প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

পুরানো সাময়িকী ও সংবাদপত্র

জুলাই ৩০, ২০১৫

 

বঙ্গদর্শন

দীপক সেনগুপ্ত


এরপর উল্লেখযোগ্য পত্রিকা বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গদর্শন’। ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে পত্রিকাটি বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ‘বঙ্গদর্শন’-এর উদ্দেশ্য কি ছিল? তখন বাঙালী ইংরাজি ভাষায় রচিত কিছু বিষয়বস্তুর জ্ঞান লাভকেই শিক্ষা বলে মনে করত। বাঙালীর মনন এবং চিন্তায় বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব ছিল সর্বাধিক। ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তনীয় বিষয়ে আমাদের যেন কোন মূলধনই নেই। এই আত্মশক্তির অবমাননা বঙ্কিম মেনে নিতে পারেন নি। ইংরাজি ভাষা বা বিদেশীদের জ্ঞানকে তিনি ছোট করেন নি কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত বিভিন্ন বিষয়ে রচনা প্রকাশ না হলে সাধারণের কোন কাজে আসবে না, কতিপয় বিদ্দজ্জনের মধ্যেই চিরকাল সে জ্ঞান আবদ্ধ থাকবে এটা তিনি জানতেন। আবার অন্যের প্রভাব মুক্ত হয়ে আত্মশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তাকেও তিনি স্বীকার করেছেন। কিসের তাড়নায় প্রাণিত হযে এবং কি উদ্দেশ্যে বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হযেছিলেন, কিছুটা দীর্ঘ হলেো এ বিষয়ে তার নিজের বক্তব্যের কিছু অংশ তারই ভাষায় শোনা যাক :

“ যাঁহারা বাঙ্গালা ভাষায় গ্রন্থ বা সাময়িক পত্র প্রচারে প্রবৃত্ত হয়েন, তাঁহাদিগের বিশেষ দুরদৃষ্ট। তাঁহারা যত যত্ন করুন না কেন, দেশীয় কৃতবিদ্য সম্প্রদায় প্রায়ই তাঁহাদিগের রচনা পাঠে বিমুখ। ইংরাজিপ্রিয় কৃতবিদ্যগণের প্রায় স্থির জ্ঞান আছে যে, তাঁহাদের পাঠের যোগ্য কিছুই বাঙ্গালা ভাষায় লিখিত হইতে পারে না। তাঁহাদের বিবেচনায় বাঙ্গালা ভাষায় লেখকমাত্রেই হয় ত বিদ্যাবুদ্ধিহীন লিপিকৌশলশূন্য; নয় ত ইংরাজি গ্রন্থের অনুবাদক। .......

“ লেখাপড়ার কথা দূরে থাক, এখন নব্য সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন কাজই বাঙ্গালায় হয় না। বিদ্যালোচনা ইংরাজিতে। সাধারণের কার্য্য, মিটিং, লেক্চর, এড্রেস্, প্রোসিডিংস্, সমুদয় ইংরাজিতে। যদি উভয় পক্ষ ইংরাজি জানেন, তবে কথোপকথনও ইংরাজিতেই হয়, কখন ষোলো আনা, কখন বার আনা ইংরাজি। আমরা কখন দেখি নাই যে, যেখানে উভয় পক্ষ ইংরাজির কিছু জানেন, সেখানে বাঙ্গালায় পত্র লেখা হইয়াছে। .......



“ ইহাতে বিস্ময়ের বিষয় নাই। ইংরাজি একে রাজভাষা, অর্থোপার্জ্জনের ভাষা, তাহাতে আবার বহু বিদ্যা আধার, এক্ষণে আমাদের জ্ঞানোপার্জ্জনের একমাত্র সোপান। ........ বিশেষ ইংরাজিতে না বলিলে ইংরাজে বুঝে না; ইংরাজে না বুঝিলে ইংরাজের নিকট মান মর্য্যাদা হয় না, ...... ইংরাজি লেখক, ইংরাজি বাচক সম্প্রদায় হইতে নকল ইংরাজ ভিন্ন কখন খাঁটি বাঙ্গালীর সমুদ্ভবের সম্ভাবনা নাই। যতদিন না সুশিক্ষিত জ্ঞানবন্ত বাঙ্গালীরা বাঙ্গালা ভাষায় আপন উক্তি সকল বিন্যস্ত করিবেন, ততদিন বাঙ্গালীর উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই। .........

“ এদিকে কোন সুশিক্ষিত বাঙ্গালীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, “মহাশয়, আপনি বাঙ্গালী - বাঙ্গালা গ্রন্থ বা পত্রিকাদিতে আপনার এত হতাদর কেন?” তিনি উত্তর করেন, “ কোন বাঙ্গালা গ্রন্থে বা পত্রে আদর করিব? পাঠ্য রচনা পাইলে অবশ্য পড়ি|” আমরা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি যে, এ কথার উত্তর নাই। যে কয়খানি বাঙ্গালা রচনা পাঠযোগ্য, তাহা দুই তিন দিনের মধ্যে পড়িয়া শেষ করা যায়। তাহার পর দুই তিন বৎসর বসিয়া না থাকিলে আর একখানি পাঠ্য বাঙ্গালা রচনা পাওয়া যায় না।

“ এই রূপ বাঙ্গালা ভাষার প্রতি বাঙ্গালির অনাদরেই, বাঙ্গালির অনাদর বাড়িতেছে। সুশিক্ষিত বাঙ্গালিরা বাঙ্গালা রচনায় বিমুখ বলিয়া সুশিক্ষিত বাঙ্গালি বাঙ্গালা রচনা পাঠে বিমুখ। সুশিক্ষিত বাঙ্গালিরা বাঙ্গালা পাঠে বিমুখ বলিয়া, সুশিক্ষিত বাঙ্গালিরা বাঙ্গালা রচনায় বিমুখ।

“ আমরা এই পত্রকে (‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা ) সুশিক্ষিত বাঙ্গালীর পাঠোপযোগী করিতে যত্ন করিব। যত্ন করিব, এই মাত্র বলিতে পারি। যত্নের সফলতা ক্ষমতাধীন। এই আমাদিগের প্রথম উদ্দেশ্য।

“ দ্বিতীয়, এই পত্র আমার কৃতবিদ্য সম্প্রদায়ের হস্তে, আরও এই কামনায় সমর্পণ করিলাম যে, তাঁহারা ইহাকে আপনাদিগের বার্ত্তাবহস্বরূপ ব্যবহার করুন। বাঙ্গালী সমাজে ইহা তাঁহাদিগের বিদ্যা, কল্পনা, লিপিকৌশল, এবং চিত্তোৎকর্ষেরও পরিচয় দিক। তাঁহাদিগের উক্তি বহন করিয়া, ইহা বঙ্গ-মধ্যে জ্ঞানের প্রচার করুক। অনেক সুশিক্ষিত বাঙ্গালী বিবেচনা করেন যে, এরূপ বার্ত্তাবহের কতক দূর অভাব আছে। সেই অভাব নিরাকরণ এই পত্রের (‘বঙ্গদর্শন’-এর ) এক উদ্দেশ্য। আমরা যে কোন বিষয়ে, যে কাহারও রচনা, পাঠোপযোগী হইলে সাদরে গ্রহণ করিব। এই পত্র, কোন বিশেষ পক্ষের সমর্থন জন্য বা কোন সম্প্রদায়বিশেষের মঙ্গলসাধনার্থ সৃষ্ট হয় নাই। ....................

“ অনেকে বিবেচনা করেন যে, বালকের পাঠোপযোগী অতি সরল কথা ভিন্ন, কিছুই সাধারণের বোধগম্য বা পাঠ্য হয় না। এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করিয়া যাঁহারা লিখিতে প্রবৃত্ত হয়েন, তাঁহাদিগের রচনা কেহই পড়ে না। যাহা সুশিক্ষিত ব্যক্তির পাঠোপযোগী নহে, তাহা কেহই পড়িবে না। যাহা উত্তম তাহা সকলেই পড়িতে চাহে; যে না বুঝিতে পারে, সে বুঝিতে যত্ন করে। এই যত্নই সাধারণের শিক্ষার মূল|............

“ তৃতীয় যাহাতে নব্য সম্প্রদায়ের সহিত আপামর সাধারণের সহৃদয়তা সম্বর্দ্ধিত হয়, আমরা তাহার সাধ্যানুসারে অনুমোদন করিব। .............. এ জগতে কিছুই নিস্ফল নহে। একখানি সাময়িক পত্রের ক্ষণিক জীবনও নিস্ফল হইবে না। ............”

অনেক দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিতে হল, না হলে পত্রিকা প্রকাশের বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের সঠিক মনোভাব কি ছিল সেটা যথাযথ বোধগম্য হবে না। পত্রিকাটিতে সাহিত্য ছাড়া বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সঙ্গীত, ধর্ম, কৃষিতত্ব, সমাজনীতি, ভাষাচর্চা, গ্রন্থ আলোচনা ইত্যাদি বিষয়ও স্থান পেত।

যাদের রচনায় ‘বঙ্গদর্শন’ সমৃদ্ধ হয়েছিল তারা হলেন - বঙ্কিমচন্দ্র, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্য, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, দীনবন্ধু মিত্র, নবীনচন্দ্র সেন, প্রাণনাথ পণ্ডিত, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ১২৭৯-এর কার্ত্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত দীনবন্ধু মিত্রের ‘যমালয়ে জীয়ন্ত মানুষ’ বাংলা সাহিত্যে প্রথম ছোট গল্প হিসাবে চিহ্ণিত হয়ে আছে।

অন্যান্য অনেক পত্রিকার মত ‘বঙ্গদর্শন’-এ অধিকাংশ লেখকদের নাম থাকত না; বা ছদ্মনাম থাকত। পত্রিকার গ্রাহক তালিকায় ছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বিদ্যাসাগরের মত স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ। ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রচার শুধু যে বঙ্গদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, এটা এলাহাবাদ, ত্রিপুরা, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, বারাণসী প্রভৃতি স্থানেও বিস্তার লাভ করেছিল।

বঙ্কিমচন্দ্রের বহু উপন্যাস ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। সব উপন্যাস যে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়েছে তা নয়; আংশিক প্রকাশিত হয়ে নানা কারণে বন্ধ হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর গ্রন্থবদ্ধ হবার আগে পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিতও হযেছে। ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রথম সংখ্যা (বৈশাখ, ১২৭৯) থেকেই ‘বিষবৃক্ষ’ প্রকাশিত হতে থাকে। ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুণ্ডলা’ ও ‘মৃণালিনী’ আগেই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বিষবৃক্ষ’ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া : “তখন ‘বঙ্গদর্শনে’র ধুম লেগেছে; সূর্যমুখী আর কুন্দনন্দিনী আপন লোকের মত আনা-গোনা করছে ঘরে ঘরে। কী হল কী হবে দেশসুদ্ধ লোকের এই ভাবনা।”

‘ইন্দিরা’ প্রথম বের হয় ‘বঙ্গদর্শন’-এর ১ম বর্ষের চৈত্র সংখ্যায়। পরে অবশ্য বর্ধিত হয়েছে। এর পরের মাসেই, ১২৮০-র বৈশাখে বেরোয় ‘যুগলাঙ্গুরীয়’। শ্রাবন ১২৮০ থেকে ভাদ্র ১২৮১ এই ১৪ মাস ধরে প্রকাশিত হয় ‘চন্দ্রশেখর’; ১২৮১-৮২ বঙ্গাব্দে ‘রজনী’; ১২৮২-তে ‘রাধারাণী’ বেরোবার পরে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ১২৮২-র চৈত্র অবধি বেরিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। সেটা অন্য প্রসঙ্গ। উপন্যাস বাদ দিয়েও বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যান্য অনেক লেখা ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। ‘বন্দে মাতরম’ প্রথম ‘বঙ্গদর্শন’-এই প্রকাশিত হয়। তবে ‘বঙ্গদর্শন’-এর ভাগ্যে শুধু যে প্রশংসা জুটেছিল এমন নয়। বৃটিশ শাসকের রোষানলে পড়ে বিদ্রোহে ইন্ধন যোগানোর অভিযোগে ‘আনন্দমঠ’-এর প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পত্রিকাটির সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়েই হোক কিংবা এর বিষয়বস্তু ও তার পর্যালোচনা পছন্দ না হবার জন্যই হোক পত্রিকাটিকে অনেক বারই নিন্দা ও বক্রোক্তি সহ্য করতে হয়েছে। ‘বঙ্গদর্শন’কে বলা হয়েছিল ব্যঙ্গদর্শন। অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্রও ‘বঙ্গদর্শন’-এ বিদ্যাসাগার মহাশয়ের সমালোচনা করেছিলেন। এতে উষ্মা প্রকাশ করে বিদ্যাসাগরের এক জন গোঁড়া ভক্ত ‘হালিসহর পত্রিকা’য় লিখেছেন :

“ বঙ্গদর্শনের দর্শনশক্তি চমৎকার,
এ দোষ দর্শনে রোষ হয় না কার?
এখন গ্রন্থকর্তা ঘরে ঘরে,
Editor বহু নরে,
কিন্তু কলম যে কী রূপে ধরে তা অনেকে জানে না|
ভূষিমাল গর্দ্দাভরা ভেতরেও ময়লা পোরা,” ..... ইত্যাদি|

এগুলির প্রভাব নিতান্তই সাময়িক। এ সব সত্বেও ‘বঙ্গদর্শন’ যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল সেটা রবীন্দ্রনাথের লেখাতেই পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের লেখাতে সাধারণ পাঠকের প্রতিক্রিয়া এবং নিজের অনুভুতিও ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন “অবশেষে বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন আসিয়া বাঙালির হৃদয় একেবারে লুট করিয়া লইল । একে তো তাহার জন্য মাসান্তের প্রতীক্ষা করিয়া থাকিতাম , তাহার পরে বড়োদলের পড়ার শেষের জন্য অপেক্ষা করা আরও বেশি দুঃসহ হইত। বিষবৃক্ষ , চন্দ্রশেখর , এখন যে-খুশি সেই অনায়াসে একেবারে এক গ্রাসে পড়িয়া ফেলিতে পারে কিন্তু আমরা যেমন করিয়া মাসের পর মাস , কামনা করিয়া , অপেক্ষা করিয়া , অল্পকালের পড়াকে সুদীর্ঘকালের অবকাশের দ্বারা মনের মধ্যে অনুরণিত করিয়া - তৃপ্তির সঙ্গে অতৃপ্তি , ভোগের সঙ্গে কৌতূহলকে অনেক দিন ধরিয়া গাঁথিয়া গাঁথিয়া পড়িতে পাইয়াছি , তেমন করিয়া পড়িবার সুযোগ আর কেহ পাইবে না|”

‘বঙ্গদর্শন’-এর একটি বিশেষ গুণ ছিল কোন রচনার প্রতিপাদ্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পাদকের মতের মিল না হলেও যদি বক্তব্যের সারবত্তা থাকত এবং রচনা উৎকৃষ্ট মানের হত তা হলে পত্রিকায় প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন অন্তরায় হত না। এটা কিন্তু অনেক পত্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তার ‘ভারতমহিলা’ নামক একটি প্রবন্ধ ‘আর্যদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু সম্পাদক যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ বলেন, “তুমি বাপু যে সকল ভিউ দিয়াছ, আমার সঙ্গে তা মেলে না। আমূল পরিবর্ত্তন না করিলে আমার কাগজে উহা স্থান দিতে পারি না|” ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় কিন্তু প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ‘বঙ্গদর্শন’-এর ঘোষিত নীতি ছিল –“সম্পাদকের মতের বিপরীত মতও বঙ্গদর্শনে প্রকাশের আপত্তি নাই; এই কথা পাঠকদিগের যেন স্মরণ থাকে|”

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর ‘প্রভাকর’-এর মত ‘বঙ্গদর্শন’কে কেন্দ্র করেও লেখকদের নিয়মিত আড্ডা বসত বলে জানা যায় । চার বছর সম্পাদনার কাজ চালিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র সেই পদ ছেড়ে দেন এবং পত্রিকাটির প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় । এ প্রসঙ্গে তার সম্পাদিত শেষ সংখ্যায় (চৈত্র ১২৮২) ‘বঙ্গদর্শনের বিদায় গ্রহণ’ রচনায় লিখেছেন –“.... আমি একে দাসত্বভারে পীড়িত, তাহার উপর স্বাস্থ্যের এবং পরিশ্রমশক্তিরও সীমা আছে। ইদানীং বঙ্গদর্শনের, প্রায় লিখার ভার আমার উপর পড়িয়াছিল। কাজেই আমি আর পারিলাম না .... চারি বৎসর গত হইল বঙ্গদর্শন প্রকাশ আরম্ভ হয়। যখন ইহাতে আমি প্রবৃত্ত হই, তখন আমার কতকগুলি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল; পত্রসূচনায় কতকগুলি ব্যক্ত করিয়াছিলাম; কতকগুলি অব্যক্ত ছিল। যাহা ব্যক্ত হইয়াছিল এবং যাহা অব্যক্ত ছিল তাহার অধিকাংশই সিদ্ধ হইয়াছে। এক্ষণে আর বঙ্গদর্শন রাখিবার প্রয়োজন নাই|”

অন্যান্য কারণ ছাড়াও হয় ত তিনি মনে করেছেন যে চার বছর ধরে এবং সাহিত্য, সঙ্গীত, দর্শন, ধর্ম, সমাজনীতি, ইতিহাস, পুরাতত্ব, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তার নিজের এবং অন্যান্য বিদগ্ধ জনের সুচিন্তিত এবং সুরচিত রচনা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠক ও লেখক উভয় শ্রেণীর জন্যই যথেষ্ট উপাদান রেখে যেতে পেরেছেন যা ভবিষ্যতের পাথেয় হয়ে থাকবে। পত্রিকায় প্রকাশিতব্য বিষয় নির্বাচন সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের মত স্পষ্ট হয়েছে তার একটি উক্তিতে – “মনুষ্যজীবন বিচিত্র এবং বহুবিষয়ক; এজন্য জ্ঞানেরও বৈচিত্র্য এবং বহুবিষয়কতা চাই। যাহা বিচিত্র ও বহুবিষয়ক নহে, তাহা সাধারণের নিকট আদরণীয় হইতে পারে না|”

বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ সম্পাদনা করেছিলেন মোট চার বছর - ১২৭৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে ১২৮২-এর চৈত্র পর্যন্ত, ৪৮ মাসে ৪৮ সংখ্যা, পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যাও ছিল ৪৮; ৮ পৃষ্ঠার ফর্মার সর্বসমেত ৬ ফর্মার পত্রিকা। বহু লেখা বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই লিখেছেন। মূল্য প্রথম তিন বছরের জন্য নির্ধারিত হয়েছিল বার্ষিক সাড়ে তিন টাকা এবং সডাক চার টাকা; কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনার শেষ বর্ষে অর্থাৎ চতুর্থ বর্ষে পরিবর্তিত মূল্য হয়েছিল যথাক্রমে তিন টাকা ও সাড়ে তিনটাকা।

প্রথম সংখ্যায় যে লেখা গুলি বেরিয়েছিল সেগুলি হল - পত্র সূচনা (প্রবন্ধ) - বঙ্কিমচন্দ্র; ভারত কলঙ্ক (প্রবন্ধ) - বঙ্কিমচন্দ্র; কামিনী কুসুম (কবিতা) - হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়; বিষবৃক্ষ (উপন্যাস) - বঙ্কিমচন্দ্র; আমরা বড়লোক (প্রবন্ধ); সঙ্গীত (প্রবন্ধ) - বঙ্কিমচন্দ্র ও জগদীশনাথ রায়; ব্র্যাঘ্রাচার্য্য (ব্যাঘ্রাচার্য্য?) বৃহল্লাঙ্গূল (প্রবন্ধ) - বঙ্কিমচন্দ্র; উদ্দীপনা (প্রবন্ধ) - অক্ষয়চন্দ্র সরকার। লক্ষণীয় যে একমাত্র ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের নাম ছাড়া আর কোথাও কারো নামই প্রকাশিত হয় নি। পত্রিকাতে বহু রচনার লেখক বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং কিন্তু কোথাও তার নাম নেই; এই সংযম আজকের যুগে অকল্পনীয়। এ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের একটি উক্তি প্রনিধানযোগ্য – “যশের জন্য লিখিবেন না। ... টাকার জন্য লিখিবেন না। ... যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গলসাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্যে লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে। ... সত্য ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ|”

‘বঙ্গদর্শন’-এ কোন রচনা প্রকাশের আগে প্রয়োজন হলে বঙ্কিমচন্দ্র নিজে রচনাটি পরিমার্জনা করতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতিকে বলেছেন – “তোমরা কি ভয়ে লেখকদের লেখা কাটো না? আমি তো বঙ্গদর্শনের অনেক প্রবন্ধ নিজে আবার লিখিয়া দিয়াছি বলিলেও চলে। আমরা যাহা লিখিতাম তাহাই সুন্দর করিয়া লিখিবার চেষ্টা করিতাম। এখন লেখকেরা এদিকে বড় উদাসীন। তোমাদের ‘সাহিত্যে’ও দেখি –অনেক প্রবন্ধ দেখিয়া মনে হয়, একটু অদল বদল করিয়া কাটিয়া ছাঁটিয়া দিলে বেশ হয়। কেন কর না? লেখকেরা কি রাগ করেন?- বঙ্গদর্শনের আমলে আমাক্কে বড় খাটিতে হইত। আমি খুব ভাল করিয়া ‘রিভাইজ’ না করিয়া কাহারও কপি প্রেসে দিতাম না। ”

‘বঙ্গদর্শনে’ বহু গ্রন্থ ও সাময়িক পত্রের সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। এর জন্য পত্রিকায় ‘প্রাপ্ত গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা’ নামে একটি নির্দিষ্ট বিভাগ ছিল। কোন সংবাদ পত্রের সমালোচনা কখনও প্রকাশিত হয় নি। এ সম্বন্ধে জানান হয়েছে – “আমরা কয়েকখানি অভিনব সংবাদপত্র উপহার প্রাপ্ত হইয়া তাহার সমালোচনায় অনুরুদ্ধ হইয়াছি। সংবাদপত্রের সমালোচনা আমাদের রীতি নহে, এবং আমরা সে নিয়ম ভঙ্গ করিতে ইচ্ছুক নহি। যাঁহারা পত্র প্রেরণ করিয়াছেন তাঁহারা মার্জ্জনা করিবেন|” সমালোচক হিসাবে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – “মনে আছে, বঙ্গদর্শনে যখন তিনি সমালোচক পদে আসীন ছিলেন, তখন তাঁর শত্রুর সংখ্যা অল্প ছিল না। শত শত অযোগ্য লোক তাঁহাকে ঈর্ষা করিত এবং তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব অপ্রমাণ করিবার চেষ্টা ছাড়িত না। কিন্তু কিছুতেই তিনি কর্তব্যে পরাঙ্মুখ হন নি|”

তখন বহু পত্রিকায় অন্য পত্রিকা এবং প্রকাশিত গ্রন্থ সম্বন্ধে সমালোচনা প্রকাশিত হত। সে সময়ে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকার মধ্যে ‘সোমপ্রকাশ’ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে; বিদগ্ধ জনদের কাছে এই পত্রিকাটি ছিল বিশেষভাবে আদৃত। ‘সোমপ্রকাশ’-এর প্রকাশনা শুরু হয়েছে ‘বঙ্গদর্শন’-এর চোদ্দ বছর আগে। অতএব ‘বঙ্গদর্শন’ সম্বন্ধে ‘সোমপ্রকাশ’-এর মতামত জানতে চাওয়া স্বাভাবিক। সাধারণভাবে ‘সোমপ্রকাশ’ ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রশংসা করে নি। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের ১১ই বৈশাখ সংখ্যায় ‘সোমপ্রকাশ’ লিখেছে -

“যে সমুদয় ব্যক্তি বঙ্গদর্শন সম্পাদন কার্য্যে ব্রতী হইয়াছেন, তাঁহারা বঙ্গসমাজে অপ্রসিদ্ধ নহেন। ইঁহাদিগের অনেকেই লেখনীর বলে সহৃদয়গণের নিকট বিপুল প্রশংসা লাভ করিয়াছেন। ঈদৃশ বিদ্যা বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ যে সমবেত চেষ্টা হইয়া মাতৃভাষায় সৌষ্ঠব সম্পাদনার্থ অগ্রসর হইয়াছেন, এটি নিরতিশয় আল্হাদের বিষয় সন্দেহ নাই। বঙ্গদর্শন সুলেখক ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যক্তিগণের রসময়ী লেখনী বিনির্গত হইবে বলিয়া অনেকেই সোৎসুক চিত্তে ইহার প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। বৈশাখের প্রথম দিবসে সেই অভিষ্ট বঙ্গদর্শন কুতূহলপর পাঠকগণের সমক্ষে উপনীত হইল। সকলেই উৎফুল্ল নয়ন হইয়া আগ্রহ সহকারে বঙ্গদর্শন পাঠে প্রবৃত্ত হইলেন। আমরাও সেই আগ্রহের বশবর্ত্তী হইয়া বঙ্গদর্শনখানি আদ্যোপান্ত পাঠ করিলাম; কিন্তু ক্ষোভের বিষয়, আমাদিগের মন আশানুরূপ পরিতৃপ্ত হইল না|”

একই সংখ্যায় ‘সোমপ্রকাশ’ লিখেছে -

“বঙ্গদর্শনের অনেক স্থলে নিতান্ত কদর্য্য ভাষা ব্যবহৃত হইয়াছে। এইরূপ বাংলা প্রচার হইলে ভাষার উন্নতি হওয়া সুদূর পরাহত। বড়লোকের লিখিত বলিয়া কেহ যেন এইরূপ ভাষার অনুকরণ না করেন। বঙ্গদর্শনের লেখকগণ লব্ধপ্রতিষ্ঠ হইলেও তাঁহারা রচনা বিষয়ে যেরূপ চাপল্য প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা অবশ্য দোষ বলিয়া গণনা করা উচিত। রচনাগত দোষ সংশোধন করা লেখকগণের অবশ্য কর্ত্তব্য। অন্যথায় তাঁহারা ভবিষ্যতে সুলেখক পদবাচ্য হইতে পারিবেন না|”

‘সোমপ্রকাশ’ ‘বঙ্গদর্শন’ প্রচারের উদ্দেশ্য ও রচনার গুণগত মান বিচার না করে ব্যাকরণের প্রতি বেশি দৃষ্টি দিয়েছিল। ব্যবহৃত শব্দ ‘সাবধানী’, ‘একেবারে’, ‘কেবলমাত্র’ শব্দগুলিকে অশুদ্ধ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, এগুলির শুদ্ধ রূপ হবে ‘সাবধান’, ‘একবারে’, ‘কেবল’ অথবা ‘মাত্র’। আরও বলা হয়েছে, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে ‘পদ্ম পলাশ নয়নী’-র পরিবর্তে হবে ‘পদ্ম পলাশ নয়না’ এবং ‘শ্যামাঙ্গিনী’ হবে ‘শ্যামাঙ্গী’। অনেক পরে ‘সোমপ্রকাশ’ অবশ্য বঙ্কিম প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানিয়ে ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রশংসাই করেছে।

‘বঙ্গদর্শন’-এর গ্রাহকদের মধ্যে বিদ্যাসাগরও ছিলেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র সামগ্রিকভাবে বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করেন নি। বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের উক্তি –“আর একটা হাসির কথা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে নাকি বড় পণ্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহের বহি বাহির করিয়াছেন। যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত, তবে মূর্খ কে ?” সাহিত্য রচনা সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের বক্তব্য ছিল বিদ্যাসাগর কিছু ছোটদের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন মাত্র (He is only a primer maker)। তার বাংলা ভাষারও প্রশংসা করেন নি বঙ্কিমচন্দ্র, তার মতে বিদ্যাসাগরের ভাষা ছিল সংস্কৃত ঘেঁষা। এমন কি কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকেও বিদ্যাসাগরের উপরে স্থান দিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বই সে সময়ে বিপুল সংখ্যায় বিক্রি হত এবং তা থেকে নিশ্চয়ই অর্থাগম হত ভালই। তবে কি ঈর্ষাণ্বিত হয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের এই অশ্রদ্ধা? এ প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের এই মানসিকতা কি বিশ্বাস্য? প্রকৃত কারণ জানা নেই। হয় ত বিদ্যাসাগরের মত মনীষীর কাছে বাংলা ভাষার সংস্কার, অগ্রগতি এবং মননশীল ও রুচিসম্পন্ন পাঠক তৈরির যে প্রত্যাশা বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল, বিদ্যাসাগর সেটা পূরণ করতে পারেন নি।

১২৮২-এর চৈত্র সংখ্যা প্রকাশের পর বহু লোকের অনুরোধ উপেক্ষা করে বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদনার কাজ ছেড়ে দেন এবং পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। বঙ্কিমচন্দ্র এ সম্বন্ধে যা কারণ দেখিয়েছেন তা আগেই উদ্ধৃত হয়েছে। মাত্র চার বছর সচল থাকলেও এর মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের গতিপথটি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের উক্তি –“ রচনা ও সমালোচনা এই উভয় কার্য্যের ভার বঙ্কিম একাকী গ্রহণ করাতেই বঙ্গসাহিত্য এত সত্বর এত দ্রুত পরিণতি লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছিল। ”

বঙ্কিমচন্দ্র ও ‘বঙ্গদর্শন’ পাঠক ও লেখকদের মনে কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল তার একটি পরিচয় পাওয়া যায় গিরিজাপ্রসন্ন রায়চৌধুরীর লেখা থেকে। তিনি লিখেছেন –“বঙ্গদর্শনে প্রকশ্যভাবে গ্রন্থাদির যে সমালোচনা হইত, তাহাতে প্রশংসার উপযুক্ত ব্যক্তিগণ দ্বিগুণ উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া কার্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইতেন। আর যাঁহারা অনুপযুক্ত তাঁহারা বাধ্য হইয়া আপনাদিগের দাম্ভিকতা পরিত্যাগপূর্ব্বক উপযুক্ত পথ গ্রহণে প্রবৃত্ত হইতেন। - সকলেই বঙ্গদর্শন সম্পাদককে রাজার ন্যায় শ্রদ্ধা করিত, ভয় করিত, সম্মান করিত, তিনি যে-গ্রন্থ উৎকৃষ্ট বলিতেন রাশি রাশি পাঠক তাহা অবিলম্বে ক্রয় করিয়া আগ্রহের সহিত পাঠ করিত এবং গ্রন্থকারকে পরোক্ষভাবে প্রোৎসাহিত করিত। বঙ্গদর্শনের সম্পাদক যে-গ্রন্থের নিন্দা করিতেন, সে গ্রন্থ বড় কেহ কিনিত না। পুস্তক বিক্রেতার দোকানে তাহা কীটদষ্ট হইয়া জগৎ হইতে বিলুপ্ত হইত। বড় সহজ কি এই শক্তি! কিন্তু বঙ্গদর্শন একদন তাহা সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইয়াছিল। স্বকীয় বিদ্যা বুদ্ধি জ্ঞান গবেষণা প্রভাবে, সর্বোপরি পক্ষপাতশূণ্যতা ও সাহিত্যের উন্নতির ঐকান্তিক কামনাবশত বঙ্গদর্শন একদিন সাহিত্যজগতে এইরূপই রাজার ন্যায় ক্ষমতা পরিচালন করিয়াছিল। ”

বঙ্কিমচন্দ্র এবং ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা সম্বন্ধে অনেক আলোচনা হয়েছে, বিশ্লেষণ সহ সমালোচনা মূলক গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। ‘বঙ্গদর্শন’ যখন আত্মপ্রকাশ করেছে তখন বাংলা ভাষা ছিল নিতান্তই আনাদৃত ও অবহেলিত। ইতিহাস শিক্ষার উপর বঙ্কিমচন্দ্র জোর দিয়েছিলেন। তার মতে “ইতিহাসবিহীন জাতির দুঃখ অসীম। ” তিনি লিখেছেন –“অন্যকে প্রবৃত্ত করিবার জন্য বঙ্গদর্শনে বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম। বঙ্গদর্শনের দ্বারা সর্বাঙ্গসম্পন্ন সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টায় সচরাচর আমি এই প্রথা অবলম্বন করিতাম। যেমন কুলি মজুর পথ খুলিয়া দিলে, অগম্য কানন বা প্রান্তরমধ্যে সেনাপতি সেনা লইয়া প্রবেশ করিতে পারেন, আমি সেরূপ সাহিত্যসেনাপতিদিগের জন্য সাহিত্যের সকল প্রদেশের পথ খুলিয়া দিবার চেষ্টা করিতাম। ” অবশ্য ‘বঙ্গদর্শনে’ সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞান এবং ধর্ম ও দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধও স্থান পেয়েছে। কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে। ‘বঙ্গদর্শনে’ পত্রিকার গ্রাহক ও নিয়মিত পাঠকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন। বঙ্কিমচন্দ্র যে সময়ে ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশ করেছিলেন সে সময়ে বাংলা ভাষার অবস্থা ও বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের মতামত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন –

“তিনি আপনার শিক্ষাগর্বে বঙ্গভাষার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিলেন না, একেবারেই শ্রদ্ধা প্রকাশ করিলেন। যত কিছু আশা আকাঙ্ক্ষা সৌন্দর্য প্রেম মহত্ব ভক্তি স্বদেশানুরাগ, শিক্ষিত পরিণত বুদ্ধির যত-কিছু শিক্ষালব্ধ চিন্তাজাত ধনরত্ন সমস্তই অকুন্ঠিতভাবে বঙ্গভাষার হস্তে অর্পণ করিলেন। পরম সৌভাগ্যগর্বে সেই অনাদরমলিন ভাষার মুখে সহসা অপূর্ব্ব লক্ষীশ্রী প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিল। তখন, পূর্বে যাঁহারা অবহেলা করিয়াছিলেন তাঁহারা বঙ্গভাষার যৌবনসৌন্দর্য্যে আকৃষ্ট হইয়া একে একে নিকটবর্তী হইতে লাগিলেন। বঙ্গসাহিত্য প্রতিদিন গৌরবে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল। বঙ্কিম যে গুরুতর ভার লইয়াছিলেন তাহা অন্য কাহারো পক্ষে দুঃসাধ্য হইত। প্রথমত, তখন বঙ্গভাষা যে অবস্থায় ছিল তাহাতে যে শিক্ষিত ব্যক্তির সকল প্রকার ভাবপ্রকাশে নিযুক্ত করা যাইতে পারে ইহা বিশ্বাস ও আবিষ্কার করা বিশেষ ক্ষমতার কার্য।

“দ্বিতীয়ত, যেখানে সাহিত্যের মধ্যে কোনো আদর্শ নাই, যেখানে পাঠক অসামান্য উৎকর্ষের প্রত্যাশাই করে না, যেখানে লেখক অবহেলাভরে লেখে এবং পাঠক অনুগ্রহের সহিত পাঠ করে, যেখানে অল্প ভাল লিখিলেই বাহবা পাওয়া যায় এবং মন্দ লিখিলেও কেহ নিন্দা করা বাহুল্য বিবেচনা করে, সেখানে কেবল আপনার অন্তরস্থিত উন্নত আদর্শকে সর্বদা সম্মুখে বর্তমান রাখিয়া, সামান্য পরিশ্রমে সুখ্যাতিলাভের প্রলোভন সংবরণ করিয়া অশ্রান্ত যত্নে, অপ্রতিহত উদ্যমে দুর্গম পরিপূর্ণতার পথে অগ্রসর হওয়া অসাধারণ মাহাত্ম্যের কর্ম। চতুর্দিকব্যাপী উৎসাহহীন জীবনহীন জড়ত্বের মতো এমন গুরুভার আর কিছুই নাই; তাহার নিয়ত প্রবল ভারাকর্ষণশক্তি অতিক্রম করিয়া উঠা যে কত নিরলস চেষ্টা ও বলের কর্ম তাহা এখনকার সাহিত্যব্যবসায়ীরাও কতকটা বুঝিতে পারেন, তখন যে কত কঠিন ছিল তাহা কষ্টে অনুমান করিতে হয়। সর্বত্রই যখন শৈথিল্য এবং শৈথিল্য যখন নিন্দিত হয় না তখন আপনাকে নিয়মব্রতে বদ্ধ করা মহাসত্ত লোকের দ্বারাই সম্ভব। বঙ্কিম আপনার অন্তরের সেই আদর্শ অবলম্বন করিয়া প্রতিভাবলে যে কার্য করিলেন তাহা অত্যাশ্চর্য। ”

পত্রিকাটি এর পরে অবশ্য বন্ধ হয় নি। ১২৮৩-তে পত্রিকার কোন সংখ্যা প্রকাশিত হয় নি। বঙ্কিমচন্দ্রের পর ‘বঙ্গদর্শন’এর পরিণতি পত্রিকার বিখ্যাত লেখক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং বঙ্কিমের নিজের লেখা থেকেই জানা যায় – “বঙ্গদর্শন এক বৎসর বন্ধ থাকার পর ১২৮৪ সালে সঞ্জীববাবুর সম্পাদকতায় আবার বাহির হয়। কিন্তু বঙ্কিমবাবু কার্যত বঙ্গদর্শনের সর্বময় কর্তা ছিলেন, তিনি নিজে তো লিখিতেনই, অন্য লোকের লেখা পছন্দ করিয়া দিতেন, অনেককে বঙ্গদর্শনে লিখিবার জন্য লওয়াইতেন, অনেকের লেখা সংশোধন করিয়া দিতেন। পূর্বেও তাঁহার কর্ত্তৃতাধীনে যেমন চলিত, বঙ্গদর্শন এখনও তেমনি চলিতে লাগিল। ”

‘বঙ্গদর্শন’ সঞ্জীবচন্দ্রের হাতে কেমন চলেছিল? এ প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই লিখেছেন –“বঙ্গদর্শন এক বৎসর বন্ধ থাকিলে পর তিনি আমার নিকট ইহার স্বত্বাধিকার চাহিয়া লইলেন। ১২৮৪ সাল হইতে ১২৮৯ সাল পর্যন্ত তিনিই বঙ্গদর্শনের সম্পাদকতা করেন। পূর্বে আমার সম্পাদকতার সময়ে বঙ্গদর্শনে যেরূপ প্রবন্ধ বাহির হইত, এখনও তাহাই হইতে লাগিল। সাহিত্য সম্বন্ধে বঙ্গদর্শনের গৌরব অক্ষুণ্ণ রহিল। যাঁহারা পূর্ব্বে বঙ্গদর্শনে লিখিতেন, এখনও তাঁহারা লিখিতে লাগিলেন। অনেক নূতন লেখক, যাঁহারা এক্ষণে খুব প্রসিদ্ধ তাঁহারাও লিখিতে লাগিলেন। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘রাজসিংহ’, ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবী’ তাঁহার সম্পাদকতাকালেই বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। তিনি নিজেও তাঁহার তেজস্বিনী প্রতিভার সাহায্য গ্রহণ করিয়া ‘জাল প্রতাপচাঁদ’, ‘পালামৌ’, ‘বৈজিকতত্ত্ব’ প্রভৃতি প্রবন্ধ লিখিতে লাগিলেন। কিন্তু বঙ্গদর্শনের আর তেমন প্রতিপত্তি হইল না। তাহার কারণ, ইহা কখনও সময়ে প্রকাশিত হইত না। সম্পাদকের অমনোযোগে এবং কার্য্যাধ্যক্ষতার বিশৃঙ্খলতায় , বঙ্গদর্শন কখনও আর নির্দিষ্ট সময়ে বাহির হইত না। এক মাস, দুই মাস, চারি মাস, ছয় মাস, এক বৎসর বাকি পড়িতে লাগিল। - শেষে বঙ্গদর্শনের অপঘাত মৃত্যু হইল। ” ১২৮৪ সালের চৈত্র মাস অবধি এভাবেই চলেছিল। প্রসঙ্গত ১২৮৪-র কার্তিক মাসে ‘বিশেষ দ্রষ্টব্য’ শিরোনামে যে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি ছিল – “প্রতি মাসের প্রথম দিবসে বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হইবে, ইহা আমরা স্বীকার করি নাই। মাসের যে কোন দিবসে হউক বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হইবে; কিন্তু পূজা উপলক্ষ্যে আমাদিগের আপিস বন্ধ থাকায় এবং ম্যালিরিয়া জ্বরে বঙ্গদর্শন-কার্য্যকারগণ পীড়িত হওয়ায় এইবার বঙ্গদর্শন কিছু বিলম্বে বাহির হইল। - শ্রীজ্যোতিষচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় / বঙ্গদর্শন কার্য্যাধ্যক্ষ। ”

এর পরেও পত্রিকা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয় নি। চন্দ্রনাথ বসুর উদ্যোগে ১২৯০-এর কার্তিক মাসে ‘বঙ্গদর্শন’ পুনঃপ্রকাশিত হয়, সম্পাদক হন শ্রীশচন্দ্র মজুমদার। শ্রীশচন্দ্র লিখেছেন –“আমার বঙ্গদর্শন গ্রহণ স্থির হইয়া গেলে বঙ্কিমবাবু একদিন বলিলেন, ‘শ্রীশবাবু, তোমার সঙ্গে আমার একটি কথা আছে। তুমি যে আমায় লেখার জন্য পীড়াপিড়ী করিবে তা হবে না’। আমি বলিলাম, ‘বঙ্গদর্শন আপনার নামের সঙ্গে অভিন্ন, আপনি না লিখিলে কি বঙ্গদর্শন চলে? নোবেল বরাবর তো চলিবেই, প্রবন্ধও মাঝে মাঝে দিতে হবে’। উত্তর, ‘নোবেল লেখা থাকে চলিবে। কিন্তু প্রবন্ধ দিব ন-মাসে ছ-মাসে। ইদানীং প্রবন্ধ বড় একটা লিখি নাই, কেবল মাঝে মাঝে ভাঁড়ামি করেছি। তোমরা যুবা পুরুষ, অনেক লিখিতে পারিবে, আর আমার কাছে বঙ্গদর্শনের জন্য মাঝে মাঝে গালি খাবে। মেজদাদাও খান। ... সে বারে দুই মাস বঙ্গদর্শনের টোন বড় নীচু করা হয়েছিল। বিরক্ত হয়ে ৬/৭ মাস লিখি নাই। ” আমি বলিলাম, ‘আপনি কেন সম্পাদক হোন না?’ উত্তর, ‘আমার সে উৎসাহ নাই’। ... আর একদিন চন্দ্রনাথবাবু বঙ্গদর্শনের কথা তুলিলেন। বঙ্কিমবাবুকে বলিলেন, ‘শ্রীশের ইচ্ছা, আমারও ইচ্ছা, তুমি সম্পাদক হও’। বঙ্কিমবাবু অস্বীকৃত হইয়া বলিলেন, ‘তা হলে বঙ্গদর্শন ছাড়িব কেন? তা হলে আর কাহারও সহায়তা লইতাম না’।

যাই হোক শ্রীশচন্দ্রের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ ১২৯০-এর কার্তিক থেকে মাঘ এই চার মাস মাত্র চলে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং এর প্রকাশ বন্ধ করে দেন। এর পর বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে বা তার উপদেশ নিয়ে ‘বঙ্গদর্শন’ আর কখনও প্রকাশিত হয় নি। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় মাত্র চার বছর চললেও ‘বঙ্গদর্শন’ যে বাঙালীর সর্বকালের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ পত্রিকা এতে কোন সন্দেহ নেই। ১৯০১ সালে (১২৯৪ বঙ্গাব্দ) রবীন্দ্রনাথ সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে ‘বঙ্গদর্শন’কে পুনরুজ্জীবিত করেন। হয় ত ‘বঙ্গদর্শন’-এর মত একটি পত্রিকার অদর্শন তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি। তবে পত্রিকাটিকে রবীন্দ্রনাথ তার নিজের মত করে সাজিয়ে নেন। অনেক বেশি পদ্য রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। গীতাঞ্জলীর বহু কবিতা এখানে প্রকাশিত হয়েছে। তার রচিত উপন্যাস ‘চোখের বালি’ ‘বঙ্গদর্শনে’ই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ প্রথম এই পত্রিকাতেই বের হয়। তবে রবীন্দ্রনাথ বেশি দিন সম্পাদনার কাজ করেন নি। অনেকের মতে, বঙ্কিমচন্দ্রের প্রদর্শিত লক্ষ্য থেকে সরে এসে নবপর্যায়ের ‘বঙ্গদর্শন’-এ রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা ও তার ধারাকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী ছিলেন । এ নিয়ে অনেক বাদানুবাদ হতেই পারে। তবে রবীন্দ্রনাথ যে এক ধরণের বিশ্বজনীনতায় বিশ্বাস করতেন, তাতে হয় ত তিনি কোন একটি বিশেষ কালের প্রয়োজনে বিপ্লবী চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে তার দ্বারা কোন কার্যসিদ্ধি সম্পন্ন করতে ততটা মনোযোগী ছিলেন না।

‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কিছুদিন পত্রিকাটি বন্ধ হয়েছে, পুনঃ প্রকাশিত হয়েছে, সম্পাদক পরিবর্তন হয়েছে এবং পরিশেষে বন্ধ হয়ে আবার নব-পর্যায়ে প্রকাশিত হয়েছে। এর গতিপথের ইতিহাস এক নজরে দেখে নেওয়া যাক। ‘বঙ্গদর্শন’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১২৭৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে। ১২৮২-এর চৈত্র পর্যন্ত চার বছর পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। ১২৮৩-তে পত্রিকা প্রকাশিত হয় নি। ১২৮৪-এর বৈশাখ থেকে ১২৮৫-এর চৈত্র, ১২৮৭ বৈশাখ থেকে ১২৮৮ আশ্বিন এবং ১২৮৯ বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত সম্পাদক হিসাবে বঙ্কিমাগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্রের নাম থাকলেও পরোক্ষে বঙ্কিমচন্দ্রই সম্পাদনার কাজ দেখাশোনা করেছেন বলে জানা যায়। ১২৯০-এর কার্তিক থেকে মাঘ - এই চার মাস সম্পাদক ছিলেন শ্রীশচন্দ্র মজুমদার। এর পর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ ছিল। দীর্ঘকাল পরে ১৩০৮ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় পত্রিকার নব-পর্যায় প্রকাশিত হয়। ১৩১২ অবধি পাঁচ বছর এ ভাবে চলার পর ‘বঙ্গদর্শন’ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

এখানে পত্রিকার মুখপত্রের এবং ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যার ‘পত্রসূচনা’ শিরোনামে লিখিত প্রবন্ধের প্রথম পৃষ্ঠার প্রতিলিপি দুটি দেওয়া হল।





লেখক পরিচিতি : বহু বছর বি.ই. কলেজে (এখন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, শিবপুর ( IIEST,shibpur )) অধ্যাপনা করেছেন। কিছুদিন হল অবসর নিয়েএখন সেখানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আছেন। অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স নিয়ে গবেষণা করলেও একাধিক বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে - জ্যোতিষশাস্ত্র, পুরনো কলকাতার সংস্কৃতি, ইত্যাদি। অবসর সময়ে 'অবসরে'র সঙ্গে সময় কাটান।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।