মহাভারতের গল্প

কুরুরাজ বিচিত্রবীর্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ ছিলেন বলে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা পাণ্ডু রাজ্যভার পান। কিন্তু কিছুদিন রাজ্যভোগ করার পর পাণ্ডু বানপ্রস্থ নিলেন - তখন সেই ধৃতরাষ্ট্রই সিংহাসনে বসলেন। পাণ্ডুর পাঁচটি পুত্র ছিল - যদিও পাণ্ডু নিজে তাঁদের পিতা ছিলেন না। এক মুনির শাপে পাণ্ডুর পক্ষে পিতা হওয়া সম্ভব ছিল না। তাই ওঁর স্ত্রী কুন্তি ও মাদ্রী পাণ্ডুর ইচ্ছায় দেবতাদের আহবান করে সন্তানবতী হন। পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠ পুত্র যুধিষ্ঠিরের পিতা ছিলেন ধর্ম, ভীমের পিতা বায়ুদেব, অর্জুনের পিতা দেবরাজ ইন্দ্র এবং নকুল ও সহদেবের পিতা ছিলেন অশ্বিনীকুমারদ্বয়। ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী গান্ধারীর একশত পুত্র হয়েছিল। তাঁদের জ্যেষ্ঠ দুর্যোধন ছিলেন পাণ্ডুর দ্বিতীয় পুত্র ভীমের সমবয়সী। কুরুকুলপতি ছিলেন বলে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের মহাভারতে বলা হয়েছে কৌরব আর পাণ্ডুদের পুত্রদের বলা হয়েছে পাণ্ডব। বনবাসকালে পাণ্ডুর মৃত্যু হলে শিশু বয়সী পাণ্ডবরা কুরুকুলের রাজধানী হস্তিনাপুরে ফিরে এসে কৌরবদের সঙ্গে বড় হতে থাকেন। পিতামহ ভীষ্ম (বিচিত্রবীর্যের বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, যিনি প্রতিজ্ঞাবশত রাজসিংহাসন পরিত্যাগ করেছিলেন) রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষা দেবার জন্য বিখ্যাত অস্ত্রবিশারদ দ্রোণকে নিয়োগ করলেন। অল্পকালের মধ্যেই পাণ্ডুপুত্র অর্জুন হলেন দ্রোণের প্রিয়তম শিষ্য। ভীম সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তাঁর অসীম বলের জন্য। ধর্মপ্রিয় যুধিষ্ঠির সহ পাণ্ডবরা জনগণের প্রিয় হওয়ায় কৌরবরা, বিশেষকরে দুর্যোধন, ঈর্ষান্বিত হয়ে পাণ্ডবদের কি ভাবে ক্ষতিসাধন করা যায় - তাতে সচেষ্ট হলেন। একবার ভীমকে বিষ খাইয়ে মারবার চেষ্টা করলেন দুর্যোধন, কিন্তু সফল হলেন না। এই সময় ওঁর সঙ্গে মহাবীর কর্ণের পরিচয় হল। কর্ণ ছিলেন পাণ্ডব-মাতা কুন্তির কানীন (কুমারী অবস্থায় জাত) পুত্র। সূর্যদেব ছিলেন কর্ণের পিতা। ধনুর্বিদ্যায় কর্ণ অর্জুনের সমকক্ষ বুঝতে পেরে দুর্যোধন ওঁর সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করলেন। কয়েকজন বিশ্বস্ত আমত্যের সঙ্গে আলোচনা করে পাণ্ডবদের হত্যা করার হঠাত্ একটা পরিকল্পনা দুর্যোধনের মাথায় এলো। পিতার সাহায্য নিয়ে তিনি পাণ্ডবদের বারাণবত নগরে পাঠালেন। সেখানে একটি জতুগৃহে পাণ্ডবদের আটকে পুড়িয়ে মারবেন - সেই ছিল তাঁর চক্রান্ত। কিন্তু পাণ্ডবরা দুর্যোধনের অভিসন্ধি বুঝতে পেরে, সেই গৃহে নিজেরাই অগ্নিসংযোগ ক রে আত্মগোপন করলেন। ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনের অবশ্য ধারনা হল যে,পাণ্ডবদের মৃত্যু হয়েছে। আত্মগোপনকালে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা কৃষ্ণাকে (যিনি দ্রৌপদী বলে পরিচিত) অর্জুন স্বয়ংবর সভায় জয় করলেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে পঞ্চভ্রাতার সঙ্গেই তাঁর বিবাহ হল। দ্রৌপদী ছিলেন যজ্ঞবেদী-সম্ভূতা, যাঁর আবির্ভাবকালে দৈববানী হয়েছিল যে, ওঁর থেকেই ক্ষত্রিয়দের নাশ ও কুরুকুলের ভয় উপস্থিত হবে। এই সময়েই পাণ্ডবদের সঙ্গে কৃষ্ণের যোগাযোগ হল। কৃষ্ণ ছিলেন বিষ্ণুর অবতার। পাণ্ডবের মাতা কুন্তি ছিলেন কৃষ্ণের পিসীমাতা। ধৃতরাষ্ট্র যখন জানতে পারলেন যে, পাণ্ডবরা বেঁচে আছেন ও দ্রুপদ-কন্যাকে বিবাহ করেছেন এবং কৃষ্ণ তাঁদের সহায়, তখন তিনি তাড়াতাড়ি ওঁদের আমন্ত্রণ করলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে অর্ধরাজ্য দান করলেন। ভ্রাতাদের সাহায্যে যুধিষ্ঠিরের রাজ্য দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে লাগলো। তখন দুর্যোধন তাঁর মামা শকুনির পারামর্শে যুধিষ্ঠিরকে পণদ্যূতে আহবান করে তাঁর সর্বস্ব হরণ করলেন। এমন কি যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতা ও দ্রৌপদী সহ দুর্যোধনের দাস হলেন। পুত্র স্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনের এই নীচ কাজে কোনও রকম বাধা দিলেন না। দুর্যোধনের ভ্রাতা দুঃশাসন দ্রৌপদীকে সভায় নিয়ে এসে সবার সন্মুখে ওঁকে দাসী সম্বোধন করে ওঁর বস্ত্রহরণ করতে প্রবৃত্ত হলেন। কিন্তু দ্রৌপদী কৃষ্ণকে স্মরণ করতেই কৃষ্ণ অন্তরীক্ষ থেকে দ্রৌপদীকে বস্ত্রদান করে চললেন। দুঃশাসন নীচ অভিসন্ধি সফল হল না। ভীম শপথ করলেন যে, তিনি দুঃশাসনের বক্ষ বিদীর্ণ করে রক্তপান করবেন। দুর্যোধন অশ্লীল ভঙ্গি করে দ্রৌপদীকে তাঁর জানু দেখানোতে ভীম শপথ করলেন যে, তিনি দুর্যোধনের উরুভঙ্গ করবেন। তখন নানাদিক থেকে নানা অশুভ লক্ষণ দেখা দিল। ধৃতরাষ্ট্র এবার ভীত হয়ে ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ দ্রৌপদীকে সান্ত্বনা দিয়ে পাণ্ডবদের মুক্তি দিলেন ও রাজত্ব ফিরিয়ে দিলেন। এর কিছুকাল পরে আবার শকুনির পরামর্শে দুর্যোধন পাণ্ডবদের পণদ্যূতে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের বারো বছরের জন্য বনবাস আর এক বছরের জন্য অজ্ঞাতবাসে পাঠালেন। এই সময়ে পাণ্ডবরা বহু মুনি-ঋষির সংস্পর্শে আসেন ও তাঁদের কাছ থেকে অনেক ধর্মজ্ঞান লাভ করেন। এরই মধ্যে অর্জুন ইন্দ্রলোকে গিয়ে প্রথমে ইন্দ্র ও পরে মহাদেবের কাছ থেকে অনেক দিব্যাস্ত্র পান। কৃষ্ণের সঙ্গে অর্জুনের গভীর বন্ধìত্ব স্থাপন হয়। বনবাস ও অজ্ঞাতবাস শেষ হলে পাণ্ডবরা দূত মারফত্ ওঁদের রাজত্বদাবী করলেন। কিন্তু দুর্যোধন তাতে স্বীকৃত হলেন না। স্নেহান্ধ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রকে উপেক্ষা করতে পারলেন না। পাণ্ডবদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। নিজেদের রাজ্য না পাওয়ায় পাণ্ডবরা কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কুরুক্ষেত্রের এই মহাযুদ্ধে বহু রাজা হয় কৌরব অথবা পাণ্ডবদের পক্ষ নিয়েছিলেন। কৃষ্ণ নিজে যুদ্ধ না করলেও অর্জুনের সারথি হন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভে বিষাদগ্রস্থ অর্জুনকে কৃষ্ণ যে মহামূল্য উপদেশ দিয়েছিলেন, সেই উপদেশাবলী (ভগবত্ গীতা) আলাদা ভাবেই হিন্দুধর্মের একটি মহত্ গ্রন্থ। অর্জুনের রণনৈপুণ্য ও কৃষ্ণের কৌশল - এই দুইই ছিল পাণ্ডবদের জয়ের ভিত্তি। কৃষ্ণের সাহায্যে কর্ণ ও ভীেäমর মত যোদ্ধাদের অর্জুন পরাজিত করলেন। ভীম একা একশত কৌরব ভ্রাতাকে বধ করলেন। দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিশোধ নিলেন দুর্যোধনের উরুভগ্ন করে আর দুঃশাসনের বক্ষ বিদীর্ন করে। যুদ্ধে কৌরবকুল ধবংস হল,ক্ষত্রিয়দের বিনাশ হল। বেঁচে রইলেন পঞ্চপাণ্ডব, কৃষ্ণ আর কয়েকজন মাত্র। অসীম ক্ষমতাধর কৃষ্ণ চাইলে এই ক্ষয় রোধ করতে পারতেন, কিন্তু তাও করেন নি। তাই পুত্রহীনা গান্ধারী কৃষ্ণকে অভিশাপ দিলেন যে,কৃষ্ণের বংশও এই ভাবে ধবংস হবে। কৃষ্ণ তাতে অবাক হলেন না - সেই পরিণতির কথা তাঁর অজানা ছিল না। কৃষ্ণের মৃত্যুর পর পঞ্চ পাণ্ডব তাঁদের পৌত্র পরীক্ষিত্কে রাজ্যভার দিয়ে স্বর্গে যাবার জন্য দ্রৌপদীকে নিয়ে মহাপ্রস্থানের পথ নিলেন। পথের মধ্যে একে একে সবাইয়ের পতন ঘটলেও ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে পোঁছতে পারলেন। পরে দ্রৌপদী সহ অন্যান্য ভাইরা তাঁর সঙ্গে স্বর্গে মিলিত হন।