‘খেয়াল রসে’ আজও সবাই মজে আছে

 

প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

সুকুমার রায় স্মরণে

অবসর (বিশেষ) সংখ্যা, এপ্রিল ৩০, ২০১৬

 

‘খেয়াল রসে’ আজও সবাই মজে আছে

শেখর বসু

 

সুকুমার রায়

তাঁর লেখকজীবন মাত্র কয়েকটি বছরের। শেষের  আড়াই বছর আবার শয্যাশায়ী ছিলেন দুরারোগ্য অসুখে। কিন্তু মাত্র ছত্রিশ বছরের জীবনে সুকুমার রায় যা দিয়ে গিয়েছেন বাংলা সাহিত্যকে, তা তুলনাহীন। তাঁর মৃত্যুর পরে প্রায় একশো বছর হতে চলল, কিন্তু আজও আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় তিনি অতিমাত্রায় প্রাসঙ্গিক। তাঁর বিচিত্র শব্দ-ব্যবহার, লেখার লাইন, চরিত্রের নাম কী অক্লেশে আমাদের কথাবার্তার মধ্যে ঢুকে পড়ে। তাঁর একটিমাত্র কথা ব্যবহার করে দশটি কথা বলে ফেলার ফল পাই আমরা।

গোমড়ামুখো কারও পরিচয় দিতে গেলে ‘রামগরুড়ের ছানা’ বললেই যথেষ্ট। অদ্ভুত ধরনের জোড়াতালি দেওয়া ঘটনা দেখলে শুধু ‘বকচ্ছপ’ বা ‘হাঁসজারু’ বলেই থেমে যাওয়া যায়। ‘সাতদিনের ফাঁসি’ তো কবেই প্রবাদের মর্যাদা পেয়ে গিয়েছে। লাগসই জায়গায় যদি বলা যায় ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল’—ব্যস, আর কিছু ভেঙে বলার  দরকার নেই। ‘সাত দুগুনে চোদ্দর নামে চার’ বললে অনেকেই বাকি অংশটা বলে দেবেন—‘হাতে রইল পেনসিল।’

এই ভাবেই বাঙালি জীবনের নানা স্তরে মিশে গেছেন স্বল্পায়ু লেখক সুকুমার রায়। ভুগছিলেন দুরারোগ্য কালাজ্বরে। কিন্তু অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী এই মানুষটি রোগশয্যাতেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম থামাননি। নানা ধরনের লেখালেখির কাজ করে গিয়েছেন সমানে। সঙ্গে ছিল ছবি আঁকা। অসামান্য ‘আবোলতাবোল’ গ্রন্থের লে-আউট তাঁরই তৈরি।  কিন্তু দুঃখের কথা, ছাপার হরফে  বইটি তিনি দেখে যেতে পারেননি।

আমাদের দুঃখের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায় যখন জানতে পারি, তাঁর মৃত্যুর পরের বছরেই কালাজ্বরের ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছিল। যদি আগের বছর ওষুধটি বার হত, এবং সেই ওষুধে আরোগ্য লাভ করে যদি তিনি আরও চল্লিশ-পঞ্চাশটি বছর  বেঁচে থাকতেন, তা হলে--। পরেরটুকু অনুমান করতে আমাদের কারুরই কষ্ট হয় না। তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার স্পর্শে বাংলা সাহিত্য  আরও অনেকটাই ধনী হয়ে উঠতে পারত। তবে অল্প দিনের জীবনে তিনি যা দিয়ে গিয়েছেন, তাও তো তুলনাহীন ! তাঁর ছড়ায়,কবিতায়, গল্পে, নাটকে, ছবিতে আমরা আজও মজে আছি।

‘আবোলতাবোল’ বইটির ভূমিকায় লেখক লিখেছেনঃ

‘ যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার। ইহা খেয়াল রসের বই। সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাঁহাদের জন্য নহে।’

পাগলা দাশুর প্রচ্ছদ

আজগুবি, উদ্ভট,অসম্ভব বস্তুর এমন শিল্পসম্মত ব্যবহার  বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত আর কখনোই হয়নি। শুধু এই বইটিতেই নয়, সুকুমার রায়ের সৃষ্টিশীল সব লেখারই মূলে আছে তাঁর উদ্ভাবিত ‘খেয়াল রস’।
লেখকের মৃত্যুর কয়েক বছর পরে তাঁর প্রথম গল্প-সংকলন ‘পাগলা দাশু’ প্রকাশিত হয়। সেই সংকলনের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ

“সুকুমারের লেখনী থেকে যে অবিমিশ্র হাস্যরসের উৎসধারা বাংলা সাহিত্যকে অভিষিক্ত করেছে, তা অতুলনীয়। তাঁর সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র গতি, তাঁর ভাবসমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমত্কৃতি আনে ... বঙ্গসাহিত্যে ব্যঙ্গরসিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আরও কয়েকটি দেখা গিয়েছে, কিন্তু সুকুমারের অজস্র হাস্যোচ্ছ্বাসের বিশেষত্ব তাঁর প্রতিভায় যে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছে, তার ঠিক সমশ্রেণীর রচনা দেখা যায় না।”

ভাবসমাবেশের জগতে সুকুমার রায়ের যে ‘অভাবনীয় অসংলগ্নতা’র উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, তা তুলনাহীন। সুকুমারের বৈশিষ্ট্য তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। উদ্ভট রসের দুই বিশিষ্ট লেখক এডওয়ার্ড লিয়ার ও লুইস ক্যারলের ছায়া পড়েছিল সুকুমারের ওপর, তবে সেই ছায়াকে তিনি সঙ্গী করেননি। তাঁর নিজস্বতা গড়ে উঠেছিল বিশুদ্ধ বাঙালিয়ানা ও আশেপাশের জগৎ থেকে।

উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে ‘লিটারেরি ননসেন্স’ রীতিমত একটি সাহিত্য-আন্দোলনের চেহারা ধরেছিল। আপাতদৃষ্টিতে যাকে যুক্তিতর্ক বলে, তার সঙ্গে এই সাহিত্যের কোনও সম্পর্ক ছিল না। যা ছিল তা এর ঠিক উলটো দিক। অর্থাৎ মাথামুন্ডুহীন বিষয়। এক ঝাঁক লেখকের মধ্যে সবার ওপরে উঠে এসেছিলেন লিয়ার এবং ক্যারল। লিয়ারের ‘এ বুক অব ননসেন্স’ মাত করে দিয়েছিল পাঠকদের। তাঁর ‘লিমেরিক’ সবার মুখে মুখে ফিরত। এই আন্দোলন উজ্জীবিত করেছিল সুকুমার রায়কে। কিন্তু মৌলিকতা, স্বকীয়তা তাঁর লেখার পরতে পরতে। আজগুবি, উদ্ভট, খেয়ালরসের যে কাণ্ডকারখানা তিনি ঘটিয়েছেন তার প্রায় পুরোটাই উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের ভেতরমহল থেকে।

যদি কুমড়োপটাশ নাচে

সৎপাত্রের খোঁজ করা এবং হিতৈষী-সাজা কোনও একজনের সেই বিয়েতে ভাংচি দেওয়া একেবারেই বাংলা মুলুকের ব্যাপারস্যাপার। পাত্র গঙ্গারামের গুণের শেষ নেই। তার উনিশটিবার ম্যাট্রিকে ফেল মারাটা কোনও ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত নয়, বিরল এক অধ্যবসায়ের পরাকাষ্ঠা। বাবুরাম সাপুড়ের কাণ্ডকারখানাও আমাদের মাতিয়ে রাখে। ‘ছায়ার সঙ্গে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা’ বললে আমরা অক্লেশে মেনে নিই, কুমড়োপটাশ নাচলে কী হয়—আমাদের আর অজানা নয়; বোম্বাগড়ের রাজা কেন ছবির ফ্রেমে আমসত্ত্ব ভাজা বাঁধিয়ে রাখে—তা নিয়ে কেউ এখন আর প্রশ্ন তোলে না। কারণ সুকুমার রায় তাঁর আশ্চর্য লেখার গুণে  বিচিত্র এই জগৎটিকে সত্যি করে তুলেছেন। আমাদের একমাত্র কাজ হল অপরূপ  এই জগতের  সবকিছু উপভোগ করা—আমরা তাই-ই করে থাকি।

শুধুমাত্র ছড়া-ছবিতেই নয়, তাঁর গল্প ও নাটকেও প্রধান রস ওই খেয়ালরস। ‘হ য ব র ল’-তে উদ্ভট কাণ্ডের ছড়াছড়ি। গল্পের ওই বুড়োকে ভোলা অসম্ভব। বুড়োর  কখনও বয়েস বাড়ে না, কারণ বুড়ো বাড়তে দেয় না। বুড়ো কাককে বলেছিল, ‘চল্লিশ বছর হলেই আমরা বয়েস ঘুরিয়ে দিই। তখন আর একচল্লিশ, বেয়াল্লিশ হয় না—ঊনচল্লিশ,আটত্রিশ, সাঁইত্রিশ করে বয়েস নামতে থাকে। এমনি করে দশ পর্যন্ত নামে, তখন বয়েস আবার বাড়তে দেওয়া হয়। আমার বয়েস যে কত উঠল,নামল, এখন আমার বয়েস হয়েছে তেরো।’

হিজি বিজ বিজ

বিস্ময়কর সেই নামকরণ-পর্বও। হিজি বিজ বিজ বলল, ‘একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম অবিমৃষ্যকারিতা, তার ছাতার নাম প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু—কিন্তু যেই তার বাড়ির নাম দিয়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে।’

শব্দের আশ্চর্য মহিমার কথা একাধিকবার শুনিয়েছেন সুকুমার। এমনকী বিচিত্র এই জগতে গাছের ফুল ফোটার সময় ভয়ংকর সব শব্দ উঠে থাকে। নিছক শব্দ নয়, ‘শব্দকল্পদ্রুম’। ‘ঠাস্‌ ঠাস্‌ দ্রুম্‌ দ্রাম্‌, শুনে লাগে খট্‌কা--/ ফুল ফোটে ? তাই বল! আমি ভাবি পট্‌কা।’ যে জগতে ফুল ফোটা আর পটকা ফাটার শব্দের মধ্যে বিন্দুমাত্র তফাত নেই, সেই জগতে বাড়ির নাম ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’  হলে সে বাড়ি তো পড়ে যাবেই।

নেড়ার গানও দিব্যি মানানসই এখানে। ‘লাল গানে নীল সুর হাসি হাসি গন্ধ’—এর মধ্যে তো কণামাত্রও অসঙ্গতি নেই।  কিন্তু বিচারক প্যাঁচা এই প্রতিভাবান নেড়াকেই সাজা দিয়েছিল। সেই সাজাটিও জব্বর ! ‘তিন মাসের জেল আর সাত দিনের ফাঁসি।’

তিন মাসের জেল নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই, কিন্তু সাত দিনের ফাঁসি ! কথায় বলে—হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না।  সুতরাং মেনে নেওয়া  যেতে পারে যে হুকুম পালন করা হয়েছিল। কী ভাবে সেটা কেউ জানে না, এবং  বোধহয় জানতেও চায় না।

সুকুমার রায়ের নাটক ও নাটিকাগুলির প্রধান রসও সেই খেয়ালরস। প্রতিটি নাটকই মজাদার। এগুলির মধ্যে আছে ‘ঝালাপালা’, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’, ‘অবাক জলপান’, ‘চলচিত্তচঞ্চরি’ ইত্যাদি। প্রতিটি নাটকেই উদ্ভট,আজগুবি সব  ঘটনা ঘটে চলে অনায়াসে। এখানে কোনও সমস্যাই সমাধানহীন নয়। ‘ঝালাপালা’র কেষ্ট পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে   ‘আই গো আপ, উই গো ডাউন’-এর মানে জানতে চেয়েছিল। 

পণ্ডিতমশাইয়ের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে , তিনি একটুও সময় নষ্ট না করে বললেন, “ ‘আই’—আই কি না চক্ষুঃ, ‘গো’—গ  য়ে ও কারে গো—গৌ গাবৌ গাবঃ, ইত্যমরঃ। ‘আপ’ কি না আপঃ—সলিলং বারি অর্থাৎ জল। গোরুর চক্ষে জল, অর্থাৎ জল। গোরুর চক্ষে জল, অর্থাৎ কি না গোরু কাঁদিতেছে। কেন কান্দিতেছে ? না ‘উই গো ডাউন’ অর্থাৎ গুদমখানা।  গুদমঘরে উই ধরে আর কিছু রাখলে না, তাই না দেখে, ‘আই গো আপ’—গরু কেবলি কান্দিতেছে—।”

এমন হৃদয়বিদারক শব্দার্থ একমাত্র সুকুমার রায়ের পণ্ডিতমশাইয়ের পক্ষেই বার করা সম্ভব। এই ব্যাখ্যা আমরা যখন শুনি, আমাদের  কোনও সংশয় প্রকাশের ইচ্ছেই  আর অবশিষ্ট থাকে না। সুকুমার রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে সত্যজিৎ রায়  ওঁর বাবাকে নিয়ে যে অসামান্য তথ্যচিত্রটি তৈরি করেছিলেন সেখানে বিশিষ্ট অভিনেতা উৎপল দত্ত পণ্ডিতমশাইয়ের এই চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছেন।

‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’-এ রাম, লক্ষ্মণ, জাম্বুবান,সুগ্রীব, হনুমান, বিভীষণের সঙ্গে মূল রামায়ণের ওই চরিত্রগুলির আকাশপাতাল তফাত। কিন্তু নাটকের পাত্রপাত্রীদের উদ্ভট, হাস্যকর কাণ্ডকারখানা সবাইকে এমনই মশগুল করে  রাখে যে, মূল কাহিনির সঙ্গে মিল-গরমিলের কথাটা কারও মাথাতেই আসে না।

মহাকাব্যের পাত্রপাত্রীরা এখানে আজগুবি কাণ্ডকারখানা ঘটিয়ে গিয়েছে সমানে। এমনকী নাটকের সামান্য একজন দূতও এর বাইরে নয়।  গুরুত্বপূর্ণ সংবাদসংগ্রহের বৃত্তান্ত শোনাতে গিয়ে দূত বলল, ‘আমি ছানটান করেই পুঁইশাক চচ্চড়ি আর কুমড়ো ছেঁচকি দিয়ে চাট্টি ভাত খেয়ে খেয়েই অমনি বেরিয়েছি—অবিশ্যি আজকে পাঁজিতে কুষ্মাণ্ড ভক্ষণ  নিষেধ লিখেছিল, কিন্তু কি হল জানেন ? আমার কুমড়োটা পচে যাচ্ছিল কি না--। ’

এরপর ধমক খেয়েই কাজের কথায় এসেছিল দূত। ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ—খেয়ে উঠেই ঘণ্টা দু-তিন জিরিয়ে সেখানে গিয়ে দেখি খুব ঢাকঢোল বাজছে—ধ্যা র‍্যা র‍্যা র‍্যা র‍্যা--ধ্যা র‍্যা র‍্যা--ধ্যারা—।’

আবার ধমক। তারপরেই আসল সংবাদে এসেছিল দূত। কিন্তু ওই যে ‘ছান-টান’ করা, পুঁইশাক চচ্চড়ি আর  কুমড়োর ছেঁচকি খাওয়া, তারপর খেয়ে উঠেই (বেরিয়ে পড়া নয় ) দু-তিন ঘণ্টা জিরিয়ে নেওয়ার বৃত্তান্ত শুরুতেই নাটকের মেজাজটি গড়ে দিয়েছে।

‘চলচিত্তচঞ্চরি’ উদ্ভট রসের আর একটি অনবদ্য নাটক। এই নাটকের লেখক ভবদুলাল চরিত্রটি তুলনাহীন। ইনি  অনেক কথাই ঠিক ভাবে শোনেন না। যা বোঝেন তার প্রায় পুরোটাই ভুল। তাঁর বইয়ের নাম ‘চলচিত্তচঞ্চরি’। বইটির সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে। যেমন, এটির মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা সাতশো কি আটশো, মলাট লাল রঙের। তার ওপর বড় বড় করে সোনার জলে লেখা থাকবে বই ও লেখকের নাম। দাম একুশ টাকা।
সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে আছে, কিন্তু বইটা ছাপতে দেওয়া হয়নি এখনও। কেন? একটাই কারণ। লেখাই হয়নি বইটা। পরে অবশ্য কয়েক পাতা লিখেছিলেন। কিন্তু যে-সব চরিত্রের মুখে উলটোপালটা কথা বসিয়েছিলেন, তারাই রাগ করে পাতাগুলো ছিঁড়ে দিয়েছিল।   

হেঁশোরাম হুঁশিয়ার

অপরূপ চরিত্র এই ভবদুলাল। আমার মনে হয়, এই চরিত্রটির মধ্যেই সত্যজিৎ রায়ের জনপ্রিয় চরিত্র ‘জটায়ু’র বীজ লুকিয়ে আছে। সুকুমার রায়ের ‘হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ একটি অনবদ্য কল্পকথা। এই প্রফেসর হুঁশিয়ারকে সত্যজিতের প্রফেসর শঙ্কুর পূর্বপুরুষ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।  

অদৃষ্টপূর্ব বিচিত্র প্রাণীদের নামকরণ করার ব্যাপারে প্রফেসর হুঁশিয়ার অত্যন্ত পটু ছিলেন। উদ্ভট চেহারার একটা হ্যাংলা প্রাণীর নাম দিয়েছিলেন ‘হ্যাংলাথেরিয়াম’। অত্যন্ত বিরক্ত, গোমড়া চেহারার একটা প্রাণীর নাম দেওয়া হল ‘গোমড়াথেরিয়াম’।

আজব চেহারার এক ল্যাংড়া জন্তুর নাম রাখা হল ‘ল্যাংড়াথেরিয়াম’। বিদ্‌ঘুটে আকৃতির একটা প্রাণী প্রাণপণে চেঁচিয়ে যাচ্ছিল তো যাচ্ছিলই, তার লাগসই নামটিও ঠিক করে ফেলেছিলেন প্রফেসর—‘চিল্লানোসরাস’। চরিত্রের বিচিত্র সব নামকরণ করার ঝোঁকটি উত্তরাধিকারসূত্রে সত্যজিৎও পেয়েছিলেন।

একটি পর্যায়ে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন সুকুমার রায়।পত্রিকার প্রয়োজনে নানা ধরনের লেখা লিখিয়েছিলেন নানাজনকে দিয়ে। নিজেও লিখেছিলেন অনেককিছু। প্রতিভাবান লেখক, যে-কোনও বিষয়কেই উপস্থিত করতে পারতেন সুন্দর ভাবে। উপকথা, রূপকথার তো স্বাভাবিক একটা টান থাকে, কিন্তু যে বিষয়গুলি  নেহাতই তথ্যভিত্তিক—সেগুলিও তাঁর লেখার জাদুতে অনবদ্য হয়ে উঠেছে। এই সব লেখার মধ্যে আছে ‘পিরামিড’, ‘দক্ষিণ দেশ’, ‘ভূমিকম্প’, ‘চীনের পাঁচিল’, ‘ডুবুরী জাহাজ’, ‘গরিলা’, ‘রাক্ষুসে মাছ’ ইত্যাদি।

সংক্ষিপ্ত জীবনকথাও লিখেছেন ছোটদের  জন্যে। বিখ্যাত মানুষজন, বিচিত্র তাঁদের কর্মকাণ্ড ; কিন্তু খুব সহজ ভাষায় গল্পের ভঙ্গিতে তাঁদের জীবনকাহিনি শুনিয়েছেন সুকুমার। এই তালিকায় আছেন লিভিংস্টোন, পাস্তুর, সক্রেটিস,গ্যালেলিও, ডারুইন প্রমুখ।

মৌলিক গল্পেও আশ্চর্য রকমের সফল সুকুমার। তার বেশ কয়েকটি গল্পের পটভূমিতে আছে স্কুলজীবন। ছাত্র ও পণ্ডিতদের নানা ভূমিকায় দেখা যায় এই সব গল্পে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে ‘পাগলা দাশু’, ‘দাশুর কীর্তি’ ও ‘দাশুর খ্যাপামি’। ‘জগ্যিদাসের মামা’, ‘পালোয়ান’, ‘বিষ্ণুবাহনের দিগ্বিজয়’, ‘ব্যোমকেশের মাঞ্জা’  ইত্যাদি অপরূপ গল্পগুলিও ওই স্কুলজীবনকে কেন্দ্র করেই।  

তবে ‘ভুল’ গল্পটি একেবারেই অন্য ধরনের। এমন গল্প আর একটিও চোখে পড়ে না। ছোটদের পত্রপত্রিকায় এই ধারাটির চর্চা হলে অল্পবয়সী পাঠকদের সচেতনতা অবশ্যই বাড়ত। ছোট আকারের ‘ভুল গল্প’-টিতে গল্পের টান চমৎকার। একবার পড়তে শুরু করলে থামা যায় না। আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে গল্পের ঘটনাগুলি সাজানো।

গল্পের শেষে ভুল গল্পের ভুলগুলি দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি-দুটি নয়, গোটা-পনেরো ভুল আছে ছোট মাপের এই গল্পটিতে। গল্পে বলা হয়েছে , বৃন্দাবনবাবুর মাথাভরা টাক, কিন্তু শেষে দেখা যায়—তিনি টিকি দোলাচ্ছেন। গল্পের প্রথম দিকে  বলা হয়েছে তাঁর বয়স ষাট, কিন্তু পরে জানানো হয়েছে তিনি চাকরি করছেন ৫৬ বছর ধরে। গল্পের প্রথম পর্বের তথ্য—রামবাবু ইংরেজি জানেন না, কিন্তু পরে দেখা যায়—তিনি গড়গড় করে ইংরেজি টেলিগ্রাম পড়ছেন। গল্পের শেষে এই ধরনের বড় মাপের ভুল দেখানো হয়েছে গোটা-পনেরো।

সুকুমার রায় শুধু লেখাতেই নয়, খেয়ালরসের জোগান দিয়েছেন তাঁর ছবিতেও। ‘আবোলতাবোল’ বইটির পাতায় পাতায় মজাদার জীবন্ত ছবির ছড়াছড়ি। বইয়ের পাতায় এরা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। এদের মধ্যে আছে হাঁসজারু, বকচ্ছপ, কাঠবুড়ো, কুমড়োপটাশ, বোম্বাগড়ের রাজা, রামগরুড়ের ছানা, ট্যাঁশ গরু,পালোয়ান ইত্যাদি।
‘হ য ব র ল’-র ছবিগুলো গল্পের সঙ্গে ভীষণ মানানসই। অমরত্ব পেয়েছে প্রতিটি ছবিই। এগুলির মধ্যে আছে বেড়াল, কাক, বুড়ো, ব্যাকরণ সিং, নেড়া, হিজি বিজ্‌ বিজ্‌, কালো ঝোল্‌লা-পরা হুতোমপ্যাঁচা, মাথায় শামলা-আঁটা শেয়াল, কুমির ইত্যাদি। মজাদার কিছু কার্টুন চিত্রমালাও এঁকেছেন সুকুমার। এগুলিও অপরূপ।

বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষটি বেঁচেছিলেন মাত্র ছত্রিশ বছর ( ১৮৮৭-১৯২৩)।  তাঁর খেয়াল রস আপ্লুত করে আসছে প্রতি যুগের পাঠকদের। আজও করছে,ভবিষ্যতেও করবে।


লেখক পরিচিতিঃ প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ছোটগল্পকার। কর্মজীবনে আনন্দবাজার পত্রিকার গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বহু বছর। এখন পুরো সময়টাই লেখালেখির কাজ করছেন। গত চল্লিশ বছরে উনি বহু গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গোয়েন্দাকাহিনী লিখেছেন। এযুগের যুবক সম্প্রদায়ের অনেকেই বড় হয়েছেন ওঁর লেখা ছোটদের বই পড়ে।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।