প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

পুরানো সাময়িকী ও সংবাদপত্র

নভেম্বর ১৫, ২০১৫

 

অণুবীক্ষণ

দীপক সেনগুপ্ত


 অপর একটি স্বল্পস্থায়ী পত্রিকা ‘অণুবীক্ষণ’ মাসিক পত্রিকা; প্রথম প্রকাশ শ্রাবণ ১২৮২ বঙ্গাব্দ। শুরুতেই লেখা রয়েছে “স্বাস্থ্যরক্ষা, চিকিৎসাশাস্ত্র ও তৎসহযোগী অন্যান্য শাস্ত্রাদি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা।” লেখা রয়েছে একটি সংস্কৃত শ্লোক ও তার বঙ্গানুবাদ :

“দৃশ্যতে ত্বগ্র্যয়া বুদ্ধ্যা সূক্ষয়া সূক্ষদর্শিভিঃ ”।।
“সূক্ষদর্শী ব্যক্তিগণ একাগ্র সূক্ষবুদ্ধি দ্বারা দৃষ্টি করেন।”

এর পর ‘অবতরণিকা’ অংশে ব্যক্ত করা হয়েছে পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য। এখানে সম্পূর্ণ অংশটিই উধৃত করা হল।

“কর্ত্তব্য বোধের একান্ত অনুরোধে এ ক্ষুদ্র মাসিক পত্রিকা প্রচারে প্রবৃত্ত হইলাম। অনেকের সংস্কার যে ইংরেজদিগের এদেশে আসিবার পর ইংরেজী শিক্ষা বহুল পরিমাণে প্রায় সর্ব্বত্রে বিস্তারিত হইয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজী রীতি, নীতি, আচার, ব্যবহার, বাণিজ্য প্রণালী এবং রাজনীতি এদেশে প্রচলিত হওয়াতে ভারতবাসী দিগের বিশেষ উন্নতি হইয়াছে। কিন্তু আমাদিগের সংস্কার অবিকল এরূপ নহে। ইংরেজী শিক্ষা আচার, ব্যবহার, রীতি, নীতি ইত্যাদি এদেশে প্রচলিত হওয়াতে নিরবচ্ছিন্ন উপকার হইয়াছে এমত বলা যায় না। কতকগুলি বিষয়ে উপকার দর্শিয়াছে বটে, কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে বহুল অনিষ্টও ঘটিয়াছে। যে সকল উপকার হইয়াছে তাহা না হইলেও আমাদিগের সংসার যাত্রা নির্ব্বাহিত হইত, কিন্তু যে সকল অপকার হইয়াছে তাহাতে আমাদিগকে প্রায় সংসারের অনুপযুক্ত করিয়া তুলিয়াছে। সাহেবরা যদি এদেশে না আসিতেন, ইংরেজী শিক্ষা প্রণালী যদি বিস্তারিত না হইত, ইংরেজী আচার ব্যবহার এদেশীয়দিগের হৃদয় অধিকার না করিত, যদি শিক্ষাবিধান বর্ত্তমান প্রণালীতে প্রচলিত না হইত, যদি এত বিচারালয় স্থাপিত না হইত এবং বাণিজ্য কার্য্য এত অধিক পরিমাণে প্রচলিত না হইত, তাহা হইলে আমাদিগের এত অল্পকাল (এক শতাব্দী ) মধ্যে, শারিরীক, মানসিক ধর্ম্মসম্বন্ধীয় ও সামাজিক এত অবনতি, বোধ হয়, কখনই হইত না। আমাদের এ কথা বোধ হয় অনেকে অগ্রাহ্য করিবেন, কিন্তু অগ্রাহ্য করিবার অগ্রে চিন্তাশীল হইয়া এবিষয়ে গভীররূপে বিবেচনা করিতে আমরা তাঁহাদিগকে বিনীত ভাবে অনুরোধ করি। বিদ্যাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে যে সকল ভাব মনে নিহিত, বদ্ধমূল ও পরিবর্দ্ধিত হইয়াছে তাহা সহজে পরিবর্ত্তন হওয়া সম্ভব নহে। কিন্তু চিন্তাশীল ও অনুসন্ধিৎসু হইলে যে অনিষ্টকর ও ভ্রমমূলক ভাব চিরস্থায়ী থাকিবে তাহাও অসম্ভব।
“এই সকল বিষয় লইয়া আন্দোলন করা আমাদিগের এক প্রধান উদ্দেশ্য। অগ্নি যতই পরিচালিত করা যায় ততই প্রজ্বলিত হয়। সত্যও সেই রূপ যত আন্দোলিত হয় ততই প্রকাশমান হয়। আমরা যে সকল বিষয়ের আলোচনায় প্রবৃত্ত হইলাম যদি চিন্তাশীল সদ্বিদ্যাশালী ব্যক্তিগণ সেই সকল বিষয়ে নিজমত মধ্যে মধ্যে প্রকাশ করেন তাহা হইলে আমরা আপনাদিগকে উপকৃত মনে করিব। স্বাস্থ্য রক্ষা, চিকিৎসা শাস্ত্র, ও তৎ সহযোগী অন্যান্য বিজ্ঞান শাস্ত্র, ভারতসন্তান দিগ্গের অবনতির কারণানুসন্ধান ও তৎপ্রতিবিধান, গৃহস্থালীর বন্দবস্তের দোষ নির্ণয় ও তাহার সংশোধনের উপায় বিধান ও বিজ্ঞান শাস্ত্রাদি কি উপায়ে আমাদিগের প্রাত্যহিক কার্য্যোপযোগী হইতে পারে, ইত্যাদি বিষয়ের সবিস্তার আলোচনা আমাদিগের মুখ্য উদ্দেশ্য। আমাদিগের আলোচিত বিষয়ে যিনি যাহা বলিবেন বা লিখিবেন আমরা সমাদরের সহিত তাহা গ্রহণ করিব ”।

চিকিৎসা শাস্ত্র মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হওয়ায় বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি সম্বন্ধে বিভিন্ন প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ১২৮২ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে অ্যালোপ্যাথি শাস্ত্রে নানা ধরণের ব্যাধি এবং তার চিকিৎসা সমব্ন্ধে জ্ঞান অবশ্যই সীমীত ছিল। সেটা প্রতিফলিত হয়েছে প্রথম সংখ্যার ‘চিকিৎসা’ নামক একটি নিবন্ধে। নীচে নিবন্ধটির প্রাসঙ্গিক অংশ উধৃত হল।

“উত্তম উত্তম চিকিৎসকেরা স্বীকার করেন যে এখনও চিকিৎসা বিদ্যার প্রকৃত উন্নতি হয় নাই। অনেক স্থলে চিকিৎসা কার্য্য অন্ধকারে হাতড়ান মাত্র। এ বিষয়ে আমরা একটি সুন্দর আখ্যায়িকা পাঠ করিয়াছিলাম, কিন্তু কোথায় পাঠ করিয়াছিলাম তাহা স্মরণ নাই। এক অন্ধকার গৃহে জীবন ও পীড়া এই দুই জনে যুদ্ধ হইতেছে জীবনের চেষ্টা যে পীড়াকে বিনাশ করে; পীড়ার চেষ্টা সে জীবনকে সংহার করে। চিকিৎসক জীবনকে সাহায্য করিবে মনে করিয়া একটি লাটি হাতে করিয়া সেই অন্ধকার গৃহে প্রবেশ করিলেন, এবং পীড়াকে বিনাশ করিব মনে করিয়া অন্ধকারে এক লাটি কষাইলেন। যদি লাটির আঘাত সৌভাগ্যক্রমে পীড়ার উপর পড়িল তাহা হইলে জীবন রক্ষা পাইল, আর যদি জীবনের উপর পড়িল তাহা হইলে জীবনের বিনাশ হইল। .......
“এলোপেথিক ডাক্তারেরা হোমিওপেথিক ডাক্তার দিগেiew sise by side codeview and design view

র প্রতি বিশেষ বিদ্বেষ করেন, হোমিওপেথিক ডাক্তারেরা এলোপেথিক ডাক্তার দিগকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন। কিন্তু এলোপেথিক ডাক্তার দিগের পরীক্ষা করিয়া দেখা কর্ত্তব্য যে হোমিওপেথিক ঔষধ দ্বারা যথার্থ রোগ আরাম হয় কি না। আর হোমিওপেথিক ডাক্তারদিগের বিবেচনা করা কর্ত্তব্য যে সহস্র সহস্র বৎসরের পরীক্ষা মূলক সিদ্ধান্ত কখন সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা হইতে পারে না। ......
“চিকিৎসা বিষয়ে যে কয়েকটি মত প্রধানতঃ প্রচলিত আছে অথবা হইতেছে তাহা এই (১) এলোপেথি (Allopathy) অর্থাৎ অসমভাবিক চিকিৎসা (২) হোমিওপেথি (Homoeopathy) অর্থাৎ সমভাবিক চিকিৎসা (৩) হাইড্রোপেথি (Hydropathy) অর্থাৎ জল চিকিৎসা (৪) হাইজীনিয়ম (Hygienism) অর্থাৎ কেবল পথ্য ও স্নানের নিয়ম দ্বারা চিকিৎসা (৫) সাইকোপেথি (Psychopathy) অর্থাৎ মনের বল দ্বারা রোগের প্রতিকার সাধন।....”

পরে প্রতিটি ধরণের বিশদ আলোচনা রয়েছে। তবে বিভিন্ন মত ও পদ্ধতি সম্বন্ধে বলা হলেও কবিরাজি চিকিৎসার উল্লেখ নেই কেন ? তবে বেশ কিছু কৌতূহলোদ্দীপক বর্ণনা রয়েছে। এ রকম একটি প্রবন্ধের চারটি পৃষ্ঠার প্রতিলিপি এখানে দেওয়া হল।
পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন ডঃ হরিশ্চন্দ্র শর্ম্মা, বউবাজার। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে পত্রিকা প্রকাশ করে জনসাধারণকে সাহায্য করা বা সচেতন করে তোলার প্রচেষ্টা সম্ভবতঃ এটাই প্রথম। এ ধরণের বেশ কয়েকটি পত্রিকা পরে প্রকাশিত হয়েছে; যেমন ‘চিকিৎসা সম্মিলনী’ (১৮৮৪), ‘চিকিৎসা’ (১৮৮৯), ‘চিকিৎসক ও সমালোচক’ (১৮৯৫) ইত্যাদি। তবে ‘অণুবীক্ষণ’ পত্রিকাটির স্থায়িত্বকাল খুবই কম; সম্ভবতঃ এক বছরের বেশি চলে নি। এ সব পত্রিকার বিশদ বিবরণ বা সমালোচনা কোথাও চোখে পড়ে নি।
সংযুক্ত প্রতিলিপি পরিচয় –
চিত্র ১ : ১২৮২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসের একটি সংখ্যার আখ্যাপত্র।
চিত্র ২ - চিত্র ৫ আশ্বিন ১২৮২ সংখ্যা থেকে কয়েকটি পৃষ্ঠা।


চিত্র ১


চিত্র ২


চিত্র ৩


চিত্র ৪

চিত্র ৫


লেখক পরিচিতি : বহু বছর বি.ই. কলেজে (এখন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, শিবপুর ( IIEST,shibpur )) অধ্যাপনা করেছেন। কিছুদিন হল অবসর নিয়েএখন সেখানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আছেন। অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স নিয়ে গবেষণা করলেও একাধিক বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে - জ্যোতিষশাস্ত্র, পুরনো কলকাতার সংস্কৃতি, ইত্যাদি। অবসর সময়ে 'অবসরে'র সঙ্গে সময় কাটান।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।