চিবানন্দ

মধুমিতা রায় চৌধুরী

[লেখক পরিচিতি: মধুমিতা রায় চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতার দক্ষিণে। বিবাহিত এবং একটি কন্যা সন্তানের মা। নিবাস উত্তর কলকাতায়। লেখালেখির হাতেখড়ি ডায়েরির শেষের পাতায় এলোমেলো ভাবে, খামখেয়ালে। নতুন স্থান, নতুন মানুষ তাদের জীবন নিয়ে ভীষণ কৌতূহল। সেই কৌতূহলের তাগিদেই, ডায়েরির শেষের পাতা থেকে ম্যাগাজিনের পাতায় আগমন। ]

কেউ কোনোদিন পেন্সিল চিবিয়েছ? লালকালো নটরাজ মার্কা পেন্সিল!

প্রথমে একটু শক্ত। দাঁতে সেট হয়ে গেলে, মুখে একটু ছিবড়ে লাগবে। তারপর ভিজতে ভিজতে নরম হবে। তারপর রঙ চটে কাঠ বেরিয়ে আসবে। চিবোতে চিবোতে ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে লালা বেরিয়ে আসে। এই অবস্থায় সারা পৃথিবী ভুলে একমনে গভীর ভাবে যে চিন্তা আসে সেটাই হলো মেডিটেশন।

আমার সেই চিন্তায় প্রায়ই ঘুম এসে যেত। তবুও প্লান্ট কি,  কোন মাটিতে কেন হয় সেইগুলি আর মুখস্তই হতো না।  স্কুলে সাইন্স আউন্টি একটা প্যারাগ্রাফ হুবহু মুখস্থ চাইতেন। প্রায় সবাই পড়া দিচ্ছে আর আমি পেন্সিল চিবিয়ে ছিবড়ে করে ফেলছি, কিন্তু প্লান্ট আর বেরোচ্ছে না। এই রকম অবস্থায় আমি ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে উঠে গেলাম।

সেবার জন্মদিনে কে যেন একটা হারমোনিয়ামের মতন দেখতে পেন্সিল বক্স আর তারমধ্যে দুটি পেন্সিল, একটি স্কেল গিফ্ট করেছিল। সেই পেন্সিলের মাথায় আবার হরেক রঙের রাবার লাগানো থাকত। তাই রাবারটা ঠিক চিবানো উচিৎ মনে করিনি। সুতরাং আমার সেই নিজস্ব কায়দার মেডিটেশন একপ্রকার বাধ্য হয়ে আমায় ছেড়ে যেতে বসে ছিল।  কিন্তু এবার ক্লাস ফাইভ। মানে নতুন পেন। তাই যখন পেন ধরলাম তখন আবার ধ্যান ধ্যান ভাব এলো। একদিন ধ্যানে মগ্ন, আমি আবিষ্কৃত হলাম একমুখ কালি নিয়ে।

সেইসময় দাদু বেঁচে থাকা কালীন গরমের ছুটিতে দাদুর বাড়ি বর্ধমানে গিয়ে দিন পনেরো থাকা একদম বাধ্যতা মুলক ছিলো। আর যেহেতু ছুটির পর পরীক্ষা থাকতো তাই সাথে করে বই খাতা, পেন পেন্সিল ও ব্যাগে আসতো। বর্ধমানে আমার দুই জ্যাঠতুতো থাকতো। তাঁরা বেশ অনেকটাই বড়ো। মানে ছোটদাদার গার্লফ্রেন্ড ছিলো। তাই বড়ো বড়ো ভাব তাঁর।  একদিন দুপুরে, লুকিয়ে ছোটদাদার গার্লফ্রেন্ডের দেওয়া পেন নিয়ে অঙ্ক করতে বসে আবার চিবোই চিবোই ভাব এলো। কোনরকমে রেখে সরে এলাম। রাতে ছোটদাদা এই মারে কি সেই মারে। কারণ পেনের পেছনে চার পাঁচটা দাঁতের কামড় রয়ে গেছিল।

চিবোতে চিবোতে যদি চিদানন্দ ভাবটাই না আসে তাহলে আর কী হলো। এখনও মনটা চিবোই চিবোই করে। তবে আশেপাশে পেন পেন্সিলের থেকে হাতা খুন্তিই বেশি। তাই একটু কঠিন ধ্যানে যাব কিনা ভাবছি।

 

লেখকের অন্য লেখা:

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    প্রাচ্যের ফরাসি সুগন্ধি – কেরল

    সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

    আমি ভ্রমণ করতে ভালবাসি, কিন্তু ভ্রমণের কল্পনা করতে আমার আরও ভালো লাগে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) রবিঠাকুর উবাচ। আমাদের মতন ভ্রমণপিপাসুদের বেদবাক্য হয়ে থাকবে চিরকাল। বছরে যদি দু’বার ঘুরতে যাওয়া হয়, বাকি সময় কাটে ভ্রমণ কল্পনায়। সেই সময়ের কথা বলছি যখন বিদেশ ভ্রমণ শুধুমাত্র কল্পনায় বাস্তবায়িত হত। সদ্য চাকরি পাওয়া দু’জন নববিবাহিত মানুষ তাই চেষ্টা করত দেশের […]

    Read More

    গিরিশ ঘোষ : বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের পিতা

    সূর্য সেনগুপ্ত

    যদি মিথ্যা কথায় বাপ দাদার নাম রক্ষা করতে হয়, সে নাম লোপ পাওয়াই ভাল।— মিথ্যায় আমার যেন চিরিদিন দ্বেষ থাকে।–মিথ্যায় আমার ঘৃণা, সে ঘৃণা বৃদ্ধ বয়সে ত্যাগ করবো না গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ‘মায়াবসান’ নাটকে (৪:২) কালীকিঙ্করের সংলাপ, (১৮৯৮) [১] ভদ্রলোক রাত্রে শো হয়ে গেলে একটা ভাড়ার গাড়ি ধরে শুঁড়িখানায় গিয়ে বসতেন। ততক্ষণে অবশ্য তিনি অর্ধমত্ত অবস্থায়। […]

    Read More

    নববর্ষের নতুন প্রভাতে

    ভাস্কর বসু

    সে ছিল এক সময়। তখন পয়লা বৈশাখে প্রভাতফেরি বার হত, আগের চড়ক সংক্রান্তির দিন থেকেই উৎসবের সূচনা হয়ে যেত। গাজনের বাজনা শোনা যেত, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মা’র হাত ধরে চড়কের মেলাতে নতুন জিনিষের আবদার করত। এখন একটু অন্যরকম! বিগত ইংরেজি বছরের দুর্বিষহ স্মৃতিকে পিছনে ফেলে পেরিয়ে এলাম আমরা এই বছরের আরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি সময়। কিন্তু […]

    Read More

    সুকুমার রায়ের নাটক

    সুমিত রায়

    সুকুমার রায়ের (১৮৮৭-১৯২৩) “সুকুমার রায়” হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিলো না। তার প্রথম কারণ হলো তিনি ছিলেন কোলকাতায় রায়চৌধুরী বাড়ীর ছেলে, তাঁর জীবন উনিশ-বিশ শতকের মধ্যে সেতুর মতো। বাংলা সাহিত্য আর সংস্কৃতির কথা ধরলে সেসময়ে ঠাকুরবাড়ীর পরেই এই রায়চৌধুরীদের নাম করতে হয়। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের রাজ্যে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই বাংলাদেশে ছাপাখানা এসে গেছে […]

    Read More

    বীরোল

    রিয়া ভট্টাচার্য

    গ্রন্থঃ বীরোল লেখকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশনাঃ দ্য ক্যাফে টেবল কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা (genre)। অনেক দিকপাল লেখকের লেখনীর ঝরনাধারায় সিক্ত সাহিত্যমাতৃকার এই অংশ। কিশোর উপযোগী সায়েন্স ফিকশন রচনায় বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তাঁরই সাম্প্রতিকতম উপন্যাস গ্রন্থ বীরোল। এই গ্রন্থে আছে মোট দু’খানি উপন্যাস, “নতুন দিনের আলো” ও […]

    Read More
    +