প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

মোবাইল ফোনের কথা

তেরো চোদ্দ বছর আগেও মোবাইল ফোন সম্পর্কে আমাদের দেশের লোকের ধারণা ছিল খুবই সীমিত । পত্র পত্রিকায় এই বস্তুটির খবর মাঝেমধ্যে থাকতো । আমাদের দেশেও ফোনটা আসছে - এইটুকুই সাধারণ লোকে জানতো । আজকে সে চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে । এখন রাস্তায় ঘাটে মোবাইল ফোনের ছড়াছড়ি । ২০০৩-এর জানুয়ারি মাসে ভারতবর্ষে মোবাইল ফোনের সংখ্যা ছিল ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি । ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ৪৪.৯ মিলিয়নে (৪ কোটি ৪৯ লক্ষ) পৌঁছয় - যেটি ভারতবর্ষের সাধারণ টেলিফোনের (landline) সংখ্যার সমান । ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে সেই সংখ্যা ১৬৭.৪ মিলিয়ন, অর্থাৎ ১৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে । এতো অল্প সময়ের মধ্যে যে এই অগ্রগতি ঘটবে, তা ভারতবর্ষে মোবাইল ফোনের সাফল্য সম্পর্কে আশাবাদীরাও অনেকে ভাবেন নি!

মোবাইল ফোন নিয়ে কিছু লেখার আগে প্রথমেই টেলিফোন আর রেডিওর কথা বলে নেওয়া দরকার । ১৮৭৬ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে টেলিফোন উদ্ভাবন করেন অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম বেল । তার এক বছর বাদে বেল টেলিফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে তিনি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টেলিফোন পরিষেবা দেওয়া শুরু করেন । রেডিও আসে টেলিফোনের অনেক পরে । প্রথম রেডিও স্টেশন চালু হয় ১৯২২ সালে । কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে । রেডিওর যেটা মস্ত বড় সুবিধা সেটা হল এটি চলে বেতারে । ঘরে বাইরে যে কোনও জায়গা থেকেই রেডিও শুনতে অসুবিধা নেই । এই সুবিধা যদি টেলিফোনে থাকতো, অর্থাৎ যে কোনও জায়গা থেকে যদি টেলিফোন ব্যবহার করা যেতো, তাহলে এর উপযোগিতা যে আরও অনেক গুণ বাড়ত তাতে কোনও সন্দেহ নেই । রেডিওর উদ্ভাবন হতে না হতেই বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা উঠে পড়ে লাগলেন রেডিও-র প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি একটি চলমান টেলিফোন ব্যবস্থা তৈরি করা যায় । সাধারণভাবে রেডিও আর টেলিফোনের মধ্যে তফাৎ হল যে, রেডিও একমুখী । অর্থাৎ এতে শক্তিশালী প্রেরকযন্ত্র বা ট্র্যান্সমিটার (Radio Transmitter) দিয়ে গান-বাজনা-কথা ইত্যাদি সম্প্রচার করা যায়; গ্রাহকযন্ত্র বা রিসিভার-এর (Radio Receiver) মাধ্যমে যে-কেউ বহু দূর থেকেও তা শুনতে পায় । এইভাবে সবার জন্য একমুখী প্রচার করাকে বলা হয় 'ব্রডকাস্ট' করা । অন্যপক্ষে টেলিফোনের কথাবার্তা সবসময়ে দুমুখী । টেলিফোনের মধ্যমে দুজনে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে পারে - বিশ্বশুদ্বুì লোককে তা না শুনিয়ে । এই তফাৎটা চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, এই দুই প্রযুক্তিকে মেলানো খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার নয় ।

এই নিয়ে যখন একদিন আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করছিলাম, তখন বন্ধু-কন্যা হঠাৎ বলে উঠলো, এটা এমন কি কঠিন ব্যাপার ? প্রত্যেকের কাছে যদি একটা করে ট্র্যান্সমিটার আর রিসিভার থাকে তাহলেই তো দুজনের কথাবার্তা বলতে পারে । কথাটা ভুল নয়, তবে বাস্তবে সমস্যা অনেক । আমি তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, ভেবে দেখো, রেডিওতে একটা স্টেশন ধরতে আমাদের টিউনিং নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে (এযুগে বোতাম টিপেই) সেই স্টেশন যে কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সিতে অনুষ্ঠান প্রচার করছে, সেই ফ্রিকোয়েন্সিতে পৌঁছতে হয় । তাহলেই অনুষ্ঠানটা শুনতে পাওয়া যায় । বিভিন্ন রেডিও স্টেশন বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করে - যাতে একজনের প্রচারিত অনুষ্ঠান অন্যের অনুষ্ঠানে কোনও বাধার সৃষ্টি না করে । রেডিও দিয়ে মোবাইল ফোন করতে হলে - প্রত্যেকটি গ্রাহককে আলাদা আলাদা করে একটা ফ্রিকোয়েন্সি দিতে হবে । লক্ষ লক্ষ লোককে আলাদা আলাদা ফ্রিকোয়েন্সি দেওয়ার মত অতো ফ্রিকোয়েন্সি পৃথিবীতে নেই । এছাড়া, আরও বহু সমস্যা আছে । রেডিও স্টেশনের ট্র্যান্সমিটার দেখেছো কি - উঁচু উঁচু টাওয়ার আর কিরকম ভারী? সেটা বইবে কি করে? তার ওপর ঐ শক্তিশালী ট্রান্সমিটারের কাছে সেন্সেটিভ রিসিভার রাখলে সেটা মুহূর্তের মধ্যে অকেজো হয়ে পড়বে ।
আমার এই সহজ ব্যাখ্যাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বন্ধু-কন্যা বলল, তুমি ছাই জানো । বলে আমার বুক পকেট থেকে ওর বরাদ্দ চকলেট নিয়ে অদৃশ্য হল ।

সেকথা থাক । তবে ঠিক এই কারণেই ১৯৩০ সালে ডেট্রয়েট পুলিশ যখন তাদের গাড়িতে মোবাইল রেডিও বসিয়েছিল, সেগুলো জাতে ছিল সাধারণ রেডিও-ই - শুধু একটু মজবুত করে তৈরি আর বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে বাঁধা । এই রেডিও মারফৎ কন্ট্রোল রুম পুলিশদের নানা নিদেYশ দিতো । পুলিশদের কোনও প্রশ্ন থাকলে কাছাকাছি পাবলিক টেলিফোন বুথে গিয়ে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করত । এর কয়েক বছর বাদে অবশ্য আমরিকায় নিউ জার্সির স্টেটের বেয়োন শহরে পুলিশরা দ্বিমুখী মোবাইল রেডিও ব্যবহার আরম্ভ করল । কিন্তু এটি ছিল পুশ-টু-টক (হাফ-ডুপ্লে) প্রযুক্তি । অর্থাৎ কথা বলতে হলে বোতাম টিপে রেখে কথা বলতে হত । সেই সময়ে ট্র্যান্সমিটারটা কাজ করত, কিন্তু রিসিভার বন্ধ থাকত । এটি করার উদ্দেশ্য যাতে পাশের ট্র্যান্সমিটারের শক্তির দাপটে রিসিভার ক্ষতিগ্রস্ত না হয় । বেয়োন পুলিশদের জন্য তৈরি এই রেডিওগুলি ছিল বিশাল - পুলিশ-গাড়ির পুরো ট্রাঙ্ক বা ডিকি-ই লেগে যেতো এগুলোকে রাখার জন্যে ।

১৯৩৫ সালে এডউইন আর্মস্ট্রং এফএম (FM) রেডিও উদ্ভাবন করলেন । এর আগে যেসব রেডিও ব্যবহার করা হত সেগুলি ছিল এএম (AM) । এ দুটি প্রযুক্তির তফাৎ হল মডুলেশনের পদ্ধতির ।* এএম রেডিওতে নানারকমের বিরক্তিকর শব্দ (static) এসে হাজির হত । এফএম রেডিও-র উন্নততর প্রযুক্তিতে সেগুলো প্রায় পুরোটাই দূর হল । তার থেকেও বড় কথা এফএম রেডিওতে অনেক কম-শক্তির ট্র্যান্সমিটার লাগে । সুতরাং ট্র্যান্সমিটার ও রিসিভার পাশাপাশি রাখা এবং একসঙ্গে তাদের ব্যবহার করা অবশেষে সম্ভব হল । এছাড়া চলমান অবস্থার জন্য রেডিও তরঙ্গের যেসব সমস্যা হয়, যেমন 'ফাস্ট ফেডিং', এফএম রেডিওতে সেগুলি দেখা গেল অনেক কম । আর্মস্ট্রং-এর এই উদ্ভাবন খুবই কাজে লাগলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে । বিভিন্ন সৈন্যদলের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য এফএম প্রযুক্তির দুমুখী রেডিও কাজে লাগালো মিত্রশক্তি । প্রযুক্তিটিকে উন্নততর করার জন্যও সরকারী ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচুর গবেষণা আরম্ভ হল ।

এফএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৯৪৬ সালে আমেরিকার টেলিফোন কোম্পানি এ.টি.এন্ড টি (AT&T) মোবাইল টেলিফোনের পরিষেবা দেওয়া শুরু করল । সে সময়কার মোবাইল ফোন এখনকার মোবাইল ফোনের মত নয় । গাড়ির ভেতরে ২০-২৫ পাউন্ডের বিরাট দ্বিমুখী রেডিও (ট্র্যান্সমিটার-রিসিভার) বসানো থাকতো । বাইরে থাকতো একটা অ্যান্টেনা । এগুলি শহরের মাঝখানে একটা উঁচু টাওয়ারের সঙ্গে যুক্ত ট্র্যান্সমিটার ও রিসিভারের সঙ্গে যোগাযোগ করতো । সেগুলি আবার যুক্ত থাকতো টেলিফোনের অফিসে সঙ্গে - যেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হত । নিউ ইয়র্ক শহরে ১৯৭৬ সালে যেখানে প্রায় দু কোটি লোকের বাস, সেখানে মাত্র ৫৪৩ জন এই পরিষেবা পেত! এই পরিষেবার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল মাত্র ১৫ টি এফএম চ্যানেল । চ্যানেল হল একটা ফ্রিকোয়েন্সি-গুচ্ছ যেটি প্রয়োজন হয় বেতারে কথা-বার্তা বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য । এই প্রযুক্তিতে গ্রাহকের নিজস্ব কোনও চ্যানেল ছিল না । যে যখন কথা বলতে চাইতো, তখন তাকে ১৫ টি থেকে যে কোনও একটি চ্যানেল কথাবলার সময়টুকুর জন্য দেওয়া হত । তার কথা শেষ হলেই সেটি অন্য যে গ্রাহক কথা বলতে চাইছে তাকে দেওয়া হত । অর্থাৎ, এই পরিষেবায় একই সময়ে ১৫ জন গ্রাহকের বেশি কথা বলতে পারতো না । ষোলতম গ্রাহক কথা বলতে চাইলে লাইন পেত না । টেলিফোনের ভাষায় এটাকে বলা হয় 'ব্লকিং' । এক আধ সময়ে সাধারণ টেলিফোনেও এটা ঘটে - সবগুলি সার্কিট ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ডায়াল-টোন পাওয়া যায় না । তবে নিউ ইয়র্কের মত শহরে যদি ১৫ জনের বেশি এক সঙ্গে কথা বলতে না পারে, তাহলে বাস্তবিকই একটা সমস্যা । বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন এই মোবাইল প্রযুক্তি জনপ্রিয় হয় নি ।

প্রশ্ন জাগতে পারে মাত্র ১৫ টা চ্যানেলের বদলে ১৫০০ চ্যানেল দিলে অসুবিধা কি ছিল । অসুবিধা হল বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি অনুমোদিত হয়ে আছে । ইচ্ছেমত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করার উপায় নেই । সুতরাং যেটুকু বরাদ্দ করা হয়েছে সেটিকেই উন্নততর প্রযুক্তি দিয়ে আরও ভালো ভাবে সদ্ব্যবহার করতে হবে ।

একটা কথা বলা হয় নি । ১৯৪৬ সাল থেকেই বেল ল্যাবোরেটরিজের কিছু বিজ্ঞানী খাতায় কলমে নতুন ভাবে মোবাইল টেলিফোনের গঠনপ্রণালী নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিলেন । তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন সাধারণ রেডিও পরিষেবায় যে ভাবে ট্রান্সমিটার ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ বিশাল শক্তিসম্পন্ন ট্র্যান্সমিটার যার প্রেরিত রেডিও বার্তা মাইলের পর মাইল গিয়ে পৌঁছায়, সেটা মোবাইল ফোনের পক্ষে উপযুক্ত নয় । মোবাইল ফোনের পরিষেবা দিতে হবে খুব অল্প-শক্তিশালী ট্র্যান্সমিটার ব্যবহার করে - যাতে সেই ট্র্যান্সমিটারের বার্তা পাঠাবার ক্ষমতা এক-আধ মাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে । তাতে সুবিধা কি? সুবিধা হল, সেই ট্র্যান্সমিটারের এক দেড় মাইল দুরে আবার সেই একই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা যাবে (frequency reuse) - প্রথম ট্র্যান্সমিটারের প্রেরিত বার্তায় কোনও রকম বিঘ্ন বা interference না ঘটিয়ে । এতে লাভ হচ্ছে দুটো । যেহেতু একই ফ্রিকোয়েন্সি (বা চ্যানেল) বার বার ব্যবহার করা যাবে, অজস্র চ্যানেলের প্রয়োজন হবে না; আর যেহেতু ট্রান্সমিটারের শক্তি খুব কম হবে - ট্র্যান্সমিটার-রিসিভার তৈরি করতে এবং একসঙ্গে তাদের কাজ করতে কোনও অসুবিধা হবে না ।

এবার তাঁরা পরিষেবা দেবার জন্য একটা শহরকে বহু ছোট ছোট সেল-এ (cell) ভাগ করলেন । প্রত্যেক সেলেই একটা করে ছোট ট্র্যান্সমিটার-রিসিভার টাওয়ার থাকবে এবং সেই সেলের জন্য নির্দিষ্ট কতগুলি চ্যানেল থাকবে - যেগুলো আবার দূরে অন্য সেল-এ ব্যবহার করা হবে । মোবাইল টেলিফোন যেই সেলের মধ্যে থাকবে সেই সেলের জন্য নির্দিষ্ট যে কোনও একটি চ্যানেল দিয়ে সেলের টাওয়ার মারফৎ তার টেলিফোন সংযোগ ঘটবে । এক সেল থেকে মোবাইল ফোন যখন অন্য সেল-এ যাবে - ঠিক তার আগে, প্রথম টাওয়ার পাশের টাওয়ারকে বলবে আগন্তুক মোবাইল-এর জন্য একটা চ্যানেল-এর বন্দোবস্ত করতে - যাতে সেখানে ঢোকা মাত্র কানেকশনটা না কেটে আগের চ্যানেল থেকে নতুন চ্যানেল-এ মোবাইল 'কল'-টা হস্তান্তরিত (hand-off) হয় । এই প্রযুক্তিকে বলা হয় সেলুলার (cellular) প্রযুক্তি । এইজন্যেই বহু দেশে 'মোবাইল ফোন'-এর বদলে বলা হয় সেল-ফোন, আর পরিষেবাকে বলা হয় সেলুলার পরিষেবা ।

খাতায় কলমে এটি চমৎকার হলেও বহুদিন - এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় নি । তার কারণ এটি ব্যবহার করতে গেলে সেল থেকে সেলে যাবার সময়ে রেডিও রিসিভারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে টিউন করতে হবে নতুন ফ্রিকোয়েন্সিতে; দরকার হবে শক্তিশালী কম্পিউটার ও জটিল সফটওয়্যার-এর । কিন্তু সব কিছুই ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো । প্রথম সেলুলার পরিষেবা চালু হল ১৯৮৩ সালে শিকাগোতে । এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হল অ্যাডভান্সড মোবাইল ফোন সার্ভিস (AMPS)।

কিন্তু এতেও বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা সন্তুষ্ট হলেন না । AMPS প্রযুক্তিতে গ্রাহকদের কথা বলার সময় এক একটি করে চ্যানেল দেওয়া হয়, কিন্তু সত্যিই কি সেটার প্রয়োজন আছে? একই সঙ্গে একটা চ্যানেল বিভিন্ন গ্রাহকরা কেন ব্যবহার করতে পারবেন না? AMPS রেডিও ছিল অ্যানালগ (analog) রেডিও । উদ্ভাবিত হল ডিজিটাল রেডিও - যাতে ব্যবহার করা যায় টাইম ডিভিশন মাল্টিপল অ্যাকসেস (TDMA) এবং কোড ডিভিশন মাল্টিপল অ্যাকসেস (CDMA) পদ্ধতি । শব্দগুলো গালভারী এবং প্রযুক্তিও যথেষ্ট গোলমেলে । কিন্তু সহজ ভাষায় জটিলতা এড়িয়ে এটা একটু আলোচনা করা যাক । আমরা যদি মনে করি চ্যানেলগুলো হচ্ছে এক একটা ঘর । সেই ঘরে যখন দুজন বসে কথা বলছে; তখন পাশের ঘরেও দুজন বসে কথা বলতে পারে - তাতে কোনও অসুবিধা হবে না । কিন্তু একইসঙ্গে যদি চারজন, ছয়জন কি আটজন একই ঘরে বসে যদি একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করে তবে অবশ্যই গোলমালে কথা ভালো শোনা যাবে না । কিন্তু বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন - যখন কেউ কথা বলছে, তখন সেটি যদি খুব অল্প অল্প বিরতি দিয়ে অতি অল্প সময়ের জন্য রেকর্ড করা হয় (এখানে আমরা মাইক্রো সেকেন্ড অর্থাৎ, অর্থাৎ সেকেন্ডকে দশ লক্ষ ভাগ করলে যে সময়টুকু পাওয়া যায় - সেই মাত্রায় কথা বলছি) তাহলে রেকর্ড করা অংশগুলো পরে জোড়া দিলে, কথাগুলি পরিষ্কারই বোঝা যাবে । আর ঐ বিরতির সময়ে অন্যদের কথাবার্তাও একই ধারায় রেকর্ড করা যাবে । এই পদ্ধতি ব্যবহার করে একই ঘরে উপস্থিত তিন জোড়া লোকের কথাবার্তা যদি পর্যায়ক্রমে রেকর্ড করতে থাকা যায় এবং সেগুলি পরে আলাদা ভাবে তিনটি জোড়া দেওয়া যায়, তাহলে সবগুলি কথাই পরিষ্কার শোনা যাবে কোনও গোলমাল ছাড়াই । এটাই হল TDMA-র মূল কথা ।

CDMA আরেকটু গোলমেলে । সেখানে একটা চ্যানেল ব্যবহার করা হয় না - সবগুলি চ্যানেলের সম্মিলিত ফ্রিকোয়েন্সিই একসঙ্গে ব্যবহার করা হয় । প্রত্যেকের কথাই একই সঙ্গে রেকর্ড করা হয় কিন্তু রেকর্ডিং-এর সময়ে প্রত্যেকটি কথাবার্তার সঙ্গে একটি কোড যোগ করা হয় এবং পরে অন্য প্রান্তে সেটিকে ডিকোড করা হয় । এই কোডিং ডিকোডিং-এর ব্যাপারটা গোলমেলে । একটা উদাহরণ অবশ্য দেওয়া যেতে পারে । যদি আমরা ভাবি যে, একই ঘরে বহু লোক একসঙ্গে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু তারা প্রত্যেকেই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে এমন একটা ভাষায় - যে ভাষা তারা ছাড়া উপস্থিত অন্য কেউ জানে না । সেক্ষেত্রে লোকেরা নিজেদের ভাষাটাই শুনতে ও বুঝতে পারবে - অন্যদের ভাষা সব সময়েই গোলমাল বলে মনে হবে । এই উদাহরণে ভাষা কোড-এর কাজ করছে । এই ব্যাখ্যাটা নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি রকমের সরল, কিন্তু তবুও কোডিং-এর ব্যাপারটা কিছুটা বোধহয় বোঝা যাবে ।

TDMA বা CDMA যে শুধু ফ্রিকোয়েন্সি গুচ্ছকে ভালো ভাবে সদ্ব্যবহার (spetrally efficient) করছে তা নয়, এটি ব্যবহার করার আরও সুবিধা আছে । াংশ-এর ক্ষেত্রে ফোনের কথাবার্তা বাইরের লোক চেষ্টা করলে শুনতে পারতো । TDMA ও CDMA প্রযুক্তি সে তুলনায় খুবই নিরাপদ । TDMA ভালো না CDMA ভালো - সে নিয়ে বহু বিতর্ক ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে । ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রামের সদ্ব্যবহারের দিক থেকে বিচার করলে CDMA নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতর - সে বিষয়ে এখন দ্বিমত নেই । তবে যখন কেউ সেলুলার প্রযুক্তি বাছতে চায়, তখন অন্যান্য অনেক কিছুই বিচার করতে হয় । ভারতবর্ষে মোবাইল পরিষেবা TDMA প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুরু হয় - এটি ছিল ইউরোপের GSM প্রযুক্তি । পরে CDMA প্রযুক্তিকেও ভারত গ্রহণ করেছে । রিলায়েন্স CDMA প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ও WLL (wireless in local loop) পরিষেবা শুরু করে । আমরা সাধারণ লোকেরা যখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করি, তখন এই প্রযুক্তি দুটির মধ্যে কোনও তফাৎই আমরা ধরতে পারবো না ।

লেখাটা শেষ করার আগে একটা গল্প বলার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না । নব্বই দশকের গোড়ার দিকে ভারতে যখন মোবাইল ফোন আনার প্রস্তুতি চলছিল, তখন একটি বিদেশী মোবাইল টেলিফোন নির্মাণ-সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লীতে বছর কয়েক কাটিয়েছিলাম । কলকাতায় কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে গিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে দুই খ্যতনামা লেখকের সঙ্গে গল্প করার সময়ে একজন মন্তব্য করেছিলেন, কেন এসব জিনিস এদেশে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন - কে কিনবে? আরেকজন সায় দিয়ে বলেছিলেন, ওসব বিদেশেই চলে ।
তাঁদের মধ্যে একজন প্রয়াত । অন্যজন বোধহয় তাঁর সেই মত পালটেছেন ।

সুজন দাশগুপ্ত
সেপ্টেম্বর ৭, ২০০৮

প্রথম চিত্র: বেল সিস্টেম মেমোরিয়াল ওয়েবসাইট থেকে ।

* যে কোনও মাধ্যমের সহায়তায় যখন বার্তা প্রেরণ করা হয় তখন বার্তার প্রকৃতি অনুযায়ী মাধ্যমের মধ্যে একটা কিছু পরিবর্তন সাধন করাকেই বলা হয় মডুলেশন । বেতারে অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্রেও মডুলেশন প্রয়োজন । কথাবার্তা বা গানবাজনায় যে শব্দতরঙ্গের উদ্ভব হয় তাকে প্রথম মাইক্রোফোনের সাহায্যে বিদ্যুৎপ্রবাহে রূপান্তরিত করা হয় - এই বিদ্যুৎপ্রবাহ যেন শব্দতরঙ্গের অবিকল প্রতিলিপি । বেতারের বাহক তরঙ্গের ( carrier wave) কোনও একটি বৈশিষ্ট্যকে এই বিদ্যুৎপ্রবাহের প্রকৃতি অনুযায়ী পরিবর্তিত করে দিলেই বাহক তরঙ্গ ঐ বার্তা বহন করতে সক্ষম হবে । এএম (AM) হল অ্যাম্পলিচুড মডুলেশন । অর্থাৎ, বার্তা বহন করতে বাহকের বিস্তার (amplitude) পরিবর্তন বা মডুলেশন করা হয় । বিস্তার ছাড়া তরঙ্গের কম্পন-সংখ্যার (frequency) বৈশিষ্ট্যের উপরেও মডুলেশন করা যেতে পারে - সেটা হল এফএম (FM) ।

 

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।