প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

পুরানো সাময়িকী ও সংবাদপত্র

মার্চ ৩০, ২০১৭

 

অঞ্জলি

দীপক সেনগুপ্ত

      সেকালের সব পত্রিকাই যে সব সময় ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে বা অন্য কোনো পত্রিকায় প্রচারিত ধর্মমত বা নীতিকে খণ্ডন করে নিজস্ব চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রকাশিত হত তা নয়। সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বা জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলার মানসিকতা নিয়েও পত্রিকা বেরোত। মূলত সমাজ সেবাই ছিল এর লক্ষ্য। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও সব পত্রিকাই যে পাঠকসমাজে আদৃত বা দীর্ঘস্থায়ী হত তা নয়।  চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘অঞ্জলি’  ছিল এ রকমের একটি মাসিক পত্রিকা। রাজেশ্বর গুপ্তর সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয় ১৩০৫ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ। প্রথম সংখ্যার ‘উদ্দেশ্য’ শিরোনামে বলা হয়েছে –

    “এই খানি শিক্ষা বিষয়ক মাসিক পত্রিকা, বালক বালিকাদিগকে সুশিক্ষিত করা ইহার প্রাণ।
     “এই শিক্ষাদান কার্য্যে পিতামাতা প্রভৃতি অভিভাবকদিগের বিশেষতঃ শিক্ষক ও ছাত্রদিগের সাহায্য করা ইহার উদ্দেশ্য।
     “এই উদ্দেশ্যব্রত সাধনে ভগবান আমাদের সহায় হউন এবং আমাদিগকে আশীর্ব্বাদ ও সিদ্ধি দান করুন।
     “ আমি একাকী এই ব্রত উদযাপন করিব বলিয়া গ্রহণ করি নাই, এবং করিতে পারিব বলিয়াও মনে করি না। সকলের সমবেত চেষ্টা না হইলে একটি সামান্য পিনও প্রস্তুত হয় না, দুর্ব্বিসহ মানবচরিত্রের সহস্র মুখে প্রধাবিত স্রোতের কথা তবে আর কি। কতকগুলি প্রবাদ লিখিয়া পত্রিকার কলেবর পূর্ণ করা উদ্দেশ্য হইলে তাহা হয়ত দুচার জন মিলিয়া করিতে পারিতাম, - সে উদ্দেশ্য নয়। ভাষার পারিপাট্য সম্পাদন করিয়া পাঠকমণ্ডলীর তৃপ্তিসাধনও আমাদের ব্রত নয়। মানুষ শিক্ষা প্রভাবে মানুষ হয়। সেই শিক্ষা বিষয়ে মানব মণ্ডলীর কথঞ্চিৎ সেবা করা আমাদের কার্য্য।  প্রার্থনা করি, অভিভাবক, শিক্ষক, পরিদর্শক ও ছাত্রমণ্ডলী সকলেই অনুগ্রহ করিয়া আমাদিগকে আশীর্ব্বাদ ও সহায়তা করিবেন। আগামী বারে বিস্তারিতরূপে এই বিষয়ে নিবেদন করিতে বাসনা রহিল।”

     পত্রিকার নামকরণ প্রসঙ্গে সম্পাদক ‘অঞ্জলি’ শব্দটির বিভিন্ন অর্থ ব্যাখ্যা করে নামকরণের যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘অঞ্জলি’-র একাধিক অর্থ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে –

“ অঞ্জলি – পুষ্পপত্র চন্দন প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন উপকরণপূর্ণ বলিয়া এবং উহার প্রত্যেকটিই সতেজ, টাটকা ও পবিত্র বলিয়া।    অঞ্জলি – দেব দেবীর চরণে, বিশেষতঃ সারস্বত উৎসবে বিদ্যাদেবীর চরণকমলে অর্পিত হয় বলিয়া।     অঞ্জলি – পুষ্পাঞ্জলি, জলাঞ্জলি, কনকাঞ্জলি, প্রেমাঞ্জলি, শোকাঞ্জলি প্রভৃতি সুন্দর, স্বাদু, তরল, উজ্জ্বল ও ভাবপুর্ণ শব্দসমূহের অঙ্গ বলিয়া।    অঞ্জলিতে – দীনভাব, দেবভাব, শ্রদ্ধা, ভক্তি, শুদ্ধি ও প্রসন্নতা একত্র মিলিত বলিয়া, পূজ্য, পূজা ও পূজক এক গুচ্ছে গ্রথিত বলিয়া, আমি এই পত্রিকার নাম “অঞ্জলি” রাখিলাম।”

     পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ১৩০৫-এর ১লা বৈশাখ বেরোলেও দ্বিতীয় সংখ্যায় একটি ‘নিবেদন’ বিজ্ঞাপিত হয়। এটিতে সম্পাদক জানিয়েছেন –

     “ প্রায় চারি বৎসর হইল “অঞ্জলির” অনুষ্ঠান পত্র বাহির করিয়াছিলাম। কিন্তু দৈব ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা নিবন্ধন সঙ্কল্পিত সময়ে “অঞ্জলি” প্রকাশ করিতে পারি নাই। এতদিন পরেও যে প্রকাশ করিতে পারিলাম ইহাই ভগবানের বিশেষ প্রসাদ বলিয়া গ্রহণ করিতেছি।
     “ পূর্ব্বে যাঁহারা অনুগ্রহ করিয়া গ্রাহক হইয়াছিলেন তাঁহাদের অনেকে এখন নানা স্থানে পরিবর্ত্তিত হইয়াছেন, আমরা অনুসন্ধান করিয়া তাঁহাদের নিকট পত্রিকা প্রেরণ করিলাম।  আশা করি তাঁহারা পত্রিকা গ্রহণ করিয়া আমাদিগকে অনুগৃহীত করিবেন।
      “ অনুষ্ঠান পত্রে পত্রিকার আকার ডিমাই তিন ফর্ম্মা হইবে বলিয়া লিখিত ছিল, এখন রয়েল তিন ফর্ম্মা আকারে প্রকাশিত হইল। পত্রিকার আকার একটুকু বড় হইল বলিয়া মূল্য অধিক করি নাই। আমাদের পূর্ব্ব প্রতিশ্রুত এক টাকাই পত্রিকার মূল্য রহিল।
     “ আমরা অনেক শ্রদ্ধাস্পদ ও প্রেমাস্পদ মহোদয় ও বন্ধুদের নিকট পত্রিকা প্রেরণ করিলাম। আশা করি, সকলেই পত্রিকা গ্রহণ করিয়া আমাদের কার্য্যের সাহায্য ও আমাদিগকে কৃতার্থ করিবেন।”

     অতএব বোঝা যাচ্ছে, পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা অনেক আগেই করা হয়েছিল কিন্তু কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সেটা হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় সংখ্যাতেই ‘উদ্দেশ্য ও প্রার্থনা’য় সম্পাদক পত্রিকার উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এটা পড়লে তখনকার শিক্ষিত লোকের মানসিকতা ও সমাজের যে বিষয়ের উন্নতিকল্পে পত্রিকাটি মনোযোগী হয়েছিল তার গ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে একটি নির্দিষ্ট ধারনা গড়ে ওঠে।  শিক্ষা বিষয়ক পত্রিকাটিতে ব্যবহৃত ভাষাও লক্ষণীয়।  এ কারণেই সম্পাদকের এই বক্তব্যটি  একটু দীর্ঘ হলেও সম্পূর্ণ রচনাটিই তুলে দিচ্ছি। ‘উদ্দেশ্য ও প্রার্থনা’ শিরোনামে লেখা হয়েছে –  ( বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে )

     “ পত্রিকা প্রচার করিয়া মান সম্ভ্রম বা জীবিকা অর্জ্জন করা আমার লক্ষ্য নয়।  যিনি যে কার্য্যে ব্রতী হন ভগবৎ প্রসাদে সেই কার্য্যেই তাঁহার প্রাণে নব নব প্রতিভার আবির্ভাব হইয়া থাকে।  শিক্ষাদানকার্য্যে যাঁহারা নিযুক্ত আছেন তাঁহাদের মস্তকেও যে ভগবানের সে আশীর্ব্বাদ প্রচুর পরিমাণে নিপতিত হয় তাহাতে আমার বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই ! যদি কেহ কেবল অর্থোপার্জ্জনার্থ শিক্ষা কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন এবং বরাবর সেই লক্ষ্যই সাধন করিয়া থাকেন তাহার কথা স্বতন্ত্র;  কিন্তু এরূপ যে কেহ আছেন আমি তাহা বিশ্বাস করিতে পারি না। কোন শুভকার্য্যে প্রাণ মন হৃদয় ঢালিয়া দিলে তাহাতে দক্ষতা ও সিদ্ধিলাভ করা সনাতন সত্য। তবে অবশ্যই উহা অধিকার ভেদে বিভিন্ন হইয়া থাকে। যাহার যেরূপ শক্তি সেরূপই উহার পরিস্ফূরণ হয়।
     “ শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ে শিক্ষা দেন, ছাত্রগণ শিক্ষা করেন, অভিভাবকগণ স্ব স্ব বালক বালিকার গৃহশিক্ষার দায়ী, পরিদর্শকগণ সুশিক্ষার মন্ত্রণাদাতা ও কার্য্যনিয়ামক।  ইহাদের প্রত্যেকেই বিশ্বস্তভাবে স্বকর্ত্তব্য সাধনে ব্রতী হইলে নব নব উদ্ভাবনী বুদ্ধি ও শক্তির অভাব হয় না। পরস্পরের মধ্যে উহা বিনিময় করিলে অচিরেই শিক্ষাকার্য্যের নবযুগ প্রবর্ত্তিত হয়। এই বিনিময়ের সাধন স্বরূপ হইবে বলিয়াই আমি, অঞ্জলি প্রকাশে অগ্রসর হইয়াছি। নবযুগ একটা বড় কথা বলিলাম, কিন্তু আপনারা অনুগ্রহ করিয়া উহাতে যত ক্ষুদ্র ভাব হইতে পারে গ্রহণ করিবেন।
      “ শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক সকলেই এবং  যাঁহারা বর্ত্তমান শিক্ষা প্রণালীর দোষ দর্শন করিয়া ব্যথিত হন তাঁহারা, কৃপা করিয়া স্ব স্ব অভিজ্ঞতা ও প্রতিভাজাত তত্ত্ব আমাকে লিখিয়া পাঠাইবেন প্রার্থনা করি, এবং আমিও কৃতার্থ হইয়া তত্তাবৎ দিয়া অঞ্জলি রচনা করিয়া সকলের চরণে অর্পণ করিব। যদি ইহাতে কেহ মনে করেন “তুমি কে যে, তোমার নিকট লিখিয়া পাঠাইব ?” ইহার কি উত্তর দান করিব বুঝিতে পারিতেছি না। আমার হৃদয় অত উন্নত নয় যে “সেবক” বলিব, আমার বিদ্যা বুদ্ধিও অত নাই যে “বন্ধু” বলিব, আমার ভাবের তেমন উচ্ছ্বাস নাই যে “ভ্রাতা” বলিব, তেমন অর্থ নাই যে আপনাদিগকে পারিশ্রমিক দিব, সামর্থ্য নাই যে আপনাদিগকে বাধ্য করিব, তেমন পরিচিত নই যে বলিব অবশ্যই অনুরোধ রক্ষা করিবেন, তেমন লোক নই যে কখনও আপনাদের কোন উপকারে আসিব, তেমন খ্যাতি নাই যে মধুলোভী ভ্রমরের মত আপনারাই স্বতঃ প্রবৃত্ত হইয়া আসিয়া চারিদিকে জুটিবেন, তেমন চিন্তাশীলতা দক্ষতা বা লিপিপুন্যৈ [ লিপিনৈপুণ্য ? ]  নাই যে আপনাদিগকে আকর্ষণ করিব। আমি আমার দিক হইতে নয়, আপনাদেরই দয়া, উদারতা, সহৃদয়তা সহানুভূতি ও মহত্ত্বের উপর একান্ত নির্ভর করিতেছি। দীন বলিয়া দয়া করিবেন, ব্রত রক্ষা করিতে পারিতেছি না বলিয়া সাহায্য করিবেন, আপনাদেরই ক্ষুদ্র একজন বলিয়া সহানুভূতি প্রকাশ করিবেন, সকলকেই জানান উচিত বলিয়া লিখিয়া পাঠাইবেন, ইহাই প্রার্থনা।
     “ ফুল কাননেও ফুটে জঙ্গলেও ফুটে;  জঙ্গলের ফুল আপনি আপনার সৌন্দর্য্যের শোভা দর্শন করিয়া শীর্ণ হয়, ঝরিয়া যায়। কিন্তু উহাকেই কাননে দেখিয়া কতজনে মোহিত হয়। কতজনে ঘ্রাণে অর্দ্ধভোজন করে, কতজনে উহার প্রশংসা করে, মিলিয়া মিশিয়া জল ও তৈলকে সুবাসিত করে, কতজনে উহার ছবি তোলে। হে গোলাপ! তুমিই ইহার সাক্ষী! লোকের হৃদয়ে উদ্ভূত বিদ্যা, বুদ্ধি, সত্য, জ্ঞান, ভাব ও সেইরূপ মনাব [মানব] সমাজে প্রকাশিত হইলেই উহার সার্থকতা হইল; নচেৎ - বনফুলের ন্যায় ফুটিয়া ফুটিয়া বনে সৌরভ ছড়াইয়া মলিন, বিশীর্ণ ও বিলীন হইয়া যায়। আশা করি অনুগ্রাহক, গ্রাহক ও পাঠকগণ নূতন নূতন তত্ত্বগুলি বনফুল না করিয়া কানন কুসুমে পরিণত করিবেন। শিক্ষাবিষয়ে যাহা কিছু নূতন তত্ত্ব মনে উদিত হইবে, বা যাহা কিছু নূতন বোধ হইবে অনুগ্রহ পূর্ব্বক লিখিয়া পাঠাইলেই, আমরা তাহা পত্রিকাস্থ করিব।
     “ আর এক উদ্দেশ্য ভাল কথা, মহজ্জীবন ও শিক্ষণীয় বিষয় সকল সংগ্রহ করিয়া প্রকাশ করা। আমরা অনুষ্ঠান পত্রে লিখিয়াছিলাম –
     “ ইহাতে সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, শিক্ষাপ্রণালী, নীতি, আমোদ, ব্যায়াম অভিভাবকদের কর্ত্তব্য ও গৃহশিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখিত হইবে; এবং শিক্ষা সংক্রান্ত সংবাদ  ও সরকারী নিয়ম প্রভৃতি প্রকাশিত হইবে।”
     “আমরা যথাসাধ্য লক্ষ্য স্থির রাখিয়া ব্রত উদযাপন করিতে যত্ন করিব।”

     সম্পাদকের অকৃত্রিম আন্তরিকতা পাথেয় করে যে পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছিল সেটা বিশ্লেষণ করার আগে পত্রিকাটির অন্য কতগুলি দিক দেখে নেওয়া যাক। শুরুতে পত্রিকার প্রারম্ভিক পত্রে শুধু ‘অঞ্জলি’ – ‘মাসিক পত্রিকা’ ছাপা হত;  কিন্তু ভাদ্র সংখ্যা থেকে লেখা হতে থাকে ‘অঞ্জলি’ –‘মাসিকপত্র ও সমালোচন’। পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় যে সব রচনা ছিল, সেগুলি হল – উৎসর্গ (কবিতা);  নামকরণ;  উদ্দেশ্য; শিক্ষা;  ব্রহ্মচারী;  বর্ণশুদ্ধি;  ইতিহাস শিক্ষা;  কৃষি বিদ্যালয়;  অভিভাবকের দায়িত্ত্ব;  অধ্যয়ন;  বর্ষ;  দণ্ডপ্রদান;  স্মৃতি-রত্ন;  ভুল-ভ্রান্তি;  সংবাদ;  মধ্যছাত্রবৃত্তিপরীক্ষার পাঠ্য, ১৮৯৯। অধিকাংশই শিক্ষামূলক প্রবন্ধ।  ‘উৎসর্গ’ কবিতাটি দিয়ে প্রথম সংখ্যার শুরু। কবিতাটির কয়েকটি লাইন –  

    প্রকৃতি প্রাঙ্গণে যাঁর
        চন্দ্র সূর্য্য তারকায়
     খেলিছে অনন্ত জ্যোতিঃ,
         অনন্ত চিন্ময় জ্ঞান;
     তাঁহার রাতুল পায়
         করি এ “অঞ্জলি” দান।  ... ইত্যাদি।

     পত্রিকায় কোন সূচীপত্র বা লেখকদের নাম দেখা যায় নি। পৃষ্ঠা সংখ্যাতেও কয়েকটি ভুল রয়েছে।
     দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে পত্রিকা শুরু হত ‘নানা কথা’ দিয়ে। এ বিভাগে থাকত স্বদেশের ও বিদেশের ইতিহাস, ভূগোল ও বিজ্ঞান বিষয়ক কিছু খবর ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় – অধিকাংশই শিক্ষা জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ‘নানা কথা’র পরেই থাকত ‘ব্রহ্মচারী’ শীর্ষক মূল্যবান প্রবন্ধ। এটির উদ্দেশ্য ছিল শৃঙ্খলাবোধ  ও নীতিনিষ্ঠ আচরণের মাধ্যমে চরিত্র গঠনের জন্য নানা উপদেশ।   প্রতিটি সংখ্যার শেষে থাকত ‘সংবাদ’ – নানা ধরণের খবর নিয়ে। ‘স্মৃতি-রত্ন’  বিভাগটি সম্বন্ধে বলা হয়েছে –

“আমরা যে সকল সার কথা স্মরণ রাখিলে শিক্ষা কার্য্যের বিবিধ রূপে সাহায্য হইতে পারে – “স্মৃতি-রত্ন” বলিয়া ক্রমে ক্রমে সেগুলির উল্লেখ করিতে যত্ন করিব।

‘সমালোচনা’ বিভাগে থাকত সমসাময়িক বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত নির্বাচিত রচনার সমালোচনা। ‘এডুকেশন গেজেট’ থেকে বিভিন্ন নিয়ম ও শিক্ষা জগতের সংবাদ উদ্ধৃত হত। ইতিহাস, ভূগোল, গণিত ইত্যাদি শিক্ষণীয় বিষয় সম্বন্ধে বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য।  পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করার জন্য অনেক লেখা প্রকাশ করা হয়েছে, যেমন – ‘পরীক্ষার্থীর প্রতি’, ‘স্মরণশক্তি বর্দ্ধনের উপায়’ প্রভৃতি।  মাঝে মাঝে প্রকাশিত হয়েছে ‘তত্ত্ব খবর’ সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বিষয়ক খবর নিয়ে।  ‘তত্ত্ব খবর’ বিভাগে থাকত দেশ বিদেশের বিজ্ঞান বিষয়ক এবং কৌতূহলজনক  নানা খবর। ‘ভুল ভ্রান্তি’তে  আলোচিত হত ব্যাকরণগত বা অন্যান্য তত্ব বা তথ্যগত যেসব সাধারণ ভুলের আমরা শিকার হই বা মনের মধ্যে পোষণ করি তারই জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। নিঃসন্দেহে এটি  একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ।

প্রকাশিত কয়েকটি রচনা – ‘কিউবা’, ‘আদর ও আবদার’, মিষ্টার গ্লাডষ্টোন’, ‘এটলাস শিক্ষা’, ‘হস্তলিপি’, ‘শিক্ষার অসম্পূর্ণতা’, ‘দুর্ব্বৃত্ত ছাত্র’, ‘সাপ্তাহিক পরীক্ষা’, ‘ভগ্নাংশের ভাগহার’, ‘ব্রিটিশ পার্লিয়ামেন্ট’, ‘সভ্যতার ইতিহাস’, ‘উচ্চারণের দোষ সংশোধন’, ‘ভৌগোলিক নাম লিখন ও পঠন’, ‘বাচনিক শিক্ষা’ (এডুকেশন গেজেট হইতে উদ্ধৃত), ‘হোস্টেল ও বোর্ডিং হাউস’, ‘ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ’, ‘পরীক্ষায় অকৃতকার্য্যতা’, ‘পার্ব্বত্য চট্টগ্রাম ও চাকমা ভাষা’, ‘মৌখিক শিক্ষাদান’, ‘বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক’, ‘কু-অভ্যাস-জয়’, ‘ক্রীট বা কীরিট’ [ ভূমধ্যসাগরের ক্রীট দ্বীপ সম্বন্ধে ], ‘মধ্য ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার পাঠ্য ১৯০০’, ‘প্রশ্ন-প্রণয়ন ধারা’, ‘বাঙ্গালার সাধারণ শিক্ষা’, ‘কন্ঠস্থ বিদ্যা’, ‘জাপানের শিক্ষা’, ‘কুসংস্কারের জন্মভূমি’, ‘বিদ্যালয়ের সরঞ্জাম’, ‘শিক্ষক-সমিতি’, ‘সংবাদ পত্র-পরিচালন’, ‘শিক্ষকের পরিচয়’, ‘ব্রিটিশ মিউজিয়াম’, ‘আবৃত্তি ( Reading )’, ‘সময়ের ব্যবহার’ ইত্যাদি।

পত্রিকাটিকে প্রকৃতই শিক্ষা-সহায়ক হিসাবে তুলে ধরতে সম্পাদকের যত্নের কোন ত্রুটি ছিল না। কিন্তু মনে হয় কয়েকটি কারণে পত্রিকাটি গ্রহণযোগ্য হয় নি এবং বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। প্রথমতঃ পত্রিকায় ব্যবহৃত ভাষা। পত্রিকার ‘প্রাণ’ ছিল বালক-বালিকাদিগকে সুশিক্ষিত করা, একথা  “উদ্দেশ্যে” শীর্ষক মুখবন্ধে  বলা হয়েছে। কিন্তু গাম্ভীর্যপূর্ণ সাধু ভাষার প্রয়োগ ছাত্রদের কতটা ‘প্রাণের’ সঞ্চার করত, সেটা ভেবে দেখার। দ্বিতীয়তঃ বিষয় বস্তু নির্বাচনও ছাত্র-ছাত্রীদের উপোযোগী ছিল না।  পত্রিকার ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বর্ষ’ নামক রচনা   থেকে ভাষা ও বিষয় বস্তু নির্বাচনের একটি নমুনা দেওয়া যাক – “বাইরণের উদ্দাম উচ্ছৃঙ্খল ইন্দ্রিয়পরিতোষক গানের পরিবর্ত্তে টেনিসনের ধর্ম্মপ্রাণ নীতি শাসনের মিষ্টতর সঙ্গীতসকলে প্রাণে সন্ধ্যার ক্ষীণালোক প্রকাশিত, দুর্ব্বোধ্য, প্রহেলিকাময়, অনন্ত গাম্ভীর্য্যে পূর্ণ ইন্দ্রিয়াতীত রাজ্যের সুমধুর সঙ্গীতের দিকে আকৃষ্ট করিল, সকলের হৃদয়-বুদ্ধি-ইচ্ছাকে এক সুরে অনন্তের বিশ্বময় সঙ্গীতের সঙ্গে মিশাইয়া দিল।” এজন্যই হয় ত খগেন্দ্রনাথ মিত্র তার ‘শতাব্দীর শিশু-সাহিত্য’ গ্রন্থে পত্রিকাটি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন – “জানি না, তখনকার বালক-বালিকাদের কাছে পত্রিকাখানি  কতটা প্রিয় হয়েছিল।  মনে হয়,  পত্রিকাখানি তাদের চেয়ে তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকগণেরই উপযোগী হয়েছিল বেশি।”

‘অঞ্জলি’কে আকর্ষণীয় করে তুলতে সম্পাদক রাজেশ্বর গুপ্তর যথেষ্ট আন্তরিকতা ও চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও পত্রিকাটি সম্ভবত এক বছরের বেশি স্থায়ী হয় নি।





চিত্র ১ – ১ম বর্ষ ৫ম সংখ্যার প্রারম্ভিক পৃষ্ঠার প্রতিলিপি।


চিত্র – ২ : ‘স্মৃতি-রত্ন’ পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি প্রদত্ত কিছু উপদেশ।



চিত্র – ৩  ‘স্মৃতি-রত্ন’ পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি প্রদত্ত কিছু উপদেশ।



চিত্র –৪ ‘শিক্ষকের ত্রুটি’ নামক রচনার কিছু অংশ।




লেখক পরিচিতি : বহু বছর বি.ই. কলেজে (এখন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, শিবপুর ( IIEST,shibpur )) অধ্যাপনা করেছেন। কিছুদিন হল অবসর নিয়েএখন সেখানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আছেন। অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স নিয়ে গবেষণা করলেও একাধিক বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে - জ্যোতিষশাস্ত্র, পুরনো কলকাতার সংস্কৃতি, ইত্যাদি। অবসর সময়ে 'অবসরে'র সঙ্গে সময় কাটান।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।