প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

পুরানো সাময়িকী ও সংবাদপত্র

ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৫

 

বঙ্গমহিলা

দীপক সেনগুপ্ত


    ‘বঙ্গমহিলা’ নামে তিনটি সাময়িক পত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথম পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ১২৭৭ খ্রীষ্টাব্দের ১লা বৈশাখ (এপ্রিল ১৮৭০)। এটি ছিল একটি পাক্ষিক এবং বাংলা ভাষায় প্রথম মহিলা সম্পাদিত পত্রিকা। সম্পাদকের নাম জানান হয় নি; ‘খিদিরপুর নিবাসিনী জনৈক মহিলার সম্পাদনায়’ বলে উল্লেখিত হয়েছে। তবে যতদূর জানা যায় ইনি ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দয়োপাধ্যায় (‘ডব্লিউ. সি. বোনার্জ্জীর’) ভগিনী মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়।

‘বঙ্গমহিলা’ সম্পাদনা মহিলাদের প্রথম প্রয়াস হলেও এর পর অনেকেই এগিয়ে এসেছেন পত্রিকা পরিচালনা ও সম্পাদনার কাজে। সবগুলি পত্রিকা দীর্ঘজীবী না হলেও প্রচেষ্টা আন্তরিক ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। ‘বঙ্গমহিলা’ থেকে শুরু করে দেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত মহিলা পরিচালিত বা সম্পাদিত যে সব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে সেগুলির একটা তালিকা এখানে দেওয়া হল। এগুলি বাদ দিয়েও কিছু থাকতে পারে যেগুলি দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। বন্ধনীর মধ্যে প্রথমে সম্পাদক বা পরিচালকের নাম ও পরে প্রকাশ কাল দেওয়া হল।
‘বঙ্গমহিলা’(মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়, বৈঃ ১২৭৭); ‘অনাথিনী’(থাকমণি দেবী, শ্রাঃ ১২৮২); ‘হিন্দুললনা’(পাক্ষিক, জনৈকা হিন্দুললনা, মাঃ ১২৮৪); ‘খৃষ্টীয় মহিলা’(কুমারী কামিনী শীল, মাঃ ১২৮৭); ‘বঙ্গবাসিনী’(সাপ্তাহিক, মহিলা পরিচালিত, নাম জানা নেই, কাঃ ১২৯০); ‘ভারতী’(প্রথম সম্পাদক দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেও ১২৯১-এ স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদক হন, প্রথম প্রকাশ ১২৮৪); ‘সোহাগিনী’(কৃষ্ণভামিনী বসু ও শ্যামাঙ্গিনী দে, বৈঃ ১২৯১); ‘বালক’(জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, বৈঃ ১২৯২); ‘পরিচারিকা’(১২৯৪ বৈশাখ থেকে কেশবচন্দ্র সেনের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধু মোহিনী দেবী, প্রথম প্রকাশ জ্যৈঃ ১২৮৫); ‘বিরহিণী’ (শৈলবালা দেবী, কাঃ ১২৯৫); ‘পুণ্য’(প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী, আশ্বিন ১৩০৪); ‘অন্তঃপুর’(বনলতা দেবী, মাঃ ১৩০৪); ‘গৃহিণী’(ষোড়শীবালা গুপ্ত, জ্যৈঃ ১৩০৭); ‘ভারতমহিলা’(সরযূবালা দত্ত, ভাঃ ১৩১২); ‘সুপ্রভাত’(পরিচালনা কুমুদিনী মিত্র, শ্রাঃ ১৩১৪); ‘জাহ্নবী’(বৈঃ ১৩১৪ থেকে গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী, প্রথম প্রকাশ আষাঢ় ১৩১১); ‘মাহিষ্য মহিলা’(কৃষ্ণভামিনী বিশ্বাস, বৈঃ ১৩১৮); ‘আনন্দসঙ্গীত পত্রিকা’(প্রতিভা দেবী, ইন্দিরা দেবী, শ্রাঃ ১৩২০); ‘পরিচারিকা’(নবপর্য্যায়) (নিরুপমা দেবী, অগ্রঃ ১৩২৩); ‘দীপালি’(সীতা দেবী, ফাঃ ১৩২৭); ‘আন্নেসা’(সফিয়া খাতুন, বৈঃ ১৩২৮); ‘দীপক’(ত্রৈমাসিক, সুবর্ণময়ী গুহ ও বিভাময়ী গুহ, বৈঃ ১৩২৮ পাবনা থেকে); ‘নব্যভারত’(আঃ-কাঃ ১৩২৮ থেকে প্রফুল্লনলিনী রায়চৌধুরী, প্রথম প্রকাশ জ্যৈঃ ১২৯০); ‘বাঙ্গলার কথা’(পৌষ ১৩২৮ থেকে বাসন্তী দেবী, প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৩২৮); ‘শ্রেয়সী’(কিরণবালা সেন, বৈঃ ১৩২৯); ‘সেবা ও সাধনা’(ইন্দুনিভা দাস, জ্যৈঃ ১৩৩০); ‘মাতৃমন্দির’(অক্ষয়কুমার নন্দী ও সুরবালা দত্ত, আষাঢ় ১৩৩০); ‘শ্রমিক’(সন্তোষকুমারী গুপ্তা, আশ্বিন ১৩৩১); ‘বঙ্গলক্ষী’(গুরুসদয় দত্ত ও সরোজনলিনী দত্ত, অগ্রঃ ১৩৩২); ‘পাপিয়া’(ত্রৈমাসিক, বিভাবতী সেন, বৈঃ ১৩৩৪); ‘মুকুল’(নবপর্য্যায়) (শকুন্তলা দেবী, বৈঃ ১৩৩৫); ‘আলোক’(প্রভাত রঞ্জন বিশ্বাস ও আরতি দেবী, কাঃ ১৩৩৬); ‘মুক্ত’(পরিচালক তরুবালা সেন, ফাঃ ১৩৩৭); ‘জয়শ্রী’(শকুন্তলা দেবী, বৈঃ ১৩৩৮); ‘রূপরেখা’(জাহানারা বেগম চৌধুরী, অগ্রঃ ১৩৩৯); ‘বুলবুল’(চতুর্মাসিক, মহম্মদ হবিবুল্লাহ বাহার ও বেগম শামসুন নাহার, বৈঃ-শ্রাঃ ১৩৪০); ‘বিজয়িনী’(অণিমা দাস, আশ্বিন ১৩৪১); ‘রূপশ্রী’(বেলা ঘোষ, কাঃ ১৩৪১); ‘অনুভব ও সাহিত্য’(জ্যোৎস্নাহাসি সেনগুপ্ত, শ্রাঃ ১৩৪৩); ‘গৃহলক্ষী’(কণকপ্রভা দেব, প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৩৪৪, মাঘ ১৩৪৫ থেকে নতুন নাম ‘জাগৃহি’); ‘মন্দিরা’(কমলা দাশগুপ্ত, কমলা চট্টোপাধ্যায়, স্নেহলতা সেন, বৈঃ ১৩৪৫); ‘সঙ্ঘ-সাথী’(কমলা বন্দ্যোপাধ্যায়, বৈঃ ১৩৪৬); ‘বিজয়িনী’(জ্যোৎস্না চন্দ, আশ্বিন ১৩৪৭); ‘শিক্ষা’(স্বর্ণপ্রভা সেন, অগ্রঃ ১৩৪৭); ‘মেয়েদের কথা’(কল্যাণী সেন, বৈঃ ১৩৪৮); ‘প্রভাতী’(সুধা ঘোষ, বৈঃ ১৩৪৯); অর্চনা’(১৩৫১ থেকে চিত্রিতা দেবী, প্রথম প্রকাশ ফাঃ ১৩১০); ‘মাতৃভূমি’(১৩৫২-এর মাঘ সংখ্যা থেকে অমিতা দত্ত মজুমদার, প্রথম প্রকাশ ফাঃ ১৩১০); ‘পরিক্রমা’(ত্রৈমাসিক, কল্যাণী মুখোপাধ্যায়, বৈঃ ১৩৫৩)।    

মহিলা সম্পাদিত বা পরিচালিত যেসব পত্রিকার উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে ‘বঙ্গমহিলা’, ‘অনাথিনী’, ‘হিন্দুললনা’, ‘বঙ্গবাসিনী’, সোহাগিনী’, ‘বিরহিণী’, ‘গৃহিণী’ পত্রিকার কোন সংখ্যার খোঁজ এখন আর পাওয়া যায় না বলেই গবেষকরা জানিয়েছেন। তৎকালীন কোন পত্র-পত্রিকায় যদি এদের নাম, বিজ্ঞপ্তি বা অন্য কোন বিষয়ের উল্লেখ করা হয়ে থাকে তবে সেখান থেকেই এই পত্রিকাগুলি সম্বন্ধে কিছুটা তথ্য পাওয়া যায়। যেমন ‘বঙ্গমহিলা’ সম্বন্ধে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ সমালোচনায় লিখেছে -

“একখানি পাক্ষিক পত্রিকা। একটি হিন্দু স্ত্রী এই পত্রিকার সম্পাদিকা, কলিকাতা প্রাকৃত যন্ত্রালয়ে মুদ্রিত হইতেছে। সম্পাদিকা আশা করেন, এখানি বঙ্গদেশের সকল শ্রেণীর স্ত্রীলোকদিগের মুখস্বরূপ হইবে। স্ত্রীলোকদিগের স্বত্ত্ব প্রভৃতির সমর্থন করা ইহার উদ্দেশ্য। স্ত্রীলোকদিগের সম্পাদিত সংবাদপত্র এ দেশে এই নূতন প্রকাশিত হইল। আমরা হৃদয়ের সহিত ইহার পোষকতা করিতেছি এবং আশা করি যে, কয়েক সংখ্যা পত্রিকাতে যেমন স্ত্রীজনোচিত শান্ত ভাব প্রকাশ পাইতেছে, চিরকালিই সেইরূপ দেখিতে পাইব! সম্পাদিকা যদি অনুচিত বিজাতীয় অনুকরণে ব্যগ্র না হইয়া আমাদের বাস্তবিক অবস্থা বুঝিয়া ও সমুচিত স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া প্রস্তাব সকল প্রকটিত করেন, এখানি ভদ্রসমাজে অত্যন্ত আদরণীয় হইবে।”

১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা মার্চ ‘অমৃতবাজার পত্রিকায়’ আগাম বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হয়েছে –“বঙ্গীয় নারীজাতির মুখ স্বরূপ বঙ্গমহিলা নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা ১২৭৭ সালের বৈশাখ মাস হইতে বঙ্গদূতের আকারে প্রতিপক্ষে দুই ফর্ম্মা করিয়া প্রকাশিত হইবে। মাসিক মূল্য তিন আনা এবং অগ্রিম বার্ষিক ২ টাকা মাত্র। পত্রিকার ঠিকানা এইরূপ – ‘ওরিএনটেল ডিসপেনসারির সম্মুখস্থ দ্বিতল বাটী ওয়াটগঞ্জ রোড, খিদিরপুর।” প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে শিশির কুমার ঘোষের সম্পাদনায় ‘অমৃত বাজার পত্রিকা’ প্রথমে বাংলাতেই প্রকাশিত হত। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে ফেব্রুয়ারি থেকে এটি ইংরাজি দৈনিকে রূপান্তরিত হয়।

স্ত্রীলোকদের দ্বারা পরিচালিত বা সম্পাদিত না হয়েও প্রকৃত শিক্ষিত করে তুলতে এবং সমাজের কুপ্রথার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে আরো কয়েকটি পত্রিকার আবির্ভাব ঘটেছিল। যেমন – ‘হেমলতা’ (পাক্ষিক, ১২৮০); ‘অবলা হিতৈষিণী’ (১২৮১); ‘বঙ্গবালা’ (মাসিক ১২৯২); ‘অবলাবান্ধব’ (পাক্ষিক ১৮৬৯ খ্রীঃ); ‘সাবিত্রী’ (মাসিক ১৩০৩) প্রভৃতি। কিন্তু ‘অবলাবান্ধব’ ছাড়া অন্যান্য পত্রিকা মেয়েদের উন্নতি এবং শিক্ষা সমর্থন করলেও রক্ষণশীল মনোভাব কাটিয়ে উঠতে পারে নি।

আলোচ্য পত্রিকা ‘বঙ্গমহিলার’ প্রথম সংখ্যায় ‘স্বাধীনতা’ নামক একটি প্রবন্ধ মুদ্রিত হয়েছিল। এই রচনাটি ‘হিন্দুহিতৈষিণী’ পত্রিকা থেকে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্ধার করেছেন। যেহেতু ‘বঙ্গমহিলা’র কোন সংখ্যাই এখন কোথাও পাওয়া যায় না, সম্পূর্ণ প্রবন্ধটিই এখানে তুলে দেওয়া হল, হয় ত এটি থেকে পত্রিকার অভিমুখ কিছুটা অনুমান করা যাবে। 

“প্রকৃত স্বাধীনতা কি? বোধ করি এ কথা নব্য সম্প্রদায়ের অনেকে বুঝেন না, তাঁহারা স্বেচ্ছাচারিতাকেই স্বাধীনতা মনে করিয়া থাকেন। বঙ্গমহিলারা যথার্থ স্বাধীনতা ভোগ করিতেছেন, কিন্তু কেহ কেহ তাহা পরাধীনতা জ্ঞান করিয়া স্ত্রীজাতিকে স্বাধীনতা প্রদান করা উচিত বলিয়া যে সকল যুক্তি প্রদর্শন করেন, আমরা তাহার অনুমোদন করিতে পারি না। ইউরোপীয় কামিনীগণের যেরূপ স্বাধীনতা আছে, বঙ্গীয় স্ত্রীলোকদিগকে ঠিক সেইরূপ স্বাধীনতা দিতে এদেশীয় কতকগুলিন লোকের বড় ইচ্ছা হইয়াছে। কিন্তু বঙ্গমহিলাদের সে ইচ্ছা নাই। ইউরোপীয় ও আমেরিকান স্ত্রীজাতির যেরূপ স্বাধীনতা দেখা যায়, তাহাকে আমরা স্বেচ্ছাচারিতা বলিয়া থাকি। স্ত্রীলোক মনে করিলেই যে ঘোড়া চড়িয়া উড়িয়া যায়, ইচ্ছামতে পরপুরুষের সহিত হাস্যকৌতুক অথবা নৃত্যাদি করে, লজ্জাহীনার ন্যায় পুরুষদের সঙ্গে গান ও আহার করে, যখন তখন ভিন্ন পুরুষের হাত ধরিয়া যথায় তথায় বেড়াইয়া বেড়ায়, এমন স্ত্রীলোকদিগকে কি বলা যায়? তাহাদিগকে মেয়ে বলিতে ত আমাদের সাহস কুলায় না। নম্রতা ও লজ্জাশীলতাই স্ত্রীলোকদের প্রধান গুণ। যে সকল স্ত্রী লজ্জা পরিত্যাগপূর্ব্বক নম্রতাকে দূরে নিক্ষেপ করিয়া বীরবেশে দেশ বিদেশে অশ্বারোহণে ভ্রমণ করে তাহারা কি স্ত্রী? না বীর? নারীজাতির এই সকল কার্য্য কি ভদ্রোচিত? না সভ্যোচিত? অথবা তা স্বাধীনতার ফল? এরূপ স্বাধীনতা যে বঙ্গস্ত্রীর প্রকৃতিবিরুদ্ধ, দেশীয় খ্রীষ্টিয়ান রমণীগণই তাহার প্রমাণস্থান। তাঁহারা ইউরোপীয় কামিনীদের ন্যায় স্বাধীনতা লাভে লোলুপ হইয়াছে বটে, কিন্তু প্রকৃতির প্রতিকূলাচরণে এ পর্য্যন্তও সম্যকরূপে কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই। তাহাদের মুখভঙ্গিমা ও সলজ্জভাব অবলোকন করিলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, যেন তাঁহারা উক্তরূপ স্বাধীনতালাভার্থে স্ব স্ব প্রকৃতির উপর বল প্রকাশ করিতেছেন।

“এইরূপ স্বেচ্ছাচারিতারূপ স্বাধীনতায় বঙ্গমহিলাদের কাজ নাই। তাহাদের যে স্বাধীনতা আছে তাহাই প্রকৃত স্বাধীনতা। কে বলে যে বঙ্গমহিলারা পিঞ্জরাবদ্ধ পক্ষীর ন্যায় গৃহরূপ কারাগারে আবদ্ধ আছে? তাঁহারা কি আপন আপন ইচ্ছামত ধর্ম কর্ম করিতে পারেন না? ইচ্ছানুসারে অশন বসন প্রাপ্ত হন না? আত্মীয়স্বজনদের বাটীতে কি গমনাগমন করিতে পারেন না? তাঁহাদের মন কি স্বাধীন নহে? তবে তাঁহারা পরাধীনতা-শৃঙ্খলে বন্দীদশায় অবস্থিতি করিতেছেন, ইহা কি প্রকারে সম্ভব হইতে পারে?

“বঙ্গমহিলাদের অনেক অভাব আছে, একথা আমরা পূর্ব্বাবধিই স্বীকার করিয়া আসিতেছি, আর সেই সকল অভাব যে ক্রমে ক্রমে মোচন হইবে এক্ষণে তাহার আকার-প্রকারও দেখিতেছি। শিক্ষাভাব এদেশীয় স্ত্রীলোকদের একটি বিশেষ অভাব ছিল, কিন্তু অধুনা বঙ্গাঙ্গনাগণের জন্যে সেই শিক্ষার দ্বার মুক্ত হইয়াছে। তাঁহাদের বর্ত্তমান পোষাক পরিবর্ত্ত হউক, উচ্চতর শিক্ষা লাভ হউক, তখন দেখা যাইবে যে তাঁহাদের ন্যায় যথার্থ সভ্য, ভদ্র ও স্বাধীনচিত্ত স্ত্রী-জগতের আর কোথাও নাই। (সংস্কৃত গ্রন্থকারেরা অনেক স্থলে ভারতীয় নারীজাতিকে স্ত্রীরত্ন বলিয়া উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন।) তখনই দেখিব যে বঙ্গস্ত্রী রত্নবিশেষ হইয়াছেন।
“সে যাহা হউক, আজিকালি নব্য সম্প্রদায়ের কোন কোন লোক আপন আপন স্ত্রীকে কিছু কিছু স্বেচ্ছাচাররূপ স্বাধীনতা দিতে উদ্যত হইয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের রমণীরা তদ্বিষয়ে সম্মতা নহেন, তজ্জন্য নবীন বাবুরা কিছু পীড়াপীড়িও লাগাইয়াছেন।

“নবীন বাবু! এখন তুমি অল্প দিনের জন্য ক্ষান্ত হও, তোমার শোনিত কিঞ্চিৎ শীতল হইয়া আসুক। তুমি কি করিতে উদ্যত হইয়াছ, তাহা বড় একটা বুঝিতেছ না, অতএব আমাদের দেশের বিজ্ঞলোকদের কাছে পরামর্শ লও। তোমার স্ত্রীকে যদি দশ জন অপরিচিত পুরুষের সম্মুখে বসাইয়া দাও, তবে তিনি ভয়ে পাণ্ডুবর্ণা, লজ্জায় মলিনা হইয়া ঘর্ম্মাক্তকলেবর হইবেন সন্দেহ নাই।”

উল্লিখিত প্রবন্ধটির লেখকের নাম জানা যায় নি, তিনি মহিলা না পুরুষ সেটাও অজানা। এটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে। লেখকের মতে সে সময়ে স্ত্রী-স্বাধীনতা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল; অন্যান্য বহু পত্রিকার রচনা কিন্তু অন্য রকম সাক্ষ্য দেয়। সমালোচকদের মতে তখন অনেকেই স্ত্রীশিক্ষা এবং কিছু কিছু সংস্কার দূর করার পক্ষে লেখা প্রকাশ করলেও সাধারণ ভাবে স্ত্রী স্বাধীনতার বিষয়ে খুব উদারপন্থী ছিলেন না। অনেকেরই মনোভাব ছিল কম বেশি রক্ষণশীল। প্রথম ‘বঙ্গমহিলা’ পত্রিকাটির আয়ু ছিল মাত্র এক বছর তবে মহিলা সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা হিসাবে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবার দ্বিতীয় ‘বঙ্গমহিলার’ কথা।      

১২৮২ বঙ্গাব্দের বৈশাখে (১৮৭৫ সাল) মুক্তারাম বাবু ষ্ট্রীটে চোরবাগান বালিকা বিদ্যালয়ের বোর্ড অফ প্রিন্সিপ্যাল্‌স প্যারীচরণ সরকারের নেতৃত্বে 'বঙ্গমহিলা' নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে। বিদ্যালয়টি স্ত্রী-শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত। প্যারীচরণ সরকারই এটির প্রতিষ্ঠাতা। সম্পাদক হিসাবে নাম ছিল প্যারীচরণের ভ্রাতুষ্পুত্র ভুবনমোহন সরকারের। স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে জনমত গঠন করা এবং মহিলাদের বিজ্ঞান মনস্ক করে তোলাই ছিল পত্রিকাটির লক্ষ্য। প্রথম সংখ্যার শুরুতেই ‘ভূমিকা’-তে পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে। তার কিছু অংশ -

“আমরা এককখানি মাসিক পত্রিকা প্রচার করিতে উদ্যোগী হইয়াছি। ‘বঙ্গমহিলা’ নামে উহার নামকরণ করিলাম। বঙ্গবাসীগণের হস্তে সময়ে সময়ে নীতিগর্ভ ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ সকল উপহার দেওয়াই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। তাঁহারা গৃহকর্ম্মের বিরামে মধ্যে মধ্যে যে অবকাশ প্রাপ্ত হন, তাহা বৃথা গল্পে অতিবাহিত না হইয়া, যাহাতে সৎচর্চ্চায় অতিবাহিত হয়, তদ্বিষয়ে আমাদের প্রধান যত্ন থাকিবেক। যদিও অধুনা স্ত্রীশিক্ষার কেবল উপক্রম মাত্র হইয়াছে বলিতে হইবেক, তথাপি আমাদের বিশ্বাস এই যে, এই পত্রিকা সুপ্রণালীমত সম্পাদিত হইলে, আমাদের পাঠিকাশ্রেণীর অসদ্ভাব হইবে না।
“....  অধুনা যে সকল জ্ঞানগর্ভ সাময়িক পত্র প্রচারিত হইতেছে, তৎসমস্তই উচ্চ অঙ্গের। তাহাদের রচনাগাম্ভীর্য্য ও অর্থগৌরব বঙ্গীয় রমণীগণের পক্ষে সুগম নহে। অতএব সরল ভাষায় ঋজু ও অনতিগুরু বিষয়গুলি সন্নিবেশিত করিয়া তাঁহাদের চিত্তানুবর্ত্তন করাই আমাদের সঙ্কল্প। ....
“আমরা আর বাক্যব্যয় করিব না; কেবল এই বলিয়া উপসংহার করিব যে, আমরা এই পত্রখানিকে স্ত্রীশিক্ষার একটি অঙ্গস্বরূপ মনে করি, এবং যখন ইহার উদ্দেশ্য বিশ্বজনীন, অর্থাৎ দল বিশেষের মতানুযায়ী নহে, তখন আমরা আশ্বস্তচিত্তে প্রার্থনা ও প্রত্যাশা করিতে পারি যে, ইহা সাধারণের অনুগ্রহ ভাজন হইয়া স্বকার্য্য সাধনে অধিকারী হইবেক।”

পত্রিকাটির সূচীপত্র সম্বলিত প্রথম পৃষ্ঠার শীর্ষদেশে নিম্নলিখিত সংস্কৃত শ্লোকটি মুদ্রিত থাকত :

“নারী হি জননী পুংসাং নারী শ্রীরুচ্যতে বুধৈঃ।
তস্মাৎ গেহে গৃহস্থানাং নারীশিক্ষা গরীয়সী।”

প্রথম সংখ্যায় যে লেখাগুলি পরিবেশিত হয়েছিল সেগুলি হল :‘ভূমিকা’; ‘দুই একটি কথামাত্র’; ‘বঙ্গীয় হিন্দুসমাজ-সংস্কার’; ‘বঙ্গমহিলা’; ‘স্বাস্থ্যরক্ষা’; ‘বামাদিগের রচনা’ বিভাগে – ‘আশা’ (কবিতা)-শ্রীমতী-; ‘ঈশ্বরের প্রতি’ (কবিতা) এবং ‘নূতন সংবাদ’। প্রথম সংখ্যাতে ‘নূতন সংবাদ’ বিভাগে অযোধ্যার রসুলপুরে সংঘটিত সতীদাহের একটি মর্মস্পর্শী কাহিনী মুদ্রিত হয়েছে।

প্রথম ‘বঙ্গমহিলা’ প্রকাশের পাঁচ বছর পরে দ্বিতীয়টি প্রকাশিত হয়। প্রথম পত্রিকাটিতে প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা’ নামে একটি প্রবন্ধ সঙ্কলিত হয়েছে। এটি পড়ে মনে হয়েছে স্ত্রীলোকেরা যথেষ্টই স্বাধীনতা ভোগ করতেন যদিও ইয়োরোপীয়দের মত বাইরে বেড়িয়ে অবাধ মেলামেশা বঙ্গমহিলাদের কাম্য নয় বলা হয়েছে। এখানে দ্বিতীয় ‘বঙ্গমহিলা’ পত্রিকার ১২৮২-র শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ এখানে তুলে দেওয়া হল। প্রথম প্রবন্ধটির লেখক নারী না পুরুষ জানা নেই কিন্তু নীচের প্রবন্ধটি ‘বামাগণের রচনা’ বিভাগে শ্রীমতী মায়াসুন্দরী নামে একজন মহিলার লেখা। প্রবন্ধটির নাম ‘নারীজন্ম কি অধর্ম্ম?’ প্রবন্ধটি এ রকম -

“আমরা কি কুক্ষনেই নারী হইয়া এই বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছি। যদি পরমেশ্বর আমাদিগকে সহিষ্ণুতা গুণ অধিক পরিমাণে না দিতেন, তাহা হইলে আমাদের অবস্থা যে কি হইত, তাহা ভাবিয়া স্থির করা যায় না। আমাদিগের জন্মাবধিই পোড়া কপাল। ভূমিষ্ট হইবামাত্র পিতা মাতা আত্মীয় স্বজন সকলেই বিমর্ষ। মঙ্গলসূচক শঙ্খধ্বনি পর্য্যন্ত হইল না। পিতা বলিলেন, একটি পুত্র না হইয়া একটি মেয়ে হইয়াছে! সময় গুণে সকলই হয়! আমরা যে কি দোষে তাঁহাদের বিষচক্ষে পতিত হই, তাহা বুঝিতে পারি না। যদি বল আমাদের বিবাহে অধিক টাকা লাগে, কিন্তু তেমন পুত্রদিগের ন্যায় আমাদের বিদ্যাশিক্ষার জন্য এক পয়সাও ব্যয় হয় না। যদি বল, তাহারা বিদ্যাশিক্ষা করিয়া টাকা উপার্জ্জন করিবে এবং বৃদ্ধ পিতামাতাকে ভরণপোষণ করিবে, আমরা তাহা পারিব না, বরং কত টাকা ঘর হইতে বাহির করিয়া লইয়া যাইব, কিন্তু সে দোষ কাহাদের? তোমাদের একটি পুত্র থাকিলে, তোমরা তাহাদের বিবাহের সময় যদি দুই হাত দিয়া টাকা কুড়াও, ও কন্যাকর্ত্তার সর্ব্বস্বান্ত কর, তবে তোমাদের কন্যার বিবাহের সময়, তোমাদের নিকট হইতে অপরে কেন না লইবে?

“আমরা রীতিমত লেখাপড়া শিখিতে পাই না। ইদানীন্তন আমাদের মনে বিদ্যার অঙ্কুর উঠিতে আরম্ভ হইয়াছে বটে, কিন্তু সেরূপ বিদ্যালয়ে দেওয়া আর না দেওয়া, দুই সমান। দশ বৎসর হইতে না হইতেই বিদ্যালয় হইতে ছাড়ান হইল, কেন না কন্যাটির এখন বিবাহের সময় উপস্থিত। আহা! যাহার মনে বিবাহ যে কি পদার্থ, স্বামী যে কি বস্তু, তাহার জ্ঞান জন্মে নাই, তাহার আবার বিবাহ! বিবাহও হইল, লেখা পড়ায় জলাঞ্জলি হইল। সারাদিন দেড় হাত ঘোমটা দিয়া মুখ বুজিয়া থাক, তাহা না হইলে লোকে নির্লজ্জা বলিবে। তবে যদি স্বামীর পড়াইবার নিতান্ত জেদ থাকে, তিনি একটু আধটু পড়াইলেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে তাহা স্থগিত হয়। বাল্যবিবাহের ফল বাল্যকালে সন্তান প্রসব। স্ত্রীলোকের যদি একটি সন্তান হইল, তবে সে তাহাকে লালন পালন করিবে, না পুস্তকের পাতা উলটাইবে? অতএব নারীগণের ঐ পর্য্যন্ত বিদ্যার চূড়ান্ত হইল। স্ত্রীলোকের কিছু দেখিবার হুকুম নাই। কলিকাতায় গঙ্গার উপর পুল নির্ম্মান হইল, লোকে কত তাহার প্রশংসা করিল, কিন্তু আমাদের শোনাই সার হইল, একদিনও চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করিতে পারিলাম না। আমরা যদি বিদ্যাশিক্ষা করিতে না পারিলাম, জগতের অদ্ভুত দৃশ্য দেখিয়া জন্ম সার্থক করিতে না পারিলাম, তবে আমাদের জীবনে অল্পই সুখ। আমরা যে একেবারে সুখবিহীন তাহা বলিতেছি না। সুখ আছে কিন্তু দুঃখের ভাগই অধিক।”

প্রথম প্রবন্ধটির সঙ্গে দ্বিতীয়তির মূল সুরের কোন সাদৃশ্য নেই। প্রবন্ধটি আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে লেখা; কিন্তু এখনও এদেশের অনেক গ্রামে গঞ্জে মেয়েদের জীবন প্রায় একই খাতে বইছে।  

১৮৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্যারীচরণের মৃত্যু হলে ভুবনমোহন সরকার পত্রিকা পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। প্রধানতঃ মহিলাদের সমস্যা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে পত্রিকাটি লেখা প্রকাশ করত। নরমপন্থী ও রক্ষণশীল দুই মতমতই ছাপা হত। পত্রিকাটি মাত্র দু’বছর চালু ছিল, তবে স্বল্পস্থায়ী হলেও এতে মহিলাদের শিক্ষা প্রসার ও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথা পত্রিকাটিতে সমালোচিত হয়েছে।

     তৃতীয় ‘বঙ্গমহিলার’ আত্মপ্রকাশ বৈশাখ ১২৯০ বঙ্গাব্দে, নগেন্দ্রনাথ ঘোষালের সম্পাদনায়। উদ্দেশ্য মূলতঃ একই; “জ্ঞানের অধিকার বর্দ্ধন......ইহার উদ্দেশ্য।...... বাঙ্গালীর অন্তঃপুরে যেখানে অজ্ঞানতিমির চিরবিরাজমান, যেখানে তীব্রকর পণ্ডিতগণের বিতরিত জ্ঞানালোক লব্ধপ্রবেশ হয় না সেই স্থানে থাকিয়া স্বকার্য্য সাধন করিবে।” 

মহিলারা তখনও বেশি সংখ্যায় শিক্ষার সুযোগ পায় নি। স্বভাবতই এ ধরণের পত্রিকার পাঠক সংখ্যা ছিল খুবই কম। অর্থাভাবেই এ ধরণের পত্রিকা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় নি। দ্বিতীয় ‘বঙ্গমহিলা’ পত্রিকার সূচীপত্র সম্বলিত একটি পৃষ্ঠার প্রতিলিপি দেওয়া হল।


লেখক পরিচিতি : বহু বছর বি.ই. কলেজে (এখন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, শিবপুর ( IIEST,shibpur )) অধ্যাপনা করেছেন। কিছুদিন হল অবসর নিয়েএখন সেখানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আছেন। অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স নিয়ে গবেষণা করলেও একাধিক বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে - জ্যোতিষশাস্ত্র, পুরনো কলকাতার সংস্কৃতি, ইত্যাদি। অবসর সময়ে 'অবসরে'র সঙ্গে সময় কাটান।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।