প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

বিবিধ প্রসঙ্গ - ব্যক্তিগত স্মৃতি -বিস্মৃতি 

অগাস্ট ৩০ , ২০১৫

 

নানা রঙের দিন

ঈশানী রায়চৌধুরী

(২৩)

(আগের অংশ) কলেজের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন অনেক শান্ত। সেই আতঙ্ক নেই আর। তবে আগে যেমন SA আর SFI একজোট ছিল, এখন বোধহয় SFI নিজের একটাidentity প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। সামনাসামনি বিরোধ নেই। তবু কোথাও একটা আলাদা জায়গা খোঁজা। নিজস্ব অস্তিত্ব। তবে এদের জনবল কম। ঠিকভরদুপুরে কিছু ছেলেমেয়ে কখনও কখনও জোট বেঁধে দু-চারটে স্লোগান ছুঁড়ে দেয়। আমরা কানেও তুলি না। আবার অবজ্ঞাও করি না। যে যার মত নিয়ে থাকুক| পড়াশুনোর পরিবেশ নষ্ট না হলেই হল।

তাপসবাবু। ফর্সা, ছোটখাটো, মাথাজোড়া টাক, চশমা পরা। ম্যাথেম্যাটিকাল ফিজিক্স পড়ান। আসেন সেই বরানগর থেকে। ভালোই পড়ান। যথেষ্ট ভালো।কিন্তু আমার কেন জানি না মনে হয়, ঠিক খুব সাধারণ মেধার ছেলেমেয়েদের জন্য নন। (আসলে বাবা আমার অভ্যেস খারাপ করে দিয়েছেন। এই একজনকেদেখেছি, ছাত্রছাত্রীর মেধার নিরিখে নিজের পড়ানোর স্টাইল বদলাতে। এই প্রসঙ্গে বলতে দ্বিধা নেই, নামী দামী শিক্ষকের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছেজীবনভর, কিন্তু আজও বাবাই আমার সেরা শিক্ষাগুরু )। তাপসবাবুর একটা সমস্যা হল, ভীষণ ভুলো লোক। এই প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প শুনেছিলাম ওঁর একবন্ধুর মুখ থেকে। একদিন তাপসবাবু গেছেন নিজের শ্বশুরবাড়ি। খুব দরকার। শ্যালককে নীচ থেকে চেঁচিয়ে ডাকবেন। ধরুন শ্যালকের নাম রমেন আরশ্বশুরমশাইয়ের নাম অবনী। তাপসবাবু কিন্তু স্রেফ ভুলে মেরে দিয়েছেন নামধাম। নীচ থেকে চেঁচাচ্ছেন, "অবনী, একবার নীচে নেমে আয় ..."

তাপসবাবু যখন ডাকছেন ক্লাসে এসে, "সুচরিতা, বল উত্তরটা ...", তখন কিন্তু সুচরিতার বদলে উত্তর দেবে রত্না বা মধুমিতা। বা উনি সারাজীবন হয়ত অঞ্জনকেপুলক বলে ভেবে নিয়েছেন...এইরকম আর কী ! তাপসবাবুর সবচেয়ে সমস্যা singular -plural নিয়ে। মানে অনেকগুলো child , কিন্তু একটিমাত্র children .আমাদের পড়াতেন টাকওয়েল অ্যান্ড ফুরানিক -এর বই থেকে।

আমরা তাই লিখেছিলাম,

Child না children জানতে না জানতে
বাসটা পৌঁছে যায় হেদুয়ার প্রান্তে
দ্যাখো চেয়ে আহা রে
টাক চলে বাহারে
টাকওয়েল -ফুরানিক বগলেতে রয়ে যায়
টুকটাক প্রবলেম অনায়াসে হয়ে যায়

সোমনাথবাবুকে নিয়েও আমরা ছড়া লিখেছিলাম। সোমনাথবাবু ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো। রাজ্যের গল্প করতেন। এমনকি পাশের বাড়ির সুরভিকে প্রেমকরে বিয়ে করার গল্পও। বাল্যপ্রেম। যে কোনো কারণেই হোক, আমাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা ছিল স্যার সুরভি বৌদিকে খুব ভয় পান। এই ধারণাটা বাজারেছড়িয়েছিল অরুণাভ-কল্লোল। ওদের নাকি স্যারের বাড়িতে গিয়ে এ কথাই মনে হয়েছে ! স্যারের খুব ঠান্ডা লাগার বাতিক। একটু শীত পড়ল কী পড়ল না,অমনি মেরুন বা সাদা পুলওভার, মাফলার। আর বোধহয় সাইনাসের অসুখ ছিল, খালি বলতেন, নাকের হাড় বেঁকে যাচ্ছে । আমাদের ইলেকট্রনিক্সে হাতেখড়িসোমনাথবাবুর কাছে। তাই লেখা হয়েছিল,

আবাল্য প্রেমিক তুমি, আমাদের প্রেরণা
হায়, তবু suitable প্রেমিকা তো এল না
নাকে হাড় বেঁকে যায়
ইতিউতি চোখ চায়
"সুরভি"ত গিন্নির ভয় তবু গেল না

হে প্রেমিক, হে সাধক..আজ থেকে শুরু হোক
ভালো করে op amp পড়ানো
বেশ তো হয়েছ বুড়ো
কারো মামু, কারো খুড়ো
শীত নেই ...তবু কেন মাফলার জড়ানো?

কয়েকটা নমুনা দিলাম মাত্র। আমরা সব মাস্টারমশাইকে নিয়েই ছড়া লিখেছিলাম। প্রতিটি নিখুঁত বর্ণনা। নামের উল্লেখ না থাকলেও যাতে চিনতে অসুবিধা না হয়। এখনও সব ছড়া খুঁজলে পাওয়া যাবে অঞ্জন মল্লিকের কাছে। আমাদের মুখস্থও আছে বেশ কিছু। এ সবই ছিল আমাদের নিজস্ব হাসাহাসির জায়গা।

যখন আমরা পার্ট টু পরীক্ষা দেব, আমাদের এক বছর জুনিয়র যারা, ফেয়ারওয়েল পার্টি দিয়েছিল আমাদের। ওরা উপহার দিয়েছিল ফুল, কার্ড ..এইসব। আমরা ওদের কাছে হস্তান্তর করেছিলাম এক অনবদ্য সাইক্লো করা পাণ্ডুলিপি। আমাদের ছড়াসমগ্র।

(২৪)

এবার বলি সুধীরবাবুর কথা। আমি কি সুধীরবাবুর প্রতি একটু পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট? নিশ্চয়ই। যে সব ছাত্রছাত্রী আমাদের সময়ে এই মানুষটির ব্যক্তিগতসাহচর্যে এসেছে, তারা অধিকাংশই মুক্তকন্ঠে বলবে, শিক্ষক হিসেবে এই মানুষটির কোনো তুলনা ছিল না। ধীর স্থির খর্বকায়, একটু হৃষ্টপুষ্টই বলা যেতে পারে,শ্যামবর্ণ , কাঁচা -পাকা একমাথা চুল আর শান্ত অথচ উজ্জ্বল দুটি চোখ। সারা বছর ধবধবে সাদা ধুতি আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। শীত পড়লে হয় তারসঙ্গে সাদা কাশ্মীরি শাল অথবা প্যান্ট -সাদা শার্ট -ব্রাউন পুলওভার। ঢাকার মানুষ। স্বাধীনতার হুজুগে জেল খেটেছিলেন। ফলে এক আধ বছর নষ্ট হয়েছিল।

এই মানুষটির কাছে আমি প্রাইভেটে পড়তাম। প্রতি বছর বন্যার মতো ছাত্রছাত্রীর ভীড় লেগে থাকত তাঁর কাছে পড়বে বলে। আমার বাবা বলেছিলেন, "আপনি কিন্তু সম্মান দক্ষিণা নেবেন।" সুধীরবাবু নারাজ। বাবার সহকর্মী। আমাকে ছোট থেকে দেখছেন। এদিকে বাবাও ছাড়বেন না। তখন যে দক্ষিণা স্থির হয়, তা নেহাত নামমাত্র। আমার উল্লেখ করতেই লজ্জা করছে। এই একজোড়া গোপালের গেঞ্জির দাম !

সুধীরবাবু আমাকে পড়াতে আসতেন হেঁটে। সুকিয়া স্ট্রিট থেকে কাঁকুড়গাছি। বলতেন, "গরীব ঘরের ছেলে আমি। মাইলের পর মাইল পেটে খিদে নিয়ে হেঁটেছি। এ আর এমন কী !" এই হেঁটে আসাটা ঐচ্ছিক। আসতেন রাত আটটায়। ফিরে যাওয়ার সময়ে হেঁটে যাওয়া বাধ্যতামূলক। কারণ বাস বন্ধ হয়ে যেত। আমার বাড়ি থেকে স্যার বেরোতেন রাত সাড়ে এগারোটায়। সপ্তাহে দু- থেকে তিন দিন। এবং এক দিন দু -দিন নয়। তিন তিনটে বছর।

আরও একটা কথা আজ বলেই ফেলি। সুধীরবাবুকে আমি বলেছিলাম, "এই যে আমি আপনার কাছে পড়ছি, আমার ব্যাচে আমি একেবারে একা থাকব। এটা একটা রেকর্ড হোক, যে এই তিন বছর আমার ব্যাচে আমি ছাড়া কোনো একটি ছেলে বা মেয়েও আপনার কাছে প্র্রাইভেট টিউশন নিচ্ছে না। আমার কলেজেরই শুধু নয়, বাইরের কলেজেরও। " সুধীরবাবু বলেছিলেন, "তাই হবে। কারণ তুমি আমার একমাত্র ছাত্রী, যে প্রথম দিনই বলেছ, 'কোনো নোট চাই না । আপনি আমাকে বুঝিয়ে দেবেন। নোট আমি নিজে বানাবো। আপনি সংশোধন করে দেবেন।' ভালোই হল, এই এক বছর আমিও একটু বিশ্রাম নেব।" সত্যিই স্যার আমার ব্যাচের আর একটি ছেলেমেয়েকেও প্রাইভেটে পড়াননি। আমার বাবা খুব রাগ করেছিলেন। তখন শিক্ষকদের বেতন তো তেমন ছিল না। আর সুধীরবাবু ছিলেন জনপ্রিয়তম শিক্ষক। উনি তখন বাবাকে বলেছিলেন, "এটা আমার আর টুকটুকের বোঝাপড়া। আপনি আর এর মধ্যে ঢুকবেন না। "

সুধীরবাবু শুধুই কি আমার শিক্ষক ছিলেন? ফিজিক্স পড়িয়েছেন? না। আমার একমাত্র ভরসার জায়গা ছিলেন...যাঁকে আমি অনায়াসে সব কিছু বলতে পারি। এমনকি যে কথা বাড়িতে বা বন্ধুদেরও বলতে পারি না। শুধু জন্মদাতাই পিতা হন না। শিক্ষাগুরুও পিতাই। তাঁকে "পিতৃপ্রতিম" আখ্যা দিলে আমি নিজেই নিজের কাছে বড় ছোট হয়ে যাব।

আমি যখন থার্ড ইয়ারে উঠি, নতুন সিলেবাসে স্ট্যাটিসটিকাল আর কোয়ান্টাম মেকানিক্স এল। আমরাই প্রথম ব্যাচ। কলেজে পড়াবেন তাপসবাবু আর অশোকবাবু। তাঁরা নিজেরা তৈরী হয়ে পড়াবেন। কারণ নতুন টপিক। আমাকে বাড়িতে গাইড করবেন কে? সুধীরবাবু বললেন, " আমি তো এটা পড়াতে পারবনা তোমাকে। কিন্তু গাইড না করলে তোমার রেজাল্ট ভালো হবে না। একটা গোটা পেপার। একশ' নম্বর।"
আমি জেদ করে বললাম, " আপনি আর আমি দুজন মিলে তৈরী করে নেব। তাতে যা হবে, তাই। আমি অন্য কারো কাছে যাব না।"
সুধীরবাবু বললেন , " অরূপ পড়াবে তোমাকে। ও আমার ছাত্র। এই তোআমাদের কলেজেই জয়েন করেছে। ওকে বলেছি। এ পাড়াতেই থাকে। তবে পয়সাকড়ির ব্যাপার নেই। তাহলে কিন্তু ও খুব রেগে যাবে। তুমি অমত কোরো না।কারণ রেজাল্ট ভালো করার জন্য এটা খুব জরুরী। "
অরূপদার কথায় আসব পরে। তার আগে বলা দরকার, আমার রেজাল্ট নিয়ে সুধীরবাবুর এই দুশ্চিন্তা কেন।

আমরা যখন দু-বছর পড়ার পর পার্ট ওয়ান দেব, আমাদের পরীক্ষা হবে মোট ১০০০ নম্বরে। তার মধ্যে ৪০০ নম্বর অনার্স -এর। তিনটে থিওরি পেপার ১০০ করে, একটা প্র্যাক্টিক্যাল ১০০। আর পাস কোর্সের দুটো সাবজেক্ট। অঙ্ক তিনটে পেপার ..প্রতিটা ১০০ করে।আর কেমিস্ট্রি ৩০০ নম্বর ..দুটো থিওরি, একটা প্র্যাক্টিক্যাল। আমরা ষোলো জন। যথেষ্ট ভালোভাবে কলেজে আমাদের তৈরী করা হয়েছে পরীক্ষার জন্য। স্কটিশ চার্চের ফিজিক্স ল্যাব যথেষ্ট ভালো। অধ্যাপক অনিল সেনের নিজের হাতে তৈরী। শুধু তৈরীই নয়, অবসর নিয়ে চলে যাবার আগে উত্তরসূরী অধ্যাপকদের তালিম দিয়ে রাখা। এই ল্যাবের বেয়ারারাও এক্সপেরিমেন্টাল স্কিলে যে কোনও বাইরের কলেজের মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

আমাদের সব অনার্স থিওরি পেপারগুলোর সীট পড়েছে সংস্কৃত কলেজে, পাস থিওরি সব বেথুন কলেজে (মেয়েদের কথা বলছি, ছেলেদের পাস বা অনার্স থিওরি কোন কলেজে সীট পড়েছিল..মনে নেই) আর পাস প্র্যাক্টিক্যাল তো হোম সেন্টার। আর দুর্ভাগ্যবশত অনার্স প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার সীট পড়ল প্রেসিডেন্সি কলেজে।

(২৫)

আমাদের ব্যাচে আমরা কেউই খুব একটা খারাপ ছিলাম না পড়াশুনোতে। মোটামুটি খেটেখুটে নিজেদের তৈরীও করেছিলাম। অনার্স থিওরি পরীক্ষার প্রথম পেপারের প্রশ্ন খুব কঠিন হয়েছে। কারো পরীক্ষাই ভালো হয়নি। পরীক্ষা দিয়ে মনে হল, এই পেপারে ফার্স্ট ক্লাস নম্বর পাওয়া অসম্ভব। আমাদের সময়ে কিন্তু এত ফার্স্ট ক্লাসের ছড়াছড়ি ছিল না। মোটামুটি ৬০ শতাংশ নম্বর তুলতে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হত।

দ্বিতীয় পেপারের দিন আমার চরম দুর্দিন এল। একটা ডিডাকশন আটকে গেল মাঝপথে। তার মানে ছাঁকা ২০ নম্বর। এখনও মনে আছে। Resonant frequency of Helmholtz resonator . একটা সহজ, জানা প্রশ্ন...বাড়িতে অজস্রবার সলভ করা ..যখন পরীক্ষার হলে আটকে যায়...আমি কিছুতেই ভুলটা কোথায় ধরতেই পারছি না, এমনকি যাতে আমি একেবারে সিদ্ধ ছিলাম...লাস্ট স্টেপে উত্তর জানা আছে, সেখান থেকে ব্যাক করে করে ফার্স্ট স্টেপে আসা..সেই ক্ষমতাও কাজ করছে না ...জলের মতো সময় বেরিয়ে যাচ্ছে ... আমি আঠার মতো চিপকে আছি ওই না-পারা প্রশ্নের উত্তরে ... সে যে কী দু:স্বপ্ন !

যাই হোক, কোনোরকমে বাকি ৮০ নম্বর উত্তর করে বেরিয়ে এলাম। এসেই বাবাকে বললাম, "আমি ড্রপ দেব। কারণ আমি ২০ নম্বর ছেড়ে এসেছি। " বাবা কঠিন গলায় বললেন, "তুমি ড্রপ দিতেই পারো। তবে যদি এবার ড্রপ দাও, I will see to it that you are dropped forever. তুমি আর পড়াশুনো করবে না। ওই হায়ার সেকেন্ডারী পাস হয়েই থাকবে।" আমার চোখ ভ'রে গেছে জলে। কী হয় একবার ড্রপ দিলে? ওদিক থেকে কেমিস্ট্রি অনার্সের মেয়েরা দাঁত দার করে এসে বলছে বাবাকে, "খুব ভালো পরীক্ষা দিলাম স্যার।" দু:খে আমার বুকটা চৌচির হয়ে যাচ্ছে ! আজ কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়লে আমারও খুব ভালো পরীক্ষা হত। আর এখানে যে কী হবে!

বাবা ফেরার পথে বলেছিলেন, "বাকি ৮০ নম্বর লিখেছ?" - হ্যাঁ -- তুমি কি ভাবছ, এই যে ওরা কেমিস্ট্রি পেপার দিয়ে বেরোলো, ওদের দারুণ পরীক্ষা হয়েছে?
-- সে তো হয়েইছে ! ওরা বলল তো !
-- ছাত্রছাত্রীদের অ্যাসেসমেন্ট করেন মাস্টারমশাইরা। এদের মধ্যে একজনেরও ফার্স্ট ক্লাস নম্বর থাকবে না। আর যদি আমার খুব ভুল না হয়, মাত্র ৮০ নম্বর উত্তর করেছ বটে, তোমার এ পেপারে ফার্স্ট ক্লাস নম্বর থেকে যাবে। কাজেই আমার কথায় ভরসা রেখে থার্ড পেপারটা ভালো করে দিয়ে দাও।

তৃতীয় দিনের পরীক্ষাটা সত্যিই ভালো হল। মনে হল বাবার কথাটা কোনোক্রমে ফলে গেলেও এই পেপারে অন্তত ৭০ পাবই। প্র্যাক্টিক্যাল খারাপ হওয়ার চান্স নেই আমাদের কারোরই। তখনও বুঝিইনি, আমাদের কপালে কী দুর্ভোগ রয়েছে !

অনার্স পরীক্ষার গল্পটা আগে করি। দু:খকথা। পাস পরীক্ষার মজার গল্প পরের পর্বে করব। প্রেসিডেন্সি কলেজে পরীক্ষা। ইন্টারনাল একজামিনার দেবু মিত্র (নামটা মনে আছে, কারণ তারপরের এক বছর আমরা ওঁর মুণ্ডপাত না করে জল খাইনি)। এক্সটার্নাল এসেছিলেন গোবরডাঙা কলেজ থেকে। তিনি মানুষ ভালো। নিরীহ। নাম মনে নেই।

দুটো করে এক্সপেরিমেন্ট। একটা ইলেকট্রিক্যাল, একটা নন -ইলেকট্রিক্যাল। মনে আছে, আমার ছিল কপার -কনস্টানটান থার্মোকাপল -এর ওপর একটা এক্সপেরিমেন্ট আর অন্যটা থার্মাল কন্ডাকটিভিটি অফ রাবার বাই লী'জ -কার্লটন মেথড। দুটি বহুবার করা। প্রত্যেকে আমরা এ সব কাজ গুলে খেয়েছি।

পাওয়ার কাট হল। আমাদের হাতে একটা করে লিকলিকে মোমবাতি। ওই দিয়ে কাজ কর। আলো নেই, গ্রাফ আঁকা যাচ্ছে না। বাড়তি সময় দেবে না এরা। একটার জায়গায় লাগলে এক্সট্রা গ্রাফ পেপার দেবে না। Galvano meter -এর কাঁটা তুবড়ে গেছে। Deflection বুঝতে পারছি না আমরা। দেবু মিত্র কী জঘন্য ব্যবহার করছেন ! সমানে বলছেন, সব থার্ড ক্লাস কলেজের ছেলেমেয়েরা এসেছে। ভাইভা নিচ্ছেন যা, তাতে relevant প্রশ্নই নেই কোনো... আমরা বুঝতে পারছি...আমাদের কী ভীষণভাবে penalize করা হচ্ছে। এক্সটার্নাল বলছেন, " দেবুবাবু, এ রকম করাটা কি ঠিক হচ্ছে?" দেবু মিত্র নির্বিকার। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে যাতে একটাও ফার্স্ট ক্লাস না পায়, সে ইজারা উনি নিজেই নিজের দায়িত্বে নিয়ে নিয়েছেন। আমরা পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে বুঝতে পারলাম কালান্তক যম দেবু মিত্র একাই আমাদের ষোলোজনকে রৌরব দেখানোর পুণ্যকর্মটি মাথায় তুলে নিয়েছেন। সোৎসাহে।

(২৬)

পাস কোর্সের পরীক্ষা নিয়ে আমার খুব একটা দুশ্চিন্তা ছিল না। মায়ের দৌলতে অঙ্কে ভিতটা মোটামুটি মন্দ ছিল না। আর কেমিস্ট্রি আমার ভালো লাগার বিষয়।

এই অঙ্ক পরীক্ষার কথা যতবার মনে পড়ে , খুব মনে পড়ে যায় আমার স্কুলের বন্ধু সুতপার কথা। সুতপা যদিও ফিলোজফি অনার্স পড়ত , অঙ্কে ভালো ছিল। অর একটা পাস সাবজেক্ট ছিল অঙ্ক। আমার খুব বন্ধু ছিল স্কুলে পড়ার সময়ে। গোয়াবাগানে ওদের বাড়িতে বহুবার গেছি। দুই পরিবারের মধ্যেও যাতায়াত ছিল। সুতপারও সীট পড়েছে একই কলেজে। প্রথম দিন আমাদের অঙ্কের দু-পেপার পরীক্ষা। পরের দিন সকালে থার্ড পেপার। প্রথম দিন মাঝখানে একটা থেকে দুটো ..দুপুরের লাঞ্চ ব্রেক। প্রথম পেপার পরীক্ষা হয়ে গেছে। আমরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে টিফিন খাচ্ছি। মুমূর্ষু রোগীকে অক্সিজেন দেওয়ার মতো আমাদের নাকে মুখে গোঁজা সেকেন্ড পেপারের অঙ্ক খাতা বা বই। দেখি, সুতপা হাসিমুখে ওর বাবার সঙ্গে পরীক্ষা দিতে ঢুকছে। ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা দিতে! ভুল রুটিন টুকেছিল। ওর ধারণা, প্রথম দিন সেকেন্ড হাফে ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা , আর পরের দিন সেকেন্ড আর থার্ড পেপার পরীক্ষা। আমাদের টিফিন খেতে দেখে এক নিমেষে যখন ও বুঝল , ওর একশ' নম্বর পরীক্ষাই শুধু বাদ যায়নি, ওকে এখন ফার্স্ট পেপারের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসে সেকেন্ড পেপার পরীক্ষা দিতে হবে! আমি আজও ওর ওই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা , তারপর সেটা ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া হতাশায় , দু:খে, ভয়ে.... চোখ বুজলেই যেন ছবির মতো দেখতে পাই। আমি নিজে ওর জায়গায় থাকলে নিশ্চিতভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তাম শকে। পরীক্ষা দেওয়া তো দূরের কথা! সুতপা কিন্তু পরীক্ষা দিয়েছিল!

অঙ্ক পরীক্ষা তিনটে পেপারই মোটামুটি ভালোয় ভালোয় উতরে গেল।

কেমিস্ট্রি পরীক্ষা। এমনিতেই যারা ফিজিক্স আর অঙ্ক অনার্স, তারা কেমিস্ট্রিতে খুব একটা সুবিধেজনক অবস্থায় থাকে না। ফিজিক্সের ছেলেপুলেরা তবুও ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রিতে কোনোমতে তরে যায়। কিন্তু অর্গ্যানিক, ইনঅর্গ্যানিক আর ইন্ডাসট্রিয়াল কেমিস্ট্রিতে ফিজিক্স আর অঙ্ক অনার্স ..দু -দলেরই বিপুল ব্যথা। আর থিওরি দু-পেপারে এই চারটে সেকশন ..প্রতিটিতেই ৫০ নম্বর করে।

এই প্রসঙ্গ এই কারণেই তোলা , অঙ্ক অনার্সের কী হাল পাস সাবজেক্টে ছিল, তার একটা ছোট্ট নমুনা দেবার জন্য। আমার সীট পড়েছে ফার্স্ট বেঞ্চে। আমার পেছনে অঙ্ক অনার্স।

অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রি। পাস কোর্সের ফার্স্ট পেপারের ফার্স্ট সেকশন। প্রথম প্রশ্ন : ল্যাবোরেটোরি প্রিপারেশন অফ মিথাইল ম্যাগনেশিয়াম আয়োডাইড। অঙ্ক অনার্স আমাকে খোঁচা মেরে বলল , "হ্যাঁরে ঈশানী , ড্রপিং ফানেলে কি ম্যাগনেশিয়াম টার্নিংস দেব? মানে আমি মোটামুটি জানি যে এটাই প্রসেস।"
আমি বলেছিলাম , " তুই দিয়ে দে। কোনোমতে যদি ঠেলেঠুলে ড্রপিং ফানেলের ভেতর দিয়ে ফ্লাস্কের ভেতরে পৌঁছয় , নিশ্চয়ই রি - অ্যাকশন হবে।"

এটা একটা উদাহরণ মাত্র। এমন আরও গল্প আছে। কেমিস্ট্রি প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা। অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রিতে স্যাম্পল পেয়েছে একজন। ভ্যানিলিন। হালকা লেমন ইয়েলো ক্রিস্টাল।
-- মালটা কী রে?
শুঁকলেই হালকা ভ্যানিলার গন্ধ।
-- এটা তো ভ্যানিলিন।
-- সেটা কী গুরু? ভ্যানিলায় অ্যানিলিন?
অবস্থাটা বুঝুন!

এইসব ছেলেপুলেদের যখন হোম সেন্টারে সীট পড়ে পাস প্র্যাকটিক্যালে , তখন ল্যাবে যে টেস্ট সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় , তা হল "কয়েন টেস্ট "। এটা সব কলেজেই হয়। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক। তার মানে হল, বেয়ারাদের টাকা দিয়ে হাত করা। ওরা হেল্প করবে ডিটেকশনে বা এসটিমেশনে। এক এক টেস্টের জন্য এক এক রকম চার্জ। আমার আর অরুণাভর ডিসকাউন্ট। কারণ আমার বাবা আর ওর মামু ওই ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক। সত্যি কথা স্বীকার করি, আমি আগে থেকে জেনে নিইনি বটে, কিন্তু খাতা লেখার আগে কনফার্ম করে নিয়েছিলাম ঠিকঠাক অ্যানালিসিস করেছি কিনা। তবে আগে থেকে সাহায্য নিইনি। আর কাজটা ঠিকই করেছিলাম, তাই পয়সা লাগেনি।

এই পরীক্ষার স্মৃতিতে আরও একটা স্মৃতি মিশে আছে। পার্ট ওয়ান অনার্স প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা দিয়ে এবং দারুণ মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। সেই তারিখ ছিল ১৮ ই অগাস্ট , ১৯৮০। তারিখটা অনেক অন্ধকার মেখে বুকের মধ্যে লুকোনো আছে। কারণ ... মনে আছে , বাড়ি ফিরে চায়ের পেয়ালা নিয়ে আর একরাশ মন খারাপ সম্বল করে বসে টিভি খুলেছি। সাদা -কালো টিভি। স্ক্রীন জুড়ে আঁধার নেমে এল। চলে গেছেন আমার প্রিয়তম রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস। টিভির পর্দা জুড়ে তাঁর নিথর শরীর , অজস্র মানুষের ঢল....আমি তো জানতামই না! এভাবে বুঝি জানান না দিয়ে চলে যেতে হয়?

বাইরে সে এক বিষণ্ণ বিকেল। সে এক কেমন যেন অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার কষ্ট! আমার হয়ত পার্ট ওয়ানে ভালো রেজাল্ট হবে না! যাঁর গান আবাল্য আমার অনেক অনেক একলা থাকার মুহূর্তে নিত্য সঙ্গী ছিল ...তিনি চলে যাচ্ছেন বহুদূর .... আমার সমস্ত চেতনা জুড়ে অজস্র ভাঙচুর , ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি ...বাইরে অল্প অল্প মেঘ...

গোধূলিগগনে তারারা ঢেকে যাচ্ছিল গোপন কান্নার জমাট মেঘে।

(২৭ )

পরীক্ষা শেষ হল। আমার দুশ্চিন্তা বাড়ল। রাতে ঘুম নেই। মনে হচ্ছে , পার্ট ওয়ানে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাসটা থাকবে না। আমার সত্যি সারা জীবন বকুনি আর মুখঝামটা খাওয়ার কপাল! এদিকে ঘাড়ের ওপর পুজো এসে গেল। পাড়ার পুজো আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। এবার তাতেও কেমন দম বন্ধ ভাব। পুজোয় বাজার করার কথা মুখেও আনছি না। মা গিয়ে দেখি একটা দক্ষিণী সিল্ক কিনে এনেছেন। আমার জন্য। আমার প্রথমে এই এত দামী শাড়ি হল। কিন্তু পরব কোন মুখে? যা পরীক্ষা দিয়েছি! শাড়িটা সিলভার অ্যাশ রং , পোড়া লাল আর সোনালী জরির পাড় আর আঁচল। রোজ একবার করে প্যাকেট খুলে হাত বোলাই আর দীর্ঘনি:শ্বাস ফেলি।

কল্লোল আর অরুণাভ গেছে বেড়াতে। দার্জিলিং। ওখানে খুবসে হট চকোলেট আর হ্যাম স্যান্ডউইচ খাচ্ছে , বিন্দাস বেড়াচ্ছে আর আমাকে ইনল্যান্ড লেটার ভর্তি করে করে তার বর্ণনা পাঠাচ্ছে। সম্বোধন করছে "পিয়সহি"! এটা অবিশ্যি অরুণাভ। শরদিন্দুর খুব ভক্ত আমরা দুজনেই। কল্লোল লেখে স্রেফ "টুকটুক "| সব মিলিয়ে সুখ নেই কো মনে। গায়ে আমার জলবিছুটি! ওদের দ্যাখো কোনো চিন্তাই নেই! তার মানে কি আমার একার পরীক্ষাই সবচেয়ে খারাপ হল? তাহলে তো ঘরে-বাইরে নিগ্রহের আর বাকি থাকবে না!

ইশ , আমি যদি ছেলে হতাম , ওদের সঙ্গে তো আমিও যেতে পারতাম! তা তো হবার নয়! পদে পদে বিধিনিষেধ। বিশেষ করে ঠাকুমার। সারাক্ষণ "গেল গেল " ভাব। ভালো লাগে না আর! এরচেয়ে ছাই মাধ্যমিকের রেজাল্ট বিচ্ছিরি হলে আপদ চুকত। বিয়ে টিয়ে হয়ে যেত। কোনো টেনশনের সীন ছিল না!

ছোট থেকে "মেয়েদের এটা করতে নেই, ওটা করতে নেই, লক্ষ্মী হতে হয় , এরপর পরের ঘরে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তি..." শুনে শুনে কান পচে গেছে আমার। এদিকে আবার এদিক নেই, ওদিক আছে। রেজাল্টটি ভালো চাই! কিন্তু দিনের শেষে তুমি যত বিদ্যেধরীই হও, যতই নিজের পায়ে দাঁড়াও...তুমি মেয়ে! তাই তোমাকে "মানুষ" বলে ঘোষণা করার আগে একটা "মেয়ে "-র তকমা লাগাতেই হবে! তুমি "মেয়েমানুষ "! ছেলেরা বিয়ে করে। মেয়েদের বিয়ে হয়। তাই ঠাকুমা মাঝেমাঝে বলেন, "টুকটুকের যখন বিয়ে হবে..."| "টুকটুক যখন বিয়ে করবে..." ওটা নিষিদ্ধ বাক্যবন্ধ। ওটা আমি নিজের মনে মনে ফিসফিস করে উচ্চারণ করি। যতবার, যতবার আমার বিয়ে হবার কথা ওঠে। আমার অগণিত স্বঘোষিত আর অঘোষিত অভিভাবকের শুভচিন্তার চাপে হাঁপিয়ে উঠি।

Why can’t they leave me alone?

আমার অবস্থা এমন সঙ্গীন যে মনে হয় অষ্টপ্রহর চোখ কান বন্ধ করে রাখি। যত চেষ্টা করিপরীক্ষার কথা ভুলে থাকতে, তত তা বত্রিশ পাটি দাঁত বার করে গায়ে এলিয়ে পড়ে।

মণ্ডপে প্রতিমা। বোধন হয়ে গেল। সপ্তমী ফুরোলো। অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিয়ে পাড়ার বন্ধুদেরসঙ্গে গল্প করছি...কে যেন বলল, " আজ সন্ধেবেলা তাহলে আমাদের এবারের বেস্ট শাড়িটা সবাইপরি , চল। কালকের জন্য আর ফেলে রেখে কী হবে?" সত্যিই তো! অষ্টমী মানে তো মাঝপথেপৌঁছেই গেছে পুজো। আজেবাজে চিন্তা করে করে শাড়িটা আমার আর পরাই হবে না।

অন্য কে যেন বলল, "চল না, সিটিজেন, পূর্ব কলিকাতা , বিবেকানন্দ আর আইডিয়াল কো-অপারেটিভের ঠাকুর দেখে আসি। দুপুরের ভোগ খেতে তো দেরী আছে। "

আইডিয়ালে ঢুকেছি। এখানেই অরূপ রায়ের ফ্ল্যাট। বেশ হাসি হাসি মুখে ঠাকুর দেখছি, আমার কানের কাছে কে যেন বললেন , "আর সাজগোজ করে ঘুরতে হবে না। বাড়ি যাও। প্র্যাকটিক্যালে যা নম্বর হয়েছে তোমাদের, তা না বলাই ভালো। "
--আমি কত পেয়েছি?
-- সে আর জেনে কী হবে? সকলের অবস্থাই এক! না , খবরদার চোখে জল যেন না দেখি।কান্নাকাটি বাড়ি গিয়ে। বিকেলে কি নতুন শাড়ি পড়ে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান ছিল নাকি?

আর ঘুরতে যাওয়া! আর নতুন দক্ষিণী সিল্ক! আমার যা নম্বর হয়েছে, তার সঙ্গে ফার্স্ট পেপারথিওরি ভালো হয়নি, সেকেন্ড পেপারে একটা প্রশ্ন আটকে গেছে...কত নম্বর কম পড়বে ফার্স্ট ক্লাসথেকে , কে জানে!
চোখের জলে পথঘাট ঝাপসা। আমি বাড়ির পথে। এইটুকুনি পথ..যেন ফুরোয় না! মুহূর্মুহূ ঠোক্কর খাচ্ছি ইঁটে। চশমা পরি, কী ভাগ্যিস! তাই মাথা নীচু করে চললে রাস্তার লোক কিছু বুঝতেই পারছে না।
বাড়ি ফিরে আছড়ে পড়েছিলাম বিছানায়। আমি তখন inconsolable। অবস্থা দেখে বাড়িরলোকও চুপ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল ফুরিয়ে সন্ধে। নীচে ঢাকের বাদ্যি , আলোর ফুল। সবাই নতুন শাড়িতে , জামাতে। আমি অন্ধকার ঘরে, অন্ধকার মুখে। চুল বাঁধিনি, চোখ মুখ ফুলে লাল।পুরোনো একটা পোশাকে।
দরজায় ঘন্টি বাজল। অরূপদা। মা দরজা খুলেছেন।
-- কী বৌদি , খুব কান্নাকাটি করেছে নাকি? নীচে রয়েছে সবাই। ও যায়নি?
-- আর নীচে! সারাদিন যা গেছে বাড়িতে! ইস, অরূপ, তুমি আজকের দিনে না বললেই পারতে ওকে। না হয় পুজোর পরেই দিতে খবরটা। মেয়েটা এত শখের শাড়িটাও পরবে না বলেছে।
--পরে বললে কী হত? নম্বর বেড়ে যেত?
--আহা, তা কেন! বাকি ছেলেমেয়েরাও তো খারাপই করেছে। তারা তো জানেও না। তাইবলছিলাম ...
-- তারা আর ও এক নয় বৌদি। আমি ইচ্ছে করেই বলেছি। এই ঝটকাটা ওর দরকার। এই কষ্টটাও। এই আজকের দিনটা আজকের দু:খটা ওকে অনেক শক্ত করবে। ওর জেদ বাড়িয়ে দেবে। আরও একটা কথা বলতে এলাম। ওকে পড়াতে শুরু করব আমি। সুধীরবাবু যেমন নির্দেশ দিয়েছেন।একাদশীর দিন থেকেই। কই , ওকে ডাকুন!

(২৮)

পুজো পেরিয়ে রেজাল্ট বেরোবে। আমি তখন কেমন একটা হাল ছাড়া অবস্থার শিকার। পার্টওয়ান অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস মিস তো করব নিশ্চিত। কিন্তু কত নম্বর কম পড়বে, সেটাই বুঝতেপারছি না। এদিকে পার্ট ওয়ান বি. কমের রেজাল্ট বেরোলো আমাদের আগে। তখন তো ছাপানোগেজেট বেরোত। এখনকার মতো আন্তর্জালের ব্যাপার স্যাপার ছিল না। আমরা ওই ডাইনোসরপ্রজাতি। বাবর -আকবরের সঙ্গে বিকেলের চা সিঙারা খেতাম।

গেজেট দেখে আমাদের চোখ ছানাবড়া। যেহেতু পাস কোর্সের পুরো ছ-শ' নম্বর পার্ট ওয়ানে ক্লীয়ার করার ব্যবস্থা, সঙ্গে অনার্সের চার-শ' নিয়ে পুরো হাজার , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবার থেকে পার্টওয়ান রেসালতে "ডিভিশন" দেওয়া চালু করেছে। এই হাজার নম্বরে পাস -অনার্স মিলিয়ে মোটদশটা পেপারে যারা শতকরা ষাট শতাংশ বা তার ওপরে নম্বর পাবে, তারা ফার্স্ট ডিভিশন। বাকিচল্লিশ থেকে ষাট শতাংশের মধ্যে থাকলে সেকেন্ড ডিভিশন। তার নীচে "পি" ডিভিশন। আর এইনতুন নিয়ম আমরা জানতে পারলাম কবে? না যেদিন বি.কম পার্ট ওয়ানের রেজাল্ট বেরোলো!বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা তো পাস কোর্স কোনক্রমে পাস করে গেলেই বাঁচে।

এক শুক্রবার বিকেলে আমাদের রেজাল্ট বেরোলো। কেমিস্ট্রি আর অঙ্ক আমার মুখরক্ষা করল। ফার্স্ট ক্লাস পার্ট ওয়ান অনার্সে মিস করে যাব, জানি..কিন্তু ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে গেলাম ওই হাজার নম্বরে। বেশ অনেকখানি মার্জিন নিয়ে। কলেজে আমি একাই। সব সাবজেক্ট মিলিয়ে। যেহেতুআগে থেকে ঘোষণা করা হয়নি, তাই সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিভাগ মিলিয়ে অনার্সেরছাতছাত্রীদের মধ্যে এমন বেড়ালে ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজনের।

আমার পক্ষে মন্দের ভালো। একেবারে কিছুই না হবার কথা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরখামখেয়াল আমাকে ভরাডুবির হাত থেকে তো বাঁচাল। অন্তত সাময়িকভাবে।

আমরা কলেজের সামনে সবাই ঠেলাঠেলি করে গেজেট দেখছি , অলক বলল, " এ: , এই ঈশানীটাকে ছাল ছাড়িয়ে রোদ্দুরে শুকিয়ে মাইরি ওই পোলে ঝুলিয়ে দে! কুলের কলঙ্ক! ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে! ছি ছি , হংসোমধ্যে বকো যথা আর কাকে বলে! আমাদের মানইজ্জত আর রইলনা! "
সবাই হ্যা হ্যা হি হি করে উঠল। আমার মেঘলা চোখে এই প্রথম অনেক অনেক দিন পর এক চিলতেরোদ্দুর ঝিলিক দিয়ে গেল।

পরের সোমবার মার্কশীট এল কলেজে। যা ভয় করেছিলাম , তাই। আমার তিন নম্বর শর্ট হয়েছে। পার্ট ওয়ানে সেই মিস হয়ে গেল ফার্স্ট ক্লাসটা। দুজনের আছে মাত্র। অলক আর অরুণাভ। যদিও নম্বরের নিরিখে আহামরি কিছু নয়, তবু..ওরা পেরেছে। আমি পারিনি। দিনের শেষে...এটাই শেষ কথা।

সন্ধেবেলা অরূপদা এলেন আমাদের বাড়ি।
--কী , মন খারাপ?
আশ্চর্য! মন ভালো হবার কথা নাকি? এই লোকটা আমাকে দেখছি শান্তি দেবে না! সুধীরবাবু যে কী করলেন! আবার মিটমিট করে হাসছে দ্যাখো! আমি গোঁজ হয়ে বসে আছি।
-- তিনটে নম্বর শর্ট হয়েছে বলে কি শয্যা নিলে নাকি? আমার বাইশ নম্বর শর্ট ছিল। তবে তোমার মতো কেঁদে ভাসাইনি। আমি জানতাম , আমি পারব। আমাকে পারতেই হবে। পেরেছিলাম। পার্ট টু -তে ঊনত্রিশ নম্বর বেশি পেয়েছিলাম। ওই বাইশ মেক-আপ হয়ে গিয়েছিল।
আমি মুখ তুলে বললাম, "আপনার হাতে এগুলো কী?"
--তেমন কিছু না। আমার এম এস সির নোটস। স্ট্যাটিস্টিক্যাল আর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের। দিয়ে গেলাম। দেখে রেখো। যেখানে যেখানে বুঝতে পারবে না, নোট করে রাখবে। আমি বুঝিয়ে দেব। আর এই রইল তিন ভলিউম ফাইনম্যান'স লেকচার্স। এই বইগুলো পড়া দরকার। যত পড়বে , ততই সব গুলিয়ে যাবে। আর ততই নিজে সে প্রশ্নের জবাব খুঁজবে। আর ততই ঠিকঠাক শিখতে পারবে। আজ গাইডলাইন দিয়ে যাব। যাও , খাতা কলম নিয়ে এস। আজ কী বার? সোমবার? সামনের সোমবার আমাকে রিপোর্ট করবে কতটা প্রোগ্রেস। ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কান্না আমি মোটে বরদাস্ত করি না।

এ কী লোক রে বাবা! কার পাল্লায় পড়লাম? সুধীরবাবু আমাকে কত ভালোবাসেন , কক্ষনোবকেন না। ইনি তো কথায় কথায় ধমকান। এই একশ' নম্বরের পড়া ..মাত্র এক সপ্তাহে? বদ্ধপাগল নাকি? আর কাউকে পড়ান না তো! আমার ওপর হাত পাকানো!
অরূপদা তখন রিসার্চ স্কলার। সদ্য পড়াতে এসেছেন এম এস সি পাস করে। প্রাইভেট টিউশনকরেন না। আমি প্রথম মুরগী। কাজেই ধরো আর জবাই করো। রেগেমেগে মাকে বললাম, "আমিএর কাছে পড়ব না। তোমাকে বলে রাখলাম।"
মা হাত উল্টে বললেন, "ও সব আমাকে বলতে এস না। সুধীরবাবু যা বলবেন, তাই শেষ কথা। তোমার যদি তাঁর কথা অমান্য করতে হয়, নিজে গিয়ে বল। আমাকে এর মধ্যে জড়িও না। "
সুধীরবাবু আমার কাছে দেবতুল্য। তাঁকে অমান্য করি, সে সাধ্য নেই আমার। আবার এই চশমাপরা গুঁফো লোকটা এমন রাগী রাগী দেখতে! যে কোনো সময়েই পাবলিক প্লেসে আমার কানওমূলে দিতে পারে।
গজগজ করি আর খাতার দিস্তা নিয়ে বসি। দিন নেই, রাত নেই..পাগলের মতো! শুক্রবারবিকেলে অরূপদাকে ধরলাম কলেজে।

--হয়ে গেছে।
-- কী হয়ে গেছে?
-- দুটোই। পড়ে গুছিয়ে নোট করে রেখেছি। যা বুঝেছি , সেটা। যা বুঝিনি ..তাও। আপনি কবে আসবেন? আমাদের বাড়ি?
-- শুভস্য শীঘ্রম! আজকেই। সন্ধে সাতটায়।

যখন মতি নন্দীর "কোনি" পড়েছিলাম, নিজেকে আইডেন্টিফাই করেছিলাম কোনির সঙ্গে। সুধীরবাবু আমার শিক্ষাগুরু , পিতাই তো! কিন্তু...অরূপদা হল "ক্ষিদ্দা "! যিনি আমাকে সেই তীব্রমন:সংযোগ আর ধৈর্যের পাঠ দিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন, কী করে সফল হওয়ার স্বপ্ন সত্যিকরতে জানতে হয়।
কোনি বলেছিল, " তুমি কোথায় ছিলে? আমি যখন সাঁতার কাটছিলাম? "
-- তোর পাশে পাশেই তো ছিলাম রে।
--মিথ্যে কথা! কোথাও ছিলে না তুমি। কোত্থাও না। আমি বলে তখন যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছিলাম!।
--ওই যন্ত্রণাটাই তো আমি রে! ওই যন্ত্রণাটাই তো আমি।

(পরের সংখ্যায় সমাপ্য)


লেখক পরিচিতঃ বিজ্ঞানের ছাত্রী । কিন্তু প্রথম ভালোবাসা সাহিত্য । তিন দশক ধরে ভাষান্তরের কাজে যুক্ত । বেশ কিছু অনূদিত বই প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্য আকাদেমি, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইত্যাদি বিখ্যাত সংস্থা থেকে । ভাষান্তরের পাশাপাশি নিজস্ব লেখালেখির ঝোঁক । তবে খুব নিয়মিত নয় । ভালোবাসেন টুকরো গদ্য, পদ্য লিখতে । নানা স্বাদের লেখা নিয়ে এবছর প্রকাশিত হয়েছে ওঁর আরেকটি বই 'ম্যাজিক লণ্ঠন'।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.

 


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।