অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


প্রিয় চরিত্র

অবসর বিশেষ সংখ্যা এপ্রিল ১৫, ২০১৮

 

শিবরামের শিব্রাম, না স্বয়ং শিবরাম?

সুজন দাশগুপ্ত

বাংলা সাহিত্যের প্রিয়-চরিত্র নিয়ে ঠাসবুনুনি চিন্তা-উদ্রেককারী লেখা খাড়া করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পড়েছি অল্প, তার ওপর আমি ভীষণ ভুলে যাই। লিখতে গেলে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপবে আমি নিশ্চিত। দু-চার ছত্র যদি বা কিছু লিখতে পারি, তা হবে ছেলেবেলার পড়া কোনও বইয়ের চরিত্র নিয়ে। ইদানীং খেয়াল করছি, কিশোর বয়সের স্মৃতিগুলোই মনের মধ্যে গেঁথে আছে। সবই কি আছে, তা নয়। যা বিস্মৃত, সেটা তো হারিয়েই গেছে। যা মনে আছে তার থেকেই আমাকে বাছতে হবে। তবে সাহিত্য-টাহিত্য সেগুলো নয়, সিরিয়াস কিছু পড়তে গেলেই আমার ঘুম পেত (এখনও পায়)। পড়তাম হালকা হাসির গল্প, গোয়েন্দাকাহিনি এইসব। সেই সব গল্পের একটা চরিত্র নিয়ে যদি কিছু লিখি… সেটা কি অবসর-এ চলবে? গবেষণামূলক সেটা হবে না জানি… এলোমেলো অসংলগ্ন কিছু কথা না হলেই বাঁচি… ছাপা না ছাপা এখন সম্পাদকদ্বয়ের সিদ্ধান্ত।

ঠিক কোন বয়স থেকে শিশু-সাহিত্য ছেড়ে কিশোর-সাহিত্য পড়তে শুরু করেছি মনে করতে পারছি না। মনে আছে পঞ্চাশ দশকে পুজোবার্ষিকী আর মাসিক পত্রিকা পড়তাম প্রচুর – শিশুসাথী, কিশলয়, শুকতারা, রামধনু, মৌচাক...সব নাম মনেও নেই... যখন যা হাতের কাছে পেতাম, পড়ে ফেলতাম। আলাদা করে বই কেনার পয়সা সেভাবে পাওয়া যেত না, কিন্তু পাড়ার লাইব্রেরি থাকায় বইয়ের অভাব হত না। রহস্য-রোমাঞ্চ আর হাসির গল্প পড়তেই ভালো বাসতাম। যে সব চরিত্র মনে দাগ কাটত -- হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বিমল-কুমার জয়ন্ত-মানিক, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের হুকাকাশি(?), নীহাররঞ্জন রায়ের কিরীটী ... শিবরাম চক্রবর্তীর ‘শিব্রাম’, হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা, প্রেমেন মিত্রের ঘনাদা, বিধায়ক ভট্টাচার্যের অমরেশ, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গণশা-ঘোঁতনার দল ... এই মুহূর্তে এদেরই মনে পড়ছে। শরদিন্দুর ব্যোমকেশকে তখন ছোটোদের পুজোবার্ষিকীতে দেখেছি কি? যদি দেখেও থাকি মনে করতে পারছি না। সত্যজিতের ফেলুদা যখন ‘সন্দেশ’-মুক্ত হয়েছে তখন আমি দেশে নেই, কিশোরও নই… তাই বাদ।

শৈল চক্রবর্তীর শিবরাম

এই চরিত্রগুলোর মধ্যে থেকেই একটাকে যদি বাছতে হয়, তাহলে সেটা হবে শিব্রাম। গল্পের শিব্রামকে আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাই... শৈল চক্রবর্তীর রেখার আঁচড়ে সে শুধু অক্ষর সাজিয়ে বানানো মূর্তি নয়, চোখ-মুখ-হাত-পা নিয়ে তার অস্তিত্ব অতিশয় জীবন্ত। ব্যাক-ব্রাশ করা লম্বা চুল, গোলগাল কমবয়সি এক ছোকরা … গায়ে ধুতি-সার্ট, পায়ে চটি … নজর-কাড়া এক্সপ্রেশন। কোথাও পড়েছিলাম, শৈলবাবু নাকি শিবরামের একটা ফটো চেয়েছিলেন| উদ্দেশ্য শিবরামের প্রথম পুরুষে লেখা গল্পে সেটা থেকে ছবি আঁকবেন| চটকরে উত্তর দেননি শিবরাম। একটু ভেবে বলেছিলেন, ‘না, আমার কোনো ফটো নেই। কী হবে ফটো নিয়ে? আপনার ছবিতেই আমি থাকব’—।

ছেলেবেলায় আমার ধারণা ছিল শৈল চক্রবর্তীর সেই ছবিই লেখক শিবরামের আসল চেহারা। শৈল চক্রবর্তী নমস্য শিল্পী… শিবরামের আসল চেহারাকে উপেক্ষা করেননি। কিন্তু সেটা ছাপিয়ে তুলির আঁচড়ে যেটা তুলে ধরেছিলেন, সেটা হল শিবরামের চির-বালক চির-কিশোর মানসিকতা। তাই বেশি করে মনে হত, গল্পের শিব্রাম আর লেখক শিবরাম একই লোক!

সেই মনে হওয়াটা কি ভুল? গল্পের শিব্রাম পেটুক… মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। বিশেষ করে রসগোল্লা, রাবড়ি। খাবারের ব্যাপারে সে লাজলজ্জার ধার ধারে না। ‘নকুড়মামার মাথায় টাক’ থেকে শুরু করে বহু গল্পে তার উল্লেখ আছে। লেখক শিবরাম?

বুদ্ধদেব বসুর জ্যেষ্ঠা কন্যার বিয়েতে সাহিত্যিক শিবরাম আমন্ত্রিত। একে ওকে জিজ্ঞেস করে ইতিমধ্যেই খবর সংগ্রহ করে ফেলেছেন মেনুতে ছানার পায়েস আছে, রাবড়ির মত ওঁর আরেকটা প্রিয় বস্তু। অনেক সময় বিয়েতে ভালো ভালো জিনিস ফুরিয়ে যায়... ভি-আই-পি টেবিলে বসলে সে ভয় নেই। খাবার ডাক পড়তেই টুক করে গিয়ে বসে পড়লেন বরের বাবার পাশে।

হায়, সবই এল শুধু স্টার অ্যাট্রাকশনটাই এল না। শিবরাম মাঝে মাঝেই হাঁক দিচ্ছেন, ‘ছানার পায়েস কিন্তু এদিকে আসেনি।’

কয়েকবার সেটা শোনার পর বুদ্ধদেববাবুর বেয়াই আর পারলেন না। হাত জোর করে বললেন, 'শিবরামবাবু, এবার প্লিজ থামুন। আমি বরের বাবা, এটা ভালো দেখায় না।'

গল্পটা মিমিদির (বুদ্ধদেব বসুর জ্যেষ্ঠা কন্যা) কাছে শোনা। অতিরঞ্জিত হবার সম্ভাবনা কম।

দ্বিতীয় গল্পটা স্বয়ং শিবরামের করা। ‘কল্লোল যুগ’ বই-য়ে বন্ধুবর অচিন্ত্য সেনগুপ্ত শিবরাম সম্পর্কে শুধু ভালো ভালো কথা লেখেননি, প্রকাশক ডি এম লাইব্রেরিকে বলে রেখেছিলেন ওঁর কমপ্লিমেন্টারি কপি থেকে শিবরামকে একটা দিতে। ডি এম লাইব্রেরির কর্ণধার শিবরামকে চিনতেন। শিবরাম সেই বই চাইতে গেলে বললেন, ‘কী করবেন বই নিয়ে, ফুটপাথে বেচে দেবেন তো? নাম খারাপ হবে আমাদের। তার চেয়ে দামটাই না হয় দিয়ে দিই। এই নিন পাঁচ টাকা।’

শিবরাম ফুটপাথের উলটোদিকে চাচার হোটেলে গিয়ে ভালোমন্দ খেলেন, যা হান্ড্রেড পার্সেন্ট গল্পের শিব্রামীয়।

গল্পের শিব্রাম আর লেখক শিবরামের আরও প্রচুর মিল। শিবরামের আত্মজীবনীমূলক দুটি বই ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ আর ‘ভালোবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এর পাতা উলটোলেই সেটা চোখে পড়বে।

দুয়েকটা উদাহরণ দেখা যাক... গল্পের শিব্রাম রাত্রে ঘুমিয়ে এতো ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে আবার ঘুমোতে হয়। লেখক শিবরামেরও একই অবস্থা।

“সারা রাত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এতো ক্লান্ত হয়ে পড়ি যে কহতব্য নয়... ঘুম থেকে শরীরে বলধানের হেতু একটুখানি খেতে হয় – কী আর খাব? তাই ত ভাত খাই --- কিন্তু এই খাবার ব্যাপারটা। এও এতো পরিশ্রমসাধ্য কাজ যে আবার ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয় তাইতেই। সেই ক্লান্তি দূর করতে আবার ঘুম।”

শিব্রাম কাহিনিতে ভাই শিবসত্যের কথা এসেছে ঘাটশিলা কাম কলেজের হেডমাস্টার বা প্রিন্সিপাল হিসেবে। বাস্তব জীবনেও সেটা সত্য। শিবসত্য শিবরামের ছোটো ভাই ছিলেন। ঘাটশিলাতেই পড়াতেন।

বোন বিনি-র সঙ্গে (উদয়ন পত্রিকা ১৯৫০)
শিল্পী - শৈল চক্রবর্তী

শিব্রামের মাসতুতো বোন বিনি দু’জায়গাতেই স্বমহিমায় ... শিব্রামের ওপর গার্জেনগিরি করেছে।

চিরকুমার শিবরাম থাকতেন ১৩৪ নম্বর মুক্তোরাম স্ট্রিটের একটা মেসবাড়ির দোতালায় শুকতোরাম খেয়ে মুক্ত আরামে তক্তারামে শুয়ে। নিজের ভগ্নী না থাকলেও পাতানো ভগ্নী ও ভাগ্নে/ভাগ্নিদের অভাব ছিল না ওঁর জীবনে। কাছেই থাকত সতীকান্ত গুহর সাত ভাগ্নেভাগ্নি... গৌরাঙ্গ (পরে চলচ্চিত্র পরিচালক), ভুতু (পরে কাবেরী, চিত্রাভিনেত্রী), জবা, পুতুল, ইতু ও ইত্যাদি। শিবরামের একাধিক গল্পে স্বনামেই তারা এসেছে। আহারবিলাসী শিব্রামের সঙ্গে ছিল এইসব বালকবালিকার স্নেহ-ভালোবাসা খুনসুটি আর চকোলেটের বন্ধন।

মোটকথা বাস্তব-জীবনে জড়িত কমবয়সি অনেকেই শিবরামের গল্পে এসেছে, শুধু চোখে পড়েনি চাঁচোলের রাজবাড়ির ডাক্তারের মেয়ে রিনিকে... যার সঙ্গে শিবরামের কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণে (‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ দ্রষ্টব্য) কিছুটা রোমান্টিক, কিছুটা দেহজ সম্পর্কের ইশারা দেখতে পাই। মুখভর্তি সন্দেশ নিয়ে চুমু খাওয়া, নির্জন ছাদের ওপর ফ্রক ইজের খুলিয়ে রিনিকে দেখা, মাঠের ধারে গল্প করার ফাঁকে একই সঙ্গে চিঁড়েগুড় ও চুমু খাওয়া, জেলখানায় বালকবেশী রিনিকে লেপের ভেতর নিয়ে তার উষ্ণ শরীরে নিজের শীত দূর করা। মাসতুতো বোন বিনির কথা গল্পে বারবার এলেও ভাইফোঁটার সুবাদে ‘কিস’তুতো বোন রিনির প্রসঙ্গ শিবরাম এড়িয়ে গেছেন... মনে হয় সচেতন ভাবেই। লালিকেও কোনও গল্পে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না ... জীবনের শেষ পর্বে বস্তির যে কিশোরী মেয়ে আলিঙ্গনে ও চুম্বনে ভরিয়ে দিয়ে শিবরামের শয্যাসঙ্গিনী হতে চেয়েছিল। দুটোই জোরদার চরিত্র ...যৌনতা বাদ দিয়ে এদের কাহিনিতে ঢোকানো নিশ্চয় যেত।

রেবতীভূষণ ঘোষের চোখে

গল্প আর বাস্তবের শিবরামের এই মিল শুধু স্বভাব বা চরিত্রগত নয়। নামের কথাটাই ধরি... গল্পের চরিত্রে ‘শিব্রাম’ নামটা বোধহয় প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ‘হাতির সঙ্গে হাতাহাতি’ গল্পে। ‘অশ্ব থেকে অশ্বতর’-গল্পে দেখি গল্পের ‘আমি’ হয়ে গেছে শিব্রাম চক্‌রবর্‌তি। সেই নামটাই পরে কয়েকটা গল্পে লেখককের নাম হিসেবে দেখেছি! শিবরাম চক্রবর্তীর ছোটোদের রচনাবলি এখন দেখি বিক্রি হচ্ছে শিব্রাম রচনাবলী নাম নিয়ে... আর বিক্রি হচ্ছে শিব্রাম চকর্‌বর্‌তির দোকান থেকে। প্রসঙ্গত দোকানটা ছিল ওঁর আর এক পাতানো ভাগ্নে্র… নিজের আপন কোনও বোন ছিল না।

শিবরামের গল্পের মজা বিষয়বস্তুর জন্য নয়, গল্পের বিষয়বস্তু অনেক ক্ষেত্রেই সামান্য। কিন্তু সেগুলোই রসোত্তীর্ণ হয়েছে কথার পিঠে কথা আর অদ্ভুত অদ্ভুত পরিস্থিতির উদ্ভবে। শব্দকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে নানান অর্থ নিয়ে উপস্থিত করেছেন বিভিন্ন গল্পে, হয়েছে ভয়ানক ভুল বোঝাবুঝি। মই নিয়ে হৈ চৈ-এ, দোকান শান্তালয় না বুঝে শান্তা মাসির বাড়ি বোঝা। ফল হল, বাসে গুঁতোগুঁতি করে মই নিয়ে অজস্র লোকের বিরক্তি উৎপাদন করা, গন্তব্যে পৌঁছে মাসির ধমক খাওয়া এবং মই ফিরিয়ে আনার দুশ্চিন্তা। পাড়ার বামা-র (বামাচরণ?) লরি প্রসঙ্গে বিরাট প্রতিষ্ঠান বামারলরি-কে ভেবে বসা...তার থেকে উদ্ভূত সমস্যা। ওঁর গল্পে শব্দের খেলায় অনেকেরই হেনস্থা হয়েছে। নিজের পদবি-ধারী চক্রবর্তীদের নিয়েও মজা করতে ছাড়েননি ...

“আমার ধারণা চকরবরতিরা যেমন কঞ্জুষ, তেমনি আবার খুব ধারালোও হয়ে থাকে। তারা ধারে কাটে, ধার করে কাটে তাদের। ধার পাবার আশা না থাকলে সে ধার তারা মাড়ায় না।”

এটা অবশ্য গল্পের শিব্রামের কথা। বাস্তবে শিবরাম চক্রবর্তীর মতো দিল দরিয়া লোক কদাচিত চোখে পড়ে। তিনি চক্কোত্তিদের প্রতিনিধি হলে সব চক্রবর্তীরই গর্ব অনুভব করা উচিত। অর্থকষ্টে সব সময়েই ভুগতেন শিবরাম। প্রকাশকরা টাকা দিত না অনেক সময়, দিলেও ন্যায্য পাও্নার বদলে দু-চার টাকা হাতে ধরিয়ে দিত। যা পেতেন পরমানন্দে ভাগ করে নিতেন সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে।

শিবরাম নিজেকে সাহিত্যিক ভাবতেন না। সাহিত্য ওঁর মতে

“যা সর্বকালের সর্বজনের সহিত যায়, যেতে পারে। সহযাত্রার শক্তি রাখে। সর্বজনের সম্পূর্ণ মনের সঙ্গমক্ষেত্র।”

নিজেকে মনে করতেন সামান্য লেখক মাত্র, কলমচি কেবল।

“আমি লিখি নিতান্তই টাকার জন্য। ...আমি হচ্ছি ছোটোদের লেখক।”

নিজের লেখা নিয়ে মজা করে বলতেন, আমার গল্পে পোলা থাকে আর কিছু পান (pun)। কারণ পোলাপানরা ভালবাসে পান।

কিন্তু এই পান-এর জন্য ওঁর অনেক সিরিয়াস লেখাকেও কেউ কেউ তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি। ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’-র আত্মজীবনী মূলক লেখায় মানসিক ঘাত-প্রতিঘাত ব্যথা বেদনাকেও অনেকে ঠাট্টা জ্ঞানে দেখেছেন।

শিবরাম অবশ্য তাতে বিচলিত হননি, সিরিয়াস লেখা ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরি’ যখন খানিকটা উপেক্ষিত হল, ওঁকে বলতে শুনি “হ্যাঁ, আমি মস্কোকে নিয়ে করেছি কিছু পণ্ডিতি আর পণ্ডিচেরিকে নিয়ে মস্করা।” ওঁর বহু পান এখন আমাদের কথাবার্তায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছে…স্ত্রী মানেই ইস্তিরি, গরুর যেমন দরকার শস্য, তেমনি গুরুর দরকার শিষ্য, চা-খান আর নাই খান, একটু তো চাখান, প্রকৃতি প্রেমিকের রসিক প্রকৃতি (বিভূতিভূষণ প্রসঙ্গে), হাতির সঙ্গে হাতাহাতি, না না, গায়ে নয় -- আমার শুধু মুখে বাত… ইত্যাদি।

পয়সার জন্য শিবরাম লিখতেন, যখন খিদে পেত তখন লিখতে হত। পেটের দায় বড় দায়। অনেক সময় বাধ-বিচার করার সময় পেতেন না। তাই বোধহ্য় ছোটোদের জন্যেই প্রধানত লিখতেন, কারণ ছোটোরা অত খুঁতখুঁতে নয়। লিখেওছিলেন, “আমি কখনোই কালজয়ী হতে চাইনি, এমনকি বিজ্ঞাপনের পৃষ্ঠাতেও নয়। সেই বৃথা চেষ্টার অক্লান্ত সাধনায় কালক্ষয় না করে সকলের জীবনের সকালটা, না, জয় করতে নয়, তার সঙ্গী হতেই চেয়েছিলাম আমি। ছেলেমেয়েরা ছোটবেলায় আমার লেখা পড়বে একটু বেলা হলে, বড় হলেই অক্লেশে ভুলে যাবে আমায়…।”

এই খানেই উনি একটু ভুল করেছিলেন। আমি কৈশোর পার হয়ে গেছি বহু বছর আগে। কিন্তু ভুলতে পারলাম কই।

না লেখক শিবরামকে, না চরিত্র শিব্রামকে!

একটা পুরনো গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। মুক্তোরাম স্ট্রিটের মেসে ঘরে থাকলেও শিবরাম দরজার কড়ার ভেতর শেকল দিয়ে তালা ঝুলিয়ে রাখতেন। একজন শিবরাম-ভক্ত দেখা করতে এসেছেন। তালা খুলে দিতে অনুরোধ করায় শিবরাম বললেন, 'এক দিকের কাঁধ ঢুকিয়ে কেতরে কেতরে ঢুকে পড়।'

সেইভাবে ঢোকার পর শিবরাম ভক্ত বললেন, 'এ ভাবে তালা লাগিয়েছেন আপনি! চোর তো চাইলেই ঢুকে পড়তে পারে!'

'তা পারে। কিন্তু বেরোবে কী করে?'

ভেতরে ঢোকা যায় ঠিকই, কিন্তু শিবরাম চাবি দিয়ে তালা না খুলে দিলে বেরোনো যায় না, পাল্লাদুটো গায়ে চেপে বসে।

ওঁর লেখাও খানিকটা সেরকম, শিব্রামীয় ‘পান’-এর লোভে একবার ঢুকে পড়লে সেই সেই পানাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন... এই বৃদ্ধ বয়সেও সেটা বুঝছি।


চণ্ডী লাহিড়ি শিবরাম প্রসঙ্গে লিখেছিলেন,

“শিবরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য মেয়েদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। ‘চুম্বন’ লিখেছিলেন কল্লোল-গোষ্ঠীর একজনকে চ্যালেঞ্জ করে। জাতি-ধর্ম-ভাষা নিয়ে সামান্য গোঁড়ামি সহ্য করতে পারতেন না। মেয়েদের নিয়ে রসিকতার সীমা মানতেন না, কিন্তু ফল্‌গুর মত গভীরে ছিল মেয়েদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এবং সম্ভ্রমবোধ। সমসাময়িক বহু সাহিত্যিকদের চারিত্রিক বদনাম শুনেছি। মেয়েদের মুখেই শুনেছি। কিন্তু শিবরাম চিরকুমার হয়েও নিষ্কলঙ্ক।”

অচিন্ত্য সেনগুপ্ত বন্ধু শিবরাম সম্পর্কে লিখেছিলেন –

সর্বস্তরে হৃদয়ে জিগীষু
সদানন্দ আত্মভোলা শিশু
বদলালো না কোনদিন জীবনের বাসা
একটি ঠিকানা তার নাম ভালোবাসা
দুই হরি এক সাথে করেছে যে ভর
শিবেতে মঙ্গল সে, যে রামেতে সুন্দর।

চরিত্র শিব্রামকে লিখতে গিয়ে মানুষ শিবরামকে নিয়ে বেশি লিখে ফেললাম। ঐ দুটোকে আলাদা করতে পারি না যে! কিন্তু এতো বক বক করার পর আসল কথাটাই তো বলা হল না … আমার সবচেয়ে পছন্দের চরিত্র শিবরাম কেন হল? এর উত্তর, পছন্দ তো আর অঙ্ক কষে করা যায় না… এটা শ্রেফ অনুভূতির ব্যাপার। কোনও চরিত্রের সঙ্গে আড্ডা মারতে হবে বললে আমি শিব্রামকেই বাছব। কারণ ঝামেলায় ফেলবে না, আর সিরিয়াস টাইপ নয়। সিরিয়াস চরিত্রকে আমি বড্ড ভয় পাই!


লেখক পরিচিত - পাঁচ দশক ধরে আমেরিকা প্রবাসী। এক সময়ে পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন - এখন কালে-ভদ্রে। গোয়েন্দা একেনবাবু-র মানসপিতা; অবসর.নেট ও বাংলা মিস্ট্রি.কম-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।

Copyright © 2018 Abasar.net. All rights reserved.