বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ

 

প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

প্রাচীন ভারত

সুকুমারী ভট্টাচার্য স্মরণ সংখ্যা , জুন ৩০, ২০১৫

 

বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ

দিলীপ দাস


সরস্বতী পূজোয় অঞ্জলি দেবার সময় আমরা দেবীর কাছে ‘বেদ, বেদান্ত, বেদাঙ্গ’ এই তিন বিদ্যায় পারদর্শিতা প্রার্থনা করি। কিন্তু আমাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই ‘বেদ, বেদান্ত, বেদাঙ্গ’ বলতে ঠিক কি ধরনের বিদ্যা বোঝায়, তা অজানা। এই প্রবন্ধটি মূলত: বৈদিক সাহিত্যের সমকালীন ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য, অর্থনীতি, ভাষা ও সমাজের ওপর গবেষণা ও বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে। যারা বেদ মন্ত্রের গূঢ়ার্থ বা অন্তর্নিহিত দর্শনের খোঁজ করতে চান, তারা এতে  রসদ পাবেন না।

সংহিতা

ঋগ্বেদ-সংহিতা

বেদগুলির চারটি অংশ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ।  বৈদিক সাহিত্যে সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশদুটিকে কর্মকাণ্ড ও আরণ্যক ও উপনিষদ দুটিকে জ্ঞানকাণ্ড বলা হয়। ভারতের আদিমতম সাহিত্য ঋগ্বেদ।  ইন্দো-ইউরোপীয়ান সংস্কৃতির ভারতে অবস্থিত এক শাখা হিসেবে ঋগ্বেদের সৃষ্টি। পুরাকালে ঋগ্বেদ সংহিতার অনেকগুলি শাখা ছিল, এখন তাদের মধ্যে শাকল ও বাষ্কল দুটি পাওয়া যায় এবং শাকল শাখাটিই বেশি ব্যবহৃত। ঋগ্বেদের শাকল শাখায় দশটি মণ্ডল, যাতে মোট ১০২৮টি সুক্ত বা মন্ত্র। এই সুক্তগুলি হচ্ছে ১০৮৫০ শ্লোক বা ঋকের সমষ্টি। ঋগ্বেদের দশটি মণ্ডলের সবগুলি এক সময় রচিত হয় নি। ঋগ্বেদের সবচেয়ে পুরোনো মণ্ডলগুলি হচ্ছে দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল, যেগুলি সাতজন ঋষি ও তাঁদের পরিবারবর্গের লেখা বলে ‘পারিবারিক মণ্ডল’ বলা হয়। এর পরে প্রথম মণ্ডলের শেষাংশ ও অষ্টম মণ্ডলের রচনা, তার পর নবম মণ্ডল, যার বেশীর ভাগ সুক্তই হচ্ছে সোমরসের নিষ্কাশন তার গরিমার উদ্দেশ্যে রচিত। ঋগ্বেদের সবচেয়ে নবীন, সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ  হচ্ছে দশম মণ্ডল।

সুকুমারী ভট্টাচার্য ঋগ্বেদের রচনাকাল ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দ্বারা ১২০০ – ১০০০ বা ৯০০ খ্রী পূর্বাব্দ বলে ধরেছেন। তবে এই ব্যাপারে প্রচুর মতভেদ আছে পণ্ডিতদের মধ্যে। মোটামুটি ভাবে ১৪০০ থেকে ৯০০ খ্রী পূর্বাব্দের সীমার মধ্যে বেশীর ভাগ মতামত ঘোরাফেরা করে। কিছু লোক মনে করেন ঋগ্বেদের বয়স পাঁচ হাজার বা তারও বেশী পুরোনো, যদিও এই মতের সমর্থনে খুব বেশী লোক পাওয়া যায় না।

কথিত আছে যে ঋগ্বেদ ও অন্যান্য বেদগুলি লিখিত হবার আগে মৌখিক ভাবে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত ছিল। আরো একটা গল্প আছে যে ম্যাক্সমূলার বেদের প্রথম ইংরেজী অনুবাদ করার আগে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়েকজন পণ্ডিত এনে তাদের কাছে ঋগ্বেদ শুনতে চান। কথিত আছে যে সকলেই একই ঋগ্বেদ শোনান তাঁকে। তবে এটা কতদূর সত্যি সেই নিয়ে কয়েকজন বর্তমান পণ্ডিত সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

ঋগ্বেদের সুক্তগুলির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক সমস্যাগুলির থেকে দেবতার কৃপালাভ ও রক্ষা। তাই সুক্তগুলির পেছনে নান্দনিক প্রয়াস মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না। তবু প্রচুর সুক্ত আছে যা কবি, শিল্পী ও ঐতিহাসিকদের কাছে সমান প্রিয়। এরকম কিছু সুক্ত, যেমন নাসদীয় সুক্ত  যেটি ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি সুক্ত হিসেবে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের কৌতূহল উদ্রেক করে, পুরুষ সুক্ত যেখানে এক সহস্রশীর্ষ, সহস্রপাদ বিরাট পুরুষের ধারণা ও তার থেকে বিশ্বসৃষ্টির বর্ণনা করা আছে, কবিত্বময় রাত্রি সুক্ত ও অরণ্যানী সুক্ত, বিতর্কমূলক যম-যমী সুক্ত, বিয়েতে বহু ব্যবহৃত সূর্যসুক্ত অথবা চিরন্তন সমাজের এক খণ্ডচিত্র হিসেবে জুয়াড়ীর বিলাপ সুক্ত - এই সুক্তগুলির আলোচনা নিয়ে ভারতীয় ও বিদেশী পণ্ডিতদের অনেক বই বাজারে আছে। কিন্তু সেগুলির বেশীর ভাগই নিরস অনুবাদ অথবা অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা। এই সুক্তগুলি সম্ভবত আনুষ্ঠানিক হলেও পেছনে আছে সুন্দর চিত্রকল্প, ঋষিদের জীবনবোধ এবং সামাজিক ছবির পরিচয়। এর সাথে বিভিন্ন ইন্দো-ইরানীয়ান ও গ্রীক প্রত্নকথাগুলির সাথে জায়গায় জায়গায় সামঞ্জস্য আছে।

ঋগ্বেদের ভাষা নিয়ে খুব বেশী নিগূঢ় আলোচনা করব না, কারণ Vedic Philology একটি ভিন্ন শাখা হিসেবে বিস্তার লাভ করেছে। এর সাথে আছে ঋগ্বেদের প্রাক্‌-সংস্কৃত ভাষার বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তন, ভাষার মিতব্যয়ীটা, বিশেষণের ব্যবহার, উচ্চারণ ও স্বরাঘাত, বিভিন্ন ছন্দ এবং ঋগ্বেদে মহাকাব্যের লক্ষণ – এগুলি তুলে ধরতে গেলে প্রবন্ধের কলেবর বেড়ে যায় পাঠকের সংখ্যা কমতে থাকে। সেজন্য এই বিষয়গুলি এই প্রবন্ধে বাদ দেওয়া হল।

ঋগ্বেদের সমাজ মূলত কৃষিজীবী ও পশুপালক। সুবৃষ্টির জন্য দেবতাদের কাছে প্রার্থনা আর গবাদি পশুগুলিকে সম্পদস্বরূপ রক্ষনাবেক্ষন। তবে গবাদিপশু যে চুরি যেত তার প্রমাণ মেলে পণী ও সরমার উপাখ্যানে। শিল্পের মধ্যে ধাতুশিল্প, রথ নির্মাণ ও বয়ন শিল্পের উল্লেখ আছে। গ্রামকেন্দ্রিক যে সমাজের কথা ঋগ্বেদে বর্ণিত, তাতে কিন্তু কোথাও কোন নগরীর বিবরণ নেই। ঋগ্বেদের পুরুষ সুক্তে বলা হয়েছে ব্রাহ্মণের পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য ও পা থেকে শূদ্রের উৎপত্তি হয়েছিল। এ থেকে কিছু লোক বলেন যে সে যুগে বর্ণভেদ প্রথা চালু ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ পণ্ডিতের মতে এই অংশটি অনেক পরে রচিত ও প্রক্ষিপ্ত, কারণ ঋগ্বেদে আর কোথাও বর্ণভেদের উল্লেখ নেই। এই রকম ভাবেই ঋগ্বেদের আর একটি শ্লোকের শেষাংশ বিকৃত করে ব্রাহ্মণকূল সতীদাহের স্বপক্ষে লাগিয়েছিলেন।

ঋগ্বেদের প্রাচীন ভাষ্যকার হিসেবে সায়নাচার্যের নাম বিখ্যাত হলেও তাঁর আগেও বিভিন্ন ভাষ্যকার, যেমন স্কন্দস্বামী, নারায়ণ, উদ্‌গীথ, প্রমুখ, ঋগ্বেদের ভাষ্য করেছেন। আধুনিক কালে ঋগ্বেদের ধর্ম ও দর্শন নিয়ে ঋষি অরবিন্দ তাঁর ‘বেদ-রহস্য’ বইটি লিখেছেন। অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে ওল্ডেনবার্গ, ভান্ডারকর, উইলসনের মতো মনীষীদের থেকে শুরু করে বর্তমানের ওয়েন্ডি ডনিগার, দীপক ভট্টাচার্য প্রমুখেরা বেদের দেবতা ও প্রত্নকথাগুলির বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা করেছেন।

ইন্দ্র ও অগ্নি ঋগ্বেদের প্রধান দুই দেবতা। নিরুক্তকার যাস্ক সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ট শতকে ঋগ্বেদের দেবতাদের তিন ভাগে বিন্যস্ত করেছিলেন –ভূলোকবাসী, দ্যুলোকবাসী ও অন্তরীক্ষবাসী। এখনকার গবেষকরাও এই বিভাগ মেনে চললেও, এর সাথে কাল অনুযায়ী ভাগ করেন, যেমন দ্যৌঃ, সূর্য, মিত্র-বরুণ, ইত্যাদি প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয়ান দেবতারা বা পরের দিকে উদ্ভূত বায়ু, আদিত্য, পুরুষ ইত্যাদিরা। বিখ্যাত গায়ত্রী মন্ত্র, যা মূলত সবিতা বা সূর্যের উদ্দেশ্যে বিরচিত, ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডলে প্রথম পাওয়া যায়, যা পরে অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যে উদ্ধৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে ঋগ্বেদে বিষ্ণু প্রধান দেবতা নন,  যিনি প্রধানত ইন্দ্রের সহচর।
অনেকের মতে বেদের ধর্ম বলতে বহুদেবতা কেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া কলাপ, নীতিবোধ, ইন্দ্রজাল (মূলত অথর্ব বেদে) ও কিছু প্রত্নকথা। এই প্রত্নকথাগুলি আখ্যান হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো। কিন্তু এর সাথেই আমরা দেখি বৈদিক নীতিবোধ যা দেবতা ও মানুষকে ঋত অথবা সত্যের পথগামী হতে এবং ধৈর্য, দান, দয়া, অতিথিপরায়ণতা ইত্যাদি গুণাবলীর চর্চা করতে বলা হয়েছে। এই সবেরই মাঝে নিহিত আছে ঋগ্বেদের দর্শন, যা শতাব্দীর বিবর্তনের পর পরিস্ফুট হয়েছে দশম ও প্রথম মণ্ডলের শেষাংশে। সেখানেই আমরা দেখতে পাই ঋষিরা হিরণ্যগর্ভ সুক্তে জিজ্ঞাসা করছেন ‘কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম’ (কোন দেবতাকে হবির দ্বারা পূজা করি?) বা নাসদীয় সুক্তের শেষে প্রশ্ন উঠছে কে এই জগতের সৃষ্টি করেছেন ও কেন করেছেন, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা হয়তো জানেন অথবা ‘আঙ্গ বেদ যদি বা না বেদ’, হয়তো তিনিও জানেন না। এখানেই বহুদেবতার মাঝে একেশ্বরবাদরূপে এক নতুন দর্শনের উৎপত্তি ও উপনিষদের শুরু।

সামবেদ সংহিতা

সামবেদ সংহিতার তিনটি পাঠভেদ আছে – জৈমিনীয়, রাণায়নীয় ও কৌথুম।  শাখা পাওয়া যায়, ভাগবত গীতাতে ভগবান নিজেকে বেদের মধ্যে সামবেদ (বেদানাং সামবেদোহস্মি, গীতা ১০/২২) বলেছেন, কিন্তু একজন ইন্ডোলজিস্টের চোখে সামবেদের গুরুত্ব খুব কম। (প্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী সামবেদের ১০০০ শাখা ছিল। হয়ত কোনো এক শাখা ছিল সেযুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কিন্তু বর্তমানে সেটি লুপ্ত।) সামবেদের ১৮১০টি মন্ত্রের মধ্যে ১৭৩৫টি ঋগ্বেদের অষ্টম ও নবম মণ্ডল থেকে অবিকৃত ভাবে নেওয়া হয়েছে ও বাকীগুলির অধিকাংশই যজুর্বেদ বা অথর্ববেদ থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো যে সামবেদ মন্ত্রগুলি ঋগ্বেদের প্রাচীনতর অংশগুলিকে অনুসরণ করেছে তাই এতে প্রাচীন দেবতাদেরই প্রাধান্য। সামবেদের যেসব সুক্তগুলি সংগীত হিসেবে প্রচলিত ছিল, সেগুলি সামগান বলেই আমরা জানি; রবিকবির ভাষায় ‘ ..প্রথম সামরব তব তপোবনে’।
সামবেদের রচয়িতা/ গায়কদের প্রধান কাজ ছিল যে এই মন্ত্রগুলিকে গানের রূপ দেওয়া।

সামবেদ সংহিতাকে দুভাগে ভাগ করা হয়, আর্চিক (বা পূর্বার্চিক) এবং উত্তরার্চিক। আর্চিক ব্যবহার হত ভাবী উদ্‌গাতা বা তার সহায়কের প্রশিক্ষণের জন্য, আর উত্তরার্চিক ছিল সেই গানগুলির ব্যবহারিক ও যজ্ঞানুষ্ঠানের সহায়করূপে বিন্যস্ত। যজ্ঞানুষ্ঠান জটিল ও দীর্ঘ হওয়াতে দুটি আর্চিকের গানগুলিকে গ্রামগীত, অরণ্যগীত, ইত্যাদি চারভাগে ভাগ করা। প্রকাশ্যে গুরুগৃহে যা শেখানো হত তা গ্রামগীত ও অরণ্যানীর নির্জনতায় যা শেখানো হত তা ছিল অরণ্যগীত। মন্ত্রগুলিকে সংগীতের প্রয়োজনে বিকার (একক শব্দের পরিবর্তিত উচ্চারণ), বিশ্লেষণ (শব্দের বিভাজন), বিকর্ষণ (কোনো শব্দের বিশ্লিষ্ট অক্ষরসমূহের মধ্যে দীর্ঘায়ত স্বরবর্ণের সন্নিবেশ), ইত্যাদি ছয় ভাগে ভাগ করা ছিল। একদিক দিয়ে এরাই ছিল বর্তমানের সাত সুর ও রাগ-রাগিনীর পূর্বসূরি। আবার বৃহৎ, রথন্তর, বামদেব্য, রৈবত, গৌরীবিত, অভিবর্ত, ইত্যাদি কিছু পুরোহিত পরিবার কয়েকটি সুরে বিশেষ পারদর্শী তাদের নামে সামগানের নামকরণ হয়েছিল। এদের বর্তমানের ‘ঘরানা’র পূর্বসূরি বলা যেতে পারে। তবে সামবেদের কয়েকজনঋষির নাম বেশ অন্যরকম – ইরিমিরি, ইরিঞ্চি, ইরিমি, মিরি ও রিণু।

ঋগ্বেদের সাথে তুলনায় সামবেদের উচ্চারণের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। ঋক্‌-মন্ত্রগুলি যজ্ঞের হোতা ও তার সহকারীরা তিন প্রকার স্বরের সাথে উচ্চারণ করতেন (উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত)। কিন্তু সামবেদের সুক্তগুলি উদ্‌গাতা ও তার সহকারীরা গান হিসেবে গাইতেন ও পেছনে দাঁড়িয়ে কিছু উপগাতাগণ তাদের সাথে গলা মেলাতেন, মাঝে মাঝে কিছু একাক্ষর শব্দ (আ, হু, উ, ইত্যাদি), যাদের স্তোভ বলা হত, গানের সাথে জুড়ে দিতেন। বর্তমানের সংগীতের সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে? সুললিত ও বিভিন্ন গতির ছন্দের ব্যবহার দেখে মনে হয় এই গানের সাথে নৃত্য থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। এই গানগুলির মূল উদ্দেশ্য ছিল যজ্ঞের সফলতা কামনা ও অশুভ শক্তি গুলির থেকে দূরে থাকা। সামবেদে খাদ্য, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনার আধিক্য দেখে মনে হয় সেই যুগে সমাজ ও অর্থনীতির বদলের সাথে সাথে এইগুলির প্রয়োজন বেশী হয়ে পড়েছিল।

যজুর্বেদ সংহিতা

যজুর্বেদ সংহিতা দুই প্রধান শাখায় বিভক্ত – শুক্ল ও কৃষ্ণ। রচনাকালের দিক থেকে শুক্ল যজুর্বেদ পূর্ববর্তী। যজুর্বেদ প্রধানত যজ্ঞকেন্দ্রিক, এতে বিভিন্ন যজ্ঞের মন্ত্র ও অনুষ্ঠানসূত্র ও বিবৃতি, যজ্ঞবেদী নির্মাণ, যজ্ঞাগ্নিসমূহের আধান ইত্যাদি আছে। শুক্ল যজুর্বেদের দুই শাখা, রচনাকাল অনুযায়ী – কাণ্ব ও মাধ্যন্দিন। এদের পাঠগত ভিন্নতা মূলত ভৌগোলিক – বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে শ্রুতি হিসেবে বিস্তার লাভ করার সময় পাঠগত ভিন্নতা এসে যায়। কৃষ্ণ যজুর্বেদের পাঁচ (বা ছয়) শাখার মধ্যে তৈত্তিরীয় শাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলিতে কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার প্রচলন বেশী দেখা যায়।  

আচার্য সায়ন ঋগ্বেদের আগে যজুর্বেদের ভাষ্য করেছিলেন, কারণ সেকালে যজ্ঞের অনুষ্ঠান অপেক্ষাকৃত ভাবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। যজুর্বেদের বিভিন্ন যজ্ঞের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে, অশ্বমেধ, সোমযোগ (এটি বহু-বছরব্যাপী এক ব্যয়বহুল যজ্ঞ ছিল), বাজপেয়, দীক্ষণীয়েষ্টি, দর্শপূর্ণমাস, সৌত্রামণী, ইত্যাদি। শুক্ল যজুর্বেদের মাধ্যন্দিন শাখার বাজসেনীয় সংহিতার শেষাংশে আছে এমন কয়েকটি যজ্ঞ,  সর্বমেধ, পিতৃমেধ পুরুষমেধ – এদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও  প্রণালী নিয়ে নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনো বিতর্ক চলে। এই সংহিতার শেষাংশে বেশ কিছু স্থানে দার্শনিক চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়, যা যজ্ঞকেন্দ্রিক যজুর্বেদের মূল স্রোতের থেকে আলাদা। এখানেই আছে বিখ্যাত শতরুদ্রিয় বা রুদ্রপ্রশ্ন মন্ত্রগুলি (যা দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন শিবমন্দিরে বা বেলুড়মঠে, শিবরাত্রিতে পঠিত হতে দেখেছি)। এর এই সংহিতারই শেষ ৪০তম অধ্যায়টি হচ্ছে বিখ্যাত ঈশোপনিষদ।

সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে রচনাকাল হিসেবে যজুর্বেদকে ঋগ্বেদের পরবর্তী কালের, মোটামুটি ভাবে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডল বা প্রথম মণ্ডলের প্রথমাংশের সমসাময়িক ধরা যায়।  যদিও যজুর্বেদের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ে রচিত তার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেমন কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতা বা শুক্ল যজুর্বেদের বাজসেনীয় সংহিতার যেসব মন্ত্রগুলিতে ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলি বিশুদ্ধতম ভাবে রক্ষিত হয়েছে, সেগুলি পূর্বে রচিত। তৈত্তিরীয় সংহিতা বিভিন্ন প্রত্নগাথাতে শিব বা বিষ্ণুর কাহিনীগুলি থেকে ধারনা হয় যে সেই অংশগুলি আরো পরে রচিত, সম্ভবতঃ পুরাণগুলির সমসাময়িক, ইতিহাসের গুপ্তযুগ বা তারও পরবর্তী।

যজুর্বেদের যজ্ঞগুলি থেকে সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক জীবনের কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজতন্ত্রের উৎপত্তি, দুর্বলতর শত্রুর ওপরে আধিপত্য করাই ছিল যজ্ঞানুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়াও ছিল যজ্ঞের মাধ্যমে উর্বরতা-চর্চা, ইন্দ্রজাল, অশুভ শক্তির প্রভাব মুক্তি ও প্রাচীন আর্যদের কিছু আদিম প্রহেলিকাময় সংস্কৃতির চর্চা, যার গূঢ়ার্থ হয়তো তখনকার মানুষ ভুলেই গিয়েছিল।  সমস্ত যজ্ঞানুষ্ঠানের মধ্যে ব্যতিক্রমী ছিল সর্বমেধ যজ্ঞ, যেখানে  যজমান যজ্ঞ শেষে সমস্ত কিছু প্রতীকীভাবে প্রার্থীদের সমর্পণ করেন। এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে আত্মদান ও আত্মসমর্পণের দার্শনিক তত্ত্ব, যা পরে ঈশোপনিষদে পরিস্ফুট। এর জন্যই সর্বমেধ যজ্ঞকে সর্বশ্রেষ্ঠ যজ্ঞ বলা হয়েছে। 

যজুর্বেদের সময় থেকেই বর্ণভেদ ক্রমশঃ কঠোর হতে থাকে। আর্যরা অনার্য নারীদের বিবাহ করতেন। কৃষি সম্পদ বৃদ্ধি ও বণ্টনের সাথে সাথে সমাজে নারীদের স্থান পুরুষদের তুলনায় হীন হতে থাকে। প্রাচীন ভারতে নারীদের স্থান নিয়ে সুকুমারী ভট্টাচার্যের গবেষণা তাঁর অন্য একটি বইয়ে (প্রাচীন ভারতে নারী) সবিস্তার লেখা আছে, তাই এই ব্যাপারে এখানে আলোচনা করছি না।

অথর্ববেদ সংহিতা

অথর্ববেদ কিন্তু শুরুতে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বেদ হিসেবে গণ্য হতো না। এ বিষয়ে প্রচুর উদাহরণ দেওয়া যায়, যেমন ঋগ্বেদের পুরুষ সূক্তে তিন বেদের উল্লেখ। অথর্ববেদকে বেদ হিসেবে উল্লেখ আছে ছান্দোগ্য উপনিষদে ও শতপথ ব্রাহ্মণে, অন্যান্য বিদ্যার সাথে অথর্বাঙ্গিরস নামে। এর মূল কারণ অথর্ববেদের বিষয়বস্তু, যা মূলত ইন্দ্রজাল, গার্হস্থ্য বা নারীবিষয়ক, সামাজিক ও পারিবারিক এবং রাজকীয় অনুষ্ঠান বিষয়ক মন্ত্র, যা বাকী তিন বেদের বিষয়বস্তুর সাথে সুসমঞ্জস নয়। তবে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে বা বৃহদারণ্যক উপনিষদের শেষাংশে এই ধরনের মন্ত্রের দেখা পাওয়া যায়, যেগুলি অথর্ববেদের সমসাময়িক। পরবর্তীকালে অথর্ববেদের বেদসাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভের প্রধান কারণ পুরোহিতশ্রেণীর আধিপত্য বিস্তার ও সমাজে প্রতিকূল শক্তি ও  রোগ ইত্যাদি প্রতিরোধের জন্য ইন্দ্রজালিক শক্তির গুরুত্ব বৃদ্ধি।

অথর্ববেদের দুটি শাখা পাওয়া গেছে, পৈপল্লাদ ও শৌণক, কিন্তু প্রাচীন সাহিত্যে এর ন’টি শাখার উল্লেখ আছে। অথর্ববেদের রচয়িতাদের মধ্যে অথর্ব, ভৃগু বা অঙ্গিরার মত প্রাচীনতর ঋষিরা ছাড়াও বুদ্ধ, অজমীড় ও নারায়ণ নামের অপেক্ষাকৃত আধুনিক ঋষিদের নাম আছে। অথর্ববেদের পুরোহিত ব্রহ্মা, যিনি ঋগ্বেদের দেবতা নন, বা ঋগ্বেদে প্রজাপতি নামে পরিচিত। তাঁকেই অথর্ববেদের রচয়িতা বলে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়াও অথর্ববেদে শিব বা নীললোহিতের উল্লেখ দেখে মনে হয় এসময় বর্তমান পৌরাণিক দেবতাদের ধারনা দানা বেঁধেছিল।

অথর্ববেদের মোট কুড়িটি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম ছয়টি এবং অষ্টম ও নবম অধ্যায়ে যে সব সূক্ত আছে তাদের প্রধান উপজীব্য হল শত্রু দানব রাক্ষস ইত্যাদিদের বিতাড়ন, রোগ নিরাময় মন্ত্র (যেমন ক্ষয়রোগ, রক্তপাত বন্ধ, সর্পদংশন, গলগন্ড, ইত্যাদি), বঞ্চিতা ও অনূঢ়া নারীদের প্রায়শ্চিত্তের প্রার্থনা, বৃষ্টিপাত, বীরপুত্রের জন্ম, অমঙ্গল মুক্তি ও রাজার বিজয়। সপ্তম ও নবম অধ্যায়ে আছে আত্মা, ব্রহ্ম ইত্যাদির দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ও বিখ্যাত অস্যবামীয় সূক্তটি আর দ্বাদশ অধ্যায়ে আছে পৃথিবীর বর্ণনামূলক কাব্যময় ভূমিসূক্তটি। তবে আমার নিজের বিশেষ প্রিয় বহমান সময়ের উদ্দেশ্যে রচিত উনবিংশ অধ্যায়ের কালসূক্ত, যাকে পণ্ডিতেরা theosophic and cosmogenic বলেছেন।

অথর্ববেদের অন্যতম শাখা চরণবৈদ্যকে প্রাচীন চরক সংহিতার লুপ্ত উৎস মনে করা হয় এইজন্য যে রোগনিরাময় মন্ত্রগুলি ছাড়াও এর ভৈষজ্য অংশে রোগের চিকিৎসা বা ওষধি, ধাতু ও রাসায়নিক থেকে ওষুধ প্রস্তুতি – এসব দেখে মনে হয় যে অথর্ববেদে চিকিৎসার পদ্ধতি খুব প্রাথমিক স্তরে হলেও বিদ্যমান ছিল।
অথর্ববেদের রচনাকাল ও রচনাস্থল নিয়ে বহুমত বিদ্যমান। সাল ১৯৫৯-এ কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ দুর্গামোহন ভট্টাচার্য প্রচুর পরিশ্রম করে অনেক খোঁজাখুঁজি করে পৈপ্পলাদ সংহিতার বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। তাঁর প্রয়াণের পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র, আমার বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র, দীপক ভট্টাচার্য সেই গবেষণা সম্পূর্ণ করেন। উৎসাহী পাঠকদের এ বিষয়ে দীপক ভট্টাচার্যের অথর্ববেদ নিয়ে সুগভীর গবেষণার বইগুলি দেখতে বলছি। এছাড়াও ওয়েন্ডি ডনিগার প্রমুখ গবেষকদের লেখায় পড়েছি যে অথর্ববেদে লোহিত অয়স ও কৃষ্ণ অয়স নামের দুই ধাতুর উল্লেখ আছে। লোহিত অয়সের নাম ঋগ্বেদেও আছে তাই এটি যদি তামা হয় তাহলে কৃষ্ণ অয়স হচ্ছে লোহা – এই হিসেবে একদল পণ্ডিত ভারতে লৌহযুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অথর্ববেদের রচনাকাল হিসেবে খ্রীষ্ট পূর্ব ১০০০-৯০০ অব্দ ধরেন। তবে অনেকে মনে করেন ভারতে লোহার ব্যবহার আরো পুরোনো। সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে বৌদ্ধযুগে অন্যান্য ধর্মমতের সাথে প্রতিযোগিতার ফলে অথর্ববেদ বেদসংহিতার অন্তর্ভুক্ত হয়।

অথর্ববেদের যুগে সামাজিক চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে সেযুগে বিধবা বিবাহ ও সতীদাহ দুটোই যে চালু ছিল। ব্রাত্যসূক্তে যে ব্রাত্যদের কথা বলা আছে তারা আর্য ভাষায় কথা বলে ও সম্ভবতঃ আর্যদের মধ্যেই বৈদিক আচার না-মানা কোনো গোষ্ঠী।

বৈদিক সাহিত্যে বেদের সংহিতা অংশগুলি যদি মন্ত্রগানের কাব্য হয় তাহলে ব্রাহ্মণ অংশগুলিতে যজ্ঞের প্রক্রিয়া ও সুফল বিবৃত। প্রতিটি বেদের আলাদা আলাদা ব্রাহ্মণ আছে। প্রায় প্রতিটি  ব্রাহ্মণের রচনাকাল সংহিতা অংশগুলির অনেক পরে। সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে বেশীর ভাগ ব্রাহ্মণগুলি লেখা হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব দশম থেকে ষষ্ট শতাব্দীর মধ্যে। বাকী তিন বেদের একাধিক ব্রাহ্মণ অংশ থাকলেও অথর্ববেদের ব্রাহ্মণের সংখ্যা একটি – এর থেকে বোঝা যায় যে সংহিতা সাহিত্যগুলির মধ্যে অথর্ববেদ অনেক আধুনিক।

ব্রাহ্মণ

সূত্র সাহিত্যে তেইশটি ব্রাহ্মণের উল্লেখ থাকলেও এর মধ্যে অনেক কটি এখন লুপ্ত ও আংশিক বা পুরোপুরি ভাবে অন্যান্য ব্রাহ্মণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।  ঋগ্বেদীয় ব্রাহ্মণ দুটি, ঐতরেয় ও কৌষীতকী, এদের মধ্যে ঐতরেয় প্রাচীনতর, যার ভৌগোলিক পটভূমিকা কুরুপাঞ্চাল ও বশঊশীনর  অঞ্চল। এতে আছে বিখ্যাত রাজসূয় যজ্ঞের প্রক্রিয়া। এছাড়াও কৌষীতকী ব্রাহ্মণের ভৌগোলিক পটভূমিকা নৈমিষারণ্য – বোঝা যাচ্ছে যে আর্যসভ্যতা ততদিনে দক্ষিণ-পূর্বে সরে এসেছে।

বৈদিক সাহিত্যে সামবেদীয় ব্রাহ্মণ সমৃদ্ধতম – এতে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক ব্রাহ্মণ আছে, যা মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তাণ্ড্য মহা ব্রাহ্মণ বা পঞ্চবিংশতি ব্রাহ্মণ। নাম থেকেই বোঝা যায় এতে আছে পঁচিশটি অধ্যায়। এর আলোচ্য বিষয় হল সামগান ও সাম মন্ত্রের পদ্ধতি। এতে আছে অগ্নিষ্টোম ও অন্য সাতাশি ধরনের যজ্ঞানুষ্ঠান। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বিশ্বসৃজাময়ন যজ্ঞ, যা কিংবদন্তী অনুযায়ী এক হাজার বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়। সরস্বতী ও দৃষদ্বতী নদীর অববাহিকা এর ভৌগোলিক পটভূমিকা। ব্রাহ্মণের যুগে যে সমাজে শিল্পচর্চা গুরুত্ব পেত তার প্রমাণ ঐতরেয় ব্রাহ্মণের একটি চিরন্তন সুন্দর কথায় – শিল্প হচ্ছে বাস্তবেরই অনুকরণ। শিল্পের এইধরনের ব্যাখ্যা বৈদিক সাহিত্যে প্রথম।  পঞ্চবিংশতি ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে শিল্প তিন প্রকার – নৃত্য, গীত ও বাদ্য। ষড়বিংশ ব্রাহ্মণে আছে স্বাহা, স্বধা, বষট্‌ উচ্চারণের বিধি ও দেবমন্দির ও প্রতিমার উল্লেখ – যা থেকে ধারনা করা যায় বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে এটি অনেক আধুনিক।  সামবেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রাহ্মণ হচ্ছে ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ, যার শেষ আটটি অধ্যায় নিয়ে রচিত বিখ্যাত ছান্দোগ্য উপনিষদ। সামবেদের আর একটি  ব্রাহ্মণে - সামবিধান ব্রাহ্মণে, আছে একটি চিত্তাকর্ষক কথা – সমস্ত জগত সাত সুরের সঙ্গীত প্রবাহে বিধৃত। এখান থেকেই কি সাত সুরের উৎপত্তি?

কৃষ্ণ যজুর্বেদের একটি মাত্র ব্রাহ্মণ পাওয়া যায় – তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ। একে সাধারণত তৈত্তরীয় সংহিতার অংশ হিসেবেই ধরা হয়। এরই উপসংহারে আছে বিখ্যাত কঠোপনিষদ।

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বহু গবেষিত হচ্ছে শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ। এর রচয়িতা হিসেবে দুজনের নাম পাওয়া যায়, শাণ্ডিল্য ও যাজ্ঞবল্ক্য।  শাণ্ডিল্য রচিত অংশটির ভৌগোলিক পটভূমিকা ভারতের উত্তর-পশ্চিম আর যাজ্ঞবল্ক্য রচিত অংশটিতে বিদেহর মতো দক্ষিণ-পূর্বের উল্লেখ আছে। তাই মনে করা হয় এই ব্রাহ্মণ সুদীর্ঘ কাল ধরে রচিত। এতেই আছে মনুর উপাখ্যান-  বিখ্যাত মহাপ্লাবন ও মনু কর্তৃক প্লাবন থেকে রক্ষা এবং যজ্ঞের সাহায্যে পুনঃ সৃষ্টি। এই উপাখ্যানটি পরে পুরাণে বিস্তার লাভ করেছে। জনমেজয়, পরীক্ষিত, শৌনক ইত্যাদি মহাভারতের কিছু চরিত্রের নাম শতপথ ব্রাহ্মণে পাওয়া আয়।

গোপথ ব্রাহ্মণ অথর্ববেদের একমাত্র ব্রাহ্মণ। অন্যান্য ব্রাহ্মণের মতো এতে যজ্ঞানুষ্ঠানের পদ্ধতি প্রক্রিয়া থাকলেও, এতে কিন্তু সেযুগের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর খুঁজে পাওয়া যায়। এতে অথর্ববেদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা দেখে মনে হয় বেদ হিসেবে দীর্ঘকাল অবহেলিত থাকার পর এ যেন এক বিলম্বিত প্রতিবাদ। এই ব্রাহ্মণেই পুত্র শব্দের ব্যুৎপত্তি হিসেবে পুন্নাম নরক থেকে ত্রাণ করে যে সে পুত্র, এর প্রথম উল্লেখ আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে আছে যে নারী, শূদ্র, সারমেয় ও কৃষ্ণবর্ণ পাখী দেখা অমঙ্গলজনক।  বোঝাই যাচ্ছে ব্রাহ্মণের যুগে পুরুষ শাসিত সমাজ পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় জাতিভেদ  সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল,  ব্রাহ্মণ বর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব ও শূদ্রবর্ণের বিড়ম্বিত জীবনের প্রমাণ ব্রাহ্মণগুলিতে প্রচুর।

ব্রাহ্মণগুলিকে প্রাচীন সংস্কৃত গদ্যসাহিত্যের প্রথম নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়। তবে এই গদ্য ছিল ছন্দোবদ্ধ, সমাসবদ্ধ ও স্মৃতিতে রাখার সুবিধার জন্য পুনরাবৃত্তি ও পৌনঃপুনিকতা দুষ্ট। তাই এতে সংহিতার কাব্যঝংকারের আনন্দ অনুপস্থিত। ব্রাহ্মণগুলির ভাষা পাণিনি পূর্ববর্তী হিসেবে ধরা হয়। কেবল গোপথ ব্রাহ্মণকে পাণিনির সমসাময়িক বলা হয়েছে।

ব্রাহ্মণগুলিতে প্রচুর উপাখ্যান আছে, যেগুলি পুরাণের গল্পকথাগুলির পূর্বসূরি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শতপথ ব্রাহ্মণের দেবাসুরের সংগ্রাম ও প্রজাপতি ব্রহ্মার বরদানের ঘটনাগুলি। বৈদিক সাহিত্যে এখানেই প্রথমবার এই সংগ্রামকে সত্য ও অসত্যের দ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যে ধারনাটি অনেক পরে বিভিন্ন পুরাণে সম্পূর্ণতা লাভ করেছে। 

আরণ্যক

বৈদিক সাহিত্যের জ্ঞানকাণ্ডের মধ্যে পড়ে আরণ্যক ও উপনিষদগুলিকে। যদিও সংহিতা ও ব্রাহ্মণ,  আর আরণ্যক ও উপনিষদের মধ্যে সঠিক ভেদরেখা টানা অসম্ভব কারণ এরা প্রায়শই একে অন্যের ওপরে বিস্তার লাভ করেছে। তাই সাধারণত বৈদিক সাহিত্যকে সংহিতাপূর্ব (সংহিতা ও ব্রাহ্মণ) এবং সংহিতাউত্তর (আরণ্যক ও উপনিষদ) ভাগে মোটামুটি বিভাজন করা হয়। প্রচলিত অর্থে আরণ্যকগুলি অরণ্যে রচিত বলে ধরা হয়। পাণিনি ‘আরণ্যক’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন অরণ্যে বসবাসকারী ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু অরণ্যে রচিত গ্রন্থ হিসেবে ‘আরণ্যক’ শব্দের ব্যবহার করেন কাত্যায়ন, যাকে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের ধরা হয়। এর থেকে কিছু পণ্ডিত মত পোষণ করেন যে আরণ্যকগুলি আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে রচিত। আকারে ক্ষুদ্রতম হলেও, যুগসন্ধিক্ষণের সাহিত্য বলেই আরণ্যকগুলির তাৎপর্য।

প্রত্যেক সংহিতার এক বা একাধিক ব্রাহ্মণ থাকলেও প্রতি সংহিতার নিজস্ব আরণ্যক বা উপনিষদ নেই। শুধু তিন ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম – ঋগ্বেদের ঐতরেয় ও কৌষীতকী এবং যজুর্বেদের তৈত্তিরীয়, যাদের নিজস্ব সংহিতা,  ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ রয়েছে।

ঋগ্বেদের ঐতরেয় ও কৌষীতকী আরণ্যকের প্রথম দিকের অধ্যায়গুলিতে আমরা যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠানেই কথাই দেখি, যা দেখে মনে হয় এই অংশগুলি যেন ব্রাহ্মণেরই প্রলম্বিত শাখা মাত্র। কিন্তু শেষভাগ গুলিতে কিছু প্রতীকী বিশ্লেষণ ও ঔপনিষদিক ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন প্রাণের উপাসনা, ত্যাগের মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞানলাভ, অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক বিবৃতি, উচ্চতর জ্ঞান অর্জন ও প্রজ্ঞার অনুশীলন। এদিকে দিয়ে আরণ্যকগুলিকে জ্ঞানকাণ্ড বলা যুক্তিযুক্ত। জ্ঞানের প্রতি এত শ্রদ্ধা - ইন্দ্র, সরস্বতী ও অশ্বীদ্বয়ের কাছে মেধার জন্য প্রার্থনা, এর আগে হয় নি। এর কারণ হিসেবে বলা যায় যে সত্যিই সেই সময় ধাতুবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, প্রাথমিক শারীরবিদ্যা – এদের অনুশীলন শুরু হয়েছিল।

যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যক থেকে বিভিন্ন মন্ত্র যেমন নারায়ণসূক্ত, দুর্গাসূক্ত, ইত্যাদি পুরোহিতদের, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, পূজোতে ব্যবহার করতে দেখছি। এই আধুনিক দেবতাদের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় যে তৈত্তিরীয় আরণ্যকের কিছু অংশ বেশ আধুনিক। এতেই আছে নারায়ণের মতো অপেক্ষাকৃত আধুনিক দেবতার  স্তোত্রর পরে পরেই রুদ্রর প্রশস্তি। যার থেকে বোঝা যায় যে ব্রাহ্মণদের মধ্যে একটা দেবতাভিত্তিক শ্রেণিভেদ, যা বর্তমানের আইয়েঙ্গার ও  আইয়ারদের পূর্বসূরি, আরণ্যকের যুগেই প্রচলিত ছিল।  

আরণ্যকের যুগের সমাজে কৃষিকাজ মানুষের প্রধান জীবিকা তাই আমরা বৈদিক সাহিত্যে পাই ফসলের রক্ষা, সুবৃষ্টির জন্য প্রার্থনা, যাগ-যজ্ঞ।  ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থেকে মানুষ পরিত্রাণ চায় তাই ঐতরেয় ও তৈত্তিরীয় আরণ্যকমে দেখি অন্নই শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা। তখন জাতিভেদ সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত। ব্রাহ্মণবর্ণের মধ্যেও শ্রেণীবিভাগের উল্লেখে স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে তৈত্তিরীয় আরণ্যকমের এক জায়গায় দৃষ্টি আটকে যায়, সেখানের আছে বিবাহিত ও অবিবাহিত, এই দুই প্রকার নারীর গর্ভস্থ সন্তানের রক্ষার জন্য প্রার্থনা। 

আরণ্যকের দেবতাকুলের মধ্যেও দেখি অনেক পরিবর্তন। ঋগ্বেদের মিত্র-বরুণ, ইন্দ্র, দ্যৌঃ, উষা – এঁরা পশ্চাৎপটে চলে গেছেন ও সামনের সারিতে দেখি কিছু নতুন দেবতা। রুদ্র এখানে শিব বা নীললোহিত, নারায়ণ ও বাসুদেব প্রাধান্য লাভ করেছেন, তাঁদের সাথে অনিরুদ্ধ, প্রদ্যুম্ন ও সংকর্ষণ বা বলদেবের পূজো হতে দেখি,  নারায়ণের সমুদ্রে অনন্তশয্যার বিবরণের মধ্যে পৌরাণিক প্রভাব স্পষ্ট, অগ্নিতুল্য উজ্জ্বল ও দুর্গতিতারিণী দুর্গার প্রথম দেখা পাই তৈত্তিরীয় আরণ্যকে, কুবের এসেছেন ধনের দেবতা হিসেবে,  রুদ্র অম্বিকার পতি, হৈমবতী উমার প্রথম সাক্ষাত পাই কেনোপনিষদে। তবে এখানে দেবীদের পরিচয় খালি দেবতাদের স্ত্রী হিসেবে নয়, তাঁরা মাতৃরূপিণী ও নিজেদের শক্তিতে সমুজ্জ্বল।  

ব্রহ্ম, জন্ম-মৃত্যু, আত্মা ও পুনর্জন্মের ধারনাগুলি  তখন তৈরী হচ্ছিল কিন্তু তা উপনিষদের পূর্ণতা লাভ করে নি।

উপনিষদ

বৈদিক সাহিত্যের শেষতম অংশ হচ্ছে উপনিষদগুলি, যার জন্য এদের বেদান্ত বলা হয়। উপনিষদ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে গুরুর নিকটে বসে জ্ঞান অর্জন। উপনিষদের দর্শন নিয়ে প্রচুর লেখা আছে, তাই আমরা দর্শনে প্রসঙ্গে না গিয়ে এই প্রবন্ধে সেই যুগের ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনীতির আলোচনা করব।

উপনিষদ নামের প্রচুর রচনা পাওয়া গেলেও, যেগুলি বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত, সেই চোদ্দটি (বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, কৌষিতকী,  ঈশ, মণ্ডুক, মাণ্ডুক্য, কঠ, কেন, প্রশ্ন, শ্বেতাশ্বেতর, মৈত্রী ও মহানারায়ণ) উপনিষদকে প্রকৃত মুখ্য উপনিষদ বলে ধরা হয়। অনেকে শেষ দুটিকে মুখ্য উপনিষদ হিসেবে ধরেন না। এদের রচনাকাল ধরা হয় খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম থেকে খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী।

পৃথিবীর ইতিহাসে সেই সময়কালটিতে আমরা এক ব্যতিক্রমী ধর্মীয় চিন্তাধারার প্রমাণ পাই। পারস্যে জরথুস্ট্র, চীনে কনফুসিয়াস বা গ্রীসের সক্রেটিস-প্লেটোর মত দার্শনিকরা প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসগুলিকে প্রশ্ন করেছিলেন। ঠিক সেই রকম প্রায় সমসাময়িক ভাবেই ভারতবর্ষেও যজ্ঞকেন্দ্রিক আচার ব্যবহার ও বিশ্বাসের ওপর প্রশ্ন উঠেছিল। যজ্ঞগুলি ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছিল, তাদের প্রণালীর ওপর ব্রাহ্মণদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল আর তাদের ফলাফল নিয়েও অনেক সংশয় দেখা দিয়েছিল। তাই চিন্তাশীল মানুষেরা আরো গভীরে গিয়ে জ্ঞানলাভের প্রকৃত ইচ্ছা, ঈশ্বর, আত্মা, কর্মফল, পুনর্জন্ম ইত্যাদি সম্বন্ধে ভাবতে শুরু করেছিলেন। এই সবেরই ফলস্বরূপ ছিল সেই যুগে বেদান্তদর্শন ও বৌদ্ধ, জৈন, আজীবক ইত্যাদি ব্যতিক্রমী চিন্তাধারার উৎপত্তি।
চৌদ্দটি উপনিষদের মধ্যে বৃহদারণ্যক ও ছান্দোগ্যকে সবচেয়ে প্রাচীন ও ইতিহাসের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে ধরা হয়। শুক্লযজুর্বেদের অন্তর্গত বৃহদারণ্যক আকারে সত্যিই বৃহৎ। এর প্রথমাংশ আরণ্যকের বৈশিষ্ট্যযুক্ত হলেও দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা প্রকৃত উপনিষদের জ্ঞানের পরিচয় পাই। এই উপনিষদে আছে বিখ্যাত মন্ত্র ‘অসতো মা সদ্‌গময়’। এতে পাই পুনর্জন্মের প্রথম অপরিস্ফুট চিন্তা। ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের দর্শনচিন্তা ও জনকের রাজসভায় তাঁর সাথে গার্গীর প্রশ্নোত্তর এবং বাণপ্রস্থে উদ্যত ঋষির সাথে স্ত্রী মৈত্রেয়ীর বিখ্যাত কথোপকথনগুলি সেই যুগের আশ্চর্যরকম গভীর দার্শনিক চিন্তার ফসল।

সামবেদের অন্তর্গত ছান্দোগ্য উপনিষদে প্রকৃত উপনিষদের চিন্তাধারা আছে শেষের অধ্যায়গুলিতে, আর প্রথমাংশ ব্রাহ্মণ বৈশিষ্ট্যযুক্ত। এতে আছে মৃত্যুর পর দেবযান ও পিতৃযান নামের দুই পথে আত্মার ভ্রমণ,  ইন্দ্র-বিরোচন সংবাদ ও আত্মার স্বরূপ, বিখ্যাত ‘তত্ত্বমসি’ দর্শন ও ‘ভূমা’র তত্ত্ব।

শুক্লযজুর্বেদের ঈশোপনিষদের মোটে আঠারোটি শ্লোক, উপনিষদদের মধ্যে মধ্যে ক্ষুদ্রতম।  এতে দেখি ত্যাগের মাধ্যমে সত্য উপলব্ধি, কর্ম ও জ্ঞানের আধ্যাত্মিক দ্বৈতবোধ ও আর স্থিতধী পুরুষের সাক্ষাতকার, যিনি ভবিষ্যতের গীতার পূর্বসূরি।

সামদেবের কেনোপনিষদে আছে বিখ্যাত হৈমবতী উমার উপাখ্যান, যাতে সমস্ত দেবতাদের শক্তির অন্তরালের এক মহাশক্তিকে ‘ব্রহ্ম’ বলা হয়েছে। কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় উপনিষদ শিক্ষা ও ধ্বনিতত্ত্ব দিয়ে শুরু হলেও পরে অন্ন, প্রাণবায়ু, মন, জ্ঞান ও আনন্দের আধারস্বরূপ ব্রহ্মকে দেখানো হয়েছে। ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় উপনিষদের সৃষ্টিতত্ত্ব আর কৌষীতকি উপনিষদের ইন্দ্র সম্বন্ধে আখ্যানগুলির মধ্যে প্রাচীন ঋগ্বেদের ছায়া স্পষ্ট।
অথর্ববেদের মুণ্ডক সম্ভবত কোনো মুণ্ডিত মস্তক সম্প্রদায়ের দ্বারা রচিত। মুণ্ডক ও কেন – এই দুই উপনিষদে বৌদ্ধ ও শৈবমতের প্রভাব আছে। অথর্ববেদের মাণ্ডূক্য উপনিষদে বেদান্ত দর্শনের মৌলিক মতবাদগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কঠ, মণ্ডুক ও শ্বেতাশ্বেতর অপেক্ষাকৃতভাবে নবীন। কঠোপনিষদে যম-নচিকেতা কথোপকথনের মাধ্যমে মৃত্যু, আত্মা ও পুনর্জন্ম সম্বন্ধে যা বলা আছে তার পুনরাবৃত্তি পাই গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে।
কৃষ্ণ যজুর্বেদের শ্বেতাশ্বেতর উপনিষদে শৈব প্রভাব বিশিষ্ট। এতে বেদান্তের ব্রহ্ম ও সাংখ্যের পুরুষের মধ্যে সাযুজ্য বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়, এছাড়াও এই উপনিষদের শেষ শ্লোকটিতে আমরা প্রথম ভক্তি কথাটির উল্লেখ পাই – যার উৎস ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর দক্ষিণ ভারত।

উপনিষদগুলির ভাষা প্রবীণ ও নবীনের সমন্বয়ে রচিত, ব্যাকরণ পতঞ্জলির কাছাকাছি, রচনাশৈলীর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সংলাপের ব্যবহার। অজাতশত্রু-বালাকি, যাজ্ঞবল্ক্য-গার্গী, যাজ্ঞবল্ক্য-মৈত্রেয়ী, (বৃহদারণ্যক), যম-নচিকেতা (কঠ), প্রজাপতি-ইন্দ্র-বিরোচন, আরুণি-শ্বেতকেতু, শ্বেতকেতু-প্রবাহণ,  জাবাল-সত্যকাম অশ্বপতি-ষড়ব্রাহ্মণ (ছান্দোগ্য), ইত্যাদি কথোপকথনের মাধ্যমে কোনো একটি মতামতকে নির্দিষ্ট ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।  এর থেকে আরো জানতে পারি যে এই ঋষিগণ সেযুগে পরমজ্ঞানীরূপে বিবেচিত হতেন।
উপনিষদগুলিতে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির যা পরিচয় পাওয়া তার মধ্যে ছান্দোগ্য উপনিষদে কুরুদেশের ফসল শিলাবৃষ্টিতে বিনষ্ট হওয়ার ফলে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল (ঊষস্তি-চাক্রায়ণ সংবাদ) বা গান্ধার দেশ যে দস্যু সংকুল ছিল তারও প্রমাণ মেলে। খাদ্য হিসেবে ব্রীহি ও যব, তিল ও মাস, প্রিয়ঙ্গু, গোধুম, মসুর, দধি, বৃষমাঙ্গস, যজ্ঞডুমুর, ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়। মুদ্রার প্রচলন ছিল কি না জানা না থাকলেও ঋণপত্র বা হুণ্ডির প্রচলন ছিল।
উপনিষদের দেবতাদেরও দেখি সময়ের সাথে বিবর্তিত হতে। তৈত্তিরীয় উপনিষদে বৈদিক মিত্র-বরুণ, অর্যমা, ইন্দ্রর সাথে সাথে বায়ু, ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর (যাঁরা বেদে গৌণ দেবতা) উল্লেখ পাই। কেনোপনিষদে অগ্নি, বায়ুর সাথে দেখা পাই হৈমবতী উমার, শ্বেতাশ্বেতরে বৈদিক রুদ্র, বেদে যিনি পশু ও মানুষের প্রতি তীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষেপ করতেন, তাঁকে দেখি পরম শ্রদ্ধা সহ মহর্ষিরূপে পূজিত হতে। তবে উপনিষদের উৎকর্ষ নিহিত এক অনন্য ধারনার মধ্যে, সেটি হচ্ছে যে সমস্ত দেবতাকুলের ওপরে এক পরম শক্তি, পরমাত্মা,  ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের উপস্থিতির বিশ্বাস। এই অদ্বৈততত্ত্ব বা একেশ্বরবাদের  বীজ কিন্তু আমরা ঋগ্বেদের হিরণ্যগর্ভ সূক্ত বা নাসদীয় সূক্তের মধ্যেও দেখতে পাই।

একটা কথা এখানে উল্লেখ করা দরকার যে সেযুগে সমাজে জাতিভেদ প্রথা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের মর্যাদা ও প্রাধান্যের একটা টানাটানি যে ছিল তার প্রমাণ পাই। কিন্তু জ্ঞানলাভের জন্য ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয় রাজার কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করতেন না। রাজা অশ্বপতির কাছে ব্রাহ্মণদের শিক্ষালাভ, কাশীরাজ অজাতশত্রুর কাছে গর্বিত ব্রাহ্মণ বালাকির শিক্ষালাভ, রাজা জনকের জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধার পরিচয় – এই সবই এর প্রমাণ। বৃহদারণ্যকে এই ধরনের শিক্ষাকে প্রতিলোম অর্থাৎ বিপরীত বলা হয়েছে। প্রকৃত জ্ঞানের স্পৃহা মানুষের মধ্যে গভীর ছিল, তার প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে ছান্দোগ্যতে দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রকে দেখানো হয়েছে জ্ঞানপিপাসু  হিসেবে।  ছান্দোগ্যের জ্ঞানপিপাসু  ইন্দ্রের সাথে ঋগ্বেদের যুদ্ধপিপাসু ইন্দ্রের কতো ফারাক!  ঋষিদের চিন্তাধারা বেদের কর্মকাণ্ড থেকে উপনষিদের জ্ঞানকাণ্ডে উত্তরণ।

উপনিষদের যুগে মানুষের বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞানকে সুচারুরূপে বিভিন্ন শাখায় ভাগ করে শিক্ষাদানের প্রয়োজন হয়ে উঠল। ছান্দোগ্য উপনিষদে নারদ-সনৎকুমার সংবাদে ইতিহাস-পুরাণ, দেববিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্র, ধনুর্বেদ, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্পবিদ্যা, ইত্যাদির উল্লেখ আছে। তৈত্তিরীয় উপনিষদে শীক্ষাবল্লীতে উচ্চারণ প্রণালী, জ্যোতিষবিদ্যা, বিদ্যা, প্রজা ও অধ্যাত্মদর্শনের কথা বলা আছে। এইভাবে বিভিন্ন বিদ্যার শাখার উন্মেষের সাথে জন্ম হল বেদাঙ্গসূত্র সমূহের, যা পরের অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বেদাঙ্গসূত্র

শিক্ষা নিরুক্ত ব্যাকরণ ও ছন্দ

প্রধানত বেদাঙ্গগুলিকে ছয় ভাগে ভাগ করা হয় -  শিক্ষা, ব্যাকরণ, ছন্দ, নিরুক্ত, জ্যোতিষ ও কল্প। কল্পসূত্রগুলি ধর্মবিষয়ক, এদের আবার চার ভাগে ভাগ করা হয় ধর্ম, শ্রৌত, গৃহ্য ও শুল্ব। ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে বিচার করে পণ্ডিতেরা সূত্রগুলি খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে তৃতীয় খ্রীষ্টাব্দর মধ্যে লেখা হয়েছিল মনে করেন। সূত্র রচয়িতাদের অধিকাংশদের নামের শেষে অয়ন থাকার জন্যে, যেমন বৌধায়ন, আশ্বলায়ন, অনেকে মনে করেন এঁরা কোনো এক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত ছিলেন।

বেদাঙ্গসূত্রগুলি আখ্যান, দেবস্তুতি বা দেবকাহিনীর জন্য লেখা হয় নি, তাই তাদের স্মৃতিতে রাখা কঠিনতর ছিল। তাই এতে শব্দসংক্ষেপ করে বাহুল্যবর্জিত এক আঙ্গিক দেখতে পাওয়া যায়, যা প্রায় সাংকেতিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, উপযুক্ত ভাষ্য ব্যতীত যাদের অর্থবোধ দুষ্কর হয়ে পড়ে। ভাষার দিক থেকে এদের প্রাক্‌পাণিনীয়  বলেই ধরা হয়। আশ্ব্লায়ন গৃহ্যসূত্রে ‘ভারত’ ও ‘মহাভারত’-এর উল্লেখ আছে, তাই মনে করা হয়, যে সেই যুগে মহাকাব্যদুটির প্রাচীন এক সংস্করণ প্রচলিত ছিল।

বেদাঙ্গসূত্রগুলি রচনার কাল ছিল ভারতের ইতিহাসেরও এক গভীর পরিবর্তনের সময়। এই যুগে যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্মীয় আচার প্রণালীর ওপর যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি বিদেশী পারসিক, গ্রীক, শক, কুষাণ ও কিছু পরে হূণ জাতির সাথে সংযোগ ঘটেছে। তক্ষশীলা, পাটলিপুত্র, কোশাম্বী বা মথুরার মত নগরী তখন রীতিমত বিশ্বজনীন। ভারতে বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসার হয়েছে, বিদেশী ভাবধারা, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি আস্তে আস্তে ভারতের মধ্যে মিশে গেছে। এই বিদেশী সংমিশ্রণ ও ভাবধারার আত্মীকরণ ভারতবর্ষের ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, জ্যোতিষ, গণিত, রসায়ন – এই সমস্ত ক্ষেত্রেও জোরালো প্রভাব ফেলেছিল।

এর সাথে সাথে ছিল দেশীয় তথাকথিত অনার্য জনগোষ্ঠীর সাথে ক্রমাগত মিশ্রণ। এই যুগসন্ধিক্ষণে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মতো ধর্মবিশ্বাসগুলি, যাদের অনেকে প্রতিবাদী ধর্ম বলে থাকেন, সেগুলিও প্রচারিত হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম রাজানুকুল্য লাভ করাতে প্রাচীন ব্রাহ্মণ্যধর্ম তার যজ্ঞকেন্দ্রিকতা থেকে অনেক সরে এসেছে ও যজ্ঞের প্রাচীন গৌরব অনেক স্তিমিত হয়েছে, (তবে বিলুপ্ত কখনোই হয়ে যায় নি, কারণ আমরা সে যুগের কয়েকজন রাজাকে অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে দেখি)।

ভাষার ক্ষেত্রেও এক বড়ো পরিবর্তন হয়েছিল। প্রাচীন বৈদিক ভাষা কথ্য ভাষার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল, উচ্চারণ, ব্যাকরণ, ব্যুৎপত্তি, সব কিছুই এক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলেছিল। পতঞ্জলি বৈদিক ভাষাকে ছন্দঃ ও কথ্য ভাষাকে লৌকিক বা ভাষা নাম দিয়েছিলেন। সেই জন্য ভাষা, উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তির জন্য শিক্ষা, ব্যাকরণ, ছন্দ ও নিরুক্ত সূত্র গুলি লেখার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

বেদাঙ্গের শিক্ষা সূত্রগুলিতে মূলত ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনা পাওয়া যায়। সময়ের সাথে বেদমন্ত্র উচ্চারণের নিয়মগুলি শিথিল হয়ে এসেছিল, ভৌগোলিক অঞ্চল অনুযায়ী উচ্চারণের ভেদ এসেছিল।  তাই শিক্ষাসূত্র গুলিতে বেদমন্ত্র উচ্চারণের বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বহু শিক্ষাগ্রন্থের নাম পাওয়া গেলেও তার মধ্যে বেশির ভাগই লুপ্ত হয়েছে। যাদের নাম পাওয়া যায় তাদের মধ্যে আছে ‘পাণিনীয়’, ‘সর্বসম্মত’ ও ‘সিদ্ধান্ত’। বিভিন্ন মন্ত্রের উচ্চারণপ্রণালী, গান, সুর-সমেত সংহিতা পাঠ ও বাদ্যযন্ত্রের সাথে অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি এই গ্রন্থগুলির মূল উপজীব্য। ‘পাণিনীয়’ শিক্ষা গ্রন্থে উচ্চারণ, সন্ধিবিচ্ছেদ, সংহিতা পাঠ কৌশল দেওয়া আছে। নামকরণ থেকে বোঝা যায় যে এই গ্রন্থ স্বয়ং পাণিনীর রচনা নয়। ভারদ্বাজ শিক্ষা তৈত্তিরীয় সংহিতার সাথে যুক্ত। এতে আছে সন্ধি, সমাস, আবৃত্তির নিয়ম, স্বরন্যাস, পদ, যতি, ছন্দ ইত্যাদি বিষয়ের চর্চা। এই নিয়ে একটি চিত্তাকর্ষক তথ্য জানাতে চাই - অথর্ববেদীয় আপিশলী  শিক্ষায় বর্ণমালার বিভিন্ন অক্ষরের শ্রেণীবিভাগ, তাদের যথার্থ উচ্চারণ ও ধ্বনি নিয়ে আলোচনা আছে। এই ধরনের আলোচনা এর আগে আর কোথাও নেই।
বেদাঙ্গসূত্রের ব্যাকরণ আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হচ্ছেন পাণিনি। আরো অনেক প্রাচীন বিশেষজ্ঞ থাকলেও, শুধু মাত্র পাণিনির ব্যাকরণটিই এখন পাওয়া যায়। যদিও তাতে ধ্রুপদী বৈদিক ব্যাকরণ সংক্রান্ত একটি মাত্র সংক্ষিপ্ত অধ্যায় আছে। পাণিনির ব্যাকরণ রচনার সময় সংস্কৃত সাধারণের কথ্য ভাষা ছিল না, সেই স্থান অধিকার করেছিল প্রাকৃতভাষা।  সেই কারণে পাণিনিকে খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের বলে ধরা হয়। পাণিনি সংক্ষেপে, শব্দের বাহুল্য বর্জন করে, বিদ্ববত্তার সাথে ভাষাকে সুসংহত করে বেঁধেছিলেন তাই পাণিনির বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর ব্যাকরণকে পণ্ডিতেরা সম্পূর্ণ ও প্রথম বিজ্ঞানসম্মত ব্যাকরণ বলেন।

বেদাঙ্গসূত্রের নিরুক্তগুলি হচ্ছে শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ধারণের বিদ্যা। যাস্কের নিরুক্তকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম নিরুক্ত গ্রন্থ। যদিও যাস্ক নিজে তাঁর পূর্ববর্তী নিরুক্তকারদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁদের রচনা পাওয়া যায় নি। যাস্ক নিরুক্তর রচনাকাল ধরা হয় খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৫০০ শতকের মধ্যে, অর্থাৎ তিনি পাণিনির পূর্ববর্তী। তিনি চার ধরনের পদের কথা বলে গিয়েছিলেন নাম (বিশেষ্য, বিশেষণ ও সর্বনাম), আখ্যাত (ক্রিয়া), উপসর্গ ও নিপাত (অব্যয়)। তাঁর নিরুক্তে আছে প্রতিশব্দ, সমার্থক শব্দ ও ঋগ্বেদের বিভিন্ন দেবতার নামের বুৎপত্তি। তিনি সর্বদা মূল ধাতু থেকে ব্যুৎপত্তি  সন্ধান করেছেন, তাই সব ক্ষেত্রে তাঁর ব্যুৎপত্তি সঠিক না হলেও তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হতে হয়। যাস্কের পূর্ববর্তী নিরুক্তকার শাকটায়নের মতে বিশেষণের ব্যুৎপত্তিও ধাতু থেকে করা সম্ভব। কিন্তু যাস্ক এই মতের বিরোধিতা করেছেন।

বেদপাঠে ছন্দের ব্যবহার ও তাদের ক্রমাগত বিবর্তন ও নতুন ছন্দের উৎপত্তির জন্য ছন্দশান্ত্রকে সুসংহত করার প্রয়োজন ছিল। সেই জন্য রচিত হয়েছিল বেদাঙ্গের ছন্দসূত্র গুলি। ছন্দসূত্রের মধ্যে নিদানসূত্র ও পিঙ্গলছন্দঃসূত্র – এই দুটিই প্রচলিত। নিদানসূত্রে সামবেদীয় মন্ত্রগুলির ছন্দ ও সুর আলোচিত হয়েছে।  অনেকে বলেন এটি পতঞ্জলির রচনা। পিঙ্গলছন্দঃসূত্র অনেক পরের লেখা কারণ এতে বৈদিক ছন্দ ছাড়াও অনেক অ-বৈদিক ছন্দের আলোচনা আছে।

জ্যোতিষ

বৈদিক যুগে জ্যোতিষের প্রয়োজন হত মূলত কৃষি কাজ ও যজ্ঞানুষ্ঠানের উপযুক্ত সময় ও নক্ষত্র নির্ধারণের জন্য। বৈদিক সাহিত্যে যজুর্বেদের পরে লগধ প্রণীত বেদাঙ্গ জ্যোতিষকে প্রধান বেদাঙ্গ সূত্র ধরা হয়। এতে আছে উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন, ঋতু পরিবর্তন, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা নির্ণয়, চান্দ্র মাসের গণনার নিয়মাবলী, ইত্যাদি। জ্যোতিষের জটিল অঙ্ক বা আমরা যাকে জ্যোতিষী বলি, সেই বিদ্যা এসেছিল অনেক অনেক পরে।

 

কল্পসূত্র

শুল্ব, শ্রৌত, গৃহ্য, ও ধর্ম সূত্রগুলিকে একত্রে কল্পসূত্র বলা হয়। এদের রচনাকাল খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০-৪০০ থেকে খ্রীষ্টাব্দ ৩০০ বা তারও কিছু পরে। শুল্বসূত্র ছাড়া বাকী তিনটি সূত্র সাহিত্যের মূল বিষয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও প্রণালী।

শুল্বসূত্র

শুল্বসূত্রের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে জ্যামিতি ও গণিত, যা যজ্ঞবেদী নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হত। এতে আছে বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার, তাদের সম্বন্ধীয় সূত্রাবলী ও কিছু বীজগণিতের ব্যবহার। প্রসঙ্গত, শুল্ব কথাটির অর্থ হচ্ছে মাপবার ফিতে।

শ্রৌতসূত

শ্রৌত সূত্র গুলি মূলত যথাযথ নির্দেশসহ বিভিন্ন যজ্ঞানুষ্ঠানের প্রণালী বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শ্রৌত সূত্র গুলিকে প্রচলিত ভাবে এক একটি বেদের সাথে যুক্ত করা হয়। যেমন ঋগ্বেদ শ্রৌতসূত্রের নাম আশ্বলায়ন ও শাঙ্খায়ন। এছাড়াও বিভিন্ন বেদের সংযুক্ত বৌধায়ন, বাধুল, ভারদ্বাজ, আপস্তম্ব, হিরণ্যেকেশী ও বৈখান্‌স, কাত্যায়ন, লাট্যায়ন, দ্রাহ্যায়ণ, জৈমিনীয়, মৈত্রায়ন বা মানব ইত্যাদি নামের শ্রৌতসূত্রে খোঁজ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বৌধায়নের শ্রৌতসূত্র প্রাচীনতম ও বৈখান্‌স নবীনতম মনে করা হয়। অধিকাংশ শ্রৌতসূত্রগুলির বিভিন্ন অধ্যায়কে প্রশ্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে, যার থেকে বোঝা যায় যে এদের বিষয়বস্তু পুরোহিত/ঋষি ও ছাত্রের মধ্যে প্রশ্নোত্তরের ছলে ব্যাখ্যা করা। সামবেদীয় শ্রৌতসূত্র গুলিতে সামগানের প্রণালী ব্যাখ্যা করা আছে।

গৃহ্যসূত্র

শ্রৌতসূত্রগুলিতে যেমন প্রধান কোনো গোষ্ঠীর মঙ্গলের জন্য যজ্ঞানুষ্ঠান, তেমনি গৃহ্যসূত্রগুলিতে একক গৃহস্থ্যের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বিশদ প্রণালী ব্যাখ্যা করা আছে। শিশুর জন্ম থেকে মৃত্যুর পর পারলৌকিক ক্রিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পদ্ধতির দীর্ঘ তালিকা আছে গৃহ্যসূত্রগুলিতে। যেমন নবজাত শিশুর জাতকর্ম, আদিত্যদর্শন, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, উপনয়ন। তারপর গুরুগৃহে বেদাধ্যয়ন, অনধ্যায় ও শেষে সমাবর্তন। তারপর গৃহস্থ আশ্রমে বিবাহ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পদ্ধতি, পাণিগ্রহণ, অগ্নিপরিগ্রহণ, সপ্তপদী, লাজহোম, ইত্যাদি। নারীদের গর্ভাবস্থার বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, ইত্যাদি। এছাড়াও গৃহ্যসূত্রগুলিতে গার্হপত্য অগ্নি প্রজ্বলন বিধি, প্রায়শ্চিত্ত, কূপ ও দীঘি খনন,  হলকর্ষণ, ইত্যাদি লোকাচারের নির্দেশ আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার, যে এই তালিকার প্রচুর আচার এখনো হিন্দু সমাজে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

শ্রৌত সূত্রের মত গৃহ্য সূত্রেরও বিভিন্ন শাখা আছে যাদের চার বেদের সাথে যুক্ত করা হয়। ঋগ্বেদের আশ্বলায়ন ও শাঙ্খায়ন, শুক্লযজুর্বেদের বাজসেনয় ও পারস্কর, কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতার বৌধায়ন, ভারদ্বাজ, আপস্তম্ব, প্রভৃতি, সামবেদের গোভিল, জৈমিনীয়, খাদিল ইত্যাদি। অথর্ববেদের কৌশিক সূত্র, যা শ্রৌতসূত্র ও গৃহ্যসূত্রের মিশ্রণ।  এদের মধ্যে রচনাকাল হিসেবে আশ্বলায়ন, বৌধায়ন, গোভিল প্রাচীনতম এবং জৈমিনীয়, খাদিল নবীনতম।

ধর্মসূত্র

ধর্মসূত্র গুলিকে সেকালের সমাজনীতি বলা যায়। পরে স্মৃতিসাহিত্য গুলি (মনুস্মৃতি, পরাশরস্মৃতি, নারদস্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি ইত্যাদি) যখন লেখা হয়, মনু এই সমাজনীতিগুলিকে যথার্থ ভাবে বিধিবদ্ধ করেছিলেন, যা ব্রিটিশরা ভারতে আসা অবধি অটুট ছিল। এদের রচনাকাল অন্যান্য সূত্র সাহিত্যগুলির সমসাময়িক ও বিভিন্ন শাখাগুলিও অনুরূপ। সামবেদীয় গৌতম ধর্মশাস্ত্র সম্ভবত প্রাচীনতম। এতে দীক্ষানুষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রায়শ্চিত্ত, শুদ্ধিকরণ, ব্রহ্মচর্য ও অন্যান্য চতুরাশ্রমের বিধি, এর দশম অধ্যায়ে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন ও সাক্ষ্যদান সম্পর্কিত আইন লিপিবদ্ধ আছে। বৌধায়ন ধর্মসূত্র, যা পণ্ডিতেরা মনে করেন দাক্ষিণাত্যে উদ্ভূত, গৌতম ধর্মশাস্ত্র থেকে অনেক জায়গা পুনরুক্তি করেছে। এতেও আছে চতুরাশ্রম বিধি, খাদ্য সম্বন্ধে বিধি নিষেধ, পাপ অপরাধ ও শাস্তি। বশিষ্ঠ ধর্মশাস্ত্রে আছে পাপের জন্য সমাজ থেকে বহিষ্কার ও তপস্যার মাধ্যমে পাপক্ষয়ের উল্লেখ। আপস্তম্ব ধর্মশাস্ত্রে সমাজে বর্ণভেদ সম্পর্কে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করা আছে ও বর্ণভেদই যে ধর্ম সে রকম বলা আছে। একটি চিত্তাকর্ষক তথ্য এতে আছে – গোমাংস খাওয়া নিয়ে অকুণ্ঠ অনুমোদন।

আগেই বলেছি, সূত্র সাহিত্যগুলি লেখার সময় ভারতের ইতিহাসে কি রকম পরিবর্তন চলছিল। বৈদিক যুগ থেকে সমাজব্যবস্থার প্রচুর পরিবর্তন এসেছিল। লোহার ব্যবহার, উন্নততর অস্ত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়াতে, বাণিজ্যের প্রসার হয়েছিল ও ধনী শ্রেষ্ঠী শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল, বিভিন্ন বৃত্তির প্রচলন হয়েছিল, এর ফলে অর্থসম্পদের কেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়েছিল। রাজা ও রাজ্যের কর্তব্য সঠিক ভাবে নিরূপণের জন্য নিয়মাবলীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কর্মফল ও জন্মান্তরবাদ এই যুগে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল ও পাপ-পুণ্য,  সামাজিক রীতি-নীতি গুলিকে ব্যাখ্যা করার পক্ষে এই দুই মতবাদ খুব সুবিধাজনক হয়ে পড়েছিলে।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ব্রাহ্মণশ্রেণীর হাতে সমাজের নীতি ও আইন নির্ধারণের ক্ষমতা। এতে ব্রাহ্মণকূল সমাজের প্রভু হয়ে দাঁড়িয়েছিল ও  শূদ্রগণ সবচেয়ে অবহেলিত ও নিপীড়িত শ্রেণী হয়ে পড়েছিল। তাদের মানুষ বলে গণ্যই করা হত না। আরো একটি সামাজিক অবক্ষয় সে যুগে দেখা যায় – নারীদের প্রতি ক্রমেই অশ্রদ্ধার ভাব – তাদের সমাজে হীনতর বলে মনে করা আছে। নারীদের অধিকার ক্রমশই কমে আসছিল, সামান্য অপরাধে তাদের গুরুতর শাস্তি বিধান ছিল।

প্রকৃত সাহিত্য সমাজের দর্পণ। ঋগ্বেদ থেকে সূত্রসাহিত্য, এর মাঝে সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, রাজনীতি, অর্থনীতি – এই সমস্তই বদলেছে, কালের অমোঘ নিয়মে।  বৈদিক সাহিত্যের ঋষিকবিদের রচনায় সমাজের এই ক্রমবিবর্তন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হতে দেখি। তাই বৈদিক সাহিত্য সঠিক ভাবে বুঝতে গেলে, সমাজের পরিপ্রক্ষিতে তার ব্যাখ্যা করতে হয়, যেটা সুকুমারী ভট্টাচার্য সফলভাবে করে দেখিয়েছেন।

 

(এই প্রবন্ধটি প্রধানত সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা “ইতিহাসের আলোয় বৈদিক সাহিত্য” বইটি অবলম্বনে রচিত।)


লেখক পরিচিতি - যাদবপুর ও ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্‌টিটিউট অফ সায়েন্সের প্রাক্তনী। বর্তমানে আমেরিকার সেন্ট লুইস্‌ (মিসৌরী) শহরবাসী। ইতিহাস পেশা নয়নেশা। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ও Indology নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ভালবাসেন।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।