মহাভারত কোনও ব্যক্তি বিশেষের রচনা নয়। বহুলোকের লেখা বহু কাহিনীকে সংকলিত করে সৃষ্টি হয়েছে এই মহাকাব্য। মোটামুটিভাবে ৪০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রীষ্টাব্দ - অর্থাৎ প্রায় সাতশো বছর ধরে মহাভারতের কাহিনীগুলি সৃষ্টি হয়েছে। মহাভারত তার বর্তমান রূপ পেয়েছে অনুমানিত ৪০০ খ্রীষ্টাব্দে। এই ব্যাপারে অবশ্য সব পণ্ডিতরা একমত নন। তবে মোটামুটি ভাবে বলা যেতে পরে যে, মহাভারতের প্রকাশ হিন্দুধর্মের বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলি, অর্থাৎ, বেদ সংহিতা (ঋগ্, সাম, যজুর ও অথর্ব বেদ), ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ - যেগুলি "শ্রুতি" বলে পরিচিত - তাদের পরে। এই বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলির সৃষ্টিকাল ২০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে। শ্রুতিগুলিকে গ্রন্থ না বলে বলা উচিত ঋষিদের অনুভূত বা উপলব্ধ চিরন্তন সত্য। অক্ষরে বা গ্রন্থ হিসেবে এই "শ্রুতি"-গুলি বহুদিন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় নি। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় এই জ্ঞান বিধৃত থাকতো বেদ-জ্ঞানী ঋষি ও যাজক-শ্রেণীর মধ্যে। গুরু তাঁর শিষ্যকে এই জ্ঞান দান করতেন - শিষ্য যখন জ্ঞানের উপযুক্ত বা অধিকারী হতেন। চতুর্বেদ ও ব্রাহ্মণের (যাদের একযোগে কর্মকাণ্ড বলা হয়) মূল বিষয়বস্তু ছিল দেবদেবীর আরাধনা ও তৎসম্বন্ধীয় যাগ-যজ্ঞ-বলিদান ইত্যাদি। সাধারণ মানুষ এইসব ক্রিয়াকর্মের মধ্য দিয়ে তাদের ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতো। আরণ্যক ও উপনিষদে (যাদের একযোগে জ্ঞানকাণ্ড বলা হয়) মূল লক্ষ্য ছিল পরমসত্যের বা ব্রহ্মের অনুসন্ধান এবং সেই ব্রহ্মকে উপলব্ধি করে মোক্ষ লাভ। কর্মকাণ্ডের যাগ-যজ্ঞাদিকে অপ্রাধান্য দিয়ে উপনিষদের ঋষিরা অন্তর্মুখি হয়ে পরম জ্ঞানের সন্ধান করাটাই শ্রেয় মনে করেছেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে অবশ্য উপনিষদের এই ঋষিদের প্রগাঢ় চিন্তা অনুধাবন করার ক্ষমতা ছিল না। যেটুকু তারা বুঝলো - তা হল যাগ-যজ্ঞ-বলিদান, ইত্যাদির অসারতা। সুতরাং ধর্ম-কর্ম পালনের উত্তম পথটি যে কি - সেটি তাদের কাছে আরও অস্পষ্ট হয়ে গেল। এই সময়ে জৈনধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম এবং বস্তুবাদ ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হল, এবং সাধারণ মানুষের অনেকেই এদের আশ্রয় করে নিজের নিজের মোক্ষ বা নির্বাণের সন্ধান করল। এই বিশেষ সন্ধিক্ষণে সংকলিত হল মহাভারত। স্বভাবতই অনুমান করা যেতে পারে যে, এই সংকলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতবাসীকে আবার হিন্দুধর্মতে উদ্বুদ্ধ করা। যে-সকল খণ্ড খণ্ড আখ্যান ও ঐতিহ্য পুরাকালে প্রচলিত ছিল, তাই সংগ্রহ করে সৃষ্টি হল ১০০,০০০ শ্লোকের এই বৃহৎ মহাকাব্য, যা আকারে সমবেত ইলিয়াদ আর ওডিসির প্রায় সাতগুণ! মহাভারত রচিত হয়েছে কুরু রাজবংশীয় দুই বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর পুত্রদের বিবাদ ও তার অন্তিম ফল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এছাড়াও অজস্র কাহিনী এঁদের প্রসঙ্গে মহাভারতে অবতারণা করা হয়েছে। বস্তুত এঁদের বিবাদের কাহিনী মূল মহাভারতের এক পঞ্চমাংশের বেশি নয়। মহাভারতের রস বহুমুখী - সব রকম মানুষের চাহিদাই মহাভারত মিটিয়েছে। আধ্যাত্মবিদ্যানুরাগীদের জন্য এতে রয়েছে ভগবৎগীতা ও অন্যান্য দার্শনিক তথ্য, সমাজবিদ্যানুরাগীদের জন্য রয়েছে সমাজ ও নীতি বিষয়ক অজস্র তথ্য ও তত্ব, কাব্যপ্রেমীদের জন্য রয়েছে নানান শ্রুতিমধুর সব শ্লোক, গল্প-পিপাসুদের জন্য রয়েছে অজস্র কাহিনী। কিন্তু সর্বোপরি এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে - ধর্ম ও কর্তব্য সম্পর্কে বহুবিধ ব্যাখ্যা ও উপদেশ - পুরুষ ও নারীর ধর্মবিধ আচরণ কি, বর্ণ-ভেদে (ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, ইত্যাদি) দায়িত্ব ও কর্তব্যের কি তফাৎ, মোক্ষ লাভ (পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি) করার কি পথ, ইত্যাদি, ইত্যাদি। তবে মনে রাখতে হবে যে, মহাভারতের রচনাকালের ব্যাপ্তি প্রায় সাতশো বছর ধরে। ফলে সমাজের প্রাচীনতর চিত্র (সম্ভবত বৈদিক যুগের অব্যবহিত পরবর্তী যুগের) এতে যেমন আছে, তেমন এতে রয়েছে এক সমাজচিত্র যাতে প্রতিফলিত হয়েছে মনুসংহিতার অনুশাসন এবং সমকালীন পুরাণ-বিধৃত মূল্যবোধ। আদি কাহিনীর পরে যে নৈতিক কাহিনীগুলি রচিত হয়, তার শেষের সংযোজনগুলির রচয়িতা ছিলেন ভৃগুবংশীয় ঋষিরা। এই ব্রাহ্মণ্য সংযোজনে যা বিশেষভাবে চোখে পড়ে - তা হল ব্রাহ্মণদের পুনঃ পুনঃ জয়গান এবং নারী ও শুদ্রদের (ও বর্ণসঙ্করদের) অবনমন। মহাভারত রচনার বহুকাল পূর্বে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ঘটেছিল। তবে কবে তা ঘটেছিলে, তা নিয়ে পণ্ডিতরা এক মত হতে পারেন নি। অনেকের বিশ্বাস সেই ঘটনাকাল হল ১৪০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে।