প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

বিবিধ প্রসঙ্গ - ব্যক্তিগত স্মৃতি -বিস্মৃতি 

এপ্রিল ১৫, ২০১৫

 

নানা রঙের দিন

ঈশানী রায়চৌধুরী

(৮)

(আগের অংশ) স্কটিশে ছেলেদের চারটে হোস্টেল। ওয়ান , ডাফ ( এতে অনেক বিদেশী ছাত্র থাকে ), অগিলভি আর টমোরি। মেয়েদের জন্য বরাদ্দ একটাই। ডানডাস। মাঝে মধ্যে সুযোগ পেলে ডানডাসে যাই। দীপা আর বিপাশা থাকে। দীপা দুর্গাপুরের মেয়ে আর বিপাশা বীরভূম। দীপার একটা হাতে অনেকটা পোড়ার দাগ। আগুন চিহ্ন রেখে যায় কী ভয়ঙ্করভাবে। দীপার সঙ্গে গল্প হয় বেশি। খুব ব্যালান্সড মেয়ে। মানে মেয়েলিপনা কম। বিপাশার একটু সঞ্জয় -সঞ্জয় মন ।

মেয়েদের হোস্টেল জীবন কেমন হয় ? সারাক্ষণ কেটে যায় যার গার্জেনদের শ্যেনদৃষ্টির নীচে , তার কৌতূহল তো থাকবেই। আমি গা এলিয়ে দিই দীপার সরু শক্ত খাটে। দীপাকে বলি, "তুই চেয়ারে বোস |" করিডোর দিয়ে হেঁটে যায় কেউ কেউ ব্যস্ত পায়ে। মুসুর ডালে ফোড়ন দেওয়ার গন্ধ ভেসে আসে। তা ছাপিয়ে যায় কলঘরের বালতিতে ছ্যারছ্যার করে জল পড়ার শব্দ। দীপা আমার সামনে ধরে প্যাকেট খোলা হরলিক্স বিস্কুট |

মেয়েদের হোস্টেলে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটে। কিন্তু রেখেঢেকে। ছেলেদের হোস্টেলে একেবারে বেনোজল হয়ে। ছাত্র পরিষদের রমরমা। সত্যি কথা বলতে গেলে দৌরাত্ম্য। তখন কলেজের ছাত্র পরিষদ চলে দুজন নেতার নির্দেশে। এঁরা অলক্ষ্যে মেঘনাদ। নাম ..এই ধরুন..অশেষরঞ্জন ও দেবব্রত। আর সামনে থেকে হুঙ্কার দেয় অ -দাদা , ক -দিদির দল। রাজু মাঝেমাঝে গর্জন করে বেশি, তবে ইদানীং পাত্তা পায় কম। নিজেদের দলের ছেলেরাই অ -বাবুকে তোল্লাই দেয় বেশি। সংগঠক এবং গুণ্ডামি ..অ -বাবু লা-জবাব ! আর রাজু একটু গোঁয়ার টাইপ। ফলে কাজের বদলে ছড়ায় বেশি |

এমনই একদিনের কথা। সেদিন আমি আর দীপা আড্ডা দিয়ে ফিরেছি কলেজে। মাঝে যে ক্লাসটা ছিল, কোনও কারণে হয়নি। এরপর আবার ক্লাস আছে। শুনি হলে প্রচুর হই হল্লা |

কোনো মাইক টাইক নেই। ডায়াসে দাঁড়িয়ে পুলকদা। পুলকদা আর কয়েকজন আমাদের সিনিয়র। আর হল ভর্তি অনেক ছেলেমেয়ে। স্টাফ রুমের বাইরে কয়েকজন অধ্যাপককেও চোখে পড়ল। পুলকদার একটা চোখে ব্যান্ডেজ। এই পুলকদারা আমাদের মাঝেমাঝে অন্যরকম কথা শোনায়। যে কথা অ-দাদারা বলে না। এরা মিটিং মিছিল করে ক্লাস বন্ধ করার বিপক্ষে। এরা বলে ছাত্র-রাজনীতি ঐচ্ছিক। এরা বলে, হোস্টেলগুলো এখন অনৈতিক কাজকর্ম আর বোমা বাঁধার আখড়া। এরা কথায় কথায় "জবাব চাই, জবাব দাও " বলে না। মোটমাট আমরা এদের ওপর একটু একটু নির্ভর করতে শিখছি। বিশ্বাস তৈরী হচ্ছে ধীরে ধীরে |

পুলকদা আসছিল কলেজের পেছনের গলি দিয়ে। হঠাত তাকে ঘিরে ধরে অ -দাদার কিছু চ্যালাচামুণ্ডা । ততদিনে তো পুলকদারা মার্কামারা হয়ে গেছে অ-দাদাদের বিরোধীপক্ষ হিসেবে। রাজনৈতিক রং আছে কী নেই ..সে পরের কথা। আগে মারো। একা পেয়েছ, মারো। বেধরক ঠ্যাঙানি দিতে দিতে ..আরও কী কী উদ্দেশ্য ছিল কে জানে..লাশ টাশ পড়ত কিনা..ওরা যখন পুলকদাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওদের গোপন গর্তে , খেয়াল করেনি ওই গলিতে একা হেঁটে আসছিল শুভম। সে আমাদের ব্যাচ। আর্টস পড়ে। তার বাবা চলচ্চিত্র -শিল্প-সংস্কৃতি জগতের এক উজ্জ্বল নাম। সে পুলকদার আর্তনাদ শুনে চেঁচিয়ে ওঠে, "ওকে ছেড়ে দাও। এই, তোমরা ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ?"

"আরে, এটা অমুকের ছেলে না ? এটাকেও ধর ! আজ শালা দুটো লাশ ফেলে দেব। মার শালাকে। "

ওরা অনেকে। এরা মাত্র দু'জন ! হাত চলছে, খিস্তি চলছে, কোমর থেকে বেরিয়ে এসেছে ছুরি, চেম্বার |

কী কপাল ! হুটার বাজিয়ে গলি দিয়ে ছুটে আসে বড়তলা থানার সাব -ইন্সপেক্টরের জীপ। নিমেষে দলবল , ছুরি, চেম্বার হাওয়া। যাবার আগে দুটো পেটো ফাটে শুধু। এরা দুজন প্রাণে বেঁচে যায়। ওই পুলিশ কর্মচারী ওদের তুলে নিয়ে যান। ডাক্তারের চেম্বারে |

চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে চোয়ালে হাত চেপে পুলকদা কলেজে ঢুকলে পুলকদার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেয়..অনেক গুণ্ডাবাজি , বোমাবাজি সহ্য করেছি আমরা। এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তাই পুলকদা এখন ডায়াসে। তার বক্তব্য সমর্থন করতে উঠে আসে শুভম। আমরা রুদ্ধশ্বাসে দেখি পুলকদা চোখের ব্যান্ডেজ খোলে। রক্তে ভেজা। চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ। চোখটা ..কী সাংঘাতিক ! যেন বেরিয়ে এসেছে !

আমরা শিউরে উঠি। অজান্তেই আমাদের হাতের মুঠি শক্ত হয়ে যায়। চোয়াল চেপে বসে দাঁতের ওপর। আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অনেক সহজ হয়ে যায়। কলেজে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর দৃষ্টিভঙ্গি বদলের। সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিবর্তনকামী ছাত্রছাত্রীরা মনে মনে পরস্পরের হাত ধরে ব্যারিকেড তৈরী করে |

(৯ )

কলেজ রাজনীতির ডামাডোল চলছে। ছাত্র পরিষদের বিরুদ্ধে জোট বাড়ছে। অ-দাদারা হাতের মুঠি আকাশে তুলে চেঁচিয়ে বিল্ডিং -এর দেওয়ালে চিড় ধরাতে মরীয়া। এদিকে তলে তলে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (SA ) সংঘবদ্ধ হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি।

এর মধ্যে একটা কাণ্ড হল। এক অবিবাহিত অধ্যাপক আমার প্রেমে পড়লেন। আমার চেয়ে প্রায় চোদ্দ বছরের বড়। বাবাকে "দাদা " বলে ডাকেন ( না, একই ডিপার্টমেন্ট নয়)। সে এক তুমুল প্রেমে পড়া। সারা কলেজ জানিয়ে। আমি তখনও মাঝেমাঝেই এদিকে ফ্রক , ট্রাউজার্স পরি। শাড়ি ধরিনি বললেই হয়। এ হেন নাক চ্যাপ্টা, চলনসই চেহারার হাঁটুর বয়েসী খুকিতে তিনি কেন মজলেন কে জানে! প্রেমে পড়লে মানুষ সত্যিই ক্যাবলা হয়ে যায়। তিনিও এমন ভেবলে গেলেন! উকিল পাকড়ালেন শম্পাদের। আমরা চারজন মোটামুটি একসঙ্গেই থাকি। তাই আমাদের একসঙ্গে ডেকে পাঠান , তারপর তদ্গতচিত্তে আমাকে তোল্লাই দেন। একটা সুবিধা হল অবশ্য। ঠিক সময়ে খাতাপত্তর না দেখালেও সাত খুন মাপ। আমার একার নয়। আমাদের চার জনের। এর মধ্যে পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার বই কিনেছি দুটো। “তুমি এলে সূর্যোদয় হয়” আর “আমিই কচ আমিই দেবযানী”। তা উনি একদিন একতলার করিডোরে আমাকে একা পেয়ে বললেন, "তুমি এলে সূর্যোদয় হয় "। আমি এত খারাপ, এত খারাপ..যে ফিক করে হেসে বললাম, "সংলাপও ধার করতে হয় স্যার ? এটা পূর্ণেন্দু পত্রীর কপিরাইট কিন্তু। "

ইস , কী অর্বাচীন আমি। তখনও সতেরো হয়নি। উনি কেমন সঘন প্রেম প্রেম চোখে চেয়ে আমাকে একটা খাম দিলেন। সত্যি বলতে কী, মনে খুব ফুর্তি হল। যা কলেবর, মনে হয় মস্ত বড় প্রেমপত্র। কিন্তু একা একা দেখার উপায় আছে ! বাকি তিন মূর্তি হামলে পড়েছে গন্ধ পেয়ে।

ব্যাজার মুখে খাম খুলে দেখি ...বেশি না ! সাড়ে সতেরো পাতা। উফ , কী নেই তাতে ! কোটেশনের বন্যা। শুরুই হয়েছে, "পুরানো জানিয়া চেয়ো না , চেয়ো না আমারে আধেক আঁখির কোণে ..." দিয়ে।

আমি খুব মন দিয়ে পড়ছি আর বানান ভুল গুনছি। ইস্কুলের নিয়ম। তিনটে বানান ভুলে এক নম্বর মাইনাস। পুরো চিঠিতে ন' নম্বর মাইনাস। সাড়ে আঠাশটা বানান ভুল। তাও শেষের দেড়টা গ্রেস দিয়েছি। আধখানা কেন ? কারণ একটা শব্দের বানানটা অপ্রচলিত।

শম্পা বলল , " শোন , উত্তর না হয় নাই দিলি , বুড়োমানুষের মনে বানান ভুল ধরিয়ে ব্যথা দিস না। তাছাড়া প্র্যাক্টিক্যাল কিন্তু হোম সেন্টার। মনে থাকে যেন। " তার মানে প্রেম নেই, কিন্তু প্রেম প্রেম ভাব করতে হবে। বিরক্তি দেখানো চলবে না। চল্লিশ নম্বর আছে প্র্যাকটিক্যালে আর কুড়ি ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টে। খুব চাপ!

এর মধ্যে অ্যানুয়েল পরীক্ষা হয়ে গেল। এবং আমার নম্বরের কোনো মা বাপ রইল না। মানে আমার মায়ের মতে যাচ্ছেতাই নম্বর হল। কেমিস্ট্রিতে ঝুড়ি ঝুড়ি কেয়ারলেস মিসটেক হল। হতচ্ছাড়া নাটা আমার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে কলার তুলে ঘুরতে লাগল আর কাকু জ্যেঠুরা বাবাকে ডেকে ডেকে খাতা দেখিয়ে চুকলি কাটতে লাগলেন , " ইস , দেখুন করুণাদা, টুকটুক কী বিশ্রী সব ভুল করেছে জানা জিনিসগুলো। এই যে ছেলেটি ..(মানে নাটা ) ...কী স্টেডি ! মনে হয় দারুণ রেজাল্ট করবে। "

আমার গায়ে জলবিছুটি। করাচ্ছি ভালো রেজাল্ট ! সব ক'টার নাকে যদি ঝামা না ঘষেছি ..তো নাম নেই আমার। বাড়িতে খুব নিগ্রহ। মা উঠতে বসতে "ভালো" ছেলেদের উদাহরণ দেয়। আমি জ্বলি। এর মধ্যে আবার অমিত এসে বলল, " বুঝলি প্রশান্ত বাবু (ওর অঙ্কের টিউটর ) বলেছেন মেয়েদের অঙ্কে মাথা কম ! "

সব মিলিয়ে ঘেঁটে আছি খুব। মেজাজ খারাপ থাকে সর্বক্ষণ। শেষে একদিন শম্পাকে বললাম, "চল , আজ দুপুরে সিনেমা দেখব। "

এদিকে তো ট্যাঁকখালির জমিদার আমরা ! চার জন। টিকিটের পয়সা পাব কোথায় ? শম্পা। এতদিন মিশনারী ইস্কুলে পড়েও পরকালের ভয় নেই ...হেসে বলল , "মা বিশ্বকোষ কেনার টাকা দিয়েছে। পকেটমার হয়ে যাবে আজ ! " আরে রাম রাম ! যীশুঠাকুর এই শিখিয়েছেন আমাদের ? এই মিথ্যে কথা বলতে ? কী আশ্চর্য ! আমাদের একটুও পাপবোধ জাগে না। আমরা দুনিয়া নস্যাত করে নুন শো তে "কলেজ গার্ল " -এর টিকিট কাটি। মিত্রা সিনেমায়। তাও আবার ব্ল্যাকে। বই কেনার পয়সায়।

এই পাপবোধ না থাকার বোধ ... এই অপাপবিদ্ধতা ...এর নাম যৌবনের ভোরবেলা"। আমরা তখন সপ্তদশী।

(১০)

এবার ফিরি একটু কলেজ রাজনীতিতে। সতেরো বছর বয়স খুব অন্যরকম বয়স একটা। চোখে পরকলা , কিন্তু সবটা রঙিন নয়। আমরা সাদা কাচে চোখ রেখে সত্যি চিনতে শিখছি একটু একটু করে আর রঙিন চশমা চেনাচ্ছে রোম্যান্টিকতা। দুইয়ে মিলেমিশে আছে বেশ। গলা জড়াজড়ি করে।

আগেই বলেছি, সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা সিঁটিয়ে থাকত। হোস্টেল চলত ছাত্র পরিষদের নির্দেশে। কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে যাদের, লেখাপড়া লাটে উঠেছে যাদের ..এক সময়ে তারাও রুখে দাঁড়ায়। এখানেও তাই হল। কিছু কিছু শিক্ষকের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল যাতে কলেজে নৈরাজ্য দূর হয়। ফলে তলে তলে ছেলেরা জোট বাঁধল। প্রথমে ওয়ান হোস্টেল। থানাকে ইনফর্ম করে আচমকা এক রাতে পনেরো-কুড়ি জন ছেলে দলবল সমেত রাজুকে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়ে ওয়ান হোস্টেলকে রাতারাতি ছাত্র পরিষদের কবলমুক্ত করে। তখন বাম -রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে। জ্যোতিবাবু এসেছেন। SA বুদ্ধি করে হাত মেলায় SFI -এর সঙ্গে। ফলে তাদের সংগঠন জোরদার হয়ে যায়।

এই ঘটনা , এই হোস্টেল ইভ্যাক্যুয়েশন ঘটেছিল এক শনিবার রাতে। সোমবার কলেজে দাবানলের মতো এই খবর ছড়িয়ে পড়ে। SA প্রথম সাফল্যের স্বাদ পায়। যদিও ওপরে ওপরে কোনও রাজনৈতিক রং ছিল না বলা হয় , আসলে কিন্তু এরা বেশিরভাগই ছিল উগ্র বামপন্থী। সেই মনে মনে "নকশালবাড়ি লাল সেলাম। "

পুরোনো নকশাল নেতারা আশা করতে লাগলেন যদি আবার ঘাঁটি গড়া যায়। তবে একটা কথা বলব। আমরা কিন্তু ভয় কাটিয়ে উঠে একটা সুস্থ পড়াশুনোর পরিবেশ ফিরে পেতে শুরু করলাম। রাজনীতি ছিল। কিন্তু ঐচ্ছিক। কোনো জোরজুলুমের জায়গা ছিল না আর।

পুলকদা , সুমিতাভদা , অম্লানদা (তার আবার এক প্রেমিকা ছিল , একেবারে তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা , চোখে চশমা , খুব ব্যক্তিত্ব ... যাকে দেখেই ওই কবিতাটা মনে আসত .."তুমি তো তেমন গৌরী নও ") --এরা ছক কষতে লাগল পরের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। যাতে ছাত্র পরিষদ আর ঢুকতে না পারে। আমাদের ক্লাসের অনেকেই এই সদিচ্ছার সামিল। আমরাও কিছুটা। পরোক্ষ সমর্থনে।

বিখ্যাত নকশাল ছাত্রনেতা আবীর চ্যাটার্জী সন্ধের পর কলেজ ক্যান্টিনে স্পেশাল স্ট্র্যাটেজি শেখানোর দায়িত্ব নিলেন। নির্বাচন এগিয়ে আসছে। মনোনয়ন পত্র দাখিল করবে SA। কিন্তু CP হুমকি দিচ্ছে লাশ ফেলে দেবার। বোমা , ছুরি , স্লোগান সব। CP চাইছে অ-দাদার ভাইকে ( অনুব্রত ) দাঁড় করাতে আমাদের ক্লাস থেকে। আর দাঁড়ানোর কথা নীপার ( নীপা পরবর্তীকালে এক রাজনীতিক ও মন্ত্রীর ঘরণী )। আবীর শিখিয়েছিলেন স্ট্র্যাটেজি কেমন হয়। বলেছিলেন, "অপোনেন্টকে অ্যাসেস করে আগে ডিফেন্স সাজাবে, তারপর অফেন্সে নজর দেবে। "

আমাদের ক্লাস মানে তো কচিকাঁচার দল। এখানে মাথা চিবিয়ে খেতে সুযোগ দেওয়া হবে না CP কে। প্রথমত জনপ্রিয় এবং ইমেজ ভালো..এমন প্রার্থী চাই আর দ্বিতীয়ত অনুব্রত আর নীপাকে আটকাতে হবে কনটেস্ট করা থেকে। ততদিনে CP কিছুটা বিভ্রান্ত , কিছুটা মাজা ভাঙা। তড়পানি বেশি, গুন্ডামিও ..কিন্তু SA -র কলজের ধক অনেক বেশি।

অনুব্রত মোটেই নিরীহ নয়। সেও যন্তর। কিন্তু কোথাও নিজের ইমেজ সচেতন। দলের চেয়ে ব্যক্তি নিজেকে খাতির করে বেশি। SA তে যারা আছে আমাদের ক্লাস থেকে..সকলেই অনুব্রতর ছোটবেলার সাথী। তারা বলল , "তুই দাঁড়াস না। তোরা কিন্তু জিততে পারবি না। হাওয়া ঘুরে গেছে। "

অনুব্রত বলেছিল, "জানি। হেরে গিয়ে কি খোরাক হব শালা ? আমি নমিনেশন ফাইল করব না। "

" কিন্তু অ-দাদা ?"

" ও আমি সামলে নেব। ভাবিস না। "

একটা ঝামেলা মিটল। কিন্তু নীপা ? আবীরদার স্ট্র্যাটেজি হল , মেয়েরা মায়ায় মরে। দুর্বল করে দাও। কেল্লা ফতে।

SA -র একটি ছেলে ছিল। আমাদের সহপাঠী। স্মার্ট , সুন্দর , চালাকচতুর। নীপার একটু দুর্বলতা ছিল তার ওপর। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হল, হালকা প্রেমের অভিনয় করে নীপার মন ঘুরিয়ে দিতে হবে। সে ট্রেনিং-ও হল। তারপর একদিন নিউ মার্কেট , ফিরপো , চিকেন ফ্রাই , সোনালী ফেনিল বীয়ার (তখনকার জমানায় মেয়েরা একা একা বীয়ার , জিন , ভদকা নিয়ে বসার সাহস পেত না। যেটুকু যা...আড়ালে আবডালে। নীপার খুব ইচ্ছে নিয়ম ভাঙার। এই ছেলেটি তাতে ইন্ধন দিল দলের নির্দেশে। তারপর ওই নিরিবিলিতে নীপাকে বলল, " তুই এই রাজনীতিতে থাকিস না প্লীজ। আমার এত চিন্তা হয় ! "

নীপা ভাসিয়ে দিল নমিনেশন পেপার। রোম্যান্টিকতার বেনোজলে। আমাদের ক্লাসের দুটো আসন নিশ্চিত হয়ে গেল।

অবশ্য যত অনায়াসে যত কম পরিসরে এই যুদ্ধের কথা লিখলাম, তত মসৃণ ছিল না যাত্রাপথ। SA -SFI জোট মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছিল পুলিশ প্রহরায়। ভোট হয়েছিল পুলিশ প্রহরায়। আমার মা ভয় পেয়েছিলেন। বলেছিলেন , "টুকটুক না হয় নাই গেল ভোট দিতে। যদি ঝামেলা হয়। " বাবা কঠিন কর্তৃত্বে বলেছিলেন, "ও না যাওয়া মানে SA -র একটা ভোট নষ্ট। যাই ঝামেলা হোক, ও যাবেই। "

গিয়েছিলাম। ভোট দিয়েছিলাম। CP কে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল তথাকথিত "অ-রাজনৈতিক" ছাত্র সংগঠন SA। আমাদের নতুন জেনারেল সেক্রেটারি হল পুলকদা।

আমরা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছিলাম। কলেজে ফিরে এসেছিল সুস্থ পরিবেশ। পড়াশুনোর , রাজনীতির, সংস্কৃতির।

(পরের অংশ)


লেখক পরিচিতঃ বিজ্ঞানের ছাত্রী । কিন্তু প্রথম ভালোবাসা সাহিত্য । তিন দশক ধরে ভাষান্তরের কাজে যুক্ত । বেশ কিছু অনূদিত বই প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্য আকাদেমি, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইত্যাদি বিখ্যাত সংস্থা থেকে । ভাষান্তরের পাশাপাশি নিজস্ব লেখালেখির ঝোঁক । তবে খুব নিয়মিত নয় । ভালোবাসেন টুকরো গদ্য, পদ্য লিখতে । নানা স্বাদের লেখা নিয়ে এবছর প্রকাশিত হয়েছে ওঁর আরেকটি বই 'ম্যাজিক লণ্ঠন'।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।