শিল্প ও সাহিত্য

নভেম্বর ১৫, ২০১৪
বাংলা কবিতার এক প্রাথমিক পাঠ ১ ২
দেবব্রত ভৌমিক
৩। ছন্দের রীতি
উচ্চারিত ধ্বনিদের পরিমাণ মত মাত্রায় সাজানোর পদ্ধতিকে বলা হয় ছন্দের রীতি। সে প্রকাশ করে ছন্দের অন্তঃপ্রকৃতি এবং প্রথম কয়েক সারির বিশ্লেষণেই তার লক্ষণ ধরা পড়ে। সারিতে সারিতে পর্ব ও পদ বিন্যস্ত হয় ছন্দ-রীতির ধারায়। এক-এক বাক্যাংশ নিয়ে হয় এক-এক পর্ব, যাদের দীর্ঘতা ঠিক হয় মাত্রার সমতায় এবং এক-এক ছন্দ-রীতির নিয়মে। বাংলা ছন্দে মাত্রা সাজানো হয় তিন রকম পদ্ধতিতে, তাই ছন্দের রীতি তিন প্রকারঃ দলবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও মিশ্রবৃত্ত। বৃত্ত শব্দটি নিজের অর্থ বোঝায়, এক cycle এ নিয়মিত ঘটে যাওয়া। এর শর্ত হল, যে বৃত্তের হিসেবেই গোণা হোক, প্রতি পর্বের মাত্রা-সংখ্যা সমান হবে। প্রসঙ্গত বলা যায়, সমান-সংখ্যার পর্ব দিয়ে গড়া হয় এক-এক সারি। ফলে সব সারিতে মূল ও ভাঙ্গা পর্ব সমূহের মাত্রা-সমষ্টি সমান হয়। এজাতীয় গঠন শৈলীর প্রয়োগ রয়েছে অধিকাংশ কবিতায়।
ছন্দের পরিচয়ে বলা হয় রীতির নাম ও পর্বের লক্ষণ, যেমন- মাত্রাবৃত্তের পাঁচ-মাত্রার চাল কিংবা মিশ্রবৃত্তের চার-মাত্রার চাল। পূর্ণ পর্ব সাধারণত চারমাত্রার কম বা সাতমাত্রার বেশি হয়না। পর্বের দীর্ঘতা, দল-মাত্রার পার্থক্য ও লয়ের ভিন্নতা দেখায় ছন্দ-রীতির স্বাতন্ত্র্য।
তিন রীতিতেই মুক্তদলের মাত্রা এক। রুদ্ধদলের মাত্রা কখনো এক, কখনো দুই। এরূপ দ্বিবিধ মাত্রামূল্যর প্রয়োগ নিয়েই ছন্দ রীতির ভিন্নতা। দলবৃত্ত রীতিতে রুদ্ধদলের মাত্রা এক। মাত্রাবৃত্ত রীতিতে রুদ্ধদলের উচ্চারণ সবসময় প্রসারিত মনে করা হয় জন্য তার মাত্রা দুই। মিশ্রবৃত্ত রীতিতে রুদ্ধদল শব্দের প্রথমে বা মাঝে থাকলে তার মাত্রা এক, যদি সে শব্দের শেষে বা আলাদা থাকে তবে তার মাত্রা দুই।
এই তিন রীতির নতুন নামকরণ করেন শ্রী প্রবোধ চন্দ্র সেন, বাংলা কবিতার ছন্দ-গবেষণায় পথিকৃৎ ব্যক্তি। তার উদ্যোগে স্বরবৃত্তর নাম পাল্টে হয় দলবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত নাম পায় কলাবৃত্ত, এবং অক্ষরবৃত্তর নাম হয় মিশ্রবৃত্ত।
কলা (mora) নামের ক্ষুদ্রতম এককের উচ্চারণকে ভিত্তি ধরে, প্রবোধচন্দ্র মাত্রাবৃত্ত নাম বদল করে কলাবৃত্ত রাখেন। মাত্রাবৃত্ত নামের প্রসিদ্ধি বেশি জন্য, সে নামের ব্যবহার হয়েছে এই লেখায়।
অক্ষরবৃত্ত নামটিকেও প্রবোধচন্দ্র খারিজ করা শুরু করেন, যদিও সে নামের প্রচলন হয়ে আসছে বহুকাল। তার মতে, অক্ষরবৃত্ত নাম ছন্দটির চরিত্র ঠিকমত দেখায় না। সেমত মিশ্রবৃত্ত নামকে ব্যবহার করা হয়েছে এই লেখায়। রীতিটির ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ৩-৩ সেক্।শনে ।
৩-১ দলবৃত্ত ছন্দ
ছন্দটিতে মুক্ত বা রুদ্ধ, সব দল এক মাত্রার। পূর্ণপর্ব সর্বদা চার মাত্রায় এবং প্রতি পর্বের প্রথম দলে শ্বাসাঘাত (অধিক চাপ) থাকে। বহুলভাবে ছড়ায় ব্যবহৃত হয় জন্য দলবৃত্ত ছন্দের অন্য নাম ‘ছড়ার ছন্দ’। ছন্দের লয় দ্রুত, কবিতার আবৃত্তি হয় দ্রুতভাবে। দৃষ্টান্ত,
বাঁশ বাগানের | মাথার উপর || চাঁদ উঠেছে | ওই, I [১ ১ ১ ১ | ১ ১ ১ ১ || ১ ১ ১ ১ | ১]
মাগো আমার | শোলোক বলা || কাজলা দিদি | কই? I [১ ১ ১ ১ | ১ ১ ১ ১ || ১ ১ ১ ১ | ১]
(‘কাজলা দিদি’, যতীন্দ্রমোহন বাগচী)
উপরে দেখান হয়েছে পর্বের ভাগ ও সারিগুলির পাশে মাত্রা গণনা। দল আলাদা করে দেখা যায় প্রথম পঙ্ক্তির মাত্রাসংখ্যাঃ প্রথম পর্বে- বাঁশ্+ বা+গা+ নের্ = ৪; দ্বিতীয় পর্বে- মা+থার্ + উ+পর্ = ৪; তৃতীয় পর্বে- চাঁদ্ + উ+ঠে+ছে = ৪; চতুর্থ পর্বে- ওই= ১; মোট ১২+১ = ১৩। দ্বিতীয় পঙ্ক্তির মাত্রাসংখ্যাঃ মা+গো +আ+মার্ = ৪, শো+লোক্ +ব+লা = ৪, কাজ্+লা +দি+দি = ৪, এবং কই = ১; মোট ১২+১ = ১৩। স্পষ্ট অক্ষরে লেখা দলগুলিতে শ্বাসাঘাত পড়ছে। অন্ত্যমিল আছে (ওই)।
৩-২ মাত্রাবৃত্ত ছন্দ
এই রীতির মাত্রা গণনায়, মুক্তদল এক মাত্রা ও রুদ্ধদল সর্বদা দুই মাত্রা। ছন্দটির বিশেষত্ব রুদ্ধদলের প্রসারিত উচ্চারণে। পর্বদের আয়তন চার থেকে সাত মাত্রা। শেষ পর্ব ছাড়া অন্যান্য পর্বের মাত্রা সংখ্যায় সমতা থাকে। মাত্রাবৃত্তর লয় মধ্যম প্রকৃতির, তাই আবৃত্তির গতি হয় দলবৃত্ত ছন্দের চেয়ে মন্থর।
প্রথম পরিচ্ছেদে জিজ্ঞাসা ছিল, ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতার ছন্দ কি? প্রথম দুই লাইনের মাত্রা গণনা করে বোঝা হবে তার ছন্দ।
আমাদের | ছোট নদী || চলে বাঁকে | বাঁকে, I [ ১ ১ ২ | ১ ১ ১ ১ || ১ ১ ১ ১ | ১ ১ ]
বৈশাখ | মাসে তার || হাঁটুজল | থাকে। I [ ২ ২ | ১ ১ ২ || ১ ১ ২ | ১ ১ ]
ছন্দ মেলে মাত্রাবৃত্তর ৪-মাত্রার চালে, বৈশাখের বৈ কে রুদ্ধদল ধরলে। বৈ কে বই ধরার কারণ, ঐ = অ+ই যুগ্ম স্বরধ্বনি এবং সেজন্য তার মাত্রা দুই। অন্য রুদ্ধদলঃ দের, শাখ, তার ও জল। বাকি সব মুক্তদল। মাত্রাবৃত্তর আরেক নমুনায় রইল, একালের জনপ্রিয় এক কবিতার শেষ অংশ।
আমার পরে | যে বোন ছিলো || চোরাপথের | বাঁকে [৫ | ৫ | ৫ | ২]
মিলিয়ে গেছে, | জানি না আজ || কার সঙ্গে | থাকে [৫ | ৫ | ২+৩ | ২]
আজ জুটেছে, | কাল কি হবে? || – কালের ঘরে | শনি
আমি এখন | এই পাড়ায় || সেলাই দিদি: মণি [৫ | ২+৩ | ৩+২ | ২]
তবু আগুন, | বেণীমাধব, || আগুন জ্বলে | কই? [৫ | ৫ | ২+৩ | ২]
কেমন হবে, | আমিও যদি || নষ্ট মেয়ে | হই? [৫ | ৫ | ৩+২ | ২]
(‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’, জয় গোস্বামী)
ছন্দের চাল ৫-মাত্রার, ৩+২ বা ২+৩। প্রতি চরণে তিন পূর্ণপর্ব ও ২-মাত্রার ভাঙ্গা-পর্ব। মাত্রাবৃত্তের নিয়মে রুদ্ধদল পায় ২ মাত্রা। দ্বিতীয় পঙ্ক্তির সঙ্গে = সঙ + গে, এবং ষষ্ট পঙ্ক্তির নষ্ট = নষ্ + ট এই দুই শব্দের প্রথমে রুদ্ধদল। পঞ্চম পঙ্ক্তির জ্বলে দেখায় যুক্তবর্ণ জ্ব, উচ্চারণে যে হয় জ। অতএব জ্বলে = জ+লে দেখায় দুই মুক্তদল। অন্য রুদ্ধদল রয়েছে শব্দদের শেষে বা মাঝখানে, এবং আলাদা ভাবে। লঘুযতিলোপ পড়েছে ‘দিদি’ র পরে।
মাত্রার আলোচনায় ২-৩ সেক্,শনে কয়েকটি রচনাকে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের পরিচয় উভয় রূপে - কবিতায় ও গানে। এদের গুরুত্ব ও আকর্ষণ বিশেষ রকম। উদাহরণ স্বরূপ একটির কবিতা-রূপের ছন্দকে বিশ্লেষণ করা হল। ছন্দ মিলছে মাত্রাবৃত্ত রীতির নিয়মে।
দুর্গম গিরি, | কান্তার-মরু, || দুস্তর পারা : বার | [২ ২ ১ ১ | ২ ২ ১ ১ | ২ ২ ১ ১ | ২ ]
লঙ্ঘিতে হবে | রাত্রি নিশীথে, || যাত্রীরা হুঁশি : য়ার। [২ ১ ১ ১ ১ | ২ ১ ১ ১ ১ | ২ ১ ১ ১ ১ | ২ ]
(‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’, নজরুল ইসলাম)
ছন্দের কাঠামো ৬+৬+৬+২। এক-এক পর্বে ৬ মাত্রা (৪+২) ও ভাঙ্গা পর্ব ২-মাত্রার, এবং পর্ব সমষ্টিতে ২০ মাত্রার সারি। প্রথম সারিতে রুদ্ধদল রয়েছে প্রথম পর্বে - দুর্ + গম, দ্বিতীয় পর্বে - কান্ + তার, তৃতীয় পর্বে - দুস্ + তর, এবং চতুর্থ পর্বে - লঘুযতিলোপে ভাঙ্গা পর্ব ‘বার’। দ্বিতীয় সারির রুদ্ধদলঃ প্রথম পর্বে - ‘লঙ্ +ঘি+তে’ র লঙ্, দ্বিতীয় পর্বে - 'রাত্রি (রাত্+রি)’ র রাত্, তৃতীয় পর্বে - ‘যাত্রী (যাত্+ রী)’ র যাত্, এবং চতুর্থ পর্বে - লঘুযতিলোপে ভাঙ্গা পর্ব ‘য়ার’। বাকি সব মুক্তদল।
৩-৩ মিশ্রবৃত্ত ছন্দ
এই রীতিতে রুদ্ধদলের উচ্চারণ হয় মিশ্রিত ভাবে, অর্থাৎ তার মাত্রামূল্য এক অথবা দুই হতে পারে। অক্ষরবৃত্ত নামে ছন্দটির পুরোনো পরিচয়। নতুন নাম মিশ্রবৃত্ত, যে দল-মাত্রার মিশ্র রূপকে বোঝায়। রুদ্ধদল শব্দের প্রথমে বা মাঝে থাকলে তার মাত্রা হবে এক। যদি রুদ্ধদল শব্দের শেষে বা আলাদা ভাবে থাকে তাহলে তার মাত্রা হবে দুই। ছন্দের চাল ৪ মাত্রায়। পর্বের গঠন শুরু হয় সেই মাত্রায়, সঙ্গে তার মাত্রা বাড়ান হয় ৪-এর গুণিতক সংখ্যায়। মূল পর্ব ৪, ৮, কিংবা যোগ করে ৬ বা ১০ মাত্রায় হয় যখন সাথে থাকে ২-গুণিতক মাত্রার ভাঙ্গা-পর্ব। মিশ্রবৃত্ত ছন্দের লয় ধীর হওয়ায়, এর আবৃত্তির গতি অন্য দুই ছন্দ রীতির তুলনায় বিলম্বিত। উদাহরণ,
হাজার বছর ধরে | আমি পথ হাঁটিতেছি || পৃথিবীর পথে, [১+২ ১+২ ১ ১ | ১ ১ ২ ১ ১ ১ ১ || ১+১+২ | ১ ১]
সিংহল সমুদ্র থেকে | নিশীথের অন্ধকারে || মালয় সাগরে [১+২ ১+২ ১ ১ | ১+১+২ ১+১+২ || ১+২ | ১ ১ ১]
অনেক ঘুরেছি আমি; | বিম্বিসার অশোকের || ধূসর জগতে [১+২ ১ ১ ১ ১ ১ | ১+১+২ ১+১+২ || ১+২ | ১ ১ ১]
সেখানে ছিলাম আমি; | আরো দূর অন্ধকারে || বিদর্ভ নগরে; [১ ১ ১ ১+২ ১ ১ | ১ ১ ২ ১+১+২ || ১+১+১ | ১ ১ ১ ]
(‘বনলতা সেন’, জীবনানন্দ দাশ)
এই স্তবকে তিন পর্ব নিয়ে প্রতি পঙ্ক্তি, যাতে মাত্রার কাঠামো ৮+৮+৬। মাত্রা-গণনা দেখান হয়েছে সারিগুলির পাশে। যে শব্দে রুদ্ধদল রয়েছে তাদের মাত্রা গণনার নির্দেশ রাখা হয়েছে যোগ চিহ্ন দিয়ে। প্রথম ও মাঝের যে রুদ্ধদল তার মাত্রা ১, আর শেষের বা আলাদা থাকা রুদ্ধদলের মাত্রা ২। সারির প্রথমে থাকায় সিংহল শব্দে অনুস্বর (ং) কে মাত্রা ধরা হয়নি। সমুদ্র শব্দে, র-ফলা থাকায় ‘দ্র’ কে আলাদা দল বলে ধরা হয়নি। তার দল চিহ্নিত হয়েছে ‘মুদ্র’ তে, ‘মু’ র সাথে।
ইতিপূর্বে জানিয়েছি, অক্ষরবৃত্তর আধুনিক নাম মিশ্রবৃত্ত। অক্ষর গুনতি করে অক্ষরবৃত্তের গঠন চেনা হয়। এক এক লাইনে যতগুলি অক্ষর বা বর্ণ দেখতে পাওয়া যায় ততগুলি তার মাত্রা। অক্ষরের ও যুক্তাক্ষরের মাত্রামূল্য সমান। রুদ্ধদলের মাত্রা বিচারঃ শব্দের প্রথমে বা মাঝে থাকলে ১-মাত্রা, আর শেষে বা আলাদায় থাকলে ২-মাত্রা। ৪ বা ৪-এর গুণিতক সংখ্যার সাথে ২ যোগ করে যে সংখ্যা হয়, ততগুলি মাত্রা দিয়ে তৈরী হয় অক্ষরবৃত্তের এক-এক সারি। নামের সাথে সারির মাত্রা জানিয়ে তার উল্লেখ হয়, যেমন - অক্ষরবৃত্ত ১৪-মাত্রা।
‘বনলতা সেন’ কবিতার যে অংশটি উপরে আছে, তার প্রতি লাইনের অক্ষর গুনলে দেখা যায় সেই ৮+৮+৬ মাত্রার কাঠামো।
অক্ষরবৃত্তর লক্ষণ বোঝাতে পেশ করি আরেক দৃষ্টান্ত, বাংলা কাব্যের অতিশ্রেষ্ঠ এক কবিতা থেকে-
চিত্ত যেথা | ভয়শূন্য, || উচ্চ যেথা | শির, [১ ১ ১ ১ | ১ ১ ২ || ১ ১ ১ ১ | ১ ১]
(‘নৈবেদ্য, ৭২’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
অক্ষরবৃত্তর হিসেবে পঙ্ক্তিটিতে অক্ষরের সংখ্যা ১৪। সারির পাশে যে মাত্রা গণনা দেখান হয়েছে সেই মত মাত্রার সংখ্যাও ১৪। প্রথম ও তৃতীয় পর্বে, চিত্ত=চিত্+ত এবং উচ্চ=উচ্+চ। রুদ্ধদল শব্দ দুটির প্রথমে আছে জন্য তাদের মাত্রা ১, যার ফলে দুটি শব্দই ২- মাত্রার। দ্বিতীয় পর্বে, ভয়শূন্য (ভ+য়+শূন্য) শব্দে রুদ্ধদল ‘শূন্য’ রয়েছে শেষে তাই তার মাত্রা ২। ‘ন্য’ কে আলাদা দল বলে ধরা যায় না। য-ফলা ইয়ে বোঝায় বলে তার উচ্চারণ মুক্ত ভাবে হতে পারে না। ন্য হয় ন ও য-ফলার যুক্ততায়, এবং ‘শূন্য’ তে সে আশ্রিত ধ্বনি।
৩-৪ ছন্দের রীতি চেনার পদ্ধতি
১) প্রথম দুই লাইনে যতির জায়গাগুলি ঠিক ঠিক ধরা।
২) পর্বগুলি ভাগ করে লাইন দুটি পড়ার সময়ে শুনতে ভাল লাগছে কিনা দেখা।
৩) প্রতি পর্বে দলেদের চিহ্নিত করা।
৪) দেখতে হবে, কোন রীতির নিয়মে দলেদের মাত্রা নির্ধারণ করলে প্রথম সারির পর্বগুলির মাত্রাসংখ্যা সমান সমান হয়?
৫) মাত্রা গণনা শুরু করা যেতে পারে দলবৃত্তর নিয়মে। (এতে সব দল ১ মাত্রা)।
৬) দ্বিতীয় সারিকেও পরখ করতে হবে দলবৃত্তর নিয়মে। দেখতে হবে পর্বে পর্বে মাত্রাদের সমতা সেখানেও থাকছে কিনা?
৭) যদি মাত্রাসমতা না মেলে, অথচ লাইন দুটি পড়তে গিয়ে শুনতে ভাল লাগছে তাহলে পর্ব ভাগে ভুল নেই।
৮) এরপর দেখতে হবে অন্য রীতিদের নিয়ম মেলে কিনা?
(দুই রীতিতেই মুক্তদল ১ মাত্রা; রুদ্ধদল মাত্রাবৃত্তে ২ মাত্রা, আর মিশ্রবৃত্তে ১ অথবা ২ মাত্রা।)
৯) তিন রীতির মধ্যে যে রীতি অনু্যায়ী পর্বদের মধ্যে মাত্রার সমতা ও মিল পাওয়া যাচ্ছে, তাকেই সঠিক রীতি বলে ধরা হবে।
৪। ছন্দের রূপ
ছন্দের রূপ তার বহিঃপ্রকৃতি। বাংলা কবিতার সেই বাইরের অবয়বকে দেখা হয় অনেক রূপে, যেমন- একপদী, দ্বিপদী, ত্রিপদী, চৌপদী, পয়ার, সনেট, অমিত্রাক্ষর, প্রভৃতিতে। তিন ছন্দ-রীতির প্রত্যেকটির অবলম্বনে এই সব ছন্দ-রূপের নির্মাণ সম্ভব।
দ্বিপদীর ও ত্রিপদীর দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে সেকশন ২-৬ তে। নিচের উদাহরণটি এক চৌপদীর। মাত্রাবৃত্ত রীতিতে তৈরী এর পূর্ণপর্ব পাঁচমাত্রায় এবং ভাঙ্গা-পর্ব দু-মাত্রায়।
আধেক লীন | হৃদয়ে দূর : গামী || [১ ২ ২ | ১ ১ ১ ২ : ১ ১ ||]
ব্যথার মাঝে | ঘুমিয়ে পড়ি | আমি || [১ ২ ১ ১ | ১ ১ ১ ১ ১ | ১ ১ || ]
সহসা শুনি | রাতের কড়া | নাড়া || [১ ১ ১ ১ ১ | ১ ২ ১ ১ | ১ ১ ||]
‘অবনী বাড়ি | আছো?’ I [১ ১ ১ ১ ১ | ১ ১ I]
(‘অবনী বাড়ি আছো’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
৪-১ পয়ার
পয়ার তৈরী হয় ১৪ মাত্রার দুই পঙ্ক্তি সাজিয়ে, যাদের প্রতিটিতে থাকে ৮ ও ৬ মাত্রার দুটি পদ। পয়ারের বিশেষত্ব, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর উক্তিতে, “আট-ছয় আট-ছয়/পয়ারের ছাঁদ কয়”। তিন ছন্দ রীতিতেই পয়ার রচিত হয়। এক মিশ্রবৃত্ত রীতির পয়ারের উদাহরণ-
মহা ভার : তের কথা || অমৃত | সমান। I [১ ১ ১ ১ | ২ ১ ১ || ১ ২ | ১ ২ I ]
কাশীরাম | দাস কহে || শুনে পু : ণ্য বান্। I [ ১ ১ ২ | ১ ১ ১ ১ || ১ ১ ১ | ১ ২ I ]
(‘মহাভারত’, কাশীরাম দাস)
৪-২ অমিত্রাক্ষর
বাংলা ভাষায় অমিত্রাক্ষর ছন্দর প্রবর্তন করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। পয়ার ধাঁচের এই ছন্দে অন্ত্যমিল, বা চরণের শেষে কোন মিত্রাক্ষর বা মিল থাকে না। মিল না থাকলেও প্রতি চরণের মাত্রাসংখ্যা নির্দিষ্ট, সাধারণত ১৪; এবং পর্বের মাত্রা সংখ্যাও নির্দিষ্ট, ৮ বা ৬। ছন্দটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ভাবের প্রবহমানতা। ভাবের প্রকাশ চরণ-অনুসারী নয়। এক চরণে এক নির্দিষ্ট ভাবের প্রকাশ হবে এমন নয়, বরং ভাব এক চরণ থেকে আরেক চরণে প্রবহমান; এবং বাক্য শেষ হতে পারে চরণের মাঝখানে। আর এক বৈশিষ্ট্য, বিরতি দেয়ার স্বাধীনতা ও যেখানে যে বিরামচিহ্নর প্রয়োজন তার ব্যবহার। যেমন,
জাগে রথ, রথী, গজ, || অশ্ব, পদাতিক | (৮+৬)
অগণ্য। দেখিলা রাজা || নগর বাহিরে, | (৮+৬)
রিপুবৃন্দ, বালিবৃন্দ || সিন্ধুতীরে যথা, | (৮+৬)
নক্ষত্র-মণ্ডল কিংবা || আকাশ-মণ্ডলে। I (৮+৬)
(‘মেঘনাদবধকাব্য’, মাইকেল মধুসূদন দত্ত)
এখানে কোন চরণের শেষেই অন্ত্যমিল নেই। আবার প্রথম বাক্যটি চরণের শেষে সমাপ্ত না হয়ে প্রবাহিত হয়ে আর এক চরণের শুরুতে সমাপ্ত হয়েছে, ‘অগণ্য’ তে। অন্ত্যমিল না থাকা এবং ভাবের বা বাক্যের প্রবহমানতা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রধান দুই বৈশিষ্ট্য।
৪-৩ সনেট
সনেটের জন্ম ইটালীয়ান কবিতায়। বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেন মধুসূদন দত্ত, চতুর্দশপদী নাম দিয়ে। গঠনের বিশেষতা, দুই স্তবকে ১৪টি সারি এবং সেই দুই স্তবকের সারির-সংখ্যা ৮ ও ৬। প্রথম ৮-সারির স্তবককে অষ্টক ও শেষ ৬-সারির স্তবককে ষটক বলা হয়। প্রথম স্তবকে থাকে কোন সমস্যা বা ভাবের প্রকাশ, আর দ্বিতীয় স্তবকে বর্ণিত হয় সে সমস্যার সমাধান বা পরিণতি। অন্ত্যমিল থাকে নির্দিষ্ট নিয়মে। মধুসূদন রচিত ‘বঙ্গভাষা’, বাংলার প্রথম সনেট। মিশ্রবৃত্ত ছন্দে রচিত কবিতাটির প্রতি সারির প্রথম পর্ব ৮ মাত্রার ও দ্বিতীয় পর্ব ৬ মাত্রার, দুই পর্ব মিলে ১৪ মাত্রা। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, কবিতাটির প্রথম দুই সারি ও সাথে এক বিশ্লেষণ দেওয়া হল ।
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;- (৮+৬)
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি, (৮+৬)
হে বঙ্ গ ভান্ : ডা রে ত ব||বি বি ধ | র তন |[১ ১ ১ ১ : ১ ১ ১ ১ || ১ ১ ১ | ১ ২ ]
তা স বে অ : বোধ আ মি |অ ব হেলা | ক রি |[১ ১ ১ ১ : ২ ১ ১ || ১ ১ ২ | ১ ১ ]
প্রথম সারিতে, প্রথম পর্ব - হে + বঙ্ + গ + ভান্ = ৪ মাত্রা (২ মুক্তদল ও ২ রুদ্ধদল শব্দের প্রথমে) ও লঘুযতিলোপ; দ্বিতীয় পর্ব - ডা+রে +ত+ব = ৪ মাত্রা (মুক্তদল); তৃতীয় পর্ব - বি+বি+ধ = ৩ মাত্রা (মুক্তদল); চতুর্থ পর্ব - র+তন = ৩ মাত্রা (মুক্তদল ও শব্দ শেষের রুদ্ধদল)। পর্ব সমষ্টিতে ৪+৪+৩+৩ = (৮+৬) = ১৪ মাত্রার সারি। দ্বিতীয় সারিতে, প্রথম পর্বে - তা+ স+বে + অ =৪ মাত্রা (মুক্তদল) এবং লঘুযতিলোপ; দ্বিতীয় পর্বে - বোধ+ আ+মি = ৪ মাত্রা (প্রথমে শব্দ শেষের ১ রুদ্ধদল ও ২ মুক্তদল); তৃতীয় পর্ব - অ+ব+হেলা = ৪ মাত্রা (২ মুক্তদল ও শব্দ শেষের ১ রুদ্ধদল), চতুর্থ পর্ব - ক+রি = ২ মাত্রা (মুক্তদল), মোট (৮+৬) = ১৪ মাত্রা।
৪-৪ গদ্যছন্দ
বাংলায় গদ্যছন্দে কবিতা লেখা শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর গোড়ায়। কবিতার মতই পঙ্ক্তি সাজিয়ে প্রথম গদ্যকবিতা লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯২৫ সালে। অনেকের অভিমতে প্রথম উৎকৃষ্ট বাংলা গদ্যকবিতা “শিশুতীর্থ”, লেখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে ১৯৩১ সালে। অনেক গদ্যকবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তাদের অন্যতম কয়েকটিঃ ‘আমি’, ‘সাধারণ মেয়ে’, ‘পৃথিবী’, ইত্যাদি। পরে সমর সেন, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু ও অনেক কবির অবদানে মৌখিক ভাষার আদলে লেখা বাংলা গদ্যকবিতার অগ্রগতি হয়।
গদ্যছন্দে নিয়মিত ভাবে পর্বের গঠন নেই। পর্বগুলো নানা মাত্রার হয় এবং পর্ব-দৈর্ঘ্যে কোন ধরনের মিল বা সমতা থাকে না। পদ ও চরণ যতির দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং বিরাম চিহ্ন বা ছেদ চিহ্ন দিয়ে হয়। এই বিরাম বা ছেদ উচ্চারণের সুবিধার্থে নয়, বরং অর্থ প্রকাশের সুবিধার জন্য। গদ্যে লেখা হলেও পড়ার সময় এক ধরনের ছন্দের আভাস বা ধ্বনি-স্পন্দন পাওয়া যায়। যেমন-
অনেক অনেক দূরে আছে মেঘ মদির মহুয়ার দেশ,
সমস্ত সেখানে পথের দুয়ারে ছায়া ফেলে
দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য,
আর দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস
রাতের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে।
আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়ার ফুল,
নামুক মহুয়ার গন্ধ।
(‘মহুয়ার দেশ’, সমর সেন)
ইদানিং কালে রচিত এক গদ্যকবিতার দৃষ্টান্ত দেয়া হল নিচে। কবিতাটি বিতর্কিত এবং তার উৎস হয়ত উদ্ধৃতির শেষটা। কবিতাটি লেখা হয়েছে সেই ব্যক্তির উদ্দ্যেশে, বাংলা ভাষায় যার অবদান অপরিমেয়। একশ বছর ধরে বহু ক্ষমতাশালী সাহিত্যিক তাঁর প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। পরিহাস ছলে ব্যক্ত হয়েছে এখানে যে অনুরাগ, সেটা বাঙালি হৃদয়ে চিরস্থায়ী।
কে আপনাকে বলেছিল, ‘বসন্ত রোদন ভরা’
আপনি দেখেছিলেন?
হায়! হায়!
আপনি সব জেনেশুনে আমাদের সর্বনাশ করে গেছেন,
যে দিকে তাকাই শুধু লিরিকের লতা,
হাওয়ায় গড়িয়ে পড়ে,
ন্যাকা মেয়েছেলে যেন কিছুই জানেনা।
(‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, তারাপদ রায়)
পরিশেষ
লেখার শেষ পর্যায়ে এসে মূল কথার পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন থেকে যায়। কবিতা লেখা হবে ছন্দে কিংবা ছন্দ-ছাড়া সে সিদ্ধান্ত কবি নিয়ে থাকেন, যে কথাটি বলা হবে তার সুন্দর ও পরিপূর্ণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে। এবং সে তাগিদেই তিনি এক ছন্দ-রীতি বেছে নিয়ে থাকেন। কখনো কখনো সে রীতির নিয়ম তিনি ভাঙেন বা পাল্টান। দলবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং মিশ্রবৃত্ত ছন্দ এক-এক রকমের মাত্রা ভিত্তিক কাঠামো। ছন্দের তৈরি যে রীতির নিয়মেই হোক, সারিতে সারিতে মাত্রা-সংখ্যা সমান হবে, এবং পর্বের চালে ও পদে পদে মাত্রা সংখ্যার সমতা থাকবে। অন্যদিকে ছন্দ-ছাড়া লেখার নাম ফ্রি ভার্স বা গদ্যছন্দ। সে রীতিতে কথার প্রকাশই মুখ্য, বলার ভঙ্গি গৌণ। অগণিত কবি ছন্দ জাতীয় কাঠামো না জেনে অথবা জানার পরেও তাকে না মেনে কবিতা লিখেছেন, লিখছেন ও লিখবেন সেই ফ্রি ভার্সে।
সহায়তায়
১। “বাংলা কবিতার ছন্দ”, অমল পাল, ২০১১, লালমাটি প্রকাশন
২। “কবিতার ক্লাশ”, নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী, ১৯৯৫, আনন্দ পাবলিশার্স
৩। “ছন্দ”, প্রবন্ধ, রবীন্দ্র-রচনাসমগ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী; www. rabindra-rachanabali.nltr.org
৪। “বাংলা কবিতায় ছন্দের ব্যবহার”, সাহিত্য আলোচনার এক উপস্থাপন, সুদীপ্ত ভৌমিক, ২০১২, আনন্দ মন্দির, নিউ জার্সী।
৫। “Bengali Poetry”, Wikipedia, http://bn.wikipedia.org/wiki/বাংলা_লিপি
৬। “বাংলা-ছন্দ”, প্রবন্ধ, জীবেন্দ্র সিংহরায়, www.edpdbd.org
৭। “বাংলা ছন্দের ধারাবাহিক বিকাশ”, প্রবন্ধ, হাসানাল আব্দুল্লাহ, mukto-mona.com/bangla_blog
৮। “বাংলা কবিতার পরিক্রমাঃ ছন্দ, অন্ত্যমিল ও গদ্যকবিতা”, প্রবন্ধ, লুতফুল বারি পান্না, www.golpokobita.com/blogs/2721
৮। http://adarshalipi.blogspot.com
৯। http://chorakobita.wordpress.com
লেখক পরিচিতি: পেশায় কেমিক্যাল ইন্জিনীয়ার, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ। উচ্চশিক্ষার উদ্দ্যেশে মার্কিন দেশে আসা। ছাত্রাবস্থার পালা শেষ হওয়ার পর, দেশে ফেরা হয়নি। নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সী অঞ্চলে সময় কেটেছে। জন্ম খাস কলকাতায়, কৈশোর ও প্রথম যৌবন কেটেছে সেই মহানগরে। তিন দশক সময় পার করেও, “তোমাকে চাই, তোমাকে চাই” বলে কলকাতার জীবনকে মনে মনে ডাক দিয়ে থাকি।
(আপনার
মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)
অবসর-এর
লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য
অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।