প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

বইয়ের খবর

ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৫

 

কত ঘরে দিলে ঠাঁই - মাহফুজুর রহমান
অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, প্রথম প্রকাশ ২০০৯, ‌ ঢাকা।

 

“একটা আজব ট্রেন সময়ের বিশাল বিচিত্র প্রান্তর পেরিয়ে  স্টেশন থেকে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে অবশেষে আমাকে নামিয়ে দিয়েছে এক জাংশানে। এখন শুধু পরের কোনও এক ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা। ওয়েটিং রুমে হোল্ড-অল খুলে বিছানা পেতে আরাম করে বসা। হয়তো চা আনিয়ে নেওয়া। তারপর হয়ত একটা বই খুলে পড়ার চেষ্টা করা। এককালে রেল ভ্রমণে তাই তো করতাম...আপাতত হাতে সময় অঢেল... পরের ট্রেন কখন আসবে তা নিয়েও নেই চিন্তা।”

এইভাবে শুরু হয়েছে ‘কত ঘরে দিলে ঠাঁই’ - মাহফুজুর রহমানের স্মৃতিকথা।

দুখণ্ডের বই – আশ্চর্যজনক ভাবে দুটি খণ্ডই ৩০৪ পাতা!  বইটির শুরু নওগাঁর কথা দিয়ে যেখানে লেখকের বাল্যজীবন কেটেছে। শেষও হয়েছে আবার সেই নওগাঁয়েই। বহু দিন প্রবাসে কাটিয়ে বেড়াতে এসেছেন পুরনো স্মৃতির খোঁজে। কিন্তু সেই নওগাঁকে কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে নওগাঁয়ে। ঠিকানাই তো পাল্টেছে তিনবার - প্রথমে ছিল বৃটিশ শাসিত ভারত, পরে  পূর্ব পাকিস্তান, শেষে বাংলাদেশ। এর মধ্যে লেখকের ঠিকানা আর ঘরও বদলেছে বহুবার - নওগাঁ থেকে সিরাজগঞ্জ, সেখান  থেকে ঢাকা; পড়াশুনো শেষ করে প্রথমে দেশে চাকরি, পরে ইউরোপে গিয়ে অর্থনীতিতে ডক্টরেট হওয়া,  আবার দেশে ফিরে কিছুদিন কাজ। অবশেষে  ইউনাইটেড নেশনসে চাকরি নিয়ে নিউ ইয়র্কে এসে সেখানেই পাকাপাকি ভাবে থেকে যাওয়া।  
প্রথমেই লেখক বলেছেন ‘কোনও গিরিশৃঙ্গ জয় করি নি এবং তা কোনও অর্থেই করি নি। এখানে তাই বিজয়ের ছবি নেই। আমি বরং আঁকতে চেয়েছি একটা জীবনের ছবি। ’ লেখক পেশায় সাহিত্যিক নন, একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। কিন্তু অক্ষর সাজিয়ে ওঁর ছবি আঁকার ক্ষমতা অসাধারণ! ছেলেবেলার গ্রামের বর্ণনা, পরিবেশ প্রকৃতির বর্ণনা প্রায় কবিতার রূপ নিয়েছে। কুশলী কলমে সেই বর্ণনার মধ্যেও শৈশবের দৃষ্টি, বিশ্বাস ও অনুভূতির সরলতা অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পেরেছেন।  

‘কাল বৈশাখী তার নিয়ম মাফিক আসে, অর্থাৎ না জানিয়ে। হয়ত হঠাৎ কোনও শেষ বিকেলে দিগন্ত অন্ধকার হয়ে আসে। হঠাৎ ঠাণ্ডা হাওয়া দেয়। ক’মুহূর্তে গা জুড়িয়ে দেওয়া হাওয়া ঝড় হয়ে ছুটে আসে কচি ধান শিশু পাটের ক্ষেতের ওপর ঢেউ তুলে। ঝড় আছড়ে পড়ে ভিটের আম গাছের লিচু গাছের মাথায়, টিনের চালের ওপরে... ধুলোয় ঢেকে যায় চারিদিক। মুহূর্তেই বৃষ্টি আসে ঝেঁকে। তখন আবছা আলোয় চোখে আম গাছের নিচে চোখ পড়বে বিপর্যস্ত তবু দুরন্ত ছেলের দল...লুঙ্গির কোচরে কাঁচা আম নিয়ে বাড়ি ফেরা। সর্বাঙ্গ ভেজা। চুল বেয়ে গা বেয়ে এখনও দরদর করে পানি ঝরছে। ...বাড়ি ঘিরে প্রলয় কাণ্ড। ঝড়ের গর্জনে বাবা-মার বকুনি চাপা পড়ে যায়। পুরনো টিনের ঘরটা বোধহয় চূর্ণ হয়ে যাবে...। ঝড় আর বৃষ্টি যেন ধ্বংসের লড়াইয়ে নেমেছে। আব্বা আজান দিতে শুরু করেন। সজোরে আল্লার মাহাত্ম্য ঘোষিত হয় আজানে, আল্লাহু আকবর। তাতে নাকি ঝড় থেমে যায়।

আবার,

‘ আস্তাকুড়ে কাঁঠালের ভুতি মেশে আমের খোসা আঁঠির সাথে। উঠান ঝাঁট দিয়ে বাইরে আনা ধূলো মাটির স্তুপ থেকে লিচুর স্মৃতি এখনও মুছে যায় নি। বিরামহীন গরম এখন জ্যৈষ্ঠ আষাঢ়ের গন্ধ ছড়িয়ে দেয় ঘরে বাইরে, সারা গ্রামে। বৃষ্টি পড়ে।হাওয়া স্তব্ধ। আমের আঁঠি ভেদ করে কচি আমার চারা মাথা তোলে। আম আঁটির ভেঁপু বাজে।
শস্য ক্ষেতে চৈত্র এখন স্মৃতি। আউশ ধান বেড়ে উঠেছে। শিষ উঁকি দিয়েছে তার আগেই। কোথাও বা শিষের ভারে ধানের গাছ নুয়ে পড়তে শুরু করেছে। ঋজু পাট গাছ তরতর করে বেড়ে এখন চাষীর মাথা ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। ঘাস কলমি আগাছায় ঢাকা ক্ষেতের আল দুপাশের ধানপাটের বিস্তারে সংকীর্ণ। হাঁটতে গেলে জ্বলুনি ধরানো আঁচড় ফেলবে, ভেজা পাটের পাতা লেগে থাকতে চাইবে গায়ে আলপথে চলায় আর হেমন্তের সুখ নেই...’

তার একটু পরেই লিখছেন, 

‘একটা বেজি আলের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে ছুটে বেরিয়ে আবার উধাও হয়ে গেল। ইদানীং বেজির উৎপাত বেড়েছে। কদিন আগে আমাদের মুরগির খোপে তার আবির্ভাব হয়েছিল।

এই বালকের মনে ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলমানদের বিভেদ ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট হচ্ছে। বাড়ির আবহাওয়া (জন্ম একটি রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে। বাবা ছিলেন মৌলভি। পড়েছেন মাদ্রাসাতে।) এবং পরিচিত গণ্ডীর বলয়ের প্রভাবে একটা ঘৃণাবোধ জেগে উঠছে হিন্দুদের প্রতি। এদিকে মুসলিম লীগের ঘন ঘন মিছিল শুরু হয়েছে। চাঁদ-তারা সংবলিত ক্ষুদ্র পতাকা আর কয়েদে আজমের ছবি সংবলিত তকমা বিক্রি হচ্ছে... লেখক লিখছেন ‘রক্ত আমারও গরম হয়।... মিছিলে যোগ দেই। পকেটের সাথে পিন দিয়ে আটকানো পতাকা বা টুপির সাথে লাগানো তকমা। দেশ স্বাধীন করে ছাড়ব আমরা মুসলমানরা। আর হিন্দুদের আধিপত্যও মানব না...।” এই অকপট স্বীকারোক্তি একজন সংস্কারমুক্ত লেখকের পক্ষেই করা সম্ভব।

কলকাতায় হিন্দু মুলমানদের দাঙ্গা হচ্ছে...হিন্দুরা মুসলমানদের কচুকাটা করছে। মুসলমান মেয়েদের মান-ইজ্জত নষ্ট করা হয়েছে। মুরুব্বিদের বিধান - হিন্দু আক্রমণ প্রতিরোধের জন্যে প্রস্তুতির প্রয়োজন।

“...লোহার পাত ছেনি দিয়ে কেটে অস্ত্র বানানো হল। বাঁশ কেটে দুটো সড়কিও। কিন্তু তখন মনে হয়, গ্রামে যে হিন্দুর বাস নেই! আক্রমণটা আসবে কোত্থেকে? মনে পড়ে যায়, ‘বসু পরিবারের সেই মেয়েটির কথা।...মা নূতন সাদা শাড়ি হাতে দিয়ে বলেছিল সেটা বাজার থেকে নক্সা করে আনতে। ...শাড়িটায় নক্সা করে ফিরছি হনহন করে। ...বসু সোডা ওয়াটার ফ্যাক্টরির গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে বসু পরিবারের ফর্সা টুকটুকে মেয়েটি। চুলে তার মস্ত একটি বেণী।... হাতের শাড়িটার দিকে চেয়ে আচমকা প্রশ্ন করে সে, ছাপিয়ে আনলে বুঝি?... শাড়িটায় এক হাত বোলায় সে। বলে, কি সুন্দর। সেদিনের কথা মনে পড়তেই আততায়ীর লিস্ট থেকে বাদ পড়ে যায় বসুকন্যা।“

তবে বালকেরও চোখে পড়ে...‘সাধারণ হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে মন খুলে মেশে না, সাধারণ মুসলমানরাও হিন্দুদের সাথে মেশে না। হিন্দুরা মুসলমানদের ছোঁয়া এড়িয়ে চলে। মুসলমানরা বলে পানি, হিন্দুরা বলে জল! সিরাজগঞ্জ বা নওগাঁয়ে দাঙ্গা হয় নি, তবু হিন্দুরা সেখান থেকে চলে যাচ্ছ ওপার বাংলায়। স্পষ্ট নয় তার কাছে। তবে জিন্না সাহেব রিসার্ভ করা ট্রেনে যাচ্ছেন আর ওদের নেহরু যাচ্ছেন মালগাড়িতে জোড়া একটা বগিতে – খবরটা বালককে তৃপ্তি দেয়। সৃষ্টি হয় পাকিস্তান। এক বছর কাটতে না কাটতে খবর আসে গান্ধী আততায়ীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ‘আমার বৃত্তে কারোর চোখে জল দেখি নি। আক্ষেপ শুনেছি, মানুষটা ভাল ছিল। আর শুনেছি সিরাজগঞ্জ শহরে হিন্দুরা কেঁদে বুক ভাসিয়েছে।’ 

এই পরিবেশের মধ্যে থেকেও লেখকের চেতনার বিকাশ ঘটেছে। তাঁর স্বচ্ছ চিন্তাধারা তাঁকে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের সংকীর্ণ বেড়াজাল ভেঙ্গে উত্তরণের পথে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি লিখছেন -

‘ঢাকায় হিন্দু-মুসলমানদের দাঙ্গা। দাঙ্গা মানে হিন্দু নির্যাতন, কারণ মুসলমানদের ওপরে আক্রমণ করার শক্তিই হিন্দুদের নেই। কলেজেও থমথমে ভাব। অমন স্যুটেড আজহার স্যার, তিনিও স্যুট ছেড়ে ফিনফিনে পাঞ্জাবী আর পায়জামা পরে ক্লাসে এসেছেন, আশপাশে বস্তির মুসলমানরা পাছে তাঁকে হিন্দু বলে ভুল করে তাই। ...কলকাতায় নাকি দাঙ্গা হয়েছে, তাই ঢাকাতেও হতে হবে। বাড়ির মুরুব্বীরাও ঢাকার দাঙ্গার কারণ খুঁজে পান কলকাতার দাঙ্গায়। আমি ঠিক খুঁজে পাই না। ... কয়েক ট্রাক মিলিটারী গেল পুরানো ঢাকার দিকে। অধিকাংশ হিন্দুদের বাস ওদিকটায়। খোলা ট্রাকের ওপর সৈন্যরা বেশ খোশ মেজাজে আছে মনে হয়। ওদের একজন আমাদের দিকে তাকিয়ে তর্জনী সোজা করে ছুরির মত নিজের গলায় ঠেকিয়ে একটা ইঙ্গিত করে যায়, যার অর্থ বুঝতে কষ্ট হয় না। ওরাই চলেছে হিন্দুদের রক্ষা করতে...’

নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে। আকৃষ্ট হয়েছেন বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে। চোখে ভাসছে শোষণহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন। মানবতার স্বপ্ন। কিন্তু লেখাপড়া ছাড়তে পারছেন না। ‘তবু কোনও এক ধরণের পাতি বুর্জোয়াত্ব দ্রুত ঠেলে নিয়ে আসে ইয়ুনিভার্সিটির শ্রেণীকক্ষে।‘ তারপর ডিগ্রি লাভ এবং চাকরি।
সুযোগ আসে বাইরে যাবার। কিছুদিনের জন্যে ম্যানচেস্টার থেকে ঘুরে আসেন। তারপর সুযোগ পান নোবেল প্রাইজ পাওয়া ইকনমিস্ট জ্যান টিনবার্গেনের কাছে ডক্টরেট করার। টিনবার্গেনের সুপারিশেই ইউ.এন-এ চাকরি জুটে যায়।

কর্মজীবনের বহু ঘটনার কথা এতে রয়েছে। সেগুলো লেখক বর্ণনা করেছেন প্রায় দিনপঞ্জির আকারে। বহু সহকর্মী একের পর এক বইয়ে পাতায় এসেছেন, কিন্তু পরিচয়ের সংক্ষিপ্ততায় সেগুলো তেমন দাগ কাটে না। যেটা দাগ কাটে এবং গভীর ভাবেই কাটে – সেটা হল প্রায় নৈর্ব্যক্তিক দ্রষ্টার ভূমিকায় প্রথম খণ্ডে লেখকের ছেলেবেলার কথা - ছাত্রজীবনের কাহিনী। নিঃসন্দেহে সেটাই মনে হয়েছে বইটির প্রধান সম্পদ। 

বইটি ২০১৩ সালে বাংলাদেশের আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে। যোগ্য সম্মান।

সুজন দাশগুপ্ত

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।