মনখারাপের তারা – সুশান্ত সিংহ রাজপুত

অনিকেত সোম

[লেখক পরিচিতি: সাহিত্যজগতে নবীন। লিখেছেন কয়েকটি ছোটগল্প, ভ্রমণ আলেখ্য ও নাটক। ভালোবাসেন বই পড়তে, পাহাড়ে বেড়াতে, সিনেমা দেখতে এবং খেতে। ]

প্রতিভাবান অভিনেতা সুশান্তের আকস্মিক প্রয়াণ একরাশ মনখারাপের পাশাপাশি শুধুমাত্র আমাদের ওঁর মৃত্যুর কারণের প্রতি কৌতূহল বাড়িয়ে দিল তাই নয় প্রশ্ন উঠিয়ে দিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নোংরা রাজনীতি, অবসাদ, ফেলে আসা ভালোবাসা, জীবনে সঠিক ভালোবাসার মানুষকে অবিরত খুঁজে ফেরার সঠিক দিশার প্রতিও।
কে এই SSR? একটু গুগল করলেই হয়তো তার হদিশ পাওয়া যেতে পারে। তবে আমার এই প্রতিবেদন, দোষী কে, তা খুঁজে বার করা নয় বরং মাত্র ৩৪বছরের সুশান্তের কাজ ও তার চিন্তা ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসা।

আজ যখন সুশান্তের অভিনয় করা সিনেমা, তার অভিনীত চরিত্রদের কথা উঠে আসে মনে পড়ে যায় ২০০৮ সালের একতা কাপুরের পরিচালনায় ওঁর প্রথম অভিনয় করা ছোট্ট চরিত্রের কথা— প্রীত সিং জুনেইজা। ধারাবাহিক সিরিয়ালটির নাম ছিল— ‘কিস দেশ মেঁ হ্যায় মেরা দিল’।

মজার কথা কী জানেন, এই চরিত্রে অভিনয় করা মানুষটির সিরিয়ালে চরিত্রের সময়সীমা বেশিক্ষণ ছিল না।  যেমন, তার অভিনয় করা সিনেমা—‘দিল বেচারা’য় শেষ অভিনীত চরিত্র ‘ম্যানি’-ও। প্রথম ও শেষ দুটি অভিনীত চরিত্রের শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়। যা ভাবলে অবাক হতে হয় বৈকি!

ছোট্ট চরিত্রের মিষ্টি, ভুবন ভোলানো হাসির প্রীত সিংহ জুনেজার ট্যালেন্ট বুঝতে দেরী করেন নি একতা। পরের টেলিসিরিয়াল ‘পবিত্র রিস্তা’-তে লিড রোলে কাস্ট করেন তিনি সুশান্তকে। লক্ষ লক্ষ নারীদের নয়নের মণি হয়ে ওঠে ‘মানব দেশমুখ’। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সুশান্তকে।

একটু পিছন ফিরে যদি দেখি, তাহলে দেখতে পাব সুশান্তের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বিহারে হলেও, নিজেকে অভিনয়ের জগতে নিয়ে আসা হঠাৎ ভাবনা ছিল না। অ্যাকাডেমিক ফিল্ডে ওঁর ছিল ঈর্ষণীয় সাফল্য। কিন্তু এগুলো সবগুলোই ঘটেছে হঠাৎ করে মা মারা যাবার পরে। ছোটবেলা থেকেই সুশান্ত প্রিয় অভিনেতাদের বিভিন্ন চরিত্রের মিমিক্রি করতে ভালোবাসতেন। বিভিন্ন ইন্টারভিউতে একথা বলেওছেন তিনি। পরিবারের সবথেকে ছোট সদস্য যখন মনমরা হয়ে পড়লেন মায়ের মৃত্যুতে, পুরো পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় দিল্লিতে চলে আসার। দিল্লিতেই টুয়েলভ পাশ করেন তিনি। এরপর AIEEE- তে সপ্তম স্থান পেয়ে দিল্লি কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ব্যাচেলর অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হন। পদার্থবিজ্ঞানে ন্যাশনাল অলিম্পিয়াড বিজয়ী সুশান্ত যে পড়াশোনাতে তুখোড় ছিলেন তা এগুলো দেখেই বোঝা যায়। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ব্যারি জনের থিয়েটার ও শামক দাভরের ডান্স ট্রুপেও যোগ দেন। বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড সেরেমনিতে ব্যাক আপ ডান্সার হিসেবেও কাজ করেন। পরবর্তীতে ভালো সুযোগের জন্য মুম্বাইয়ে নাদিরা বব্বরের থিয়েটারে যোগ দেন সুশান্ত। আর ততদিনে মনস্থির করে ফেলেছিলেন যে, অ্যাকাডেমিক ফিল্ড তার উপযুক্ত জায়গা নয়। আর এই নাদিরার থিয়েটার গ্রুপ থেকেই সুশান্তকে পিক করে একতা অ্যান্ড টিম। প্রথম বৃত্ত সম্পন্ন হয় এখানেই।

সময়টা ২০১২। ততদিনে আগের দুটি সিরিয়াল জনপ্রিয় হয়েছে। জনপ্রিয়তা পেয়েছে রিয়ালিটি শো— জরা নাচকে দিখা ও ঝলক দিখলা যা (এপিসোড ৪), সুশান্তের উত্তরণ শুরু।

পরিচালক অভিষেক কাপুর তার আপকামিং সিনেমা ‘কাই পো চে’-র লিডিং রোলের জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। তিনটি চরিত্রের বাকি দুটি পছন্দ হলেও ঈশানের চরিত্রের জন্য তার পছন্দ মিলছিল না। সুশান্তকে প্রথম দেখায় বাতিলও করেন তিনি।কারণ হিসেবে শোনা যায়, ঈশান চরিত্রের জন্য সেই সময় সুশান্তের শরীর ভারি ছিল যা চরিত্রে বেমানান ছিল। এরপর কিছুটা সময় পরে, ফের নিজেকে তৈরী করে অভিষেকের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে ঈশান— সুশান্ত সিংহ রাজপুত। আর এখান থেকেই শুরু হয় বলিউড সিনেমায় পদার্পণ।

সুশান্তের সিনেমার পরিসংখ্যানে চোখ বোলালে দেখা যায়:

কাই পো চে-র পর তিনি — শুদ্ধ দেশি রোমান্স, পিকে, ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী, এম এস ধোনি, রাবতা, কেদারনাথ, সোনচিড়িয়া, ছিছোরে, ড্রাইভ ও দিল বেচারাতে অভিনয় করেছিলেন। একমাত্র ‘দিল বেচারা’ সুশান্তের মৃত্যুর পর হটস্টার ডিজনির মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মতে রিলিজ করেছিল। তার একটা অন্যতম বড় কারণ ছিল করোনা অতিমারীর জন্য বিগ স্ক্রিন বন্ধ থাকা। কিন্তু বাকি সিনেমাগুলো এই ৩-৪ বছরের পরিসরে খুব কমে করে হলেও আম দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। বড় রকমের হিট প্রজেক্ট ছিল: পিকে। যদিও সুশান্তের রোল ছোট্ট থাকলেও তিনি ভালো অভিনয় করেছিলেন। নায়ক হিসেবে নিজস্ব সুপারহিট এম এস ধোনি, ছিছোরে, কেদারনাথ। তবে সেইভাবে হিট না করলেও সোনচিড়িয়া প্রশংসিত হয়েছিল দর্শকমহলে। আর এটা এখন প্রায় সকলেই জানেন যে— রেকর্ডসংখ্যক দর্শক ভিজিট হয় হটস্টারে ‘দিল বেচারা’-র জন্য। যদিও এটার একটা কারণ অবশ্যই অকাল মৃত্যু। কিন্তু নিন্দুকরা যাই বলুন, সুশান্ত বেঁচে থাকলেও ‘দিল বেচারা’ সুপারহিট হতো। কারণ ইমানুয়েল ম্যানি চরিত্রে সুশান্ত সিংহ রাজপুত করেছিলেন অসাধারণ অভিনয়। যা প্রত্যেক দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছে যে, কেন এতো তাড়াতাড়ি তুমি চলে গেলে সুশান্ত? আর একটু অপেক্ষা কী করা যেতো না?
সুশান্তের অকালপ্রয়াণ মেনে নিতে পারছে না তামাম ভক্তকুল। দায়িত্ব এখন সিবিআইয়ের হাতে সঁপেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত— সুপ্রিম কোর্ট। হয়তো আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে আমাদের সত্যির জন্য। তবে বিভিন্ন ইন্টারভিউ, স্মৃতিচারণে একটা জিনিস স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, সুশান্ত পজিটিভ মানসিকতার ছেলে ছিলেন। এইরকম একজন মানুষ কীভাবে অবসাদে ঢুকে পড়লেন এটা কিন্তু ভাবার বিষয়।

আপনি যদি এম এস ধোনি, কেদারনাথ, রবতা, ছিছোড়ের মতো সিনেমাগুলো দেখে থাকেন তাহলে বুঝবেন চরিত্রের জন্য কতটা গভীরে ঢুকে একজন মানুষ কাজ করেছেন। শুধু অভিনয়ের জন্য ধোনির সঙ্গে দিনের পর দিন থেকে যাওয়া, ধোনির ক্রিকেট কোচ, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, যোগাযোগ রাখা, ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা কিংবা কেদারনাথের সেই দৃশ্যের কথা ভাবুন যেখানে মনসুর কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মন্দাকিনীকে। এগুলো কিন্তু শুধু শুটিংয়ে এসে করেছিলেন এমন নয়, দিনের পর দিন এগুলো বাস্তবেও প্র্যাকটিস করেছিলেন।

মনে পড়ে ছিছোড়ের সেই সংলাপ? হ্যাঁ, একটু নিজের স্মৃতিকে ধাক্কা দিন আরো একবার। মোদ্দা কথাটা হল সুশান্তের মুখ দিয়ে চরিত্রের সংলাপে বক্তব্য অনেকটা এরকমই ছিল যে—Your result doesn’t decide if you’re a loser or not … your attempt decides that.

যে ছেলে টেলিস্কোপ কিনে তারা গুনতেন, যার মহাকাশযান নিয়ে তুমুল আগ্রহ ছিল, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে রীতিমতো চর্চা করতেন, আকাশে প্লেন ওড়ানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনিই আবার অভিনয়ের জন্য চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যেতে পারতেন, যিনি মাত্র ৩৪ বছরেই একটা নিজস্ব রাজত্ব সৃষ্টির সম্ভাবনাকে উসকে দিয়েছিলেন, তিনি কেন যে এরকম করে ফেললেন!!!

ভালোবাসার খোঁজে থাকা মানুষটির জন্য এ অনুভূতি শুধুই বেদনাময়। আজ আকাশের এক মনখারাপের তারা, যিনি নিজে এখন টেলিস্কোপ দিয়ে আমাদের দেখছেন…

তথ্য ঋণ:
১. ইন্টারনেট
২. ইউ টিউব
৩. সংবাদপত্র ও পত্রিকা

 

লেখকের অন্য লেখা:

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    সর্বশেষ পোস্ট

    চুনী গোস্বামী: ক্রীড়াপ্রেমী স্কুল-প্রাক্তনীর চোখে

    কলরব রায়

    কিক অফ –  গেছেন পিকে, গেছেন চুনী, গেলেন বলবীর, স্বর্গের মেন স্টেডিয়ামে বাড়ছে ক্রমেই ভীড়। ইন্দ্রজ্যেঠু করো কিছু লাইভ টেলিকাস্ট, আমরা যাতে দেখতে পারি সেই গ্লোরিয়াস পাস্ট। __ “ছড়াbituay”: ২৬শে মে, ২০২০ [বলবীর সিং মারা যাওয়ার পরদিন]   ফেসবুকে ওপরের এই পোস্টটা করেছিলাম – ওটা ছিলো আমার বহুমুখী এবং বহু-বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া। সুবিমল (চুনী) গোস্বামী যে আর ইহজগতে […]

    Read More

    প্রিয় তারিক ভাই

    প্রিয়াংকা আচার্য্য

     আপনার সঙ্গে আমার বেশ কিছু ছবি আছে। এটা সবচেয়ে সুন্দর। আমার খুব প্রিয়। তবে ছবিকে ঘিরে এমন অপ্রিয় এক শোক আঙুল নিঙড়ে যে এতো অসময়ে বের হবে তা কে জানতো!   আপনি ছিলেন আমার কৈশোরের ‘রিয়েল হিরো’- মুক্তির গান ছবির মোটা ফ্রেমের আড়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সেই তেজদীপ্ত ছেলেটি। পরিচয় হওয়ার অনেক পরে জেনেছি যে আপনিই […]

    Read More

    বিদায় তারিক ভাই, বিদায়

    সুজন দাশগুপ্ত

    এই মাত্র খবর পেলাম, বন্ধু জিয়াউদ্দীন তারিক আলি আর নেই। কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত হয়ে সোমবার সকালে বাংলাদেশে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। ‘৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তারিক আলী ছিলেন একজন উদার মনের মানুষ। বাংলাদেশে বহু কর্মকাণ্ডে তিনি নিবিড় ভাবে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি হিসেবে সেটিকে গড়ে তোলার কাজে ওঁর অবদান ছিল তুলনীয়। এছাড়া সম্মিলিত সামাজিক […]

    Read More

    মনখারাপের তারা – সুশান্ত সিংহ রাজপুত

    অনিকেত সোম

    প্রতিভাবান অভিনেতা সুশান্তের আকস্মিক প্রয়াণ একরাশ মনখারাপের পাশাপাশি শুধুমাত্র আমাদের ওঁর মৃত্যুর কারণের প্রতি কৌতূহল বাড়িয়ে দিল তাই নয় প্রশ্ন উঠিয়ে দিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নোংরা রাজনীতি, অবসাদ, ফেলে আসা ভালোবাসা, জীবনে সঠিক ভালোবাসার মানুষকে অবিরত খুঁজে ফেরার সঠিক দিশার প্রতিও। কে এই SSR? একটু গুগল করলেই হয়তো তার হদিশ পাওয়া যেতে পারে। তবে আমার এই […]

    Read More

    কৈশোরের মুজতবা আবিষ্কার

    ভাস্কর বসু

    আমাদের কৈশোর কাল কেটেছে সত্তরের দশকে। সেই সময়কার বাংলা এখনকার থেকে অনেক আলাদা ছিল। তখন বাংলা ভাষার ও বাংলা মাধ্যম স্কুলের বেশ ভালো কদর ছিল। শিক্ষকরাও ছিলেন ছাত্রদরদী। শুধু পরীক্ষায় ভাল নম্বর নয়, তাদের সামগ্রিক বোধ যাতে পরিণত হয় সেদিকেও তাঁদের তীক্ষ্ণ নজর থাকতো। এছাড়া জানিনা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, সেই সময় আমাদের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার […]

    Read More
    +