অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


পুরানো সাময়িকী ও সংবাদপত্র

অবসর বিশেষ সংখ্যা এপ্রিল ১৪, ২০১৮ (সংযোজন)

 

সন্দেশ

দীপক সেনগুপ্ত

শিশু সাহিত্য ‘সন্দেশ’ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। ছোটদের জন্য এর আগে প্রকাশিত হয়েছে প্রমোদাচরণ সেনের ‘সখা’ (১৮৮৩), ভুবনমোহন রায়ের ‘সাথী’ এবং ‘সখা ও সাথী’ (১৮৯৪), শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘মুকুল’ (১৮৯৫) ইত্যাদি। ১৮৮৫-তে ‘বালক’ প্রকাশিত হলেও তার স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র এক বছর। ‘সন্দেশে’র রূপকার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ‘সখা’ ও ‘মুকুল’-এ নিয়মিত লিখেছেন। এ দুটি পত্রিকায় তার ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করার মাধ্যমেই তিনি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। হয় ত তখন থেকেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য মনের মত একটি পত্রিকা প্রকাশ করার পরিকল্পনা তার ছিল।

বহুদিন ধরে ছোটদের লেখা লিখে উপেন্দ্রকিশোর বুঝেছিলেন যে রচনার সঙ্গে চিত্রের যথাযথ সংযোগ ঘটলে বিষয়বস্তুটির কল্পিত রূপ মনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায় এবং রচনাটি পাঠকের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ‘সন্দেশ’ পত্রিকাটির মূল বিশেষত্ব এতে মুদ্রিত ব্যঞ্জনাময় চিত্রাবলি যা সহজেই ছোটদের মনকে এক আনন্দঘন কল্পলোকের সন্ধান দেয়। তখন পত্রপত্রিকায় যে সব ছবি ছাপা হত তার অধিকাংশই ছিল কাঠে খোদাই করা ব্লক থেকে প্রস্তুত। উপেন্দ্রকিশোর তার লেখা ‘ছোটদের রামায়ণ’-এর জন্য এভাবে ছবি ছাপতে গেলে অনেক ছবি নষ্ট হয়ে যায়। তখন থেকেই তিনি ছবি ও মুদ্রণের উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হন এবং হাফটোন পদ্ধতিতে ব্লক তৈরিতে মনোনিবেশ করেন। তিনিই ছিলেন এদেশে হাফটোন ব্লকের জনক। এর জন্য তার বিজ্ঞান চেতনা তাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। এ প্রসঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের মেজোমেয়ে পুণ্যলতা চক্রবর্তী তার ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’তে লিখেছেন –

“হাফটোন ছবি কি করে তৈরি করতে হয় সে বিষয়ে অনেক বই আনিয়ে বাবা পড়লেন, তারপর হাফটোন ছবি তৈরি করবার ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম আনবার জন্য বিলেতে অর্ডার দিলেন ... বিলেত থেকে মালপত্র এসে হাজির হল ... একটা ঘরে বাবা স্টুডিও তৈরি করলেন, আরেকটা ঘরে ছোট একটা ছাপার প্রেস বসল। অন্য একটা ঘরে আর বড় বারান্দায় নানারকম যন্ত্রপাতি রাখা হল। একটা স্নানের ঘরকে করা হল ডার্ক রুম। ... বাবা বই পড়ে পড়ে আর নিজের হাতে তা পরীক্ষা করে সব শিখতে লাগলেন। এমনি করে আমাদের দেশে হাফটোন ছবি তৈরির সূত্রপাত হল।”

‘সন্দেশে’র রূপকার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জন্ম ১৮৬৩ সালের ১২ই মে অবিভক্ত বঙ্গের ময়মনসিংহ জেলার মসুয়া গ্রামে। পিতা কালীনাথ ও মাতা জয়তারা। পাঁচ পুত্রকন্যার মধ্যে উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন মধ্যম। পিতৃদত্ত নাম ছিল কামদারঞ্জন। তার মাত্র চার বছর বয়সে কালীনাথের জ্ঞাতিভাই জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাকে দত্তক নেন এবং কামদারঞ্জন হয়ে যান উপেন্দ্রকিশোর। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে ১৮৮০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উপেন্দ্রকিশোর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন কিন্তু বি.এ. পাশ করেন ১৮৮৪ সালে মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন থেকে। সাহিত্য রচনা, চিত্রাঙ্কন ও মুদ্রণ বিষয়ে গবেষণা ছাড়াও সঙ্গীত বিষয়ে তার ছিল অসাধারণ নৈপুণ্য। পাখোয়াজ, বাঁশি, হারমোনিয়াম ও বেহালা বাদনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, যদিও বেহালাই ছিল তার সর্বাধিক প্রিয়। মাঝে মাঝে সঙ্গীত রচনা ও সুর সংযোগও তিনি করেছেন। ‘জাগো পুরবাসী’ ব্রহ্মসঙ্গীতটি তারই রচনা। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মসমাজভুক্ত। ব্রাহ্মসমাজেরই নেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠা কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে ১৮৮৫ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার ছিল – সুখলতা, সুকুমার, পুণ্যলতা, সুবিনয় ও শান্তিলতা – এই তিন কন্যা ও দুই পুত্র। ‘সন্দেশ’ প্রকাশের আগেই তার বহু বই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে – ‘ছেলেদের রামায়ণ’ (১৮৯৭), ‘সেকালের কথা’ (১৯০৩), ‘ছেলেদের মহাভারত’ (১৯০৮), ‘মহাভারতের গল্প’ (১৯০৯), ‘টুনটুনির বই’ (১৯১০) প্রভৃতি।

‘সন্দেশে’র কথায় ফিরে আসা যাক। বিলেত থেকে প্রসেস ক্যামেরা ও ছাপাখানার অন্যান্য সরঞ্জাম আনিয়ে ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ৩৮/১ শিবনারায়ণ দাস লেনে উপেন্দ্রকিশোর ‘ইউ. রায়’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। এখানেই শুরু হয় তার হাফটোন ব্লক তৈরির কাজ। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় ১৯০১ সাল নাগাদ ২২নং সুকিয়া স্ট্রিটে স্থানান্তরিত হয় সংস্থাটি। পরে ১৯১০ সালে সুকুমার রায় সক্রিয় ভাবে কাজে যোগদান করলে প্রতিষ্ঠানটির নাম বদলে ‘ইউ. রায়. এন্ড সন্স’ রাখা হয়। শুধু ব্লক তৈরি নয়, প্রকাশনার কাজও এখানে হত।

শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোরের বহু দিনের লালিত বাসনা বাস্তবায়িত হবার মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। ‘সন্দেশে’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩২০ বঙ্গাব্দের বৈশাখে (১৯১৩ খ্রীঃ)। প্রথম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া ফেলে দেয় ‘সন্দেশ’। ‘সন্দেশ’ যখন বেরোয়, উপেন্দ্রকিশোরের ভ্রাতা প্রমদারঞ্জনের কন্যা লীলা রায় (পরে যিনি লীলা মজুমদার নামে খ্যাত হয়েছেন) তখন বছর পাঁচেকের শিশু। পরবর্তী কালে তিনি তার সেদিনের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন –

“সন্দেশ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি হাতে করে উপেন্দ্রকিশোর ২২নং সুকিয়া স্ট্রিটের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে বসবার ঘরের দরজার কাছে হাসিমুখে দাঁড়ালেন। অমনি ঘরময় একটা আনন্দের সাড়া পড়ে গেল। সেই সময় সেই ঘরে যে ক’জন মানুষের উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল, তারা কেউই বোধ হয় জীবনে কখনো সে সন্ধ্যার কথা ভুলতে পারবে না। সন্দেশের প্রকাশন শিশুসাহিত্যের জগতে একটা নতুন দিনের উদ্বোধন করে দিয়েছিল। হঠাৎ যেন একদিনের মধ্যে বাঙ্গালার শিশুসাহিত্যের সমস্ত দৈন্য ঘুচে গিয়ে সে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠল।”

‘সন্দেশ’ যে শিশুচিত্তে কতখানি আলোড়ন তুলেছিল তার আর একটি পরিচয়্ পাওয়া যায় কবি সুনির্মল রায়ের স্মৃতি চারণায় – “স্কুলে পড়াশোনায় মন লাগল না, কখন বাড়ি যাব আর ‘সন্দেশ’ পড়ব এই চিন্তা। বাড়ি ফিরে এসে ‘সন্দেশ’-এর মধ্যে ডুবে গেলাম। আর এত অদ্ভুত বইয়ের কথা তো ধারণাই করতে পারি নি, কি সুন্দর গল্প, কবিতা, ধাঁধা, আমায় যেন এক নতুন রাজ্যে নিয়ে গেল। প্রতি সংখ্যার প্রথমেই রঙিন ছবি আর ভিতরে গল্পের সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে সব মজার মজার টুকরো ছবি, প্রতি ছবির ভিতর শিল্পীর নাম U.R. লেখা। ইনি যে উপেন্দ্রকিশোর রায় তা আর বুঝতে দেরি হল না-কারণ তাঁর আঁকা ছবি আগেও দেখেছি। এই ‘সন্দেশ’ আমার জীবনে একটা রঙিন আনন্দময় যুগ নিয়ে এল। প্রতি মাসের পয়লা তারিখে ডাকের পথ চেয়ে থাকতাম – আমাদের লোক ভোরবেলা (গিরিডির) ডাকঘরে গিয়ে চিঠি নিয়ে আসত, ‘সন্দেশ’ যদি পয়লা তারিখে তার হাতে না দেখতাম মুখ শুকিয়ে যেত। তার পরদিন আবার আকুল হয়ে প্রতীক্ষা করতাম, দূর থেকে লক্ষ করতাম লোকটার হাতে অন্যান্য চিঠিপত্রের মধ্যে উঁচু হয়ে আছে ‘সন্দেশ’-এর বাদামী মোড়ক – আনন্দে প্রাণ নেচে উঠত।”

‘সন্দেশে’র লেখকরা কোন পারিশ্রমিক নিতেন না এবং সূচীপত্রে বা রচনার শেষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখকের নাম ছাপা হত না। অন্যান্য বহু পত্রিকার প্রথম সংখ্যার শুরুতেই সাধারণত: যে গুরুগম্ভীর ভাবে পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়, ‘সন্দেশে’র ক্ষেত্রে সেটা ঘটে নি। বরং একটি হাস্য রসের কাহিনী দিয়ে শুরু করে পরিশেষে বলা হয়েছে – “আমরা যে সন্দেশ খাই, তাহার দুটি গুণ আছে। উহা খাইতে ভাল লাগে, আর উহাতে শরীরে বল হয়। আমাদের এই যে পত্রিকাখানি ‘সন্দেশ’ নাম লইয়া সকলের নিকট উপস্থিত হইতেছে উহাতেও যদি এই দুটি গুণ থাকে – অর্থাৎ উহা পড়িয়া যদি ভাল লাগে আর কিছু উপকার হয়, তবেই ইহার ‘সন্দেশ’ নাম সার্থক হইবে।”

প্রথম সংখ্যা ‘সন্দেশ’ শুরু হয়েছে একটি কবিতা দিয়ে, লেখিকা শ্রীজ্যোতির্ম্ময়ী দেবী বি.এ.। এর পর রয়েছে – ‘সন্দেশের কথা’, ‘পৃথিবীর পিতা’ (পৌরাণিক, আখ্যায়িকা), ‘উত্তর আর দক্ষিণ’, ‘প্রথম কবি ও প্রথম কাব্য’, ‘শিশু’, ‘চাঙ’, ‘কথাবার্ত্তা’, ‘পাখীর গান’ (স্বরলিপি সহ গান), ‘শিশুদের গল্প-নূতন পয়সা আর পুরানো পয়সা’, ‘সংবাদ’। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল বত্রিশ। জ্যোতির্ম্ময়ী দেবীর প্রথম কবিতাটি ছিল –

“নূতন বরষে ভাই আমাদের ঘরে,
‘সন্দেশ’ এসেছে আজ নব সাজ প’রে।
ডাকিয়া লইব তারে আদরে সবাই,
হাসিমুখে ত্বরা করে আয় তোরা ভাই।
সরল হৃদয় তার, মধুর বচন,
শুনিব তাহার মুখে সন্দেশ নূতন।
বিভুর আশীষ বাণী তাহার মাথায়,
চাহিয়া লইব সবে, আয় তবে আয়।
এ নব সন্দেশ যেন বরষ বরষ,
জাগায় নবীন আশা, নূতন হরষ।
শুনায় নূতন বাণী, আনে নব কাজ,
কল্যাণে পুলক ভরা, - এই চাহি আজ।”

প্রথম সংখ্যায় কোন ধাঁধা ছিল না, কিন্তু দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে ‘নূতন ধাঁধা’ বিভাগটি যুক্ত হয়। পরের সংখ্যায় আগের ধাঁধার উত্তর দেওয়া হত। পত্রিকায় লেখা থাকত –

“কলিকাতা ৬৪/১নং সুকিয়া ষ্ট্রীট, লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে শ্রীললিতমোহন গুপ্ত কর্ত্তৃক মুদ্রিত ও ২২নং সুকিয়া ষ্ট্রীট সন্দেশ কার্য্যালয় হইতে শ্রীললিতমোহন গুপ্ত কর্ত্তৃক প্রকাশিত।”

‘সন্দেশে’র মান অক্ষুণ্ণ রাখতে উপেন্দ্রকিশোরকে বিরামহীন ভাবে লিখতে হয়েছে। কঠিন ও জটিল বিষয়কে সহজ করে পরিবেশন করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য ‘সন্দেশ’ ছোটদের মনের মত হয়ে উঠেছিল। উপেন্দ্রকিশোরের লেখা গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ‘গুপী গাইন’, ‘ঝানু চোর চানু’, ‘জোলা আর সাত ভূত’, ‘কুঁজো আর ভূত’ ইত্যাদি। আর রয়েছে পুরাণের গল্প – ‘পৃথিবীর পিতা’, ‘ত্রিপুর’, ‘মহিষাসুর’, ‘শুম্ভ নিশুম্ভ’, ‘গণেশ’, ‘গণেশের বিবাহ’, ‘অগস্ত্য’, ‘গঙ্গা আনিবার কথা’। বন্য প্রাণী ও জীবজন্তু নিয়েও তার লেখা কম নয়। প্রথম বর্ষেরই আষাঢ় সংখ্যায় ছাপা হয়েছে ‘বাঘের গল্প’, কার্তিক মাসে ‘সুন্দরবনের জানোয়ার’, মাঘ ও ফাল্গুনে যথাক্রমে ‘মাকড়সা’ ও ‘শুকপাখী’ এবং চৈত্রে বেরিয়েছে ‘সাপের খাওয়া’ নামক নিবন্ধে চিত্র সহ নানা তথ্য। একটা অজগর আস্ত ছাগল গিলে খাবার পর স্ফীত অজগরের নিঁখুত ছবি নিশ্চয়ই ছোটদের কাছে আকর্ষণীয় হয়েছিল। উপেন্দ্রকিশোরকে তো বিপুল পরিমাণ লেখা লিখতেই হয়েছে, তবে তার প্রেরণায় পরিবারের অনেকেই কলম ধরেছেন তাকে সাহায্য করতে। ভাই কুলদারঞ্জন অনুবাদক হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, জুল ভার্ন ও এইচ.জি. ওয়েলসের লেখা সম্ভবতঃ তিনিই প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন। প্রথম বর্ষের কার্তিক সংখ্যা থেকে ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হয় তার অনুবাদ করা ‘রবিনহুড’। আর এক ভাই প্রমদারঞ্জন ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, চাকরি করতেন সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায়। জরিপের কাজে তাকে অনেক দুর্গম স্থানে যেতে হত এবং সে সঙ্গেই তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমেছিল জঙ্গল ও বন্য প্রাণীদের নানা খবর। ‘বনের খবর’ নাম দিয়ে সে সব দুর্গম প্রদেশের রোমাঞ্চকর কাহিনী ‘সন্দেশে’র পাঠকদের উপহার দিয়েছেন ‘বনের খবর’ শীর্ষক গল্পে। ধারাবাহিক ভাবে এটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম বর্ষের শ্রাবণ সংখ্যা থেকে।

১৯১১ সালের ৭ই অক্টোবর লন্ডন ও ম্যাঞ্চেস্টারে মুদ্রণ বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য সুকুমার রায়্ গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি নিয়ে বিলাত চলে যান। সে কারণে তিনি ‘সন্দেশে’র প্রথম দিকের সংখ্যায় তার লেখা প্রকাশ করতে পারেন নি। ‘সন্দেশে’ তার প্রথম আবির্ভাব ১৩২০-র শ্রাবণ সংখ্যায়, অবশ্য লেখক হিসাবে নয়, চিত্রকর হিসাবে। হাস্যরসস্রষ্টা লেখক বন্ধু কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়ও তখন বিলাতে। তার লেখা বিখ্যাত হাসির গল্প ‘ভবম হাজাম’-এর জন্য বিলাত থেকেই মজার ছবি এঁকে পাঠান সুকুমার। ছবির একটি প্রতিলিপি এখানে দেওয়া হল। S.R. প্রতীকটি তারই নামের সূচক। এখানেই সুকুমার রবীন্দ্রনাথের হাতে ‘সন্দেশ’ তুলে দেন। রবীন্দ্রনাথ পত্রিকার প্রশংসা করেন এবং লেখা দেবেন বলেন। কিন্তু নানা কারণে উপেন্দ্রকিশোর সম্পাদক থাকাকালীন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘সন্দেশে’ বেরোয় নি।

১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে সুকুমার দেশে ফিরে এসে প্রকাশনার কাজে পিতা উপেন্দ্রকিশোরকে নানা ভাবে সাহায্য করেছেন। এবার থেকে পত্রিকায় নিয়মিত তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৩২০-তেই বেরিয়েছে তার লেখা ‘বেজায় রাগ’ (কবিতা, অগ্রহায়ণ), ‘খোকা ঘুমায়’ (কবিতা, পৌষ), ‘সূক্ষ হিসাব’ (গল্প, মাঘ), ‘ওয়াসিলিসা’ (গল্প, চৈত্র)। প্রায় প্রতি মাসেই তার লেখা বেরিয়েছে। এর পর তিনি চিত্র সহযোগে যে সব মজার কবিতা লিখেছেন, সেগুলি ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় ‘খিচুড়ি’ (মাঘ ১৩২১), ‘আবোল তাবোল’ ( ফাঃ, চৈঃ ১৩২১), ‘কাতুকুতু বুড়ো’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩২২) বা অন্যান্য নামাঙ্কিত হলেও পরে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে সবই ‘আবোল তাবোল’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থে একত্রিত হয়ে স্থান পেয়েছে। উপেন্দ্রকিশোরের পরিবারের অনেকেই লিখেছেন ‘সন্দেশে’র জন্য। বড় মেয়ে সুখলতা রাও-ও ছিলেন সে তালিকায়। সিদ্ধার্থ ঘোষ লিখেছেন –“সন্দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইউ. রায়. এন্ড সন্সের হাউস ম্যাগাজিন।” তবে পরিবারের অনেকে লেখনী ধরলেও বাইরের অনেকের লেখাই পত্রিকায় স্থান পেয়েছিল। এদের মধ্যে রয়েছেন – অবনীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, প্রসন্নময়ী ও প্রিয়ম্বদা দেবী, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, বিজয়চন্দ্র মজুমদার, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, কালিদাস রায়, চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, উইলিয়ম পিয়ার্সন, মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতা, জ্যোতির্ম্ময়ী দেবী, বিজনবালা দাসী প্রভৃতি।

পত্রিকাটি মনের মত করে তুলতে উপেন্দ্রকিশোর যত্নের কোন ত্রুটি রাখেন নি। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে মনের মত বাড়ি করে তিনি ১০০নং গড়পাড় রোডে চলে যান। উপেন্দ্রকিশোরের শরীর কিন্তু ভেঙে পড়ে, দুরারোগ্য ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন তিনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাদকতায় তখন ইউরোপের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত, বাণিজ্যিক আদান প্রদানও ক্ষতিগ্রস্ত। এরই ফলে এদেশে ডায়াবেটিসের ওষুধ ইনসুলিন আসা বন্ধ হয়ে যায়। নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেন উপেন্দ্রকিশোর। গিরিডিতে বায়ু পরিবর্তনের জন্য গিয়েও কোন লাভ হয় নি। ১৩২২ বঙ্গাব্দের ৪ঠা পৌষ (২০শে ডিসেম্বর ১৯১৫) বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিশু প্রেমিক এই মানুষটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বৈশাখ ১৩২০ থেকে পৌষ ১৩২২-মোট তেত্রিশটি সংখ্যা সম্পাদনা করেছেন উপেন্দ্রকিশোর।

পত্রিকার প্রাণপুরুষ উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুতে পত্রিকা কিন্তু বন্ধ হয় নি। সুযোগ্য পুত্র সুকুমার রায় আগেই পত্রিকা প্রকাশনায় পিতাকে নানা ভাবে সাহায্য করেছিলেন, এবার তিনি এগিয়ে এসে সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘সন্দেশ’ যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ১৩২২-এর মাঘ সংখ্যায় ‘স্বর্গীয় উপেন্দ্রকিশোর’ শীর্ষক রচনাটিতে লেখা হয়েছে –

“ “সন্দেশের” পাঠক-পাঠিকাগণ, যে দারুণ শোকসংবাদ বহন করিয়া এই সংখ্যার ‘সন্দেশ’ তোমাদের কাছে যাইতেছে, তোমাদের কোমল হৃদয়ে তাহা নিশ্চয়ই আঘাত দিবে। সন্দেশের সম্পাদক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী আর ইহজগতে নাই। যিনি বহু বৎসর ধরিয়া অক্লান্ত পরিশ্রম, অজস্র অর্থব্যয়, অশেষ আদর ও যত্ন করিয়া তোমাদিগের মনোরঞ্জন করিয়াছেন, কত মজার কথা, কত সুন্দর উপদেশ, কেমন রঙ্গিন ছবি পূর্ণ করিয়া মাসে মাসে তোমাদের হাতে সন্দেশ দিয়া তোমাদিগকে সন্তুষ্ট করিতেন এবং তাহাতে নিজে কত না আনন্দ লাভ করিতেন, তোমাদিগের সেই বন্ধু তোমাদিগকে ছাড়িয়া ৪ঠা পৌষ প্রভাতে পরলোকবাসী হইয়াছেন। তোমরা অনেকেই হয় ত তাঁহাকে দেখ নাই, কেহ কেহ হয় ত তাঁর নামও জান না, কিন্তু সকলেই “সন্দেশ” বা অন্যান্য মাসিক পত্রে তাঁর মজার গল্প ও কবিতা পড়িয়াছ, তাঁর হাতে আঁকা ছবি দেখিয়াছ, যেমন ভাবে বলিলে বেশ সহজে তোমরা বুঝিতে পার তেমন ভাবে লিখিত উপদেশ পাইয়াছ। ......”

পরিশেষে বলা হয়েছে –

“এই সন্দেশ তাঁহার স্মৃতিচিহ্ন হইয়া থাকুক। এখন হইতে যাঁহারা এই কাগজ চালাইবে তাঁহারা যেন তাহারই আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া, ইহাকে উপযুক্তরূপে পরিচালিত করিতে পারেন, ভগবানের নিকট এই প্রার্থনা করি।”

এই ইচ্ছা সফল হয়েছিল। সুকুমার রায়ের সম্পাদনায় পত্রিকার উৎকর্ষর কোন অবনমন ঘটে নি, উপেন্দ্রকিশোরের অনুপস্থিতি কোথাও অনুভূত হয় নি। ‘সন্দেশ’কে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে সুকুমার অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিচারণায় –

“এক মাস প্রতীক্ষার পরে আজ আবার মোড়ক ছিঁড়ে ডুবে যাওয়া। সেই ‘সন্দেশ’! নানারঙিন মলাট থেকে সর্বশেষ ধাঁধাটি পর্যন্ত এমন কিছুই তাতে ছিল না, যা শিশুর পক্ষে - অধিকাংশ স্থলে সাবালকের পক্ষেও কম উপভোগ্য নয়; বিশেষ করে উন্মীলমান ইন্দ্রিয় ও মন নিয়ে শিশু যা কিছু আকাঙ্ক্ষা করে থাকে, এবং যা কিছু তার বেড়ে ওঠার পক্ষে প্রয়োজন - তার বয়সোচিত পুলক ও পুষ্টি, সব যেন সাজিয়ে গুছিয়ে উপহার আনত ‘সন্দেশ’, মাসে-মাসে, সুদূর কলকাতার সুকিয়া ষ্ট্রীট থেকে। মলাটে লাল কালিতে ছাপা থাকত: ‘প্রতিষ্ঠাতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী’; সম্পাদক: সুকুমার রায়, বি. এসসি’। সহজ বুদ্ধিতে আমি বুঝে নিয়েছিলুম যে এই দুজনের মধ্যে পিতা-পুত্রের সম্বন্ধ; এবং, অধিকাংশ রচনা স্বাক্ষরহীন হওয়া সত্ত্বেও, আমার অনুমান করতে দেরি হয় নি যে, আশ্চর্য ছন্দ-মিলের কবিতাগুলোর লেখক যেমন পুত্র, তেমনি ‘পুরাতন লেখা’ পর্যায়টিও স্বর্গত পিতার লেখনী থেকে বেরিয়েছিল।”

অনেক সংখ্যাতে সুকুমারের একাধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। রচনার শেষে লেখকের নাম থাকত না; একটি তথ্য অনুযায়ী চৈত্র ১৩২২ সংখ্যায় তিনি দশটি লেখা লিখেছেন। সব ধরণের লেখাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। গল্প, কবিতা, নাটক, ধাঁধা-যে বিষয়েই তিনি কলম ধরেছেন, সেখানেই তিনি কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। ‘আবোল তাবোল’ ও ‘খাই খাই’ গ্রন্থের প্রায় সব কবিতাই ‘সন্দেশে’ প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও নামের কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন ‘আবোল তাবোলে’র ‘রামগরুড়ের ছানা’ ‘সন্দেশে’ ছিল ‘হেসো না’ (বৈশাখ ১৩২৫), ‘নোটবই’ ছিল ‘জিজ্ঞাসু’ (বৈশাখ ১৩২৭), ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ ছিল ‘বাপরে’ (আষাঢ় ১৩২৮) ইত্যাদি। আগেই বলা হয়েছে ‘আবোল তাবোল’ বইটির বহু কবিতা শুধু ‘আবোল তাবোল’ নাম দিয়েই ‘সন্দেশে’ প্রকাশিত হয়েছে। ১৩২৭ সালে তার তিনটি নাটক প্রকাশিত হয়েছে – ‘অবাক জলপান’, ‘হিংসুটি’ ও ‘মামা গো’ (যথাক্রমে জ্যৈষ্ঠ, ভাদ্র ও চৈত্র সংখ্যায়)। মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে ‘ঝালাপালা’ ও ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’।

‘পাগলা দাশু’র হাস্যরসে পূর্ণ গল্পগুলি পড়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন –

“বঙ্গ সাহিত্যে ব্যঙ্গ রসিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আগে কয়েকটি দেখা গিয়েছে, কিন্তু সুকুমারের হাস্যোচ্ছাসের বিশেষত্ব তাঁর প্রতিভার যে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছে তার ঠিক সমশ্রেণীর রচনা দেখা যায় না।”

সুকুমার রায় ‘সন্দেশে’ প্রবন্ধ লিখেছেন অসংখ্য, বিষয়বৈচিত্র্যে ভরপুর তার প্রবন্ধ গুলির মধ্যে অনেকগুলিই বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি বিষয়ক। লক্ষণীয় বিষয় হল, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধর সঙ্গে পুরাণের কাহিনীও আমাদের শুনিয়েছেন সুকুমার। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে তার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। পত্রিকাকে সর্বাঙ্গসুন্দর করার কাজে হাত লাগিয়েছেন পরিবারের বহু সদস্য। তবে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য সুবিনয় রায়। বিভিন্ন ধরণের লেখা ছাড়াও সম্পাদনার কাজে দাদাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন তিনি। এ ছাড়াও ছিলেন সুবিমল, শান্তিলতা, কুলদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জন, সুবিনয়ের স্ত্রী পুষ্পলতা, কুলদারঞ্জনের দুই মেয়ে ইলা ও মাধুরীলতা, পিসতুতো ভাই হিতেন্দ্রমোহন বসু ও দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা জ্যোতির্ময়ী দেবী। সুকুমারের দিদিমার ভাই ডাঃ দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু তার লেখার প্রথমেই ‘ভাই সন্দেশ’ দিয়ে শুরু করে রচনার শেষে ‘তোমার মেজ দাদামশায়’ দিয়ে ইতি টেনেছেন। কখনো ‘তোমার মেজ দাদামশায় শ্রী দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু’ লিখেও শেষ করেছেন। তার লেখা ‘রাক্ষুসে মাকড়সা’ (অগ্রঃ ১৩২৩), ‘কাঁকড়া-বিছে’ (পৌষ ১৩২৩), ‘চেলা বা তেঁতুলে বিছা’ (চৈঃ ১৩২৫) উপভোগ্য। ‘জুলে ভার্ন’-এর ‘মিস্টিরিয়াস আয়ল্যান্ড’ অবলম্বনে বৈশাখ ১৩৩২ থেকে ধারাবাহিক ভাবে কুলদারঞ্জন লিখেছেন ‘আশ্চর্য্য দ্বীপ’। প্রমদারঞ্জনের ১৪ বছরের মেয়ে লীলা রায় (পরে মজুমদার) লিখেছেন ‘লক্ষ্মী ছেলে’ (ভাদ্র ১৩৩০)। পরিবারের বাইরের লেখকদের মধ্যে ছিলেন কামিনী রায়, মোহনলাল ও শোভনলাল গঙ্গোপাধ্যায়, হাবিলদার কাজি নজরুল ইসলাম, সীতা ও শান্তা দেবী, প্রিয়ম্বদা দেবী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, ফটিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ মিত্র প্রভৃতি। ১৩২৫ পৌষ সংখ্যার প্রথমেই রয়েছে অতুলপ্রসাদ সেনের ‘বাতাসের গান’, যার শুরু ‘মোরা নাচি ফুলে ফুলে দুলে দুলে...।’ গানটি খুবই পরিচিত ও জনপ্রিয়। কার্তিক ১৩২৬ সংখ্যায় শিবনাথ শাস্ত্রী ‘মুক্ত’ নামক একটি কবিতা লিখেছেন, খগেন্দ্রনাথ মিত্রের মতে কবিতাটি ঠিক ছোটোদের উপযুক্ত নয়। সুকুমার ‘দ্রিঘাংচু’ নামক একটি ছোট গল্প লেখেন (কাঃ ১৩২৩)। এটি ‘হাস্যরসের সাহায্যে অন্ধ সংস্কারকে ব্যঙ্গ’। খগেন্দ্রনাথ মিত্র তার ‘শতাব্দীর শিশু-সাহিত্য’ গ্রন্থে উল্লেখযোগ্য মনে করে সম্পূর্ণ গল্পটিই উধৃত করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সুকুমার রায়ের চেয়ে প্রায় ছাব্বিশ বছরের বড়। উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদনা কালে ইচ্ছা থাকলেও রবীন্দ্রনাথ ‘সন্দেশে’ লেখা দিতে পারেন নি। এবার সুকুমারের অনুরোধে তিনি কয়েকটি লেখা ‘সন্দেশ’কে উপহার দিয়েছেন। কার্ত্তিক ১৩২৮ সংখ্যাটি শুরু হয়েছে তার কবিতা দিয়ে – “হেথায় তিনি কোল পেতেছেন আমাদের এই ঘরে, / আসনটি তাঁর সাজিয়ে দে ভাই মনের মত করে।...” ইত্যাদি। তার ‘বৃষ্টি রৌদ্র’ কবিতা বেরিয়েছে ভাদ্র ১৩২৯-এ। ‘তিন বছরের প্রিয়া’ প্রকাশিত হয়েছে বৈশাখ ১৩৩২ সংখ্যায়, কবিতার শেষে মুদ্রিত হয়েছে কবির হস্তাক্ষরে ‘দাদামচায় / শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।

সুকুমারের সম্পাদনা কালে পত্রিকা কি কোন সঙ্কটের মধ্যে পড়েছিল? কারণ অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩২৬ সংখ্যায় এই বিজ্ঞপ্তিটি ছাপা হয়েছে – “মাঘ ফাল্গুনের “সন্দেশ” ছাপা হইতেছে, ২রা বৈশাখ বাহির হইবে। চৈত্রের সংখ্যা ১০ই বৈশাখ বাহির হইবে। তাহার পর যদি আগামী বৎসর হইতে বেশ নিয়মিত ও সুন্দরভাবে সন্দেশ চালান সম্ভব হয়, তবে ২৫শে বৈশাখ নূতন বৎসরের নূতন সন্দেশ বাহির হইবে। সেরূপ ব্যবস্থা আমাদের পক্ষে করা সম্ভব না হইলে আগামী বৎসর আর সন্দেশ বাহির হইবে না।” প্রসঙ্গত: অগ্রহায়ণ-পৌষ ও মাঘ-ফাল্গুন যুগ্ম সংখ্যা হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল।

যাই হোক, সঙ্কটে পরলেও ‘সন্দেশ’ সেটা কাটিয়ে উঠেছিল। পত্রিকা যথারীতি বেরোতে থাকে, তবে সঙ্কট সত্যিই দেখা দেয় এর বছর চারেক পর। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী সুকুমার রায় কালাজ্বরে ভুগে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। তারিখটা ছিল ১০ই সেপ্টেম্বর ১৯৩০ সকাল ৮-১৫মিঃ (২৪শে ভাদ্র, ১৩৩০)। ১৩২২ থেকে ১৩৩০ মোট আট বছরের মধ্যে শেষ আড়াই বছর অসুস্থ শরীরেই ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা করেছেন তিনি। সুকুমারের মৃত্যুতে বেদনাহত রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন –

“আমি অনেক মৃত্যু দেখেছি কিন্তু এই অল্পবয়স্ক যুবকটির মত, অল্পকালের আয়ুটুকু নিয়ে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে অমৃতময় পুরুষকে অর্ঘ্য দান করতে প্রায় আর কাউকে দেখিনি। মৃত্যুর দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে অসীম জীবনের জয়গান তিনি গাইলেন।”

সুকুমারের মৃত্যুর পর আশ্বিন ১৩৩০ সংখ্যায় পত্রিকার শুরুতেই উচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবসমৃদ্ধ তার লেখা যে কবিতাটি মুদ্রিত হয়েছে, তার প্রথম চারটি পংক্তি –

“অজর অমর অরূপ রূপ,
নহি আমি এই জড়ের স্তুপ,
দেহ নহে মোর চির নিবাস
দেহের বিনাশে নাহি বিনাশ। ...”

সুকুমারের মৃত্যুর পর ‘সন্দেশে’র টালমাতাল অবস্থা সামাল দিতে এগিয়ে আসেন ভাই সুবিনয় রায়। বাবা ও দাদার সঙ্গে থেকে পত্রিকা সম্পাদনার কাজে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি। উপরে বর্ণিত অনেক লেখাই সুকুমারের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখা ‘ঝালাপালা’ ও ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ এই সময়েই প্রকাশিত হয়। কুলদারঞ্জনের ‘আশ্চর্য্য দ্বীপে’র কথা আগেই বলা হয়েছে। ১৩৩০-এর অগ্রহায়ণ সংখ্যা থেকে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তার অনুবাদ করা উপন্যাস ‘এগবার্টের লাঞ্ছনা’। লেখকদের মধ্যে যোগদান করেছেন পুষ্পলতা রায়, পুষ্পলতার দুই মেয়ে ইলা ও মাধুরীলতা, পুণ্যলতার দুই মেয়ে কল্যাণী (পরে কার্লেকার) ও নলিনী (পরে দাশ), মণীশ ঘটক, জলধর সেন, গিরিজাকুমার বসু, ক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য, কুসুমকুমারী দাশ, যোগীন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ।

যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্বেও সুবিনয় ‘সন্দেশ’কে খুব বেশি দিন টিঁকিয়ে রাখতে পারেন নি। প্রবল অর্থকষ্টের সম্মুখীন হতে হয় সুবিনয়কে। ঋণগ্রস্ত অবস্থায় পত্রিকাকে বাঁচানো যায় নি। কার্তিক ১৩৩৩ সংখ্যার পর ‘সন্দেশ’ বন্ধ হয়ে যায়। উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত সাধের ইউ. রায়. এন্ড সন্স নিলামে বিক্রি হয়ে যায়, জলের দরে বিকিয়ে যায় ১০০নং গড়পাড় রোডের বাড়ি এবং সমগ্র ব্যবসা। প্রতিষ্ঠানেরই প্রাক্তন কর্মচারী বিশ্বাস ভাতৃদ্বয় – করুণাবিন্দু বিশ্বাস ও সুধাবিন্দু বিশ্বাস ব্যবসাটি কিনে নেন। এদেরই আর্থিক আনুকূল্যে বছর পাঁচেক বন্ধ থাকার পর ‘সন্দেশ’ আবার প্রকাশিত হতে থাকে ১৩৩৮-এর আশ্বিন মাস থেকে। এটাই ‘নবপর্যায়ের সন্দেশ’। প্রথমে সম্পাদক ছিল সুবিনয় রায়, পরে সুবিনয় রায়ের সঙ্গে যুক্ত হন সুধাবিন্দু বিশ্বাস। শেষ বছরে সুধাবিন্দু একাই সম্পাদকের কাজ চালিয়েছেন।

নবপর্যায়ের ‘সন্দেশ’ খুব খারাপ চলে নি। প্রিয় সুকুমার বিদায় নিলেও ‘সন্দেশ’ নামটির মধ্যেই পাঠকেরা হয় ত তার অস্তিত্ব অনুভব করত। প্রথম সংখ্যায় সম্পাদকের নিবেদন –

“দীর্ঘ পাঁচ বৎসরের পর “সন্দেশ’ আবার দেখা দিল। নানা অনিবার্য্য কারণে এই কয়েক বৎসর ”সন্দেশ” বাহির হইতে পারে নাই। পূর্ব্বের গ্রাহক-গ্রাহিকাদের অনেকেরই এখন “সন্দেশ” পড়িবার বয়স উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। তাহাদের ছোট ছোট ভাই-বোনেরা হয়ত এখন “সন্দেশ” পড়িবে। যে আদর্শ ও উদ্দেশ লইয়া “সন্দেশ” প্রথম প্রকাশিত হয় এবং সুদীর্ঘকাল যাহা অক্ষুণ্ণ ছিল, এখনও সেই সুন্দর আদর্শ ও শুভ উদ্দেশ্য “সন্দেশ”কে যেন চালিত করিতে পারে , ইহাই আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা। ...... সকলের শুভেচ্ছা ও সহানুভূতির উপর ভরসা রাখিয়া “সন্দেশ” নবযাত্রার পথে অগ্রসর হইতে চলিল।”

প্রথমেই রয়েছে সুনির্ম্মল বসুর কবিতা ‘ফের এলো’, তার পরে রবীন্দ্রনাথের ‘সে’ উপন্যাসের একাংশ। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে এটি। অন্যান্য লেখকদের মধ্যে ছিলেন উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, কুলদারঞ্জন রায়, সুবিনয় রায়, সুধাবিন্দু বিশ্বাস, অশোক চট্টোপাধ্যায়, যতীন সাহা প্রভৃতি। বিভিন্ন সংখ্যায় পুরানো লেখকরা ছাড়াও ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, ননীগোপাল মজুমদার, মণীন্দ্রলাল বসু, অখিল নিয়োগী, সমর দে, শৈল চক্রবর্তী, বন্দে আলি মিয়া, সুকুমার দে সরকার প্রভৃতি। সুনির্মল বসু ও লীলা রায় (পরে মজুমদার) বহু কবিতা ও গল্প লিখেছেন। ‘সে’ উপন্যাসটি ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘উড়ো জাহাজ’ (বৈশাখ ১৩৩৮), ‘মাকাল’ (পৌষ ১৩৩৮), ‘ঝাঁকড়া চুল’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩৪০) ও ‘গরমের বন্ধে’ (আষাঢ় ১৩৪০)।

নবপর্যায়ের সন্দেশও কিন্তু বছর চারেকের বেশি চলেনি। ১৩৪২-এর পর আর পত্রিকা বেরোয় নি। এর প্রায় সিকি শতাব্দী পর ‘সন্দেশ’ আবার আত্মপ্রকাশ করে মুলতঃ সুকুমার রায়ের সুযোগ্য পুত্র সত্যজিৎ রায়ের আগ্রহে ও প্রচেষ্টায়। সত্যজিৎ রায় ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যৌথ সম্পাদনায় পত্রিকায় আবার প্রকাশিত হতে থাকে ১৩৬৮ সালের বৈশাখ মাস থেকে। এজন্য ১৭২নং ধর্মতলা ষ্ট্রীটের দোতলায় একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। একটানা একত্রিশ বছর সম্পাদনার কাজ করেছেন সত্যজিৎ। ১৯৯২-এ তার মৃত্যুর পর লীলা মজুমদার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন সত্যজিৎ পত্নী বিজয়া রায়। এরা অসুস্থ হয়ে পড়লে সহ-সম্পাদক হন সত্যজিৎ রায়ের কৃতী পুত্র সন্দীপ রায়। ‘সন্দেশ’ এখনও বেরোচ্ছে, সামলাচ্ছেন মূলতঃ সন্দীপ রায়। পত্রিকার শতবর্ষ পালিত হয়েছে। বহু লেখক বিভিন্ন পত্রিকায় ‘সন্দেশ’ সম্বন্ধে লিখেছেন। যদিও মধ্যিখানে দীর্ঘদিন পত্রিকা বন্ধ ছিল, তা হলেও কোন পত্রিকা একটি পরিবারের চারটি প্রজন্মের আন্তরিক প্রচেষ্টায় লালিত হয়েছে এবং এখনও সচল রয়েছে এরকম দৃষ্টান্ত আর আছে কিনা সন্দেহ।

‘সন্দেশ’ যেমন বহু ছেলেমেয়ের মনের খোরাক জুগিয়েছে, তেমনি এক বিরাট লেখক গোষ্ঠি গড়ে উঠেছে এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। নিয়মিত লেখকরা ছাড়াও ছোটদেরও লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে ‘সন্দেশ’। প্রসঙ্গতঃ ১৩২৫-এর শ্রাবণ সংখ্যায় ৮ বছর বয়স্ক জনৈক অজয়নাথ রায়চৌধুরীর ‘নদী’ নামক একটি ছোট কবিতা প্রকাশিত হয়। এত অল্প বয়সে এ ধরণের কবিতা রচনা বিস্ময়কর। কবিতাটি ছিল –

“কে হে তুমি ঢেউয়ে ঢেউয়ে করিছ বন্দন।
ভক্তিভরে কার দুটি অভয় চরণ।।
তব স্নিগ্ধ ক্রোড়ে কত লোকে করে স্নান।
দেখিয়া তোমার শোভা মুগ্ধ করে প্রাণ।।
তোমার উপর দিয়া চলে কত তরী।
তোমার চরণে আমি প্রণিপাত করি”।।

খগেন্দ্রনাথ মিত্র তার ‘শতাব্দীর শিশু-সাহিত্য’ গ্রন্থে লিখেছেন –

“ ‘সন্দেশে’র বিষয়বস্তুতে নতুনত্ব ছিল না। পূর্বের পত্রিকাগুলির মতই উপন্যাস, ছোটোগল্প, কবিতা, ছড়া, বিজ্ঞান, ভ্রমণ কাহিনী, জীবজন্তুর বৃত্তান্ত, একরঙা বা রঙীন চিত্রাবলি ও ধাঁধা প্রকাশিত হত। কিন্তু রচনায়, পরিবেশনে, সাজসজ্জায় বা ছাপায় ‘সন্দেশ’ ছিল অতুলনীয়। ছবিগুলি সূক্ষরেখায় অঙ্কিত হত যা পূর্ব্বের ছবিগুলিতে দেখা যায় না। বিজ্ঞান, রসসাহিত্য ও চিত্রশিল্প – এই তিন মিলিয়ে নিপুণ হাতে ‘সন্দেশ’ তৈরি হত। রচয়িতাগণ শিশু ও কিশোরদের মন বুঝতেন। সব রচনার জন্ম হত তারই পরিপ্রেক্ষিতে।”

এখন যুগের পরিবর্তন হয়েছে। ছোট ছেলেমেয়েদের এখন পাঠ্যপুস্তকের বাইরে মনোনিবেশ করার সুযোগ কম, বাড়িতেও উপযুক্ত পরিবেশের অভাব। ‘সন্দেশে’র মত পত্রিকা আর কজন পড়বে? এর ফলে কল্পনা ও স্বপ্নের জগৎ হারিয়ে যাচ্ছে। বড় বেশী বস্তুতান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার শিকার হয়ে পড়ছে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা। এটা যে সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার পক্ষে সহায়ক নয়, সেটা বুঝতে হবে। যাই হোক, শিশুসাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার ও ‘সন্দেশ’কে বাদ দিয়ে করা সম্ভব নয়।

সংযুক্ত প্রতিলিপি – চিত্র – ১-৪ কয়েকটি সংখ্যার (যথাক্রমে অগ্রহায়ণ ১৩৩৮, কার্তিক ১৩৩৯, কার্তিক ১৩৪০ ও কার্তিক ১৩৪১ ) প্রচ্ছদের প্রতিলিপি।
চিত্র – ৫ : পত্রিকায় প্রকাশিত ‘হ-য-ব-র-ল’ রচনার একটি চিত্র।
চিত্র – ৬ : বৈশাখ ১৩৩০ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা।
চিত্র – ৭ : শ্রাবণ ১৩২০ সংখ্যায় সুকুমার রায়ের আঁকা কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ভবম হাজাম’ রচনার ছবি।
চিত্র – ৮ : ‘নবপর্য্যায়ে’র ‘সন্দেশ’ পত্রিকা।







  

 চিত্র – ১-৪ কয়েকটি সংখ্যার (যথাক্রমে অগ্রহায়ণ ১৩৩৮, কার্তিক ১৩৩৯, কার্তিক ১৩৪০ ও কার্তিক ১৩৪১ ) প্রচ্ছদের প্রতিলিপি।

চিত্র – ৫ : বৈশাখ ১৩৩০ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা।


লেখক পরিচিতি: বহু বছর বি.ই. কলেজে (এখন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, শিবপুর (IIEST,shibpur) অধ্যাপনা করেছেন। কিছুদিন হল অবসর নিয়েএখন সেখানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আছেন। অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স নিয়ে গবেষণা করলেও একাধিক বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে - জ্যোতিষশাস্ত্র, পুরনো কলকাতার সংস্কৃতি, ইত্যাদি। অবসর সময়ে 'অবসরে'র সঙ্গে সময় কাটান।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.