প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

এই তো সেদিন ...() ()

আমার কৈশোর কেটেছিল - সাউথ এন্ড পার্কে। যদিও ছিলাম মাত্র সাড়ে তিন বছর , কিন্তু সেখানেই আড্ডা মেরেছি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ না করা পর্যন্ত। এখনও মাঝে মধ্যে যাই। পুরনো বন্ধুদের প্রায় কেউই আর নেই । যে কজন আছে, দেখা হলেই পাড়া যে উচ্ছন্নে গেছে তা নিয়ে হা হুতাশ করে। কথাটা সত্যি, সেই সাউথ এন্ড পার্ক হারিয়ে গেছে। পাড়ার রবীন্দ্র পাঠাগার উঠে গেছে বহুদিন। পাঁচুদার স্টেশনারি স্টোরের কোনো অস্তিত্বই নেই। যে একতলা বাড়ির বারান্দায় বসে উচ্চস্বরে গল্প আর গান চলত সেই বাড়িটাও এখন অদৃশ্য। বেশ কিছুদিন হল সেখানে দাঁড়িয়ে আছে চারতলার একটা অ্যাপার্টমেণ্ট বিল্ডিং। আড্ডা মারার রক ভেঙ্গে তৈরি হয়েছে গাড়ি ঢোকানোর জায়গা। ঐ খানেই একদিন বাড়ির মালিক হাইকোর্টের উকিল তাপস বাবু আমাদের চ্যাঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এসে বলেছিলেন, "তোমরা এতো শব্দ করছ, আমি কোনও কাজ করতে পারছি না।"
বড়দের তখনো আমরা একটু সমীহ করতাম। করত না শুধু স্বপন। আমরা সবাই চুপ।
স্বপন বলে উঠেছিল, "তারপর।"
"এতো না চেঁচিয়ে গল্প করতে পারো না!"
"তারপর।"
"গল্পগুজব তো নিচু গলাতেও করা যায়।"
"তারপর।"
"'তারপর' আবার কি?
"তারপর।"
"তুমি তো আচ্ছা বাঁদর!"
"তারপর।"
তাপস বাবু ক্ষেপে আগুন। "বেয়াদবের দল, এখুনি আমি ফ্যাংচাকে ফোন করছি," বলে ভেতরে গিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

ফ্যাংচাদা ছিলেন পাড়ার মাস্তান, রবীন্দ্র পাঠাগারের পাণ্ডা। আমরা সবাই তাঁকে মান্য করতাম। এবার ফ্যাংচাদার কাছে নির্ঘাত চাঁটা খাবো। বারান্দা থেকে উঠে এসে স্বপনকে সবাই চেপে ধরেছিলাম, "তুই ওরকম অসভ্যতা করলি কেন?"
স্বপন বলল, "তারপর।"
"চ্যাংড়ামি করিস না, ওই রকে বসা এখন বন্ধ হবে।"
"তারপর।"

এই ছিল স্বপন । পাড়ার লেক ভিউ স্কুলের মাস্টার মশাইরা ওকে নিয়ে তিতিবিরক্ত। কোনমতে থার্ড ডিভিশনে হায়ার সেকেন্ডারি যখন পাশ করল, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন সবাই, বিশেষ করে পণ্ডিত মশাই। স্বপন আশুতোষ কলেজে চান্স পেয়েছিল। প্রথম দিন কলেজে যাবার পথে পাঁচিল টোপকে স্কুলের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সকালে 'জনগণমন ' দিয়ে পণ্ডিত-মশাইয়ের ক্লাস শুরু হত। বাইরে থেকে হেঁড়ে গলায় স্বপন শুরু করল 'জনগণমন-অধিনায়ক...। ক্লাসে হাসির হল্লা। পণ্ডিত মশাই হুংকার দিয়ে তাদের থামিয়ে জানলার কাছে এসে বললেন, "আঃ স্বপন , তুমি তো পাশ করে গেছো, তোমাকে এখন এসব গাইতে হবে না।"
স্বপন অম্লান বদনে বলল, "কি করবো স্যার, আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।"

ফ্যাংচাদার হুকুমে রকের সেই আড্ডা উঠে গেলো। ওরকম ভালো রক সাউথ এন্ড পার্কে আর কোথাও ছিল না। পজিশনটাও ছিল দারুন। পাশে পাঁচুদার দোকান - বিড়ি সিগারেট জুসলা ভিমটো - কি না মিলতো! উলটো দিকে ছিল সবিতাদের একতলা বাড়ি। সবিতার বয়স তখন বছর ষোল । তেমন সুন্দরী না হলেও বয়সের একটা জেল্লা ছিল। জানলা দিয়ে আমাকে দেখতে পেলেই বাইরে এসে দাঁড়াতো আর আমার দিকে তাকিয়ে ভীষণ মিষ্টি করে মুখ টিপে হাসতো। আমি শিওর ছিলাম আমাকে ও ভালোবাসে। কিন্তু তাতে কি! ওর পিতৃদেব রাম খ্যাপা, মাসিমাও একটু জানি কেমন । এগোবো কী ভাবে? এদিকে বেশী অপেক্ষাও করা যায় না । ব্যাচা বলে টেড়িকাটা চুলের একটা ছেলে - আমাদের থেকে বেশ কয়েক বছরের বড় - ডোভারলেন বা ওরকম কোথাও থাকত। মাঝেমাঝেই স্কুটার নিয়ে সবিতার বাড়ির চারপাশে ঘুরপাক খেতো। আমাদের সিনিয়র গ্রুপকে সেটা রিপোর্ট করাতে মানুদা ব্যাচাকে কড়কে দিয়েছিল। পাড়ার মেয়েকে বেপাড়ার ছেলে এসে হিড়িক দিয়ে যাবে - অবশ্যই সেটা বরদাস্ত করা হবে না! মানুদাও বেপাড়ার - হিন্দুস্তান পার্কে বাড়ি । কিন্তু পাড়ার মিতাদির সঙ্গে ওর অনেক বছরের প্রেম । হবু জামাই হিসেবে প্রায় পাড়ারই লোক। কিন্তু রিলিফ যেটা পাওয়া গেলো - সেটা টেম্পোরারি। ব্যাচা যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইনাল ইয়ারে, সুতরাং পাশ করলেই সবিতাকে পেতে সরকারি রাস্তা ধরবে। আমাকে দ্রুত অ্যাকশন নিতে হবে। সবিতার দূর সম্পর্কের দাদা চার্লি। আমাদের এতো দিনের বন্ধু, কিন্তু চার্লির আসল নাম কেউই জানতাম না। বোধহয় বগলাচরণ বা ওই ধরণের কিছু হবে। ওর বাবা হোমিওপ্যাথি করতেন, কিন্তু অগাধ বিশ্বাস ছিল জ্যোতিষ শাস্ত্রে। কুষ্ঠির দেওয়া নামই রেখেছিলেন ছেলের। চার্লিকে ধরলাম - এসব ব্যাপারে রিলেশ্যানাল অ্যাঙ্গেল বেশ এফেক্টিভ হয়। "তোর সঙ্গে একটা গোপন কথা আছে।"
"ভাগ শালা, কোনও গোপন কথা আমি শুনবো না। যা বলার সবার সামনে বলবি । বুকের পাটা নেই?"
"এরকম করিস না, শোন না।"
অনেক কষ্টে চার্লিকে রাজি করলাম অরুণের বাড়িতে সন্ধ্যায় আসতে। অন্যরা সবাই লাইন মেরে পূর্বাশায় হিন্দি সিনেমা দেখতে যাবে। অরুণও থাকছে না, দোতালায় যে নতুন ভাড়াটে এসেছে , তাঁর মেয়ে মমতাকে পটিয়ে পাটিয়ে বসুশ্রীতে নিয়ে যাচ্ছে। অতএব নিরিবিলি । অরুণকে সবাই বৃদ্ধ বলে ডাকতাম। চার্লির মতে ওর নাকি বয়সের গাছ পাথর ছিল না। আমরা সবাই সবার বয়স জানতাম। শুধু অফিশিয়াল বয়স নয়, আসল বয়সও । অনেকের অফিশিয়াল বয়স এক বছর কমানো থাকতো - বিরাট কোনও ব্যাপার নয়! বাবলুর বয়স শুধু দুবছর কমানো ছিল - যাতে আরও দুবছর এক্সট্রা সরকারি চাকরি করতে পারে। কিন্তু অরুণের কাছ থেকে আসল তো দূরের কথা, অফিশিয়াল বয়সও আদায় করতে পারি নি। এমনও হয়েছে আমরা কোথাও আড্ডা দিচ্ছি হঠাৎ অরুণ এসে হাজির।
"বন্ধু, কিসের কথা হচ্ছে?"
চার্লির চট জলদি জবাব, "বয়সের কথা।"
"তাহলে আমি চলি," অরুণ অ্যাবাউট টার্ন করতো।

অরুণকে আগেই বলে রেখেছিলাম, সবিতার ব্যাপারে একটু হিন্টও দিয়েছিলাম। অরুণের বাবা-মা থাকতেন ধানবাদে। বাড়িতে কাজের লোক জগু - সেই আধা-অভিভাবক। অতি নচ্ছার বুড়ো। আমরা চা চাইলে বলতো দুধ নেই। দুধ লাগবে না বললে বলতো চিনি নেই । চিনি লাগবে না বললে বলতো চা ফুরিয়ে গেছে। একদিন চার্লি ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল , বেশ, তাহলে গরম জলই দাও। জগু জানালো কেরোসিন নেই। কিন্তু অরুণের শোবার ঘরের চাবি থাকতো শুধু অরুণের কাছে। সেখানে জগুর জারিজুরি খাটাতো না। সেই ঘরে দরজা বন্ধ করে আমরা বিস্তর হুজ্জতি করতাম। জগু বাইরে থেকে হুমকি দিতো বাবুকে সবকিছু জানিয়ে দেবে বলে। অরুণ ভেতর থেকে চোপ, চোপ বলে জগু-কে ধমকাতো। অরুণের ঘরে অবশ্য বসার কোনো বন্দোবস্ত ছিল না। শুধু একটা খাট। তার ওপর সবসময়ে একটা মাশারি টাঙানো । অরিজিনাল কালার ছিলো বোধহয় নীল। আমরা যখন দেখেছি - তখন সেটা ধূসর কালো। ময়লা জমে জমে নেটের ভেতরের ফাঁকগুলো প্রায় ভরাট । চার পাঁচ জন খাটে ঢুকলে আমাদের নিশ্বাস প্রশ্বাসের চাপে মশারিটা এক্সপ্যাণ্ড আর কোলাপ্স করত । আর ভেতরে কি দুর্গন্ধ! অরুণকে সে নিয়ে কিছু বললে বলত, "ভাল না লাগলে আমার এখানে আসিস না।" যেন আমাদের যাবার আরও কত জায়গা আছে!

সিনেমা যাবার আগে অরুণ আমাকে ঘরের চাবি দিয়ে গেল। শুধু একটাই কন্ডিশন ওখানে সিগারেট খাওয়া চলবে না। মাসিমা নাকি কালকে আসবেন, গন্ধ পাবেন। আচ্ছা ফ্যাসাদ, সিগারেট ছাড়া এসব সিরিয়াস জিনিস নিয়ে কি আলোচনা করা যায়! উপায় নেই, কথা দিতে হল খাবো না। সন্ধ্যা নাগাদ অরুণের বাড়ির দিকে যাচ্ছি - পথে দেখা ভালুকের সঙ্গে । ডাক নাম ছিলো ভোলা - সেটা থেকে ভাল্লু এখন ভালুক । ভালুককে আমি এক্সপেক্ট করি নি, ভেবেছিলাম অন্যদের সঙ্গে পূর্বাশায় গেছে। কি করে ওকে কাটানো যায় ভাবছি, তার আগেই আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "ওরে আমায় মেরে ফ্যাল -
        "'টস্‌টসে রস-ভরপুর
                আপেলের মত মুখ
                আপেলের মত বুক
          পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর...'
বিরক্ত হয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে সরাবার চেষ্টা করলাম, "কি হচ্ছে কি, ছাড় ! "
"মাইরি, সবিতা আমার প্রেমে পড়েছে ।"
আমি তো স্তম্ভিত! "তার মানে ?"
"আমাকে দেখলেই মিটি মিটি হাসে । আজ জিজ্ঞেস করলাম, 'হাসছো কেন'? এমন একটা লাজুক হাসি ছুঁড়ে ছুটে পালালো - না দেখলে বিশ্বাস করবি না!"
এরপর আর সত্য গোপন করার অর্থ হয় না । বলে দিলাম, "আমাকে দেখেও তো হাসে ।"
"ধুউউউস, 'ধুক ক'রে নিভে গেল বুক ভরা আশা', বিজুও তো বলল ঐ এক কথা । আমি ভেবেছিলাম বিজু গুল মারছে!"
আমার দিলে হাফ-সোল, কিন্তু ভালুকের নয়। ও প্রেমিক ছেলে, সবিতার তিনগুণ সুন্দরী মল্লিকার সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করছে । ওর কি এসে যায়!

তাপস বাবুর রক থেকে বিতাড়িত হবার পর, আমাদের বসার কোনও জায়গা রইলো না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এখানে সেখানে আড্ডা মারতাম। শেষে পজিশন নিলাম সাদার্ন অ্যাভিনিউর মোড়ে - যেখান থেকে লেকের অ্যান্ডারসন ক্লাবে ঢোকার রাস্তা বেরিয়েছে । লোকেশানটা বেশ স্ট্র্যাটেজিক। লেকে তখন অনেক সুন্দরী মেয়ে বেড়াতে আসতো - এলেই পড়ে যেতো আমাদের ফোকাসের মধ্যে । যে মেয়েটা আমাদের সবার মন কেড়েছিল, সে আসতো অ্যাণ্ডারসন ক্লাবে । ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল, বড় বড় চোখ, ফর্সা দীর্ঘাঙ্গী- দেখতে অনেকটা নূতনের মতো । স্কুল কেটে দেবানন্দ আর নূতনের 'পেয়িং গেস্ট' দেখার পর থেকে নূতনকে কেউই আমরা ভুলতে পারি নি। চার্লি নিজেকে ভাবতো দেবানন্দ । দেবানন্দের স্টাইলেই চলাফেরা করত। এই নূতনকে দেখলেই সেই স্টাইলটা আরও প্রকট হত। আমরা যারা দেবানন্দের মত হাঁটতে পারতাম না, তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে নূতনকে দেখতাম, বুক ধুকধুক করত - সেই সঙ্গে টনটনে একটা ব্যথা। ভালুক তো বলেই ফেলল নূতনকে পেলে মল্লিকাকে যে কোনও দিন ও ছাড়তে রাজি। নূতন কিন্তু আমাদের পাত্তা দিত না ! বাস থেকে নেমে এতগুলো দীর্ঘশ্বাস উপেক্ষা করে কোনো দিকে না তাকিয়ে হনহন করে হেঁটে যেতো। "ঠিক হ্যায়," ভালুক একদিন ঘোষণা করল, "আমিও রোবাস্ট অপ্টিমিস্ট -
      'সব কেড়ে নিতে পারে নি দিনের ফাঁকি,
      তবু আছে রাত, কিছু তবু আছে বাকি'।
"ঐ আশাতেই থাক, দিনেই কিছু জুটছে না তো রাতে! এই ভালুক শালা কবিতা কপচাতেই কপচাতেই একদিন মরবে ।" চার্লি লেকের রেলিং-এ হেলান দিয়ে মুখ তুলে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে রায় দিল।

স্বপন এসব কিছুই জানতো না, কারণ ফার্স্ট ইয়ারে ফেল মারায় ওর বাবা ওকে মাস ছয়েকের জন্য মামাবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মামা খুব কড়া টাইপের লোক - বাড়িতে পড়াবেন আর শাসন টাসন করবেন । ফিরে এসে সব কিছু শুনে আমাদের সবাইকে বলল, "ভীতু কোথাকার! মেয়েটা এলে আমায় বলিস।"
আমাদের অবশ্য বলতে হল না। বাস থেকে নূতন নামতেই স্বপন বুঝে গেল। সটান মেয়েটার সামনে হাজির। মেয়েটা থমকে দাঁড়ালো। স্বপন বলল, "আই লাভ ইউ, ঝ্যাং!"
বলিহারি সাহস মেয়েটার । ভ্যাবাচ্যাকা তো খেলোই না, উলটে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করল, "'ঝ্যাং' মানে?"
"ওটা ব্যাক-গ্রাঊণ্ড মিউজিক।"
হিন্দি সিনেমা দেখে দেখে মিউজিক ডিরেক্টরের কায়দা ফায়দাগুলো স্বপনের তখন নখদর্পণে।

স্বপনের বুজ্‌ম ফ্রেন্ড ছিল অজয় মণ্ডল। সে আমাদের পাড়ারও নয় - বোধহয় ঢাকুরিয়ায় থাকতো। ভালো গোল কিপার। অজয়ের আগে ম্যাচে গোল সামলানোর দায়িত্ব ছিল আমার। ভালো গোল কিপার বলে নয় - অন্য কোনো পজিশনে যোগ্য নই বলে। সে সময়ে এই রকমই নিয়ম ছিল - বাজে খেললে তাকে গোলে দেওয়া হতো। অথচ সেখানে রাখা উচিত একজন ভাল খেলোয়াড়কে। সে নিয়ম অবশ্য এখনো দেখি অন্য ক্ষেত্রে। সবচেয়ে আনাড়িকে বসান হয় ইনফর্মেশন ডেস্কে। যাক সে কথা, পাড়ায় আমাদের মধ্যে হাতে গোনা যে-কটিকে বড়রা মনে করতেন করে খাবে, তাদের একজন ছিল দীপক। দীপকের বাবা ট্রেড ইউনিয়নের খুব হোমরা-চোমরা ব্যক্তি ছিলেন। কয়েক বছর আগে ওঁর নামে উত্তর কলকাতায় একটা রাস্তাও হয়েছে দেখলাম। থাকতেন সাউথ এন্ড পার্কে, কিন্তু রাস্তার নাম কেন নর্থে হল - সে রহস্য আমি এখনও উদ্ধার করে উঠতে পারি নি। দীপক ছিল রগচটা দুঃসাহসী । ক্ষেপে গেলে দুমদাম একে ওকে ঘুষি মারতো - পাড়া বেপাড়া মানতো না। আর সে ঘুষির জোরও মন্দ ছিল না। কে দীপকের নাম ষাঁড় দিয়েছিল মনে নেই। গোঁয়ার্তুমি আর গুঁতোর তেজ বিচার করলে নামকরণের সার্থকতাটা অস্বীকার করা যায় না। তবে এই নামটা দীপকের মোটেই পছন্দসই ছিল না। দুয়েকবার ওর সামনে সাহস করে যারা নামটা উচ্চারণ করেছে তারা কেউই অক্ষত থাকে নি। অজয় মণ্ডলও একদিন নামটা বলে গাঁট্টা খেয়েছিল। এর পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে, ব্যাপারটা সবাই ভুলে গেছি। ইলেকশনের আগে কিছুর মধ্যে কিছু না অজয় হঠাৎ রাত্রিবেলা বাড়ি ফেরার আগে দাস বাবুদের পাশের জমির পাঁচিলে ভুষো কালি দিয়ে বড় বড় করে লিখে দিল 'দীপক বসুকে ষাঁড় মার্কা বাক্সে ভোট দিন'। পরদিন হুলুস্থুল! দীপক যাকে সামনে পাচ্ছে, কলার চেপে ধরে তাকে ধমকাচ্ছে, "কে লিখেছে এখুনি বল।" সবাইকে পাওয়া গেছে, শুধু অজয় মণ্ডল নেই। সুতরাং দোষী যে কে, সে বিষয়ে সন্দেহ ধীরে ধীরে ঘনীভূত হচ্ছে। স্বপন বন্ধুকে গিয়ে খবর দিল, "এবার তোকে দীপক শেষ করে দেবে। পাঞ্চ জোগাড় করেছে - সেটা পরে ঘুষি মারবে। কিছু একটা কর।"
পরদিন সকালে দেখি 'দীপক বসুকে ষাঁড় মার্কা বাক্সে ভোট দিন'-এর ঠিক নীচে সাদা চক দিয়ে লেখা 'অজয় মণ্ডলকে গুজিয়া মার্কা বাক্সে ভোট দিন।'
'গুজিয়া' জিনিসটা যে কি, আমরা কেউই জানতাম না। কিন্তু এর পর অজয়কে আর সন্দেহ করা যায় না, দীপককে সবাই মিলে আমরা অনেক বোঝালাম। নিজের নামে এসব আজেবাজে কথা ও কেন লিখবে? নিশ্চয় পঞ্চানন তলার কেউ তোদের দুজনের নামেই লিখেছে।
পঞ্চানন তলার বস্তির ছেলেদের সঙ্গে আমাদের প্রায়ই গোলমাল আর মারামারি হত, তাদের পক্ষেও এ কুকাজ করা নিশ্চয় সম্ভব। দীপক সব শুনে শেষে বলল, "ঠিক আছে, কিন্তু যদি ধরতে পারি তোরা কেউ করেছিস, তাহলে চোয়াল ভেঙ্গে দেবো।"

****

এখন পর্যন্ত যা লিখেছি, তা দীপক, অরুণ আর খোকনকে ডেকে শোনাতেই অরুণ ঘোরতর আপত্তি তুলল। প্রথমত , ওর মশারি নাকি মোটেই অত নোংরা ছিল না এবং নীল রঙেরও না। তার ওপর সেদিন ও আদপেই মমতার সঙ্গে বসুশ্রী যায় নি। কিন্তু এগুলো বাহ্য। মোদ্দা কথা হল, মমতার কথা ওর বৌ জানে না। এদ্দিন চেপে রেখেছিল। এখন জানতে পারলে নাকি বাড়িতে অশান্তি হবে।
আমি বললাম, "তুই প্রায় সত্তর বছরের বুড়ো। উনিশ বছর বয়সে যদি একটা মেয়েকে নিয়ে সিনেমাও দেখে থাকিস - তাতে কি তোর চরিত্রহানি হবে?"
অরুণও ছাড়বার পাত্র নয়, বলল, "চরিত্রহানি নয়, সত্যের অপলাপ হবে।"
খোকন এদিকে চটে গেছে। বলল, "আমার কথা লিখিস নি কেন। এর থেকেই বোঝা যায় কে ট্রু ফ্রেন্ড। "
"কি মুশকিল সবে তো কয়েক লাইন লিখেছি! এখনো তো অনেক বাকি।"
"কিন্তু আমাকে দিয়ে শুরু করিস নি কেন?"
বুঝুন কি আবদার !
দীপকের মুখও দেখলাম গম্ভীর । বলল, "বুড়ো হলে লোকেরা নাতি-নাতনি নিয়ে গর্ব করা শুরু করে আর নিজেদের ছেলেবেলা নিয়ে বড়াই। কোনও অবজেক্টিভিটি থাকে না। উল্টোপাল্টা যা কিছু বকে যায় শুধু নিজেদের জাহির করতে।"
আমি ঠিক বুঝলাম না এখানে কোথায় নিজেকে জাহির করেছি।
কিন্তু উত্তর দেবার আগেই খোকন সায় বলল, "ঠিক, তুই শালা আমাদের হেয় করে নিজেকে হিরো বানাবি - তা চলবে না।" খোকনের মুখ সেই আগের মতোই আছে।
"স্টুপিডের মতো কথা বলিস না!"
"আমি স্টুপিডের মতো কথা বলছি? তুই তো সারা জীবন মাল ছড়ালি, তার তো কোনও উল্লেখ দেখছি না!"

এসব শোনার পর পুরনো দিনগুলো নিয়ে লেখার আর ইচ্ছে থাকে!

 

সুজন দাশগুপ্ত
ডিসেম্বর ২০, ২০১১

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

 

 

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।