প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

ভ্রমণ

অগাস্ট ৩০ , ২০১৫

মহাকালের সংসার ও একটি নদী

শিবাংশু দে


(আগের অংশ)

অজগর করে না চাকরি  পঞ্ছি করে না কাম
দাস মলুকা কহ গয়ে  সবকে দাতা রাম ।।

১১

  আগেও বলেছি, আবারও বলি, বনারস কোনও স্থান নাম নয়। ওটা একটা মানসিকতা। ভারতসভ্যতার যা যা লক্ষণ প্রতীচ্য সভ্যতার চোখে বালুকণা, তার সব কিছুই বনারসি মানসিকতার অঙ্গ। সংকীর্ণ গলি'র পর গলি। আবর্জনার স্তূপ আছে, কিন্তু নেইও। যদি লোকে নাইই তাকায় সেদিকে, তবে তার থাকা না থাকার কোনও তাৎপর্য নেই। সেই শাশ্বত প্রশ্ন... জব দেখনেওয়ালা কো'ই নহি, জ্বল যাও তো ক্যা, বুঝ যাও তো ক্যা? তিনফুট চওড়া গলিপথে এগিয়ে যাচ্ছেন, অন্য দিক থেকে দেখলেন অতি বলশালী একটি শিবের বাহন সবেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। লাফিয়ে পাশের দোকানে আশ্রয় নিয়ে যখন ধাতস্থ হবার চেষ্টা করছেন, শোনা যাবে দোকানদারের সস্নেহ আশ্বাস, উওহ কুছ নহি করেগা।

মন্দিরে যাবেন? সহস্র সহস্র লোকজন নিজস্ব ধরণে পুজোআচ্চা করে যাচ্ছে। কেউ দ্রুতবেগে, কারুর কোনও তাড়া নেই। ফুল, পাতা, জল, ধূপ, দুধ, ধুলো, কাদা, ঘন্টাধ্বনি, স্বেদবিন্দু, উচ্চরোল ভক্তির আকুতি। মনে হবে, মানুষ তার অসীম সহিষ্ণুতা নিয়েও টিকতে পারছে না এখানে, দেবতা তো কী করে থাকবেন? ঘাটের পর ঘাট। পোষাকের লজ্জাবিযুক্ত মানুষ। যাবতীয় বর্জ্যে ভাসমান গেরুয়া জল। তাও বিশ্বাসে পবিত্রতম। পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে। রিকশার উপর রিক্শা, ষাঁড়ের উপর ষাঁড়, মানুষের উপর মানুষ, ফুটপাথ বদল হয়ে যায় মধ্য পথে। সন্ধে হলো। বাতি জ্বলে, নেভে, আবার জ্বলে, আবার নেভে। রিক্শা, অটো, সাইকেল, কুকুর, ভাঙা গলিপথ, চারদিকের মন্দির থেকে ভেসে আসা নানা ভজন আরতির কোলাহলে ভারি বাতাস,সব পেরিয়ে আজকের মতো আস্তো শরীরে আস্তানায় ফিরে যাওয়া। বাবা কা নগরী কি মহিমা অপার।     

এতোটা পড়ে সাহেবসুবো'রা বলবেন, আরে রাম রাম, কে এখানে মরতে যায়? সেই জন্যই তাঁদের আসতে মানা করি। যদি এর উপর এখানকার ধূলিমলিন পথঘাট, গলিঘুঁজি সব ঘুরে ফিরে বনারসি অলীক-কুখাদ্য রঙ্গে মজে যাবার গপ্পো করি তবে তো চিত্তির। নরক অন্ধকারের মতো কালো কড়াই, কুম্ভীপাকের তেলের বয়সি গামলা গামলা ফুটন্ত কটাহ তৈল,  সিসে লাল রং সরেশ জিলিপি আর গামলার ধরা জলে শিশু শ্রমিকদের দিবারাত্র ধুয়ে যাওয়া থালাগেলাস। নাহ, আর বলবো না। এক স্বাস্থ্যসচেতন বন্ধু বলেন তিনি বনারসে গিয়ে কিস্যু খাবেনা না। খেলেই পেটের সত্যনাশ। ওষুধ খেতে হবে গাদাগাদা। আমি বলি দু'হাজার বছর ধরে  খেটেখুটে মানুষ এতো ওষুধ বানিয়েছে কেন? খাবার জন্যই তো। তবে ? বনারসি কুখাদ্য খেয়ে যদি ওষুধ খেতে হয় তবে সেটা জন্মগত অধিকার হিসেবেই মেনে নিতে হবে।

১২

কোথা থেকে শুরু করি?

বাবা বিশ্বনাথ মন্দির থেকে উত্তরদিকে ঠঠেরিবাজারের দিকে যেতে দালমন্ডির পূর্বদিকে বিখ্যাত কচৌড়ি গলি, লাহোরিটোলা।  সক্কাল সক্কাল নিশ্চিন্তে তেঁতুলের চাটনি বা চনা-আলুর ঝোল দিয়ে গরম কচৌড়ি খাবার বাসনা হলে সাতটার মধ্যে পৌঁছে যেতে হবে। নদীতে স্নান সেরে ফেরার পথে  বনারসিবাবুরা প্রাতরাশটা ওখানেই শ্রীগণেশ করেন। জলেবিও পাওয়া যায়, রসে মুচমুচে। কিন্তু তা মলাই মারকে নয়। পাপড়ি চাট, বুঁদিয়া চাট, ধনিয়া চাট, ইমলি চাট, আলু চাট, দহি চাট, পালক চাট, টমাটর চাট, চনা চাট, মটর চাট, অগণিত কম্বিনেশনের চাট খেতে গেলে লাক্সা থেকে দশাশ্বমেধ রাস্তায় অপেক্ষা করছে বিভিন্ন চাটভান্ডার। মাটির কুলহড়ে মলাই মারকে লস্যি বা স্বর্গীয় বনারসি রাবড়িমলাই সব দিকেই পাওয়া যায়। তবে চৌকের দিকেই কুলীন দোকানগুলি রয়েছে। বনারসি সমোসা একটু ছোটো, বাংলা সিঙাড়ার মতো পাতলা ছালের নয়। ফলতঃ রসিকরা সব সময় নিজেদের ঠিক আটকে রাখতে পারেননা।

নাম শুনেছিলুম আগে তাই পৌঁছে গেলুম 'কাশী চাট ভান্ডার', লাক্সা রোড, গোদউলিয়া।  সাঁঝের ঝোঁকে সেখানে ঢোকাই যায়না। বসে খাবার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু তা নেহাৎ অপ্রতুল। নীচে আর মেজানিন তলায়। তবে সেখানে শুধু খাদ্যপদার্থের দিকেই নজর রাখতে হবে। এদিকওদিক তাকালে একটু নার্ভাস হবার সমূহ কারণ রয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি ওপরে যতোগুলো নাম আছে, সবগুলো'ই চেখে দেখা হয়েছে। তাছাড়াও আরো কিছু কুখাদ্য দৃষ্টি আকর্ষণ করার অপেক্ষায় ছিলো। তাদেরকেও ভবিষ্যতের আশায় ছেড়ে আসা হয়নি। ঐ রাস্তাতেই এপার ওপার অন্ততঃ গোটা চারপাঁচ সরেস রাবড়িমালাই। কোনোটা কেসরিয়া, কোনোটা প্লেন বা অন্য সুরভি। পাশেই ভাং মারকে ঠন্ডাই। অন্তস্তল পর্যন্ত শীতল করে দেয় বাবার পরসাদি। মাত্রা বেশি হয়ে গেলে সোজা জিলা অস্পতাল। ডানদিকের গলিটায় ঢুকে গেলেই সারিসারি কোণারক মন্দির স্টাইলে জলেবির স্তূপ সাজানো রয়েছে। মস্তো ইমরিতি থেকে মিনি দুধ-জলেবি । সবার প্রতি সুবিচার করতে যাওয়া একটু চাপ, কিন্তু জীবন তো একটাই। আর ওষুধ তো রয়েইছে।

বনারসি খানপানের বাকি অর্ধেকটা দখল করে আছে  পানদোষ বা পুণ্য। তা গোটা তিরিশ-বত্রিশ পানের রকম রয়েছে। প্রধান ঘরানা হলো কলকত্তা ( মানে বাংলা পান), বিহারি এবং বনারসি। নামেরও সব সামাজিক স্তর রয়েছে। মাটির কাছাকাছি নাম রামপ্যারি, লালপরি, পচরঙ্গি, দিলখুশ।  বাংলাপান খুবই লোকপ্রিয়। তবে মগহি হলো বনারসের অসলি পান। বনারসি মগহি ইজ দ্য কিং। পানপাতা ছাড়া মূল ত্রয়ী তো সেই চুনা, কত্থা, সুপারি'র কম্বিনেশন। তবে তার সঙ্গে যোগ হয় সুখা নারিয়্ল, মিঠি সুপারি, সৌঁফ (মৌরি), ইলাইচি, গুলকন্দ, কাজু গুঁড়ো, পিস্তা গুঁড়ো, জায়ফল গুঁড়ো, লক্ষ্মীচূড়া, লবঙ্গ, চেরি ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনকোনায় মোড়া পানটিকে বলে গিলৌরি। লবঙ্গ দিয়ে গাঁথা গিলৌরিটি মুখে ফেলে শুধু চোখ বুজে চিবিয়ে যাওয়া ছাড়া প্রকৃত রসিকের কোনও কৃত্য নেই। চকোলেট পানও এখন খুব চলতি, কিন্তু বনেদি রুচির মানুষেরা ওসব পরিহার করে চলেন। বনারসে প্রতিটি গলি, রাস্তার কোনা, দৃশ্য-অদৃশ্য গোঁজ, সর্বত্র পানের সমাহার অনন্ত। তবে রইসি বনারসিরা একগামী। নিজের ছাপ্পা দোকান ছাড়া তারা অন্য কোথাও খাবেনা। পান খরিদ ও খাওয়া আসলে একটা  সামাজিক কার্যক্রম।

পানের সাথে যত্রতত্র পিক ফেলার যে নারকীয় অনুষঙ্গ নিয়ে আমরা সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকি, তা কিন্তু অসলি বনারসি পানের তহজিব নয়। যাঁরা পানপাতার সঙ্গে নানা প্রকৃতির তামাকুপাতা সেবন করে থাকেন, ঐ ঘৃণ্য অভ্যেসটি তাঁদেরই ওয়সিহত।


১৩

পানি ভরেরে কৌন অলবেলি, ঝমাঝম

পন্ডিত ছন্নুলাল মিশ্র যখন মুডে থাকেন, খমাজে "অব না বজাও শ্যাম"  খটকা, মুড়কি, গিটকিরি, পুকার সব কিছু ছড়াতে ছড়াতে আসরে ঠুমরির মাহৌল জমাতে থাকেন, কিছু গয়া'র গিটকিরি, কিছু পঞ্জাবি মুড়কি, সংলাপও চলতে থাকে সমানে, আসা যাওয়া করে, সুননেওয়ালা বলে উঠবে য়হি হ্যাঁয় বনারসি চাল। কথা ঊঠবে, কেন ছন্নুলালজি ? ওঁর থেকে তো অনেক ইলমদার শিল্পী বারাণসি আমাদের দিয়েছে। ওঁর তালিম তো কিরানা ঘরের। কণ্ঠস্বরের তাসিরও তো সেই মাপের নয়। তবে? উত্তরটি হতে পারে ছন্নুলালের গায়নের ভঙ্গিটি, একেবারে মাটির কাছে। মাটির কাছাকাছি থাকা শ্রোতাদের খুব তাড়াতাড়ি অধিকার করে নেয়। তাঁর আপাত চ্যুতিগুলি, সুর থেকে সরে যাওয়া, অহরহ সংলাপ, প্রায় গ্রাম্য রসিকতা'র সুতো, কিন্তু মজিয়ে রাখে তাঁর সামনে বসে থাকা মানুষগুলিকে। তাঁদের মধ্যে কেউ পানবিক্রেতা, কেউ রাবড়িওয়ালা, কেউ বিখ্যাত অধ্যাপক, কেউ বা বরিষ্ঠ রাজপুরুষ অথবা পরিচয়হীন, ধারালো, বনারসি ভবঘুরে পথের লোক। সব মিলিয়েই ফুটে ওঠে বনারসি চাল। বনারসি অদার ঠিক এই ধরণটি ফুটে উঠতো আরেকজন শিল্পীর পেশকারিতে, গিরিজা দেবী।

গানে গানে সব বন্ধন যাক টুটে। এই প্রার্থনাটি এসেছে অনেক পরে। কিন্তু আমাদের দেশে সর্বত্র সঙ্গীতই আবহমানকাল ধরে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতার প্রত্যক্ষতম সৃজনশীল সূচক। ভারতবর্ষ মানেই অন্তহীন সুরের সিম্ফনি, অগণন সুরধারার ঝর্ণাতলা। সামান্য ধারণায় যতোটা বুঝি, সারা বিশ্বে আর কোনও ভূখন্ড দেখতে পাইনা, যেখানে সুর ও সঙ্গীত সামগ্রিক মানবিক যাপনের সঙ্গে এতো ওতপ্রোত, এতো বহুধাবিকীর্ণ। এই বিপুল, বিশাল দেশের কোনও এমন প্রান্ত নেই যাদের নিজস্ব গীতশৈলী নেই। বিস্ময়কর। কিন্তু তার মধ্যেও বারাণসি অনন্য। সেই গুরু বল্লভাচার্যের সময় থেকে শুরু হয়েছে। মধ্যযুগের ভক্তি-আন্দোলনের প্রধান গুরু'রা যেমন সন্ত কবির, সন্ত তুলসিদাস, সন্ত  রবিদাস, সন্ত সুরদাস সবাই বাণী প্রচারের মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীতকেই বেছে নিয়েছিলেন। এঁদের সবারই তপোভূমি বারাণসি। যে যখন কাশীনরেশ থেকেছেন, সঙ্গীতচর্চার প্রচার প্রসারকে সতত পোষকতা দিয়ে গেছেন। হোরি, ধমার আর চতুরঙ্গ এই তিন আঙ্গিকে বারাণসির শিল্পীদের পারদর্শিতা চিরকালই স্বীকৃত। বারাণসি'র নিজস্ব নির্গুণ সম্প্রদায়ের সাধনপদ্ধতির শিকড় রয়েছে সঙ্গীত চর্চার মধ্যে। বাদশাহ বহাদুর শাহের সময় কাশী দরবারে উস্তাদ বসত খানের উত্তরসূরি,  ওয়রিশ আলি, সাদিক আলি, নিসার আলি, আশিক আলি বখ্‌স প্রমুখ গন্ধর্বেরা প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। এখনও পর্যন্ত এই ছোট্টো জনপদটি দেশ'কে দিয়েছে দু' দু'জন ভারতরত্ন সঙ্গীতশিরোমণি, পন্ডিত রবিশংকর এবং উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। বারাণসির আবহমান সারস্বতসাধনার অংশ সুরসন্ধানের ইতিবৃত্ত অতি পুরাতন। এখানে সুরচর্চা অধ্যাত্মচর্চার অঙ্গ। বাবা বিশ্বনাথ, যিনি নটরাজরূপে সঙ্গীতেরও ঈশ্বর, তাঁর বাসভূমির প্রজাদের সুরের আশীর্বাদে ভরিয়ে রেখেছেন চিরকাল।

জন্মসূত্রে বাঙালি পন্ডিতজি এবং জন্মসূত্রে বিহারি উস্তাদজি কিন্তু তাঁদের সিদ্ধিভূমি হিসেবে বারাণসির মাটির প্রতিই প্রণত থেকেছেন চিরকাল। উস্তাদজি'র কাছে বহুবার অনুরোধ এসেছে বিদেশে গিয়ে বসবাস করার জন্য। তিনি উত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ, আমি যাবো। কিন্তু আমার জন্য সেখানে একটা গঙ্গার ঘাট, বালাজি মন্দির, বনারসি গলিঘুঁজি আর সুননেওয়ালোঁদের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। নয়তো সেখানে গিয়ে আমি কী করবো? এই সমস্ত নিয়েই তো বিসমিল্লাহ খান। একটা বাদ গেলেই আমি আর আমি থাকবো না। কী শুনবেন আমার কাছে? বারাণসির প্রতি পন্ডিতজির আবেগও এই রকম। লিস্টিটা তো শেষ হয়না। পূর্বি বাজের জন্ম, ধারণ ও প্রবহমানতা, সবই বারাণসির মাটিতে। সিতারিয়া উস্তাদ মুস্তাক আলি খান, পন্ডিত বড়ে রামদাসজি, পন্ডিত ছোটে রামদাসজি তো কিম্বদন্তীর পর্যায়। বনারসি ঠুমরির যে সিলসিলা জগদীপজি, উস্তাদ মুইজুদ্দিন খান শুরু করেছিলেন তা বড়ি মোতিবাই, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, রসুলনবাই, গিরিজাদেবীদের সঙ্গে পৌঁছে গেছে একটা শিখরে। পন্ডিত রামসহায়জির উত্তরসূরি কণ্ঠে মহারাজ, গোদই মহারাজ, কিশন মহারাজ, অনোখে'লাল, এই সব তবলাবাদনের শেষকথা, এই বারাণসিরই সন্তান। কথক নৃত্যের বনারসি ঘরানার শুকদেব মহারাজ, কৃষ্ণপ্রসাদ, সিতারা দেবী, গোপীকৃষ্ণ, অলকনন্দা এঁরা রয়েছেন। আর একালে আমার অতি প্রিয় দিগগজ শিল্পীরা,  এন রাজম, পন্ডিত রাজন মিশ্র-সাজন মিশ্র এবং রনু মজুমদার, যাঁদের পরিবেশন আমার মতো কোটি শ্রোতাকে  সম্মোহিত করে রাখে, শুদ্ধ বনারসি বাবুবিবি ।

পন্ডিতেরা যাকে উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীত বলে থাকেন, অর্থাৎ ঠুমরি, দাদরা, কাজরি, হোরি, চৈতি, তরানা, ঘাটো ইত্যাদি, সেই সব শৈলির সব থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপায়ণ আমরা বনারসি বনাওটে খুঁজে পাই। কারণ এই ভূভাগটিতে কেতাবি শাস্ত্রীয়তা আর লোকজ সঙ্গীত কেতা চিরকাল সমান ইজ্জতের সঙ্গে মানুষের কাছে আদৃত রয়ে গেছে।

হেথায় আর্য, হেথা অনার্য

১৪

বারাণসিকে কেন ভারতসভ্যতার নাভিকেন্দ্র বলা হয় তার একটা সদুত্তর আমি নিজের মতো করে পেয়েছি। ভারতীয় সভ্যতাসংস্কৃতির চালিকাশক্তি হিসেবে গত দু'হাজার বছর ধরে একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী, আর্যমুখিন, আভিজাত্যগর্বিত মনস্কতাকে প্রাধান্য দিয়ে আসা হয়েছে। বস্তুতঃ ঘটনাক্রম ও ইতিহাস বিচার করতে গেলে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত সামনে এসে যায়। ভারতবর্ষ চিরকালই  সংখ্যাগরিষ্ঠ, নিপীড়িত, মৃত্তিকার সন্তানদের প্রধান আশ্রয়। ভারতবর্ষ নামক ধারণাটিকে তাঁরাই ধরে রেখেছেন গত হাজার পাঁচেক বছর। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে  যাঁরা এই ভূখন্ডকে অধিকার করতে, শাসন করতে, লুণ্ঠন করতে আবহমান কাল ধরে সমাগত হয়েছেন, তাঁরা সর্ব অর্থে বহিরাগত। তাঁরা এসেছেন, ফিরে গিয়েছেন, থাকতে আসেননি। শুধু তাঁদের সুকৃতিগুলি এদেশের ইতর মানুষ নিজেদের মধ্যে ধরে রেখে দিয়েছেন। ভারতচেতনা নামক একটি পুণ্য ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়েছে। সারা বিশ্ব'কে ভারতবর্ষ মানবিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ সমন্বয়বাদের শিক্ষা দিয়ে এসেছে। এই চেতনাটির প্রয়োগশালা হিসেবে বারাণসির একটা অনন্য স্থান রয়েছে আমাদের ইতিহাসে। কারণ পুরাণযুগের পর যখন  এদেশে   তুর্কি অভিযান শুরু হয়, ভারতবর্ষের তৎকালীন সমাজব্যবস্থাটি   প্রথম একটি সম্পূর্ণ বিপরীত রীতির সভ্যতার আঘাতে টালমাটাল হয়ে যায়। একটি পুরাতন জাতি, নতুনধর্মের প্রেরণায় উজ্জীবিত, যার সঙ্গে যোগ হয়েছে মরুভূমির উপজাতিক হিংস্র যুদ্ধমত্ত মানসিক অভিমুখ। সেই উত্তাল হিংসার প্লবতায় অন্তর্মুখী, শান্তিসন্ধানী, দোলাচলহীন ভারতীয় জনজীবনের ডায়নামিকসগুলি একেবারে ছিন্নমূল হয়ে পড়ে। ফলতঃ এদেশের একমুখী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি বহিরাগত আক্রমণের বিপরীত ক্রিয়ায় হিংসা ও ঘৃণাকে আঁকড়ে ধরেই পীড়নসাগর পেরোতে চেয়েছিলো। কয়েকশো বছর কাটার পর যখন মানুষ এই ভবিতব্যকে স্বীকার করতে শুরু করে, তখনই প্রথম ভারতবর্ষ অনুভব করে যে সমস্ত শুভবুদ্ধির সমন্বয়ের মাধ্যমেই মানুষের মুক্তি। বিপরীত মুখে ধ্বংস ছাড়া কিছু পাবার নেই।

এতো গেলো মধ্যযুগের পরিস্থিতি। কিন্তু তার বহু আগে যখন লৌকিকক্রিয়া-সর্বস্ব বৈদিক পুরোহিততন্ত্রের চাপে ইতর সংখ্যাগুরু মানুষের ঐহিক, আত্মিক অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে অধ্যাত্মিক উপনিবেশবাদ কায়েম করার প্রবল প্রয়াস চলছিলো, তখন একজন মানুষ সম্পূর্ণ অন্যপথে, অন্য আদর্শে এদেশের বিপুল ইতরবর্গের কাছে এক নতুন দিশা এনে দেন। আদিযুগ ও মধ্যযুগ, এই দুই কালখন্ডেই যে তিনটি মানুষ ভবিষ্যত ভারতচেতনার মানচিত্রটি এঁকে দিয়েছিলেন, তাঁদের তিনজনের সঙ্গেই বারাণসি অত্যন্ত ওতোপ্রোতভাবে জড়িত একটি জনপদ। কবির বলেছিলেন, " জাতি না পুছো সাধুকা"। যে মানুষটি তার সমস্ত ঐহিক সম্বলকে বিসর্জন দিয়ে বহুজনহিতায় সাধু হয়েছে, সেতো তার জন্মগত জাতির পরিচয়ও বিরজাহোমের আগুনে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছে। সংকীর্ণ পরিচয়ের মানুষটির মৃত্যু হবার পরই তার মধ্যে চিরকালীন মানব জন্ম নিয়েছে। সেই তো একমাত্র অধিকারী সমন্বয়ের শিক্ষা দিতে। সেই শাশ্বত  তিনজন ভারতীয়, শাক্যমুনি বুদ্ধ, কবিরসাঁই আর গোস্বামী তুলসিদাস, শাশ্বত চন্ডালের শ্মশানভূমি বারাণসি'কেই তাঁদের কর্মভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এ কী শুধুই সমাপতন? না, নিপীড়িত ভারতাত্মার প্রতি প্রত্যাশিত আত্মনিবেদন? সারনাথ, কবিরচৌরা আর অস্সিঘাট, বারাণসির তিনপ্রান্তের তিনটি আলোকস্তম্ভ আমাদের চিনিয়ে দেয় বারাণসির প্রকৃত আত্মপরিচয়।


ধম্মম শরণং গচ্ছামি

১৫

বারাণসি গমিষ্যামি গত্বা বৈ কাশিকা পুরীম।
ধর্মচক্রং প্রবর্তিষ্যে লোকে স্বপ্রতিবর্তিতম ।।

কাশীপুরী গমন করে বারাণসিতে লোকের মুক্তির জন্য ধর্মচক্র প্রবর্তন করলাম ( আজীবকের প্রতি শাক্যমুনি বুদ্ধ)।

মহাভিনিষ্ক্রমণের পর সিদ্ধার্থ প্রথমে গিয়েছিলেন কোসল রাজ্যে আলার কালামের কাছে। অরিয়পরিয়সেন সূত্তে বুদ্ধের জবানিতে লেখা হয়েছে, ' মঙ্গলকর পথ ও শ্রেষ্ঠ, লোকোত্তর, শান্তিময় তত্ত্বের সন্ধানে আমি আলার কালামের কাছে গেলাম। নিদানকথা, বুদ্ধচরিত ও ললিতবিস্তরে এ বিষয়ে নানা বিপরীত কথা বলা হয়েছে। প্রথম দুটি গ্রন্থে বলা হয়েছে সিদ্ধার্থ প্রথমে রাজগৃহে রাজা বিম্বিসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ও তার পর মগধে আলার কালামের কাছে দর্শনশিক্ষা করতে যান।  তৃতীয় গ্রন্থটিতে বলা হয়েছে তিনি প্রথমে বৈশালী গিয়ে আলার কালামের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পরে রাজগৃহে এসে রাজা বিম্বিসারের নির্দেশে উদ্দক রামপুত্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে এই তিনটি গ্রন্থই বুদ্ধের দেহাবসানের অনেক পরে, পঞ্চম শতকে,  সংকলিত হয়েছিলো। তাই স্বয়ং বুদ্ধের উক্তিটিকেই প্রামাণ্য ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু আলার কালাম বা উদ্দক রামপুত্তের কাছে সিদ্ধার্থকে দেবার মতো কিছুই ছিলোনা। তাঁরা ছিলেন সংসারত্যাগী উপাসক, নিজস্ব ধরনে সাধনা করতেন। তাঁদের থেকে সিদ্ধার্থের প্রাপ্তি বলতে চারটি ধ্যান ও চারটি স্তব। তাতে তাঁর আর কী হবে? কোসল ত্যাগ করে এলেন রাজগৃহের নানা প্রসিদ্ধ শ্রমণদের থেকে দর্শনতত্ত্ব শিখতে। এই শ্রমণরা নানারকম তপস্যা করতেন। তাই দেখে সিদ্ধার্থ তপস্যা করতে শুরু করলেন। প্রথমে হঠযোগ, তার পর কৃচ্ছ্রসাধন, উপবাস, খাদ্যগ্রহণ করে আবার উপবাস, এরকম চললো ছ'বছর। কিন্তু ধ্যানমার্গ, তার স্তরভেদ, কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও তপস্যা , অর্থাৎ সেসময় যা যা কিছু প্রচলিত সাধনবিধি ছিলো সব কিছু নিয়েই পরীক্ষানিরীক্ষা করলেন। এটা প্রমাণ করে তিনি আদ্যন্ত একজন মানুষ ছিলেন, কোনও স্বর্গচ্যুত দেবতা নয়। পরবর্তীকালে তাঁকে দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে নানা প্রচেষ্টা হয়েছে।

সেই সময় বৈদিক ধর্মের অন্যমেরুতে একটি সামাজিক মন্থন চলছিলো। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতির অত্যাচারে সংখ্যাগুরু মানুষ কোনও নতুন 'ধর্মীয়' উত্থানের অপেক্ষায় মুহ্যমান। এ বিষয়ে চর্চা আরণ্যক ও উপনিষদেও আছে।  ব্রাহ্মণ্যধর্ম ব্যতিরেকে যেসব মুনিঋষি তখন সমাজে ছিলেন তাঁরা ব্যক্তিগত দর্শনের গন্ডিতে আবদ্ধ, নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা তাঁদের ছিলোনা। এঁদের মধ্যে ছিলেন, অজিত কেশকম্বলি, পুরাণ কাশ্যপ, পাখুদা কাত্যায়ন, সঞ্জয় বেলটঠিপুত্ত, মোক্ষলি গোপাল, চার্বাক প্রমুখ। তাঁরা হয়তো প্রচলিত ব্যব্স্থার প্রতি বীতরাগ ছিলেন, কিন্তু নিপীড়িত মানুষকে শূশ্রূষা দেওয়া ছিলো সাধ্যের অতীত। তাঁদের পঞ্চভূতবাদ, বিক্ষেপবাদ, অক্রিয়বাদ, নিয়তিবাদ ইত্যাদি ছিলো মস্তিষ্কের ব্যায়াম, প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিতান্ত তাত্ত্বিক। এই সব জড়নীতির প্রেক্ষাপটে তীর্থংকর মহাবীর প্রচার করছেন পঞ্চমহাব্রত ও ব্রহ্মচর্য। জাগতিক প্রয়োজনকে অস্বীকার করে কঠোর উপবাস ও নিবেদিত সন্ন্যাস জীবনের ব্রত।

সিদ্ধার্থকে এসব কিছুই প্রভাবিত করতে পারলো না। কঠোর, কঠোরতর তপস্যা ও কৃচ্ছ্রসাধনের পীড়ন প্রত্যাখ্যান করে তিনি অবলম্বন করলেন 'মধ্যপথ'। প্রচার করলেন সংক্ষিপ্ত স্মৃতিনির্দেশ, পঞ্চশীল। তাঁর তপস্যাপর্বের পাঁচ সঙ্গী, কোন্ডিণ্য, বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম ও অস্মজি মনে করলেন বুদ্ধ  কঠোর তপস্যার চাপ নিতে অক্ষম এবং 'মধ্যপন্থা' আসলে আরামের কাছে আত্মসমর্পণ। তাঁরা ত্যাগ করলেন বুদ্ধকে। মগধ ছেড়ে তাঁরা যাত্রা করলেন বারাণসির দিকে।

১৬

'অনেক জাতি সংসারং সন্ধাবিস্সং অনিব্বিসং
গৃহকারকং গবেসন্তো দুঃখ জাতি পুনপ্পুনং ।
গহকারক ! দিটঠোহসি, পুন গেহং ন কাহসি
সব্বা তে ফাসুকা ভগ্গা গহকূটং বিসংখিতং।
বিসঙ্খারগতং চিত্তং তণ হানং খয়মজঝগা ।
(ধম্মপদ)

'জন্ম জন্মান্তর পথে পথে ফিরেছি কিন্তু সন্ধান পাইনি। এ গৃহ যে নির্মাণ করেছে  কোথায় সে গোপনচারী। বার বার দুঃখ পেয়ে এবার তোমার দেখা পেলাম, হে গৃহকারক! আর তুমি এ গৃহ রচনা করতে পারবে না। তোমার স্তম্ভ, গৃহভিত্তি সব ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার চিত্ত আজ সংস্কারবিগত, তৃষ্ণার থেকে মুক্ত আমি আজ।'
নৈরঞ্জনা নদীর ধারে এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে প্রথম প্রহরে তাঁর মনে পড়লো পূর্বজীবনের কথা। দ্বিতীয় প্রহরে লাভ করলেন দিব্যচক্ষু, তৃতীয় যামে দর্শন করলেন ভবচক্র ( প্রতীত্য সমুৎপাদবাদ) এবং চতুর্থ প্রহরে সর্বজ্ঞান অধিগত করে অর্হত্ত্ব প্রাপ্ত হলেন সিদ্ধার্থ। উল্লিখিত উপলব্ধি উচ্চারণ করার পর  শাক্যমুনি পরমকারুণিক গৌতম বুদ্ধের জন্ম হলো।

বুদ্ধত্ব লাভের পর আট-দশ দিন গৌতম বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের চারদিকে তপস্যাযাপন করলেন। মহাবগ্গ অনুযায়ী এই সময়ই প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু সংযুক্তনিকায় বলে এই উপলব্ধি বুদ্ধের অনেক আগেই হয়েছিলো। এই তত্ত্ব জটিল। তবে মূল কথা হলো তৃষ্ণা ও তার ফলরূপ দুঃখের আকর মানুষের অবিদ্যা। কীভাবে অবিদ্যাকে বিনাশ করে স্তরে স্তরে তৃষ্ণা ও দুঃখ জয়ের শেষে  মোক্ষলাভ হয় তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে এই তত্ত্বে। কিন্তু কার কাছে প্রচার করবেন তাঁর অর্জিত দর্শন? প্রথমে প্রয়াস করলেন তাঁর প্রথম 'গুরু' উদ্দক রামপুত্তের সঙ্গে এই তত্ত্ব নিয়ে বিনিময় করেন। কিন্তু সংবাদ পেলেন উদ্দক প্রয়াত হয়েছেন। তার পর খোঁজ নিলেন আলার কালামের কুশল। দুর্ভাগ্য আলারও তখন আর ধরাধামে নেই। এই নবদর্শনকে সম্যক হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে এমন কাউকে আর মগধে পেলেন না। বুদ্ধ কাশীর পথে অগ্রসর হলেন। কারণ কাশীই ধারণ করতে পারে এই নবদর্শনের গরিমা।

দীর্ঘ, দুর্গম বনপথ অতিক্রম করে তিনি পৌঁছোলেন বারাণসির উপান্তে ঋষিপত্তনে ( ইস্সিপত্তন)। পথে গঙ্গানদী পেরোলেন সাঁতার দিয়ে। তাঁর কাছে নৌকোযাত্রার পাথেয় ছিলোনা। তাঁর পঞ্চশিষ্য শুনলেন বুদ্ধ এসেছেন, কিন্তু কৌন্ডিণ্য ব্যতিরেকে বাকিরা স্থির করলেন কঠিন তপোশ্চর্যা যে মানুষের কাছে ত্যজ্য, তিনি গুরু হতে পারেন না। কিন্তু যেহেতু তিনি রাজসন্তান তাই ন্যূনতম সম্মান তাঁর প্রাপ্য। তাই পাঁচ জনেই অপরাহ্ণে এলেন ঋষিপত্তনের দক্ষিণে সেই প্রান্তরে যেখানে বুদ্ধ ধ্যানমগ্ন ছিলেন। বুদ্ধকে দর্শনমাত্র তাঁরা বুঝতে পারলেন যে এই বুদ্ধ একজন অন্য ব্যক্তিত্ব। ধর্মদর্শন আলোচনা করতে করতে তাঁরা আরো উত্তরের দিকে মৃগদাবের পথে যাত্রা করলেন। রাত্রির প্রথম যামে বুদ্ধ উপবেশন করলেন একস্থানে । তার পর মৌনতা অবলম্বন করে ধ্যানমগ্ন হলেন। দ্বিতীয় প্রহরে তিনি ধ্যান সম্বরণ করে পঞ্চশিষ্যের কাছে আত্মউন্মোচন করলেন। সেই নিশীথ আকাশের নীচে সুপ্ত চরাচরে তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর উপলব্ধির মূলতত্ত্ব।

" হে ভিক্ষুগণ, একদিকে সংসারী মানুষের উপভোগ্য ইন্দ্রিয়সুখ, অপরদিকে ফলহীন দুঃখকর ব্রহ্মচর্য্য, এই উভয়ই ধর্মার্থীগণ পরিত্যাগ করিবে। আমি এক মধ্যপথ আবিষ্কার করিয়াছি, যে পথ অবলম্বন করিলে চক্ষু উন্মীলিত হয়, দিব্যজ্ঞান জন্মে, শান্তিলাভ হয়, মানব নির্বানপ্রাপ্ত হয়।   সৎদৃষ্টি, সদবাক্য, সৎসঙ্কল্প, সদ্ব্যবহার, সদুপায়ে জীবিকা আহরণ, সৎচেষ্টা, সৎস্মৃতি, সম্যক সমাধি, আমার আবিষ্কৃত এই অষ্ট পথ। দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখনিরোধ, দুঃখনিরোধের পথ, আমার প্রচারিত এই চারিটি মহাসত্য। "  

তার পর সারা রাত্রি ধরে তিনি আলোচনা, ব্যাখ্যা, বিনিময় করলেন তাঁর হৃদয়ের উপলব্ধি। এই পঞ্চশিষ্য তাঁকে রাজগৃহ-উরুবেলায় ত্যাগ করে চলে এসেছিলেন। বিশদ আত্মমন্থন করে তাঁরা অনুভব করেছিলেন গৌতম বুদ্ধ বিনা তাঁদের গতি নেই। তাঁরা তো গুরুর অপেক্ষাতেই দিনযাপন করছিলেন বারাণসিতে।

পরদিন ব্রাহ্মমুহূর্তে কৌন্ডিণ্য বুদ্ধের প্রথম শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। তার পর একে একে বপ্প, ভদ্দীয়, মহানাম ও অস্মজি বুদ্ধের শরণ নিলেন।

১৭

  গাড়িটি এসে দাঁড়ালো সুরম্য তৃণভূমিঘেরা একটি পুরা অবশেষের পাশে। নামফলকে লেখা আছে 'চৌখন্ডী স্তূপ। চতুর্থ-পঞ্চম শতকে গুপ্তযুগে নির্মিত বর্গাকার স্তূপটি সেই স্থানকে নির্দিষ্ট করছে যেখানে বুদ্ধ প্রথম তাঁর পাঁচ অনুগামীর সঙ্গে পুনঃ সাক্ষাৎ করেছিলেন। সপ্তম শতকে হিউয়েন সাঙের বিবরণীতে এই স্তূপটির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমে ১৮৩৫, ও পরে ১৯০৪-০৫ সালে উৎখননের পর এই ৯৩ ফুট উঁচু পিরামিড আকারের স্তূপটি পুনরাবিষ্কৃত হয়। খননের ফলে এখান থেকে গুপ্তযুগের বুদ্ধমূর্তি ছাড়াও নানা উৎকৃষ্ট ভাস্কর্য উদ্ধার হয়েছে। এই স্তূপের চূড়ায় ১৫৮৮ সালে যুবরাজ সলিমের বারাণসি আগমন উপলক্ষে রাজা টোডরমলের পুত্র গোবর্ধন একটি বুরুজ নির্মাণ করেন।

এইখান থেকেই ঋষিপত্তন বা সারনাথের  পুরা অবশেষের সীমানা শুরু হলো।

'নত্থি রাগসম অগ্গি, নত্থি দসসমো কলি,
নত্থি খন্দাদিসা দুক্‌খা, নত্থি সন্তিপরং সুখং।
জিঘচ্ছা পরমা রোগা, সঙ্খারা পরমা দুখা,
এতং ঞত্বা যথাভূতং নিব্বানং পরমং সুখম ।।'

চৌখন্ডিস্তূপ থেকে দু-আড়াই কিমি উত্তরে এগিয়ে গেলে সারনাথের মূল পুরাতত্ত্ব-অবশেষের অবস্থান। বুদ্ধ পদার্পণ করার সময় এখানে ছিলো বিস্তীর্ণ বনভূমি। স্থানটি হরিণ অধ্যুষিত হবার জন্য সেটি মৃগদাব নামেও কথিত হতো। এই মৃগদাবের  সন্দর্ভ ধরেই পরবর্তীকালে জাতককথার সূত্রপাত হয়। আসলে সারনাথ নামটিই এসেছে মৃগরাজ সারঙ্গনাথের নাম থেকে। এখনও সেখানে একটি সরকার স্থাপিত হরিণ অভয়ারণ্য রয়েছে। সেখানে মূলতঃ বিদেশী বুদ্ধভক্তদের ভিড় দেখতে পেলুম।   মূল চত্বরটির  প্রবেশপথের পাশ থেকে শুরু হয়ে যায় বৌদ্ধ মঠের ভগ্নাবশেষ। চক্রপথের ডানপাশে শ্রমণ ও ভিক্ষুদের সারবাঁধা বাসস্থানের ভগ্নাবশেষ রয়েছে। সেগুলি পেরিয়ে গেলেই ধর্মরাজিকাস্তূপ।

এই স্তূপটির মাহাত্ম্য বিষয়ে পরে আলোচনা করছি। ধর্মরাজিকা স্তূপ থেকে ঈষৎ উত্তরমুখী হলেই প্রাচীন মূলগন্ধকুটিবিহার মন্দিরের  ধ্বংসস্তূপ।

১৮

   ' বারাণসির উত্তর-পূর্বদিকে বরণা ( বরুণা) নদী পেরিয়ে ১০ লি মতো গেলে 'লু ঈ' বা মৃগদাব সঙ্ঘারামের দেখা পাওয়া যায়। এর সীমানা আট ভাগে বিভক্ত, একটি ঘেরা দেওয়াল দিয়ে সব গুলি সংযুক্ত রয়েছে। কয়েকতল উঁচু বুরুজগুলি সংলগ্ন ঝুলবারান্দা ও সেগুলির কারুকাজ খুব নিপুণ হাতের কাজ। এই সঙ্ঘারামটিতে ১৫০০ মতো ভিক্ষু রয়েছেন। তাঁরা হীনযান মতের সম্মতীয় শাখার উপাসক। বিরাট সীমানার মধ্যে প্রায় দুশো ফুট উঁচু একটি বিহার দেখলাম। তার শীর্ষদেশে একটি সোনায় মোড়া আমের প্রতিকৃতি রয়েছে। দালানগুলির ভিত্তি পাথরের। সিঁড়িও পাথরের, কিন্তু বুরুজ ও কুলুঙ্গিগুলো ইঁটের তৈরি। কুলুঙ্গিগুলো চারদিকে একশোটি সারিতে সাজানো ও তার প্রত্যেকটিতে একটি করে সোনার বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। বিহারের মধ্যে দেশি তামা দিয়ে তৈরি একটি বুদ্ধমূর্তি। ধর্মব্যাখ্যানে রত এই মূর্তিটির আকার স্বাভাবিক মানুষের সমান।'

মূলগন্ধকুটিবিহারের এই বর্ণনা করেছিলেন হিউ এন সাং আনুমানিক ৬৪০ সালে। তাঁর বিবরণ পড়ে মনে হয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে গুপ্তযুগে নির্মিত  এই বিহারটি সেই সময় পূর্ণ গৌরবে বিরাজ করতো। বুদ্ধ নিজে তাঁর অনুগামীদের যে চারটি স্থানকে 'অভিজাহিতাত্থানানি' অর্থাৎ অপরিবর্তনীয়  তীর্থভূমি বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন ঋষিপত্তনের  মৃগদাব, যেখানে মূলগন্ধকুটিবিহার নির্মিত হয়েছিলো, তার অন্যতম। বাকি তিনটি উরুবেলা (বোধগয়া), সংকস্সা ও শ্রাবস্তীর  জেতবন। বৌদ্ধদর্শনের পবিত্রতম কেন্দ্র হিসেবে ঋষিপত্তনের বিহারটি সমগ্র বিশ্বে স্বীকৃত ছিলো। একটি রটনা আছে যে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক নাকি ঋষিপত্তনের বিহারটি বিধ্বস্ত করেছিলেন। এই রটনাটির সূত্র কিন্তু আবার এই হিউ এন সাং। তিনি ৬৪৪ সালে ভারত ত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর ঋষিপত্তন আগমন তার দুচার বছর আগেই। তাই তাঁর পূর্বোক্ত বিবরণের সঙ্গে এই স্থানে শশাঙ্কের ধ্বংসলীলার আখ্যান  ঠিক মেলেনা। একথা ঠিক অঙ্গ, বঙ্গ ও মগধদেশে শশাঙ্ক 'বেদবিরোধী' শ্রমণদের বহু প্রতিষ্ঠান বিনষ্ট করেছিলেন এবং সেইকালে তীব্র বৌদ্ধবিরোধিতার কারণে বেশ  বিখ্যাত বা কুখ্যাতও ছিলেন। শ্রীহর্ষের সঙ্গে তাঁর বহুবিদিত শত্রুতা এবং সেই কারণে শ্রীহর্ষানুগত হিউ এন সাঙের রচিত ইতিহাসে তাঁর সম্বন্ধে সমদর্শী  বিশ্লেষণ থাকার সম্ভাবনা নিতান্ত কম মনে হয়।

হিউ এন সাং 'ধর্ম-ব্যাখ্যানে রত' যে বুদ্ধমূর্তিটির কথা উল্লেখ করেছেন সেটি বুদ্ধের উপবিষ্ট 'ধর্মচক্রপ্রবর্তনমুদ্রা'র প্রতিচ্ছবি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী সেটি ধাতুনির্মিত ছিলো। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে মূলবিহারের খননসূত্রে লব্ধ এই মুদ্রায় বুদ্ধের প্রস্তরমূর্তিটির ( যেটি এই সময় সারনাথ জাদুঘরে রয়েছে) মতো উচ্চকোটির ভাস্কর্য আমি দেশে আর একটিই দেখেছি। সেটি পাটনা জাদুঘরে আরো চারশো বছর আগে মৌর্যযুগের শেষ পর্যায়ে নির্মিত বিখ্যাত দিদারগঞ্জের যক্ষী মূর্তি।

১৯

এই বিহারটির বাইরে  হিউ এন সাং দশটি স্তূপ, তিনটি সরোবর ও 'হেঁটে যাবার ভঙ্গিমায়' তথাগতের একটি 'মহান করুণা ও ভাবব্যঞ্জক' মূর্তি দেখেছিলেন।  এছাড়া তিনি একটি প্রায় তিনশো ফুট স্তূপ দেখেছিলেন এখানে। ' এই স্তূপটির নীচের ভিত্তি বেশ চওড়া ও নির্মাণটি অনেকটা উঁচু। এটি বিভিন্ন ধারার কারু ও শিল্পকাজ শোভিত এবং মহার্ঘ বস্তু দিয়ে সুন্দর করে সাজানো'।

এই স্তূপটিই আদিরূপে সম্রাট অশোক নির্মিত 'ধর্মচক্র স্তূপ' ছিলো, পরবর্তীকালে পালিভাষায় ধম্মখ বা বর্তমানকালে ধামেখ স্তূপ নামে পরিচিত। এটিকে পঞ্চম শতকে গুপ্তযুগে বিশাল আকার দেওয়া হয়। এর নীচের অংশে আটদিকে আটটি কুলুঙ্গি করা আছে এবং পাথরে উৎকীর্ণ নানা জ্যামিতিক বিন্যাস , স্বস্তিক, পুষ্প-পত্র, পক্ষী ও মানুষিক নক্‌শা দেখতে পাওয়া যায়। কারুকৃতি হিসেবে এর তুলনা সাঁচীর স্তূপের সঙ্গে করা যেতে পারে।

এর দক্ষিণে রয়েছে ধর্মরাজিকা স্তূপ। এখন শুধু এর চক্রাকার ভিত্তিভূমিটিই অবশিষ্ট রয়েছে। সারনাথের উপর বারাণসির অন্যান্য  মন্দিরের মতো বারম্বার তুর্কি ও অন্যান্য বিধর্মী আক্রমণ হয়েছে। ফলতঃ এর গরিমাময় প্রাচীন স্থাপত্যের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই শুধু ধামেখ স্তূপটি ছাড়া। কিন্তু ধর্মরাজিকা স্তূপটির যতোটা অবশেষ বাকি ছিলো, অষ্টাদশ শতকে কাশীনরেশ চেত সিংএর দিওয়ান জগত সিং একটি বাজারের দোকানপাট নির্মাণের জন্য তার ইঁটগুলি  ভেঙে নিয়ে যায়। এই স্তূপে  একটি সবুজ পাথরের  আধারের মধ্যে বুদ্ধের দেহাবশেষ ছিলো। এই লোকটি বুদ্ধের আত্মার শান্তি কামনায় তা গঙ্গায় বিসর্জন দেয়। শূন্য আধারটি এই মূহুর্তে ভারতীয় জাদুঘর, কলকাতায় রক্ষিত আছে। এই নিদর্শনটি ব্যতিরেকে এই স্তূপটির অভ্যন্তরে বেশ কিছু অমূল্য পুরা সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিলো, কিন্তু তার কোনও হদিশ এখন আর পাওয়া যায়না।

ধর্মরাজিকা স্তূপটি প্রাক অশোকপর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কারণ প্রাপ্ত লোককথা বা  ইতিহাস অনুযায়ী এই বিশেষ স্থানটিতেই  বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে ধর্মচক্রপ্রবর্তন বিষয়ক উপদেশ দিয়েছিলেন। অশোক পিয়দস্সি  ইতোপূর্বে স্থাপিত স্তূপটিকে বিবর্ধিত করেছিলেন। তার পর গুপ্তযুগে দুবার এবং পরবর্তীকালে আরো দুবার এই স্তূপটির আকার বৃদ্ধি করা হয়েছিলো। কিন্তু জগত সিংয়ের কল্যাণহস্তের আশীর্বাদে এখন শুধু এর ভিত্তিভূমিটিই অবশিষ্ট আছে। 

সিংহলে প্রাপ্ত মহাবংশে বলা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে যখন অনুরাধাপুরায় মহাস্তূপের উদ্বোধন হয়েছিলো তখন ঋষিপত্তন থেকে প্রায় দ্বাদশ সহস্র ভিক্ষু ও শ্রমণ সেখানে সমাগত হয়েছিলেন।  পঞ্চশিষ্যকে দীক্ষা দেওয়ার পর যশ নামে কাশীর এক প্রতিপত্তিশালী ব্রাহ্মণ বুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তিনি সপরিবারে ঋষিপত্তনে এসে তাঁর শরণ গ্রহণ করেন। এই ঘটনার পর বারাণসিতে বুদ্ধের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এক বছরের মধ্যে ষাট জন অনুগামী তাঁর ধর্মে দীক্ষা নেন। এই সব শিষ্যকে বুদ্ধ নবধর্ম প্রচার করতে বিভিন্নদিকে প্রেরণ করেন ও নিজে ফিরে যান উরুবেলায়।

২০

  এই পরিসরে এখনও বেশ কিছু স্তূপ ও চৈত্যের ভগ্নাবশেষ দেখা যায়। দেখা যায় অশোক পিয়দস্সির স্থাপিত ধর্মচক্র সিংহস্তম্ভের ভগ্ন মূল ভিত্তিটি। এই স্তম্ভটি তুর্কি আক্রমণে ভূলুন্ঠিত হয়। কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ এই স্তম্ভের শীর্ষদেশে স্থাপিত চতুর্দিকে সিংহচিহ্নিত মূর্তিটি ভূলুণ্ঠিত হলেও তার ক্ষতি সামান্যই হয়েছিলো। এই সিংহমূর্তিটিই স্বাধীন ভারতের সরকারি প্রতীক। সিংহমূর্তিগুলির  নীচে চারটি পশুমূর্তি, হস্তী, বৃষ, অশ্ব ও সিংহ এবং চব্বিশ শলাকার চক্র উৎকীর্ণ রয়েছে। এই চক্রটি ভারতীয় জাতীয় পতাকার মধ্যমণি। এই চতুর্সিংহ ও অন্য চারটি পশু ভারতবর্ষের চতুর্দিকে সার্বভৌম সম্রাট অশোকের অধিকার প্রচার করছে। একদিকে প্রায় ভূমিগত অবস্থায় রয়েছে এককালের জমকালো পঞ্চায়তন মন্দির।

সারনাথ শুধু বৌদ্ধধর্মের শ্রেষ্ঠ তীর্থ নয়। সার্বভৌম ভারতধর্মের যে সংহত রূপ বারাণসি নামক ধারণার মধ্যে দেখি, সারনাথ তার  সার সংক্ষেপ বলা যায়। যখন ঐ অঙ্গনপরিসরের মধ্যে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম তখন এই ভাবনাটিই মনের ভিতর ক্রমশঃ অনুরণিত হয়ে যাচ্ছিলো। ইতিহাসের  নানা পর্যায়ে  বিভিন্ন চিন্তানায়কের থেকে ভারতদর্শন বা ভারতধর্ম বিষয়ে যেসব বোধের মণিমুক্তো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে, ঋষিপত্তন বা সারনাথের ঐ নাতিবিশাল ভূখণ্ডটি তার মূর্ত নিদর্শন।

২১

যেসব উৎসাহী মানুষ সারনাথ দর্শনে আগ্রহী, তাঁদের অবশ্যকর্তব্য এর সন্নিহিত জাদুঘরটি মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করা। স্থানিক জাদুঘর সারাদেশে অসংখ্য দেখেছি, কিন্তু এই ছোট্টো সংগ্রহশালাটি এককথায় অনুপম এবং শিহরণ জাগায়। মৌর্য, কুষাণ, গুপ্ত ও পালযুগের বিভিন্ন পুরানিদর্শন ও ভাস্কর্যের যে নমুনা এখানে আমি দেখেছি তার সত্যিই কোনও তুলনা নেই। পূর্বোক্ত ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রায় বুদ্ধের মূর্তিটি ও অশোকের সিংহস্তম্ভ ছাড়াও বহু বোধিসত্ত্ব ও সনাতনধর্মের দেবদেবীর ঈর্ষণীয় সংগ্রহ এই জাদুঘরটিতে দেখা যায়।
ঋষিপত্তনের বৌদ্ধ এলাকার সঙ্গে লাগোয়া রয়েছে জৈন তীর্থংকর শ্রেয়সনাথের মন্দির। একটি মহাবৃক্ষকে কেন্দ্রে রেখে এই মন্দিরের সন্নিহিত উদ্যানটি মনে হয় শান্তিকল্যাণ। বারাণসি শ্রেয়সনাথের জন্মস্থান। এই মন্দিরটির বিপরীতদিকে রয়েছে বিখ্যাত বৌদ্ধ সাধক, পন্ডিত ও চিন্তানায়ক সিংহলের অনাগারিক ধর্মপাল কর্তৃক ১৯৩১ সালে স্থাপিত মূলগন্ধকুটিবিহারের নবমন্দিরটি। মনে করা হয় ঋষিপত্তনে গৌতমবুদ্ধ এই মন্দিরটির ভূমিতে অবস্থিত একটি মঠে বসবাস করতেন। এই মন্দিরটিতে তক্ষশিলা থেকে সংগৃহীত কিছু বৌদ্ধ পুরানিদর্শন রয়েছে। অনাগারিক ধর্মপাল ছিলেন আধুনিককালে ভারতভূমির বৌদ্ধ নবমূল্যায়ণের পথিকৃৎ। ১৮৯১ সালের বুদ্ধপূর্ণিমায় তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাবোধি সমাজ। আজকের সারনাথের সংস্কার ও বিকাশের ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন মূল প্রেরণা। তাঁর সমাধিমন্দিরও রয়েছে এই পরিসরেই।

২২

  সূর্যাস্তের সময় এগিয়ে এলো। ফিরে যাচ্ছিলুম আবার বারাণসির মূল শহরের আস্তানার দিকে। 'বেদবিরোধী' বুদ্ধকে একসময় ব্রাহ্মণ্য শক্তিকেন্দ্র চরম আক্রমণ চালিয়েছিলো বিধর্মী অভিযোগে। আদি শংকরের পূর্বসূরি কুমারিলভট্টের নেতৃত্বে যে সংখ্যায় বুদ্ধভক্তদের হত্যা করা হয়েছিলো, চারশো বছর তুর্কি অত্যাচারেও হয়তো ততো বৌদ্ধনিধন হয়নি। ব্যক্তিক নীতিবোধ যখন গোষ্ঠীগত 'ধর্ম'বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়, মানবিকচর্যা ও মূল্যবোধের তুমুল বিপর্যয় তখনই সম্ভবামি এবং যুগে যুগে তার অন্ধ অনুকরণ ইতিহাসকে কলংকিত করে রাখে। কিন্তু এই ঋষিপত্তনে শাক্যমুনি গৌতম বুদ্ধ তাঁর এক প্রিয়তম  শিষ্য সারিপুত্তকে যা বলেছিলেন, তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কালের উপনিষদেরও মর্মবাণীর মধ্যে সেই একই আকুল পথনির্দেশ পাওয়া যায়।

' অপারূতা তেসং অমতস্স দ্বারা
যে সোতবন্তো পমুঞ্চন্তু সদ্ধং,
বিহিংস সঞঞী পগুণং ন ভাসিং,
ধম্মং পণীতং মনুজেসু ব্রহ্মে ।' ( মহাবগ্গ)

অমৃতের দুয়ার আজ উন্মুক্ত। যাহারা শ্রবণে সক্ষম, তাহারা শোন। শ্রদ্ধাদ্বারাই এই অমৃতের সাক্ষাৎকার লাভ হইবে। হিংসা অপগুণ হইতে মুক্ত হও। ধর্ম এইরূপে মানুষের  সার্থকতা প্রণয়ন  করে।

(পরের অংশ)


লেখক পরিচিতঃ শিবাংশু দে'র লেখনী অনায়াসে ছুঁয়ে যায় সঙ্গীত কাব্য ইতিহাস কিংবা উত্তরভারতীয় শিল্পশহরের ধুলোবালি। সূক্ষ্ম নরম অক্ষরে জাগান তুলোট কাগজে লুকিয়ে থাকা ছবি যার পরতে পরতে অপেক্ষা করে পাঠকের নবতর বিস্ময়। ব্যক্তি জীবনে শিবাংশু বিখ্যাত তাঁর সুভদ্র পাণ্ডিত্যের জন্যে। অতিব্যস্ত পেশাগত জীবনের খতিয়ান হয়তো লেখক পরিচয়ে তত প্রাসঙ্গিক নয়, যদি না তজ্জনিত আসমুদ্রহিমাচল ভ্রমণ ও বহু মানুষ দেখাজনিত অভিজ্ঞতা স্মরণ করা হয়।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2015 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।