সস্ত্রীকো ধর্মামচরেত

 

প্রথম পাতা

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

ধর্ম

অক্টোবর ৩০, ২০১৫

 

সস্ত্রীকো ধর্মমাচরেত

অরুণ কুমার গণ


ঋষিবাক্যে রয়েছে,"সস্ত্রীকো ধর্মমাচরেত্"। ঋষি বলছেন, নিজের বিবাহিত জীবনসঙ্গিনী স্ত্রীকে সাথে নিয়ে তুমি তোমার সংসারে ধর্ম আচরণ করবে। সবসময়ে মনে রেখো, তোমার জীবনসঙ্গিনীই হবেন তোমার যথার্থ ধর্মসঙ্গিনী। শাস্ত্র বাহ্যসংসারজীবনের সার্বিক ধারাকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে একটা অমোঘ সত্যসিদ্ধান্ত জগৎবাসীকে জানিয়ে দিয়ে বলেছেন, স্ত্রীই হবেন তোমার জীবনপথের একমাত্র প্রধান সাহায্যকারিণী। তুমি আর তোমার স্ত্রী, এই দুইয়ের সম্মিলনে চলমান হবে তোমার সংসার পরিক্রমা। সতত বহমান এই সংসারের দুটো পথ, একটা বহিরঙ্গের সংসারপথ আর অন্যটা অন্তরঙ্গের ধর্মপথ। এই দুটো পথের মিলনে একটা অসাধারণ জীবনপথ তৈরী হয়।এই জীবনপথে স্বামীস্ত্রী একত্রে একমাত্র চলবার অধিকারী, তাই দুজনকে এই পথ দিয়ে একসাথে চলতে হবে,তবেই একদিন পথের প্রান্তের ব্যোমাতীত নিরঞ্জন অবস্থা "নিজ নিকেতনে" নির্বিঘ্নে পৌঁছানো যাবে। যদিও সংসারপথে কোন পুরুষ বা নারী একাকী চলতে পারেন, অনেকে একা একা সংসারপথে চলেনও, কিন্তু শাস্ত্রসিদ্ধান্ত অনুসারে তারা কেউই একাকী ধর্মপথের প্রান্তসীমায় কোনমতেই পৌঁছতে পারবেন না, অন্য কোন উপায়ও তাদের নেই। স্থূল সংসারপথ পঞ্চতত্ত্বের নীচের দিকের তিনতত্ত্ব "ক্ষিতি অপ্ তেজে"র সমষ্টি মাত্র, এই পথেই সংসারবাসী সবাই নিজের অজান্তে চলাচল করেন। অন্যদিকে "ক্ষিতি অপ্ তেজ মরুৎ ব্যোম"এর সর্বসম্মিলনে অন্তরদেশে অদৃশ্য ধর্মপথ সৃষ্টি হয়, এই পথে স্বামীস্ত্রী একসাথে শাস্ত্রবিধান অনুযায়ী চললে অবশ্যই তারা একদিন ব্যোমাতীতে পৌঁছতে সক্ষম হবে। এই ব্যোমাতীত অবস্থায় পৌঁছানোটাই মানবজন্মের একমাত্র লক্ষ্য। শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন নয়, পরমার্থই মানবজীবনের কাম্য।যতদিন না জীবের এই পরমার্থপ্রাপ্তি হবে, ততদিন বারে বারে তাকে এই বিশাল জগৎসংসারে নানা রকমের শরীরের মাধ্যমে আসা যাওয়া করতেই হবে। এই জায়গাতে সংসারবাসী সব শরীর সম্পূর্ণ অসহায়।কারো কোন ইচ্ছা কোন কাজ করবে না। তাই কোন জীব নিজের ইচ্ছায় মানবশরীর পাবে না। যেন পূর্বনির্দিষ্ট একটা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনায় এই সংসারে ৮৪ লক্ষ যোনির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ শরীর প্রতিদিন সবার অলক্ষ্যে সৃষ্ট হয়েই চলেছে।৮৪ লক্ষ যোনির মধ্যে এক যোনি নয় বারবার, সুরদুর্লভ মানব জন্ম চারযুগেতে একবার। ৮৪ লক্ষ শরীরের মধ্যে মানবশরীর সবচাইতে উন্নততম এবং শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। কারণ,মানবশরীর একমাত্র জীবনের লক্ষ্য জানতে পারে বুঝতে পারে এবং ইচ্ছা করলে কাম্যেও পৌছতে পারে, মানবশরীর ছাড়া অন্য কোন শরীরের পক্ষে কাম্য পরমধামে পৌঁছানো সম্ভব নয়। শাস্ত্র এর কারণ বর্ণনা করে জানিয়েছেন যে মানবশরীর একমাত্র কর্মশরীর, ব্রহ্মাণ্ডের বাকী সব শরীর ভোগশরীর।যে শরীর শুধুমাত্র ভোগবিলাসই চায়,সে শরীরটাকেই ভোগশরীর বলে। ভোগশরীর কোনসময় পরমার্থ চাইবে না, পরমার্থের পথ দেখিয়ে দিলেও তারা ওপথে যাবে না। নানা রকমের শারীরিক মানসিক অর্থনৈতিক প্রতীকধার্মিকভাব ভোগের মধ্যেই ভোগশরীর তৃপ্তি খুঁজে বেড়ায়। ভোগীমানবশরীর আসলে পশুশরীরেরই অন্য নাম, এই তথ্যটা শুনতে কঠোর হলেও সত্য এবং বাস্তব। অতি দুর্লভ মানবশরীরকে যোগশরীর না করে কেবল ভোগশরীর অবস্থায় রাখলে সুদুর্লভ এই মানবজন্মটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। শাস্ত্র এই বিষয়টাকে আন্তরিকভাবে সংসারকে বারেবারে জানিয়েছেন, বুঝিয়েছেনও নানাভাবে।

স্বামীর পুরুষশরীর আর স্ত্রীর নারীশরীর। সব শরীরের মতই এই দুই শরীরের মধ্যেও জীব বর্তমান। জীব নানা রকমের শরীরের মাধ্যমেই এই ভবসংসারে বিচরণ করে। শাস্ত্রের বিশ্লেষণে জীবের স্বরূপ ঠিক যেন একটা পাখীর মতো। স্ত্রীদেহ আর পুরুষদেহ সেই পাখীর দুই ডানা। পাখীর একটা পাখা কেটে দিলে সে আর কোনোভাবেই শূন্য আকাশে উড়তে পারবে না, শূন্যে উঠতে না পারার দরুন সে যেকোন দিন সংসারের মাটিতে পড়ে গিয়ে বিড়াল কুকুরের খাদ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে যেতে পারে।ঠিক এইভাবে, নারীরূপী স্ত্রী আর স্বামীরূপী পুরুষ এই দুজনের একজনের অভাবে জীবরূপী পাখীর একটা ডানা না থাকার কারণে ক্ষিতিতত্ত্বে পতিত হয়ে ঐ শরীরস্থ জীব না চাইলেও কামক্রোধরূপী বিড়াল কুকুরের খাদ্যবস্তুতে অবশ্যই আপনাআপনি পরিণত হয়ে অসামান্য ভবলীলার অযথা সমাপ্তি ঘটে যাবে। এইজন্যে তাঁরা জগৎবাসীকে বিশেষভাবে সাবধান করে ডাক দিয়ে বলেছেন, তোমরা বিশ্বের "অমৃতস্য পুত্রাঃ", তোমরা আমাদের কথা শোনো, তোমরা কেউ কিন্তু সামান্য জীব নও, তোমরা সবাই স্বয়ং অসীমের সন্তান।সংসারে এসে তোমরা তোমাদের আসল পরিচিতিটা ভুলে গেছ। আমাদের কথাটা দয়া করে শোন, সংসারমার্গ হোক কিংবা ব্রহ্মমার্গই হোক, স্ত্রীবিহীন অবস্থায় কোন কাজই সুচারুভাবে হয় না, হতে পারবেও না। স্ত্রী ছাড়া স্বামীর কোন কাজ প্রকৃতপক্ষে কোনভাবেই সম্ভব হবে না। স্বামীর সাথে স্ত্রী থাকলে সংসার এবং ধর্মের সাথে তোমাদের সার্বিক জীবনটা সবটাই যেন একসাথে পূর্ণতা পেয়ে যাবে।

সংসারের দৈনন্দিন কাজ ছাড়া ভজন পূজন সাধন আরাধনা প্রভৃতিও প্রতিদিন নিয়ম করে বিধান অনুসারে গৃহস্থাশ্রমে করতে হয়। শাস্ত্র জানিয়েছেন, স্ত্রীর সাহায্য ছাড়া ঐ কাজগুলোও ঠিকমত সম্পন্ন হবে না, হতে পারবে না। শাস্ত্র আরো জানিয়েছেন, স্ত্রী বিরহিত মানুষ নিশ্চিতভাবে আশ্রমভ্রষ্ট ও প্রত্যবায়গ্রস্থ হয়ে যাবে, বিবাহ না করলে কোন মানুষই কোনদিন কোনমতে কোনভাবে গৃহস্থাশ্রমের অধিকারী হতে পারবে না। তাই দার-পরিগ্রহকে গৃহস্থাশ্রম প্রবেশের দ্বার বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং একে গৃহস্থাশ্রম পালনের অপরিহার্য উপায় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে শাস্ত্রে । এ বিষয়ে শাস্ত্র বিশেষভাবে বলেছেন-

"অদারস্য গতির্নাস্তি সর্ব্বাস্তস্যাফলাঃ ক্রিয়াঃ।
সুরার্চ্চনাং মহাযজ্ঞং হীনভার্যো বিবর্জ্জয়েৎ।।
একচক্রো রথো যদ্বদেকপক্ষো যথা খগঃ।
অভার্যোপি নরস্তদ্বদযোগ্যঃ সর্ব্বকর্মসু ।।
ভার্যাহীনে গৃহঃ কস্য তস্মাদ্ভার্যাং সমাশ্রয়েৎ।
সর্ব্বস্বেনাপি দেবেশি কর্ত্তব্যো দারসংগ্রহঃ।।"
- মৎস্যসূক্ত,একত্রিংশ পটল।।

অর্থাৎ ভার্যাহীন ব্যক্তির কোন গতি নাই। তার সকল ক্রিয়া নিষ্ফল হয়ে যাবে; তার দেবপূজায় ও মহাযজ্ঞে কোন অধিকার থাকবে না, এক চাকার রথ যেমন চলতে পারবে না, একটা ডানা ওয়ালা পাখী যেমন উড়তে পারবে না, তেমনি ভার্যাহীন ব্যক্তি সব কাজের যোগ্য হবে না; ভার্যাহীনের কোন ক্রিয়ায়অধিকার থাকবে না, ভার্যাহীনের কোন সুখ থাকবে না, ভার্যাহীনের গৃহও সম্পূর্ণ হবে না, অতএব সংসারী, তোমাকে নিজের ভালোর জন্যে ভার্যা গ্রহণ করতে হবে। হে দেবেশি, সর্বস্বান্ত হলেও তোমাকে দার পরিগ্রহ করতে হবে।

সংসারের স্ত্রীরা ভার্যা, দার, রমণী, জননী, জায়া, গৃহিণী প্রভৃতি বিভিন্ন নামে সংসারে পরিচিত। শাস্ত্র একজায়গায় গৃহিণীকে 'গৃহ' নামে উল্লেখ করে বলেছেন, "গৃহিণী গৃহমুচ্যতে"(পঞ্চ ৩,১৪৪)। গৃহিণী গৃহকে সবদিক দিয়ে নিজের মত সুন্দর করে ভালোবেসে সবসময়ে সাজিয়ে রাখেন, কারণ তিনিই যে গৃহের কর্ত্রী, মালিকা । গ্রামবাংলার প্রবাদ বাক্য,"সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে"।"সুখ"শব্দের অর্থ হল "সু" অর্থাৎ সুন্দররূপে "খ"এ অবস্থান করা।"খ"এর অর্থ,সূর্য(ছান্দস), ব্রহ্মাকাশ (ছান্দস), দৈহিক আকাশ, আকাশ, আকাশের মণিতুল্য, বিন্দু, শূন্য(লীলাবতী),জ্ঞান, স্বর্গ, পুর ইত্যাদি। জগত সংসারে যে সব মুনি ঋষি দেবতাদের নাম শুনতে পাওয়া যায়, তাঁরা সকলেই সবকিছু আগে থেকে জেনে বুঝে দেখে তবেই স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন, দেখা যায়।তাঁরা শাস্ত্রের সারকথা চূড়ান্তভাবে জানতেন।"শাস্ত্র" শব্দটার দুরকম অর্থ। জগতের সমস্ত জ্ঞানী মুনি ঋষি মহাপুরুষদের সম্মিলিত জ্ঞান যে সমস্ত গ্রন্থে সন্নিবেশিত আছে, সেই সব গ্রন্থাবলী শাস্ত্র নামে পরিচিত, এটা বহিরঙ্গের অন্তর্গত হলেও এইসব গ্রন্থাবলীকে সংসারের মানুষেরা চিরকালীন শ্রদ্ধার ও পবিত্র পূজার আসনে বসিয়ে রেখেছেন। "শাস্ত্র" শব্দটার অন্তর্নিহিতও ব্যাখ্যাও আছে। যে শ্বাসের ওপর জগতের সমস্ত শরীর বেঁচে আছে, জীবিত অবস্থায় সংসার বন্ধন ছিন্ন করবার জন্য সেই শ্বাসরূপী অস্ত্রকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার নামও শাস্ত্র। বহিরঙ্গের শাস্ত্রের নানা রকমের ব্যাখ্যা হতে পারে,হয়ও, কিন্তু অন্তর্মুখী শাস্ত্র সবসময়ই এক রকমের, ঠিক যেন অংকের মত, জগতের সর্বত্রে ২ আর ২ এর যোগফল ৪ যেমন হয়, অন্তর্মুখী শাস্ত্র তেমনই। ব্যাসদেব, বশিষ্ঠ, মরীচি,অত্রি, অঙ্গিরা, পুলিস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, ভৃগু ইত্যাদি মহান মুনিঋষিবৃন্দ,দেবাদিদেব মহাদেব,যোগেশ্বর হরি,ভগবান রামচন্দ্র, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রমুখ দেবতারা সবাই এই অন্তর্মুখী শাস্ত্রানুসারে স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন।পরবর্তীকালে নানকদেব, কবীরদাসজী, সুরদাসজী, রবিদাসজী, সুখরামজী মহারাজ কেউই স্ত্রী বর্জিত ছিলেন না। জানা গেছে, তাঁরা কেউই কোনসময় স্ত্রী হতে আলাদা থাকতেন না। যেমন, যেখানেই বশিষ্ঠ থাকতেন, সেখানেই অরুন্ধতীকে দেখা যেত। অরুন্ধতী সামান্য সময়ের জন্যেও বশিষ্ঠ হতে আলাদা থাকতে পারতেন না, বশিষ্ঠও তেমনি সবসময় স্ত্রী সঙ্গে থাকতে খুবই ভালবাসতেন। এইভাবে মরীচি কলাদেবীর সাথে, অত্রি সতীস্ত্রী অনসূয়ার সাথে, পুলিস্ত্য হবির্ভূদেবীর সাথে, ক্রতু ক্রিয়াদেবীর সাথে, ভৃগু তাঁর স্ত্রী খ্যাতিদেবীর সাথে সবসময়ই থাকতেন। মনুও সবসময় স্ত্রী শতরূপার সাথে থাকতে ভালবাসতেন। এঁদের কন্যা, কপিলমুনির মা দেবহুতি ছিলেন কর্দমঋষির স্ত্রী। উনিও সবসময়ে স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে পছন্দ করতেন।শাস্ত্রমতে বিবাহিত স্ত্রীদের ক্ষমতার কথা ঐ সর্বজ্ঞ মুনি ঋষি দেবতারা সবাই ভালোভাবেই জানতেন।

এইসব ঋষি মুনি দেবতা মহাত্মা যোগী, এঁরা কারা?

বেদমন্ত্রের যাঁরা দ্রষ্টা, তাঁরা হলেন ঋষি,"ঋষয়ো মন্ত্রদ্রষ্টায়োঃ"। সপ্তবিধ ঋষি আছেন। (১)ব্রহ্মর্ষি, ব্রাহ্মণ ঋষি(বশিষ্ঠাদি),(২)দেবর্ষি, দেবতা ঋষি(নারদাদি), (৩)মহর্ষি, মহান ঋষি(ব্যাসাদি), (৪)পরমর্ষি, পরমঋষি(ভেলাদি), (৫)কান্ডর্ষি, কান্ড ঋষি (জৈমিনীআদি)(৬)শ্রুতর্ষি, শ্রুত ঋষি (সুশ্রুতাদি) (৭)রাজর্ষি,রাজা ঋষি(জনকাদি)(রত্নসার)।এইসব ঋষিরা সবাই সত্যলোকের সন্নিহিত স্থান ঋষিলোকে আছেন। এঁরা তন্ত্রোক্ত মন্ত্রের উপাসনায় সিদ্ধ।যাঁরা মননশীল হেতু সর্বজ্ঞ, তাঁরা মুনি পদবাচ্য। এঁদের অঙ্গ লক্ষণ "বীতরাগ ভয়ক্রোধ স্থিতধী"(গীতা)। এঁরা "নিত্যং স্থিততে হৃদ্যেষ পুণ্যপাপ উপেক্ষিতা" (মনু৮‌‌॥৯)। অগস্ত্য, পাণিনি,কাত্যায়ন,পতঞ্জলি প্রমুখেরা সবাই মুনি। পরমাত্মা স্বয়ং জীব কল্যাণের জন্যে যখন মানবশরীর ধারণ করেন, তখন তিনি মহাত্মা নাম ধারণ করেন। যথা, নানকদেব, কবীরদাসজী, দরিয়াওজী, বিরমদাসজী, সুখরামজী, নির্ভয়রামজী, যুক্তেশ্বরজী, সুন্দরদাসজী, এঁরা দয়ালদেশ, অগম দেশের, আনন্দলোকের মালিক কেবলীজন মহাত্মা। দেবতা, দিব্ শব্দ হতে জাত। "দিব্" অর্থাৎ আকাশ, দেবতাদের স্থান, এটাই দ্যুলোক। "দ্যু" এর অর্থ স্বর্গ,দ্যুলোক অর্থাৎ স্বর্গলোক। যোগীরা হলেন অষ্টাঙ্গ যোগে যাঁরা সিদ্ধিলাভ করে জীবাত্মা পরমাত্মাকে ব্রহ্মকুলের ধারায় সংযোগ ঘটাতে চাইছেন, তাঁরা যোগীপদবাচ্য। যেমন, গোরখনাথ, মৎস্যেন্দ্রনাথ ইত্যাদি। সমগ্র জগৎব্রহ্মান্ডে ৩ লোক, পৃথিবী(ভূর্লোক) অন্তরীক্ষ(ভুবর্লোক) আর স্বর্গ(স্বর্লোক)হলেও বিশেষভাবে মোট ১৪ লোক।৭ ঊর্দ্ধলোক, ভূঃ ভুবর স্বঃ মহ জন তপ সত্য আর ৭ অধঃলোক, অতল বিতল সুতল তলাতল রসাতল পাতাল। ঊর্দ্ধলোকের "ভুবর্‌" হল অন্তরীক্ষলোক, এটা ইন্দ্রলোক নামেও পরিচিত।"স্বঃ" হল দেবলোক বা স্বর্গলোক,দেবতাদের স্থান। মোট ৭টা স্বর্গ আছে,এদের মধ্যে বজ্রলোক হল রাম, কৃষ্ণ অবতারাদিদেরস্থান। জনলোক হল সনক,সনাতন, সনন্দন, সনৎকুমার প্রভৃতিঊর্ধ্বরেতা, ব্রহ্মচারীদের স্থান (স্কন্দপুরাণ)। সমাধি অবস্থায় সাধকের তপোলোক বিচরণ হয়।তপোলোকে সাধকের এই বিচরণ অস্থায়ী।সত্যলোক হল ব্রহ্মলোক। সবচাইতে ওপরের লোক হল আনন্দলোক, এটাই অগম দেশ, দয়াল দেশ, সৎগুরুদেবস্থান। এই স্থানই মানব জীবনের একমাত্র কাম্য। এঁরা সবাই জানেন, স্ত্রীগ্রহণ না হলে চতুরাশ্রম অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। অসম্পূর্ণ চতুরাশ্রমের কারণে তাঁরা কেউই তাঁদের অতি দুর্লভ মানবজন্মকে মূল্যহীন করতে চাননি। তাঁরা সবাই ছিলেন প্রেমের পথের পথিক। তাঁরা আদরভাব নিয়ে জানিয়েছেন, জগৎসংসারের সব মানবমাত্রেরই শাস্ত্রবাক্যতে মান্যতা দিয়ে বিবাহিত হওয়া উচিত। তাঁরা সংসারীদের সাবধান করে বলেছেন,সংসারপথ খুব কঠিন, ক্ষুরের ধারের মত সূক্ষ্মাতিতম সূক্ষ্ম। সঠিকভাবে না চললেপপাত ধরণীতলে। চারপাশে নানাধরনের লোভ, কাম, কামনার আক্রমণ তোমাকে সবসময় পথভ্রষ্ট করবার জন্যে সর্বত্র ওৎ পেতে বসে আছে। ওদের হাত থেকে বাঁচতে তোমরা পুরুষেরা, নিজের বিবাহিত স্ত্রীসঙ্গে সব সময়ে থাকবে, নিজের স্ত্রী ছাড়া সংসারের অন্য নারীদের মাতৃসমা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করবে। তাঁদের এই বিধান সুষ্ঠু সাংসারিক জীবন এবং সার্থক সাধন জীবনের একটা মস্ত বড় দিকনির্দেশ।

সংসার হল "সং" আর "সার" এর যোগফল। "সং' হল সংসারের বহিরঙ্গ, আর "সার" হল ঐ একই সংসারের অন্তরঙ্গ। অন্তরঙ্গের সারের প্রতীকরূপই হল সৃষ্ট জগৎব্রহ্মান্ডের যাবতীয় দৃশ্যমান বাহ্যিক রূপ।"যা আছে ব্রহ্মান্ডে, তা সবই আছে ভাণ্ডে"। যা যা রূপ বাইরে দেখতে পাওয়া যায়, তা সবই সংসারের সব শরীররূপ ভান্ডের অন্তরে সুপ্তভাবে বায়ুর আকারে থরে থরে নিঃখুতভাবে সাজিয়ে রাখা আছে এবং নিজেদের সেই জায়গা থেকে তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মে ব্যাপৃত থেকে শরীররূপী জগৎকে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত করে চলেছে আপন ধারায়।সাধারণ সংসারী মানুষ নিজেদের অন্তরঙ্গের কাজের ধারাকে জানে না। তাদেরকে কেউ জানায়নি, তাদের বেশীরভাগই ধারাটাকে জানবার চেষ্টাও করেনি। তারা নিজেরা নিজেদেরটা নিয়েই সদা ব্যস্ত। সব ঠিক আছে, তবুও যতটা জানানো যায়। সাধারণত: প্রত্যেক সংসারে পিতামাতা স্বামীস্ত্রী পুত্রকন্যা ভ্রাতাভগ্নী এবং অন্যান্য পরিজনেরা একসাথে থাকেন, তাঁরা সবাই পরস্পরের স্বজন সুজন আত্মীয় বলেই সংসারে পরিচিত। এদের সাথেই সমাজে সংসারে থাকতে হয় সবাইকে, এইটাই নিয়ম। ঠিক একইভাবে শরীররূপী ভান্ডারের অভ্যন্তরেও এবংবিধ বহুবিধ আত্মীয় পরিজনেরা নানা রকমের চঞ্চল বায়ুরূপে (প্রকৃতি রূপে) বিরাজ করে আছেন। এই চঞ্চল বায়ুরা সংখ্যায় বহু হলেও ওরা সবাই মূল স্থিরবায়ু অর্থাৎ পুরুষ হতে সৃষ্ট এবং তাঁরই একান্ত আশ্রিত হয়ে আছে। স্থিরবায়ু(পুরুষ) হলেন আধার, চঞ্চল বায়ু(প্রকৃতি)হলেন আধেয়। আধার না থাকলে আধেয় থাকবে কোথায়। পাত্র না থাকলে জলের থাকবার কোন জায়গাই নেই। তাই স্থিরবায়ুকে ছাড়া চঞ্চল বায়ুর থাকবার কোন জায়গাই নেই, স্থিরবায়ু ছাড়া চঞ্চল বায়ু অস্তিত্ববিহীন। যেহেতু তারা পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত, তাই তারা পরষ্পরের স্বজন আত্মীয় অর্থাৎ শরীররূপ ভান্ডের অভ্যন্তরেও সবার অগোচরে পিতামাতা ভ্রাতাভগ্নী স্বামীস্ত্রী পুত্রকন্যা ও পরিজন আত্মীয়রূপী বায়ুদের অবস্থান। শরীরের অন্তরঙ্গে শত্রুরূপী বায়ুও আছে, তারাই বহিরঙ্গের শত্রু হয়ে সামনে সময়ে সময়ে দেখা দেয়। শরীরের বাইরে যত আত্মীয় স্বজন বন্ধু শত্রু প্রতিবেশীদের স্থূলদেহে দেখা যায়, তারা সবাই শরীরের ভেতরে বায়ুরূপে নিরাকারে সবসময়ে আছে। তাই, বিবাহের পরে যে নারী স্ত্রীরূপে তার নিজ স্বামীর জীবনসহচরী রূপে সংসারক্ষেত্রে এলেন, তিনিও বায়ুরূপে বিবাহপূর্ব সময় থেকে তার ভাবী স্বামীর শরীরচারিণী ছিলেন, তার সাধনহীন ভাবী সংসারী স্বামী তা জানতেনও না, জানতে হয় কিনা তাও তিনি জানতেন না। একইভাবে বিবাহের আগে নারীরূপা ভবিষ্যতের স্ত্রীশরীর মধ্যেও বায়ুরূপী স্বামী বিরাজ করতে থাকেন তাদের নিজেদের সম্পূর্ণ অগোচরে। এ কারণে বিবাহের আগে নারী বা পুরুষ কেউ কাউকে চিনতে পারবেন না, যদিও প্রত্যেকেই জানেন, বিবাহের পরে তাদের সঙ্গী বা সঙ্গীনী হিসাবে কোন চেনা বা অচেনা শরীর নিয়ে স্বামী বা স্ত্রীরূপে আসবেন জীবনে। যিনি সারা জীবন জীবনের প্রতিটি অনুপর্বে সঙ্গদান করে জীবনকে নানাবিধ সাহায্য ও সমৃদ্ধ করে থাকেন তিনিই তো হন প্রকৃত জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী। নারী বা পুরুষ প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগে থেকে মনোমধ্যে নিজ পতি বা পত্নীকে কল্পনা করে থাকেন নিজের নিজের অগোচরে। নিজ শরীর অভ্যন্তরস্থ স্বামী বা স্ত্রীরূপী যে বায়ু আপাত নিষ্ক্রিয় হয়ে এতদিন অবস্থান করছিল, সে যথাসময়ে যথানিয়মে ক্রিয়াশীল হওয়া মাত্রই মনোমধ্যে চেতন চিন্তারূপে চলে আসবে, এই চেতন চিন্তাও বায়ুরূপী। পরবর্তীকালে এই নিরাকারী চেতনা ধীরে ধীরে ঘনীভূত হতে হতে যখন আকারে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হবে, তখনই বহিরঙ্গের সংসারে আপনাআপনি আসবে বিবাহের ক্ষণ বা বিবাহের লগ্ন। সে সময়ে দেখা যাবে এ যাবৎ সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন নরনারী বিবাহ নামক পবিত্র কর্মের মাধ্যমে পরবর্তী বাকী জীবন একসাথে একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে, স্বামী বা স্ত্রীরূপে কাটিয়ে দিচ্ছেন, একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনের জীবন যেন অসম্পূর্ণ। সংসারী মানুষেরা নিজেদের বিবাহের জন্যে নিজেদের অজান্তে অনেক খোঁজাখুঁজি করেন বটে, এরকম সব খোঁজাখুজি বৃথা, তাঁরা জানেনই না যে সবই পূর্বনির্দিষ্ট হয়ে আছে। প্রাচ্যের আপামর মানুষ এই সনাতন অন্তর্মুখী বিবাহধারায় অনন্তকাল ধরে পরম বিশ্বাসী হয়ে আছেন আপনাহতেই।যদিও অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ সনাতন ধারাতে বিশ্বাস না করে নিজেদের বাহ্যবুদ্ধি অনুসারে বিবাহ করে ফেলেন বটে, কিন্তু সে সবের অধিকাংশ বিবাহসম্পর্ককে স্থায়ীরূপে দেখা যায় না । পাশ্চাত্যদেশের বিবাহচিন্তা সম্পূর্ণ বহির্মুখী হবার কারণে তাদের স্বামীস্ত্রীদের মধ্যেকার বজ্রবাঁধুনিটা যেন মাঝে মাঝে আলগা হয়ে যায়, মধুর দাম্পত্য সম্পর্ক কখনো কখনো কোথায় যেন হারিয়ে যায়। প্রাচ্যের মানুষদের মধ্যে যারা পাশ্চাত্য ভাবধারা অনুসরণ করতে যায়, তাদের সংসারে অশান্তি স্বাভাবিক ঘটনা।

কানন কুন্তলা,সমুদ্র মেখলা,শস্যশ্যামলা ভারতজননী পৃথিবীর সকল দেশের মুকুটমণি। অপূর্ব গরিমায় অসীম গাম্ভীর্যে পৃথিবীপৃষ্ঠে এই দেশের অবস্থান। এই দেশের আকাশ বাতাস, প্রান্তর আঙ্গিনা, বন উপবন, পাহাড় পর্বত, সমতলভূমি, খাল বিল পুষ্করিণী, নদনদী উপসাগর সাগর মহাসাগর, এই দেশের মানুষের আচার ব্যবহার সংসার শিক্ষাদীক্ষা ধর্মকর্ম পৃথিবীর সকল দেশের আদর্শ। কেন ভারতের যশোমান সৌভাগ্য সম্মান সত্যাভিমান হিমালয় কন্যাকুমারীকার সীমানা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে? কেন ভারত জগতের শ্রেষ্ঠাসন অধিকার করে গর্বোন্নত মস্তকে আপন মাহাত্ম্যে সারা পৃথিবীকে আলোকময় করে রাখছে? ভারতজননী শ্রেষ্ঠ আসনের অধিকারী কিসের জন্যে?

ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের মূল কারণ, ধর্মেকর্মে চূড়ান্ত আধিপত্য লাভের ফলে সে এ জগতের সকল দেশের বরণীয় ও পূজনীয়। এই ধর্মকর্মের মূল অধিনায়ক স্বয়ং ভগবান সহ শত সহস্র রত্নসার ব্রহ্মর্ষি মহর্ষি যোগীপুরুষ মহাত্মার জন্ম কেবল এই ভারতজননীর গর্ভে। ভারতজননীর পবিত্র কোলে লালিত প্রতিপালিত হয়ে তাঁরা নিজেদের আলোয় ভুবনমন্ডল আলোকিত করে রেখেছেন। ঐসব সাধনঅধিনায়ক পুত্রদের জন্য ভারতজননী ভুবনবিদিতা, জগতপূজ্যা, সকল দেশের রাণী।এই দেশ হল সাধুসন্তমহাপুরুষ পুণ্যাত্মাদের লীলানিকেতন। তাঁদের পবিত্র চরণস্পর্শে এ দেশের ধূলার কণায় কণায়, আকাশে বাতাসে জলে সব জায়গাতেই ছড়িয়ে আছে সৎচিন্তা ভগবৎচিন্তার তরঙ্গ। ঈশ্বরভক্তি, সত্যের প্রতি অনুরাগ, নিষ্ঠায় এ দেশের মানুষের রক্তে সদাই বেজে চলেছে আত্মচেতনার সুর। অতীতকালে সনাতন ভারতের সমাজ ছিলো চতুরাশ্রমে শৃঙ্খলাবদ্ধ।চতুরাশ্রম চার পর্বে সমৃদ্ধ, ব্রহ্মচর্য গার্হস্থ্য বাণপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস। তাই দেখা যায় তৎকালীন দেশ সমাজ ছিলো সুষম, সুন্দর, সুসংবদ্ধ। চতুরাশ্রমের প্রথম অংশ ব্রহ্মচর্য হল দ্বিতীয় অংশ গার্হস্থ্যপর্বে প্রবেশের অনুশীলন পর্ব।চতুরাশ্রমের সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রধানই হল এই গার্হস্থ্য আশ্রম।এই আশ্রমই চতুরাশ্রমের ভিত্তিভূমি, সবাই একথা স্বীকার করেছেন। এই দ্বিতীয় পর্বেই বিবাহকার্য অনুষ্ঠিত হয়।ব্রহ্মচর্য পর্বে গুরুসন্নিধানে বা প্রকৃত শিক্ষকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিষ্য বা শিক্ষার্থী প্রথমে নিজ শরীর ও শারীরবৃত্তীয় শিক্ষায় ব্রতী হয়। সুশৃঙ্খল নিয়মানুবর্তিতা, প্রকৃত সংযম শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করে গুরুপ্রদর্শিত কঠোর নিষ্ঠায় সাধনসমরের মাধ্যমে নিজ শরীর অভ্যন্তরস্থ চঞ্চল বায়ুগুলোকে নিজ নিয়ন্ত্রণাধীনে এনে স্থিরবায়ুর জগতে উপনীত হতো ব্রহ্মকুলের সাধন ধারা অনুসরণ করে। এই সাধনধারাই ব্রহ্মবিদ্যা নামে জগতে পরিচিত। শরীর অভ্যন্তরস্থ চঞ্চলবায়ুরূপী প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের সুকৌশল একমাত্র সনাতন ভারতের সমদর্শী মুনিঋষিদের অনায়াস করায়ত্ত ছিল। তাঁদের আশ্রমে তাঁদেরই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিষ্যদের ব্রহ্মচর্য পর্বের অনুশীলন করতে হত। এই পর্বের অনুশীলনকারীদের শরীর, মন, চিন্তাভাবনা সবই আত্মমূখী সচেতনায় সমৃদ্ধ থাকত। জীবনধারণের প্রকৃত অর্থ, উদ্দেশ্য ও কর্তব্য জানা এই অংশেই শুরু হত অর্থাৎ গার্হস্থ্যজীবনে প্রবেশের আগেই শিক্ষার্থী ব্রহ্মচারী নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে পারত, নিজ শরীরস্থ চঞ্চলবায়ুর ইতিপর্ব ও তাদের নিয়ন্ত্রণের সুকৌশলও তার জানা হয়ে যেত অর্থাৎ পরবর্তী গার্হস্থ্যজীবনে প্রবেশের আগেই নিজ শরীরস্থ স্ত্রীরূপী চঞ্চলবায়ুও তার নিয়ন্ত্রণে এসে যেত। চঞ্চলবায়ু নিয়ন্ত্রণের পর গার্হস্থ্যজীবনে প্রবেশ করে যথাকালে যথানিয়মে সে যখন বিবাহ নামক পবিত্র শাস্ত্রবিধির মাধ্যমে স্ত্রী গ্রহণ করবে, সেই বিবাহিত স্ত্রী তখন তার সর্বার্থে জীবনসঙ্গিনী হয়ে যাবে, এটাই শাস্ত্রীয় বিবাহসংবিধান।

সনাতন ধর্মে দশ রকমের সংস্কার আছে। এই দশ সংস্কারের উদ্দেশ্য হল মানবজীবনকে সংস্কৃত বা পরিমার্জিত অর্থাৎ উন্নততম বিশুদ্ধাবস্থায় উন্নীত করা। শাস্ত্র আবার মাতৃগর্ভের জননকে ভৌতিক বা দৈহিক জন্ম আখ্যা দিয়েছেন। এই দৈহিক জন্মলব্ধ সব মানুষকেই শাস্ত্রকারগণ 'শূদ্র' আখ্যা দিয়ে বলেছেন-"জন্মনা জায়তে শূদ্র,সংস্কারাৎ দ্বিজ উচ্চতে" অর্থাৎ সংস্কারের মাধ্যমে সংসারী মানুষ দ্বিজ বা দ্বিতীয় জন্ম অর্থাৎ দ্বিজত্ব প্রাপ্ত হয়।"সংস্কার" শব্দের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শাস্ত্র বলেছেন-"অয়ম্ আত্মন্ অতীন্দ্রিয় গুণঃ" অর্থাৎ সংস্কার হল অতীন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয় বহির্ভূত আত্মিক বিষয়। দশবিধ সংস্কারগুলি হল- গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম, নামকরণ, নিষ্ক্রমণ, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন পরিশেষে বিবাহ। আবার, যাজ্ঞবল্ক্যমতানুসারে মোট সংস্কারসংখ্যা হল এগারোটা। উপরোক্ত দশকে সাথে নিয়ে তার সাথে ষোড়শ বর্ষের "কেশান্ত"কে যোগ করে হল যাজ্ঞবল্ক্য মতের মোট এগারোটা সংস্কার। সব শাস্ত্রকারগণ এককথায় বিবাহকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসাবে পরিগণিত করেছেন। চতুরাশ্রমের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রম গার্হস্থ্যেইবিবাহ অনুষ্ঠান হয়। অতীতদিনের মহান প্রেমিক সত্যদর্শী মুনিঋষিবৃন্দ এইভাবে শাস্ত্রসম্মত বিবাহের মাধ্যমে একটা সুস্থসমাজের দিক্ নির্দেশ দিয়ে গেছিলেন। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে সমাজে বিধিবদ্ধ বিবাহপদ্ধতি শাস্ত্রানুযায়ী শুরু হয় উদ্দালকপুত্র ঋষি বালক শ্বেতকেতুর সময় থেকে, সমাজকে সুসংহত করবার জন্যে।প্রকৃত সমাজ সংস্কারক বোধহয় উদ্দালকই।এইভাবের বিবাহের মাধ্যমে সংসারপ্রবাহ সতত চলমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে আপনধারায়।

বিবাহ কি?

বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিবাহ হল স্বামী স্ত্রীর মিলন। "বি-বহ্+অ(ঘঞ্)" হল বিবাহ শব্দের ব্যকরণগত ব্যুৎপত্তি।"বহ" প্রাপণে-অর্থাৎ বহন করা।যার দ্বারা বিশেষ রূপে বহন বা প্রাপন হয়, সেটারই নাম বিবাহ। বি-বিশেষরূপে, বহ-বহন, বোঝা বহন করা। বাহ্যিক বিবাহে স্বামীকে স্ত্রীর সাথে বাহ্যসংসারের বোঝা বহন করতে হয়। কিন্তু অন্তর্জগতের অন্তর্লক্ষ্যে বিবাহের তাৎপর্য ভিন্ন এবং বাহ্যিক ব্যাখ্যার বিপরীত। বিবাহের অন্যান্য নাম হল-উদ্বাহ, উপযাম, উপযম, পরিণয়। উদ্বাহ=উৎ-বহ+ঘঙ্।উৎ-উপরে,বহ-বহন করা, নিয়ে যাওয়া অর্থাৎ যার সাহায্যে উপরে বা উর্দ্ধে অর্থাৎ উন্নততম জীবনে যাওয়া যায়। উপযাম= উপ অর্থাৎ উপরে, সমীপে,যাম অর্থে যাওয়া অর্থাৎ যার সাহায্যে উপরে যাওয়া যায়। উপযম=উপ অর্থে উপরে, যম অর্থে এখানে সংযম বা নিবৃত্তি। যার দ্বারা প্রবৃত্তি মার্গের জীবন উন্নত হয়ে নিবৃত্তি মার্গে পৌঁছানো যাবে, সেটাই তো বিবাহ ।পরিণয়= পরি+ ‌‌‌‌‌ণী+অন। পরি - সর্বতোভাবে, ণী - নিয়ে যাওয়া, নেওয়া। পরিণয় অর্থে সর্বতোভাবে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া অর্থাৎ ভগবৎপ্রাপ্তি ঘটানো। এইভাবে, বিবাহের মূল লক্ষ্য ও অন্তর্নিহিত অর্থ হল দৈহিক স্থূল বাহ্য জীবনকে উন্নত পর্যায়ে উন্নীত করে আত্মময় জীবন লাভ করা।

বিবাহের সাধারণ অর্থ মিলন। মিলন অর্থে দুইয়ের মধ্যে যে দূরত্ব বা ব্যবধান,তার বিলোপ সাধন করে পরস্পরকে একীভূত অবস্থায় আনা। বহির্জগতে মিলন অর্থে শারীরিক মিলন, কিন্তু অন্তর্জগতে তা হল আত্মিক মিলন অর্থাৎ চঞ্চল প্রাণের সাথে স্থিরপ্রাণের মিলন, বহিরঙ্গের সাথে অন্তরঙ্গের মিলন, আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন।। মিলনের বিপরীত শব্দ বিচ্ছেদ, বিয়োগ। দুই পৃথক বা বিযুক্ত জিনিষের দূরত্ব দূরীভূত করে একীভূত বা  সংযোগ করার নাম মিলন। মাতৃজঠরে থাকাকালীন জীব সবসময় অন্তর্মুখে যোগযুক্ত অবস্থায় ছিল, তখন তার শ্বাসপ্রবাহ ছিল অন্তর্মুখী সুষুম্নায়, যথাসময়ে ঐ একই জীব সংসারে ভূমিষ্ঠ হবার পরই তার শ্বাসপ্রবাহধারা বহির্গতিতে আসার কারণে সে জন্ম নেবার মুহূর্তেই বৈষ্ণবী মায়ার কবলে পড়ে  যোগবিচ্যুত অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়।এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম ও শৃঙ্খলা। সংসারে যোগবিযুক্ত অবস্থায় থাকতে থাকতে ঐ জীব স্বাভাবিক কারণে মাতৃজঠরে থাকাকালীন নিজের যোগযুক্ত অবস্থার কথা পুরোপুরি ভুলে যাবে। এই পূর্ণ বিযুক্তি বা বিচ্যুতির ফলে সংসারে প্রাণভগবানের সাথে ঐ জীবের কোন যোগাযোগ, তাঁর পরিচয় বা তৎসম্বন্ধে কোন ধারণা বিন্দুমাত্র থাকবে না। সব ভুলে গিয়ে নিজের প্রকৃত উৎসের সাথে বহু যোজন দূরত্ব রচিত হবে তার। যার দ্বারা এই ব্যবধান দূর হয়,সামীপ্য বা নৈকট্য অবস্থা তৈরী হয়,সেটাই বিবাহের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য। প্রাচীন ভারতের ত্রিকালজ্ঞ প্রেমিক ঋষিবর্গ এইভাবেই সংসারবাসীর সার্বিক কল্যাণের ব্যবস্থা করে গেছেন।

বিবাহে পাত্র ও পাত্রী থাকে। বিবাহের দিন পাত্রকে "বর" এবং পাত্রীকে "কনে" বলা হয়।'বর" অর্থে বড় বা শ্রেষ্ঠ। আর "কনে" অর্থে ছোট বা কনিষ্ঠা।এককথায় "কনে" শব্দের অর্থ "বরাকাঙ্খী কনিষ্ঠা"। কনে হল "কন্যা", কনিষ্ঠার অপভ্রংশ। কনেকে "দুহিতা"ও বলে।"দুহিতা"র অর্থ যিনি একই জন্মে অর্থাৎ একই জীবনে দুই কূলের হিত সাধন করেন। দুই কূল অর্থে পিতৃকুল এবং স্বামীকুল। পিতৃকূলে তার জন্মগ্রহণ এবং উপযুক্ত বয়স অবধি সেখানে তাকে থাকতে হয়। এই সময়ে পরবর্তী কূলে অর্থাৎ স্বামীকূলে কিভাবে তাকে  বাকী জীবনটা সুস্থভাবে কাটাতে হবে তার উপযুক্ত শিক্ষা দুহিতাকে পিতৃকূলেই নিতে হয়। বিবাহের দিন বরের নারায়ণ অবস্থা হয়, বর সেজেগুজে বরাসনে বসে থাকেন। ঐদিন বর কাউকে প্রণাম করেন না, করতে নেই। কারণ, নারায়ণ অবস্থায় থাকার জন্যে বরের কোন নমস্য থাকে না। বিবাহের দিন বরের আবার "সাধু" আখ্যা হয়। গীতাও এই অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন সুচারুভাবেই-" সদ্ ভাবে সাধুভাবে চ সদিত্যেতৎ প্রযুজ্যতে"। বিবাহকার্য শুরুর আগেই বরকে জিজ্ঞাসা করা হয়-"সাধু ভবান্ আস্তান্" অর্থাৎ আপনি সাধুভাবে আছেন তো? বরকে এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়-"সাধ্বায়মাসে", এর অর্থ হল, "হ্যাঁ, আমি সাধুভাবেই আছি"। বরের এই স্বীকারোক্তির পরেই বিবাহের অন্যান্য কর্মানুষ্ঠান শুরু হয়।

প্রকৃতপক্ষে সংসারী সাধারণ মানুষ অন্য সময় "বর" অবস্থায় থাকে না।"বর" মানে বড় বা শ্রেষ্ঠ। বরের বিপরীত অবর, ন বর = নিকৃষ্ট। অর্থাৎ সাধারণ সংসারী জীব সর্বদা অবর অবস্থা বা নিকৃষ্ট অবস্থায় আছে। এই নিকৃষ্ট অবস্থা ছেড়ে সাধনার মাধ্যমে উন্নত অবস্থা লাভ করে আগে সাধু হতে হয়। সাধু(সৎ)অবস্থায় উপনীত না হলে অর্থাৎ বর না হলে বা হতে না পারলে কনের সাথে বিবাহ হবে না।

বিবাহের দিন বরকে দর্পণ ধারণ করতে হয়। দর্পণ অর্থে যার মাধ্যমে নিজ অবয়বের দর্শন হয়। বাহ্যিক দর্পণ কাঁচের তৈরী, কিন্তূ বিবাহের দর্পণ অন্য রকমের। একটা লম্বা দন্ড, দন্ডের ওপরে চকচকে গোলাকার একটা ধাতুর পাত, এটা আসলের প্রতীকরূপ। আসল হল,শরীরের পেছন দিকে সোজা সরল মেরুদন্ডের ওপর দিকে গোলাকার উজ্জ্বল দর্পণরূপী অখন্ডমন্ডলাকার বিরাজমান। এই অখন্ডমন্ডলাকাররূপী দর্পণ লাভ করতে পারলে সাধু বা সৎ অবস্থা আপনাআপনি এসে যায়, এই অবস্থায় আত্মরূপের দর্শন হয়। শাস্ত্র ঐ অবস্থাকে "ধৃতি" বলেছেন। এই অবস্থা লাভ হলে জীবের চঞ্চল মন  আপনাআপনি শান্ত ও স্থির হয়ে যায়, ইন্দ্রিয়েরাও কর্মহীন হয়ে পড়ে। "বর" সাধুপুরুষ। সাধুকে অর্চনা বন্দনা করা শাস্ত্রীয় বিধি। সাধুরূপী বরকে সংসার এরপর পাদ্য অর্ঘ্য মধুপর্ক ইত্যাদি দিয়ে অর্চনা করে। বিবাহ অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্যায়ে কনেকে পরবর্তী কোন নির্দিষ্ট লগ্নে বরের সামনে উপস্থিত করা হয়। নির্দিষ্ট লগ্নেই বিবাহকার্য সম্পন্ন করা হয়, অলগ্নের বিবাহকে শাস্ত্র সম্মতি দেননি। তাই সংসারে অলগ্নে কোন বিবাহের বিধি নাই। লগ্ন= লগ্+ক্ত। "লগ" অর্থে লাগা বা সংযুক্ত হওয়া। যখন আত্মদেবতাতে সংযুক্ত হয়ে স্মরণমনন হয় অর্থাৎ জীবাত্মা পরমাত্মায় সংযোগ হয়, তখনই শুভলগ্ন আসে। এই শুভলগ্নেই বিবাহের বিধি সমাজে এখনও প্রচলিত। যদিও বর্তমানে সমাজের বিবাহবিধি কেবলমাত্র বহিরঙ্গেই সীমাবদ্ধ। অন্তর্জগতে বিবাহের লক্ষ্য হল প্রকৃতি-পুরুষের মিলন, জীবাত্মা-পরমাত্মার মিলন, চঞ্চলপ্রাণ-স্থিরপ্রাণের মিলন অর্থাৎ গীতোক্ত "মন্মনা" অবস্থা। মনকে নিয়ে গিয়ে মনেতে রাখা, চঞ্চল মনকে(প্রকৃতিকে) নিয়ে স্থির মনে(পুরুষে) রাখাটার নামই "মন্মনা'" অবস্থা, এই মন্মনার সবটাই যে কঠোর সাধনসাপেক্ষ। এই মন্মনারূপী শুভলগ্ন সমাগত হলে পুরুষপ্রকৃতির বিবাহ পরবর্তী অন্যান্য অনুষ্ঠান শুরু হয়, যার প্রত্যেকটা অংশই ব্রহ্মবিদ্যারূপী যোগশাস্ত্রের অনুমোদিত। অতীতকালে যিনি এহেন বিবাহরূপী পুণ্যকার্যের পুরোহিত হতেন, তিনিই শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী "ব্রাহ্মণ"(অর্থাৎ 'ব্রহ্ম যঃ জানতি', যিনি স্বয়ং ব্রহ্মকে জেনেছেন)। যিনি দেহরূপ পুরীর মধ্যে সদাই অবস্থান করে দেহরূপ পুরীর হিত সাধন করতে থাকেন, তিনিই পুরোহিত। অন্তর্জগতের নিরাকার পুরোহিতরূপের বাহ্য অবয়বী ব্রাহ্মণের সামনে স্বয়ং পৃথিবীপতিও করজোড়ে তাঁর শ্রীমুখনিসৃত আদেশের জন্যে শঙ্কিতভাবে নতমস্তকে দন্ডায়মান থাকতে বাধ্য থাকতেন। সমগ্র শাস্ত্র ব্রাহ্মণের স্বাভাবিক করায়ত্ত,"এবংবিধা বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রাহ্মণো মুখে"(গীতা)। কারণ, সমস্ত পুজাপদ্ধতির মধ্যে যে ভূতশুদ্ধি, ন্যাস, প্রাণায়াম ইত্যাদি যে সব বায়ুক্রিয়া নিহিত আছে, তা করা  উপযুক্ত ব্রাহ্মণ ছাড়া কখনই সম্ভব নয়। বর্তমানের ব্রাহ্মণেরা হলেন ব্রাহ্মণবংশে জাত,সাধনার মাধ্যমে ব্রাহ্মণত্বে উন্নীত তাঁরা নন।যোগপথ অবলম্বনে ব্রাহ্মণত্বে উপনীত না হওয়া ব্রাহ্মণদের দ্বারাই বর্তমানের পূজাপদ্ধতি চলছে বলে সমাজে সংসারে এত অস্বাভাবিকতা।

ভারতীয় সনাতনধারার বিবাহ হল ধর্মীয় জীবনের চর্যা এবং সৃষ্টিধারা অব্যাহত রাখার উৎসব। ধর্মীয়ব্যাকরণের সূত্রানুসারে পতিরও(স্বামীর) ধর্মকর্মের সহকারিণী তথা সাধনযজ্ঞের "সধর্মচারিণী" বলে "পতি" শব্দের স্ত্রীলিঙ্গে "পত্নী" শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে, "পত্যুর্নো যজ্ঞসংযোগে" সূত্রানুসারে। পতি+স্ত্রী ঈ(ঙীপ্),'ন্'আগম,যজ্ঞসংযোগে; পতি-নী(স্ত্রীলিঙ্গ) =পত্নী, পতিকৃতযজ্ঞফলভোক্ত্রী, বেদবিধানে বিবাহিত স্ত্রী, পাণিগ্রহণাদিধর্ম্মযুক্তা নারী হলেন পত্নী। "পত্নী"কে পালয়িত্রী আখ্যা দিয়েছেন স্বয়ং ঋগ্বেদও(১/২২)। বিবাহরূপী ধর্মীয় জীবনচর্যাই হল শাস্ত্রমতে মনুষ্যজীবনের মুখ্যকর্ম, এতে পত্নীর অপরিহার্যতা শাস্ত্রে নানাভাবে উল্লেখ আছে। তাই পত্নী হয়ে যান তাঁর নিজ স্বামীর "গৃহিণী সচিবঃ সখী প্রিয়া শিষ্যা ললিতাকলাবিধৌ" হিরণ্ময়ী সহধর্মিণী অর্থাৎ সর্বার্থে জীবনসঙ্গিনী।

বিবাহ পরবর্তীকালে বর কনের স্বামী হিসাবে সংসারে পরিচিত হন। "স্বামী" শব্দটাতে দুটো পদ "স্ব" আর "আমি" আছে। "স্ব" অর্থে "আমি" অর্থাৎ প্রকৃত আমি, অন্তর আমি, অন্তর্যামী অর্থাৎ স্থিরপ্রাণ। আর "আমি" অর্থে চঞ্চল প্রাণ, অর্থাৎ প্রকৃতি। ভারতীয় নারীর চোখে, তাঁর শরীরে শরীরীরূপে যে অব্যক্ত স্থিরপ্রাণচৈতন্য সূক্ষ্মভাবে নিত্য বিরাজমান, সেই অন্তর্নিহিত সূক্ষ্মস্বরূপের ঘনীভূত স্থূল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বহিরঙ্গরূপই তাঁর স্বামী। এইভাবের সাধনভজনান্তে স্ত্রী নিজ চোখদুটোকে শাম্ভবী মুদ্রায় রেখে যখন অন্তর দেবতাকে দর্শন করতে গিয়ে নিজ অন্তপুরের হিরন্ময় সিংহাসনে আসীন পতিকে দেখতে পান, এটা হল স্ত্রীর প্রাথমিক ভগবান দর্শন। এই কারণে সংসারের সব বিবাহিত স্ত্রীরা নিজ নিজ পতিকে দেবতাস্বরূপে মানেন। সেজন্য ভারতীয় সমাজের বিবাহ একটি পুণ্যময় ব্রতস্বরূপ, চিরস্থায়ী, সারা পৃথিবীতে এমনটি আর দুটি নেই। অন্যদিকে, পাশ্চাত্য বিবাহ পদ্ধতি সাময়িক আইনী চুক্তি বিশেষ। শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ও চঞ্চল মনকে নির্ভর করে নির্মিত এই চুক্তিবিবাহ আপামর পাশ্চাত্যবাসী বেশীরভাগের কাছে সে কারণে চিরস্থায়ী হয় না, বরং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষণস্থায়ী। চুক্তিতে থাকে সর্ত, আর ব্রতে থাকে তপস্যা। তপস্যা নিরবধিকালের,সর্বাংশে নিষ্কাম, কিন্তু  চুক্তি ক্ষণকালের এবং পূর্ণাঙ্গে কামগন্ধে ভরপুর। ব্রতে থাকে উৎসর্গের সংকল্প, আত্মোপলব্ধির সাধনা, থাকে আনন্দময় যোগ, চুক্তিতে থাকে শুধু ভোগ, সম্ভোগ।

বিবাহিত নারী সধবা পদবাচ্য। "ধব" অর্থাৎ পতির সাথে সদা যুক্তাবস্থাই সধবা। চঞ্চল প্রাণ সদাই স্থিরপ্রাণের আশ্রিত বা অধীনস্থ। তাই সংসারে স্ত্রী সবসময়ে স্বামীর অনুগত থাকবেন, এর ফলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আকর্ষণ ক্রমাগত এমনভাবে বাড়তে থাকবে যে স্বামী স্ত্রী ছাড়া কোনসময়েই থাকতে পারবেন না। অন্তর্জগতের  হিসাবে ইন্দ্রিয় ধর্মে রত থাকাই পরাধীনতা এবং স্বধর্মে অর্থাৎ স্ব এর অধীনে অর্থাৎ স্বামীর অধীনে থাকাটাই স্বাধীনতা। অন্যকথায় বলতে গেলে বলতে হয় স্বধর্মে অর্থাৎ আত্মধর্মে (স্বামীরূপী অন্তর্যামীতে) বশীভূত হয়ে আত্মারামে লেগে থাকাই স্ত্রীস্বাধীনতা। এই প্রকৃত অন্তর্মুখী স্ত্রীস্বাধীনতা আমাদের দেশ ভারতবর্ষের একান্ত নিজস্ব পবিত্র সম্পদ। আজকাল সবই বহির্মুখী হবার কারণে সমাজ সংসার থেকে আসলটা হারিয়ে গেছে, নকলে ভরে গেছে দুনিয়া।তাই সমাজে সংসারে নানা সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির জন্যে কিংবা শোভা বর্ধনের জন্যে জননীস্বরূপা স্ত্রীজাতির সৃষ্টি হয়নি এ জগৎ সংসারে। ঠিক যেমন ফুল কেবলমাত্র দৃষ্টিসুখরঞ্জনের জন্যে কিম্বা গন্ধ বিতরণের জন্যে জগতে সৃষ্ট হয়নি। যাঁরা পরমাত্মক্ষেত্রে নিত্য বিচরণশীল সত্যদর্শী মহাত্মা, তাঁরা ফুলের বাহ্যিক রূপের মধ্যে না থেকে ঐ ফুলের সূক্ষ্মতত্বে অচিরে প্রবেশ করে দেখেন সৃষ্টিকর্তা ঐ ফুলের বীজকোষঅণুর মধ্যে মাতৃরূপকে কি সুন্দররূপে সৃজন করে রেখেছেন। বাহ্যিকরূপ দেখেও তাঁরা আনন্দিত, ভাবছেন ঐ ফুলের অপরূপ রূপটা সত্যিই মনোহর, সাথে সাথে আবার ভাবছেন, যিনি ঐ সুন্দর ফুলটা সৃষ্টি করেছেন তিনি তাহলে কতটা সুন্দর। এইভাবে জ্ঞানীরা বিচার করেন। ফুল যেমন ফল উৎপাদনের হেতু, তেমনই জননীস্বরূপা মাতৃজাতিও বংশরক্ষার কারণ। বিবাহের পরে যিনি কেবলমাত্র স্ত্রী ছিলেন, বংশরক্ষার কারণে হয়ে গেলেন জননী।স্ত্রীর জননীতে রূপান্তর দ্বিজত্ব অর্জনের মতই নারীজীবনের একটা শুভময় ঘটনা। এ ছাড়াও অন্য একটা সর্বমহৎ কারণও আছে। স্বামীর মুক্তিলাভের একান্ত সাহায্যকারীনি হলেন শাস্ত্রমতে বিবাহিত স্ত্রী। সাধকস্বামী তাই কামনা করে অন্তর দেবতার কাছে প্রার্থনা জানিয়ে  বলছেন-"ভার্যাং মনোরমাং দেহিং মনোবৃত্তিঅনুসারিণীম্‌"(চণ্ডী)।সাধকস্বামী ইচ্ছাপ্রকাশ করছেন, তাঁর ভার্যা যেন তাঁর মনোরমা ও তাঁর মনের বৃত্তির অনুসারিণী হয়। সাধক-স্বামীর  আত্মাভিমুখী ইচ্ছাশক্তি হবেন তাঁর ভার্যা অর্থাৎ দৈবী প্রকৃতিরূপিণী সুমঙ্গলী স্ত্রী সাধকস্বামীর মনের পক্ষে মনোরমা অর্থাৎ প্রীতিজনিকা। সাধকস্বামী পুনরায় কামনা করে বলছেন-

"ওঁ মম ব্রতে তে হৃদয়ং দদাতু,
মম চিত্তমনুচিত্তং তে অস্তু ।
মমবাচমেকমনা জুষাব বৃহস্পতিস্ত্বা নিয্যুক্ত  ।।"

'আমার জীবনব্রতে, আমার সাধনাব্রতে তোমার হৃদয় অর্থাৎ মনোসংযোগ দান করো, আমার চিত্তের অনুগামিনী তুমি হয়ে থাকো। আমরা যেন সবসময়ে এক প্রাণমন হয়ে থাকতে পারি। ভগবান তোমাকে আমার সঙ্গে সদাই যুক্ত করে রাখুন।' সাধকস্বামী আরও বলছেন,

"ওঁ অনুপাশেন মণিনাপ্রাণসুখেন গ্রন্থিনা।
বধ্নামি সত্যাগ্রন্থিনা মনশ্ত হৃদয়ং চ তে।।"
অন্ন প্রাণ মন ও সত্যের গ্রন্থিতে তোমায় আমার সাথে যুক্ত করে নিলাম।
পরিশেষে সাধকস্বামীর আনন্দ ঘোষনা-
"যদেতৎ হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।।"

তোমার হৃদয় হোক আমার,আমার হৃদয় হোক তোমার,তুমি কেবলমাত্র আমারই হয়ে আমার সাথে সবসময় থাকো, আমিও কথা দিলাম তোমার সাথে সবসময় আমিও থাকবো, আমার কথার নড়চড় কখনও হবে না। সতী অনুসূয়াও এইভাবে দুনিয়ার সব স্ত্রীদের সম্ভাষণ করে বলেছেন, তোমাদের "একই ধর্ম একই ব্রতনিয়মা,কায়বচন মম পতিপদ প্রেমা।" আর কোনো কাজ নেই তোমাদের। জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং অত্যন্ত মূল্যবান। জীবন সফল করবার জন্যে স্বামী ছাড়া অন্যদিকে মন দিয়ো না।

এইভাবে পবিত্র এই দেশের অতীত দিনের সমগ্র ঋষিকুলের স্ত্রীরা সবাই তাঁদের স্বামীদের মুক্তিমার্গের একান্ত সাহায্যকারিণী হয়ে ছিলেন বলে এখনো তাঁরা বর্তমানের নমস্য হয়ে আছেন, থাকবেনও চিরকাল। শাস্ত্রমতে বিবাহিত নারীরাই স্ত্রী পদবাচ্য। সংসারে নারী যেমন পুরুষকে প্রলুব্ধ করতে পারে, তেমনই পুরুষরাও নানা ছলাকলা নানা প্রলোভনে নারীদের প্রলুব্ধ করতে সক্ষম। এ কারণে শাস্ত্র কঠোরভাবে স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষকে পিতৃবৎ জ্ঞান করতে সংসারের সব স্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে নিজের বিবাহিত স্ত্রী ব্যতিরেকে অন্য নারীদের মাতৃবৎ জ্ঞান করতে স্বামীদের কঠোরতম নির্দেশ দিয়েছেন। যারা এই নির্দেশ পালন করবেন, তারা এমনিতেই অনেকটা এগিয়ে যাবেন।এটা সাধনার মাধ্যমে মুক্তিযাত্রার প্রধানতম প্রাথমিক সর্ত। সাধনার পরম শত্রু কামকে জয় করবার করার উপায় ও নির্দেশ দিতে গিয়ে ব্রহ্মবিদ্যার উদগাতা মহান ঋষিবৃন্দ এই শিষ্টাচার উপহার দিয়ে সমাজকে বাঁচিয়ে গেলেন। সাধকের সাধনাবস্থায় যদি দীপ্তিস্বরূপা ধর্মপত্নী সঙ্গে থাকেন, তাহলে কামদেব তাঁর স্বামীকে কোনভাবেই আক্রমণ করতে পারবেন না, বরং ভয় পাবেন। কাম পরাভূত হলে মুক্তিলাভ অবশ্যই সহজ হয়ে যায়। এ কারণে ধর্মপত্নীই স্বামীর ধর্মপথের একমাত্র সহায়, নিজের মুক্তির জন্যে নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে স্বামীরও উচিত স্ত্রীকে ধর্মাচরণে সাহায্য করা। এইভাবে স্বামী স্ত্রী উভয়ে সাধনসমরের মাধ্যমে আত্মানন্দে ব্রহ্মানন্দে ব্যাপৃত থাকলে কেউ তাঁদের অনিষ্ট করতে বিন্দুমাত্রও সাহস করবে না। কঠিন প্রস্তর খন্ডও এই ধরনের সাধকস্বামীস্ত্রীকে দেখে ভয়ে কম্পমান হবে, কারণ তাঁদের যুগল মূর্তি তখন যে কঠিন প্রস্তরখন্ডের চেয়েও কঠিনতর। স্বয়ং মহাকালও স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন সাধ্বী বজ্রকঠিন মনস্ক বেহুলাকে দেখে, সতীস্ত্রীর মৃত স্বামী লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন।আবার, ফুলও তাঁদের দেখে অভিমান শূন্য হবে। কারণ, এতদিন ফুল জানতো এই পৃথিবীতে সেইই বোধহয় একমাত্র সুন্দর, একমাত্র কোমল, কিন্তূ আদর্শ স্বামীস্ত্রী যে কোন সুকোমল ফুল অপেক্ষাও কোমলতর, তাদের থেকেও সুন্দরতর। আদর্শ স্বামীস্ত্রীকে দেখে স্বর্গের দেবতারাও অত্যন্ত খুশী হন।"লক্ষ ঘুড়ির দু একটি কাটে, হেসে দাও মা হাতচাপড়ি"। এক লক্ষ যুগলের মধ্যে যদি মাত্র দু একটিও মুক্তি পেয়ে যান, তাহলে জগৎজননী মা করতালি দিয়ে তাদের সম্বর্ধিত করে হর্ষোল্লোসিত হয়ে পড়েন। সংসারে এমন স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক, একজন ছাড়া অন্যজন সর্বাংশে অস্তিত্বহীন।

"সস্ত্রীকো ধর্মামচরেত্", সারসত্য এই ঋষিবাক্য।।

 

(অবসর-এ প্রকাশিত একটি প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ - হিন্দু ধর্ম ও নারী নির্যাতন )


লেখক পরিচিতি - বাহ্যজীবনের পেশায় দন্ত-চিকিৎসক, অন্তর্জীবনের নেশায় সনাতন ধর্মীয় ভাবধারা অনুশীলন।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।