বিজ্ঞানের ছাত্র সুকুমার

 

প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

সুকুমার রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, এপ্রিল ৩০, ২০১৬

 

বিজ্ঞানের ছাত্র সুকুমার

মানস প্রতিম দাস

 

‘প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর ডায়রিটা আমি পাই তারক চাটুজ্যের কাছ থেকে।’ লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়।

ঠিক লিখেছিলেন কি কথাটা? আমাদের তো মনে হয় ডায়রিটা তাঁকে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা সুকুমার রায়। এও মনে হয় আমাদের যে প্রোফেসর শঙ্কুর পরিচয় নিয়ে সত্যজিৎ রায় যে হেঁয়ালি করেছেন সেটাও সঙ্গত নয়। ‘প্রোফেসর শঙ্কু কে?’ এই প্রশ্নের কোনো মানে হয় না। অতীত সম্পর্কে যদি একটুও ভক্তি থাকে আমাদের তবে হেঁয়ালির জাল কেটে সহজেই বলতে পারতাম – শঙ্কু হলেন হেশোরাম হুঁশিয়ারের ছেলে...ইয়ে মানে পড়শির ছেলে...মানে ওনার সহকর্মীর ছেলে...মানে... ... ধুস্‌, পরিষ্কার করে লিখে গেলেই পারতেন সুকুমার-সত্যজিৎ। মানে এ তো হতেই হবে, তাই না? না হলে গোমড়াথেরিয়াম-ও হেসে ফেলবে! দু’জনে মিলে হয়ত লিখেও ফেলতেন যদি না জীবনের নিষ্ঠুর অনিশ্চয়তা বাধ সাধত। সত্যজিৎ যখন মাত্র দুই কি তিন, তখন চলে গেলেন সুকুমার।

সুকুমার রায়

সত্যজিৎ যে সুযোগটা পাননি, সেটা কিন্তু সুকুমার পেয়েছিলেন। বাবা উপেন্দ্রকিশোর প্রকাশনা নিয়ে যে সফল পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন, তার সহযোগী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সুকুমার। বাবার পাশে তিনিও কলম চালাচ্ছেন, প্রাণ পাচ্ছে পাগলা দাশু। সত্যজিতের এই সুযোগ হল না, এটা নিঃসন্দেহে দুঃখের। অবশ্য পাঠক হিসাবে দুঃখের কোনো ভাগ নিতে হয়নি আমাদের। হেশোরামের উত্তরাধিকার নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন শঙ্কু। দু’য়ের আচরণে পার্থক্য অনেক, অন্তঃসলিলা মিলটাও নেহাৎ কম নয়।

সুকুমার জন্মেছিলেন ব্রাহ্ম পরিবারে। কে না জানেন, ব্রাহ্মরা জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চর্চায় অগ্রগণ্য ছিলেন। এই নিবন্ধের খাতিরে বিজ্ঞানকে আলাদা করে নিতে চাইব জ্ঞান থেকে। নির্দিষ্টভাবে প্রফুল্লচন্দ্র রায়, নীলরতন সরকার বা কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর কথা আলাদাভাবে বলি বটে কিন্তু সুপরিচিত ব্রাহ্মদের জীবনী পাঠ করলেই দেখতে পাব যে বিজ্ঞানের পঠনপাঠন এবং সম্ভব হলে হাতেকলমে বিজ্ঞানের চর্চাকে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রত্যেকে। উপেন্দ্রকিশোর এবং সুকুমার সেই ঐতিহ্য সৃষ্টি এবং বহনের কাজটা করেছেন আনন্দের সঙ্গে, বলা ভালো পরম উল্লাসে।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহাদের থেকে প্রেসিডেন্সিতে বছর সাতেকের সিনিয়র ছিলেন সুকুমার। মানে, সাল তারিখ তাই বলে। তাঁর জীবনীতে লেখা আছে যে তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন, দুটো বিষয়ে অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করেন। আজকাল একটা অনার্স রাখতেই ছেলেপুলেরা দিশেহারা আর সুকুমার দু’ দুটো অনার্স নিয়েও অমন রসবোধ জীইয়ে রেখেছিলেন। জুলজি-ও কি কোর্সে ছিল নাকি ওটা বাবার লেখা থেকেই খানিকটা আয়ত্ত হয়ে গিয়েছিল? না হলে সারা জীবন জন্তু জানোয়ারের এমন দুর্দান্ত সব বর্ণনা উপহার দিয়ে গেলেন কীভাবে!লীলা মজুমদার লিখেছেন, ‘উপেন্দ্রকিশোরের জীবজন্তুর ছবি দিয়ে ভরা একটা মোটা মস্ত বই ছিল, তার থেকে সুকুমার গল্প বলতেন। তাছাড়া ওই বয়সেই নানা রকম মজার-মজার কাল্পনিক জন্তুর গল্প বলতেন। ভবন্দোলার মস্ত মোটা শরীর, থপথপ করে হাঁটে, বাড়িঘর কাঁপে। মন্তুপাইন তার সরু লম্বা গলা পেঁচিয়ে রাখে আর গোলমুখ, ড্যাবড্যাবে চোখ কোম্পু অন্ধকার বারান্দার কোণে দেয়ালের পেরেকে ঝুলে থাকে।’ এই সব গল্পে ভয় পেয়ে ছোটরা নাকি অন্ধকারে আর বারান্দায় বেরোতে সাহস পেত না! সে যাই হোক্‌, কল্পনার সামর্থ্য যেমন ছিল সুকুমারের তেমনি তার অধিকারও পেয়েছিলেন তিনি। এই কল্পনাই যে সুদূরপ্রসারী শিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি তা আজ ভুলে গিয়েছি আমরা।

এই কল্পনা অবশ্য কখনও কখনও গোলমাল করে ফেলে আমাদের যুক্তিবুদ্ধির নক্‌শায়। মজাটা বাদ দিয়ে আমাদের মন আঁকড়ে ধরে অলৌকিকতাকে, উদ্ভট ভাবনাকে। সুকুমারের ক্ষেত্রে যে সেটা হওয়া সম্ভব ছিল না, তা বেশ ভালোই জানি আমরা। হয়ওনি। বরং ভিত্তিহীন ভাবনাকে তিনি আক্রমণ করেছেন তাঁর লেখায়। ‘আষাঢ়ে জ্যোতিষ’ প্রবন্ধের শুরুতেই বেশ বলেছেন সুকুমার – ‘মানুষের বিদ্যায় যেখানে কুলায় না, কল্পনা সেখানের অভাব পুরাইয়া লয়।...নানান দেশের নানা কাহিনীর মধ্যে সত্য ঘটনা আর কল্পিত কাহিনী এমনভাবে জড়ানো আছে যে, তার কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা, তাহা ঠিক করাই কঠিন।’ লেখাটা ছোটদের জন্যই, তাই গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন পরিবেশন। যাকে তাচ্ছিল্য করে আমরা বলি ‘জ্ঞান’ দেওয়া, তার আশপাশ দিয়েও হাঁটেননি লেখক। অথচ বুঝিয়ে দিয়েছেন বেশ স্পষ্ট করে যে জ্যোতিষ ব্যাপারটা নেহাৎই আজগুবি। ‘হাত গণনা’ ছড়াটি একই গোত্রের। ‘প্রলয়ের ভয়’ প্রবন্ধেও সেই একইরকম ভুল ভাঙানো। সূর্যগ্রহণের কথা উল্লেখ করে সুকুমার লিখছেন, ‘বিশেষত যারা অশিক্ষিত বা অসভ্য, যাদের কাছে সূর্যের এই নিভে যাওয়ার কোনওই অর্থ নেই, তারা যে তখন পাগলের মত অস্থির হয়ে বেড়াবে, এ তো খুবই স্বাভাবিক।’ এই ফর্মূলায় অবশ্য এখন ইউনিভার্সিটির বহু ডিগ্রীধারী ‘পাগল’ ও ‘অশিক্ষিত’ হওয়ার সম্মান পেতে পারেন।

ফিরে যাই হেশোরামে। জীবনের একেবারে শেষ দিকে লেখা এটা। অনেকেই বলেন, আর্থার কোনান ডয়েলের ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’ দ্বারা  অনুপ্রাণিত। সে তো হতেই পারে। হেশোরামকে কাগজে-কলমে আনার সাল হল ১৯২২ আর ঐ বছরেই তো প্রকাশিত হয়েছিল ডয়েলের উপন্যাস। কিন্তু সুকুমার যদি কিছু নিয়েও থাকেন তবে তা অভিযানের ভাবনা মাত্র। বাকিটা তো পুরোটাই প্যারোডি। যে সময়টার কথা আলোচনা করছি সেটা অ্যাডভেঞ্চারের সুবর্ণযুগ। কলম্বাস আর ভাস্কো-দ্য-গামার সন্তানেরা বিজ্ঞানের বলে বলীয়ান হয়ে অজানা অন্ধকারে ঝাঁপ দিচ্ছে আর যা পাচ্ছে তাই রং চড়িয়ে খবরের কাগজে ছাপছে। মার্কিনীরা অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন এ ব্যাপারে। তবে তাদের আদি ভূমি ইংল্যান্ড পিছিয়ে ছিল না। কোনান ডয়েল সে দেশেরই তো চিকিৎসক-লেখক! লস্ট ওয়ার্ল্ড এক বিশ্বক্ষুধার প্রকাশ। কিন্তু কতিপয় কলেজ শিক্ষিত বাঙালি বাদ দিলে সেই সময়ের বাংলায় আমাজনের অববাহিকা নিয়ে আগ্রহ তেমন কেউ হয়ত রাখতেন না। অনাগ্রহীকে রসসিক্ত করতে প্রমাণিত ফর্মূলাই হয়ত কাজে লাগিয়েছিলেন সুকুমার, জন্ম নিয়েছিল চিল্লানোসরাস আর বেচারাথেরিয়ামের দল।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

সব কিছুরই একটা সৃষ্টির ইতিহাস, একটা জেনেসিস থাকে। সুকুমারের কলেজীয় পড়াশোনার কথা বলেছি আগেই, বলেছি বাবার কাছ থেকে তাঁর শিক্ষা এবং অনুপ্রেরণা লাভের কথা। আর একটু এগোব এবারে। বৃত্তি নিয়ে মুদ্রণ শিল্প শেখার লক্ষ্যে সুকুমার ইংল্যান্ডে পৌঁছলেন ১৯১১ সালে। বলতে গেলে অজানা, অচেনা দেশ কিন্তু একেবারে নতুন পরিবেশ নয় সুকুমারের কাছে। বাবা উপেন্দ্রকিশোর তখন মুদ্রণ কারিগরীতে পরিচিত একটা নাম। ইংল্যান্ডেও। ‘পেনরোজেস পিকটোরিয়াল অ্যানুয়াল’ প্রকাশিত হওয়া শুরু করেছিল ১৮৯৫ থেকে। বিলেতে সেটা বেশ নামী এক পত্রিকা। জার্নাল আর ম্যাগাজিনের সমন্বয় বললে বোধহয় ভুল হয় না। সেখানে আটখানা পেপার ছেপেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। চাট্টিখানি কথা নয়। ফলে উপেন্দ্রকিশোরের পুত্রের একটা স্বাভাবিক আদর হয়ত ছিল সে দেশে। তবে উপেন্দ্রকিশোরের পেপার গ্রহণ করলেও সাহেবরা নাকি তাঁর পদ্ধতির নির্ভুলতা নিয়ে নিঃসংশয় ছিলেন না। প্রযুক্তি-ইতিহাসের গবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ লিখেছেন, ‘সুকুমার যখন বিলেতে, পেনরোজ অ্যানুয়ালে (১৯১১-১২) উপেন্দ্রকিশোরের নবম ও শেষ রচনা ‘মাল্টিপ্‌ল স্টপ্‌স’ (Multiple Stops) প্রকাশিত হয়। সুকুমার হাতে কাজ করে, ডেমন্‌স্ট্রেট করে, লন্ডন ও ম্যাঞ্চেস্টারের মুদ্রণ-শিল্প বিশেষজ্ঞদের দেখিয়ে দেন মাল্টিপ্‌ল স্টপ ব্যবহারের সুফল।‘ সু্যোগ্য পুত্রের কর্মদক্ষতা সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল বিলেতের সন্দিগ্ধ বিশেষজ্ঞরা। সিদ্ধার্থবাবু আলাদা করে উল্লেখ করেছেন ‘হাফটোন’ চর্চার কথা। লিখেছেন, ‘ ... বিবিধ মুদ্রণ পদ্ধতি ও নানা ধরণের মুদ্রাযন্ত্র সম্বন্ধে সুকুমার শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হয়েছিল বিলেতের মুদ্রণ বিশেষজ্ঞদেরও। ‘হাফটোন’ চর্চা, বিশেষ করে হাফটোন সংক্রান্ত ক্যামেরার কাজে উপেন্দ্রকিশোরের পুত্র তথা ছাত্র সুকুমারের নতুন কিছু শেখার ছিল না।’

প্রযুক্তির ছাত্র সুকুমার, ফটোগ্রাফিতেও তাঁর অসামান্য অবদান ছিল। কিন্তু তাই বলে কি বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহী থাকতে হবে? কথাটা তুললাম এই কারণে যে সুকুমার যখন ইংল্যান্ডে তখন ইউরোপ প্রত্যক্ষ করছে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক বিপুল আলোড়ন। রাদারফোর্ড দিয়েছেন পরমাণুর প্ল্যানেটারি মডেল। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন চারটে মৌলিক গবেষণাপত্র উপহার দিয়ে তাক্‌ লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। ব্রাউনিয়ান গতি, ভর-শক্তি সমতুল্যতা, ফোটোইলেক্‌ট্রিক এফেক্ট এবং অবশ্যই আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব। উন্মাদনার ঝড় বইছে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে। হয়েছে কোয়ান্টাম ধারণার সুত্রপাত। এ সবের কোনও কিছুই কি আকর্ষণ করতে পারল না সুকুমারকে? বিশেষ করে প্রযুক্তি এবং পদার্থবিদ্যার মধ্যে সম্পর্ক যখন গলায়-গলায়। কী এমন বাধা থাকতে পারে সুকুমারের দুর্দান্ত মেধাবী মন এবং বিজ্ঞানের জগতে এইসব নব-নব আবিষ্কারের মধ্যে মেলবন্ধনে? বুঝে ওঠা মুশকিল। অন্ততঃ সুকুমারের বিলেত থেকে লেখা চিঠিপত্রে এ সবের তেমন প্রতিফলন দেখতে পাই না। সিরিয়াস প্রবন্ধের দু’একটা জায়গায় পরমাণু গবেষণার আচমকা উল্লেখ যে নেই তা নয়, তবে তার পরিপ্রেক্ষিত আলাদা। লেখক সিদ্ধার্থ ঘোষ নিজে পেশায় ছিলেন ইঞ্জিনীয়ার, প্রযুক্তির ছাত্র। তাই হয়ত তিনি এই বিষয়টি নিয়ে তেমন মাথা ঘামাতে চাননি। বরং জনপ্রিয় কায়দায় সুকুমারের প্রযুক্তির কথা পরিবেশনের প্রসঙ্গটিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘সন্দেশ-সম্পাদক হিসেবে রচিত শিক্ষামূলক নিবন্ধগুলি থেকে বরং বিজ্ঞানী কারিগর সুকুমারকে সহজে চিনতে পারা যায়।... বাংলা বিজ্ঞান-সাহিত্যের ইতিহাসে কারিগরি বিষয়, যন্ত্রবিজ্ঞান কিঞ্চিৎ উপেক্ষিত। মানব কল্যাণে নিযুক্ত বিজ্ঞানের ব্যবহারিক দিকগুলির, প্রযুক্তির অবদানের প্রসঙ্গ সুকুমারকে কিন্তু আকৃষ্ট করেছিল।’ হয়ত কিছু পরিমাণে ঠিক উপেক্ষার তত্ত্বটা। তবে বিজ্ঞান সাধারণের কাছে প্রকাশিত কারিগরী বিদ্যার মাধ্যমেই। সেটাই জনপ্রিয়। বাংলার বিজ্ঞান লেখকরা এই কারিগরীকে নৈপুণ্যের সংগে পরিবেশন করেছেন। তার সঙ্গে অবশ্য মৌলিক বিজ্ঞানও লিখিত হয়েছে। সুকুমারের বেশির ভাগ লেখা ছোটদের জন্য। তার মধ্যে বিজ্ঞান ও কারিগরী বিদ্যার আলাদা ক্যাটেগরি খোঁজার চেষ্টা করছি না। কিন্তু একটা অমোঘ সময়ে ইউরোপে থেকেও কেন তিনি বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামালেন না, তা বোঝা একটু কঠিন। আমার ভাবতে ইচ্ছে করে, হয়ত তাঁর অকালমৃত্যুর কারণেই তাঁর কলম থেকে এ সম্পর্কিত কোনো লেখা পাইনি আমরা। পরিণত বয়সের সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই এ সম্পর্কে লিখতেন সুকুমার। অন্য স্বাদের, আরও একটা ‘বিশ্বপরিচয়’ পেতে পারতাম আমরা!

সুকুমার রায়কে নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি। সব লেখাতে যে তাঁর বিজ্ঞান ভাবনার কথা সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে এমন নয়। পুত্র সত্যজিৎ রায় এক সুন্দর ভূমিকা লিখেছিলেন আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত ‘সমগ্র শিশুসাহিত্য’ বইটির জন্য। সেখানে আলাদা করে বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ আনেননি তিনি। হাস্যরস, প্যারোডি, অনুপ্রাস, উদ্ভট সন্ধি ইত্যাদি নিয়েই সীমাবদ্ধ আলোচনা। আবার ১৯৭৬ সালে সাক্ষরতা প্রকাশনের উদ্যোগে সুকুমার রচনা সংগ্রহের প্রথম খন্ডের জন্য প্রেমেন্দ্র মিত্র যে ভূমিকা লেখেন তাতেও বিজ্ঞান গুরুত্ব পায়নি। তুলনায় লীলা মজুমদার তাঁর লেখায় বারবার সুকুমারের বিজ্ঞান ভাবনার কথাটা টেনে এনেছেন। এই পঙক্তিগুলো সেই কথাই বলে –

‘...সুকুমার রায় এখন খ্যাতি লাভ করেছেন আশ্চর্জ সব ছড়ার রচয়িতা হিসেবে। কিন্তু ওঁর মনটা যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক, কেননা একটা বিজ্ঞান-শিক্ষণের মধ্যে দিয়ে তিনি গিয়েছিলেন। ...’

অথবা

‘... সুকুমার রায় যে-বিষয়েই লিখুন, শিল্পকলা হোক সাহিত্য হোক – তার মধ্যে একটা বৈজ্ঞানিক মনের দীপ্তি পাওয়া যায়। অথচ সেই সঙ্গে সাহিত্যরস। ...’

রবীন্দ্রনাথ অন্ততঃ একটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে সুকুমারের বিজ্ঞানমুখীনতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। কলকাতার এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স ১৯৪০ সালের ২২শে নভেম্বর ‘পাগলা দাশু’র প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করে। সুকুমারের স্ত্রী সুপ্রভা রায়ের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ এই বইয়ের জন্য ভূমিকা লিখতে রাজি হন। সেখানে রবিঠাকুর বলেন,

‘... তাঁর সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র ও স্বচ্ছল গতি, তাঁর ভাব সমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমৎকৃতি আনে। তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভী‌র্য ছিল সেইজন্যই তিনি তাঁর বৈপরীত্য এমন খেলা ছলে দেখাতে পেরেছিলেন। ...’

বিজ্ঞানের নিবিড় পাঠক এবং অনন্য বিশ্লেষক রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই বোধহয় এমন লেখা পাওয়ার ছিল আমাদের। বস্তুতপক্ষে, ননসেন্স ব্যাপারটা এতটাই গভীর সেন্সের দাবি রাখে যে বিজ্ঞানের প্রকৃত ছাত্র ছাড়া তা উপহার দেওয়া বোধহয় অসম্ভব। ননসেন্স লিমেরিকের স্রষ্টা এডওয়ার্ড লীয়র, যাঁর সঙ্গে সুকুমারের ভাবগত মিল স্পষ্ট, তাঁর প্রথাগত শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হয়নি দারিদ্রের কারণে। কিন্তু স্বভাবশিল্পী লীয়র পেশাগতভাবে ছবি আঁকাআঁকির কাজটা শুরু করেছিলেন ইংল্যান্ডের জুলজিক্যাল সোসাইটির হয়ে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোলো। বিজ্ঞানের সঙ্গে যোগ শুরু সেখানেই। আবার, ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’এর লেখক চার্লস লুডউইগ ডজসন, ছদ্মনামে লুই ক্যারল, অঙ্কের প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন একজন গণিতবিদ। উদাহরণ এমন অনেক আছে। বিজ্ঞানের নিয়মের রাজ্যটা এমনই যে সেখানে হাল্কা বেনিয়মেই ননসেন্সের মজাদার জগৎটা ধরা দেয়। মোট কথা সুকুমারের ট্যাঁশ গোরু আর নন্দ গোঁসাই জন্মসূত্রে বিজ্ঞানের কাছে কৃতজ্ঞ।

লুইস ক্যারল

সুকুমারকে শুধুমাত্র শিশু সাহিত্যক হিসাবে বরণ করার মধ্যে দিয়ে আমরা আরও একটা কাজ সূক্ষভাবে করে ফেলেছি। সেটা হল তাঁর সিরিয়াস রচনার জগৎটাকে পাঠকের চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সিরিয়াস জগতে বিজ্ঞান সম্পর্কে ভিন্নতর কথা যেমন আছে তেমনি রয়েছে বিজ্ঞানের সঙ্গে সংঘাত। কেমন সেটা? প্রথমে ‘ভাষার অত্যাচার’ নিয়ে একটু কথা হোক। ভাষার বাঁধনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার রোগ আছে আমাদের সবার। কথিত শব্দ ঠিক কী যে বোঝাল তার তোয়াক্কা না করে ওই অসম্পূর্ণ ভাষাকেই আমাদের একমাত্র হাতিয়ার করি আমরা। বিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়েও এর ব্যতিক্রম হয় না। সুকুমার বলছেন, ‘... বিজ্ঞানের এক-একটি সিদ্ধান্ত বা ‘ল’ আওড়াইয়া আমরা মনে করি, খুব একটা কার্যকরণ
সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হইল। অমুক কাজটা অমুক ‘ল’ অনুসারে সম্পন্ন হইল; ... নিউটনের গতিবিষয়ক তৃতীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া সমান হইল। বলা বাহুল্য, আইনটার খাতিরে কাজটা নিষ্পন্ন হয় না। কার্যত ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার তুল্যতা দেখা যায় বা এরূপ হওয়াই স্বাভাবিক। ‘অমুক সিদ্ধান্ত অনুসারে হয়’ বলায় নতুন কিছুই বলা হইল না, কেবল সিদ্ধান্তকে তত্ত্বের সঙ্গে মিলাইয়া দেখা গেল। ...’ এমন চমৎকার এই রচনা যে আরও বেশি বেশি উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সামলানো যায় না। তবে রসসাহিত্যিককে বিরক্তি বর্জিত হতে হয়, এমন বালখিল্য ধারণার হুড়মুড় করে ভেঙে পড়া এমন প্রবন্ধে দেখতে পাই। চারদিকে কৌতুক ঘুরে বেড়াচ্ছে এমনতো নয়, অনেক সময় বিরক্তি ঢাকতেই রসের সমূহ আয়োজন। আবার তাতেও বিরক্তি থাকে। সবাই যে সেটা বুঝতে পারবেন না তা জেনেই রসটীকা সংযোজন করতে হয় মানে শুরুতেই ব্যঙ্গ জুড়তে হয়। না হলে ‘আবোল তাবোল’এর শুরুতেই কেন তিনি লিখবেন, ‘... ইহা খেয়াল রসের বই, সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাঁহাদের জন্য নহে।‘ ব্যঙ্গের পেছনে বিরক্তি অনাবৃত হয়ে পড়ে ‘ভাষার অত্যাচার’ জাতীয় রচনায়। তাই তো সুকুমার লেখেন, ‘ভাষা যে কেবল চিন্তাকে বিপথে ঘোরাইয়া বা তাহার আসন দখল করিয়াই ক্ষান্ত হয়, তাহা নহে; সে এক-এক সময়ে আমাদের অজ্ঞতার উপর পান্ডিত্যের রঙ ফলাইতে থাকে।’

এবারে আসা যাক বিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্ঘাতের প্রসঙ্গে। সুকুমার রায় ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মান। শুধু যে তাঁর পরিবার ব্রাহ্ম ছিল তাই নয়, তাঁদের মেলামেশা যে মহলে ছিল তাঁর বড় অংশই ছিল ব্রাহ্ম। এই হয়ত স্বাভাবিক। সনাতন হিন্দুধর্মের সঙ্গে কট্টর বি্রোধ ব্রাহ্মদের, এখানে-ওখানে দু’চারটে সখ্যের আল্‌গা উদাহরণ উপস্থিত করে সেই শত্রুতাকে লঘু করা সম্ভব নয়। এত বিরোধের পর সহজেই সামাজিক মেলামেশা ঘটবে এমন আশা করা অনুচিত। ফলে ব্রাহ্ম খুঁজে বেড়াবে ব্রাহ্মকে বা বিদেশের মাটিতে Unitarian-কে ! সনাতন হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠান বা উদ্ভট সংস্কারকে ত্যাগ করে আসা ব্রাহ্ম ঈশ্বরকে অবশ্য ত্যাগ করেননি। তাই ঈশ্বরকে মানেন না যিনি তিনিও ব্রাহ্মের মিত্র নন। আবারও বলতে হয়, দু’চারটে বিচ্ছিন্ন উদাহরণ দিয়ে এই তথ্যকে পাল্টানো সম্ভব নয়। শিবনাথ শাস্ত্রী থেকে সুকুমার রায়, সবাই এই সত্য অনুসারী। সে অর্থে ব্যতিক্রম নন রবীন্দ্রনাথও। বহু নাস্তিক যেভাবে বিজ্ঞানকে সবার উপরে স্থাপন করতে চান সেভাবে কাজ করতে দীক্ষিত নন ব্রাহ্মরা। এই সব বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুট সুকুমারের রচনার মধ্যে। ‘ব্রাহ্মহিন্দু সমস্যা’ সুকুমারের কোনও বিচ্ছিন্ন রচনা নয়। অন্যান্য বহু রচনার মধ্যেই ব্রাহ্মমতের হয়ে রক্ষণাত্মক এবং আক্রমণাত্মক, যুগপৎ এই দুই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় সুকুমারকে। আবারও বলতে হয় যে নেহাৎই নবীন এক ধর্মমতকে বাঁচানোর এই প্রচেষ্টা ইতিহাসের বিচারে অত্যন্ত স্বাভাবিক। সুকুমার সেটাই করেছেন। ‘দৈবেন দেয়ম্‌’ প্রবন্ধে কুসংস্কারের বিপক্ষে বলতে গিয়ে সরাসরি শঙ্করাচার্যকে টেনে এনেছেন রণভূমিতে। লিখছেন, ‘... সংসারটাকে ‘মায়া’ বলিয়া উড়াইতে চাহিলেই সে সরিয়া দাঁড়ায় না, বরং মায়াপুরীর যমদূতগুলি ক্ষুধার আকারে ব্যাধির আকারে সংসারের নানা তাড়নার আকারে জীবনের কন্ঠরোধ করিবার উপক্রম করে। কিন্তু কুতর্কের কন্ঠরোধ করিবে কে?’ বস্তুবাদী পাঠক যদি এই ‘প্রগতি’ নিয়ে আহ্লাদিত থাকেন তবে কিন্তু তাঁকে ‘যুবকের জগৎ’ প্রবন্ধের এই ধরণের পঙক্তির চাপও বহন করতে হবে – ‘... যে ভগবান আমার সুখ দুঃখ সংগ্রামের বোঝা বহন করিতেছেন, আমার পাপের বোঝাও সেই ভগবানই অপরাজিত প্রসন্নতার সহিত বহন করিতেছেন।‘ এই কথাগুলোর মধ্যে কোনও কৌতুক-ব্যঙ্গ-রসিকতা নেই। সরল বিশ্বাস ঝরঝর করে বেরিয়েছে কলম থেকে।

ভাষা যাই হোক না কেন, যে কোনও ধর্মের সঙ্গে এমন কিছু ধারণার যোগ থাকবেই যা সেই মতানুসারীদের মতে ব্যাখ্যার অতীত। সেখানে সমাধানটা অন্ততঃ খোঁজার অধিকারও নেই বিজ্ঞানের। ধর্মাবলম্বীরা এ ব্যাপারে এতটাই কঠোর। ‘চিরন্তন প্রশ্ন’ প্রবন্ধে এক জায়গায় সুকুমার লিখছেন, ‘বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি ও সূক্ষ জটিলতার মধ্যে মন যখন আপনার সম্যক দৃষ্টিকে হারাইয়া ফেলে, বাহিরের খন্ডতার মধ্যে ঘুরিয়া-ঘুরিয়া যখন সে আর পথ খুঁজিয়া পায় না, তখন পরিশ্রান্ত মানুষ তাহার চিরন্তন প্রশ্নের বোঝাকে আপনার মধ্যে অন্তরের দ্বারে ফিরাইয়া আনে। ... তখন মানুষ বুঝিতে পারে, বাহিরের সাধনার দ্বারা যে ‘আমি’কে আমরা অন্বেষণ করি, সে আমাদের প্রকৃত স্বরূপ নয়। ...’ তাহলে প্রকৃত স্বরূপ খোঁজার পথ কী? প্রবন্ধের শেষে সেই ধর্মের উপরেই আস্থা রেখেছেন সুকুমার। বস্তুবাদী বিজ্ঞানী এভাবে ‘স্বরূপ’ খোঁজার চেষ্টাতে আগ্রহী হবেন না। ফলে এই উত্তরটাও তাঁর কাছে মূল্যবান নয়। বিজ্ঞানের খন্ডতা আসলে অখন্ড মহাবিশ্বকে বোঝার একটা কৌশল। সেটা জানতেন বিজ্ঞানের ছাত্র সুকুমার নিজেও। তবু ধর্মের পক্ষে কলম ধরতে গিয়ে অন্য কথা বলতে হল তাঁকে। তিনি লিখে যান, ‘... ওই যে ব্যূহের মুখে, ভিতর বাহিরের সন্ধিস্থলে চৈতন্যরূপী জয়দ্রথ বসিয়া আছেন, বিজ্ঞানের অস্ত্রে তো তাহার গায়ে কোনও দাগ পড়ে না। বিজ্ঞান নিজ বলে আত্মার শিবিরে ফিরিবে কোন্‌ পথে?’

এমনি বিচিত্র সুকুমারের জগৎ! বৈচিত্রের পূজারী তিনি, তাঁর জীবনের প্রতি ছত্রে বৈচিত্র্য যে পাখনা মেলবে তাতে আর আশ্চর্য কী !

কৃতজ্ঞতা- শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়
তথ্যসূত্রঃ
১। লীলা মজুমদার, সুকুমার, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, মে ১৯৮৯
২। সিদ্ধার্থ ঘোষ, কারিগরি কল্পনা ও বাঙালি উদ্যোগ, দে’জ পাবলিশিং, জানুয়ারি ১৯৮৯
৩। সুভাষ চক্রবর্তী (সম্পা), বিশেষ সুকুমার রায় সংখ্যা, যুবমানস, এপ্রিল ১৯৮৮
৪। সুকুমার রচনা সমগ্র, শুভম, ২০১১
৫। সত্যজিৎ রায় ও পার্থ বসু (সম্পা), সমগ্র শিশুসাহিত্য, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, বৈশাখ ১৩৮৯


লেখক পরিচিতিঃ পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা। আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান প্রযোজক। পেশা ও নেশা কিছুটা মিলেছে কর্মস্থলে, যেখানে বিজ্ঞানের বহু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন তিনি। ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে এফ এম রেনবোতে পরিবেশন করছেন লাইভ অনুষ্ঠান 'বিজ্ঞান রসিকের দরবারে'। বাকি নেশার মধ্যে লেখালেখি ধারাবাহিকতা রাখতে পেরেছে। সময় পেলে কিঞ্চিৎ ফোটোগ্রাফি। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখ্যঃ সুস্থায়ী উন্নয়নের নীল নকশা, জলবায়ু বিতর্ক, অনুপ্রেরণার নাম কালাম, একবিংশ শতকের নোবেলজয়ী-চিকিৎসাবিজ্ঞান, রিমেম্বারিং রামানুজন।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।