প্রিয় তারিক ভাই

প্রিয়াংকা আচার্য্য

[লেখক পরিচিতি: লেখক বাংলাদেশের সাংবাদিক ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা। জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক হিসেবে দৈনিক আমাদের অর্থনীতিতে কর্মরত। গত ৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্দেশনায় জড়িত। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গবেষণামূলক কাজে সম্পৃক্ত। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান রাখা বিপ্লবীদের স্মৃতি ধরে রাখতে গঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন সূর্য সেন সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া ছাত্রাবস্থা থেকেই বাংলাদেশের মূল ধারার আবৃত্তি ও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। ]

 আপনার সঙ্গে আমার বেশ কিছু ছবি আছে। এটা সবচেয়ে সুন্দর। আমার খুব প্রিয়। তবে ছবিকে ঘিরে এমন অপ্রিয় এক শোক আঙুল নিঙড়ে যে এতো অসময়ে বের হবে তা কে জানতো!

 

আপনি ছিলেন আমার কৈশোরের ‘রিয়েল হিরো’- মুক্তির গান ছবির মোটা ফ্রেমের আড়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সেই তেজদীপ্ত ছেলেটি।

পরিচয় হওয়ার অনেক পরে জেনেছি যে আপনিই সেজন। তা জানার আগেই আপনার অসাম্প্রদায়িক, আপোষহীন, দৃঢ়চেতা সত্তার কাছে নত হয়েছি।

আপনিই শিখিয়েছেন- এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হলেও নিজের অস্তিত্ব কীভাবে টিকিয়ে রাখতে হয়। দিদাকে বাসার বাইরে গেলে নানী, পিসিকে ফুপি, মাসিকে খালা না বলতে।

চিন্তার অনেক জটিলতায় আপনি সহজেই পথ বলে দিতেন। হয়তো এজন্যই আমি পেশাগত জীবনে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাজ করতে আগ্রহী হয়েছি।

নারীর মর্যাদা, অধিকার, আন্দোলন নিয়ে আপনি ছিলেন সচেতন। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ওপর ডকুমেন্টারির কাজ শুরু করতে আপনি নানাভাবে পরামর্শ দিয়েছেন। কল্পনা দত্তকে নিয়ে কাজ করার কথা আমার ওয়ালে আপনার করা শেষ কমেন্টে জানিয়েওছেন।

এই গোটা লক ডাউনে যখন চারিদিক থেকে আসা হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলাম, তখন আপনি সাহস জুগিয়েছেন। পাশে থেকেছেন।

শেষ দেখায় আপনি স্থপতি-কবি রবিউল হুসাইনের হঠাৎ চলে যাওয়া নিয়ে আফসোস করেছিলেন। আপনি বলেছিলেন- এরপর দেয়ালে কার ছবি উঠবে কে জানে!

আসলেই কে জানতো!! মানে কী করে মেনে নেয়া যায় এমন করে চলে যাওয়া!!!

গত কিছু আলাপে আমাদের কথা হয় দেশভাগ নিয়ে। আপনি বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। তাই এ বিষয়ের ওপরই একটা বই আপনাকে দেয়ার জন্য কিনেছিলাম। দুই দিন আপনার সঙ্গে দেখা করে বইটা দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি। আপনি অপেক্ষা করেছেন আমি পৌঁছাতে পারিনি।

এবার আমার অপেক্ষার পালা। দিনতো একদিন ফুরাবেই। অনেক অনেক অনেক কথা জমা আছে, আরও থাকবে। অভিমান, চোখের জল, সব থাকবে। সেগুলো বলবো। জ্বালাবো সেখানেও।

শেষ ফোনকথায় আপনাকে বলেছিলাম- আপনার চেহারার সঙ্গে গুলজার সাহাবের দারুণ মিল। আপনি হেসেছিলেন। আপনার হাসির শব্দ কানে ভীষণ বাজছে!

আপনি আমার পোস্টগুলো সব পড়তেন। নিশ্চয়ই এটাও পড়বেন। তাই বলছি- আপনাকে ভালোবাসি, বড্ড বেশিই ভালোবাসি। আর ভালোবাসবোও… সে যেখানেই থাকেন!

মরণ রে তুহুঁ মম শ্যাম সম…

লেখকের অন্য লেখা:

    One reply on “প্রিয় তারিক ভাই”

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    প্রাচ্যের ফরাসি সুগন্ধি – কেরল

    সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

    আমি ভ্রমণ করতে ভালবাসি, কিন্তু ভ্রমণের কল্পনা করতে আমার আরও ভালো লাগে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) রবিঠাকুর উবাচ। আমাদের মতন ভ্রমণপিপাসুদের বেদবাক্য হয়ে থাকবে চিরকাল। বছরে যদি দু’বার ঘুরতে যাওয়া হয়, বাকি সময় কাটে ভ্রমণ কল্পনায়। সেই সময়ের কথা বলছি যখন বিদেশ ভ্রমণ শুধুমাত্র কল্পনায় বাস্তবায়িত হত। সদ্য চাকরি পাওয়া দু’জন নববিবাহিত মানুষ তাই চেষ্টা করত দেশের […]

    Read More

    গিরিশ ঘোষ : বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের পিতা

    সূর্য সেনগুপ্ত

    যদি মিথ্যা কথায় বাপ দাদার নাম রক্ষা করতে হয়, সে নাম লোপ পাওয়াই ভাল।— মিথ্যায় আমার যেন চিরিদিন দ্বেষ থাকে।–মিথ্যায় আমার ঘৃণা, সে ঘৃণা বৃদ্ধ বয়সে ত্যাগ করবো না গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ‘মায়াবসান’ নাটকে (৪:২) কালীকিঙ্করের সংলাপ, (১৮৯৮) [১] ভদ্রলোক রাত্রে শো হয়ে গেলে একটা ভাড়ার গাড়ি ধরে শুঁড়িখানায় গিয়ে বসতেন। ততক্ষণে অবশ্য তিনি অর্ধমত্ত অবস্থায়। […]

    Read More

    নববর্ষের নতুন প্রভাতে

    ভাস্কর বসু

    সে ছিল এক সময়। তখন পয়লা বৈশাখে প্রভাতফেরি বার হত, আগের চড়ক সংক্রান্তির দিন থেকেই উৎসবের সূচনা হয়ে যেত। গাজনের বাজনা শোনা যেত, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মা’র হাত ধরে চড়কের মেলাতে নতুন জিনিষের আবদার করত। এখন একটু অন্যরকম! বিগত ইংরেজি বছরের দুর্বিষহ স্মৃতিকে পিছনে ফেলে পেরিয়ে এলাম আমরা এই বছরের আরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি সময়। কিন্তু […]

    Read More

    সুকুমার রায়ের নাটক

    সুমিত রায়

    সুকুমার রায়ের (১৮৮৭-১৯২৩) “সুকুমার রায়” হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিলো না। তার প্রথম কারণ হলো তিনি ছিলেন কোলকাতায় রায়চৌধুরী বাড়ীর ছেলে, তাঁর জীবন উনিশ-বিশ শতকের মধ্যে সেতুর মতো। বাংলা সাহিত্য আর সংস্কৃতির কথা ধরলে সেসময়ে ঠাকুরবাড়ীর পরেই এই রায়চৌধুরীদের নাম করতে হয়। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের রাজ্যে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই বাংলাদেশে ছাপাখানা এসে গেছে […]

    Read More

    বীরোল

    রিয়া ভট্টাচার্য

    গ্রন্থঃ বীরোল লেখকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশনাঃ দ্য ক্যাফে টেবল কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা (genre)। অনেক দিকপাল লেখকের লেখনীর ঝরনাধারায় সিক্ত সাহিত্যমাতৃকার এই অংশ। কিশোর উপযোগী সায়েন্স ফিকশন রচনায় বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তাঁরই সাম্প্রতিকতম উপন্যাস গ্রন্থ বীরোল। এই গ্রন্থে আছে মোট দু’খানি উপন্যাস, “নতুন দিনের আলো” ও […]

    Read More
    +