প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

পুরনো দিনের পত্রিকা ও বই থেকে নির্বাচিত প্রবন্ধ (সূচী)

কলকাতায় বোমা !

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ সেন, এম-এ

      [ লেখক পরিচিতি : খগেন্দ্রনাথ সেনের জন্ম ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে। পিতা প্রবোধচন্দ্রের পৈতৃক নিবাস হুগলী জেলার গুপ্তিপাড়া। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম.এ পাশ করে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা জগন্নাথ কলেজের লেকচারার হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩০-এ ‘অ্যাডভান্স’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক হয়ে সাংবাদিকতায় প্রবেশ। ১৯৩০-৩১ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল বৈঠকে দ্বিতীয় অধিবেশনের প্রতিনিধি কলকাতার শেরিফ নগেন্দ্রনাথ লাহার সেক্রেটারী হয়ে লন্ডন ও ইওরোপ ভ্রমণ করেছেন। ১৯৩২ সালে আশুতোষ কলেজের অধ্যাপক হয়ে যোগদান করেন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘হিন্দুস্থান ষ্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ও ১৯৪৪-এ ‘দি ন্যাশনালিস্ট’ পত্রিকার এডিটর-ইন-চিফ নিযুক্ত হন। সাংবাদিকতা থেকে আবার শিক্ষা জগতে প্রত্যাবর্তন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত আশুতোষ কলেজের সান্ধ্য বিভাগে এবং ১৯৫৬ থেকে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত (১৯৬৬) দিবা বিভাগের অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগেও তিনি শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৫৯ সালে ভারত-মার্কিন শিক্ষামূলক বিনিময় কর্মসূচীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন।
       খগেন্দ্রনাথ ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ছোটদের পত্রিকা ‘রংমশাল’ প্রতিষ্ঠা করেন, সম্পাদক ছিলেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। ছোটদের এটি ছিল অত্যন্ত প্রিয় পত্রিকা। কলকাতা বেতার কেন্দ্রে ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত ‘গল্পদাদুর আসর’ও পরিচালনা করেছেন খগেন্দ্রনাথ। তার রচিত গ্রন্থ – ‘ইকনমিক রিকনস্ট্রাকশন অফ ইন্ডিয়া’, ‘ভারতের অর্থনীতি’, ‘সমাজবিজ্ঞানের ভূমিকা’, ‘সমাজবিজ্ঞান পরিচয়’, ‘সোভিয়েট ইউনিয়নের নয়া সংবিধান ১৯৭৭’ প্রভৃতি।
১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর খগেন্দ্রনাথের কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে।]

দীপক সেনগুপ্ত

       কলকাতায় বারবার পাঁচবার বোমাবর্ষণ হোলো| যারা এই সময়ে কলকাতায় ছিলে তারা বোমার এই শব্দ শুনেছো, তারপর তার ধ্বংসলীলার পরিচয়ও পেয়েছো| যারা কলকাতায় ছিলেনা তারা তোমাদের কলকাতাবাসী আত্মীয়স্বজনের জন্য চিন্তিত হয়েছো এবং আছো| ইতিমধ্যে বোমার জন্য কলকাতায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে চিঠিপত্রে তার আভাস পেয়ে থাকবে| কিন্তু অনেকে আছো যারা কলকাতায় বোমাবর্ষণের খবর পেয়েছো কেবলমাত্র সংবাদপত্রের মারফৎ এবং তার ধ্বংসলীলার ছবি কাগজ দেখেছো|
এই বোমাবর্ষণের পেছনে যে নৃশংসতা আছে সে কথা আজ না বললেও বুঝতে পারবে| এই নৃশংসতার সৃষ্টি হয়েছে বর্ত্তমান যুদ্ধরীতির ফলে|

       আমাদের দেশে ক্ষাত্রধর্ম্ম ছিল “সম্মুখ সমর|" সাবমেরিণ-যুদ্ধ আরম্ভ হবার আগে য়ুরোপেও এই রীতি ছিল| বর্ত্তমান মহাযুদ্ধের রীতি সর্ব্বাঙ্গীণ-সমর বা টোট্যাল ওয়ার (Total War)| এইরূপ যুদ্ধে সামরিক বা বেসামরিক প্রভেদমূলক কোনো সংজ্ঞা থাকে না| সমগ্র জনসাধারণের প্রচেষ্টা সামরিক কার্য্যে নিযুক্ত হওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ক্রমশঃ বিস্তৃত হয়ে সমস্ত দেশের সীমানায় পরিব্যপ্ত হয়| তখন শত্রুর লক্ষ্যস্থল হয় এই যুদ্ধপ্রচেষ্টার উৎসগুলিকে বিনষ্ট করা এবং ঠিক সেই অনুপাতেই স্বপক্ষীয় দলকে সাবধান হতে হয়, যাতে এই উৎসগুলি শত্রুর দৃষ্টিপথের অন্তরালে থাকে| এই জন্যই ব্ল্যাক-আউটের প্রয়োজন হয়, যাতে সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলি শত্রুর দৃষ্টিপথবর্ত্তী না হয়। কামুফ্লাজের (camouflage) ব্যবস্থাও এই জন্যই হয়| এমন কি যাতে সংবাদপত্রের ভিতর দিয়েও অসাবধানে কোনো খবর শত্রুর কর্ণগোচর না হয় তার জন্য যুদ্ধকালে সামরিকবিভাগ কর্ত্তৃক সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করা হয়| এবং জনসাধারণকে বারেবারে সাবধান করা হয় যাতে তাঁরা অসংযত বাক্যের দ্বারা শত্রুর গুপ্তচরের কাছে মূল্যবান্ সংবাদ গোচর না করেন|

       এই সকল কারণে সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলির নিশানা পাওয়া শত্রুর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে| অপরপক্ষে বেসামরিক জনসাধারণের বিপদের আশঙ্কাও বেড়ে যায়| শত্রুর বোমার বিমানগুলি লক্ষ্যবস্তু সম্বন্ধে সঠিক তথ্য না পাওয়ায় ইতস্ততঃ বোমা নিক্ষেপ করতে বাধ্য হয় এবং তাতে নিরপরাধ জনসাধারণের জীবননাশের সম্ভাবনা থাকে| এই জন্যই এ,আর,পি বা বিমাণ-আক্রমণ-প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে|

      কলকাতায় যে পাঁচবার জাপানী বিমানের হানা হল তাতে এ,আর,পি ব্যবস্থার আবশ্যকতা সম্বন্ধে আর কোনো সন্দেহ থাকা সম্ভব নয়| দেখা গেল যে যারা ব্যাফ্ল্-ওয়াল (baffle-wall) এর পিছনে বা অশ্রয়কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের কোনো আঘাত লাগে নি, যে সব হতভাগ্যেরা তা নিতে পারে নি তারাই হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়েছে| সৌভাগ্যবশতঃ এরূপ হতাহতের মোট সংখ্যা অতি অল্পই হয়েছে|

      "জ্যোৎস্না-হসিত নীল আকাশ"-এর বক্ষ বেয়ে বোমারু বিমানগুলি এসেছিলো; সেই অপরূপ শুক্লা জ্যোৎস্নার সহায়তা পেয়েও শত্রুর অধিকাংশ বোমাই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়| তবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে নিক্ষিপ্ত বোমাগুলি হাল্কা ওজনের মানুষ-মারা বোমা| বিশেষজ্ঞরা এর থেকে সিদ্ধান্ত করেন যে সামরিক লক্ষ্যবস্তু বিনষ্ট করা এই বোমাবর্ষণের উদ্দেশ্য ছিল না, এর উদ্দেশ্য ছিল নিরপরাধ ভারতবাসিদের প্রাণসংহার করা| এইরূপে ভারতবাসিদের মনে আতঙ্ক বিস্তার করতে পারলে অশিক্ষিত আতঙ্কগ্রস্ত কলিকাতাবাসীরা কলকাতা ত্যাগ করে পলায়ন করবে অবং তাতে শেষপর্য্যন্ত যুদ্ধপ্রচেষ্টা ব্যাহত হবে|

       এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে আমরা কি জাপানীদের এই অভিসন্ধি সার্থক হতে দেবো ?

      এ প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তর নেই| অনেকে মনে করেছিলেন, হয়ত বা এখনও করেন, যে জাপানী আমাদের বন্ধু| জাপানী আজ যে-পথে তার উন্নতির ধ্বজা ধরে চলেছে সে হল পাশ্চাত্য পথ| এ পথে আছে স্বার্থের সংঘাত, দন্তের আস্ফালন, অর্থনীতির বিপাক; এবং সকলের পেছনে আছে বিজ্ঞানের ধংস-বৈজয়ন্তী| এপথ ভারতের পথ নয়| ভারতবর্ষ কারুর শত্রুর নয়, কিন্তু তাই বলে ভারতবর্ষ স্বার্থান্বেষী, দাম্ভিকের বন্ধুও নয়। জাপান যে প্রাচ্যের মহান আদর্শ ভুলে গিয়ে ভুলপথে চলেছে, জাপানের প্রাক্তন পরম সুহৃদ সত্যদ্রষ্টা কবি রবীন্দ্রনাথও তীব্রভাষায় জাপানী কবি নগুচিকে একাধিক পত্রে জানিয়েছিলেন| ভারতবর্ষ যে জাপানকে ভালোবাসে সে জাপান তোজোর জাপান নয়| সে জাপান আজ থাকলে চীনকে গ্রাস করতে উদ্যত হত না, ভারতবাসীর মনে ভীতিসঞ্চার করবার জন্য বোমারু বিমান পাঠাতো না|

       আজ যদি আমরা সত্যি সত্যিই ভীত, সন্ত্রস্ত হই, তাহলেই তোজোর জাপানকে মেনে নেওয়া হবে| শুধু তাই নয়, জাপানীর কাছে আমরা অতি হেয়, ঘৃণ্য জীবরূপে প্রতিপন্ন হবো| স্বাধীন দেশ হবার দাবী যদি বা কিছুমাত্র থেকে থাকে, আমাদের কাপুরিষোচিত ব্যবহারের দ্বারা আমরা সেই দাবী নষ্ট করবো|

       এ কথা হয় তো বলা যায় যে নিরস্ত্র জাতির পক্ষে পলায়নই প্রশস্ত পন্থা| কিন্তু এ কথা যারা বলে প্রকৃত জনযুদ্ধ কাকে বলে জানে না; নয় ত তথাকথিত সশস্ত্র জাতির জনসাধারণ সম্বন্ধে তাদের একটা ভ্রান্ত ধারণ আছে| পূর্ব্বেই বলেছি এটা সর্ব্বাঙ্গীন যুদ্ধ; সৈন্যবাহিনী এখনও প্রয়োজন, কিন্তু যে জনবাহিনী তাদের পেছনে কাজ করে তারা সকলেই হাতিয়ার নিয়ে কাজ করে না, তারা কাজ করে ফ্যাক্টরীতে ডকে, রাস্তাঘাটে ইত্যাদিতে, জাতীয় যুদ্ধপ্রচেষ্টার নানাদিকে| কেউ গাড়ী চালাচ্ছে, কেউ টেলিগ্রাফ অফিসে কাজ করে, কেউ বা মিলে মজুরী করে, কেউ বা রাস্তা তৈরী করছে, কেউ রোগীর শুশ্রূষার জন্য নিযুক্ত হয়েছে, ইত্যাদি নানারূপে প্রত্যেকে সামরিক কাজের একটি অংশ বেছে নিয়েছে| দেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত রাখার জন্য যে আত্মোৎস্বর্গ, জনযুদ্ধের সেইটাই হল সবচেয়ে বড় আদর্শ; হাতিয়ার থাক বা না থাক আমাদের সবকাজেই এই আদর্শ প্রয়োগ করা যায়| আজ যদি আমরা আমাদের এই দুর্দ্দিনে কর্ত্তব্যবিমুখ হয়ে পালিয়ে যাই, তা'হলে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন, কল্পনার বিলাসেই পর্য্যবসিত হবে, বাস্তব রূপ আর নেবে না|

       সুখের বিষয়, আমরা এখনও এই গ্লানি থেকে দূরে আছি|

       কলকাতা থেকে দুশ্রেণীর লোক পালিয়েছে| এক, যারা বাংলাদেশকে কোনকালেই নিজের দেশ বলে ভাবে নি| আর দ্বিতীয়, যাদের জন্য বিমান আক্রমণ প্রতিষেধক কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় নি| মাড়োয়ারি ভাটিয়ারা ত আসে অর্থের সন্ধানে, তাদের সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক, সোণার শিকলের সম্পর্ক| জাপানী বোমায় যে সেই শিকল ছিঁড়ে যাবে তা আর বিচিত্র কি? কিন্তু দুঃখ হয় তাদের জন্য যারা থাকে বস্তীগুলিতে, এবং সারা জীবন খেটেও যাদের সম্বল খালি লোটা ও কম্বল| বেঁচে থাকবার জন্যই তাদের আপ্রাণ চেষ্টা, সেই বেঁচে থাকার ব্যাপারটাই যদি বিপন্ন হয়ে পড়ে, তবে আর তাদের ঠেকাবে কে? বোমার কাছে বস্তীর কি-ই বা মূল্য! আশা করা যায় যে এবার থেকে এই বস্তীগুলির নিরাপত্তার জন্য কত্তৃপক্ষ যথারীতি ব্যবস্থা করবেন| কারণ এই সার্ব্বজনীন যুদ্ধে আমরা একটা জিনিষ এই শিখেছি যে যতই আমরা আমাদের শ্রেণীগত সভ্যতার বড়াই করি না কেন, এই সভ্যতার উপাদান যোগায় ঐ কুলিমজুরের দল, কারণ ওরা না থাকলে আমাদের বেঁচে থাকাই একটা বিড়ম্বনা হয়ে ওঠে|

       তোমরা যখন বড় হবে, এই শিক্ষার মধ্যে বড় হয়ো যে আমাদের জীবনে খুটিনাটি কাজেরও দাম বড়ো কম নয়! ঝি-চাকর ছোটলোক বলে ঘৃণা করবার অধিকার কোনো মানুষেরই নেই| আভিজাত্য বা বংশমর্য্যাদার কোনো মূল্যই নেই যদি না সেই মর্য্যাদা, সত্যিকারের মনুষ্যত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে| গরীব দুঃখীদের পরিশ্রম আমাদের কাছে এতই সহজলভ্য যে ওর সত্যিকারের মূল্য আমরা সহজে ধারণাই করতে পারি না| ষ্টেশনে কুলী না পেলে বুঝতে পারি যে চার পয়সা বা দু'আনা মূল্যের যে পরিশ্রম, তার সত্যিকারের মূল্য কি| তেমনই আমরা অভ্যস্ত হয়েছি সভ্যতার আনুসঙ্গিক যন্ত্রগুলির সঙ্গে| কলকাতায় সন্ধ্যার দিকে বাবুরা যখন ট্রামে ঝুলতে ঝুলতে বাড়িমুখো যান, পাছে ট্রাম বন্ধ হয়ে যায় এই ভয়ে, তখনই বোঝা যায় আজকের দিনের যন্ত্রসভ্যতা আমাদের কিরূপ পঙ্গু করে দিয়েছে| গ্রীষ্মে মাথার উপর ইলেক্ট্রিক ফ্যানটি খারাপ হয়ে গেলে মনে হয় হাত পাখাটুকু নাড়বার শক্তিটুকুও বুঝি বিজ্ঞান আমাদের কাছ থেকে হরণ করেছে| আমাদের এই পরাধীনতা কে দূর করবে? আজ বোমার ভয়ে গরীব দুঃখীরা পালাচ্ছে তাই আমাদের অনেকেরই একটু অঙ্গ চালনা করবার অবসর হয়েছে, আশা করা যায় এতে কলকাতাবাসীর শিথিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে হয় ত বা একটু স্বাস্থ্যসঞ্চার হবে| বাড়ির মেয়েদের বাইরে পাঠিয়ে কর্ত্তাদের হাতপুড়িয়ে রান্না শিখতে হচ্ছে; আশা করা যায় গিন্নীরা ফিরে এলে তরকারিতে একটু লবণ বেশী হয়ে গেলে কিংবা ডালটা একটু ফিকে হলে আর চোখের জল ফেলবার কারণ হবে না, কর্ত্তা বুঝবেন এই সব ধৈর্য্যশীলা, স্নেহশীলা রাঁধুনীদের মূল্য কি| আমাদের দেশে মেয়েরা এখনও বাজার করতে বেরোন নি, কিন্তু বিলাতে দেখেছি, এখানেও সাহেব পাড়ায় দেখা যায়, বাজারের কাজটা মেম সাহেবেরাই করতে ভালবাসেন| কর্ত্তাকে যদি বোমার গুণে রান্না শিখতে হয়, আমাদের দেশের মেয়েরা বাজার হাটটাই বা করবেন না কেন?

        যাক, কথায় কথায় অবান্তর কথা এসে পড়লো| দেশ ছেড়ে পালানোর মধ্যে বীরত্ব ত নেইই, বুদ্ধিও বেশী আছে বলে মনে হয় না| অনেকেই পালিয়েছেন এই মনে করে যে একটা বিরাট ধ্বংসযজ্ঞ বুঝি বা আরম্ভ হোলো| এই বোমাবর্ষণ বুঝি বা আসন্ন জাপানী আক্রমণেরই ভূমিকা|

       কিন্তু স্থির চিত্তে ভেবে দেখতে হবে যে যে-কদিন বোমাবর্ষন হয়েছে তাতে কি এরূপ একটা ধারণা করা যুক্তিসঙ্গত হবে? আজ বাংলাদেশে যে বিরাট সৈন্যসমাবেশ হয়েছে এবং বিমান আক্রমণ পরিপন্থী যে সমস্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে তার কি কিছুই মূল্য নেই? তা ছাড়া ভারতবর্ষের মত একটা মহাদেশ আক্রমণ করার মত রসদ বা লোকবল কি জাপানের আছে? ভুললে চলবে না যে জার্ম্মাণী তার অধিকৃত দেশগুলি থেকে সৈন্যসংগ্রহ করেছে, কিন্তু জাপানীদের এখনও সে সুযোগ হয় নি| এখনও প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিপরীক্ষা চলছে, নৌবহরের যাতায়াত এখনও বিপদসঙ্কুল| অপরপক্ষে দেখা যায় কলকাতায় যে বোমাবর্ষণ হয়েছে তার বহুগুণ তীব্র বোমাবর্ষণেও লণ্ডনের অধিবাসিগণ বিচলিত হন নি| জাপানীদের ভারত আক্রমণ আসন্ন ত নয়ই, একেবারেই হবে কি না, যথেষ্ট সন্দেহ আছে| কারণ মিত্রপক্ষের বর্ম্মা-অভিযান রীতিমত আরম্ভ হবার আর বেশী দেরী নেই এবং সে অভিযান আরম্ভ হলে ভারত-আক্রমণের সম্ভাবনা আরও পেছিয়ে যাবে|

       অবশ্য ভবিষ্যতে আরও ঘোরতর বোমাবর্ষণ যে হবে না তা নিঃসংশয়ে বলা যায় না| জাপানের প্রচণ্ড শক্তিকে অস্বীকার করা যায়না| বর্ম্মা, মালয় ইত্যাদি স্থান অধিকারের ফলে সে শক্তি আরও বর্দ্ধিত হয়েছে| এই সব স্থান থেকে ভারতবর্ষের উপর বিমান আক্রমণ আরও সহজ হয়ে উঠেছে| কিন্তু অপরপক্ষে মিত্রশক্তিও আজ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে| প্রশান্ত মহাসাগরের শক্তিপরীক্ষার চরম মীমাংসার উপর এই শক্তির ভাগ্য নির্ভর করছে| কাজেই বোমাবর্ষণের আশঙ্কা থাকলেও তার ধংসকারিণী শক্তি যে ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাবে তা মনে করবার কোনো হেতু নেই|
তবে একথাও সত্যি যে শত্রুর এই শক্তিকে প্রতিহত করতে গেলে জাতীয় সংহতি প্রয়োজন| কেবলমাত্র সৈন্যসামন্তের দ্বারা এই শক্তি প্রতিহত হবে না| আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে শত্রুকে প্রতিরোধ করবার দৃঢ় সঙ্কল্প জাগিয়ে রাখতে হবে| অপর পক্ষে আমরা যদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাই তাহলে জাপানের ভারত-আক্রমণের পথ আরও সহজ সুগম হয়ে উঠবে|

       যার মনে করেন বিজয়ী জাপান আমাদের স্বাধীনতা পুষ্পাঞ্জলির মত আমাদের কাছে নিবেদন করবে, তাঁরা পৃথিবীর ইতিহাসের পৃষ্ঠা যেন আরেকবার পড়ে দেখেন| বিশেষ করে জাপানের নিজের ইতিহাস|
যাঁরা এইভবে দেশের স্বাধীনতা ভিক্ষা করেন তাঁদের দেশ থেকে দূরে থাকাই ভালো|

      এমন কি অরাজকতার মধ্য দিয়েও যে স্বাধীনতা পাওয়া যায় তাও অর্জ্জন করতে হয় বাহুবলে, বুকের রক্তে ও চোখের জলে|
দেখাতে হবে আমাদের সেই শক্তি, সেই সাহস, সেই আত্মত্যাগ|

('রামধনু' পত্রিকা, মাঘ ১৩৪৯)

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।