই বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী মধ্যবিত্ত বাঙালি মানসিকতার বারফট্টাইকে মনে রেখে। কারও মতে ঘনাদা আসলে বিমল ঘোষ নামে মেসের এক বাসিন্দা, যাঁকে প্রেমেনবাবু ডাকতেন টেনদা বলে।

সেই ঘনাদা, আমাদের আজও আনন্দ দিয়ে চলেছেন, অনবরত ভাবে। আর কি কেউ লিখতে পারবেন এই ভাবে? কে জানে!

ঘনাদা বেশ জটিল, টেনিদা কিন্তু বেশ সাদাসিধে মানুষ।

ট্রেনে চাপলেই আপনাকে হয় বর্ধমান নয় খড়গপুর যেতেই হবে।

নো অপশন

টেনিদা বহুদিন আগেই উবাচ। টেনিদা – নামটা শুনলেই না, কেমন গা ছমছম করে! বাপরে!!!!! এই বুঝি ডালমুট, পাঁঠার ঘুগনি খেতে চাইবে!

প্যালা একবার বলেছিল, হাওড়া, ইষ্টিশনে, জুতো বুরুশ যাচ্ছে, খাবে নাকি টেনিদা? টেনিদার যা চোপা!!!!!!!!

তবে টেনিদার সিংহ হৃদয়। আমাদের লিডার। ভজহরি মুখুজ্জে বলে কথা!!!! ম্যাট্রিক দিয়েছে, স্কুল ফাইনাল দিয়েছে, কে জানে হায়ার সেকেন্ডারিও দেবে কিনা!! তবে ৭ বারের চেষ্টায় স্কুল ফাইনাল পাশ করেছে। সিটি কলেজ আবার কোদালে অমাবস্যাতেও ছুটি দেয়। গাবলু মামার আর কোনো খোঁজ নেই, কুট্টি মামা বাঘের দাঁত আর বাঁধালো কিনা জানা নেই!

ক্যাবলা [কুশল মিত্র] “ছপ্পর উপর কৌয়া নাচে, নাচে বগুলা” গাইছে না।

হাবুল [স্বর্ণেন্দু সেন] “মেকুরে হুড়ুম খাইয়া হৈক্কর করসে” বলছে কি?

প্যালা [কমলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়]‍“ বাসক পাতা দিয়ে সিংগি সিঙি মাছ” খাচ্ছে কিনা জানি না। পটলডাঙায় চাটুজ্জেদের রোয়াকটা কি আর আছে? নাকি ওটাও promoting হয়ে গেছে?

হতে পারে, তবে আমাদের স্মৃতিকে তো কেউ মুছতে পারবে না।

প্যালার দুই বোন- পুঁটি আর আধুলির বিয়ে হয়েছে কি? বাঙ্গালির আজ ঘোর দুর্দিন।

একটা বিষয় ভুললে চলবে না, আমাদের বাল্য বা কৈশোরের থেকে এখনকার বাল্য বা কৈশোর অনেক এগিয়ে । পুলিশ- ভূত- প্রেত- দৈত্য- দানোর গল্প যেমন আমরা আগ্রহ ভরে শুনতাম বা পড়তাম, সেটা বোধহয় এখনকার বাচ্চারা সেভাবে শোনে বা পড়ে না।

নেট এবং নানা বিষয় পড়া এবং শোনার ফলে - তাদের বুদ্ধিমত্তা অনেকখানি এগিয়ে গেছে, কালের নিয়মেই। জীবনের সময় সরণীতে বাল্য কৈশোর এক স্বর্ণ সময়।

তাই জীবনে টেনিদা, ঘনাদারা বারবার ফিরে আসে।
আমার স্বপ্নে ওরা কথা বলে, হাসে, গাঁট্টা মারে, আলু-কাবলি খায়।
মাংসের ঘুগনির সুগন্ধে জীবনটা ম ম করে।
ছেলেবেলার “দুষ্টুমি”গুলো ফুটে ওঠে টেনিদার কথায়।
টেনিদা পরীক্ষায় ফেল করে। নাকি এনট্রান্স /ম্যাট্রিক / স্কুল ফাইনাল সব দিয়েছে, কে জানে হায়ার সেকেন্ডারি দেবে কিনা!
পরীক্ষায় তো সবাই পাশ করে – তবে ফেল করে কয়জন?
এই হচ্ছে – আমাদের লিডার টেনিদা।

টেনিদার সোল্লাসে সেই চিৎকার, 'ডি-লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস' সেই সাথে বাকি তিনজনের একসাথে "ইয়াক-ইয়াক'- কে ভুলবে? সেটা নাকি আবার ফরাসী ভাষাতে উল্লাস প্রকাশ। ‘ঝাউবাংলোর রহস্য’ তে অবশ্য এক ভদ্রলোক জানান তিনি অনেকদিন ফরাসী ভাষা চর্চা করছেন কিন্তু এরকম শোনেননি।

পটলডাঙার টেনিদা এবং তার তিন যোগ্য শিষ্য প্যালা, হাবুল ও ক্যাবলা স্কুলের শেষ পরীক্ষার পর বেড়াতে চলে যায় ঝন্টিপাহাড়ে মেশোমশাই-এর সদ্য কেনা বাংলোতে। ঝন্টিপাহাড়ীর মনোরম পথে যেতে যেতে টেনিদার মনে হল – “পথের ধারে পাকা পাকা আম আর কাঁঠাল ঝুলছে” – হাবুলের তাৎক্ষণিক মন্তব্য – “আর গাছের মালিক ঠ্যাঙা নিয়া তাইড়া আসছে” !! টেনিদা রেগে আগুন, - “দিলে সব মাটি করে – কোত্থেকে ঠ্যাঙা ফ্যাঙা এসে হাজির করলে!”

সেখানে অবশ্য পরে তারা টেনিদার নেতৃত্বেই সমাধান করে ভুতুড়ে রহস্য।

টেনিদার স্রষ্টা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

ঘনাদা ও সাথীরা

‘চারমূর্তির অভিযান’ উপন্যাসে কুট্টিমামার কাছে বেড়াতে গিয়ে প্রথম প্লেনে চড়ে টেনিদা আর তার তিন সাগরেদ। সেখানেই জানতে পারি, তাদের ভাল নামগুলো। টেনিদা – ভজহরি মুখার্জি
প্যালা – কমলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়
হাবুল – স্বর্ণেন্দু সেন
ক্যাবলা – কুশল মিত্র।

“সেই যে - সেবার গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি বেড়াতে গেছি। ওই যে একটা ছড়া আছে না — ‘মামাবাড়ি ভারি মজা — কিল চড় নাই’? কথাটা একদম বোগাস — বুঝলি? কক্ষনো বিশ্বাস করিসনি।

অবিশ্যি মামাবাড়িতে ভাল লোক একেবারে নেই তো নয়। দিদিমা, দাদু এরা বেশ খাসা লোক। বড় মামিরাও মন্দ নয়। কিন্তু ওই গাবলু মামা-টামা — বুঝলি, ওরা ভীষণ ডেঞ্জারাস হয়।

বললে বিশ্বাস করবিনে, সাতদিনের মধ্যে গাবলু মামা দু’বার আমার কান টেনে দিলে। এমন কিছু করিনি, কেবল একদিন ওর ঘড়িটায় একটু চাবি দিয়েছিলুম — তাতে নাকি স্প্রিংটা কেটে গিয়েছিল।

আর একদিন ওর শাদা নাগরাটা কালো কালি দিয়ে একটু পালিশ করেছিলুম, আর নেটের মশারিতে কাঁচি দিয়ে একটা গ্র্যান্ড জানলা বানিয়ে দিয়েছিলুম। এর জন্য দু’দিন আমার কান ধরে পাক দিয়ে দিলে। কী ভীষণ ছোটলোক বল দিকি।

তা করে করুক — গাবলু মামা — খ়ড়গপুরে দিনগুলো আমার ভালোই কাটছিল। দিব্যি খাওয়া-দাওয়া — মজাসে ইস্টিশানে রেল দেখে বেড়ানো, হাঁটতে হাঁটতে একেবারে কাঁসাইয়ের পুল পর্যন্ত চলে যাওয়া, সেখানে বেশ চড়ুইভাতি — আরও কত কী বেশ ছিলুম।

বেশ মনের মতো বন্ধুও জুটে গিয়েছিল একটি। তার ডাক নাম ঘটা। — ভালো নাম ঘটকর্পর। ওর ছোট ভাইয়ের নাম ক্ষপণক, ওর দাদার নাম বরাহ। ওদের বাবা গোবর্ধনবাবুর ইচ্ছে ছিল, — ওদের ন-ভাইকে নিয়ে নবরত্ন সভা বসাবেন বাড়িতে।

কিন্তু ক্ষপণকের পর আর ভাই জন্মাল না — খালি বোন আর বোন। রেগে গিয়ে গোবর্ধনবাবু তাদের নাম দিতে লাগলেন, জ্বালামুখী, মুণ্ডমালিনী এই সব। এমনকি খনা নাম পর্যন্ত রাখলেন না কারুর।”

ঘটাকে অবশ্য পছন্দ টেনিদার।

“ওর ঠাকুরমার ভাঁড়ার থেকে আচার–টাচার চুরি করে এনে আমায় খাওয়াত — অমন ভালো ছেলে দুনিয়ায় আর হয় না!”.

কিন্তু এই ঘটাই টেনিদাকে নিয়ে গেছিল – গোবর্ধনবাবুর আমের বাগানে। সেই ব্রহ্ম টক আম খেয়ে সায়েবের বাত সেরে যায় আর টেনিদার গাবলু মামার চাকরী হয়েছিল।

প্যালা সাগ্রহে গাছের কথা জানতে চাওয়ায় অবশ্য টেনিদা বলেছিল,

“ও-সব ভগবানের দান রে— বেশিদিন কি সংসারে থাকে? পরদিনই কালবৈশাখী ঝড়ে গাছটা ভেঙে পড়ে গিয়েছিল।”

“টেনিদা” আমাদের সময়ে অতি জনপ্রিয়, তার কারণ ঐ সময়ের সাথে আমরা যারা নিজেদের বড়ো বলে দাবী করি, তারা সময়, বিষয় সব কিছুর সাথে একাত্মবোধ করতাম। ‘বিদেশিনী’ সম্পর্কে রবিঠাকুর গেয়েছিলেন, “তোমায় দেখেছি শারদপ্রাতে, তোমায় দেখেছি মাধবী রাতে,. তোমায় দেখেছি হৃদি-মাঝারে” - ! টেনিদা, ঘনাদা সম্পর্কেও আমাদের মনে হয় – এঁদের দেখেছি পাড়ায়, পাড়ায়, পুজো প্যান্ডেলে, বিয়েবাড়িতে, রকের আড্ডায়, খেলার মাঠে! তাঁরা তো আছেনই – “হৃদি-মাঝারে”!

ভুল হতেও পারে, তাই আগাম ক্ষমাপ্রার্থী, কিন্তু মনে সংশয় জাগে – হয়তো এখন টেনিদা বা ঘনাদার ঐ চরিত্র ছোটোদের কাছে একদম অচেনা! সত্যিই কি তাই? যাঁরা চল্লিশোর্ধ, তাঁরা বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল চরিত্রদের সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু পরের প্রজন্ম? তারা কি পড়ছে? তারা কি যাচ্ছে ঝাউবাংলোতে, কিংবা ঝন্টিপাহাড়ীতে? কিংবা ঘনাদার হাত ধরে মেক্সিকোতে বা পেরুতে বা আগ্রাতে? “টল” বা “মশা”র সন্ধানে? জানিনা, জানিনা। এ মন জানতে ব্যাকুল যখন তখন, অনেকটা সেই বহুশ্রুত গানের মতই।

অবশ্য নিরাশ হতে মন চায় না। আশা তো নিশ্চয় করবো, আজকের কিশোরদের ও মন জয় করবে এই দাদারা, যেমন আগের অনেক প্রজন্মদের করে এসেছে। ============================================

অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং ঋণ : -
১। অরুণাংশু ভট্টাচার্য (দি সানডে ইণ্ডিয়ান) ।
২। ঘনাদা সমগ্রের মুখবন্ধ।
৩। ইন্টারনেট।
৪। টেনিদা সমগ্র


লেখক পরিচিত - প্রাক্তন ঔষধ বিপনন প্রতিনিধি। শখের লেখালেখি করেন। বর্তমানে দমদমে বসবাস রত। প্রকাশিত বই: চাপড়ঘন্ট, দোতালা বাস, নাট্যে উপেক্ষিত, বেচুবাবু, ইত্যাদি। সম্পাদিত বই - নুনেতে ভাতেতে (১ ও ২)

 

Copyright © 2018 Abasar.net. All rights reserved.