অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

জুলাই ১৫, ২০১৭

 

ফিসফাস কিচেন- আম রাজত্ব

সৌরাংশু

কদিন আগেই মুখবইতে বোধহয় কারুর একটা উক্তি দেখলাম- আমাদের সময় আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুলই ছিল দেশজ ফল। আপেল কমলা গরমকালে তো ছিলই না... বা এরকম টাইপের কিছু। বস্তুতঃ বাঙালির প্রাণের কাছাকাছি খাবারগুলোর মধ্যে আলু বা পোস্ত দুটোই ঠ্যাহরালো পরদেশি। রসগোল্লা নিয়েও মোহনভোগী উড়ে ব্রাহ্মণগুলো টানাহ্যাঁচড়া শুরু করেছে। রইল শুধু হৃদয়রূপী আমই। এই আমকে যদিও কিছু কিছু ঐতিহাসিক বালি সুমাত্রা বোর্ণিওতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তবুও ঘুরে ফিরে আম এই সুজলাসুফলা বাংলাদেশ এবং বাংলা দেশেই ফিরে এসেছে তার শিকড়বাকড় নিয়ে।

আমকে যদিও ‘ব্যাদে আছে’ বলে মহানাসনে বসাতে পারছি না। তবু ‘বৃহদারণ্যক উপনিষদ’ এবং পুরাণে ‘আম্রফল’এর আনাগোনা দেখা যায়। আমগাছ কাটাকেও অমঙ্গলসূচক বলে দাবী করা হত। তা এই আম্রফলই দক্ষিণ ভারতে পৌঁছে তমিড় ভাষায় নাম পেলো ‘আমকায়’। সেখান থেকে ‘মামকায়’আর মালয়লমে ‘মামগা’ বা ‘মানগা’। আর পর্তুগীজগুলো এসে এই হৃদফলের সন্ধান পেয়ে লাফাতে লাফাতে ম্যাঙ্গো মাংতে মাংতে ইউরোপে ছড়িয়ে দিল তাকে।

প্রাচীন ভারতে, সম্মান প্রদর্শন করার জন্য বিভিন্ন আমের নাম ব্যবহার করা হত। যেমন বৈশালীর বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীর নামকরণ হয়েছিল আম্রপালি ইত্যাদি। নন্দরাজাদের আমলে আমকে ‘মদনশর’ হিসাবে ধরা হতো। গ্রীক বীর সিকন্দর পুরুর সঙ্গে ঝাড়েঝাপ্টা পর্ব শেষ করার পর মগধের দ্বারে পৌঁছে ফিরে যান একগাদা আমের চারা স্মৃতি হিসেবে নিয়ে। নন্দদের সঙ্গে মেগাকর্ষক যুদ্ধটা মাঠেই মারা যায়। আর সিকন্দরও বেশী দিন টেকেন নি। ব্যবিলনে শহীদ হয়ে যান মাত্র ৩৪ বছর বয়সে। তবে সে অন্য গল্প।

বৌদ্ধ ধর্মের ধরাধামে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমের জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে। কথিত আছে যে গৌতম বুদ্ধকে আমগাছ গিফট করা হয়েছিল যাতে উনি তাঁর নিচে বিশ্রাম নিতে পারেন। আর এই কথনের জন্যই বৌদ্ধ শ্রমণদের মধ্যে একে অপরকে আম ফল বা চারা উপহার দেবার প্রথা দেখা দিতে শুরু করে।

মেগাস্থিনিস বা হিউএন সাং-এর লেখায় পাওয়া যায় বলশালী রাজারা, বিশেষত মৌর্যরা স্বাচ্ছল্যের প্রতীক হিসাবে পথের দু ধারে আমগাছ রোপণ করতেন। হিউএন সাং-এর হাত ধরেই আমের বিদেশ যাত্রা।

আর বর্তমানে দাঁড়িয়ে আম কি শুধু আমাদের নাকি? আম তো আমপৃথিবীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসুন অনেকগুলো আমের প্রকারের নাম দেখে নিই আগেঃ

ফজলি, আশ্বিনা, ক্ষীরমন, সিন্দুরা, ল্যাংড়া, গৌড়মতি, গোপালভোগ, মধু চুষকী, বৃন্দাবনী, লখনা, তোতাপুরী, রাণী পসন্দ, ক্ষিরসাপাত, আম্রপালি, হিমসাগর, বাতাসা, ক্ষুদি ক্ষিরসা, বোম্বাই, সুরমা ফজলি, সুন্দরী, বৈশাখী, রসকি জাহান, হীরালাল বোম্বাই, ওকরাং, মালদা, শেরীধণ, শামসুল সামার, বাদশা, রস কি গুলিস্তান, কন্দমুকাররার, নাম ডক মাই, বোম্বাই (চাঁপাই), ক্যালেন্ডা, রুবী, বোগলা, মালগোভা, হিমসাগর রাজশাহী, কালুয়া (নাটোর), চৌসা লক্ষ্ণৌ, কালিভোগ, বাদশাভোগ, কৃষ্ণকলি, পাটনাই, গুটি লক্ষনভোগ, বাগান বিলাস, গুটি ল্যাংড়া, পাটুরিয়া, পালসার, আমিনা, কাকাতুয়া, চালিতা গুটি, রং ভীলা, বুদ্ধ কালুয়া, রাজলক্ষী, মাধুরী, ব্যাঙ্গলোরা, বন খাসা, পারিজা, চন্দনখোস, দুধ কুমারী, ছাতাপোরা, চোষা, জিলাপি কাড়া, শীতল পাটি, পূজারী ভোগ, জগৎ মোহিনী, দিলশাদ, বেগম বাহার, রাজা ভুলানী, নাবি বোম্বাই, সিন্ধী, ভূতো বোম্বাই, গোলেক, কালী বোম্বাই, চকচকা, পেয়ারা ফুলী, ভ্যালেনাটো, সিন্দুরী ফজলী, আমব্রা, গুলাবজামুন, আলম শাহী, অস্ট্রেলিয়ান আম, মায়া, দাদাভোগ, শরবতি ব্রাউন, আলফান, রত্না, লাড্ডু সান্দিলা, ছোটীবোম্বাই, কালিজংগী, দ্বারিকা ফজলি, মিঠুয়া, বোম্বে সায়া, বোম্বে গ্রিন, তোহফা, কাচ্চা মিঠা মালিহাবাদ, তৈমুরিয়া, জাহাঙ্গীর, কাওয়াশজি প্যাটেল, নোশা, জালিবাম, বেগনফল্লি, ভারতভোগ, ফজরী কলন, সাবিনা, সেনসেশন, লতা, বোম্বাই, আল্লামপুর বানেশান, শ্রাবণী, ইমামপসন্দ, জনার্দনপসন্দ, কৃষ্ণভোগ, সারুলী, ইলশে পেটী, কলম বাজি, ইয়াকুতিয়া, গুটী ভুজাহাজরী, ম্যাটরাজ, সামার বাহিতশত (আলীবাগ),গোলাপখাস, জুলী, ভেজপুরী, কালুয়া গোপালভোগ, কলম সুন্দরী, বনারাজ, ম্যাডাম ফ্রান্সিস, মোহাম্মদওয়ালা, সফেদা মালিহাবাদ, খান বিলাস, জাফরান, মধু মালতী, জিতুভোগ, পলকপুরী, কাকরহিয়া সিকরি, পাথুরিয়া, বোম্বে কলন, কেনসিংটন, কাকরহান, মিছরি, সামার বাহিশ্ত, মানজানিল্লো নুনেজ, নাজুকবদন, ফারুকভোগ, রুমানি, টারপেনটাইন, কুমড়া জালি, দুধিয়া, মহারাজ পসন্দ, ম্যানিলা, পিয়ারী, জান মাহমুদ, সামার বাহিশ্ত রামপুর, মাডু, লা জবাব মালিহাবাদ, লাইলী আলুপুর, নীলম, মিশ্রীভোগ, পদ্মমধু, বাঙামুড়ী, পুনিত, বেলখাস, শ্রীধন, আমান খুর্দ বুলন্দাবাগ, পামার, কারাবাউ, এমিলী, কোরাকাও ডি বয়, নিসার পসন্দ, পাহুতান, বোররন, সফেদা বাদশাবাগ, র‍্যাড, আরুমানিস, বাংলাওয়ালা, মোম্বাসা, রোসা, ক্যাম্বোডিয়ানা, ফজরী জাফরানী, বোম্বাইখুর্দ, এক্সট্রিমা, বদরুল আসমার, শাদওয়ালা, সামার বাহিশ্ত কারানা, এসপাডা, বাশীঁ বোম্বাই, কর্পূরা, হুস্ন-এ-আরা, সফেদা লক্ষ্ণৌ, শাদউল্লা, আজিজপসন্দ, কর্পূরী ভোগ, জিল, সারোহী, গ্লেন, টমি অ্যাটকিনসন, স্যাম-রু-ডু, মাবরোকা, হিমাউদ্দিন, ফ্লোরিডা, কেইট, আরউইন, নাওমী, কেন্ট, আলফন্সো, নারিকেল ফাঁকি, জামাই পসন্দ, লক্ষণভোগ, ভাদুরিয়া কালুয়া, চিনি ফজলী, মল্লিকা, সূর্যপুরী, হায়াতী, পাউথান, দুধস্বর, বেনারসী ল্যাংড়া, পাটনামজাথী, জালিবান্দা, মিছরিদানা, নাক ফজলী, সুবর্ণরেখা, কালা পাহাড়, বউ ভুলানী, জমরুদ, অরুনা, নীলাম্বরী, ফোনিয়া, সিন্ধু, বোগলা গুটি, রাজভোগ, মোহন ভোগ, হাঁড়িভাঙা, টিক্কা ফরাশ, হিমসাগর (নাটোর), মৌচাক, মহানন্দা, তোতাপুরী, পুকুর পাড়, কোহিতুর, বিলু পসন্দ, কাগরী, চিনিবাসা, দুধ কুমার, মন্ডা, লাড্ডু, সীতাভোগ, শোভা পসন্দ, গৃঠাদাগী, ছোট আশ্বিনা, ঝুমকা, দশেরী, কালী ভোগ, ভবানী চরুষ, আলফাজ বোম্বাই, মধুমনি, মিশ্রীকান্ত, গিড়াদাগী, কুয়া পাহাড়ী, বিড়া, দ্বারভাঙ্গা, আরাজাম, গোবিন্দ ভোগ, কাঁচামিঠা, মতিমন্ডা, পোল্লাদাগী, দাদভোগ, শ্যামলতা, মিশ্রীদাগী¸ কিষান ভোগ, ভারতী, বারোমাসি, দেওভোগ, সিদ্দিক পসন্দ, লতা, বাদামী, আনারসী, জহুরী, রাখাল ভোগ, গুটি মালদা, রগনী, বাউনিলতা, গৌরজিত, ফজরীগোলা, আনোয়ার রাতাউল, বাবুই ঝাঁকি, মনোহারা, রাংগোয়াই, গোল্লা, কাজি পসন্দ, রাঙামুড়ী, বড়বাবু, করল্লা, জালিখাস, কালিয়া, সাটিয়ারকরা, সফদর পসন্দ, ছুঁচামুখী, কাদের পসন্দ, টিয়াকাটি এবং (হ্যাহ) ইত্যাদি। কিছু বাদ গেলে অবশ্যই জানাবেন। সারা দুনিয়া থেকে আম জোগাড় করে ঝাঁকা ভরে কীবোর্ডে ফেললাম। এর থেকেই কয়েকটার গল্প করি আসুন।

ল্যাংড়া

আমের রাজা ল্যাংড়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এক খোঁড়া ফকির। ফকির থাকতেন হাজিপুরের একটি আমগাছের তলায়। সে গাছটি আবিষ্কার করেছিলেন পটনার ডিভিশনাল কমিশনার ককবার্ণ (কী ভয়ানক নাম রে বাবা!)। তারপরে সাড়া পড়ে গেল সে গাছকে ঘিরে। চার দিকে সান্ত্রী-সেপাই, মাঝখানে একটি আমগাছ। নিখিল সরকার ওরফে শ্রীপান্থর লেখাই পাই‘বোধিদ্রুমের প্রতিটি শাখা নিয়ে যেমন কাড়াকাড়ি, তেমনি হাজিপুরের এই আমগাছের ডাল নিয়েও। হাথুয়া, বেতিয়া, দ্বারভাঙ্গা, ডুমরাও-এর মহারাজারা বরং হাজার হাজার টাকার খাজনা হারাতেও রাজি আছেন, কিন্তু হাজিপুরের আমের ডাল নয়।’

এবারে ফজলি। কথিত আছে, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মালদহের কালেক্টর র‌্যাভেন সাহেব ঘোড়ার গাড়ি চেপে গৌড় যাচ্ছিলেন। পথে তাঁর জল তেষ্টা মেটানোর জন্য গ্রামের এক মহিলার কাছে জল খেতে চান। ফজলু বিবি নামে সেই মহিলার বাড়ির আঙিনায় বড় একটি আমগাছ ছিল। ফজলু বিবি সেই আম দিয়ে ফকির-সন্ন্যাসীদের আপ্যায়ন করাতেন (এজন্য এই আমের আর এক নাম ফকিরভোগ)। ফজলু বিবি তাঁকে জলের বদলে একটি আম খেতে দেন। আম খেয়ে কালেক্টর সাহেব ইংরেজিতে তাঁকে আমের নাম জিজ্ঞেস করেন। বুঝতে না পেরে ওই মহিলা তাঁর নিজের নাম বলে বসেন। সেই থেকে ওই আমের নাম হয়ে যায় ফজলি।

আর লক্ষণভোগ হল দিনাজপুরের ইংরাজবাজারের লক্ষণ চাষির বোনা আম।

অবশ্য আমার পছন্দের আমকে আমি গত আঠেরো বছর মুখে লাগাই নি। রামায়ণে আছে যে হনুমান হয় অশোক বনে অথবা অন্যত্র কোথা থেকে আম খেয়ে আঁটি ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন দাক্ষিণাত্যের কোথাও। হয় তো সেই থেকেই কপালে সিঁদুর টানা অদ্ভুত সুন্দর মিষ্টি স্বাদ ও গন্ধযুক্ত গোলাপখাস আমগাছগুলো কেরলের বাগিচায় সেজেগুজে বসে থাকে। তামিল নাড়ুতেও, তবে তামিলনাড়ুরগুলি একটি লম্বাটে আর আঁশযুক্ত হয়। তবে বাংলা ভাষায় আমের গল্প লিখতে বসেছি আর হিমসাগর লিখব না তা কি হয়? হিমসাগর সবথেকে ভালো পাওয়া যায় কিন্তু শান্তিপুর আর চন্দননগরে। চন্দননগরের হিমসাগরের রঙ সোনালী। স্বাদে অতুলনীয়। বিশেষতঃ বিশ্বনাথ চ্যাটার্জির বাগানের হিমসাগর আমের স্বাদের কথা আর কি বলব! শান্তিপুরি হিমসাগর একটু ছোট গোলাকার হয়।

আরেকটা আমের কথা বলতেই হয়। বছর দুয়েক আগে একবার মালদা টাউনে গেছিলাম, কাজে। আসার সময় সেখান থেকে খাস মালদাই আমসত্ত্ব ধরিয়ে দিল জনগণ। একফুট লম্বা প্লাইউডের মতো দেখতে। খটখটে আমসত্ত্ব। কিন্তু একটু দুধে ফেললে বা চাটনিতে পড়লে তার স্বাদ গন্ধে পাগলপারা হতে হয়। সেই আমসত্ত্ব তৈরী হয় শুধুমাত্র গোপালভোগ আমে। পরীক্ষামূলকভাবে টিভিতে মনপসন্দ সিনেমা দেখতে দেখতে একটু ভেঙে নিয়ে চুষে চুষে দেখতে পারেন। সিনেমাটাকে না হলেও আমসত্ত্বকে ৫স্টার দিতে আপনি বাধ্য থাকবেন কথা দিলাম। আমসত্ত্বই ভারতের অন্যত্র আম পাঁপড় বা অম্বাবড়ি হিসাবে প্রচলিত।

এরপরে একটু ভিনরাজ্যে প্রবেশ করি। দিল্লির বাজারগুলোতে আমান্তপ্রাণ বাঙালির ওয়াটারলু। হিমসাগর তাও কালেভদ্রে, কিন্তু গোলাপখাস নেইই। বদলে আছে আধা টক আধা মিষ্টি সিন্দুরি আম আর বেগনফল্লি বা সফেদা তাতে পেটই ভরে মন নয়। আমবাত বলতে গ্রীষ্মের শেষপ্রান্তে এসে বেনারসি ল্যাংড়া। তবে আর দুটো আমকে যদি না বলি তাহলে আমার কর্মভূমির সঙ্গে বেইমানি হয়ে যাবে। চৌসা আর দশেরি। চৌসা চুষে খায় বলেই এমন নাম নয় কিন্তু। ইতিহাস বলছে হুমায়ুনের সঙ্গে চৌসার যুদ্ধ জিতে দিল্লির মসনদ দখল করার স্মারক স্বরূপ শেরশাহ তাঁর পছন্দের আমের নাম রাখেন চৌসা বা চৌন্সা। যা আবার পূর্ব পাকিস্তান, সিন্ধ এবং পাঞ্জাবের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হয়, যেখান পর্যন্ত শেরশাহ হুমায়ুনকে তাড়া করে গেছিলেন। আকারে ছোট হলেই মিষ্টি খেতে এবং অতি অবশ্যই আঁটি চোকলা না কেটে চুষে খাবার মধ্যেই এর মজা।

চৌসা

অষ্টাদশ শতাব্দীতে উত্তর প্রদেশের কাকোরির (কাবাব আর চন্দ্রশেখর আজাদের জন্য বিখ্যাত!) কাছের দশেরি গ্রামে এর মূল গাছটি পাওয়া যায়। লক্ষ্ণৌয়ের নবাবদের হাতযশে এর প্রচার এবং প্রসার।

একটা হাইপ্রোফাইল কিন্তু হতাশজনক আম হল আফুস বা হাপুস বা আলফান্সো। যতদূর সম্ভব পর্তুগীজদের থেকেই কলম করে ফলন শেখার ফলেই এই আমের উৎপত্তি। সারা পৃথিবীতে এর নাম। ভারতের সর্বাধিক দামী এবং রপ্তানিকৃত এই আমের মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি অঞ্চলে মূলত ফলন হয়। কাটার সময় হাত কমলা হয়ে যায় এত গাঢ় এর রঙ। আর তেমনই ঘন এর শাঁস। তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এর রপ্তানিযোগ্যতা এবং পাল্প বা শাঁস হিসাবে এর ব্যবহারযোগ্যতাই একে মহামূল্য করে তুলেছে। স্বাদ বা গন্ধের কারণে নয়। বরং কেশর খান। গির অভয়ারণ্য থেকে বেরিয়ে এসে জুনাগড় এবং আমরেলি অঞ্চলে গিরনার পর্বতের পাদদেশে এই আম প্রথম চাষ হয় গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে। কয়েকদিন আগে ক্যাটরিনা কাইফ আপনাদের জিজ্ঞাসা করল কোন আম সেরা? উত্তরের দশেরি, পশ্চিমের আলফান্সো এবং কেশর, দক্ষিণের বেগনফল্লি? তা আপনারা স্লাইসের বোতলে কেশরের স্বাদ খেতে চাইছেন বলে ভোট দিলেন এবং সত্যিই তার স্বাদ বলিহারি যাই! গিরের সিংহের কেশরের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে আপনার স্বাদকোরকের সিংহাসনে তার অধিষ্ঠান। গন্ধেও মাশাল্লাহ। আর আছে নীলম। হায়দ্রাবাদী নীলম কিন্তু ইস্টবেঙ্গলী আম। হলুদ এবং লাল। ছোট ছোট আকারের নীলম স্বাদে সত্যিই প্রথম পাঁচে থাকার উপযুক্ত।

এসব তো গেলো দেশী আমের গল্প, এবারে ভিনদেশি দু তিনটে হবে নাকি?

যদিও আমের উৎপাদন ভারতেই শুধুমাত্র সারা বিশ্বের প্রায় ৪১% হয়ে থাকে, পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের কয়েকটি পরিচিত আম আপনাদের সামনে হাজির করছি।

মাদাম ফ্রান্সিক

মাদাম ফ্রান্সিক ডেসার্টের জন্য ব্যবহৃত একধরণের আম যা হাইতিতে সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে চাষ করা হয় এবং জুন-জুলাইতে এর পাকা ফল পাওয়া যায়। হাল্কা কমলা থেকে হাল্কা হলুদ এর রঙ হয় আর অদ্ভুত মোটা আকৃতি। স্বাদে মিষ্টি হলেও একটা হালকা টান থাকে যার ফলে বিভিন্ন ডেসার্টে এটি ব্যবহৃত হয়। মাদাম ফ্রান্সিক নাম ডক মেই অর্থাৎ মিষ্টিজলের প্রসাদ থাইল্যান্ডের সেরা আম। এর বিশেষত্ব হল আলফান্সোর মতোই আঁশহীনতা। এর সোনালী রঙ একে বিশেষত্ব দিয়েছে। তবে নাম ডক মেই আর কর্ণাটকের নীলম নাকি একই আম। নীলম খেয়েছি, এবং ব্যাঙ্গালোরের বিক্রেতারা গর্ব করে বলেছেন যে এ আম নাকি থাইল্যান্ডেও পাওয়া যায়। তাই...

অ্যামেরিকার দুটি জনপ্রিয় ফলন হল কেইট আর ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড। এর মধ্যে কেইটের বাহ্যিক রঙ সবুজাভ আর ভ্যালেন্সিয়া প্রাইডের উপরিত্বক হলুদের উপরে সিঁদুরের ছড়াছড়ি। যথাক্রমে মূলত মিয়ামি এবং দক্ষিণ ফ্লোরিডায় এই দুটি ফলের মূল চাষ। ভ্যালেন্সিয়া

তা বিদেশের দিকে যখন গেলাম তখন আমের কয়েকটা রেসিপি হয়ে যাবে নাকি?

ভ্যালেন্সিয়া

থাই ম্যাঙ্গো চিকেন স্টার ফ্রাইঃ এক মুঠো কাজু, চিকেন ব্রেস্টের ডাইস করা টুকরো, কুচি করা দুকলি রসুন, লাল ক্যাপ্সিকামের টুকরো, এক টেবিল চামচ থাই লঙ্কার আচার বা নাম প্রিক পাও, বড় বড় টুকরো পেঁয়াজ, একটা ছোট পেঁয়াজ কুচি করে কাটা, ফিশ সস এবং এক বড় বাটি পাকা আম চৌকো চৌকো করে কাটা। প্রথমে লোহার কড়াইতে সাদা তেল দিয়ে কাজুগুলো ভেজে নিয়ে পেপার টাওয়েলে রেখে দিন। তারপর গরম তেলে রসুন কুচির ফোড়ন দিয়ে তাতে পেঁয়াজ কুচি দিন। চিকের টুকরোগুলি দিয়ে নাড়তে থাকুন, একটা চকচকে ভাবের জন্য হালকা চিনি দিয়ে নিতে পারেন। নুন দিন। হালকা নরম হলে এবারে ক্যাপসিকাম এবং পেঁয়াজের বড় টুকরোগুলো দিন। হালকা নেড়ে নিয়েই বাকি সমস্ত উপকরণ যুক্ত করুন। আম ছাড়া। প্রায় রান্না হয়ে এলে তখন আম আর ভেজে রাখা কাজু দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে পরিবেশন করুন। সাদা সুগন্ধি ভাতের সঙ্গে এর সঙ্গত অনবদ্য।

এ তো গেলো পূর্ব এশিয়া। এবারে কি কন্টিনেন্টাল কিছু? তাহলে চিকেন উইংস নিয়ে নিন। আমের টুকরো, গার্লিক পাউডার বা রসুন কুচি, আদা কুচি, অলিভ অয়েল, জায়ফল গুঁড়ো, দারুচিনি গুঁড়ো, নুন মরিচ স্বাদমতো, থেঁতো করা দু চারটি লবঙ্গ, লঙ্কা গুঁড়ো, মধু, ব্রাউন সুগার, পেঁয়াজ কুচি, অলস্পাইস এক চা চামচ আর মিষ্টি স্বাদ চাইলে আমের রস, নাহলে টক টক চাইলে কমলালেবুর রস। এবারে, অলিভ অয়েল কড়াইতে দিয়ে। পেঁয়াজ নেড়ে নিয়ে আমের টুকরোগুলো দিয়ে নাড়তে থাকুন। ঠাণ্ডা করে তাতে কমলালেবু বা আমের রস সঙ্গে অল স্পাইস, ব্রাউন সুগার, মধু, পাতিলেবুর রস এবং বাকি মশলাগুলো দিয়ে মিক্সি বা ব্লেন্ডারে মিশিয়ে নিন। এবারে এটিকে ম্যারিনেড হিসাবে ব্যবহার করে চিকেন উইংস দিয়ে ঘন্টা চারেক ফ্রিজে রাখুন। হ্যাঁ চার ঘন্টা! আমের ঘনত্বের কথা চিন্তা করেই এই সময়। নামে আম হলেও খাস ট্রিটমেন্ট কি না! যাই হোক। চার ঘন্টা পরে এটিকে বার করে আনুন। ৪২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ওভেন প্রিহিট করুন। এরপর বেকিং ট্রে নিয়ে চিকেনগুলি ম্যারিনেড থেকে তুলে সাজিয়ে দুপিঠ পনেরো মিনিট করে বেক করুন। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে ম্যারিনেডটি একটু একটু করে ঢালুন চিকেনে। শেষে ম্যারিনেডটি আঠালো হয়ে যাবে এবং চিকেন বাদামী। ব্যাস আপনার খাস কন্টিনেন্টাল ম্যাঙ্গো জার্ক চিকেন তৈরী।

এবারে গ্রিল্ড ম্যাঙ্গো হ্যালেপানো। এই যে এতক্ষণ ধরে আলফান্সোকে দূরছাই করলাম। সে ঠিক বদলা নিয়ে নিল। আলফান্সোর মূল সুবিধা হল এর পাল্পটি ঘন হয়, চোকলায় আঁশ থাকে না আর ন্যালপ্যাল করে না। তাই খোসা ছাড়িয়ে আমের চোকলা কেটে নিন। তাতে নুন, মরিচ, লঙ্কাগুঁড়ো আর অলিভ অয়েল দিন। এবারে বেকিং ট্রে প্রিহিট করে তাতে বেকিং শীট দিয়ে আমগুলি সাজিয়ে রাখুন। দুটো দিক দু তিন মিনিট বেক করুন। এরপর লেবুর রস আর হ্যালেপানো লঙ্কা চাকা চাকা করে কেটে উপরে দিন আর ধনে পাতা কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন।

এবারে দেশে ফেরা যাক। আমের রেসিপি বলতেই প্রথমেই বলতে হয় আমরসের কথা। গুজরাটি আমরস যে একবার খেয়েছে সে জানে অমৃতের স্বাদ। তবে গুজরাটের প্রতিবেশী দুটি রাজ্যেও অর্থাৎ মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থানেও আমরস সামান্য রেসিপি পাল্টে ব্যবহৃত হয়। মহারাষ্ট্রে দারুচিনি গুঁড়ো দিয়ে সিজনিং হয় আর রাজস্থানে জাফরান গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়।

আমরস বানাবার জন্য আলফান্সো এবং কেশর উভয় আমই সম পরিমাণে ব্যবহার করা গেলে ভালো। আলফান্সোর টেক্সচার ও রঙ আর কেশরের স্বাদ ও গন্ধ আমরস বা কেরি কা রসকে অপার্থিব বানিয়ে ফেলে। যদিও অনেকেই বলবে যে আমের শাঁস কেটে নিয়ে ব্লেন্ডারে চিনি দিয়ে মেশাতে, কিন্তু যারা আসলের কদর করতে জানে তারা বলবে হাত লাগাতে। আসুন হাত লাগাই। খোসা ছাড়িয়ে নিন আর হাতে কচলে শাঁস বার করে নিন। এবারে আন্দাজমতো চিনি দিয়ে কচলে মাখুন যেন আঁশ বা দানা না থাকে। এর সঙ্গে স্বাদের রকম ফেরের জন্য আদা কুচি বা সঁঠ পাউডার, এলাচ গুঁড়ো অথবা জাফরান ব্যবহার করতে পারেন। ব্যাস আপনার আমরস তৈরী। মহারাষ্ট্রে বা রাজস্থানে অবশ্য আমের সঙ্গে দুধ মেশায়। কিন্তু গুজরাটি আমরস পুরী রেসিপিতে দুধের স্থান নেই। পুরী অবশ্য আমার সাদা ময়দার লুচিই পছন্দ। কিন্তু আপনারা হৃদয়ের কথা মনে রেখে লাল আটার পুরী বা আটা ময়দা মিশ্রিত পুরী খেতে পারেন।

বাঙালি জনমানসে আমরস এখনও সেরকম জায়গা করে নিতে পারে নি। তার জায়গায় ফাঁকিবাজি ম্যাঙ্গো শেক শ্যামবাজারের দোকানগুলিতে ঠাঁই নিয়েছে। একবার আমরস খেয়ে দেখুন, ম্যাঙ্গোশেককে হেলায় ঠেলে সরিয়ে দেবেন।

গুজরাটে যখন গেলাম তখন একবার কাঁচা আমের মিষ্টি চাটনি খাবেন না? প্রচুর পরিমাণে কাঁচামিঠে আম, সৈন্ধব লবণ বা বিট নুন, শুকনো কমলালেবুর খোসা, আঞ্জির (শুকনো মিষ্টি ডুমুর), শুকনো এপ্রিকট, কালো আঙুর, গুড় (আখের গুড়ই সাধারণত ব্যবহার হয়), একটা গোটা রসুন, আদা কুচি, লঙ্কা গুঁড়ো, সর্ষে গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, দারুচিনি দু তিনটি এবং ভিনিগার লাগবে। আমগুলিকে চৌকো চৌকো কেটে নুন হলুদ মাখিয়ে পাতলা কাপড়ে রেখে দু দিন রোদে শুকোন। ড্রাইফ্রুটগুলিকে ছোট ছোট টুকরোয় কেটে ভিনিগারে ভিজিয়ে নিন। গুড় এবং সর্ষে গুঁড়ো ছাড়া বাকি উপকরণ মেশান। সর্ষের গুঁড়ো ভিনিগারে ভালো করে মেশান। গুড় গুঁড়ো করে ভিনিগারে মেশানো সর্ষের সঙ্গে একসঙ্গে বাকি মিশ্রণের সঙ্গে আম মিশিয়ে নিন। এবারে ব্যবহার করার জন্য একসপ্তাহ কাঁচের বয়ামে রেখে দিন।

গুজরাটে আরেকরকম চাটনি হয় কাঁচা আমের। চুন্ডা বলা হয় তাকে। কাঁচা মিঠে আমকে গ্রেট করে চিনি, হলুদ লঙ্কা গুঁড়ো, নুন, দারুচিনি লবঙ্গ গুঁড়ো আর জিরে গুঁড়ো দিয়ে।

আমের চাটনি হলে আমের আচার কেনো নয়? পাঁচ ফোড়ন থেকে রাঁধুনি বাদ দিয়ে বাকিগুলিকে মোটামোটা করে কুটে নিন। যাতে একদম গুঁড়োও না হয়ে যায়, আবার গোটা গোটা দানাও না থাকে। এবারে কাঁচা আম চৌকো চৌকো করে কেটে আঁটি ছাড়িয়ে নুন হলুদ লঙ্কা মাখিয়ে কোটা মশলা আর সর্ষের তেল দিয়ে ভালো করে আম মাখিয়ে রোদে রেখে দিন এক সপ্তাহ। জল যেন না লাগে। এরপর কাচের বয়ামে রেখে দিন আর ভাত রুটি পরোটা সব কিছুর সঙ্গেই ব্যবহার করুন। একই উপকরণ দিয়ে আমতেলও বানাতে পারেন শুধু তেল গরম করে তারপর ঠাণ্ডা করে তাতে আম মাখিয়ে নিন আর বয়ামে ভরার সময় দু ইঞ্চি বেশি তেল ঢেলে রাখুন। রোদে দিতে হবে না। মুড়ি মাখার বা আলুভাতে মাখার জন্য আমতেল প্রস্তুত।

আর কাঁচা আম দিয়েই যখন শুরু হয়েছে তখন আমপোড়া শরবত আর আমপান্নাও ঘুরে আসতে হয়। গরমের তাপ কমানোর জন্য এদুটির জুড়ি নেই। বা বলা যেতে পারে এদুটি একে অপরের জুড়ি। আমপোড়া বঙ্গদেশীয়। এখানে বেগুনের মতোই আমকে আগুনে পুড়িয়ে, খোসা ছাড়িয়ে, কচলে নিয়ে বীটনুন, জিরে গুঁড়ো আর সামান্য চিনি দিয়ে তাতে জল আর বরফ দিয়ে সরবত। আর আমপান্না সমগ্র উত্তর ভারতের জমিদারী। তাতে আম না পুড়িয়ে সিদ্ধ করে নিতে হয়। ঠিক যেভাবে বেগুনের ভর্তা করা হয়।

গরম সামলাবার আরেকটি হাতিয়ার হল আমডাল বা টকের ডাল। পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা আর রাই বা সর্ষে ফোড়ন দিয়ে অড়হর ডাল দিয়ে আমের ডাল বাঙালির গ্রীষ্মকালীন দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবশ্য অড়হরের জায়গায় মুসুর বা মুগ ডালও ব্যবহার করা যেতে পারে।

উত্তর প্রদেশে অবশ্য এই টক ডালেই ঘিতে সর্ষে জিরে শুকনো লঙ্কা রসুন আর কারিপাতা ফোড়ন দেওয়া হয়।

কাঁচা আম নিয়ে কথা বলতে গেলে একটু দাক্ষিণাত্যেও যাওয়া প্রয়োজন। আমের পাচাড়ি। কাঁচা লঙ্কা চিড়ে কাঁচা আমকে জলে সিদ্ধ করে তাতে গুড় মিশিয়ে নিন। এরপর কড়াইতে তেল গরম করে শুকনো লঙ্কা, সর্ষে এবং কারি পাতা ফোড়ন দিয়ে আমের মিশ্রণটি দিয়ে নুন দিয়ে নামিয়ে মেখে নিন। এর সঙ্গে পরিবেশনের জন্য রোস্ট করা চীনেবাদাম, রসুন, শুকনো লঙ্কা, তেল আর নুন দিয়ে ভালো করে গ্রাইণ্ড করে চাটনি তৈরী করুন।

উত্তর ভারতে দই এবং বেসনের কারি গ্রীষ্মকালে এক উপাদেয় সাইড ডিশ। রাজস্থানে এই কারিতে দই আর বেসনের জায়গায় কাঁচা আম দিয়ে কৈরি কারি তৈরী করা হয়। জিরে, শুকনো লঙ্কা, সর্ষে, হিং, তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ নেড়ে নিন। এতে সামান্য জল আর নুন দিয়ে বেসন যুক্ত করে নাড়তে নাড়তে মিশ্রণ তৈরী করুন। কাঁচা আমের টুকরো দিয়ে জল দিয়ে নরম করে ফেলুন। দেখবেন যেন থকথকে থাকে। এর পর, গুড় দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। নামিয়ে নিয়ে এতে ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিন। কৈরি কি কারির সঙ্গে খোবা রুটি খেতে হয়। খোবা রুটির আটা একটু দানাদার হয়। সাধারণ আটার সঙ্গে গম মোটা করে কুটে নিয়ে মিশিয়ে নিন ঘি আর নুন দিয়ে। একটু মোটা লেচি করে মোটা করেই বেলতে হবে। এরপর একদিকে ছুরি দিয়ে একটু একটু করে গর্ত করে নিয়ে তাওয়ায় সেঁকতে থাকুন। মোটামুটি সেঁকা হয়ে গেলে অপর দিকের আটায় চিমটে বা তর্জনি ও বুড়ো আঙুল দিয়ে চিমটি কেটে কেটে সামান্য করে আটা উপরের দিকে তুলে নিন। সারা রুটি জুড়ে ছোট ছোট গর্ত তৈরী হবে ঠিক যেন চাঁদের পাহাড় বা মঙ্গলের মাটি। এরপর এই দিকে সামান্য ঘি দিয়ে উলটে নিয়ে ভাল করে সেঁকে নিয়ে কৈরি কি কারির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

কাঁচা আম নিয়ে যখন কথা চলছে, তখন আম চিকেন হবে না? তবে আম চিকেনে আমি যে রেসিপি ব্যবহার করেছিলাম সেটা বলি। রসুন ধনে জিরে পেঁয়াজ বাটা আর পাকা আমের শাঁস (তবে খুব বেশি মিষ্টি হলে তাতে একটু বেশি করে ভিনিগার দিতে হবে) নুন হলুদ দিয়ে চিকেনে মাখিয়ে রাখতে হবে। এরপর তিল আর কস্তুরী মেথি ফোড়ন দিয়ে তাতে লম্বা লম্বা করে পেয়াঁজ কেটে দিয়ে একটু ক্যারামেলাইজ করে তাতে ম্যারিনেট সহ চিকেন দিয়ে কষতে হবে ঢাকা দিয়ে ঢাকা দিয়ে। প্রায় হয়ে এলে কাঁচা লঙ্কা আর ধনে পাতা দিয়ে ভাল করে মাখিয়ে নামিয়ে নিন। ব্যাস ম্যাঙ্গো চিকেন তৈয়ার। তবে কাঁচা আমও ব্যবহার করা যায়। সে ক্ষেত্রে চিনি দিতে হবে ম্যারিনেটে।

আর আমসত্ত্বের চাটনি, আমের টক, আমের আইসক্রিম এসব রান্নার জন্য আম তৌর পে রেসিপি বই বা রান্নার সাইটগুলো দেখে নিন। ফিসফাস কিচেন তো সে জন্য নয়। তাই আম রাজত্বের সফরনামা এখানেই শেষ করি কবিগুরুর প্রথম কবিতাটিকে একবার ঝালিয়ে নিয়ে। ‘আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিই তাতে/ হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিকে নিস্তব্ধ, পিপীলিকা কাঁদিয়া যায় পাতে।।’ আম বা আমসত্ত্ব দিয়ে কলা দিয়ে দুধ বা দই দিয়ে মাখা সন্দেশ দিয়ে চিঁড়ে আর মুড়ি মাখার তুলনার জন্য আপনাকে এয়ার কন্ডিশনারের হাওয়াকে আনতে হবে না। একটু পিছন ফিরে শীতলপাটি, ঝাঁঝরি, কুঁজোর জল, আর ক্যাম্ফোর দেওয়া জবাকুসুম তেল- এগুলোকে মনে করলেই চলবে। মনের প্রশান্তি প্রশান্ত মহাসাগরে হাওয়া খেতে চলে যাবে। বুঝলেন?


লেখক পরিচিতি: লেখক ভারত সরকারের আধিকারিক। অধুনা দিল্লিবাসী এবং নিয়মিত বাংলা ব্লগার। খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে ফিসফাস কিচেন-১ ইতিমধ্যেই সৃষ্টিসুখ থেকে গত বইমেলায় প্রকাশিত। এটি দ্বিতীয় মরশুম। এছাড়াও লেখকের আরও তিনটি গদ্য-গল্পের বই রয়েছে।                  

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.