প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

সমাজ ও সংস্কৃতি - পুরাণ কাহিনি

অগাস্ট ৩০, ২০১৫

 

অস্তি কশ্চিৎ বাগবিশেষঃ

প্রশান্ত ভট্টাচার্য


প্রথম পরিচ্ছেদ

শান্ত এই মধুর আশ্রমে উপবিষ্ট ব্রাহ্মণ পাঠ বোঝাচ্ছিলেন তাঁর কিশোর শিষ্যদের। দূরে উত্তুঙ্গু পর্বতমালা, তার হিমের পরশ ছুঁয়ে যাচ্ছে ত্বক। মাঝে মাঝে শিহরণ হচ্ছে। আশ্রমটি শ্রীনগরের নিকটবর্তী, একটি মনোরম স্রোতস্বিনীর ধারে। তার নাম সিন্ধু। আজ প্রভাতে ব্রাহ্মণ শুরু করেছিলেন প্রত্যাভিজ্ঞ তত্ত্ব, শৈব দর্শনের সারাৎসার। তার ভূমিকায় ব্রাহ্মণ একটি কাহিনী বলছিলেন।

‘একদিন দেবাদিদেব মহেশ্বর ঋষি দুর্বাসাকে স্মরণ করলেন, বললেন, মুনে! সকল মনুষ্যকে জগৎ দর্শনের কথা শ্রবণ করাও, এই আমার অভীপ্সা! প্রণত হয়ে দুর্বাসা বললেন, আমার অভীপ্সাই আমার জীবনের নিমিত্ত হোক, হে ত্রিকাল! ঋষি দুর্বাসা স্মরণ করলেন তাঁর তিন মানস পুত্রকে, ত্র্যম্বক, অমর্দক আর শ্রীনাথকে। তাদের পাঠ দিলেন যথা ক্রমে অদ্বৈত, দ্বৈত আর দ্বৈতাদ্বৈতের। তাঁরা তিনজনে এই শৈব দর্শনের তিন ধারা প্রচার করলেন। তিনটি ধার মূল কথাই হোল জীবননির্বাহী শিল্প!’

‘প্রত্যাভিজ্ঞ তত্ত্বকে লোকে ত্রিকাশাসন বলেও অভিহিত করে লোকে। ত্রিকাশাসন অর্থে শক্তি, শিব ও আত্মা। তোমাদের আমি এই তিনটি বিষয়ে উত্তরকালে বিবৃত করবো। এখন বিশ্রাম‘। পিতা তথা গুরুর বানী কিশোরের মনে গেঁথে যাচ্ছিল। তার কত কথা, কত কল্পনা মনে ভিড় করে আসছিল। ঐ পর্বতমালার চূড়ার হিমমুকুট যে অচিন্তনীয় রঙে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছিল সেই কি মহাদেবের জটাজাল, আর এই যে রজতের মত সিন্ধু নদী, সেই তাঁর গলার অলৌকিক নাগ! আর ঐ যে বিস্তীর্ণ কুমকুমের ক্ষেত, ষে মাতা পার্বতীর বসনাঞ্চল!

এমনি করেই চলছিল শিক্ষাদান আর একটু একটু করে জীবনের অর্থগুলো কমলদলের মতো পরতে পরতে উদ্ভাসিত হচ্ছিল। একদিন গুরু বললেন, ‘অমোঘ ও অন্তিম চেতনা হোল শিবজ্ঞান। প্রকৃত শিবজ্ঞানের সূত্র হোল, দেবত্ব থেকে মনুষ্যত্বের অবনমন এবং আবার মনুষ্যত্বের ভূমি থেকে দেবত্বে উন্নয়ন। ঐ অবনমন মানুষকে তার কর্তব্য সম্পর্কে অভিহিত করে। এই অবনমনে দুটি বিষয় আমরা প্রত্যক্ষ করি। পরমশিব এইস্থলে পুরুষ ও প্রকৃতিতে বিভাজিত হন। পুরুষ ও প্রকৃতি মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। যা দেখা যায় ও যা দেখা যায় না, এই দুয়ের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। এই প্রকার বিভ্রমকে অনিত্য বলে। বুদ্ধি, জ্ঞান আর সাধনার দ্বারা আবার দেবত্বে উন্নীত হওয়ার প্রচেষ্টাই আমাদের লক্ষ্য’। গুরু থামলেন। কিছুক্ষণ নীরবতার পর কোনও একজন প্রশ্ন করল, ‘ পথ কি গুরুদেব ?’ ব্রাহ্মণ মৃদু হাসলেন, তারপর বললেন, ‘দেবত্বে উন্নীত হবার পথ হোল চারটি। অন্যোপায় অর্থাৎ পূজার্চনা, সম্ভোপায় অর্থাৎ ইচ্ছা, শক্তোপায় বা জ্ঞান এবং অনুপায় অর্থাৎ দেবকৃপা। প্রথম তিনটি মনুষ্যের আয়ত্তাধীন কিন্তু চতুর্থটি নয়। সেটি পরমশিবের ইচ্ছা। এই পথ ধরে মানুষ দেবত্বে উন্নীত হতে পারে, আর তার সহজ গুণ হোল ভক্তি। ভক্তিই সকল সাধনার মূল কথা’। ব্রাহ্মণ থামলেন। কিশোররা কি বুঝল কেউ জানে না, কেবল একজনের মনে দুটি কথা গেঁথে রইল, শক্তি ও ভক্তি। জ্ঞান ও নিবেদনের আর্তি!

তারপর  কয়েক বছর চলল বেদ অধ্যয়ন। তার সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরন্যক ও উপনিষদের পাঠ। এরই মধ্যে মধ্যে রইল দর্শনের আলোচনা। সে সকল দর্শনের তুলনামূলক সিদ্ধান্তগুলি। অবশেষে বেদাঙ্গ ও পুরাণ কথা। কাশ্মীরের শৈব দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল যোগসাধনা ও তন্ত্রসাধনা। সে বিষয়েও জ্ঞান লাভ হোল। শিক্ষা ক্রমশ পরিণতির দিকে অগ্রসর হোল।

একদিন আশ্রমে কাব্য আলোচনা শুরু হোল। গুরু বললেন, ‘কাব্য, একটি কাহিনীর ছন্দোবদ্ধ ্ধ প্রকাশ। তোমরা অবগত আছ যে, শব্দ ব্রহ্ম। কয়েকটি শব্দ নিয়ে গঠিত হয় বাক্য। বাক্যের নানান প্রকাশ। বাক্যের কয়েকটি ধর্ম আছে। তা হোল, রীতি, গুণ, অলঙ্কার, বক্রোক্তি, রস, ধ্বনি, অনুমান ও ঔচিত্য। এই সকল ধর্মের কোনও একটি বা একাধিক ধর্ম নিয়েই বাক্যের অর্থপূর্ণ অস্তিত্ব। সেই অর্থপূর্ণ শব্দশৃঙ্খল দ্বারা বাক্য, এবং বাক্য শৃঙ্খল দ্বারা কাব্য রচিত হয়। আমরা যে সকল রীতির সাথে পরিচিত, তা প্রধানত দুটি, বৈদর্ভী ও গৌড়ীয় বা মাগধী। এই দুই বাগধারা বিশেষ প্রচলিত। আমার অনুমান, তোমরা এর বিস্তৃত পরিচয় পেতে ইচ্ছুক। তবে তার জন্য তোমাদের সেই সকল স্থানে ভ্রমণ  করা আবশ্যক, যেখানে পূজনীয়গণ এই বিদ্যাদানে পারঙ্গম!’

এই কথা গুরুপুত্রের মনে যেন বিদ্যুৎ সঞ্চার করল। সে মনে মনে স্থির করল, আরও জানতে হবে, আরও বহু জ্ঞানসমুদ্র পাড়ি দিতে হবে, তবে যদি শক্তির পাদপদ্মে স্থান মেলে! জ্ঞানই যে তার আরাধ্য!

বহু প্রচেষ্টার পর সে খুঁজে বার করল ভাস, সৌমিল, কবিপুত্র ঋষি, ঋষিকল্প প্রমুখের রচনা। তার মধ্যে মহাত্মা ভাসের রচনা তার বড় প্রিয় মনে হোল। অদম্য উৎসাহে সে অধ্যয়ন করল মহাকবি ভাসের ‘উরুভঙ্গম’, ‘প্রতিজ্ঞযৌগন্ধায়ন’, ‘হরিবংশম’, ‘স্বপ্নবাসবদত্তা’ প্রমুখ। আর সে পরিচিত হোল আদিকবি বাল্মকীর ‘রামায়ণ’ এর সাথে। তার মনে প্রশ্ন উঠল যে, বেদে অনেক কাহিনীসূত্র্র আছে, তা অর্থপূর্ণও বটে,  তাহলে বাল্মিকী কেন আদিকবি সম্মান পেলেন? প্রশ্নটি সে তার পিতার কাছে রাখল।

পিতা উত্তর করলেন, ‘ প্রণাম করি সেই দেবতাত্মা ঋষিকে, জনশ্রুতি বলে, তিনি শরাঘাতে আহত পক্ষিকে দেখে বিচলিত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন,

মা নিষাদপ্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শ্বাশতীঃ সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্ ॥

তিনিই তো প্রথম! বাক্যে করুণা সঞ্চার করেছিলেন, রস সম্পৃক্ত করেছিলেন, তাই তিনি আদিকবি, পুত্র! অপরদিকে ঋষিগণ শ্লোকটির অন্য অর্থ করলেন, রাবণ যখন দুরাচারে আশ্লিষ্ট ছিলেন, তখন কৃষ্ণবর্ণ রাম তাকে হত্যা করেন, এইভাবে। ঋষিগণ কথিত এই শ্লোক শুনে প্রজাপতি ব্রহ্মা তাঁকে রামের সকল কাহিনী কীর্তিত করে রামায়ণ রচনার অনুজ্ঞা করেন!’ এই অদ্ভুত বর্ণনা শুনে তরুণের মনে আলোর উদ্ভাস হোল, মনে এক তীব্র ইচ্ছা জাগল। কাব্য রচনার বাসনা তার মনে মনে গেঁথে রইল।

অবশেষে শিক্ষা শেষ হোল। শিক্ষান্তে স্নাতক ছাত্রদের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন গুরু। বললেন, বৎসগণ! আমি যেটুকু জানি, আমার শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা, সকলই তোমাদের কাছে উন্মুক্ত করেছি। কিন্তু বিপুলা এ পৃথ্বী অচিন্তনীয় জ্ঞানের ভান্ডার। এই সসাগরা জম্বুদ্বীপের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পশুপাখি, প্রতি পাদপ, প্রতিটি নদী, প্রতিটি আগ্নেয়গিরি তোমাদের জন্য শিক্ষার ছত্র খুলে রেখেছে। পরম করুণাময়  দেবাদিদেব মহাদেব তোমাদের আশীর্বাদ করুন! যাও বৎসগন! এই আকাশ, বাতাস, বসুন্ধরা, এই জল আর ঐ মহাশূন্যের কাছে পরিচিত হও ব্রহ্মান্ডের দুর্জ্ঞেয় রহস্য। চরৈবেতি!’

পরদিন সূর্যের প্রথম রশ্মিপাতে সেই তরুণ এসে দাঁড়াল পিতার সামনে। বলল, ‘আমাকে আজ্ঞা করুন, পিতা আমি যাই! আমি প্রথমে রাজসমীপে যাব। তারপর আপনার শিক্ষা আর ভাগ্য আমাকে যেখানে প্রেরণ করে!’ পিতার চোখ আর্দ্র হয়ে আসে, তাঁর দুটি হাত ওপরে উঠে আসে, শুধু বলেন, ‘জয়তু ভব!’ তারপর ক্রন্দনরতা মাতার কাছে অগ্রজ আর অনুজদের কাছে বিদায় নিয়ে তরুণের যাত্রা শুরু হয়।

দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে তরুণ অবশেষে এসে পৌঁছল রাজসমীপে। কাশ্মীররাজ ও মহামাত্যদের প্রণাম করলেন। তরুণের দিকে চাইলেন মহারাজ। ‘বল বৎস। কি তোমার পরিচয় ?’ এক মুহূর্তে যেন বিহ্বল হয়ে গেলো সে তরুণ। পরিচয়?আজ এই মুহূর্তে তার মনে হোল, তার নুতন পরিচয় দরকার। সে তো মহেশ্বর ত্রিকালের পূজক, তাঁর অর্চনার একটি তো শক্তোপায়, জ্ঞানের। সেই পরম জ্ঞানই তো শক্তি। সে ধীরে ধীরে বলল, ‘প্রণাম মহারাজ! প্রণাম উপস্থিত সকল ঋষি, ব্রাহ্মণ, মহামাত্যদের। রাজন, আমি ত্রিলোকেশ্বরের পূজারী। যিনি মনের থেকেও দ্রুতগামী, হিরণ্যগর্ভের থেকেও জ্যোতিষ্মান! তাঁর সেই বিপুল অকল্পনীয় গতি যে শক্তিবিন্দুতে স্থিত হয়, তাকেই কালী বলে। সেই জ্ঞানবিন্দু সকল চেতনার মূলাধার! আমি সেই জ্ঞানের দাসানুদাস। আমার জাতনাম এই মুহূর্তে আমি ত্যাগ করলাম। এই মুহূর্ত থেকে পৃথিবী জানুক আমাকে কালিদাস নামে! কালিদাস!’

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

মহারাজ তাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করলেন। কালিদাস রাজাশ্রয়ে নিশ্চিন্তে তার জ্ঞানচর্চার সুযোগ পেলেন। একদিন মহারাজ তাকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানালেন এক কাব্যচর্চার অনুষ্ঠানে। অনেক গণ্যমান্য অতিথিদের সাথে পরিচিত হলেন কালিদাস। এমন সময়ে সেখানে এলেন রাজকন্যা। স্থির দীপশিখার মতো প্রোজ্জ্বল অথচ অনুপম। তন্বী, গৌরাঙ্গী, শিখরদশনা, ক্ষীণকটি, পীনোন্নত পয়োধরা। নূপুর নিক্বণে সুর বেজে উঠল অলকার। গজেন্দ্রগামিনী ধীর পায়ে আসন গ্রহণ করলেন। নীরবতা ভাঙলেন মহারাজ। ‘ মাননীয়গণ, ইনি আমার কন্যা বিদ্যোত্তমা। ইনিও সকলের মতো কাব্যালোচনায় উৎসাহী!’ 

আমন্ত্রিতদের মধ্যে নবীনতর হলেন কালিদাস। কেদারনাথের পথে গুপ্তাক্ষি থেকে এসেছেন তিনি। গুপ্তাক্ষি শ্রীনগর থেকে অনেকটা দূরে, রাজধানীর আদব কায়দা সেখানে পৌঁছয়নি। তাই কালিদাস এমন রাজসভায় আচরণীয় কর্তব্য অবহিত নন। তিনি ঔৎসুক্যের সাথে লক্ষ্য করছিলেন, কে কি বলেন। রাজনন্দিনী হলেও বিদ্যোত্তমা শিক্ষিতা এবং কাব্যচর্চায় পারঙ্গম। উপস্থিত সকলেই বিশিষ্ট। মহারাজও বিদ্বান এবং সাতিশয় কাব্যবিশারদ। সভা শুরু হল সভাপণ্ডিতের মঙ্গলাচরণ দিয়ে।

তারপর ভাট বললেন, ‘মহারাজ! রাজ্যে এখন প্রবল গ্রীষ্মের প্রকোপ। এমতাবস্থায় কাব্যচর্চা খুবই দুরূহ কার্য’। সভাকবি যোগেন্দ্র বললেন, ‘বিষম অবস্থায় যিনি কাব্যরচনা করেন, তিনিই যথার্থ কবি। এক্ষণে রাজদুহিতা কিছু বলুন!’ সকলের দৃষ্টি বিদ্যোত্তমার উপর নিবদ্ধ হল। কিঞ্চিৎ ব্রীড়ার সাথে তিনি বললেন, শুনেছি, রাজ্যে এক নবীন কবির আগমন হয়েছে। আজ তারই তো কাব্য পাঠ করার দিন। মহারাজ! আপনি আজ্ঞা করুন, কবিবর আমাদের আনন্দ প্রদান করুন!’ মহারাজ সানন্দে সম্মতি দিলেন, বললেন, ‘কালিদাস, তুমি আমাদের তোমার কাব্যে আমোদিত কর কবি!’

কালিদাস মহারাজের কথায় সম্বিত ফিরে পেলেন। কি বলবেন, চিন্তা করতে লাগলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘মহারাজ! শ্রদ্ধেয় ভাট মহাশয় গ্রীষ্মের কথা উল্লেখ করলেন, আমি এতক্ষণ সেই তপঃক্লেশের কথা ভাবছিলাম। উপস্থিত এই কটি চরণ নিবেদন করছি!

‘প্রচণ্ডসূর্যঃ স্পৃহণীযচন্দ্রমাঃ
সদাবগাহক্ষতবারিসঞ্চযঃ .
দিনান্তরম্যোঽভ্যুপশান্তমন্মথো
নিদাঘকালঃ সমুপাগতঃনিদাঘকালোঽযমুপাগতঃ প্রিযে
নিশাঃ শশাঙ্কক্ষতনীলরাজযঃ
ক্ব চিদ্ বিচিত্রং জলযন্ত্রমন্দিরম্
মণিপ্রকারাঃ সরসং চ চন্দনং
শুচৌ প্রিযে যান্তি জনস্য সেব্যতাম্
সুবাসিতং হর্ম্যতলং মনোরমং
প্রিযামুখোচ্ছ্বাসবিকম্পিতং মধু .
সুতন্ত্রিগীতং মদনস্য দীপনং
শুচৌ নিশীথেঽনুভবন্তি কামিনঃ
নিতম্ববিম্বৈঃ সদুকূলমেখলৈঃ
স্তনৈঃ সহারাভরণৈঃ সচন্দনৈঃ
শিরোরূহৈঃ স্নানকষায়বাসিতৈঃ
স্ত্রীয়ো নিদাঘং শময়ন্তি কামিনাম্’

এই বলে কালিদাস নীরব হলেন! সকলে স্তব্ধ,  হয়ে রইলেন। এমন কাব্য তারা অতীতে শোনেন নি! প্রথমে মুখ খুললেন, রাজকুমারী, ‘সাধু সাধু!’ উপস্থিত সকলেই তাকে সাধুবাদ জানালেন। মহারাজ বললেন, ‘বৎস! তোমার কাব্য একেবারেই ভিন্ন এবং উৎকৃষ্ট। আমি পরম সন্তোষ লাভ করলাম’। আর কিছুক্ষণ কাব্যালোচনার পর সভা শেষ হল। রাজকুমারীর ইচ্ছায় মহারাজ কালিদাসকে অপেক্ষা করতে আদেশ করলেন।

সকলে নিষ্ক্রান্ত হলে বিদ্যোত্তমা বললেন, ‘কবি! আমার ইচ্ছা, আপনি আমাকে নিয়মিত আপনার রচিত কাব্য শোনাবেন!’ কালিদাস বললেন, ‘দেবী! এই ছত্র কয়টি অকস্মাৎ মনে উদয় হল, তাই উক্ত করলাম। বিশেষ কোনও কাব্য রচনা করি নি’। কালিদাস নীরব হলে রাজনন্দিনী বললেন, ‘আমার অনুরোধ, আপনি ঋতু সম্বন্ধে কাব্য রচনা করুন। কিন্তু রচনামাত্র আমি যেন তার প্রথম শ্রোতা হই, এই আমার প্রার্থনা!’

কালিদাস বললেন, ‘বেশ, এবার আমায় অনুমতি দিন, গৃহে যাই’।

অনুপ্রাণিত কালিদাস লিখে চলেন তার ঋতু বর্ণনা। রাজকুমারী শোনেন, মতামত দেন। কালিদাস বর্জন পরিমার্জন করেন। কাব্যের ঘোরে ঋতু পরিবর্তন হয়। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা, বর্ষা থেকে শরৎ, ...............এক এক করে হেমন্ত এসে পরে। ক্রমে বিদ্যোত্তমার সাথে, মহারাজের প্রশ্রয়ে, কালিদাসের সখ্য নিবিড় হয়েছে। এমনি করে শিশির ঋতু আসে। হিমেল হাওয়ায় কালিদাসের পিতৃগৃহের কথা মনে পরে। মনে পরে জননীর কথা। আশ্রমিকদের কথা। একদিন মহারাজের অনুমতি নিয়ে কালিদাস গুপ্তাক্ষি গেলেন। বহুদিন অদর্শনের পর আশ্রমে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। অগ্নির মধ্যে কাষ্ঠ প্রবেশ করিয়ে কালিদাস বলে চলেন মহারাজের কথা, সভাসদদের কথা, রাজধানীর প্রাচুর্যের কথা। বান্ধবদের শোনান সদ্য রচিত কাব্যের কথা। বন্ধুরা প্রশ্ন করে কার উদ্দেশ্যে এই কাব্যাঞ্জলি?নতমুখে কালিদাস বলে, ‘জানি না’। তার সুগৌর মুখে রক্তাভা খেলে যায়।

আবার শ্রীনগরে ফিরে আসেন কালিদাস। মনে তার নব সৃষ্টির উন্মাদনা। কতক্ষণে তার বিদ্যোত্তমাকে তিনি নূতন কাব্য শোনাবেন, সেই আগ্রহে অধীর হয়ে থাকেন। ক্রমে শীত গিয়ে বসন্ত আসে। আকাশে বাতাসে অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের ছোঁয়া, প্রকৃতিতে ছেয়ে যায় ফুল্ল কুসুমিত দ্রুমদল। বসন্ত যেন তাকে মাতাল করে।

বিদ্যোত্তমাকে অর্পণ করবেন বলে নূতন পদ রচনা করেছেন,

‘কিং কিংশুকৈঃ শুকমুখচ্ছবিভির্ন দগ্ধং
কিং কর্ণিকারকুসুমৈর্ন কৃতং মনোজ্ঞম্হৃতং মনোজ্ঞৈঃ
যত্ কোকিলঃ পুনরমীপুনরযং মধুরৈর্বচোভির্
যূনো মনঃ সুবদনে নিযতং হরন্তিসুবদনানিহিতং নিহন্তি
পুংস্কোকিলৈঃ কলবচোভিরুপাত্থর্ষৈঃ
গুঞ্জদ্ভিরুন্মদকলানি বচাংসি পুংসাম্ভৃঙ্গৈঃ
লজ্জান্বিতং সবিনযং হৃদযং ক্ষণেন
পর্যাকুলং কুলগৃহেঽপি কৃতং বধূনাম্’

কাব্যপাঠে বিদ্যোত্তমা অত্যন্ত আনন্দমুগ্ধ হল। সে বলল, ‘কবি! এতদিনে ষড় ঋতুর বৃত্ত সম্পূর্ণ হল হল। এ এক অতুল্য ঋতুকাব্যমালা। এর নাম আমি দিলাম ‘ঋতুসংহার’। এ কাব্য অমর হবে একদিন। সেদিন হয়ত তুমি আমি থাকব না, কিন্তু মানুষ পড়ে আনন্দ আস্বাদন করবে। আর তুমি সেদিন মহাকবি বলে খ্যাত হবে’। বিস্ময়মুগ্ধ কালিদাস নীরবে সে স্তুতি প্রীতমনে মনে গ্রহণ করেন।

কালিদাস মনে মনে ভাবেন, তবে কি বিদ্যোত্তমা তার অনুরক্তা?তিনি তো নিজেকে মনে মনে নিবেদন করেছেন সেই রাজনন্দিনীর কাছে! একি তার আকাশকুসুম কল্পনা?তাকে ঘিরে ছয় ঋতুতে রচেছেন এই ষড়ঋতুর কাব্য সমাহার! কাব্যের এক রক্তমাংসের মানস প্রতিমায় কি কবির অধিকার থাকে?নানান প্রশ্ন, নানা সংশয় ভিড় করে আসে মনে। উৎকণ্ঠায় বুঝি প্রাণ যায়। একেই কি প্রণয় বলে ?

কালিদাস সর্বদা কল্পনা করেন তার মুখচন্দ্র। তার কাব্যের ছত্রে ছত্রে বেজে যায় তার নূপুরের ধ্বনি। তার গণ্ডের লোধ্ররেণু, তার ললাটের কুমকুম বিন্দু, তার কেশকলাপের রজত তারারাজি কালিদাসকে যেন অচেতন করে তোলে। গভীর নিশীথে, একাকী কালিদাস নক্ষত্রের সাথে কথা বলেন। শব্দের মহাকাশে রমণীয় তারাদলের ইন্দ্রসভা থেকে চয়ন করেন কাব্যের ফুলদল। ক্ষুৎপিপাসা তাকে ক্লান্ত করে না, কিন্তু বিদ্যোত্তমার অদর্শন তাকে আহত করে। কালিদাস মনে মনে স্থির করেছেন, আসন্ন বসন্ত পূর্ণিমায় তিনি তার ঋতুসংহার রাজকুমারীর করকমলে সমর্পণ করবেন আর......তাকে নিবেদন করবেন তার প্রণয়ের কথা।

সন্ধ্যাবেলা রাজগৃহে মহোৎসব। চন্দনে, অলক্তকে, কুমকুমে, পুষ্পে, পর্ণে তার অপরূপ সজ্জা! থরে থরে প্রস্তুত দীপমালা, আঁধার ঘনিয়ে এলে জ্বলে উঠবে সেই অপরূপ আলো। আজ যেন অমরায় বসন্ত উৎসব! মাতাল জ্যোৎস্নায় যখন রাজউদ্যান শিহরিত হবে, ঠিক তখনই বিদ্যোত্তমার হাতে তুলে দেবেন ঋতুসংহারের সযত্ন অঙ্কিত প্রতিলিপি। উৎসর্গ করবেন কালিদাস তার স্বপ্নবাসবদত্তাকে।

ক্রমে নৃত্যগীতাদি শুরু হল। আকাশে সোনার থালার মত চাঁদ উঠেছে। দেবদারু গাছের পাতায় পিছলে যাচ্ছে তার আলোর ধারা। নানাবিধ মিষ্টান্ন, পানীয়ের অশেষ আয়োজন। চারিদিকে মৃগনাভির সুগন্ধ। এমন সময়ে সহচরীবৃত হয়ে বিদ্যোত্তমা এলেন সেখানে। মহারাজও এলেন সমহিষী। উপস্থিত অতিথিবৃন্দকে মহারাজ স্বাগত সম্ভাষণ জানালেন। মৃদঙ্গ, মুরজ, মুরলী, বীণা বেজে উঠল। নটীদের নূপুরনিক্বণে ঝঙ্কৃত হল উদ্যান।

নৃত্যগীতের শেষে শুরু হল কাব্যপাঠ। উপস্থিত কবিরা তাদের কাব্য প্রস্তুত করলেন। সমাগত হর্ষধ্বনিতে গুঞ্জিত হল উদ্যানসভা। এবার মহারাজ আমন্ত্রণ জানালেন কালিদাসকে। কালিদাস তার কাব্যাংশ পাঠ করলেন। সকলে প্রসন্ন হলেন, কাব্যপ্রতিভায় বিস্মিতও হলেন। অবশেষে মহারাজের আজ্ঞা নিয়ে ঋতুসংহারের প্রতিলিপিটি পরম যত্নে রাজকুমারী বিদ্যোত্তমাকে অর্পণ করলেন। ঠিক তখনই ঝড় উঠল।

মহারাজ উঠে দাঁড়ালেন। স্মিতকন্ঠে ঘোষণা করলেন রাজকুমারীর আসন্ন বিবাহের কথা। কৈকয়ের যুবরাজ তার পাণিপ্রার্থী, রাজকুমারীও সম্মত। আগামী বৈশাখী পূর্ণিমায় তার বিবাহ।

মহারাজের কথাগুলি যেন তীক্ষ্ণ শরের মত বিদ্ধ করছিল তাকে। স্তব্ধবাক হয়ে গেলেন কালিদাস। পান ভোজনের ভিড়ে, সকলের অলক্ষ্যে সভা ছাড়লেন কালিদাস। সমস্ত সঙ্গীত যেন ব্যঙ্গ করতে লাগলো তাকে। এক দীপ্তিহীন দহন কালিদাসকে যেন গ্রাস করল। সেই স্বর্গীয় চন্দ্রালোককে মনে হল ডাকিনী। এক মুহূর্তে বিদীর্ণ হল তার মর্মরপ্রতিমা! হৃদয়ের অন্তঃস্থলে রক্তপাত হতে লাগলো।

সেইরাত্রেই কালিদাস কাশ্মীর ছাড়লেন। কোথায় যাবেন স্থির নেই। শুধু বিদ্যোত্তমার থেকে দূরে, বহুদূরে চলে যেতে চান তিনি। শেষ রাত্রের তরল অন্ধকারে, নক্ষত্রের আলোয় পথ চলা শুরু করলেন। অতিক্রম করলেন পর্বতের সানুদেশ, নির্ঝরিণী, গহীন বনানী। অনুমান করলেন কাশ্মীর রাজ্যের সীমানা পার হয়ে এসেছেন। চলতে চলতে একসময় ব্রাহ্মমুহূর্তে এসে দাঁড়ালেন এক শিব মন্দিরের প্রাঙ্গনে। গর্ভগৃহ থেকে স্তুত হচ্ছে করুনাময় শিবের ধ্যানমন্ত্র -   

ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতাংসং
রত্নকল্পোজ্বলাঙ্গং পরশু-মৃগ-বরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্।
পদ্মাসীনং সমস্তাৎ স্তুতমমরগণৈব্যার্ঘ্রকৃতিং বসানং,
বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম।।

পরমারাধ্য ত্রিকালেশ্বরকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন কালিদাস। তারপর চলতে লাগলেন ক্লান্ত পদসঞ্চারে।

(পরের অংশ)


লেখক পরিচিতি - পেশায় চর্ম প্রযুক্তিবিদ। নেশা একটু আধটু বাংলায় সাহিত্যচর্চা। পুরনো গল্প নতুন করে বলতে ভালবাসেন । কৃষ্ণ বাসুদেব, করুণাধারা গঙ্গা এবং তারপর মহাকবি কালিদাসের জীবনের কল্প-নির্মাণ, তাঁর দুঃসাহসিক প্রয়াস । এছাড়াও খুচরো মফস্বলের গল্প ও কবিতাও লিখে থাকেন ।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।