অনুপ্রবেশ: নিঃশব্দ প্রতীক্ষার কাল

রাহুল ঘোষ

[লেখক পরিচিতি: বোলপুর কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক। স্নাতকোত্তরের পাঠগ্রহণ বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগে। শিক্ষাবিজ্ঞানে স্নাতক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মহাবিদ্যালয় থেকে। পেয়েছেন নেট-জে.আর.এফ.। কবিতার বই: বিলাস, শোওয়ার সময় কোকিল, অমলিন মসলিন। সম্পাদিত গ্রন্থঃ নির্বাচিত শান্তিনিকেতন। প্রবন্ধগ্রন্থঃ দশরূপক। সম্পাদনা করে চলেছেন 'রুআক' ও 'শান্তিনিকেতন' নামে দু’টি ঐতিহ্যমণ্ডিত পত্রিকা। ]

একসময় উঁকিঝুঁকি দিয়েছিলো সন্ত্রাস
ছেলেমেয়েগুলো ছিলো সব ঘরছাড়া…
স্বপ্ন নিয়ে
অনেকদিন হলো তারা উধাও হয়েছে

(ভাস্কর চক্রবর্তী, “তুমি আমার ঘুম, আরো দু-একটা কথা”)

প্রতিকী ছবি

উপন্যাসঃ অনুপ্রবেশ
লেখকঃ তুষার চট্টোপাধ্যায়
গ্রন্থঃ ডুয়ার্সের দশ উপন্যাস (এখন ডুয়ার্স), সম্পাদকঃ প্রদোষ রঞ্জন সাহা
প্রকাশনাঃ ডুয়ার্স বুকস

১৮ মার্চ ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) শিলিগুড়ি মহকুমা শাখার উদ্যোগে একটি কৃষক সম্মেলন আয়োজন করে। সেখানে মূলত ভূমিমালিকদের একচ্ছত্র অধিকারভোগ, কৃষকদের মধ্যে জমিবন্টন, জোতদারশ্রেণীকে উচ্ছেদ করার জন্য সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। শুরু হয় কৃষক কমিটিগুলির জমি দখল, জমির রেকর্ড দখল, জোতদারদের নিরস্ত্রীকরণ প্রভৃতি কর্মসূচি। ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে এই আন্দোলন নকশালবাড়ি এলাকায় তার প্রভাব হারিয়ে ফেললেও পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে নকশাল আন্দোলন।

কথাকার তুষার চট্টোপাধ্যায় উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়েতে ডেপুটি চিফ কন্ট্রোলারের চাকরি করতেন। তুষারবাবুর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘অনুপ্রবেশ’ (১৯৮৩)। ‘চেনা অচেনা মুখ’ (২০০২) তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘গোপন কথা,’ ‘অন্তর্ঘাত,’ ‘শূন্য বলয়ে,’ ‘ঝুলন্ত সেতু,’ ‘দত্তভিলায় নেকলেস কেলেঙ্কারি,’ ‘বিপন্ন সময়,’ ‘মুখোশ,’ এবং ‘ফাটল’ (২০১৫)। ১২টি গল্পগ্রন্থ, নাটক, রম্যরচনা, মুক্তগদ্য লেখার পাশাপাশি সম্পাদনা করেছেন ‘নহবত,’ ‘তল্লাসী,’ ‘চক্রবাক,’ এবং ‘পেসমেল’ নামের চারটি পত্রিকা। আমাদের আলোচ্য বিষয় অনুপ্রবেশ উপন্যাসে ভারতী ওরফে শুভ্রার দ্বারা উপলের মগজধোলাই (brainwash) এবং সন্ধিক্ষণে উপলের চৈতন্য।

‘অনুপ্রবেশ’ উপন্যাসের পটভূমি ডুয়ার্স সন্নিহিত অঞ্চল। উপন্যাসের শুরুতেই পাই উত্তম পুরুষে গল্পকথকের Intra Communication অর্থাৎ স্বগত-সংলাপ।

সাম্প্রতিককালে আমি একটাও গোটা রাত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শেষ করে ফেলতে পারিনি। মাঝরাতে কিংবা রাতের কোনও একটা সময়ে আমার ঘুম ভাঙবেই এবং রাতের অবশিষ্ট সময়টুকু আমায় বিছানায় পড়ে থেকে ঘুমের জন্য আরাধনা করে করে ক্লান্ত এবং বিফল হয়ে বাইরে আকাশ ফরসা হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়। কিছুদিন ধরে এমন এক ধরনের অস্বস্তি কিংবা বলা যাক যন্ত্রণা নিয়ে রাতভর আমাকে ছটফট করতে হয়।

কথক একেকদিন পিছিয়ে পিছিয়ে নিজের জীবন-যন্ত্রণার কথা বলা শুরু করেছেন। অন্তর্মুখী আত্মকথনভঙ্গি(Interior Monologue) ক্রমে ক্রমে চেতনাপ্রবাহতার দিকে (Stream of consciousness) যাত্রা করলেও উপন্যাসে তার রেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাঝপথেই উপন্যাস সর্বশক্তিমান লেখকের হাতেই অর্পিত হয়েছে। “গতকাল রাতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঘুম ভাঙতেই দেখি আমার চারদিকে চাপ চাপ ঘন অন্ধকার।”

অবিশ্বাস, অন্ধকার, শুভ্রার প্রতি ফ্যাঁসফেঁসে গলার শব্দ প্রভৃতির মাধ্যমেই বর্ণনা করা শুরু হয় কথক উপলের ও কথকের স্ত্রীর(ভারতী/শুভ্রা) সম্পর্কের কথা। উপন্যাসের শুরুতেই ফুটে ওঠে সম্পর্কের মধ্যেকার তিক্ততা। গল্প ক্রমশ পিছিয়ে যেতে থাকে।

১৯৬৫ সাল থেকে শুরু হয় বর্তমানের প্রতি ইঙ্গিত। কথক উপল তখন কলেজ ছাত্র। এবং কলেজ ইলেকশনে ছাত্র ফেডারেশনের প্রার্থী। কলেজ ইলেকশনে উপল কংগ্রেস প্রার্থী লাল্টুসের বিরুদ্ধে জিতলেও শেষ পর্যন্ত লাল্টুসের প্রবল অত্যাচারে ছেড়ে দিতে হয় সে পদ। সে বিশ্বাসঘাতী হয় ফেডারেশনের কাছে। সেদিন লাল্টুসের কাছে প্রাণভিক্ষার আর্জি করে রেহাই পেয়েছিল সে এটা ফেডারেশন জানে না। পদ না ছাড়লে লাল্টুস সেদিন মারতে মারতে তাকে মেরেই ফেলত। উপলের বারবার মনে পড়ে একটাই কথা – মাস্টারমশাই বটকৃষ্ণবাবুর তার প্রতি উক্তিঃ “তোর দ্বারা কিছু হবে না।” পারিবারিক নানা কথাবার্তায় কাটে উপন্যাসের প্রথম তিন অধ্যায়। চতুর্থ অধ্যায় থেকে উপলের জীবনে প্রবেশ করে ভারতী।

উপলের সেজকাকার ছোটবেলার বন্ধু অবনীশ মৌলিক। উত্তরবঙ্গের নিমতিঝোরা চা-বাগানের ম্যানেজার। অবনীশবাবুর মৃত শ্যালিকার মেয়ে ভারতী। বেকার উপলকে ওর সেজকাকা অবনীশবাবুর কাছে পাঠিয়েছিলেন একটা চাকরি জোগাড় করে দেবার আশায়।  উপলের চাকরি হয় এক প্রাইমারি স্কুলে। পারিবারিক বন্ধুত্বসূত্রে ভারতী ও উপলের মধ্যেকার সখ্যতা অনেককাল আগে থেকেই সূচিত হয়েছিল। সে সখ্যতার গতি বৃদ্ধি পায় উপল যখন চাকরির আশায় এবার উত্তরবঙ্গে আসে।

জন্মাবধি ভারতী অবনীশবাবুর কাছেই মানুষ। ভারতীর মা প্রসব করেই মারা যান। ভারতীর বাবা নিরুদ্দেশ। উপল ভারতীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মুহূর্তটিকে বর্ণনা করেছে এভাবেঃ “ওকে ছেলেবেলায় দেখতে বেশ ভাল লাগত। ফ্রক পরে বেণি ঝুলিয়ে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাগানের গাড়িতে উঠে স্কুলে যেত। তখন ও অনেকটা দেখতে ছিল পুতুল পুতুল।”

দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার (বর্তমান) মুহূর্তটাকে বর্ণনা করেছে এভাবেঃ

“তখন ভারতী বড় হয়েছে। ডোরাকাটা অর্ডিনারি একটা মেরুন রঙের তাঁতের শাড়ির উপর একটা কালো কার্ডিগান পরেছে। ওর নাকের ডগা ঈষৎ চাপা, গালে টোল ফেলে হাসে।”

পূর্ববর্তী প্রেমগুলির ব্যর্থতা উপলকে ভারতীর কাছাকাছি নিয়ে আসে। যদিও এক সুপ্ত অনুভূতি প্রথম থেকেই ভারতীর জন্য উপলের অবচেতন মনে উপস্থিত ছিল যা ক্রমেই তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। যার সূচনাবিন্দুকে Id বলা যেতেই পারে। ভারতীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরমুহূর্তেই উপলের মধ্যে অস্তিত্ববাদী চিন্তার প্রাবল্য আমরা লক্ষ্য করতে থাকি। বুকের মধ্যে জলপ্রপাতের কলকল শব্দ, ফোয়ারার চারপাশে ঝিরঝির করে ছড়িয়ে পড়া জলপ্রবাহ, নিজেকে রঙিন ফুরফুরে বেলুন মনে হওয়া, এসবের সাক্ষ্য বহন করে।

উপল প্রথম প্রথম ভেবেছে ভারতীকে “দেখলে মনে হয় না যে, পৃথিবীতে কোথাও সুখ-দুঃখ-কষ্ট, সমস্যা কিংবা সামান্যতম জটিলতা আছে। আমি এর আগে রক্তিমা, মঞ্জুলাকে দেখেছি, রমা, টুলটু্ল,‌ মিতুল, এবং আরও কত মেয়েকে দেখেছি, কিন্তু ভারতী ভিন্ন চরিত্রের, অন্য রকমের।” আসলে ভারতী সত্যিই এক সুপ্ত হিংস্রতা, যা উপল প্রথমে বুঝতে পারেনি। উপন্যাস যত এগিয়েছে সে তত তা অনুধাবন করেছে। ভারতী উপলকে পরিবারের প্রতি অনুগত থাকার জ্ঞান দিয়েছে কিন্তু সেই যখন শুভ্রা রূপে প্রকাশিত হল তখন আমরা লক্ষ্য করি এসব আসলে ওর ফাটকাবুলি। উপন্যাসের ছয় অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি অলোককে। সে ভারতীর কাছে আসে এবং চা-বাগানের সদ্যসমাপ্ত শ্রমিক ধর্মঘট নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করে। লাইন অব অ্যাকশন নিয়ে আলোচনা করে। সেখানেই উপল প্রথম শুনতে পায় অলোক ভারতীকে শুভ্রা নামে ডাকছে। অর্থাৎ অলোকের কাছে সে শুভ্রা। যদিও পরে উপল জানতে পারে নকশালদের কাছে ভারতী শুভ্রাই এবং উপলের কাছেও ভারতী একসময় শুভ্রা হয়ে ওঠে। ক্রমে উপল বুঝতে পারে ভারতী তার মেসোর বিরুদ্ধেই চা-বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে। ভারতী ক্রমশ উপলের কাছে ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকে। ভারতীর সু্প্ত ও গুপ্ত চিন্তা উপল সব জেনে ফেললে ভারতী চায় উপল তাদের সঙ্গে যোগ দিক।

এরপর শুভ্রার দ্বারা উপলের মগজ-ধোলাই শুরু হয়। রমাকে ত্যাগ করার মুহূর্তে উপল বিছানায় ছটফট করেছিল। সেই ছটফটানি সে ভারতীর ক্ষেত্রে আর চায় না। ফলত সে ভারতীর মোহজালে আবদ্ধ হতে থাকে। একসময় ভারতীকে নিয়ে উপল ভারতীর পিসির বাড়ি মেটেলি আসে। সেখানেই কাহিনির বাঁকবদল হয়। ভারতী উপলকে ক্রমশ বলতে থাকে চা-বাগানের সবাই উপলকে নকশাল মনে করছে। সেইজন্যই সে উপলকে মেটেলিতে সরিয়ে এনেছে। এখানেই উপলের পার্টির ক্লাস শুরু হয়।

শুরু হয় মগজধোলাই যার নেপথ্যে এক নারীর রূপ-মাদকতা। আত্মিক কোনো টান উপলের এই আদর্শে কোনোদিনই ছিল না। সবই যেন জোর করে। একজন মানুষের কানে বারবার কোনো আদর্শের কথা পুনরাবৃত্ত হতে থাকলে সে অবশ্যই সেই আদর্শের প্রতি আগ্রহী হবে; মনস্তত্ত্বের পাঠকমাত্রই একথা জানেন। মগজধোলাইয়ের পর আর কোনো শব্দ কানে প্রবেশ করে না। সে সেই আদর্শকেই সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র পন্থা বলে মনে করতে থাকে।

উপলের পরিবারের প্রতি বিতৃষ্ণা, একাকিত্ব, এসব নজরে রেখেই ভারতী ধীরে ধীরে তাকে পার্টির কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। উপল হয়ে ওঠে পার্টিকর্মী। বাংলা সাহিত্যে আগে বোধহয় এত নিপুণতার সঙ্গে অন্য কোনো উপন্যাসে brainwash-এর কথা ব্যক্ত হয়নি। একজন সাধারণ মানুষকে নকশাল করে তোলার সূক্ষ্ম পদ্ধতিও অন্য কোথাও বিবৃত হয়নি। ষষ্ঠ অধ্যায় ও সপ্তম অধ্যায় পেরিয়ে এসে আমরা দেখি উপল একজন সশস্ত্র পার্টিকর্মী হয়ে উঠেছে। উপলের প্রতি শুভ্রার উক্তির  কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি।

তোর দ্বারা কোনো সমস্যারই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না উপল। আমরা একটা কঠিন সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে। বেঁচে থাকা অথবা একেবারে মরে যাওয়া। এভাবে রোজ রোজ একটু একটু করে মরে যাওয়ার যন্ত্রণা ভোগ করার মানে হয় না। আমি মনে করি না তোর জীবনে একটা যুদ্ধ ভিন্ন অবশিষ্ট কিছু আছে, তোর এসব মনে হয় না উপল?

নারী জানে পুরুষের দুর্বলতা। উপলের সাপটা ফণা তুলে কেবল ভারতীকে খুঁজে বেড়ায়। তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। জয়ন্তিতে তাদের ‘নূতন সংসার’ হয়।

উপল অষ্টম অধ্যায়ে অ্যাকশনের জন্য প্রস্তুত। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নিমতিঝোরা চা-বাগানের ম্যানেজার অবনীশবাবুকে অর্থাৎ উপলের আশ্রয়দাতা তথা শুভ্রার মেসোকে হত্যার। সে দায়িত্ব দিয়েছিল খোদ শুভ্রা ও অলোক। শেষপর্যন্ত মেসোর প্রতি ও তার পরিবারের প্রতি ভালবাসাবশত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় উপল। এ ঘটনা অলোক, ভূপেন, নিশীথ, সুধাময়কে হিংস্র করে তোলে। তারা উপলকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়। শেষমুহূর্তে শুভ্রার হস্তক্ষেপে উপল সেযাত্রায় বেঁচে যায়। কিন্তু তার প্রভাব পড়ে দাম্পত্যে। শুভ্রা প্রতিমুহূর্তে উপলকে হেয় প্রতিপন্ন করতে থাকে। শেষেরদিকে শুভ্রাও উপলকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

এগারো অধ্যায়ের শেষে আমরা দেখি উপলের বারবার মনে হতে থাকে, তাকে লাল্টুস বলেছিল চিনের দালাল, ফেডারেশন বলেছিল বিশ্বাসঘাতক, মাস্টারমশাই বটকৃষ্ণবাবু বলেছিলেন অকর্মণ্য। এবং এখন নকশালদের চোখেও সে বিশ্বাসঘাতক। যদিও সে নিজে জানে এর কোনোটাই সে নয়। সব সময়ের খেলা। গর্জে ওঠার জন্য সে অপেক্ষা করেছে সঠিক সময়ের। শুধুমাত্র সেজো কাকা-কাকিমা বুঝেছিল তাকে। বারবার চরিত্রে আঘাত আসার ফলে উপল একসময় পরিবর্তিত হয়। উপন্যাসের শেষে দেখি উপলের মধ্যে কোনো থরথর কাঁপুনি নেই। ঢিপঢিপ শব্দ নেই বুকে। সে পুরো এক অন্য মানুষ। তার আত্মবিস্মৃতি থেকে চৈতন্যোদয় হয়েছে। উপলকে হত্যা করার উদ্যোগমুহূর্তে উপল চিৎকার করে উঠেছে-

আমি শুভ্রার দিকে চোখ তুলে আবার বললাম, আমি তোমাদের হাতে খুন হয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করিয়ে দিতে চাই শুভ্রা।/ কথা শেষ করেই আমি বুঝতে পারি, আমার ক্ষমতা অসীম, বন্দুকের নলের চাইতেও!

এ তো বলিষ্ঠ প্রতিবাদ – মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে।

উপলের এই আমিত্বের জাগরণ নকশাল আন্দোলনের ব্যর্থতাকেই সূচিত করেছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আন্দোলনের মূল নেতা চারু মজুমদার বলেছিলেন, ‘এই আন্দোলন জমি অথবা ফসলের জন্য আন্দোলন ছিল না। তা প্রকৃতপক্ষে ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আন্দোলন।’ আমি মনে করি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজের কোনোরকম পরিবর্তন আদতে আসতে পারে না। তাতে করে সমাজ আরো বেশি দূষিত হয়ে পড়ে।

তথ্যসূত্র

এবং উমর, বদরুদ্দিন। (২০১৪, জুন)। “সত্তর দশকের কৃষক আন্দোলন, সত্তর দশক, প্রথম খণ্ড, সম্পাদকঃ অনিল আচার্য। কলকাতাঃ অনুষ্টুপ।

রায়, রঞ্জন, অধ্যাপক ফেসবুক পোস্ট।

চট্টোপাধ্যায়, তুষার। (২০১৯, জানুয়ারি)। “অনুপ্রবেশ,” ডুয়ার্সের দশ উপন্যাস (এখন ডুয়ার্স), সম্পাদকঃ প্রদোষ রঞ্জন সাহা। জলপাইগুড়িঃ ডুয়ার্স বুকস।

 

 

লেখকের অন্য লেখা:

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    প্রাচ্যের ফরাসি সুগন্ধি – কেরল

    সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

    আমি ভ্রমণ করতে ভালবাসি, কিন্তু ভ্রমণের কল্পনা করতে আমার আরও ভালো লাগে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) রবিঠাকুর উবাচ। আমাদের মতন ভ্রমণপিপাসুদের বেদবাক্য হয়ে থাকবে চিরকাল। বছরে যদি দু’বার ঘুরতে যাওয়া হয়, বাকি সময় কাটে ভ্রমণ কল্পনায়। সেই সময়ের কথা বলছি যখন বিদেশ ভ্রমণ শুধুমাত্র কল্পনায় বাস্তবায়িত হত। সদ্য চাকরি পাওয়া দু’জন নববিবাহিত মানুষ তাই চেষ্টা করত দেশের […]

    Read More

    গিরিশ ঘোষ : বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের পিতা

    সূর্য সেনগুপ্ত

    যদি মিথ্যা কথায় বাপ দাদার নাম রক্ষা করতে হয়, সে নাম লোপ পাওয়াই ভাল।— মিথ্যায় আমার যেন চিরিদিন দ্বেষ থাকে।–মিথ্যায় আমার ঘৃণা, সে ঘৃণা বৃদ্ধ বয়সে ত্যাগ করবো না গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ‘মায়াবসান’ নাটকে (৪:২) কালীকিঙ্করের সংলাপ, (১৮৯৮) [১] ভদ্রলোক রাত্রে শো হয়ে গেলে একটা ভাড়ার গাড়ি ধরে শুঁড়িখানায় গিয়ে বসতেন। ততক্ষণে অবশ্য তিনি অর্ধমত্ত অবস্থায়। […]

    Read More

    নববর্ষের নতুন প্রভাতে

    ভাস্কর বসু

    সে ছিল এক সময়। তখন পয়লা বৈশাখে প্রভাতফেরি বার হত, আগের চড়ক সংক্রান্তির দিন থেকেই উৎসবের সূচনা হয়ে যেত। গাজনের বাজনা শোনা যেত, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মা’র হাত ধরে চড়কের মেলাতে নতুন জিনিষের আবদার করত। এখন একটু অন্যরকম! বিগত ইংরেজি বছরের দুর্বিষহ স্মৃতিকে পিছনে ফেলে পেরিয়ে এলাম আমরা এই বছরের আরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি সময়। কিন্তু […]

    Read More

    সুকুমার রায়ের নাটক

    সুমিত রায়

    সুকুমার রায়ের (১৮৮৭-১৯২৩) “সুকুমার রায়” হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিলো না। তার প্রথম কারণ হলো তিনি ছিলেন কোলকাতায় রায়চৌধুরী বাড়ীর ছেলে, তাঁর জীবন উনিশ-বিশ শতকের মধ্যে সেতুর মতো। বাংলা সাহিত্য আর সংস্কৃতির কথা ধরলে সেসময়ে ঠাকুরবাড়ীর পরেই এই রায়চৌধুরীদের নাম করতে হয়। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের রাজ্যে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই বাংলাদেশে ছাপাখানা এসে গেছে […]

    Read More

    বীরোল

    রিয়া ভট্টাচার্য

    গ্রন্থঃ বীরোল লেখকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশনাঃ দ্য ক্যাফে টেবল কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা (genre)। অনেক দিকপাল লেখকের লেখনীর ঝরনাধারায় সিক্ত সাহিত্যমাতৃকার এই অংশ। কিশোর উপযোগী সায়েন্স ফিকশন রচনায় বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তাঁরই সাম্প্রতিকতম উপন্যাস গ্রন্থ বীরোল। এই গ্রন্থে আছে মোট দু’খানি উপন্যাস, “নতুন দিনের আলো” ও […]

    Read More
    +