বইয়ের খবর

জানুয়ারি ৩০, ২০১৬
"লেখাগুলোয় শুধু মাধুর্য নয়, অনেক অন্ধকারের আর গভীর-গভীরতর অসুখের কথাও লিখেছেন লেখক। কিন্তু ... সেই অন্ধকারের মধ্যেও তিনি অন্বেষণ করেছেন ক্লেদজ কুসুম..."
আলোচনা - ঋজু গাঙ্গুলি
- বইয়ের নাম: চন্দনপিঁড়ি
- লেখক: সুব্রত মুখোপাধ্যায়়
- প্রকাশক: প্রতিভাস
- হার্ডকভার, পৃষ্ঠা: ২০৭, মূল্য: ৩০০/- টাকা
- প্রথম প্রকাশ: বইমেলা জানুয়ারি ২০১৫
- ISBN: 978-93-84265-90-8
গল্প আর উপন্যাসের মাধ্যমে জীবনের নানা মেঘ-রৌদ্রের খেলা যাঁরা
আমাদের কাছে ফুটিয়ে তোলেন, সেই লেখকদের সৃজনপ্রক্রিয়া নিয়ে আমার
বরাবরই কৌতূহল। কেমন করে গল্প বানান তাঁরা? চোখে-দেখা আর কানে-শোনা
মানুষগুলোই কি অবিকল ধরা পড়ে তাঁদের কলমে (এখন কিবোর্ডে)? নাকি
নিজের অভিজ্ঞতার মাটি দিয়ে গড়া মূর্তিকে গবেষণার কঠোর তপস্যার
তাপে পুড়িয়ে, আর তাতে প্রকাশক বা পাঠকের চাহিদার রং চড়িয়ে, তবে
সৃষ্টি হয় সেই সব আখ্যান? কখনও কোন সাহিত্যিককে সাহস করে এই প্রশ্নগুলো
করতে পারিনি। কিন্তু সম্প্রতি এমন একটা বই পড়ার সুযোগ হল, যেটা
এই সময়ের অন্যতম লব্ধপ্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত এক সাহিত্যিকের মনের
দুনিয়াটা পুরোপুরি আমাদের মুঠোয় এনে না দিলেও তাঁর অন্তরমহলের
আঙিনায় পিঁড়ি পেতে বসার সুযোগ করে দিল। তাই নিয়েই আমার আজকের লেখাজোখা।
সাহিত্যিক সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর রচিত গল্প-উপন্যাসের নামের
সঙ্গে বিদগ্ধ পাঠকের পরিচয় আজকের নয়। সত্তরের দশকের একেবারে শেষে
লেখা “রসিক” বা আশির দশকে লেখা “পৌর্ণমাসী”-র মতো, মাত্র কয়েক
বছর আগে লেখা “আয় মন বেড়াতে যাবি”-ও পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হয়েছে।
“প্রতিদিন” পত্রিকায় টুকরো-টুকরো লেখার আকারে ২০১৩-য় ‘চন্দনপিঁড়ি’
এবং ২০১৪-য় ‘অষ্টমস্বর’ নামে মুদ্রিত তাঁর ‘লিখনমালা’ গ্রন্থাকারে
হাতে এসেছিল বেশ কিছুদিন আগে, কিন্তু খুনখারাপি-ভূত-রহস্য ইত্যাদির
বইপত্র নিয়ে (যথারীতি) ব্যাপৃত থাকায় সেটির কদর করা হয়নি। ভোজনরসিকেরা
বলেন যে গুরুপাকের আগে নাকি সম্পূর্ণ অনাহারে থাকলে বিপর্যয় অবধারিত,
আবার পেটকে একটু সাত্ত্বিক আহারের মাধ্যমে ‘তৈরি’ করে না নিলে
সময়মতো ডান হাতের ব্যাপারটা ঠিক জমে না। স্বীকার করি, আমিও তাই
বইমেলা-পরবর্তী আকন্ঠ-পাঠের প্রস্তুতি হিসেবে এই বইটা তুলে নিয়েছিলাম।
কিন্তু লেখাগুলো পড়ার পর মনে হল যে বইটা নিয়ে সাত না হলেও এককাহন
গাওয়া দরকার। কেন? ক্রমশ প্রকাশ্য।
বইটিতে দুটি অংশ আছে। প্রথমটি ‘চন্দনপিঁড়ি’, যাকে দিয়েই বইটির
নামকরণ। কিছু স্মৃতি অবধারিতভাবে এলেও এই অংশের লেখাগুলোর বিষয়:
বাংলা ও বাঙালির গর্বের ও ভালোবাসার কিছু মানুষ, যাঁদের মধ্যে
আছেন শ্রীচৈতন্য (বা আরও সঠিকভাবে লিখলে বিশ্বম্ভর বা নিমাই),
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, বিস্মৃত বিপ্লবী বিনোদবিহারী, সন্ত কবির, কালীপ্রসন্ন
সিংহ, শুভঙ্কর (আজ্ঞে হ্যাঁ, “ফাঁকি”-খ্যাত সেই গণিতজ্ঞ), লালন,
ভারতচন্দ্র, পরমহংস মশাই, ওস্তাদ আমির খাঁ, নিখিল বন্দোপাধ্যায়,
নরেন্দ্রনাথ দত্ত, এবং অজস্র লোকায়ত চরিত্র, মায় লোকায়ত দেবদেবী।
সময়ক্রম মেনে, বা কোন লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্যে যে এদের লেখা হয়নি,
তা বোঝা যায় পড়তে বসেই। মনে হয় যেন লেখক নিজের সঙ্গে গল্প বলছেন,
আর তাঁর অন্তরমহলে বসে আমরা সেই গল্প শুনছি। যেসব লেখা দিয়ে গড়ে
উঠেছে এই আখ্যানমালা, তাদের নামগুলো লিখলে হয়তো স্পষ্ট হবে কীভাবে
প্রগাঢ় অধ্যয়ন, লোকায়ত টান, অথচ সহজতা আর নম্রতার ছন্দে গাঁথা
হয়েছে এদের:
১. ছোটো চন্দনগাছের গন্ধ
২. ত্রিরত্নই জগন্নাথ
৩. শংকরাচার্য সাক্ষাৎব্যাসো
৪. দুঃখিতের বন্ধু প্রভু
৫. গীত রত্নাকরের জন্মদাত্রী
৬. ফোটে ফুল শুকনো ডালে
৭. চন্দ্রালোকে গান
৮. রাধামাধব দড়ি জোগান
৯. বিষ্ণুপ্রিয়া যদি না থাকতেন
১০. এ মৃত্তিকা মোর
১১. চৌদিকে মালঞ্চ বেড়া
১২. নহ গুপ্ত হে ঈশ্বর
১৩. ‘প্রতিভাশালীরা প্রায়ই বলবান’
১৪. বিয়ে করার স্বপ্নাদেশ পেলেন বাবাজি
১৫. অস্ত্রসহ শ্রাদ্ধাদি তিলজল দান
১৬. পড়ে আছে একমুঠি ফুল
১৭. কালী নামামৃত পীযুষ পানে
১৮. কৃষ্ণদাসের জীবন রহস্যাবৃত
১৯. কোণারকের সূর্যমন্দিরের সামনে লাল সাহেব
২০. খুঁড়িবিবির নামে বাইশ বিঘা জমি
২১. সিদ্ধিগুণে সিদ্ধপুরুষ হৈল সিদ্ধিদাতা
২২. মাতৃভক্তি, দয়া আর দানশীলতা তাঁর আদর্শ
২৩. হরসুন্দরী ব্রাহ্মমুহূর্তে পুরাণ পাঠ করতেন
২৪. কালী বেদান্তীর জীবন
২৫. বারাণসীর হটী বিদ্যালংকার
২৬. কালস্য কুটিল গতি
২৭. দিল দরিয়ায় ডুবে দেখ না...
২৮. ভারত ব্রাহ্মণ কয়, দয়া কর মহাশয়
২৯. তুমি বাড়াইলে প্রীতি মোর
৩০. লোকটির কাছে থাকতে ভালো লাগছে
৩১. আমি কাঁদি সখী ধুঁয়ার ছলে
৩২. গরিব হলে তাঁকে বাপ বলবি না?
৩৩. কে আছ চেতন?
৩৪. কোথা হতে আসে নৌকা
৩৫. আপনাতে আপনি থাকো মন
৩৬. একেই কি যোগীর চক্ষু বলে?
৩৭. মহাবীরের ভাব, হঠাৎ তা জুড়িয়ে শীতল
৩৮. জ্ঞানের বাতি জ্বলবে হৃদে অনুক্ষণ
৩৯. জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই
বইয়ের দ্বিতীয় অংশ, অর্থাৎ ‘অষ্টমস্বর’ প্রায় পুরোপুরি স্মৃতিচিত্রণ।
এই ৫৬টি সংক্ষিপ্ত লেখায় কোন জ্ঞানের ঔদ্ধত্য নেই, নেই রাশিরাশি
পরিচিত নামের প্রচণ্ডতা দিয়ে নিজের পরিচয়কে প্রোজ্জ্বল করে তোলার
চেষ্টা। বরং আছে স্মৃতির নদী ধরে কখনও উজানে, কখনও মোহনার দিকে
যাওয়ার অভিপ্রায়। প্রবলভাবে আছে ফেলে আসা ভদ্রাসন, ফেলে আসা সুখদুঃখ,
আর একটু-একটু করে সময়ের জটিল চক্রে লুপ্তপ্রায় একদা দেদীপ্যমান
নানা গুণীজনের কথা। আর আছেন সাগরময় ঘোষ, সম্পাদক হিসেবে যাঁর কথা
পড়ে অবধারিতভাবেই “ ** কী ছিলেন, কী হইয়াছেন” কথাটা আর একবার মনে
হবে সুধী পাঠকের।
লেখাগুলোয় শুধু মাধুর্য নয়, অনেক অন্ধকারের আর গভীর-গভীরতর অসুখের
কথাও লিখেছেন লেখক। কিন্তু যেহেতু সেই অন্ধকারের মধ্যেও তিনি অন্বেষণ
করেছেন ক্লেদজ কুসুমের, তাই আমরা বুঝতে পারি যে অধুনা রক্তশূন্যতায়
ভোগা আর রাজনৈতিক দলাদলিতে বিষিয়ে যাওয়া পল্লীবাংলা ও লোকায়ত জীবন
একদা এই সাহিত্যিককেই শুধু নয়, বরং সমকালীন বাংলাকে সজীব ও সবুজ
রেখেছিল তার সহজিয়া ভাবনা আর রূপ দিয়ে।
এত পেয়েও কয়েকটি বিষয়ে ক্ষোভ রয়ে গেল। সেগুলো হল:
বইটা হাতে নিন, আর বসে পড়ুন চন্দনপিঁড়িতে। তারপর কী হবে? “পাতা
পড়বে। অন্ন ঢালা হবে চুড়ো করে। মাঝখানে গব্যঘৃত। সারি সারি ব্যঞ্জন
ভাতের মন্দির ঘিরে। অন্নে হাত দেওয়ার আগেই প্রায় অর্ধভোজন।” তবে
আপনি অর্ধেকে থামবেন না, পাকা রাঁধুনির দ্বারা রচিত এই নির্ভার
অথচ জিহ্বাগ্রে জলোত্পাদক ভোজন সম্পূর্ণ করেই উঠবেন। তবেই না সার্থক
হবে চন্দনপিঁড়ি।
আলোচক পরিচিতি - আলোচক এক উদ্যমী পাঠক, যিনি
বিপ্লব, চোখের জল, মানবচরিত্রের অতলস্পর্শী গভীরতা, সিন্ডিকেট,
সারদা, ধোনি, ইত্যাদি তাবড় বিষয় থেকে দূরে, স্রেফ বেঁচে থাকার
গল্প পড়তে চান। নিজের ভালবাসা থেকেই দীর্ঘদিন বইয়ের রিভিউ করছেন।
(আপনার
মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)
অবসর-এর লেখাগুলোর
ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর
নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।