ঢলতা পানি, রমতা ফকির

 

প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা

ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫

 

ঢলতা পানি, রমতা ফকির

শেখর মুখোপাধ্যায়

(১)

“১৩৫৩, আষাঢ় মাস। ছিটেফোঁটা বৃষ্টিরও দেখা নেই। ধূলার সমুদ্রের মাঝে সর্বপ্রকার আভিজাত্যের ছোঁয়া এড়িয়ে করাচী শহরের শেষ প্রান্তে একটি বস্তি, সেইখানে নাগনাথের আখড়ার অতি প্রাচীন দালানটার এক কোণে আশ্রয় নিয়েছি হিংলাজ-যাত্রী আমরা কয়জন।”

এইভাবে একটি মহান উপন্যাস শুরু হতে পারে। আর, শুরু হলে তাকে তো এগিয়েই যেতে হবে। লেখক এগোবেন, পাঠকও। দু’জনে ঠিক একইভাবে এগোবেন এমন তো ঘটবে না। ঘটলে তো লেখা-পড়া কোনওটাই হয়ে উঠবে না। লেখক আর পাঠক, দুজনের দুজনকে প্রয়োজনই হবে না। বস্তুত, এই শব্দদুটির অস্তিত্বই থাকবে না জগতে। যতক্ষণ সে অস্তিত্ব আছে ততক্ষণ লেখক আর পাঠক দুই চালে চলবেন। লেখক অন্তত কয়েক মাসের পরিশ্রমে লেখাটি প্রস্তুত করবেন আর, তাঁর পরিশ্রমলব্ধ সেই ফল কয়েক ঘণ্টায় বা বড়জোর কয়েক দিনে পড়ে শেষ করে ফেলবেন পাঠক, যখন লেখক ‘মৃত’। পাঠক হয়তো খুশি হবেন, হয়তো হবেন না। পাঠান্তে সন্তুষ্টি অথবা বিরাগ, দুইই উদ্ভূত হয় শব্দ ও বাক্যবিন্যাসের সূত্রে গাঁথা লেখক-পাঠক সম্পর্ক থেকে। এই সম্পর্ক যাকে ভেঙে বলা যায় পাঠের অভিজ্ঞতা, তাও আবার সকল পাঠকের ক্ষেত্রে অভিন্ন হবে না। মৃত লেখক বিভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে পুনর্জাত (পুনর্নির্মিত বা বিনির্মিত বলতে পারেন যদি মন চায়) হবেন। দেশের মাটিতে, বাতাসে, আগুনে বা, এককথায় পঞ্চভূতে, এবং সর্বোপরি জাতকের রক্তে, ‘জাতকের গল্প’ বর্তমান বলে খানিকটা ঐতিহ্যের দাবিতে আর খানিকটা সংস্কারের বশেই ‘পুনর্জাত’ শব্দটিতেই হয়তো সে বেশি স্বচ্ছন্দ। বিশেষত, এই আশায় যে, তাবৎ পাঠককুল ফুকো, দেরিদা প্রমুখাৎ শ্রুত যাবৎ লিটারারি ক্রিটিসিজম মস্তিষ্কে ধারণ করে ধৃতায়ুধ হয়ে উপন্যাস পড়তে বসেন না। সেক্ষেত্রে, বহুত্বের তিলকচর্চিত বহুগামী লেখকের সম্পর্কের বাহুল্যে প্রতিটি সম্পর্কই, বহুস্তরী হোক না হোক, নিতান্তই ব্যক্তিগত, অন্তত পাঠকের কাছে। বহুগামী লেখক চরিত্রহীন হতেও পারে, অর্থাৎ লেখাটা তার ব্যবসা হলেও হতে পারে, কিন্তু পাঠকের কাছে পড়াটা তার ব্যবসা নয়। সমালোচকের ক্ষেত্রে এ-কথাটা বলা যায় না। লেখার মতোই, সমালোচনাও একটি পেশা। হাতিয়ারবন্দ্‌ হয়েই বই হাতে তুলতে হয়। সমস্যা হল বর্তমান আলোচক পেশাদার সমালোচক নয়। দীক্ষিত তো নয়ই, সাহিত্য সমালোচনা করতে যতটা শিক্ষিত হতে হয় তার কণামাত্র শিক্ষাও তার নেই। পড়া আছে খানকতক গল্প আর উপন্যাস, আর আছে সামান্য কলমপেষার অভ্যেস; এই দিয়ে আর যাই হোক সাহিত্য সমালোচনা হয় না, হতে পারে বড়জোর একধরণের পুনরীক্ষণ যাকে বলে রিভিউ। আমি বরং ওসব গোলমালে না গিয়ে, পাঠক হিসেবে অবধূতের লেখা পাঠ করার অভিজ্ঞতাই যথাসাধ্য বিবৃত করার চেষ্টা করব। আগেই গেয়ে রেখেছি, পাঠকেরা এক-এক জন এক-এক রকম। অতএব, আমার হাতে অবধূত কী হয়ে উঠবেন তার দায়িত্ব নিতে কিঞ্চিৎ দ্বিধাবোধ করছি। সেটুকু কাটিয়ে উঠে যথাসম্ভব নির্দ্বিধ হওয়ার অভিপ্রায়ে, মত সামান্য বদলে, সমালোচনার ক্ষেত্রটাতেও কড়ি আঙুলটা ছুঁইয়েই রাখি। আগে দেখে নিই, মহাত্মা সমালোচকেরা অবধূত সম্পর্কে কে কী বলেছেন। তারপর একেবারে মুক্তকচ্ছ হয়ে মতামত প্রকাশ করব।

শুরু করি নিম্নোক্ত সমালোচনাটি দিয়ে -

“--- গৌরীর [সাহিত্যিক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য] বৈঠকখানায় মাঝেমধ্যেই এসে আড্ডা জমাতেন ---- ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’-এর তৎকালীন বিশেষ জনপ্রিয় কিছুটা হ্যাংলাটে চেহারার লেখক অবধূত। অবধূতের লোকঠকানো রদ্দিমালের চাহিদা বেশিদিন থাকবে না, আমার কোনও প্রবন্ধে এই মন্তব্য করায় অবধূত গৌরীশঙ্করকে পত্রক্ষেপে হুঁশিয়ার করেন, তাঁর বন্ধু শিবনারায়ণ যদি বাচালবৃত্তি ত্যাগ না করেন তাহলে তিনি, অবধূত, এমন মন্ত্রপূত বাণ প্রয়োগ করবেন যার ফলে সপ্তাহখানেকও কাটবে না, মুখ দিয়ে রক্ত উঠে উক্ত শিবনারায়ণের বাক্যস্ফূর্তি চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। যেহেতু এখনও বেঁচে আছি, অনুমান তাঁর মন্ত্রশক্তি ফুরিয়ে গিয়েছিল।”

এখন কী করি! বড্ড দমে গেলুম। অবধূতের লেখা সম্পর্কে কাউকে কিছু বলা তো দূরের কথা, সে-লেখা নিজে পড়ব কি না ভাবতে হবে। অর্থ ও সময়, এই দুটি মূল্যবান বস্তুর অপব্যয় তো করতে পারি না। প্রথমত, এই কথাগুলি বলছেন কে? না, শিবনারায়ণ রায়! মস্ত পণ্ডিত, ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার সম্পাদক, বাঙালি বুদ্ধিজীবি বা বিদ্বজ্জন সমাজের অন্যতম সমাজপতি। তাঁর কথার দাম আছে। দ্বিতীয়ত, কথাটা কখন বলছেন? ২০০৩ সালে; এই বছর বারো আগে। অর্থাৎ, একাধারে সমকালীন (অভিজ্ঞতা) ও সাম্প্রতিক (অভিজ্ঞতার প্রকাশ)। তৃতীয়ত, কী বলছেন তিনি? এক, ‘তৎকালীন বিশেষ জনপ্রিয়’। মানে, এককালে লোকে অবধূতের লেখা খুব গিলেছে, কিন্তু আজকাল আর কেউ পাত্তা দেয় না। তার মানে, ফালতু পাল্প ফিকশন। দুই, ‘লোকঠকানো রদ্দিমালের চাহিদা বেশিদিন থাকবে না।’ শিবনারায়ণ জানতেন (গত শতকের পঞ্চাশের দশকে) যে, ভবিষ্যতে অবধূতকে কেউ পাত্তা দেবে না। ত্রিকালদর্শী সমালোচক না হলে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। সে তো শিবনারায়ণ ছিলেনই। তিনি বলছেন, লোকঠকানো রদ্দিমাল! তিনটে বিশেষণই যাকে বলে লোডেড, গুলির মতো। লোকঠকানো। রদ্দি। মাল। কিন্তু, লোকঠকানো মানে কী? লোকে তো বই কেনে, পড়ে খুশি হবে বলে। পড়ে খুশি হলে আরও পাঁচজনকে বলে। সেই পাঁচজন আবার বইটা পড়ে দেখতে চায়। তারা খুশি হলে তখন আরও দশজনকে বলে। এইভাবেই তো একজন লেখক ‘বিশেষ জনপ্রিয়’ হয়, না কী? তাহলে বইটা পড়ে লোকে খুশি হলে সেটাকে লোকঠকানো বলা যায় কীভাবে? এক ফিরিওলা রং উঠবে না বলে আমাকে একটা কাপড় গছাল। একবার পরে কাচতেই গেল তার রং গলে। আবিষ্কার করলুম যে, হ্যাঁ, রদ্দি ‘মাল’ই বটে। আমি একেবারেই খুশি হলুম না। এটাকে বলে লোকঠকানো। একেবারে জাতশত্রুতা কারও সঙ্গে না থাকলে, আমি তাকে বলব, হ্যাঁ ভাই, ওই ফিরিওলা খুব ভাল ‘মাল’ রাখে, ওর কাছেই কিনিস? আর, শত্রু জন্মের শত্রুতা ভুলে সঙ্গে সঙ্গে ওই ফিরিওলাকে ডেকে বাড়ির দাওয়ায় তামাক খাওয়াতে বসবে, যাতে সেও একটা এক নম্বর রদ্দি ‘মাল’ কিনতে পারে? না হয় পাল্প ফিকশনই হল। হ্যাঁ, শিবনারায়ণের মতো ভারী পণ্ডিত তাকে একশো কেন হাজার বার ‘রদ্দি মাল’ বলতে পারেন। ওঁর থেকে ধারে ও ভারে অনেক কমা ‘মাল’রাও বলেন। এমন কী, আমি যে আমি, এক ধার ও ভারহীন ‘মাল’, সেও কখনও-সখনও বলে থাকি। কিন্তু, ‘লোকঠকানো’ কেন? কেউ কি সতীনাথ ভেবে ভুল করে স্বপনকুমার কেনে? একরাশ বিভ্রান্তি! কিন্তু, তিনের তিন নম্বরে, বিভ্রান্তি কেটে যায় শিবনারায়ণ বর্ণিত পরবর্তী কয়েক লাইন পড়ে। সমালোচনা পড়ে অবধূত খেপে গিয়ে শিবনারায়ণকে বাণ মারার হুঁশিয়ারি দেন। এবার ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে। নামটাই তো অবধূত, অর্থাৎ তন্ত্রমন্ত্রের কারবারী। তাহলে নিশ্চিত ওই বিষয়েই বই লিখেছেন। আ রে হ্যাঁ, আছে তো! ‘বশীকরণ’ নামেই তো একটা বই লিখেছে লোকটা। বোঝা গেছে, বাণ মারা, বশীকরণ, উচাটন, স্তম্ভন, এইসব বিদঘুটে তান্ত্রিক আচারের মহিমা ফলাও করে লিখেছে বইগুলিতে। কিন্তু, তবুও, একখান প্রশ্ন রয়েই যায়। এইসব বিষয়ের বইপত্রের বেচাকেনা তো আজও হয়, রীতিমতো ‘দেখলে হবে, খর্চা আছে’ গোছের বিজ্ঞাপন দেখি সংবাদপত্রে, টিভিতে। লোকে আজও তন্ত্রাচার্যের পরামর্শ রীতিমতো দাম দিয়ে কেনে। বস্তুত, সেকাল হোক আর একাল, এইসবের কাটতি প্রায় একইরকম সর্বকালে। যেমন অনেকটা রবীন্দ্রনাথ বা জেমস জয়েসের বইয়ের কাটতি, কখনও হুড়মুড়িয়ে বাড়ে না, কখনও একেবারে মুখ থুবড়েও পড়ে না, যাকে বলে স্টেডি সেল। তবে, তাঁদের সাহিত্য হল গিয়ে কালোত্তীর্ণ। তন্ত্রাচার্যরা সেইজাতের কালোত্তীর্ণ না হলেও, কালের পর কাল উত্তীর্ণ তো করে চলেছেন। তাহলে কি ওই বশীকরণ ইত্যাদি তন্ত্রমন্ত্রের কিছু সারবস্তু আছে? এমন কি হতে পারে, বশীকরণের আসল তন্ত্রমন্ত্রটা শিবনারায়ণ জানতেন এবং তাই তিনি ধরে ফেলেছিলেন যে, অবধূত যা গছাচ্ছেন লোককে তা প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘লোকঠকানো রদ্দিমাল’?

এখন ব্যাপারটা ভাল করে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেবুঝে নেওয়ার আর কোনও উপায়ই নেই। অবধূত স্বয়ং দেহরক্ষা করেছেন ১৯৭৮ সালে আর, শিবনারায়ণ রায় ২০০৮ সালে। অবশ্য, সামনাসামনি দুজনকে বসাতে পারলেও কী ফল হত বলা মুশকিল। অবধূত সরাসরি কিছু বলেননি বা লেখেননি শিবনারায়ণকে। তিনি না কি গৌরীশঙ্করকে লেখা চিঠিতে শিবনারায়ণের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি ঘোষণা করেছিলেন। চিঠিটি শিবনারায়ণ নিজে দেখেছিলেন কি না তার উল্লেখ লেখাটিতে নেই। সেই চিঠি এখন কোথায় আছে, আদৌ আছে কি না, তার খবরই বা কে দেবে! শিবনারায়ণ রায় ও তাঁর বন্ধুর সততা সম্পর্কে সন্দেহপ্রকাশ করার ধৃষ্টতা আমার নেই। সামান্য পাঠক আমি। আমার কাছে যা রয়েছে তা হল, অবধূতের বিরুদ্ধে ‘লোকঠকানো রদ্দিমাল’ লেখার অভিযোগ। মারাত্মক অভিযোগ। হয়তো ঘরোয়া আড্ডার ছলে কথাগুলি বলেছেন শিবনারায়ণ। নথিপ্রমাণ কিছুই দাখিল করেননি, অথচ আড্ডাটিকে ছেপে তুলে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। ব্যাপারটা আর যাই হোক, আর ঘরোয়া থাকে না। প্রমাণের অপ্রতুলতাহেতু বিষয়টাকে অগ্রাহ্য করা যেত। কিন্তু, এ তো আইনের আদালত নয়। সাহিত্যের দরবার। আর, বাদী পক্ষে দাঁড়িয়ে স্বয়ং শিবনারায়ণ রায়। তিনি যে-সে লোক নন।

তাই, বাংলা ১৩৫৩ সালের আষাঢ় মাসে যে উপন্যাসের শুরু হয়েছিল তার খোঁজে হিংলাজ কেন, করাচির নাগনাথের আখড়ার অতি প্রাচীন দালানটাতেও পৌঁছনোর চিন্তা অবান্তর হয়ে ওঠে। তন্ত্রমন্ত্র শিখে মানুষকে সত্যিই বশ করা যায় কি না জানি না, জানতে কোনওদিন প্রবৃত্তি হয়নি। সম্ভবত মনেমনে জানি যে, তা যায় না। যদি যেত, তবে দুনিয়ায় ভোটের গণতন্ত্র যেমন থাকত না, তেমনই সময়ে সময়ে গা-জোয়ারি স্বৈরতন্ত্রও মাথাচাড়া দিত না। সবাইকে একেবারে মন্ত্রের জোরেই ওঠ-বস করানো যেত। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো কারও পিছনে একপাল ইঁদুরের মতো দৌড়ে মরত সবাই। নেতানেত্রীদের অনেকেই সেই আশায় কখনও-সখনও বাবাজীদের দ্বারস্থ হলেও জনতা ইঁদুর বনে যায় না। ভোটের বাক্সে বরং নেতাদের উদ্দেশে জনাদেশ জমা পড়ে, ‘পুনর্মূষিকোভব’। সুতরাং, অর্থ, উদ্যম ও সময় ব্যয় করে অবধূত পড়ব কেন? এখানেই অবধূতের দিক থেকে পাঠকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু, কেউ কেউ কিঞ্চিৎ একগুঁয়েও হয়। বুদ্ধিজীবী সমাজের সমাজপতির বাক্যকে বেদবাক্য মানতে চায় না। তাঁর মতো ভারী পণ্ডিত এক ‘হ্যাংলাটে চেহারার লেখক’এর বিরুদ্ধে এত ওজনদার গোলা নির্বিচারে দাগছেন তাতেই খানিক সন্দেহ তৈরি হয়। হ্যাংলাটে চেহারা বলতে তিনি নিশ্চয়ই রোগাটে চেহারা বুঝিয়েছেন। নইলে, চেহারা ‘হ্যাংলাটে’ কি না তা বুঝতে তো বিদ্যাবুদ্ধির ঔদার্য লাগে না। লাগে যা তা হল কুচুটেপনা। বাংলাবাজারের সংকীর্ণ এই গলিপথ থেকে রাজপথে পৌঁছনো যায় কি না তা দেখতেই রবাহূত হ্যাংলা অতিথির বেশে আরও জনাকয় সমালোচকের দরবারে পৌঁছে তাঁদের ফরাসের এককোণে চোরের মতো কৃপাপ্রার্থীর ভঙ্গিমায় বসতে হয়।

প্রবল জনপ্রিয়তা যে অবধূতের ছিল তা শ্রদ্ধেয় শিশিরকুমার দাসও জানাচ্ছেন। তবে, তাঁর লেখাগুলিকে ‘লোকঠকানো’ বা ‘রদ্দিমাল’ ইত্যাদি বলছেন না। তিনি বলছেন অবধূতের লেখার বৈশিষ্ট্য হল ভয়াবহ ও বীভৎস রসের আধিক্য। সমালোচনার স্বর অনুধাবন করে মনে হয়, এই ব্যাপারটি শিশিরকুমারের ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ নয়। তা না হোক। পাঠক বুঝল, ভরত মুনি ও ভারতীয় নাট্যশাস্ত্র প্রস্তাবিত অষ্টরসের একটি বিশেষ রস অবধূতের লেখায় সাধারণভাবেই প্রাধান্য পায়। এ এমন বড় কোনও কথা নয়। সবাইকেই শান্ত বা বীর বা শৃঙ্গার রস বিষয়েই লেখালেখি করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। তাছাড়া, বীভৎস রসের অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন দেবাদিদেব শিব। তিনি যখন ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি হয়েছেন তখন কৌতূহলী পাঠক কেন সেটাকে এড়িয়ে যাবে! শিশিরকুমার এও বলছেন যে, কোনও কোনও সমালোচক অবধূতের বিষয়নির্বাচন ও প্রয়োগরীতি সম্পর্কে সংশয়প্রকাশ করেছেন। সেও এমন বড় কথা কিছু নয়। জগতে কোন্‌ দেশে কোন্‌ ভাষায় কে এমন লেখক আছেন যাঁর লেখা সম্পর্কে কোনও দিন কোনও সংশয় উচ্চারিত হয়নি? লোকে রবিবাবুর কাছা ধরে কম টানাটানি করেছে এককালে! আজও তো কেউ কেউ করে। তাতে রবীন্দ্রনাথ পড়া কোনওকালেই আটকায়নি। লেখক লিখবে, পাঠক পড়বে, সমালোচক সমালোচনা করবে, এই তো হল বরাবরের দস্তুর। লেখকের প্রশংসা যেমন সমালোচক করতেই পারেন, তেমনই যেগুলি লেখকের ত্রুটি বলে তাঁর মনে হয় সেগুলির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করাও তাঁর অবশ্যকর্তব্য। মোটের উপর, শিশিরকুমার দাসের দরবার থেকে অবধূত-পাঠাভিলাষী মানুষটি যখন বিদায় নেয় তখন তার মুখ আর ততটা হ্যাংলাটে দেখায় না।

যুগপৎ গালে ও বুকে রামধাক্কা লাগে হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের দরবারে পৌঁছে। তিনি সপাটে বলছেন,

“উদ্ভট কাহিনী-কল্পনা, বীভৎস রস, তান্ত্রিক ধর্মসাধনার গুহ্য রহস্য ও উৎকট যৌনাচার অবধূতের রচনার বৈশিষ্ট্য।”

একইসঙ্গে আরও বলছেন,

“শক্তিমত্তা সত্ত্বেও শিথিল বিন্যাস ও যৌনতার আধিক্য ত্রুটিরূপে গণ্য।”

অর্থাৎ, শুধুমাত্র বীভৎস রস নয়, অবধূতের রচনায় শৃঙ্গার রসও অধিক পরিমাণেই পাওয়া যায় এবং সেই শৃঙ্গার রস রীতিমতো উৎকট প্রকৃতির। সেক্সুয়াল পারভার্সন বা পারভার্টেড সেক্স! অবধূত কি পর্নোগ্রাফি লিখে গিয়েছেন না কি? বা, অন্তত এরোটিকা? কাহিনী-কল্পনাও উদ্ভট! মানে, বিজার সেক্স? ব্যাপারটা ভাবতে হচ্ছে। তখনই খেয়াল করতে হয় – ‘শক্তিমত্তা সত্ত্বেও -।’ আহ্‌, লেখক হিসাবে অবধূত তাহলে শক্তিমান, এবং হংসনারায়ণও তা অস্বীকার করছেন না বা, করতে পারছেন না। তাহলে পর্নো লিখে থাকলেও, জবরদস্ত শৈলীতেই সে-কাজটি করেছেন। কিন্তু, ওই যে আবার ‘শিথিল বিন্যাস’! মহা ঝামেলায় পড়া গেল। ধুলোপায়ে বিদায় নেওয়া গেল হংসনারায়ণের দরবার থেকে।

‘দেশ’ পত্রিকার সেকালের কিংবদন্তী সম্পাদক সাগরময় ঘোষের বলা একটি গল্প মনে পড়ে গেল, ‘হীরের নাকছাবি’। অনেকেই গল্পটি জানেন। তবু, এইতালে গল্পের শেষটুকু সংক্ষেপে আবার মনে না করে পারছি না। একবার তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে তাঁরই সমালোচনায় বিদ্ধ ও বিধ্বস্ত হয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত হন কবিশেখর কালিদাস রায়ের বাড়িতে। সমস্ত ঘটনা শুনে কবিশেখর বলেন,

“শোনো বিভূতিভূষণ, দেবী সরস্বতীকে তারাশঙ্কর গা-ভরা সোনার গয়না দিয়ে যতই সাজাক, তুমি দেবীর নাকের নাকছাবিতে যে হিরে বসিয়েছ তা দেবীর সারা অঙ্গের জলুসকে ছাপিয়ে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।”

কথাটা শুনে বিভূতিভূষণ সমস্ত দুঃখ ভুলে হৃষ্টচিত্তে শিয়ালদার বাজার থেকে একটি পুষ্ট বেগুন কিনে বাড়ি ফিরেছিলেন।

এই যুগে পাঠক আর কবিশেখর কালিদাস রায়ের পরামর্শ কোথা থেকে পাবে! তার ভরসা শ্রদ্ধেয় শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থের ভূমিকাতেই তিনি বলে রেখেছেন,

“রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে প্রথম যুগের পাঠকেরা যে উৎকট অস্বাভাবিকতায় প্রতিহত হইয়াছিলেন তাহা আর অনুভূত হয় না – বরং তাঁহার লিখনভঙ্গীই এখন শিক্ষিত, অনুশীলন-মার্জিত বাঙালীর অন্তরতম প্রকাশ বলিয়া অভিনন্দিত হইতেছে। --- ইহা সাধারণ সত্য যে, অপরিচয়ের বিরুদ্ধতা একটা অস্থায়ী সাময়িক মনোভাব মাত্র।”

অবধূতের হবু পাঠক অতএব দুরুদুরু বক্ষে শ্রীকুমারের দরবারেই এককোণে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল। শ্রীকুমারও পহেলা চোটে অবধূতের রচনায় ‘বীভৎস ও ভয়ানক রস’, ‘অবদমিত প্রবৃত্তি’, ‘যৌন কামনার গোপন প্রক্ষেপ’, ‘কিছুটা রুচিহীনতা’ ইত্যাদির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। কিন্তু, একই নিঃশ্বাসে এও উল্লেখ করলেন যে, এই সমস্তকিছুর মধ্যেই পরিলক্ষিত হয় ‘আশ্চর্য সূক্ষ্মদর্শিতা ও কলানৈপুণ্য’। শুধু তাই নয়। শ্রীকুমার ঘোষণা করছেন,

“ধর্মসাধনার জটিল মনোবিকার ও ছদ্মবেশী দুর্বলতার দিকে তাঁহার দৃষ্টি অসাধারণ তীক্ষ্ণ ও তাঁহার অনেক উপন্যাসে এই মনোভাবের পুনরাবৃত্তি ইহা যে তাঁহার অভ্যস্ত দৃষ্টিভঙ্গী তাহাই প্রমাণ করে।”

বোঝো ঠেলা! তাহলে, লোকঠকানো রদ্দিমাল কোনগুলি? বাণ মেরে মুখ থেকে রক্ত তুলিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার মানসিকতার পরিচয়টাই বা কোথায়? পাঠক যার-পর-নাই বিভ্রান্তিতে শ্রীকুমারের দরবারে এবার ধপ করে বসেই পড়ল। শ্রীকুমার বলে চলেছেন,

“ধর্মসাধনার গুহ্য রহস্য ও বীভৎস মানস-প্রেরণার গভীরে অবধূতই সর্বাধিক সাফল্যের সহিত অনুপ্রবেশ করিয়াছেন।”

বেশ, তারপর?

“উৎকট তান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভীষণতা, শ্মশান-সমাগত শোকবিহ্বল নর-নারীর আকস্মিক মানসিক প্রতিক্রিয়া, মৃত্যুসম্মুখীন মানবের উদাস বৈরাগ্য ও বে-পরোয়া মনোবৃত্তি তাঁহার রচনায় সার্থক আবেগবিহ্বলতা ও ব্যঞ্জনাশক্তির সহিত বর্ণিত হইয়াছে।”

জয় গুরু! অবধূত লোকটা তাহলে উপন্যাস লিখতে জানত। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা থেকে বারে বারে এটাই স্পষ্ট হয় যে, অবধূত নিজে ধর্মব্রতী হলেও, তাঁর রচনায় ধর্মাচারীর লোভ, অসততা, জুয়াচুরি, বুজরুকি, তাদের ধর্মাচরণের অসার দিকগুলি ও ধর্ম নিয়ে ব্যবসার দৃষ্টান্তগুলিকেই তুলে ধরেছেন। অবধূতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে শ্রীকুমার গ্রন্থটিকে উচ্চপর্যায়ের ভ্রমণ-সাহিত্য বলে অভিহিত করেছেন। অবধূত সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য শ্রীকুমার শেষ করছেন এইভাবে –

“অবধূতের শক্তি সম্বন্ধে কাহারও কোন সংশয় নাই, যাহা কিছু সংশয় তাহা শক্তির প্রয়োগরীতি ও বিষয়নির্বাচনসম্বন্ধীয়। তিনি বরাবরই উদ্ভটের কাঁটাগাছে পূর্ণ ক্ষেত্রেই কর্ষণ করিতে থাকিবেন, ধর্মজীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অসঙ্গতি উদ্‌ঘাটন করিবেন বা উচ্চকণ্ঠ কৌতুকহাস্যের দম্‌কা হাওয়ায় লুটাপুটি খাইবেন না গভীর-উদ্দেশ্য-প্রণোদিত উপন্যাসের ধারা অনুসরণ করিয়া নূতন নূতন জীবনসত্য-আবিষ্কারে আত্মনিয়োগ করিবেন এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর তিনিই দিতে পারেন। তাঁহার পথনির্বাচনের উপরেই উপন্যাস-জগতে তাঁহার স্থান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করিবে।” ১০

উপন্যাস-জগতে তাঁহার স্থান! গল্প ও উপন্যাস মিলিয়ে অবধূতের রচনার সংখ্যা তাঁর সমসাময়িক লেখকদের তুলনায় কিছুই নয়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যাঁরা অনেক বেশি লিখেছেন তাঁদের ক’টা লেখা আজ ক’জন পড়ে! পড়ার অভ্যাসই কমে এসেছে। তার উপর বাংলা লেখা, তাও আবার পশ্চিমবঙ্গের বাংলাবাজারে। তবুও, অবধূতের কয়েকটি বই কলেজ স্ট্রিটে তো অবশ্যই, এমনকী আন্তর্জালেও পাওয়া যায়; ইবুক হিসেবে তো বটেই, খুঁজলে প্রিন্টেড বই হিসেবেও ডেলিভারির আশ্বাস মেলে। ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ ফিল্ম হিসেবে উপন্যাসটির তুলনায় জলো হলেও, প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে সিনেমা করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। জনপ্রিয় তো হয়েইছিল, সিনেমাটা পুরস্কারও পেয়েছিল অনেক। আজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় ‘পথের পাঁচালী’র লেখকের নাম জানতে চাইলে জবাব মেলে ‘সত্যজিৎ রায়’। উপন্যাস-জগতে তাঁহার স্থান!

‘গভীর-উদ্দেশ্য-প্রণোদিত উপন্যাসের ধারা’! বিশ্বসাহিত্যে বহুকাল আগেই গভীর-উদ্দেশ্য-প্রণোদিত উপন্যাস লেখার চল উঠে গেছে। গল্প ও তথ্যের ভূমিকা উপন্যাসে ক্রমেই কমে আসছে। বিবিধ কারণের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, বিশেষত আন্তর্জালে তথ্য আদানপ্রদানে প্রগতি এর অন্যতম কারণ। সচেতন পাঠক, ইনফর্মড রিডারকে ফাঁদা গল্প বা অজানা তথ্যভিত্তিক উপন্যাসের মাধ্যমে চমকে দেওয়া ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। গল্পের মাধ্যমে যুক্তিগ্রাহ্য কোনও একটা হিতোপদেশ বা নিদান দেওয়ার রেওয়াজও লুপ্তপ্রায়। শব্দের শিল্পই লেখার প্রধান উপজীব্য হিসাবে ক্রমশ স্বীকৃতি পাচ্ছে। নির্ভার নির্মেদ নির্ভেজাল নিটোল গল্প বলতে এখন পাল্প ফিকশনকেই বোঝায়। ফাস্টফুড বা জাঙ্কফুডের মতো মানুষ সেসবও গেলেন। বাংলায় আমরা তার উৎপাদন জারি রেখেছি। একসময় মানুষ বিপুল আগ্রহে অবধূত পড়েছিল হয়তো সত্যিই খানিকটা তন্ত্রমন্ত্রের টানে আর খানিকটা যৌনতার টানে। অন্তত একটা অংশ হয়তো বাস্তবিক তাঁর লেখায় যৌন উত্তাপ পেত। আজকের দিনে, বিভিন্ন পার্বণে ‘থিমপুজো’ যখন সংস্কৃতি, পর্নোগ্রাফি যখন মাউসের বোতাম টেপার মতোই সহজলভ্য, তখন তন্ত্রমন্ত্র বা যৌনতার আকর্ষণে লোকে অবধূত পড়বে কেন! ওইসব দেওয়া যদি একান্তই মনস্থ করেন কেউ আজ, তবে তাঁকে হয় লিখতে হবে তন্ত্রকে মন্ত্র করে ‘হ্যারি পটার’ বা ‘দা ভিঞ্চি কোড’এর মতো কিছু, আর নয়তো স্রেফ ‘ফিফটি শেডস অফ গ্রে’এর বঙ্গজ সংস্করণ।

অবধূতের ‘উদ্ভট কল্পনা’, ‘ধর্মজীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অসঙ্গতি উদ্‌ঘাটন’, ‘কৌতুকহাস্যের দমকা হাওয়ায় লুটাপুটি’! বিশ্বসাহিত্যে এইসবই এখন রাজত্ব করছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ থেকে হারুকি মুরাকামি – রচনার ভিত্তিতে আছে সেই তথাকথিত ‘উদ্ভট কল্পনা’। সেই দিক থেকে, অবধূত আজও খুবই প্রাসঙ্গিক, খুবই সমকালীন। কেবল, তাঁর লেখার ভাষা ইংরেজি, স্পেনীয় বা জাপানি নয়, ভাষা তাঁর নিখাদ বাংলা।

খুব হয়েছে। অনেক ঘাঁটা হল সমালোচক জমিদারদের দেউড়ির ধুলো। এবার যাওয়া ভাল গঙ্গাস্নানে। অবধূতেরও প্রিয় একটি কর্ম, গঙ্গাস্নান। কিন্তু, লেখক আর পাঠক যেহেতু এক নয়, লেখক যেখানে ভগবানের নামে হিংলাজ অবধি ঘুরে এসেছেন, পাঠক সেখানে হয়তো লেক কালীবাড়িরও ত্রিসীমানা মাড়ায় না, সেই পাঠক পথভুলে অথবা ইচ্ছা করে গঙ্গার কিনারায় যাওয়ার বদলে এসে পড়তেও পারে বারদুয়োরি বা খালাসিটোলার দোরগোড়ায়, সেও তরলে স্নান করবে মানত করেই। একই কথা। জাঁদরেল লেখক, বস্তুত লেখকের লেখক, কমলকুমার রেগুলার হত্যে দিতেন এসব জায়গায়। তাহলে এগুলি পীঠস্থান নয় তো কী! ওই এক লেখক! যত লোকে এঁর নাম করে তার কত ভগ্নাংশ এঁর লেখা পড়েছে কোনওকালেই ঠাহর করা গেল না। যাই হোক, গঙ্গা অথবা ‘বাংলা’য় গায়ের গু-গোবর সাফ করে পাঠক বসল নিয়ে কয়েক প্রস্ত বাঁধানো অবধূত। ইস্পাতকঠিন সিদ্ধান্ত – যা বুঝব নিজে বুঝব। নিকুচি করেছে সমঝদার সমালোচক সমাজপতিদের।

(২)

অবধূত

অবধূতের নিজের লেখার বাইরে অবধূতকে জানার উপাদান খুবই কম। ব্যক্তিগত জীবনে সত্যিই তিনি মানুষকে বাণ মারার ভয় দেখাতেন কি না, তা আর কারও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার উপায়ও তাই নেই। ‘সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান’, প্রথম খণ্ড, থেকে জানা যাচ্ছে, তাঁর জন্ম ১৯১০ সালে। সন্ন্যাসপূর্ব জীবনে তাঁর নাম ছিল দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বাড়ি ভবানীপুর, কলকাতা। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর সন্ন্যাস গ্রহণ করেন ও উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরে অবধূত হওয়ার পর তাঁর নাম হয় কালিকানন্দ। তিনি একসময় ভৈরবী গ্রহণ করেছিলেন। চুঁচুড়ায় স্বপ্রতিষ্ঠিত ‘রুদ্রচণ্ডী’ মঠে ১৯৭৮ সালের ১৩ই এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়।১১ ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’ উপন্যাসটির উৎসর্গপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, তাঁর পিতার নাম অনাথনাথ মুখোপাধ্যায়।১২ ‘বশীকরণ’ গ্রন্থের উৎসর্গপত্র পড়ে ধারণা হয়, সন্ন্যাসপূর্ব জীবনে তাঁর স্ত্রী অথবা সন্ন্যাসজীবনে ভৈরবীর নাম সুখময়ী দেবী ও পুত্রের নাম অমল [মুখোপাধ্যায়]।১৩ ভবানীপুরে বাড়ি হলেও, অবধূত সম্ভবত পূর্ববঙ্গের মানুষ এবং তাঁর জন্মও সম্ভবত সেখানেই। বিভিন্ন রচনায় যখনই মাকে স্মরণ করছেন তখন তাঁর স্মৃতিপটে বারবার ভেসে উঠছে পূর্ববঙ্গের গ্রাম, নদী, নৌকা, স্টিমার ইত্যাদি এবং চাঁদপুর নদীবন্দর।১৪ ‘বশীকরণ’ গ্রন্থেও প্রবাসী ফক্কড়ের মন যখন দুর্গাপূজার সময় বাড়ি ফেরার জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে তখন সে বহু কষ্টে ও নানা কায়দায় গিয়ে পৌঁছয় কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম শহরে। এই কারণে, পাঠকের বারেবারেই মনে হয়, দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ওরফে কালিকানন্দ অবধূত আদতে খাঁটি বাঙাল, যদিও পাঁড় ঘটির সঙ্গে তাঁর কোনও বিবাদ নেই। পশ্চিম থেকে ফেরার পথে তিনি বাঙলার গন্ধ পেতে শুরু করেন বর্ধমান থেকে এবং সেই গন্ধ জারি থাকে সিলেট ছাড়িয়ে শিলং পাহাড়ের পাদদেশ অবধি।১৫ অবধূত লিখতে শুরু করেছেন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে। ১৯১০ সালে জন্ম তাঁর। প্রথম বই ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৫৫ সালে। লেখক অবধূত আত্মপ্রকাশ করছেন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। আটষট্টি বছর বয়সে, ১৯৭৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। লেখার জন্য সময় পেয়েছেন তেইশ বছর। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে লিখেছেন প্রায় সমসংখ্যক, অর্থাৎ খান তেইশ-চব্বিশ গ্রন্থ। সমসাময়িক বাংলা লেখকদের তুলনায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের ভাণ্ডার নেহাতই ক্ষুদ্র।

‘মরুতীর্থ হিংলাজ’। সম্ভবত, অবধূতের সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস। একে কী বলব? ভ্রমণকাহিনী? ভ্রমণসাহিত্যের লক্ষণগুণ কিছু নিশ্চয়ই থাকে। আমার মতো পাঠক সেসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয়। বন্ধুরা কেউ কেউ বলেছেন, ভ্রমণে বেরুলে সেই জায়গাটিকে হৃদয়ে, মস্তিষ্কে ও সর্বাঙ্গে একেবারে চেখে-মেখে নিতে হয়, তবেই না সেই জায়গাটি সম্যক দেখা ও জানা হল। চাখা-মাখার এই প্রকারটি কী রকম? না, বন্ধুদের মতে, যে জায়গায় যাবে সেই জায়গার খাবার খাবে, পানীয় পান করবে এবং, ভ্রমণকারী পুরুষ হলে সেই জায়গার মাটি-জল-বাতাসে বেড়ে ওঠা নারীর সঙ্গলাভ করবে, নারী হলে পুরুষের সঙ্গ, অন্যকিছু হলে নিজ রুচি অনুযায়ী যে-সঙ্গ কাম্য। অর্থাৎ, স্থানটির সঙ্গে যথাসম্ভব সর্বেন্দ্রিয়গ্রাহ্য সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া জরুরি। এই অভিমত পছন্দ না হলে দয়া করে আমার বিরুদ্ধে মোকদ্দমার উদ্যোগ করবেন না। এ আমার নিজের কথা নয়। আমার পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় মহাশয় অভিযাত্রীদের উপদেশ। গুরুর নাম মুখে আনা বারণ, নইলে তাঁদের যাবতীয় রেফারেন্স পাদটীকায় দিয়ে দিতুম। ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’এ খাবার উটের পিঠে করাচি থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, পথে বিভিন্ন স্থানের কুয়োর জল ছাড়া আর কিছু পানের উল্লেখ নেই (অবশ্য, সর্বঘাটে জল খেয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাকে ভ্রমণ বললে সে অন্য কথা)। সর্বোপরি, সঙ্গিনী ভৈরবীর খর নজরের সামনে অন্য নারীর সঙ্গলাভ করা অবধূতের পক্ষে সম্ভব ছিল না (ইচ্ছে ছিল কি না তার উল্লেখ তিনি করেননি। কেই বা করে!)। আজকাল বেড়াতে গেলে বেড়ানোর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা অবশ্যকর্তব্য, নইলে বেড়ানোর আনন্দ পনেরো আনাই মাটি। বুকে ছাড়া কোনও ‘বুক’এই অবধূতের হিংলাজ ভ্রমণের সচিত্র প্রমাণ নেই। সুতরাং, আমার মতো পাঠকের চোখে ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি উপন্যাস, কথা দিয়ে গাঁথা এক মালা, সর্বঘাটে জল-খাওয়া অভিজ্ঞতার শৈল্পিক নির্মাণ।

বাংলা সন ১৩৫৩, আষাঢ় মাস। খ্রিস্টাব্দ ১৯৪৬, জুনের শেষার্ধ কিংবা জুলাইয়ের প্রথমার্ধ। স্বাধীনতা তথা দেশভাগের এক বছর আগের কথা। করাচি তখনও অখণ্ড ভারতবর্ষের অঙ্গ। হিংলাজ তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত স্বশাসিত লাসবেলা প্রিন্সলি স্টেট বা রিয়াসতের মধ্যে একটি স্থান। পাকিস্তান গড়ে ওঠার পর তা হয়ে যায় সেই দেশের বালুচিস্তান প্রদেশের অঙ্গ। এখন হিংলাজ যেতে হলে পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশির বেশে যেতে হবে। তখন হত না। তৎকালীন করাচি শহরের অনভিজাত পল্লীর এক প্রান্তে নাগনাথের প্রাচীন আখড়ায় জড়ো হয়েছে একদল হিংলাজ গমনেচ্ছু তীর্থযাত্রী। - তীর্থযাত্রা। ভ্রমণ নয়। দলে শুধু একজন, আখ্যানকার, যিনি উত্তমপুরুষে সমস্ত কথা বলে চলেছেন, তাঁর উদ্দেশ্যটা কী, ভ্রমণ না তীর্থযাত্রা, না কি আর কিছু, তা শুরু থেকে শেষ অবধি বুঝে ওঠা যায় না। তিনি কি অবধূত নিজে, যাঁর বিরুদ্ধে বাণ মেরে মানুষ খুনের শাসানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে? এইখানে, ঠিক এইখানটিতে, পাঠক আমি এক সিদ্ধান্তগ্রহণ করলাম। লেখার পিছনে লেখক মানুষটিকে অর্থাৎ ব্যক্তি লেখককে দেখার চেষ্টা পারতপক্ষে করব না। উত্তমপুরুষে যিনি কাহিনীটি বলছেন, যিনি নিজেও কাহিনীর এক চরিত্র, তাঁকেই শুধু দেখব।

“ঐ যে দূরে আকাশের পশ্চিম দিকে আস্তে আস্তে সন্ধ্যাতারাটা চলে যাচ্ছে, ঐ দিকেই কোথাও হিংলাজ। আজও জানি না ঐখানে পৌঁছনো আমার কপালে ঘটে উঠবে কি না! আর এই সুদীর্ঘ ধৈর্যপরীক্ষার শেষ ফল যখন মিলবে তখন কৌতূহল নিবৃত্তির আফসোস ছাড়া আর কী জমার ঘরে পড়বে তাই বা কে জানে!” ১৬

কৌতূহল নিবৃত্তির আফসোস! নিঃসন্দেহে এক পোড়খাওয়া মানুষের অভিব্যক্তি। এই মানুষ পাপস্খালন বা পুণ্যার্জনের আশায় দেবদর্শনে তীর্থযাত্রায় বেরয় না, অদম্য ও সোৎসাহ ভ্রমণপিপাসার বশবর্তী হয়ে বছরে একবার গৃহের নিশ্চিন্ত সুখ ছেড়ে নতুন দেশ দেখতে বেরিয়ে পড়ে না। এ জানে, চলে যাওয়া সময় এবং বিগত জীবনের মতোই অজানাকে জানা ও অদেখাকে দেখা প্রায়শ মানুষকে বার্ধক্যের দিকে আরও এগিয়ে দেওয়া এবং তার জগৎ ও তার আশা ও আকাঙ্ক্ষার পরিধিকে আরও সংকুচিত করে তোলা ছাড়া আর কিছু দিতে পারে না। বরং, বাড়িয়ে তোলে ব্যথা ও হতাশার ঝুলি। তবু, এ পথে পথে ঘোরে। পথের শেষে কোথাও এর ঘর নেই। ফিরে আসার সংসার নেই। এই মানুষ গৃহহীন, চিরকেলে অনিকেত। এ খোঁজে অন্যকিছু। এই মানুষ আছে সব মানুষের অন্তরে। মাথার উপরে বানানো ছাদ আর চার দেওয়ালের সুরক্ষায় যারা বাস করে, তাদের প্রত্যেকেই জীবনের পথে অনিকেত। একলা এসেছে, একলাই যেতে হবে। তারই মাঝখানে তবু পথের মোড়ে মোড়ে নিরন্তর খোঁজ সেই অন্যকিছুর। বারে বারেই হতাশা, প্রতিবারই আকুল আর্তি ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে’।

“দীর্ঘনিঃশ্বাস আপন হতেই বুক থেকে বেরিয়ে আসে। ছুটে চলেছি যেখানে সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র পড়েছিল, সেই মহাপিঠ হিংলাজে। ভগবান রামচন্দ্র রাবণ-বধ করে ব্রহ্মহত্যার পাপভাগী হয়েছিলেন, তাঁর সেই পাপস্খালন হয় এই মহাতীর্থ দর্শনে। অতবড় পাপ অবশ্য আমার হিসাবের ঘরে জমা থাকা সম্ভব নয়। এ যুগে ব্রাহ্মণ কোথায় যে, ব্রহ্মহত্যার পাপ ঘটবে আমার। তবে অন্তত এইটুকু আমার কপালে নিশ্চয়ই জুটবে যাতে আমার এই জীবন-নাটকের অনাগত অজানা অঙ্কগুলিতে ছুটোছুটির পালা আর থাকবে না, আকুলি-বিকুলির যবনিকা-পাত হবে। এই আশাটুকুই মনের কোণে চেপে আগামী কালের অপেক্ষায় পাশ ফিরে শুই।” ১৭

উট নিয়ে এসে পৌঁছয় মালবাহক তথা পথপ্রদর্শক দুটি মানুষ – গুল মহম্মদ ও তার পুত্র দিল মহম্মদ। তারা লাসবেলা স্টেটের নাগরিক, হিংলাজের কাছেই তাদের বাড়ি। হিংলাজের দেবীকে তারাও মান্য করে। সেখানে মোমবাতি, ধূপ আর শির্‌নির ভেট চড়ায়। দেবী-দর্শনার্থ হিংলাজ-যাত্রাকে তারা বলে নানী-কি-হজ। যাত্রাপথে শোণবেণী বাজারে কতিপয় মারওয়াড়ি ব্যবসাদার ছাড়া কোথাও হিন্দুর বসতি নেই। দূরে দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যা কিছু বসতি সবই মুসলমানের। তাতে মুসলমানের মহল্লায় হিন্দুর তীর্থযাত্রা আটকায়নি। বরং, গুল মহম্মদের ধারণা, এতজন মানুষের তীর্থযাত্রার পথপ্রদর্শক হওয়ার দরুন তার বেহেস্তে ঠাঁই পাওয়া একরকম নিশ্চিত। বিধর্মীদের ধর্মাচরণে সাহায্য করেছে বলে আল্লা তার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারেন, এমন ভাবনা তার মনে আদপেই ঠাঁই পায়নি। মনুষ্যত্ব যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অপেক্ষা করে না, এই তার প্রমাণ। বরং, পণ্ডিত ও মওলানা বিষয়টা গুলিয়ে দেন। ত্রিশ জন তীর্থযাত্রীর দলের সর্দার তথা পুরোহিত রূপলাল ছড়িদার সতেরো-আঠেরো বছরের কিশোর। থেকেথেকেই চুলে টেরি বাগানো ও হিন্দি ফিলমের গান গুনগুনিয়ে ওঠা তার স্বভাব। তারই নেতৃত্বে, গুল মহম্মদ ও দিল মহম্মদের প্রহরায় এবং দুটি উটের পথনির্দেশ পাওয়ার দক্ষতায় ভরসা করে পথ চলে যাত্রীরা। মরুভূমির মধ্যে এক থেকে দেড়-দুই দিনের যাত্রাপথের দূরত্বে অবস্থিত এক-একটি জলের কূপ। সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করে যে কূপওয়ালারা, তারা টাকাপয়সা নেয় না। চায় শুধু রুটি। ক্রোশের পর ক্রোশ দূরত্বে দোকানপাটের অস্তিত্ব নেই। ক্ষুধার জ্বালা টাকায় মেটে না। তাই তারা চায় রুটি। তারা কী কারণে করাচি বা শোণবেণী গিয়ে আর কোনও কামধান্দার চেষ্টা না করে ওই তপ্ত বালুর সমুদ্রে কাঁটাগাছের ছাউনিতে সারাটা জীবন বাস করে তা বুঝে ওঠা যায় না। তারা প্রতিদিন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বালি খুঁড়ে কুয়োগুলি জাগিয়ে রাখে বলেই সে-পথের যাত্রীরা জল পায়, জীবন পায়। জীবন পেয়ে আবার শুরু করে পথ চলা। পথেই সঙ্গে জুটে যায় কুন্তী ও থিরুমল। পথেই জীবনের যাত্রা শেষ হয় নিষ্ঠাবান গোঁড়া ব্রাহ্মণ জয়াশঙ্কর মুরারজি পাণ্ডের। শোণবেণীতে যেমন প্রায় পাশাপাশি অবস্থান করে সাগর ও মরুভূমি, তেমনই যৌবনের উচ্ছলতা আর বার্ধক্যের স্তব্ধতা, ভালবাসা আর ঘৃণা, করুণা ও নিষ্ঠুরতা, পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকে হিংলাজের পথে। সে-পথে আছে সূর্যের অসহনীয় প্রখরতা, বালির ঝড়, আছে হঠাৎ বৃষ্টি। চন্দ্রকূপে কাদার আগ্নেয়গিরিকে সাক্ষী রেখে ভ্রূণহত্যার পাপ স্বীকার করে নির্ভার হন পোপটলাল প্যাটেল। সেই আগ্নেয়গিরিতেই লাফিয়ে পড়ে প্রাণ হারায় পাগল থিরুমল, কীসের পাপে তাও বোঝা যায় না। এই দুর্ঘটনার পর চন্দ্রকূপ স্বামীকে পুজো দেওয়া হয় না বাকিদের। তবুও তারাও সকলের সঙ্গে যথাসময়েই পৌঁছয় হিংলাজ-দেবীর মন্দিরে। রূপলাল ছড়িদারের জবানিতে –

“আরে রেখে দিন আপনার আইন-কানুন। এবারের যাত্রায় চন্দ্রকূপে সব নিয়ম আমরা বিসর্জন দিয়ে এসেছি। নিয়ম হচ্ছে, চন্দ্রকূপ বাবা বাধা দিলে আর এগোনো যাবে না। কতকগুলো লোকের তো পুজোই হল না সেখানে, বাবার হুকুমও নেওয়া হল না। তা কাউকে কি আমরা ফেলে এসেছি নাকি। ওখানে অঘোরী বাবাকে চন্দ্রকূপের ঘটনা বলে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এখন কি করা উচিত? সবাই কি যেতে পারবে নদীর ওপারে?’ বাবা বললেন, ‘আলবাৎ পারবে। তুই ব্যাটা কালকের বাচ্ছা, তুই নিয়মের কি বুঝবি?’ তখন সবাইকে নিয়ে অঘোর নদী পার হয়ে চলে এলাম।” ১৮

আখ্যানকারও নিয়মের দাস বলে মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি। সন্ন্যাসীর বেশ, গেরুয়া পরে আছেন, সঙ্গে আছেন তাঁর ভৈরবী। কিন্তু, কোনও অসাধারণ শক্তির অধিকারী বলে একবারের জন্যও বিশ্বাস হয় না। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই আশা-নিরাশায় দোলাচলচিত্ত, প্রকৃতির রোষের সামনে গৃহীর মতোই অসহায়। আম বাঙালির মতোই প্রবাসে বাংলার মাটি, জল, হাওয়া, আকাশ, মেঘ আর বাঙালি মায়ের স্নেহের স্পর্শ ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তান্ত্রিক শক্তির প্রকাশ বা শ্লাঘা নেই বিন্দুমাত্র। তন্ত্রমন্ত্রের কোনও শক্তিই যে তাঁর নেই তা লেখায় স্বীকার করেছেন অকপটে। এই শক্তি যে কারও থাকতে পারে, তাও মানেন না তিনি। সামান্যতম প্রবণতাও নেই ধর্মের কারণে স্থানমাহাত্ম্য প্রচারের। ভগবানে বিশ্বাস করেন, ধর্ম মানেন, কিন্তু মানুষের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী নন আখ্যানকার অবধূত।

‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ কতটা ভ্রমণকাহিনী তা বলতে এই পাঠক অপারগ। এটুকু বলা চলে, এই উপন্যাস জীবনের কাহিনী। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি পথচলাকে ভ্রমণের মান্যতা দিলে, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ তারই এক খণ্ডচিত্র। অবধূত কী জাতের লেখক তা বুঝতে হলে অন্যান্য ভ্রমণকাহিনীর লেখকদের সঙ্গে তাঁর লেখার তুলনা টানতে হয়। সে-কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলতে পারি, উপন্যাসের কোথাও অহেতুক রোমাঞ্চ আমদানি করার প্রচেষ্টা নেই। নেই নারী-পুরুষ সম্পর্ক ঘিরে রোমান্টিক মেজাজ আমদানির চেষ্টা। করাচি থেকে হিংলাজ, কোথাও কোনও জায়গার সৌন্দর্য অথবা শ্রীহীনতা ঘিরে বাড়াবাড়ি উচ্ছ্বাস নেই। উপন্যাসে কোনও নায়ক নেই, নায়িকাও নেই। নেই কোনও ভিলেন। পোপটলাল প্যাটেলের কথাই ভাবুন। অবৈধ সম্পর্ক গোপন করার বাসনায় এককালে ভ্রূণহত্যা করেছে সে। সেই পাপস্খালন করতেই তীর্থে আসা। সব রকমের সুযোগ ছিল তাকে খলনায়ক বানিয়ে গল্পে নাটক আমদানি করার। অবধূত তার উদ্যোগমাত্র করেননি। পোপটলালের অন্যায়কর্মের পিছনে যুক্তি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা যেমন করেননি, তেমনই কলম হাতে নিজেই তার অপরাধের বিচার করতে বসে যাননি। নীতির আদালতে লেখক অবধূত কারও উকিল নন; উচ্চাসনে আসীন বিচারকও নন তিনি।

কুন্তী আর থিরুমলের সম্পর্ককেও প্রেমের রূপকথায় উত্তীর্ণ করে দেওয়ার প্রয়াস নেই বিন্দুমাত্র। তাদের মধ্যে দীর্ঘ সহবাসের অভিজ্ঞতাপ্রসূত স্নেহ যেমন আছে, পারস্পরিক ঘৃণার অবস্থানও তেমনই। থিরুমলকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারে না কুন্তী। কিন্তু, তার সঙ্গে ভবিষ্যতে জীবন কাটানোর কথাও ভাবতে পারে না আর। নিছক স্বল্পমেয়াদি মান-অভিমান বা ক্ষোভের প্রকাশ নয় এ। নিজের অতীত সিদ্ধান্তে কুন্তী অনুতপ্ত। পাশাপাশি, দায়িত্বজ্ঞানহীন থিরুমলকেও সে ক্ষমা করতে পারে না। নারী-পুরুষের মধ্যে আকর্ষণ, প্রেম, ভালবাসা ইত্যাদি হিসাব কষে, স্থান-কাল-পাত্র বুঝে ঘটে না ঠিকই। কিন্তু, বিপন্নবোধ করলে নর বা নারী কেউই সেই মহাজ্ঞানের কথাটি স্মরণ করে পরস্পরকে ক্ষমা করে দিতে পারে না। এটাই মনুষ্যোচিত। একই পরিস্থিতিতে এর বেশি কিছু ঘটলে সে এক অলৌকিক ব্যাপার। তেমন প্রেমের সুরধুনী অনেক ভ্রমণকাহিনীতেই দিব্যি কুলকুলিয়ে, কখনও-বা কলকলিয়ে, বয়ে যায়। অবধূতের আখ্যানে থিরুমলের মতোই কুন্তীও হিংলাজ থেকে ফিরে আসেনি। কিন্তু, সে থিরুমলের প্রতি প্রেমজ আনুগত্যের কারণে নয়। মরুভূমিতে জলের অভাবে তৃষ্ণায় প্রাণ হারিয়েছিল সেই মেয়ে।

আখ্যায়ক সন্ন্যাসী আর তাঁর ভৈরবীর সম্পর্ক ঘিরে কোনও রহস্য তৈরী করা হয়নি। প্রতিদিনের যৌথ জীবনযাপনের অভিজ্ঞতায় মাখামাখি প্রায় স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্যের মতোই সাদামাটা সম্পর্ক তাঁদের। চিত্তচাঞ্চল্য ঘটানোর মতো প্রেম বা যৌনতার উল্লেখ একেবারেই নেই।

লেখক অবধূত সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কথাটি বলে গিয়েছেন সজনীকান্ত দাস, ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদক। বলা বাহুল্য, ইনিও সে-যুগের সমালোচক সমাজের এক সমাজপতি, বাংলা সাহিত্য জগতের অন্যতম মহীরুহ। কিন্তু, এঁর জাত কিঞ্চিৎ আলাদা। অবধূতের জাত সম্পর্কে তিনি কী বলেছেন তা শোনার আগে তাঁর নিজের জাত-বিষয়ক একটা ছোট গল্প শুনে নেওয়া যেতে পারে। অনেক ক্লেশ, অনেক আশা-হতাশা পেরিয়ে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তখন ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে। “হঠাৎ একদিন ‘শনিবারের চিঠি’-র সম্পাদক সজনীকান্ত দাস খোঁজখবর নিয়ে বিভূতিবাবুর কাছে এসে হাজির। নব্বই-টা টাকা তাঁর হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘পথের পাঁচালী’ বই আকারে আমি ছাপব। অবাক হয়ে গেলেন বিভূতিবাবু। ন-ব্ব-ই-টা-কা!! এ-যে কল্পনাতীত!”১৯ এহেন সজনীকান্ত দাস ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’ উপন্যাসের ভূমিকায় লিখছেন,

“বৎসর দেড়েক পূর্বে ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ পড়িয়া বাংলা সাহিত্য-ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নবাগত ‘অবধূতে’র পাকাপোক্ত হাতের এবং অনাসক্ত ও নির্লিপ্ত মনের পরিচয় পাইয়া বিস্মিত হইয়াছিলাম। যে ডিটাচ্‌মেন্ট সাহিত্যে উচ্চতম শিল্প – এপিক ও ড্র্যামা – সৃষ্টির সহায়ক, অনুভব করিলাম লেখকের তাহা আছে।”

উদ্ধারণপুরের ঘাট। আমার সেই সদ্‌বন্ধু প্রদত্ত ভ্রমণ-বিষয়ক সৎপরামর্শ স্মরণ করলে দেখতে পাই, ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’কে সার্থক উপন্যাসের পাশাপাশি ভ্রমণসাহিত্য বলা ভিন্ন গত্যন্তর নেই। উদ্ধারণপুরে গঙ্গার শ্মশানঘাটে মড়ার কাঁথা সাজিয়ে গড়া গদি বা, রাজসিংহাসন বা, শাহী তখ্‌তে বসে আখ্যানকার সে-স্থানের যাবতীয় খাদ্যাখাদ্য গলাধঃকরণ করেছেন; পান করেছেন রামহরি ডোমের কুঁড়েঘরে তার বউয়ের ভাটিখানায় পাতন করা খাঁটি চোলাই বোতল-বোতল। আর, নারীসঙ্গ? তাও অল্পবিস্তর ঘটেছে বই কী। তাহলে? বন্ধুর ভুরু-নাচানো প্রশ্নের জবাবে খাঁটি বীরভুঁইয়া ভাষায় ঘাড় নেড়ে বলতেই হয়, হিঁ, বটে বাপু!

আগাগোড়া সমাজটা তার যাবতীয় বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির উদ্ধারণপুরের শ্মশানে – চণ্ডাল, বাগদি, বেশ্যা, বামুন, বোষ্টম-বোষ্টুমি, কেঁধো, চাষা, জমিদার, অফিসার, ব্যবসাদার – সবাই উপস্থিত। আছেন মুকুন্দপুর মালিপাড়ার কুমার বাহাদুর, পুলিশের এস-আই সাধুরাম সমাদ্দার, বাউণ্ডুলে ঠিকাদার খন্তা ঘোষ, ভটচায পুরুত সিধু কোবরেজ, সপরিবার রামহরি ডোম, তার শালা পঙ্কেশ্বর, মড়া-খেলানো সদ্‌গোপ মোড়ল রামরতন, ঝুমরী মেয়েরা, কৈচরের বামুনদিদি, কৌল পালবাবু, কুলীন জয়দেব ঘোষাল, বালবিধবা কিশোরী সুবর্ণ, তান্ত্রিক আগমবাগীশ, তাঁর নিত্যনতুন ভৈরবীরা, ভব সিঙ্গী, তাঁর নিহত গুরুকন্যা, গৃহস্থ বধূ থেকে তান্ত্রিকের ভৈরবীতে পরিণত সিঙ্গীগিন্নি, আরও অনেকেই। আছে নিতাই বোষ্টুমী। আর আছে মোহন্ত চরণদাস বোষ্টম, নারী ও পুরুষের সীমারেখার মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে। আখ্যানকারও আছেন, সবার মধ্যে তবু সবার তফাতে, উত্তমপুরুষে।

‘মরুতীর্থ হিংলাজ’এর সঙ্গে ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’এর গোড়ায় তফাত আছে। কাল, পাত্র ও আখ্যানের বিবিধ স্তরের কথা আপাতত অগ্রাহ্য করলে, মোটাদাগে, শুধুমাত্র স্থানের ভিত্তিতে করাচি থেকে হিংলাজ এক বিন্দু থেকে আর এক বিন্দুতে উপনীত হওয়ার কাহিনী। দীর্ঘ মরুপথে যুগপৎ ব্যক্তি ও সমষ্টির যাত্রাপথ রৈখিক। কিন্তু, ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’এ স্থান বদলায় না। একই জায়গায় একই কাহিনী বিবৃত হয় অসংখ্য স্বরে অনিঃশেষ গতিতে। পাশাপাশি পিঠোপিঠি জুড়ে থাকা প্রাণের সীমায়িত কাহিনীর সীমাহীন বিস্তার। নদীর একটি তরঙ্গ থেকে আর একটি তরঙ্গকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনই একটি মৃত্যু থেকে তফাত করা যায় না আর একটি মৃত্যুকে। জীবন থেকে কিছুতেই আলাদা করা যায় না জীবনকে। উদ্ধারণপুরের শ্মশানে আগুন জ্বলতেই থাকে প্রাণের উদ্ধত আকাঙ্ক্ষার মতো। লেলিহান শিখায় দু’হাত বাড়িয়ে মরণকে আহ্বান করে যে আগুন, সে জীবনেরই প্রতীক। মৃত্যুর যেমন শেষ নেই, প্রাণও তেমনই অনন্ত। তাই আগুন জ্বলতেই থাকে। তারই আভায় প্রতিভাত হয় জীবন আর মরণ। আলো আর আঁধারের মতো দাঁড়িয়ে থাকে পাশাপাশি।

শ্মশানভৈরব ভয় পায় না শ্মশানকালীর রোষকে। তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধিতে দাঁড়িয়ে সে বিশ্বাস করে, তার ঈশ্বর ব্যাদিতদন্ত বুনো জানোয়ার নয়, রক্ত-মাংসে তার লোভ নেই। কিন্তু, এসআই সমাদ্দার ভয় পান। তিনি সশস্ত্র পুলিশ অফিসার, সরকারি ক্ষমতা আর আগ্নেয়াস্ত্রের বলে বলীয়ান। দুনিয়ার বাকি দোপেয়েদের সঙ্গে তাঁর তফাত বলতে বোঝেন নিজের কোমরে ঝোলানো সার্ভিস রিভলভারটাকে। নিজেরই মতো ভাবেন ভগবানকে। তাই, গভীর রাত্রে শ্মশানে ভৈরবের শবদেহ ভক্ষণের নাটক দেখে জ্ঞান হারান দোর্দণ্ডপ্রতাপ সাধুরাম সমাদ্দার।

হ্যাঁ, তন্ত্রমন্ত্রের অসারতা যত তুলে ধরেছেন আখ্যায়ক, যত খুলেছেন ব্যাভিচারী জোচ্চোর তান্ত্রিকের মুখের সাধকের মুখোশ, নিজেও পরেছেন সেই মুখোশ অবরে-সবরে। কেন, কীভাবে, কোথায় – এসব জানতে হলে অবধূত পড়তে হবে। উত্তমপুরুষে যিনি কথক, তাঁর পক্ষে যুক্তির জাল বিস্তার করার আমার কোনও ইচ্ছে নেই, কারণও নেই। সেই চেষ্টা করতে গেলে নিজেরই কাছে নিজে হাস্যাস্পদ হব। তন্ত্রাচারের বীভৎস বিকৃত প্রতারণার দিকগুলি যখন কথক বর্ণনা করেছেন তখনও সেই প্রতারক তন্ত্রাচারী তাঁর শব্দ ও বাক্যবিন্যাসে হয়ে থেকেছে এক রক্তমাংসের মানুষ। তার নৈতিক অধঃপতনের বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়ে বা তাকে বাছাইকরা শব্দে বিদ্ধ করে উপন্যাসের লেখক একলাফে জেঠামশায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নীতিপুলিশে উত্তীর্ণ হননি নিজে; উপন্যাসের ‘উত্তরণ’ ঘটাননি হিতোপদেশে। নিজে যখন তান্ত্রিক ভৈরবের অভিনয় করে প্রয়োজনীয় কলাটা মুলোটা জোটাচ্ছেন বা, বাধ্য হয়ে সামাজিক বিসংবাদের নিষ্পত্তি করছেন, তখনও নিজের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলির সাফাই গাইতে একটি বাক্যও ব্যয় করেননি। সামান্য পাঠক আমি। এই মানুষকে ছোঁয়ার ক্ষমতাই নেই আমার।

ম্যাজিক রিয়ালিজম। জাদু বাস্তবতা। ১৯২৫ সালে ললিতকলা-বিষয়ক একটি প্রবন্ধে ফ্রান্‌জ রো ম্যাজিক রিয়ালিজম (Magischer Realismus) এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।২০ কিন্তু, তারপর? “Roh’s artistic child of the 1920s has become a present-day historian’s nightmare.” ২১ এ তো মারাত্মক ব্যাপার! শিল্প-সাহিত্যের পেশাদার ঐতিহাসিকেরা যদি দুঃস্বপ্নে আক্রান্ত হন তাহলে আমার মতো আম আদমি যাবে কোথায়! ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে ঘোঁটের শেষ নেই। আমাদের দেশে অনেকেরই ধারণা, জাদু বাস্তবতার ধারণাটি লাতিন আমেরিকা থেকে এসেছে। এর কিছু কারণ আছে। এক, জাদু বাস্তবতার বিষয়ে আমরা সম্ভবত বেশি করে মাথা ঘামাতে শুরু করেছি লাতিন আমেরিকান সাহিত্য ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে আমাদের দেশে পৌঁছনোর পর। অর্থাৎ, গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশক থেকে। তার আগের, ১৯৬০ থেকে ১৯৭০, এই দশবছরের সময়কালটাকে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে Boom অর্থাৎ বিস্ফারণের সময় বলে ধরা হয়।২২ দুই, ধারণাটিকে একেবারে ভ্রান্ত বলা মুশকিল। মহামহোপাধ্যায় সাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচকেরা অনেকেই এই ধারণার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। যেমন, আলেহো কার্পেন্তিয়ের। তিনি জাদু বাস্তবতার নামই দিয়েছেন ‘মার্ভিলোসো আমেরিকানো’ এবং দাবি করছেন, লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের জাদু বাস্তবতা ইওরোপের সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, এবং জাদু বাস্তবতা ব্যাপারটা একেবারেই লাতিন আমেরিকার ব্যাপার।২৩ ডেভিড ডানো আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দাবি করছেন, জাদু বাস্তবতা মানেই লাতিন আমেরিকান সাহিত্য আর বাইরের সাহিত্য হল, ‘the works of disparate writers scattered throughout the world’!২৪ শুধু এঁরা দুজন নন। আরও অনেকেই একই মত পোষণ করছেন, যেমন এঞ্জেল ফ্লোর।২৫ আবার, অনেকেই এই মতের বিরোধিতা করছেন। জঁ ফ্রাঙ্কো বলছেন, এটা লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিকদের তরফে একটা বৈশিষ্ট্য জাহির করার চেষ্টা মাত্র।২৬ জঁ পিয়ের দুরি জানাচ্ছেন, এটা নতুন ধরণের বহু-সাংস্কৃতিক শৈল্পিক বাস্তব।২৭ ওয়েন্ডি ফ্যারিসের মতে জাদু বাস্তবতা উত্তর-আধুনিক ধারায় একটি বিশিষ্ট আন্দোলন।২৮ এঁদের সকলেরই মতে জাদু বাস্তবতা একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা। কোনও বিশেষ এক স্থান-নির্ভর ব্যাপার এ নয়। জেরাল্ড মার্টিন আবার লাতিন আমেরিকার ঘরানার জাদুবাস্তবতায় কিছু ক্ষতিকারক দিক দেখতে পাচ্ছেন, এমনকী জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর লক্ষণ দেখছেন। ২৯ জেরাল্ড মার্টিন অন্যত্র দীর্ঘ আলোচনা করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, জাদু বাস্তবতা বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকেই যাঁদের লেখায় ফুটে উঠেছে তাঁরা হলেন ফ্রান্‌জ কাফকা ও মার্সেল প্রুস্ত। তাঁর মতে, জাদু বাস্তবতার পথিকৃত কাউকে বলতে হলে এঁদেরই বলা উচিৎ।৩০ তাতে বিতর্ক অবশ্য আদপেই থামেনি। স্টিফেন স্লিমন ও হোমি ভাবার মতো পণ্ডিতেরা বলছেন, জাদু বাস্তবতা হল উপনিবেশোত্তর আগুয়ান দুনিয়ার সাহিত্যের ভাষা, তৃতীয় বিশ্বের ভাষা।৩১ লাতিন আমেরিকানদের পাশাপাশি এঁরা উদাহরণ দিচ্ছেন আফ্রিকার বেন ওকরি (‘ফ্যামিশ্‌ড রোড’ খ্যাত) বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত সলমন রুশদি (‘মিডনাইটস চিলড্রেন’, ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ ইতাদি) ও আরও অনেকের। আবার কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করে উদাহরণ দেন গুন্টার গ্রাস, ইটালো ক্যালভিনো, মিলন কুন্দেরা প্রমুখের।৩২ বিবাদ থামার লক্ষণ নেই। কে ঠিক, কে ভুল কে বলবে! পণ্ডিতেরাই একমত হতে পারছেন না, আমরা তো পাতি ছাপোষা মানুষ। তবে, একটা কথা বোঝা যাচ্ছে, জাদু বাস্তব সাহিত্য যদি ইওরোপে রচনা করা যায়, যদি লাতিন আমেরিকায় রচনা করা যায়, তবে তা আফ্রিকাতেও করা যায়, এবং তা এই বাংলাতেও সম্ভব। জাদু বাস্তবতা বিষয়ে এত উপক্রমণিকা করতে হল শুধু একটি কথা বলার জন্য – অবধূতের লেখার জায়গায় জায়গায় এই জাদু বাস্তবতার আঁচ আছে, আন্দাজ আছে। সেই কারণেই কি এককালের বাঙালি সমালোচকেরা অবধূতের লেখার আন্দাজ মালুম করে উঠতে পারেননি? কে জানে! তাঁদের চোখ দেখল কেবল ‘বীভৎস রস’, ‘উদ্ভট কাহিনী কল্পনা’, ‘অবদমিত প্রবৃত্তি’, ‘যৌন কামনার গোপন প্রক্ষেপ’, ‘উৎকট যৌনতার আধিক্য’, এইসব। ঘটনাচক্রে, যাদু বাস্তব সাহিত্যে এই সবই থাকে। লাতিন আমেরিকা এই বাংলায় এত জনপ্রিয়তা, এত সমাদর পেল, আর অবধূতকে আমরা প্রায় ভুলে গেলাম। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড’ (‘সিয়েন আনোস দে সোলদাদ’) প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে, আর্জেন্তিনায়। ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’এর প্রকাশকাল ১৯৫৬ সাল। পাঠক, পড়ে দেখুন, জাদু বাস্তবতার আঁচ সেখানে পান কি না।ম্যাজিক রিয়ালিজম। জাদু বাস্তবতা। সবই লাতিন আমেরিকা থেকে আমদানি!

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

‘বশীকরণ’! গ্রন্থের এই এক নাম দিয়েছেন স্বামীজী মহারাজ অবধূত! যারা দু’বেলা জ্যোতিষ-সম্রাট, গণৎকার কি, তন্ত্রাচার্যের দোরে মাথা ঠুকে বেড়ায়, যারা কপাল ফেরানোর জন্য মন্ত্রপূতঃ তন্ত্রসিদ্ধ কবচ-তাবিজ বা রত্নের আশায় থাকে, তারা ঝটিতি এই বই এক কপি কিনে ফেলবে। পড়তে গিয়েই হতাশ হবে। আর যাঁরা সংস্কৃতি-জগতের মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত, তাঁরা নামটি দেখেই মুচকি হাসবেন। এবং, না পড়েই সাব্যস্ত করে ফেলবেন কী ধরণের লোকঠকানো রদ্দিমাল ওই বইতে ঠাসা আছে। বস্তুত, ‘বশীকরণ’ বইটি কীজাতের ‘মাল’? অসহায় নাচার হয়ে অবধূতেরই শরণাপন্ন হতে হল। ঠিক ভূমিকা নয়, ভূমিকার মতো করে লেখা পাঁচটি বাক্যের দুটিতে প্রকাশ, “বশীকরণ গল্প নয়, উপন্যাস তো নয়ই। শুধু কয়েকটি কাহিনী, নির্জলা মনগড়া কাহিনী।”

তবে, তাই হল। চারটি এমন কাহিনী আছে বইটিতে। কোনওটিই প্রচলিত অর্থে ভ্রমণকাহিনী নয়। আবার, কাহিনী চারটি মিলে তৈরী হয় একটি আদ্যোপান্ত ভ্রমণকাহিনী। কারণ, সব ক’টি কাহিনীতেই আছে একজনেরই পথচলার বৃত্তান্ত। পূর্ববঙ্গের এক জেলখানা থেকে বীরভূমের নলহাটি, সেখান থেকে ফের কলকাতার জেল, জেল থেকে গঙ্গাসাগর, তারপর উত্তরবঙ্গের চা-বাগান, কাশী, এলাহাবাদ, লালমনি, আমিনগাঁও, লামডিং বদরপুর, চন্দ্রনাথ, পাণ্ডুঘাট, চট্টগ্রাম এবং তারপর আবার ফেরার।

চারটি কাহিনীর চতুর্থ তথা শেষ কাহিনীটিতে পাওয়া যাবে এক অদ্ভুত জীব ফক্কড়ের সংজ্ঞা। তার সবটা বলে আমি হবু অবধূত-পাঠকের মজা মাটি করতে চাই না। শুধু বলে রাখি,

“ফক্কড় আমৃত্যু অনিকেত। ‘ঢলতা পানি রমতা ফকির’। জলের স্রোতের মতো ফক্কড়ও গড়িয়ে চলবে।” ৩৩

আর হ্যাঁ, বশীকরণ ও অন্যান্য তান্ত্রিক আচার সম্পর্কে আখ্যায়কের ধারণাটা ঠিক কী, কতটা বিশ্বাস করেন এই আচারগুলিকে, এগুলিকে ধর্মাচরণ বলে মানেন কি না, জীবনে কতবার বশীকরণের মন্ত্র প্রয়োগ করেছেন এবং ফল পেয়েছেন, তার সবটাই এই বইটি থেকে জানা যাবে।

রবের্তো বোলানো

অবধূতের সমস্ত লেখা আলোচনা করা আমার সাধ্যের সম্পূর্ণ অতীত। সামান্য গল্প কি উপন্যাস লেখাজোখা করি। ওটা আমার একধরণের কাজ। আলোচনা বা সমালোচনা একেবারেই আসে না। তবুও, খানিকটা বন্ধুদের অনুরোধে আর মূলত, অবধূতকে নতুন করে আবিষ্কার করে এতটাই চমকে উঠলাম যে, সেই চমকের ভূত ঘাড় থেকে নামাতে এই লেখাটা লিখতেই হল। তাঁর ‘বহুব্রীহি’ গল্পগ্রন্থের একটিমাত্র গল্পের উল্লেখ করে, যা আমাকে মানায় না সেই কারবারের ঝাঁপ এবার বন্ধ করব। এই গল্প সংকলনটিতে ভ্রমণের গল্পও আছে। সেগুলির উল্লেখ করছি না। অন্য স্বাদের গল্পগুলিরও সব ক’টি আলোচনা করব না। কিন্তু, ‘নেহাত নাচার’৩৪ গল্পটির বিষয়ে দু’কথা না বলে থাকা গেল না। লেখা এবং লেখক এই গল্পের উপজীব্য বিষয়। কী লিখেছেন, কেমন লিখেছেন, সেসব আমি বলব না। আমি বরং অন্য দু-চার কথা টেনে আনব। চিলির লেখক রবের্তো বোলানো বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক। লিখেছেন স্প্যানিশ ভাষায়। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছেন, ইংরেজিতে তো বটেই। তাঁর একটি গল্প সংকলন ‘লাস্ট ইভনিংস অন আর্থ’এর সব ক’টি গল্পই লেখা বা লেখক নিয়ে। বোলানোর অন্যান্য রচনার মতোই এটিও উচ্চপ্রশংসিত। অবধূতের ‘নেহাত নাচার’ পড়ে বারেবারে এই গল্প সংকলনটি, বিশেষ করে সংকলনের প্রথম গল্প ‘সেনসিনি’ ৩৫-এর কথা মনে পড়েছে। না, তুলনা টানার জায়গা খুব বেশি নেই। ‘নেহাত নাচার’ গল্পটি অবধূত লিখেছেন সম্ভবত গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষে বা ষাটের দশকের শুরুতে। বইটির কোথাও প্রকাশের সাল, তারিখ দেওয়া নেই। অন্যদিকে, বোলানোর গল্পগুলি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ থেকে ২০০১ এর মধ্যে। এমন ধারণা পোষণ করার কোনও জায়গা নেই যে, বোলানো অবধূতের লেখা থেকে টুকেছেন। রাম রাম! দুটি গল্পের প্লটে অর্থাৎ ‘গল্প’এ কোনও মিল নেই। দুজনের লেখার ধরণও আলাদা। বাঙালিরা আজ ক’জন অবধূত পড়েন জানি না। বোলানো বাংলা শিখে অবধূত পড়েছিলেন একথা বললে ঘোড়াতেও হাসবে। তা নয়, কিন্তু ‘নেহাত নাচার’ আর ‘সেনসিনি’এর মধ্যে কোথায় যেন একটা সুরের মিল আছে। হয়তো, স্বচিত্রিত চরিত্রকে ব্যক্ত করা যাদের কাজ, সেই লেখক জাতটার অব্যক্ত অনুভূতিগুলি দেশ-ধর্ম নির্বিশেষে একইরকম।

এতক্ষণ এই লেখা যারা পড়েছেন, তাদের হয়তো মনে হচ্ছে বর্তমান পাঠক-আলোচকের মুখে অবধূতের প্রশংসাই শুধু শোনা গেল। উক্ত লেখকের ত্রুটি-বিচ্যূতি কিছুই তার চোখে পড়ল না! কী করি বলুন। স্বজাতি ও স্বধর্ম বলে কয়েকটা ব্যাপার তো আছে। কাক কখনও কাকের মাংস খায়? আচ্ছা, রসিকতা থাক। নতুন করে খুঁত বের করার আর তো কিছু নেই। শুরুতেই তো অবধূত-বিষয়ে জাত-সমালোচকদের ভাবনাগুলি জানিয়ে দিয়েছি। তবুও যদি নেহাত চাপাচাপি করেন তো বলি, গোটা বাঙালি জাতটার যে দোষ, আবেগপ্রবণতা, সেই দোষ আর পাঁচজন বাংলা-লেখকের মতো অবধূতের মধ্যেও আছে। তবে, আর পাঁচজনের তুলনায় কমই আছে। সেটাও আরও কমতে পারত। কমে যে নি, তার কারণ সম্ভবত বাংলা-বাজারে টিকে থাকতে গেলে বড্ড বেশি লিখতে হয়। টিকে থাকা দুই অর্থেই – নাম টিকিয়ে রাখা আর পেট। ভেবেচিন্তে সময় নিয়ে লেখা, সেই লেখা পঞ্চাশ বার ঘষামাজা করা, এসব বিলাসিতা প্রায় হয়েই ওঠে না। আজকের দিনে বেশিরভাগ লেখকই পূর্ণসময়ের কোনও চাকরি করেন। লেখেন অবসর সময়ে। তাও অনেক লেখেন। ওই নাম টিকিয়ে রাখার তাগিদে। আর, সেকালে অনেকেই শুধু লিখেই পেট চালাতেন। অবধূতের আর কোনও জীবিকা ছিল বলে জানতে পারিনি। তাঁকেও হয়তো জীবনের শেষদিকে পেট চালাতেই গুচ্ছ গুচ্ছ লিখতে হয়েছে। সমসাময়িক লেখকদের তুলনায় কম লিখেছেন। তবুও, তেইশ বছরের লেখক-জীবনে প্রায় ডজন দুয়েক বই নামিয়েছেন। বছরে অন্তত একটা, কোনও বছরে একের বেশি। এভাবে ভাল লেখা হয় না। তবুও, অবধূতের কয়েকটি রচনা, বাংলা-বাজারের নিরিখে, তাঁর সময় থেকে কয়েক কদম এগিয়ে।

সব সমালোচনা, সব আলোচনাই একসময় শেষ হয়। অবধূত-পাঠের শেষপ্রান্তে এসে সার দিয়ে দাঁড় করানো বইগুলির দিকে চেয়ে আছি। অবধূতকে কি বুঝলাম? মাথা নাড়ি। বুঝিনি। এত সহজ নয় বোঝা। সমালোচকেরা সহজে বুঝে ফেলেন। বুঝে ফেলাটাই তাঁদের পেশা। পাঠকের বোঝা আর না-বোঝা মিলেমিশে থাকে তার বুকে। প্রকাশের কোনও দায় নেই তার। তার বোধের সঙ্গে সমালোচকের বোধের কোনও তুলনাই হয় না। পাঠকের বোধে কোনও ফাঁকি নেই। কারণ, লেখক অথবা লেখা, কিছুই কাউকে ব্যাখ্যা করার নেই তার, জবাবদিহি করার নেই কিছুই। এইদিক দিয়ে সে নির্ভার। সমালোচককে বড্ড ভার বহন করতে হয়। শল্যচিকিৎসকের সাবধান ভঙ্গিতে বই হাতে করে পাঠের সুখ ষোলো আনা মেলে না, অনেকসময় বহুত সাবধানতা সত্ত্বেও রুগী মারা যায়, অর্থাৎ বইটি পড়ে উদ্ধার করা যায় না; আবার, সমালোচনা করেও সেই অ-সুখ পুষিয়ে নেওয়া যায় না। বাবার বাপের মতো সমালোচকেরও তো সমালোচক আছে। বস্তুত, সমালোচকের পাঠকের তুলনায় সমালোচকের সংখ্যা বেশি। অনেকসময়ই শুধু কথায় কথা বাড়ে। তাই, ব্যক্তি অবধূতের বিরুদ্ধে বাণ মারার ভয় দেখানোর অভিযোগ খাঁটি কি না, সেই প্রশ্ন পাঠের এই শেষ লগ্নে এসে অবান্তর মনে হয়। যদি খাঁটিও হয়, সেটাই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’এর ভূমিকায় লেখা সজনীকান্ত দাসের ভাষা ধার করে ভাবনাটা পরিষ্কার ব্যক্ত করা যায় - “তিনখানা লক্কড় জ্বালিয়া যে ফক্কড় দিনান্তে দুইখানা টিক্কড় বানাইয়া খাইয়া বিনা ঝপ্পড়ে মাঠে ঘাটে গাছতলায় ধূলিধূসরিত হইয়া --- পথ চলিতে চলিতে দুই হাতে দুনিয়াকে থাপ্পড় মারে” তার কাহিনীকার ব্যক্তিজীবনে সত্যিই কাউকে বাণ মারার হুমকি দিয়েছিলেন কি না, তা জানতে পাঠক আর আদৌ আগ্রহী নয়। ব্যক্তি অবধূতকে সে খুঁজতে বসেনি। খুঁজেছিল তাঁর সৃষ্টি। এবং, আবিষ্কার করে বসেছে যে, রচনাগুলি আদপেই লোকঠকানো রদ্দিমাল নয়। অভিযাত্রা সার্থক হয়েছে তার। বাংলা সাহিত্যের যাত্রার পথে উজিয়ে গিয়ে, পূর্বসূরিদের ফেলে আসা এক চটিতে ঘটেছে তীর্থযাত্রার তৃপ্তির সমতুল অনর্ঘ প্রাপ্তি।

(উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে শব্দগুলির বানান অপরিবর্তিত)


অবধূত, মরুতীর্থ হিংলাজ, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, ১৩৬২ (১৯৫৫), পৃ ১।

শিবনারায়ণ রায়, ‘পঞ্চাশের দশকে পাইকপাড়ার আড্ডা’, বাঙালির আড্ডা, সম্পাদনা লীনা চাকী, গাঙচিল, কলকাতা, ২০০৯, পৃ ১৭ (সম্পাদক বইটির ভূমিকাতে জানাচ্ছেন, নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘হৃদয়’ পত্রিকায়, ২০০৩ সালে)।

শিশিরকুমার দাস, বাংলা সাহিত্যসঙ্গী, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০০৩, পৃ ১০।

হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, বঙ্গসাহিত্যাভিধান (প্রথম খণ্ড), ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৮৭, পৃ ৪৩।

সাগরময় ঘোষ, রচনাসংগ্রহ, আনন্দ, কলকাতা, ২০১১, পৃ ৩০০-৩০৩।

শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা, ১৯৯৬।

ঐ, পৃ ৭৮৬-৭৮৭।

ঐ, পৃ ৭৮৯-৭৯০।

ঐ, পৃ ৭৯৩।

১০ ঐ, পৃ ৭৯৫।

১১ সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত (প্রধান সম্পাদক), অঞ্জলি বসু (সম্পা), সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (সংশোধিত তৃতীয় সংস্করণ, প্রথম খণ্ড), সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৯৪, পৃ ২১৪।

১২ অবধূত, উদ্ধারণপুরের ঘাট, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, ১৩৬৩ (১৯৫৬)।

১৩ অবধূত, বশীকরণ, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, ১৩৬২ (১৯৫৫)।

১৪ অবধূত, (ক) মরুতীর্থ হিংলাজ, পৃ ২৭৬-২৭৭; (খ)বশীকরণ, পৃ ২২১।

১৫ অবধূত, বশীকরণ, পৃ ১০৯-১১০।

১৬ অবধূত, মরুতীর্থ হিংলাজ, পৃ ৩।

১৭ ঐ।

১৮ ঐ, পৃ ২৭৮।

১৯ সাগরময় ঘোষ, রচনাসংগ্রহ, পৃ ৮৩-৮৪।

২০ Franz Roh, ‘Magic Realism: Post Expressionism’, (originally published in 1925) translated version in L. P. Zamora & W. B. Faris (Eds.), Magical Realism: Theory, History, Community, Duke University Press, Durham, 1995, pp. 15-32.

২১ Irene Guenther, ‘Magic Realism, New Objectivity, and the Arts during the Weimar Republic’, Zamora & Faris, Magical Realism, p. 34.

২২
John King (Ed.), Modern Latin American Fiction: A Survey, Faber & Faber, London, 1987. Introduction অংশটি দেখুন।

২৩
Alejo Carpentier, ‘On the Marvellous Real in America’, Zamora & Faris, Magical Realism, pp. 83-88.

২৪David K. Danow, The Spirit of Carnival: Magical Realism and the Grotesque, The University Press of Kentucky, Lexington, 1995, p. 6.

২৫ Zamora & Faris, Magical Realism, Introduction অংশটি দেখুন।

২৬
Jean Franco, ‘What’s Left of the Intelligentsia? The Uncertain Future of the Printed Word’, Critical Passions: Selected Essays, Mary Louise Pratt & Kathleen Elizabeth Newman (Eds.), Duke University Press, Durham, 1999, p. 204 .

২৭
Jean-Pierre Durix, Mimesis, Genres, and Post-Colonial Discourse: Deconstructing Magical Realism, Macmillan Press Ltd., London, 1998, p. 162.

২৮
W. B. Faris, Ordinary Enchantments: Magical Realism and the Remystification of Narrative, Vanderbilt University Press, Nashville, 2004, p. 1.

২৯
Gerald Martin, ‘On Magical and Social Realism in Garcia Marquez’, Bernard McGuirk & Richard Cardwell (Eds.), Gabriel Garcia Marquez: New Readings, Cambridge University Press, Cambridge, 1987, p. 104.

৩০
Gerald Martin, Journeys Through the Labyrinth: Latin American Fiction in the Twentieth Century, Verso, London, 1989, Chs. 6-7.

৩১
(a) Stephen Slemon, ‘Magic Realism as Postcolonial Discourse’, Zamora & Faris, Magical Realism; (b) Homi K. Bhabha, Nation and Narration, Routledge, London and New York, 1990.

৩২ Maria Takolander, Catching Butterflies: Bringing Magical Realism to Ground, Peter Lang, Bern and New York, 2007.

৩৩ অবধূত, বশীকরণ, পৃ ১০৪।

৩৪ অবধূত, বহুব্রীহি, মিত্র ও ঘোষ, পৃ ১২৭-১৪৬।

৩৫ Roberto Bolano, Last Evenings on Earth, Vintage Books, London, 2008, pp. 1-22.



লেখক পরিচিতি - লব্ধ প্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক। ওঁর গোয়েন্দা কাহিনী "গজপতি নিবাস রহস্য" সম্প্রতি ধারাবাহিক ভাবে "দেশ" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । "অন্য কোনোখানে" দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত ওঁর আরেকটি ধারাবাহিক কাহিনী। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বৈবস্বত, জিয়ন নদী, অনিকেত ইত্যাদি।


(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।