অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

মে ৩০, ২০১৭

 

ফিসফাস কিচেন- উচ্ছে-বেগুন-পটল-মুলো

সৌরাংশু

২০১৫তে গাজীয়াবাদে আমার বাড়ির কাছাকাছি একটি যথেষ্ট নামকরা স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত বোর্ডের গেট দেখে আমি বেধড়ক চমকে গেছিলাম। আরে এ তো রবি ঠাকুরের সহজ পাঠ থেকে তুলে এনেছে। সত্যি বলতে কি বৃত্তের বাইরের বাঙালি (আমি নয় এই কয়েনেজটা শ্রদ্ধেয়া অনিতা অগ্নিহোত্রীর) হিসাবে বুকটা মদনলালের মতো হয়ে গিয়েছিল, যার দেশের জন্য খেলার সময় নাকি ৩ ইঞ্চি ফুলে যেত বলে সুনীল গাভাসকারের বিশ্বাস। সত্যি বলতে ফিসফাস কিচেনের দ্বিতীয়বারের জার্নির শুরুতে কেন জানি না রবি ঠাকুরের আসাটা বাঞ্ছনীয়ই ছিল। আমাদের প্রাণের মানুষের সহজপাঠের কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি থেকেই শিরোনামটা তুলে নিলাম তাহলে? বিসমিল্লার এখানেই ইতি! শুরু করি আলাপ।

সত্যি বলছি, ওই রবি ঠাকুরের কাব্য ছাড়া কোত্থাও এই চারটে সবজিকে এক ছাতার তলায় আনতে পারি নি। ছেলেবেলায় আমার উচ্ছে খুব পছন্দের ছিল। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেগুনও। কিন্তু পটল আর মুলো অপছন্দের তালিকা থেকে জাস্ট নামটাই কাটিয়েছে। ওইটুকুই। উচ্ছে, বেগুন আর পটল বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাসের একেবারে গোড়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুলোর মূলোৎপাটনে বাঙালির তেমন গা নেই গা! এমন কি উচ্ছের তরকারি করতে গেলেও পটলের প্রয়োজন পড়ে না। মুলো বেগুনেই হয়ে যায়। তাহলে?  তাহলে আর কি? মুলোটা আমাদের বাজারের থলি থেকে উঠে একটু নাক উঁচু করে থাকুক। উচ্ছে বেগুন আর পটল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি হয়ে গেলে তারপর না হয় দেখব! কী বলেন?

উচ্ছে:

এই যে আমার দাঁত ছরকুটে চেহারা, কপালের হরধনু কভু ভঙ্গ নাহি হয়। আর মুখেও একদম মিশমিশে তিতকুটে ভাব। এসব জানেন তো ছেলেবেলা থেকে তেতোখাবার শখের কারণে হয়েছে। উচ্ছে আর করলা, চিরতা আর নিমপাতা, বাসক পাতা আর থানকুনি। অবশ্য শেষ দুটোকে তেতো বলে দেওয়া যায় না। কিন্তু কসটা তো বটেই। তা এসব ছাইপাঁশ খেয়ে পাঁচ ফুট এগারো হয়েছি যখন তখন এটাই ভবিতব্য ছিল।

উচ্ছে

ছেলেবেলার ছড়াই ছিল:

বড় হলে করলা ছোট হলে উচ্চে!
কে তোমাকে দিচ্ছে?

তা তখন দেবার মানেটা অনেক নির্মল ছিল। এখনকার মতন নয়। সে যাউক গে গিয়া। করলা বা উচ্ছে যাকে বিলাইতি ভাষায় Bitter gourd বা Bitter Melon বলে তার কৌলীন্য এবং উপকারিতা নিয়ে আগে ঘুরে আসি চলুন। এই তিক্ত কুমড়ো বা তিক্ত তরমুজ সম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণ ভাবে ভারতীয় উৎপাদন। মাত্র চতুর্দশ শতাব্দীতে এটিকে চীন দেশে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তারপর তো অন্যান্য দেশ রইলই।

একটা চমকপ্রদ তথ্যও দিই। ভারতে শুধুমাত্র বঙ্গদেশেই এই তিক্ত ফলটির তিক্ততা বজায় রেখে ব্যবহৃত হয়। অন্যত্র এর যারপরনাই ব্রেনওয়াশ চলে যাতে করলা সমস্ত তিক্ততা ভুলে যেতে পারে। অবশ্য পূর্ব এশিয়া বা মধ্য অ্যামেরিকাতে এর তিক্ততা বজায় রেখেই মোকাবিলা করা হয়। কিন্তু সে তো পরের গল্প। তার আগে আসুন বঙ্গ দেশের দুটি রেসিপি নিয়ে খেলা শুরু করি।

একটা সাদামাঠা উচ্ছে চচ্চড়ি। পাঁচফোড়ন শুকনো লঙ্কা দিয়ে তারপর উচ্ছে/ করলা, মুলো, বেগুন, শিম ইত্যাদি তাতে সাঁতলে নিয়ে উচ্ছে চচ্চড়ি। পূব বাংলায় অবশ্য এতে কুমড়োও ব্যবহৃত হয়।

আর তার পরেরটি হল তেতোর ডাল। তার আবার রেসিপি কি? মুগ ডালেও হয় আবার মুশুর ডালেও। ডাল সিদ্ধ করে উচ্ছে ভেজে নিয়ে সেই তেলে ফোড়ন দিলেই হল।

এসব ছাড়াও রয়েছে লেবু বিটনুন ধনেপাতা কাঁচালংকা দিয়ে উচ্ছে সিদ্ধ মাখা। সে তো আর রেসিপির দরকার নেই। এমনিতেই মহার্ঘ বস্তু।

এবারে বরং আমরা একটু এদিক ওদিক যাই। প্রথমেই রাজস্থান। বছর বারো আগে আমার এক রাজস্থানি সহকর্মী রঘুবীর সিং  এই কালো মতো জিনিসটা অফিসে লাঞ্চে আনতো আর আমি আমার লাঞ্চ ফেলে রেখে হাপুস নয়নে তাই খেতাম রুটি দিয়ে। জিজ্ঞাসা করলে জানলাম এটা তার নানীর রেসিপি। করলাকে ভাল করে ছুরির ভোঁতা দিক দিয়ে স্ক্র্যাপ করে নিয়ে নিয়ে লম্বা লম্বা করে কেটে বীজ ছাড়িয়ে প্রথমে ঈষদুষ্ণ নুনজলে ভিজিয়ে রাখা ঘণ্টা খানেক। তারপর তা জল থেকে তুলে নিয়ে শুকনো খবরের কাগজের উপর রেখে রোদে শুকিয়ে নেওয়া। ধনে, জিরে হালকা খোলায় নেড়ে নিয়ে তা মিহি করে বেটে নিতে হবে। এর পর তেল গরম করে তাতে কালোজিরে, মৌরি আর হিং ফোড়ন দিয়ে শুকনো করলার টুকরোগুলো তেলে ছেড়ে নাড়তে নাড়তে শেষে ধনে জিরে বাটা, হলুদ আর লাল লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে শুকনো ভাবে রান্না করতে হবে। শেষে আমচুর দিয়ে ভাল করে মাখিয়ে নিয়ে নামিয়ে নেওয়া। শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে রুটির সঙ্গে একদম অমৃতর মত খেতে লাগবে পাক্কা।

ভরওয়াঁ করেলা

করলা নিয়ে কথা বলতে গেলে দুটো সর্বভারতীয় রেসিপি ছাড়া কখনই চলবে না। একটা হল ভরওয়াঁ করেলা। এটি উত্তর ভারতের রেসিপি। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখণ্ডী রেসিপি এটি। গোটা করলাগুলিকে খোসা ঘষে সবুজ অংশ বার করে নিয়ে পেট চিরে, ছুরি বা চামচ ঢুকিয়ে বীজগুলি বার করে ফেলে দিন। পেঁয়াজ কুচি তেলে ভেজে তাতে আদা রসুনের পেস্ট দিয়ে করলার খোসার সবুজ অংশের অর্ধেক নিয়ে ভাল করে ভেজে তাতে নুন হলুদ লঙ্কা গুঁড়ো, আমচুর এবং ধনে গুঁড়ো দিয়ে ভাল করে নেড়ে নিয়ে ঠাণ্ডা করে তা করলার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে সুতো পাকিয়ে বেঁধে দিন। এবারে পেটভর্তি করলাগুলি ছাঁকা তেলে কুড়মুড়ে করে ভাজুন। এবার গ্রেভির জন্য পেঁয়াজ আদা রসুন, করলার সবুজ অংশের বাকিটা, আমচুর, ধনেগুঁড়ো, হলুদ নুন আর লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে তেলে ভাল করে সাঁতলে নিয়ে ভাজা ভরা করলাগুলিকে তার মধ্যে বসিয়ে দিয়ে ঢিমে আঁচে ঢাকা দিয়ে রান্না করুন, যতক্ষণ না করলার পেটে রস ঢোকে। তারপর আর কি, পরিবেশন করে ফেলুন মার্কেট থেকে খুশবু উড়ে যাবার আগেই।

এর পর স্বাভাবিক ভাবেই দক্ষিণ ভারতে যেতে হয়। করলাগুলিকে ঈষদুষ্ণ নুন জলে ভিজিয়ে তারপর খোসা ঘষে নিয়ে লম্বা লম্বা কেটে আবার নুন মাখিয়ে রেখে দিন মিনিট পনেরো। তারপর ভাল করে ধুয়ে নিন। আদা রসুন বেটে রাখুন, তেল গরম করে তাতে শুকনো লঙ্কা, সাদা তিল, জিরে, ধনে নেড়ে নিয়ে ঠাণ্ডা করুন। তারপর গোটা মশলাগুলি গ্রাইণ্ড করে পাউডারে পরিণত করুন। এবারে তেল গরম করে করলার টুকরোগুলো দিয়ে মিনিট পাঁচ সাত সাঁতলান। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে লাল করে নিন। আদা রসুনের পেস্ট দিয়ে নাড়তে থাকুন। শেষে গুঁড়ো করা মশলা, গুড় আর তেঁতুলের ক্বাথ দিয়ে নেড়ে নিয়ে জল দিয়ে অল্প আঁচে মিনিট পাঁচ রেখে নামিয়ে ফেলুন। ব্যাস অন্ধ্র স্টাইল কাকরাকায়া ভেপুড়ু রেড্ডি... এরর মানে রেডি বা তৈরি।

আচ্ছা করলা নিয়ে তো দেশ ভ্রমণ করলাম। তা বিদেশে যাবেন নাকি? করলা আদতে ভারতীয় হলেও পূর্ব এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া কিন্তু তাকে নিজেদের কিচেন সাম্রাজ্যে স্থান দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় তেলে সাঁতলে নিয়ে নারকেলের দুধ মাখিয়ে করলা স্যালাড হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ভিয়েতনামে ভরওয়াঁ করলায় পর্কের কিমা দিয়ে তাকে স্টিম করে স্যুপে বা এমনিই খাওয়া হয়। থাই রান্নায় ছোট ছোট কিন্তু বিকট ঝালের বার্ডস আই লঙ্কার সঙ্গে ফিশ সস দিয়ে করলা রান্না হয়। আর চীনে তো ঝাল লঙ্কার সঙ্গে মজানো সয়া সস বা শ্রিম্প পেস্ট ব্যবহার করে করলা রান্না হয়।

আসুন নিজের মতো করে একটা রেসিপি করে আপনাদের খাওয়াই তাহলে। করলাগুলিকে লম্বালম্বি অর্ধেক করে তার থেকে বীজ বার করে দিন। পর্কের কিমার (চিকেন বা মাটনও চলবে) সঙ্গে আদা কুচি, চিনি, নুন আর রাইস ওয়াইন মিশিয়ে ম্যারিনেট করুন। ডার্ক সয়া সস, রসুন, নুন চিনি, ফিশ সস এবং রাইস ওয়াইন মিশিয়ে আলাদা রাখুন। সামান্য জলে কর্নফ্লাওয়ার গুলে রাখুন। পর্কের কিমা হালকা তেলে ঢাকা দিয়ে নেড়ে রাখুন সাদাটে হওয়া পর্যন্ত। এবারে একটি চওড়া কড়াইকে গরম করে তেল দিয়ে তাতে করলাগুলি ছেড়ে ভালো করে নেড়ে ভাজাভাজা করুন। সসের মিশ্রণটি ঢেলে ভাল করে নাড়তে থাকুন। সামান্য পড়ে গোলা কর্নফ্লাওয়ার দিন এবং নাড়তে নাড়তে কিমার মিশ্রণটি দিন। পর্ক সিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত ভাল করে নেড়ে মেশাতে থাকুন এবং গরম গরম পরিবেশন করুন। এমনিও খেতে পারেন বা পাতলা রাইস নুডলস সঙ্গে নিয়েও।

দেখুন একটা সোজা কথা আপনাদের সামনাসামনি বলেই ফেলি। আমার নিজস্ব মতামত, করলাকে যদি তিক্ততা ভুলে খাওয়া যায় তাহলে স্বাদের দিক থেকে এর কোন জুড়ি নেই। অবশ্য আমি জানি যে অধিকাংশের কাছেই করলা করালবদনীর রূপে হাজির হয়, তাই এবার পরের সবজিতে চলে যাই, ঝামেলা না বাড়িয়ে।

বেগুন- আগে একটা খাজা পদ্য দিই। নাম দরকার নেই, তাহলে আর খাজা বলার জন্য আমার জান প্রাণের লোকসান হতে পারে। শুনুন তাহলে:

বেগুন বেগুন
আমার গায়ে দিচ্ছ আগুন?
ঝলসে যাওয়া খোসা ছিলে,
তেল নুন লঙ্কা দিলে,
অবশেষে চটকে দিলে!
আহা, আপনার কত গুণ
বলুন দাদা, আমি কি বেগুন?

কবিতা নিয়ে কোন আলোচনা নয়। সোজাসুজি আলাপে যাই। বেগুন, ব্যায়ঙ্গন, অউবারজিনি, ব্রিঞ্জাল, এগপ্ল্যান্ট, যে নামেই ডাকুন না কেন, কোন গুণ নাই যার কপালে বেগুন। বস্তুত বাঙালিকে বেগুন দিলেই সে হয় বড় বড় করে কেটে হলুদ নুন, পোস্ত চিনি, লঙ্কা মাখিয়ে ভাজা করবে, নাহলে পাতলা পাতলা করে কেটে বেসনে একটু খাই সোডা নুন, হলুদ, ধনেগুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, কালোজিরে, আর কাঁচালঙ্কা কুচি গুলে ডুবিয়ে বেগুনি করবে, অথবা কচি কচি নিমপাতা বা মেথিশাক দিয়ে নিম বেগুন বা মেথি বেগুন করবে, কিংবা সর্ষে বাটায় টমেটো, কাঁচালঙ্কা, নুন হলুদ দিয়ে ঝাল করবে, বা সর্ষের পরিবর্তে দই দিয়ে দই বেগুন করবে না হলে নিদেন পক্ষে বেগুন পুড়িয়ে খোসা ছাড়িয়ে কাঁচা পেঁয়াজ, আদা কুচি, টম্যাটো, ধনেপাতা কাঁচা লঙ্কা আর সর্ষের তেল দিয়ে মেখে বেগুন পোড়া বা স্যাঁকা। বিভিন্ন রকমের ঝোলে বা চচ্চড়িতে বেগুনের ব্যবহারকে ধরলামই না কারণ সেক্ষেত্রে বেগুন তো মুখ্য সবজি নয়।

এইযযা বলতে বলতে তো বেশ কয়েকটা রেসিপি বলেই দিলাম। তাইলে আর বাকি রইল কি? রইল রইল। বেগুনের গল্প বলতে গেলে ভূমধ্যসাগরকে না আনলে তো বিশ্বক্যুজিনই সম্পূর্ণ হয় না। আর বাগায়রা বেঙ্গন?

তাহলে শুরু করি না হয়। যদিও প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই বেগুন চাষ হচ্ছে পূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহতে, তবুও বেগুন গাছের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় ৫৪৪ খৃষ্টাব্দে ‘ক্যুইমিন ইয়উসু’ (জনপরিষেবার প্রয়োজনীয় পদ্ধতি) নামক একটি চুক্তি পত্রে, যা উত্তর ওয়ায়েই রাজত্বে জিয়া সিক্সেই নামক এক অফিসার দ্বারা লিখিত হয়েছিল। বিভিন্ন আরবী পত্রে এর উল্লেখ এবং গ্রীক বা রোমান টেক্সটে এর অনুল্লেখ এটি নিশ্চিত করে যে মধ্যযুগ পর্যন্ত বেগুনের ব্যবহার ইউরোপে হয় নি কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে বেগুন ইতিমধ্যেই এসে গিয়েছে। প্রথমবারের জন্য ইউরোপে, ইসলামী স্পেনে ইবন-অল- আওয়ামের লেখায় বেগুন বা অউবারজিন চাষের কথা দেখা যায় দ্বাদশ শতাব্দীতে। কিন্তু তারপরেও বেগুন বা তার গাছকে ইউরোপীয়রা নিজেদের করে নিতে কুণ্ঠা বোধ করত। এমনকি ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইতালীয় লোকগাথায় বেগুন গাছকে মানসিক ভারসাম্য বৃদ্ধির কারণ হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।

যাই হোক এইসব পুরাতত্ত্ব পড়ে বা শুনে কে কবে বড়লোক হয়েছে? বেগুনকে রাজা বানিয়েছে তার সবুজ কাঁটার মুকুট আর তার অবিসংবাদিত রঙ এবং স্বাদ। ভারতের বিভিন্ন কোণে বেগুনকে নিরামিষ রান্নার ক্যাটালিস্ট হিসাবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ গোটা বেগুন নয়, বেগুন ঝোলের মধ্যে দিয়ে তার টেক্সচার ও স্বাদে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেমন তামিল সম্বর, ওড়িয়া ডালমা এবং সিন্ধ্রি ধনশক। অবশ্য ধনশককে কখনই নিরামিষের পর্যায়ভুক্ত করা যায় না। তবুও ছোলার ডালের সঙ্গে বেগুন আর কুমড়োর মিশ্রণ মাটন বা চিকেনকে স্বাদোত্তীর্ণ করেছে অবশ্যই। 

অবশ্য উত্তর ভারতে, বিশেষত পাঞ্জাবী রান্নায় প্রেশারে সিদ্ধ করা বা পোড়ানো বেগুনকে আদা পেঁয়াজ রসুন কাঁচালঙ্কা টম্যাটো জিরে ধনে গরম মশলা গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে কষে বেগুন ভর্তাকে বেগুনের একমাত্র অবতার বলেই চালানো যায়।

বাগায়রা ব্যায়ঙ্গন

তবে সেটা নিয়ে বেশি কথা না বলে আসুন দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদের একমাত্র বলার মতো নিরামিষ একটি রেসিপি দিই। বাগায়রা ব্যায়েঙ্গন। কিছু না, লম্বা বিচি কম বেগুন (একটু টিপলেই বুঝবেন নরম কিন্তু ঠাস হলে বিচি কম হবেই। গ্যারান্টি) লম্বালম্বি চিরে তেলে উপরটা চকচকে এবং ভিতরটা নরম হওয়া পর্যন্ত ভেজে নিন। এরপর শুকনো খোলায় নারকেল কোরা, ধনে, জিরে আর তিল একসঙ্গে নেড়ে নিয়ে জল দিয়ে গ্রাইণ্ড করে পেস্ট তৈরি করুন। কড়াইতে তেল দিয়ে পেঁয়াজ, আদা, রসুন নাড়ুন পেঁয়াজ স্বচ্ছ হওয়া পর্যন্ত। কারি পাতা আর মশলা পেস্টটি এতে দিয়ে নাড়তে থাকুন। হলুদ, নুন, লঙ্কা গুঁড়ো আর তেঁতুলের ক্বাথ দিন। ভাজা বেগুনগুলি দিয়ে এপিঠ ওপিঠ ভালো করে মেশান। সামান্য জল দিয়ে অল্প আঁচে ঢাকা দিয়ে রান্না করুন মিনিট পাঁচেক। ব্যাস, বাগায়রা ব্যায়ঙ্গন তৈরি।

এবারে একটা কন্নড় রেসিপি। ভেঙ্গি ভাত। ভেঙ্গি ভাতের মশলার জন্য ছোলার ডাল, বিউলির ডাল, শুকনো লঙ্কা, ধনে, গোল মরিচ এবং নারকেল কোরা নিয়ে রোস্ট করে গ্রাউন্ড করে রাখুন। বাসমতী চাল জলে ভিজিয়ে রাখুন মিনিট পনেরো। তারপর ফুটন্ত জলে চাল দিয়ে সিদ্ধ করে নিন। বেগুন ডুমো ডুমো করে কেটে, তেল গরম করে তাতে হিং, সর্ষে, বিউলির ডাল, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে তারপর বেগুনগুলি ভাজুন। কাঁচা লঙ্কা কুচি, আদা কুচি নুন ও হলুদ দিন। সামান্য ভাজা ভাজা হলে গুঁড়ো করা মশলা দিন। বেগুন নরম হয়ে এলে টম্যাটো কুচি দিয়ে নাড়তে থাকুন। বেগুন সিদ্ধ হয়ে গেলে তাতে রান্না করা ভাত দিয়ে ভাল করে হালকা হাতে মিশিয়ে দিন। বেগুন বা ভাতের চাল যেন ভেঙে না যায়। এবারে আর কি গরম গরম পরিবেশন করার আগে ধনেপাতা ছড়িয়ে দিন।

এবারে উপরে যে অত আরবী ফারসী নিয়ে বাতে মারলাম। সেখান থেকে একটা কিছু হবে না? ‘বাবা গনুস’ নাম শুনলেই কেমন ছেলেবেলার ম্যানড্রেকের ইন্দ্রজাল কমিক্স অথবা গুগাবাবার বরফি জাদুগরের কথা মনে পড়ে। সে যাই হোক। এই আরবী বা পশ্চিম এশিয়ার ডিশ বা ডিপটি বানাবার জন্য বেগুন পুড়িয়ে খোসা ছাড়িয়ে তাতে রসুন, লঙ্কা, পার্শলে, তিল, পেঁয়াজ, টম্যাটো আর তেল দিয়ে সবটা ব্লেন্ডারে মিশিয়ে উপরে কয়েক কুচি পার্শলে ছড়িয়ে দিন। আর গরম গরম পেটা ব্রেড, রুটি অথবা ব্রেড দিয়ে খেয়ে নিন। অবশ্য কাবাব বা পরোটা দিয়েও খেতে ভালো লাগে বলেই মনে হয়।

দিল্লিতে একটা লেবানিজ রেস্তোরাঁ ‘জোহো’তে মাটন কাবাব বাবা গনুশ দিয়ে খেতে মজাই লেগেছিল।

এবারে ভূমধ্যসাগরে চলে যাই বরং। যে ইতালীয় রন্ধ্রণশৈলীর কথা বারবার এসেছে বেগুনের প্রেম বিরহের গল্পে, সেখানে। ইউরোপের খানপানে ইতালীয় পেস্তো সসের খুব কদর। একটা হয় রসুন আর বেসিলের আর আরেকটা রসুন আর টম্যাটোর। রঙও তথৈবচ। পাইন নাট (প্রকারান্তরে চীনে বাদাম), রসুন বাটা, বেসিল বা তুলসি পাতা, নুন আর মরিচ, মাখন আর পারমেজান চীজ। প্রথমে বাদাম এবং রসুন, তারপর বেসিল পাতা এবং অলিভ অয়েল, তারপর নুন এবং মরিচ এবং সব শেষে মাখন এবং পারমেজান চীজ দিয়ে ব্লেন্ড করুন। আপনার বেসিল পেস্তো প্রস্তুত।

এবারে গোল বেগুন থেকে পাতলা পাতলা পিস কেটে নিন। ডিমে ডুবিয়ে নিয়ে একদিকে গ্রেট করা চীজ লাগান। এরপর অলিভ অয়েল গরম করে বেগুনের পিসগুলি হালকা ভেজে নিন। এরপর একটি বেকিং ট্রেতে অলিভ অয়েল দিয়ে বেগুনের পিসগুলি রেখে তারুপ্র পেস্তো সস দিয়ে তার উপরে রিং করে কাটা অলিভ দিন। এইভাবে একাধিক স্তর তৈরী করে ওভেনে বেক করুন পেস্তো সস তেল ছাড়া পর্যন্ত। ব্যাস চীজ ও পেস্তো বেগুন তৈরী।

আরেকটা হল গ্রিল্ড অউবারজিন পার্সেল। বেগুনির মতো করে বেগুন কেটে তাকে উষ্ণ নুন জলে দু মিনিট ফুটিয়ে নিন। তারপর কিচেন ন্যাপকিনে রেখে শুকিয়ে নিন। এবারে দুটি করে বেগুনের টুকরো কোণাকুণি এক্সের মতো রাখুন তার উপরে টমেটোর স্লাইস দিন। একটু নুন ও মরিচ, চীজের স্লাইস রেখে তার উপর একটি বেসিল পাতা রাখুন। টমেটোর স্তর আরেকবার দিয়ে এবারে বেগুনের স্লাইসগুলি চারদিক থেকে এর উপর মুড়ে পার্সেলের মতো বানিয়ে উলটে রাখুন। মিনিট কুড়ি ঠাণ্ডা করুন। এবারে টম্যাটো, বালসামিক ভিনিগার, অলিভ অয়েল এবং লেবুর রস দিয়ে একটি পেস্ট তৈরী করুন। গ্রিল গরম করে অলিভ অয়েল তুলি দিয়ে পার্সেলগুলির উপর ভাল করে মাখিয়ে পার্সেলগুলি গ্রিল করুন। শেষে গ্রিল করা পার্সেলগুলির উপর পেস্ট দিয়ে তাতে রোস্টেড তিল এবং বাদাম টুকরো আর বেসিল পাতা ছিঁড়ে ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

এবারে পটল। পটলের শুরুতেই একটু নাম সংকীর্তন করে নিই বরং। কারণ এই একটি আনাজ আমি এক্কেরে পছন্দ করতাম না ছোটবেলায়। এখনও যে করি তা তো নয়, তবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শিখে গেছি বটে। যাই হোকঃ

মধূর বাঁশির সুর শোনো হে বড়াই
সে-কাহিনী তোমাকে শোনাই ॥
চাটনি রাঁধায় আমি তেল-ঝাল দিই।
শাক রেঁধে জল ঢেলে নিই ॥
বাঁশির শব্দে শুধু রাঁধা থেমে যায়।
কানুসখা বংশী বাজায় ॥
সে-সুরে পটল ছাড়া রাঁধি যে সুপারি।
মনটাকে বাঁধতে না পারি ॥
টক লেবু চিপে রস নিমঝোলে দিই।
বিনা জলে চাল ফেলে নিই ॥
যমুনার তীরে আছে কদমের গাছ।
সেইখানে কৃষ্ণের আজ
বাঁশি বাজে, সেই সুরে কান্দে পরান।
সখি তাকে তাড়াতাড়ি আন ॥
এ-জীবন রাখা দায়, প্রাণের বড়াই।
বড়– বলে, আমি গান গাই ॥

এটা পঞ্চদশ শতকের কবি বড়ু চণ্ডীদাসের কলম। তা তখনও পটল গজগজ করে বিরাজমান। বস্তুত পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বাঙালির খাওয়া দাওয়া দেখতে গেলে কুমড়ো, লাউ এবং পটলের আধিক্য। তা পূর্ব ভারত ছাড়া যে সেই পটলের কৌলীন্যও নেই। তবুও দু চারটে রেসিপি তো দেওয়াই যায়। ছেলেবেলার পটল চেরার মধ্যে একমাত্র পছন্দের ছিল বুড়ো পটলের পেট কেটে ডিজাইন করে তার ভাজা। তবে রেসিপি দিতে গেলে সত্যি সত্যিই দিতে হয় দোলমা পটলের।

দোলমা পটল

পেট মোটা পটলের গায়ের ছাল ঘষে নিয়ে, গলা আড়াআড়িভাবে কেটে চামচ দিয়ে তার পেট পরিষ্কার করে হালকা নুন জলে ভিজিয়ে রাখুন, কাটা মাথা সমেত। অন্য দিকে মাংসের কিমা/ মাছ/ আলু সিদ্ধ নারকেল কোরা আর ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে পুর করতে পারেন। যাই দিয়েই করুন না কেন, তাকে ভাল ভাবে রান্না করে নিতে হবে। মাংসের কিমা হলে দই নুন হলুদ দিয়ে ম্যারিনেট করে পেঁয়াজ লঙ্কা কুচি আদা রসুন বাটা কসে কিমা দিয়ে তাকে ঢিমে আঁচে কষে শেষে গরম মশলা দিয়ে নামিয়ে নিন। মাছ হলে বাকি সব একই থাক তবে মাছের সঙ্গে সামান্য সিদ্ধ আলু এবং কিসমিস মন্দ হবে না। নিরামিষ হলে নারকেল এবং আলু সিদ্ধ আদা জিরে দিয়ে কষে নিয়ে টম্যাটো বাটা দিয়ে নেড়ে নিন। এবার পুর ভরুন পটলের পেটে। কাটা মাথাটাকে জুড়ে দিন একটি খড়কে কাঠি বা টুথপিক দিয়ে। তারপর ডুবোতেলেও ভাজতে পারেন অথবা কম তেলে সাঁতলে নিতে পারেন। আর গ্রেভির জন্য জিরে শুকনো লঙ্কা লবঙ্গ দারুচিনি এলাচ তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে আদা জিরে গুঁড়ো দিয়েও করতে পারেন অথবা পেঁয়াজ আদা রসুন। তারপর গ্রেভিতে জল ঢেলে মুখ বন্ধ পটলগুলো হালকা আঁচে রস ভিতরে ঢুকতে দিন। আর গরম গরম পরোটা, রুটি বা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন। 

ক্ষীর পটল

পরের রেসিপিটা ক্ষীর পটলের। কন্ডেন্সড মিল্ক, কিসমিস, কাজু আর খোয়া ক্ষীর একসঙ্গে মিশিয়ে পটলের পেট চিরে বীজ বার করে খোসা ঘষে ছাড়িয়ে  পুর ভরে চিনির রসে হালকা আঁচে বসিয়ে দিয়ে তিন চার মিনিট। তারপর তুলে ঠাণ্ডা করে পরিবেশন করুন। রূপালি তবক টবক লাগাবার কথা থাকে বটে, কিন্তু স্বাস্থ্যের কারণে আমি তার ঘোরতর বিরোধী। তাই লাগাতেও বললাম না। অবশ্য এর একটা সাদা ভ্যারাইটি পাবনা জেলার খুবই বিখ্যাত।  

পাবনার ক্ষীর পটল

পটল নিয়ে আরও অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলতেই পারে। তবে আমি একটা দিতে পারি। পটলের গা ছেঁচে নিয়ে লম্বা লম্বি অর্ধেক করে কেটে বীজ পরিষ্কার করে সামান্য নুন জলে ভিজিয়ে রাখুন। অপর দিকে দোলমার মতো পুর তৈরী করুন। শুধু গরম মশলার জায়গায় ইতালীয় বা কন্টিনেন্টাল মশলা (এখন মিক্সড হার্বস পাওয়া যায়) ব্যবহার করুন। পটলের নীচের দিকটা হালকা কেটে নেবেন যাতে তা বসাবার উপযুক্ত হয়। এরপর পটলে পুর ভরে তাতে পারমেজান চীজ উপর থেকে গ্রেট করে অলিভ বা সাদা তেল মাখিয়ে ওভেনে বসান ১৭৫ ডিগ্রীতে মিনিট তিনেক। অথবা মাইক্রো করে নিন। বিলাইতি দোলমা তৈরী।

আমাদের এই সহজপাঠের যাত্রায় শেষ ধাপটি হল মুলো। এ যে কি হতচ্ছেদ্দা করা সবজি সে আর কি বলব। বস্তুত রবীন্দ্রনাথও যদি মুলোর জায়গায় লাউ লিখে যেতেন তাহলে কি ভালটাই না হত।

উচ্ছে বেগুন পটল ও লাউ
বেতের বোনা ধামাও ফাউ...

এরকম কিছু! সে যাক গে কবির উপরে কেউ নই তাই মুলো নিয়ে সন্দেহ অমূলক করে নেমে পরি মুলোদ্ধারে।

যদিও মুলো শুনলেই মনে হয় এটি ইউরোপীয় বা অ্যামেরিকিয় সবজি, তা কিন্তু নয়। যদিও গ্রীক এবং রোমানদের মধ্যে মুলো খাবার চল ছিল, তবুও নৃতত্ত্ববিদরা মুলোর উৎপত্তিস্থল হিসাবে চিহ্নিত করেছেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াকেই। এর পরে ভারত চীন এবং মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে মুলো এবং ধীরে ধীরে ইউরোপ। সে খৃষ্টপূর্বাব্দের কথা।

যাই হোক মুলো এখন নানান বর্ণে এবং আকারে বর্তমান। উত্তর ভারতে যেমন সাদা মুলো তেমনই পূর্বভারতে লাল লম্বা মুলো পাওয়া যায়। মধ্য প্রাচ্য এবং ইউরোপে আবার সেই মুলোই লাল কিন্তু গোলাকারে পরিণত হয়। তবে এর জন্মস্থানের কাছাকাছি একটি বিশেষ প্রকারের মুলো পাওয়া যায়, ডাইকিন। যা পরিপক্ক হতে অনেক সময় নেয় কিন্তু রন্ধ্রণোপযুক্ত তেল নিষ্কাশনে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য তেল বলতে একটা কথা জানানো জরুরী। যে বায়োফুয়েল বা বায়োডিজেল নিয়ে আজ বাজার সরগরম, যা কি না ভবিষ্যতে পেট্রল ডিজেলকে হটিয়ে বাজার দখল করতে চলেছে, জর্জিয়া এবং অন্যান্য পূর্ব ইউরোপের দেশে মুলোর তেলকে বায়োফুয়েল হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা জোরদার চলছে।

মুলো নিয়ে সেই র‍্যাডিশ উইদ মোলাসেসের গল্পটা মনে আছে? তারাপদ রায়ের কাণ্ডজ্ঞানে? সেই ফরাসী দেশ থেকে এক পর্যটক বিকেলের দিকে রেস্তোরাঁয় হানা দিয়েছেন, আর ভাঁড়ারে কিছু নেই, শুধু কটা লাল মুলো আর ভেলি গুড় পড়ে আছে। তা পাচক সেই মুলোটিকেই যত্ন করে গোল গোল কেটে তার উপরে নুন মরিচ ছড়িয়ে শেষে গুড় দিয়ে ম্যানেজ করলেন। নাম দিলেন ‘ র‍্যাডিশ উইদ মোলাসেস’। সে নাকি পরবর্তীকালে ফরাসী দেশের প্যারীতে মিচেলেন হ্যাট একটি রেস্তোরাঁর জনপ্রিয় ডিশে পরিণত হল। সে সত্য বা মিথ্যা যাই হোক।

মুলোর আচার

সে যা হোক যদিও বাঙালী রান্নায় মুলোর ব্যবহার মুলো ছেঁচকি এবং মুলো শাকের মূল ডিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অ্যাসেম্বল্ড ডিশে স্বচ্ছন্দে মুলোর ব্যবহার হয়ে থাকে। ঘণ্ট, চচ্চড়ি ইত্যাদিতে যথেষ্টভাবে ব্যবহৃত। বিশেষত পালং শাকের ঘণ্ট তো মুলো ছাড়া অচল। তবে উত্তর ভারতের সাদা মুলো মূলত, মুলিকা পরান্ঠা এবং স্যালাডেই ব্যবহৃত। সে সবের রেসিপি তো একটু বই বা নেট খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। তবে স্যালাডের মুলোকে যদি পাতলা পাতলা করে কেটে চিলি ভিনিগারে ভিজিয়ে রেখে, পরে আচার হিসাবে ব্যবহার করেন তাও বেশ উপাদেয় হয়ে ওঠে।

এছাড়াও মুলো দিয়ে বিভিন্ন প্রকার স্যালাডই হয়। সে সব থাক, আসল কথাটায় আসা যাক। সত্যিই কি উচ্ছে বেগুন পটল মুলো একসঙ্গে কিচ্ছুটি হবে না? শুধু সহজ পাঠ্য হয়েই থাকবে? যাহ, তা কি হয় নাকি? কি যে বলেন! তাহলে আর বাঙালির ঘরে ঘরে বিশেষ একটি পদ এতকাল ধরে জনপ্রিয় হয়ে থাকত না।

শুক্তো অথবা শুক্তুনি। অবশ্য শুক্তোতে উচ্ছের জায়গায় অন্য যে কোন তিক্ত সবজিই পড়তে পারে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় মাঝি মাল্লারা নৌকাযাত্রার সময় মুলো, পেঁপে, শিম, ডাঁটা এসব সবজি শুকিয়ে নিয়ে যেতো সবগুলো দিয়ে রান্না করে ঝোল করে খাবার জন্য। তাতে তিক্ততার লেশমাত্র থাকত না অবশ্য। শুকনো সবজি থেকেই শুক্তোর আবির্ভাব। অবশ্য পদ্মপুরাণে বেহুলার বিয়ের নিরামিষ খাবারের মধ্যে শুক্তোর উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলেও বাইশ রকমের নিরামিষ পদের মধ্যে শুক্তুনিকে পাওয়া যায়।

শুক্তো

সেকালে 'শুক্তা' রান্না করা হত- বেগুন, কাঁচা কুমড়ো, কাঁচকলা, মোচা এই সবজিগুলি গুঁড়ো বা বাটা মসলা অথবা বেসনের সঙ্গে বেশ ভালো করে মেখে বা নেড়ে নিয়ে ঘন 'পিঠালি' মিশিয়ে রান্না করা হত। পরে হিং, জিরা ও মেথি দিয়ে ঘিয়ে সাঁতলিয়ে নামাতে হত।

মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণবসাহিত্যে এই রান্নাটির বহুবার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে 'শুক্তো' বলতে যেমন উচ্ছে, করলা, পল্‌তা, নিম, সিম, বেগুন প্রভৃতি সবজির তিক্ত ব্যঞ্জনকে বোঝায়, প্রাচীনকালে তা ছিল না। একালের শুক্তোকে সেকালে 'তিতো' বলা হত।

কিন্তু 'চৈতন্যচরিতামৃতে' সুকুতা, শুকুতা বা সুক্তা বলতে একধরণের শুকনো পাতাকে বলা হয়েছে। এটি ছিল আম-নাশক। সম্ভবত এটি ছিল শুকনো তিতো পাটপাতা। রাঘব পণ্ডিত মহাপ্রভুর জন্য নীলাচলে যেসব জিনিস নিয়ে গিয়েছিলেন তার মধ্যে এই দ্রব্যটিও ছিল।

আবার 'সুকুতা' বলতে সেই সময় শুকনো শাকের ব্যঞ্জনকেও বোঝাত।

সে যাই হোক, বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্তোর রেসিপি দিয়েই এ যাত্রা শুক্তোর বিবরণ শেষ করি। এ আবার যে সে রেসিপি না। বিশ্বকবির প্রিয় ‘দুধ শুক্তো’। কাঁচকলা, কাঁচা পেঁপে, বেগুন, পটল, ঝিঙে, শিম, উচ্ছে, সজনে ডাঁটা, মুলো, রাঙালু ডুমো ডুমো করে কেটে রাখুন। সর্ষে আর পোস্ত ভাল করে বেটে পেস্ট করে রাখুন। বিউলি ডালের বড়ি তেল গরম করে ভেজে তুলে নিন। তাতে উচ্ছে/ করলা দিয়ে ভেজে নিয়ে তুলে নিন। এরপর তেল গরম করে পাঁচফোড়ন, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা এবং আদা কুচি ফোড়ন দিয়ে তাতে বাকি সবজিগুলি দিয়ে ঢিমে আঁচে সিদ্ধ করে নিন। সবজি নরম হয়ে এলে তাতে আন্দাজমতো জল ঢেলে নাড়তে থাকুন। জল শুকিয়ে এলে সর্ষে পোস্ত বাটা দিয়ে পুরোটা মাখিয়ে নিয়ে তাতে বড়ি এবং উচ্ছে দিয়ে দুধ ঢালুন। নুন এবং চিনি স্বাদানুসারে দিয়ে নামাবার আগে ঘি দিয়ে নামিয়ে নিন। তারপর গরম ভাতে অমৃতকুম্ভের সন্ধানে যান।

কবি দিয়ে শুরু আর কবি দিয়েই শেষ। ফিসফাস কিচেনের দ্বিতীয় ইনিংসের ওপেনিং ওভারগুলিতে আশা করি আপনাদের পছন্দসই খেলা দেখানো গেল। বাকীগুলোও ধীরে ধীরে আসবে। সঙ্গে থাকুন। যেমন আগেরবার ছিলেন। দেখা হচ্ছে শীঘ্রই।   


লেখক পরিচিতি: লেখক ভারত সরকারের আধিকারিক। অধুনা দিল্লিবাসী এবং নিয়মিত বাংলা ব্লগার। খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে ফিসফাস কিচেন-১ ইতিমধ্যেই সৃষ্টিসুখ থেকে গত বইমেলায় প্রকাশিত। এটি দ্বিতীয় মরশুম। এছাড়াও লেখকের আরও তিনটি গদ্য-গল্পের বই রয়েছে।                  

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.