প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

ভগবত গীতার শিক্ষা ও প্রতিটি অধ্যায়ের সারাংশ সূচী

ভগবত গীতার শিক্ষা

ভগবত গীতা মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের (২৪ থেকে ৪২ অধ্যায়) অন্তর্গত| পন্ডিতগণ মনে করেন যে অষ্টম শতাব্দীতে শ্রীশঙ্করাচার্য প্রথম এই অধ্যায়গুলিকে মহাভারত থেকে আলাদা করেন এবং গীতা হিসাবে এর একটি ভাষ্য লেখেন| ভগবত গীতায় আঠারটি অধ্যায় আছে| এই আঠার অধ্যায়ে সাতশত শ্লোক আছে| ভগবত গীতা হচ্ছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর বন্ধু ও শিষ্য তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের কথোপকথনের মাধ্যমে বেদান্ত দর্শনের শিক্ষা|
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন গীতা হচ্ছে ধর্ম-সমন্বয় শাস্ত্র| গীতা উপনিষদের শ্রেষ্ঠ এবং সর্বোত্তম ভাষ্য| উপনিষদের নিম্নলিখিত সব তত্ত্বগুলিই গীতায় প্রাঞ্জল এবং সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে:

সংসার তত্ত্ব ও এই নিত্য সংসার থেকে মুক্তিলাভের উপায়
অবতার তত্ত্ব
পুর্নজন্ম তত্ত্ব
জীব তত্ত্ব
সগুণ ব্রহ্ম বা ঈশ্বর বা ভগবান
নির্গুণ ব্রহ্ম
ত্যাগ
কর্মযোগ
ভক্তিযোগ
রাজযোগ
জ্ঞানযোগ

কতকগুলি শিক্ষা গীতায় আছে যেগুলি বেদে অর্থাৎ উপনিষদে তেমন প্রাঞ্জলভাবে পাওয়া যায় না| যেমন নিষ্কাম কর্মযোগ, অবতার তত্ত্ব| ভক্তির কথা বলতে গিয়ে আর একটি নতুন চিন্তাধারাও গীতায় আছে যা হল প্রপত্তি অর্থাৎ সর্বতোভাবে ভগবানের শরণ নেওয়া|

ব্রহ্মবিদ্যাই গীতার মূখ্য প্রতিপাদ্য বিষয়| গীতায় বৈদিক ধর্মের যা কিছু চিন্তাধারা বা দার্শনিক তত্ত্ব আছে সেই সব চিন্তাধারা বা দার্শনিক তত্ত্বকে গ্রহণ করে সমন্বিত করা হয়েছে| এই সমন্বয় সাধনের মধ্যে দেখা যায় যে সে সময় সমাজে বৈ্দিক যজ্ঞাদির বহুল প্রচলিত ছিল শ্রীকৃষ্ণ প্রথমত তার সমালোচনা করলেন| তিনি বললেন, ‘ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্য ভবার্জুন’ অর্থাৎ হে অর্জুন, এই বেদের ভিতর সত্তঃ, রজঃ ও তমঃ এই ত্রিগুণের বিষয় আছে, তুমি ‘নিস্ত্রৈগুণ্য’ অর্থাৎ গুণাদির উর্দ্ধে চলে যাও| কেননা শুধু যজ্ঞাদি করলে ত্রিগুণের মধ্যে থাকতে হয়| কিন্তু সেখানেই তিনি থামলেন না| যজ্ঞাদি বিষয়ে সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গিকে এক আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করলেন| বেদের কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ডের মধ্যে এক সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত করলেন| তিনি বললেন নানা রকম যজ্ঞ আছে এবং যজ্ঞ ভিন্ন কিছু হয় না; তবে এইসব যজ্ঞ কেবল নিজের জন্য করতে হয় না, যজ্ঞ করতে হয় পরের কল্যাণের জন্য; পরের কল্যাণের জন্য এইসব যজ্ঞ যাঁরা করেন তাঁরাই ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন|

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন মানুষের জীবনে কর্মের প্রয়োজন আছে| কর্ম ছাড়া কেউ এক মূহুর্তও থাকতে পারে না| শরীর যতক্ষণ আছে, কর্মও ততক্ষণ আছে| শারীরিক কর্ম আপাত দৃষ্টিতে না থাকলেও মানসিক কর্ম থাকবেই| মানুষ জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বধর্ম অনুযায়ী কর্ম করা| ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, কর্মানুষ্ঠান না করে কেহ নৈষ্কর্ম নিষ্ক্রিয় আত্মারূপে অবস্থিতি অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করতে পারে না| কর্মযোগে চিত্ত শুদ্ধি ও আত্মবিবেক না হলে নৈষ্কর্ম সিদ্ধি হয় না| কেবল মাত্র জ্ঞানশূন্য কর্ম ত্যাগ দ্বারা উক্ত অবস্থা লাভ অসম্ভব| নিষ্কাম কর্মের মধ্য দিয়েই কর্মবন্ধন মোচন হয়, চিত্তশুদ্ধি হয়| সেই শুদ্ধচিত্তে আত্মা সাক্ষাৎকার ঘটে| অর্জুনকে তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘নিয়তং কুরু কর্ম’ অর্থাৎ সর্বদা শাস্ত্রবিহিত কর্ম কর| কর্ম সম্বন্ধে বললেন – অসক্তেন হ্যাচরণ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ অর্থাৎ অনাসক্ত হয়ে কর্ম করলে মানুষ পরমাগতি প্রাপ্ত হয়| ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কামনামূলক বৈদিক কর্মকাণ্ড অর্থাৎ প্রধানত যজ্ঞানুষ্ঠান পরিত্যাগ করে নিষ্কাম করম করার উপদেশ দিলেন| তিনি বললেন –

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন|
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি|| (২:৪৭)

অর্থাৎ কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনও তোমার অধিকার নাই| কর্মফল যেন তোমার কর্মপ্রবৃত্তির হেতু না হয়, কর্মত্যাগেও যেন তোমার প্রবৃত্তি না হয়|
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ এবং রাজযোগ, এই চারটি যোগ মুক্তি বা মোক্ষ লাভের পৃথক পৃথক পথ হলেও শেষে সব পথই এক তত্ত্বে মিলিত হয়|
গীতায় সগুণ ও নির্গুণ উপাসনাকে সমান স্থান দেওয়া হয়েছে|
ব্রাহ্মীস্থিতি বা ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করা, গুণাতীত যোগারূঢ় বা স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়াই গীতার উপদেশ|
গীতায় বলা হয়েছে যে ভগবানের অসংখ্য নাম, অসংখ্য রূপ| যে কোন একটি নামে বা রূপে আমাদের নিষ্ঠা হলেই মুক্তি লাভ হবে| নিষ্ঠাপূর্বক ভগবানের নাম জপ ও একটি রূপ ধ্যান করলেই মোক্ষ লাভ হবে| অপরের ইষ্টকে শ্রদ্ধা করা ইষ্টনিষ্ঠার একটি প্রধান সাধন|

গীতায় আত্মার অমরত্ব সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে| বলা হয়েছে আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, আত্মা অমর| মানবদেহের জন্ম হয় এবং মৃত্যু হয়| মৃত্যু আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না| মৃত্যুতে স্থূল দেহের বিনাশ হয় মাত্র| বস্ত্র জীর্ণ হলে তা পরিত্যাগ করে যেমন আমরা নূতন বস্ত্র পরিধান করি তেমনি আত্মা জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে নূতন দেহ গ্রহণ করে| মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম হয় অর্থাৎ পুনর্জন্ম হল দেহান্তর মাত্র| শৈশব, বাল্য, যৌবন ও জরার ন্যায় মৃত্যুও দেহের একটি অবস্থা মাত্র| আত্মাকে মৃত্যু বিনাশ করতে পারে না, অস্ত্র ছেদন করতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করতে পারে না, জল সিক্ত করতে পারে এবং বায়ু শুষ্ক করতে পারে না|
বেদে অবতারবাদ পাওয়া যায় না| সম্ভবত গীতাতেই সর্বপ্রথম অবতার তত্ত্ব সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে| দেবত্ব ও মানবত্বের অপূর্ব মিলন অবতার তত্ত্বে দৃষ্ট হয়| ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন –

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত|
অভ্যুত্থানমর্ধর্মস্য তদাত্মানাং সৃজাম্যহম্|| (৪:৭)

অর্থাৎ হে ভারত, যখনই ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যত্থান হয়, আমি সেই সময়ে নিজেকে সৃষ্টি করি (মনুষ্য দেহ ধারণপূর্বক অবতীর্ণ হই; সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদিগের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই|
ভক্তিতে ভগবান নর রূপ ধারণ করেন; ভক্তিতে মানবের মনে অন্তর্নিহিত দেবত্ব প্রস্ফুটিত হয়| মানুষের দেবত্ব ও ভগবানের মানবত্ব প্রকটিত হয়েছে অবতারবাদে| ঈশ্বর ও মানুষের মিলন ভূমি এই অবতারবাদ অবতারকে আশ্রয় করলে ধর্মসাধন সহজ হয়|
নিষ্কাম কর্মযোগই গীতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপদেশ| গীতা কর্ম ত্যাগ করতে শিক্ষা দেয় না| গীতার উপদেশ হল কর্মফল ত্যাগ| এই হল নিষ্কাম কর্ম|
সংক্ষেপে ভগবত গীতার শিক্ষা হল: ১) আত্মজ্ঞান যা হল ব্রহ্মজ্ঞান, ২) মানুষের জীবনের কর্তব্য পালন, ৩) ত্যাগ, ৪) নিষ্কাম কর্মযোগ, ৫) স্বধর্ম অনুযায়ী অর্থাৎ নিজ বুদ্ধি অনুযায়ী কর্ম করা, এবং ৬) প্রপত্তি অর্থাৎ সর্বতোভাবে ভগবানের চরণে শরণ নেওয়া|

ভগবত গীতার প্রতিটি অধ্যায়ের সারাংশ

প্রথম অধ্যায় – অর্জুন বিষাদ যোগ

জন্মান্ধ কুরুরাজা ধৃতরাষ্ট্রকে তাঁর অমাত্য সঞ্জয় রাজপ্রাসাদে বসিয়া কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিবরণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন| ঋষি ব্যাসদেব আগেই সঞ্জয়কে বিশেষ বর প্রদান করেছেন যাতে রাজপ্রাসাদে বসেই কুরুক্ষেত্রের সবকিছু তিনি দিব্য চক্ষে দেখতে পাবেন এবং সম্পূর্ণ বিবরণ রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে অবগত করাতে পারবেন| ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জয় জানালেন কুরুক্ষেত্রে কি ভাবে কৌরবগণ ও পাণ্ডবগণ সৈন্য সমাবেশ করেছেন| যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক প্রাক্কালে অর্জুন তাঁর রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণকে অনুরোধ করলেন – কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে ইচ্ছা করি, অতএব হে কৃষ্ণ, উভয় সেনাদলের মধ্যে আমার রথ স্থাপন কর| শ্রীকৃষ্ণ তখন দুই সেনাদলের মধ্যে রথ স্থাপন করলেন| অর্জুন রথের উপর দাঁড়িয়ে দেখলেন উভয় সেনাদলের মধ্যে ভূরিশ্রবাদি পিতৃব্যগণ, ভীষ্মাদি পিতামহগণ, দ্রোণাদি আচার্যগণ, শল্যাদি মাতুলগণ, ভীম-দুর্যোধনাদি ভ্রাতৃগণ, লক্ষ্মণাদি পুত্রগণ, পৌত্রগণ, অশ্বত্থামাদি বন্ধুগণ, দ্রুপদাদি শ্বশুরগণ এবং কৃতবর্মাদি সুহৃদগণ| অর্জুন করুণাবিষ্ট হয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে করতে বললেন – হে কৃষ্ণ, আত্মীয়বর্গদের যুদ্ধার্থ উপস্থিত দেখে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে| হে গোবিন্দ, আমাদের রাজ্যে কি বা প্রয়োজন আর সুখভোগে বা জীবনধারনেই বা কি প্রয়োজন? কারণ যাদের নিমিত্ত রাজ্য, ভোগ ও সুখাদি আমাদের অভিলাষিত, সেই আচার্যগণ, পিতৃব্যগণ, পুত্রগণ, পিতামহগণ, শ্বশুরগণ, মাতুলগণ, পৌত্রগণ, শ্যালকগণ ও স্বজনগণই প্রাণ ও ধনাদির আশা পরিত্যাগ করে যুদ্ধে এসেছেন| হে মধুসূদন, ত্রৈলোক্য রাজ্যের জন্যও এদের বধ করতে চাই না|
অর্জুন বললেন – হায়, আমরা কি মহাপাপ করতে প্রস্তুত হয়েছি, যেহেতু আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনগণকে হত্যা করতে উদ্যত| অর্জুন যুদ্ধের ভীষণ হিংস্র রূপ বর্ণনা করে অহিংসা, দয়া, শান্তির কথা বলে বললেন – রাজ্যলাভের সুখ এবং আনন্দ আমি কামনা করি না| এইরূপ বিলাপ করতে করতে অর্জুন ধনুর্বাণ ত্যাগ করে রথের উপর বসে পড়লেন|
অর্জুন বিষাদ যোগ নামে ভগবত গীতার প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি|

অসীম ভট্টাচার্য

( ক্রমশঃ )

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.


অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।

সেকালের জনপ্রিয় লেখক ও তাঁদের লেখা

পুরনো দিনের পত্রিকা ও বই থেকে নির্বাচিত প্রবন্ধ