স্মরণে পার্থ ঘোষ

আকাশবাণীর গল্পদাদুঃ স্মরণে পার্থ ঘোষ

বাচিকশিল্পী পার্থ ঘোষ

গোড়ার কথা

প্রত্যন্ত এক গ্রামে আবৃত্তি করতে এসেছেন এক শিল্পী। অনুষ্ঠান সময়মত শেষ হয়েছে। যথারীতি দর্শকরা ধীরে ধীরে হল ছাড়ছেন। কিন্তু শিল্পীকে ছাড়তে চাইছেন না আরেক দল শ্রোতা ও দর্শক। এক ঝলক তাঁকে ছুঁয়ে দেখার আবদার নিয়ে বাইরে অপেক্ষারত একঝাঁক ক্ষুদে শ্রোতা। আর সেই শ্রোতাদের নিরাশ করার কোন উপায় নেই। কারণ সেই আবৃত্তি-শিল্পী যে ছোটোদের প্রিয় ‘গল্পদাদু’ পার্থ ঘোষ! আনন্দের জাদুকর পার্থ ঘোষ তাঁর কণ্ঠকে ব্যবহার করেই আনন্দ বিলিয়ে যান ক্ষুদে শ্রোতাদের মনে।

“ভালো আছ ছোট্ট বন্ধুরা?”

ষাটের দশকে রেডিয়োয় ব্যারিটোন কণ্ঠস্বরে এই শব্দবন্ধ শোনার জন্য অপেক্ষা‌ করে থাকত অগণিত ছোট্ট শ্রোতারা। তাই আবৃত্তিশিল্পী আর গল্পদাদুর সত্তা মিলেমিশে এক হয়েছে বারবার। আর নিজের কণ্ঠস্বরের জাদুতে শ্রোতাদের বারবার মুগ্ধ করেছেন এই শিল্পী। আবৃত্তির স্বর্ণকণ্ঠ বলতে আমরা যাঁদের কথা জানি, পার্থ ঘোষের নাম তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতে আসবে। গল্পদাদুর কথা বলার আগে বেতারকেন্দ্রের এই ‘গল্পদাদুর আসর’ অনুষ্ঠানের ইতিহাসটা একটু বলি।

১৯২৯ সাল। ভারতীয় বেতার তখনো আকাশবাণী হয়ে ওঠেনি। তবে একটু একটু করে রঙিন হতে শুরু করছে বেতার সম্প্রচার। অনুষ্ঠানসূচি বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হচ্ছে। নতুন নতুন পালকের সংযোজন হচ্ছে তার টুপিতে। বছরের শুরু থেকেই কলকাতা বেতার সম্প্রচার করতে আরম্ভ করে নতুন নতুন অনুষ্ঠান। ‘স্টুডেন্টস আওয়ার ফর কলেজ বয়েজ,’ ‘তিন ঘন্টার নাটক,’ ‘ফুটবল, ক্রিকেট’ ইত্যাদির ধারাবিবরণী,’ ‘লেডিজ কর্নার’ বা ‘মহিলা মজলিস।’ ১৯২৯ সালের জুন মাস থেকে শুরু হল ‘চিলড্রেনস কর্নার’ অর্থাৎ ‘ছোটদের বৈঠক।’ ছোটোদের অনুষ্ঠান সাজানো কি সহজ কথা! বিস্তর মাথা ঘামিয়ে তার রূপরেখা তৈরী করা হল। তবে তারও আগে ঠিক করতে হল অনুষ্ঠানের নাম। কী নাম দেওয়া যেতে পারে এই অনুষ্ঠানের? পরিচালনা কে করবেন? এগিয়ে এলেন যোগেশ চন্দ্র বসু। ছোটোদের মনের মত করে অনুষ্ঠান সাজাবার কঠিন কাজটি কাঁধে তুলে নিলেন। ‘ছোটোদের বৈঠক’ নামেই শুরু হয়েছিল অনুষ্ঠান। ‘গল্পদাদা’ ছদ্মনাম নিয়ে প্রথম পরিচালনা করেছিলেন যোগেশ চন্দ্র বসু।

যোগেশ চন্দ্র বসু ছিলেন পেশায় আইনজীবী।‌ কিন্তু এই অনুষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে মিশে গেলেন ছোটোদের সঙ্গে। অল্প দিনেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল ‘ছোটোদের বৈঠক।’ গল্পদাদার গল্প শোনার জন্যে ছোটোরা রীতিমতো মুখিয়ে থাকত। তখন মঙ্গলবার ও বুধবার এই দু’দিন বসতো গল্পদাদার আসর। তবে খুব বেশিদিন অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেননি যোগেশচন্দ্র বসু। দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রায় দু’বছর লড়াই করেছিলেন এই রোগের সঙ্গে।

এদিকে ‘গল্পদাদা’ অসুস্থ হওয়ায় গোল বাধল। ছোটোদের অনুষ্ঠান তখন খুবই জনপ্রিয়। বিরতি নেওয়ার কোনও উপায় নেই। রেডিওর সংযোগ এমনই। মনের সঙ্গে একবার তারটি বাঁধা হয়ে গেলে, তা বাজতেই থাকে, তাকে থামায় কার সাধ্য? ইথার তরঙ্গে গল্পদাদার আসরের হাত ধরে তখন বাঁধা পড়তে শুরু করেছে কচি-কাঁচাদের মন। এমন সময় গল্পদাদা অসুস্থ! কী উপায় হবে? এগিয়ে এলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র কমল বসু। তিনি কিছুদিন এই আসর পরিচালনা করেছেন। পরে আরো অনেকেই এই আসরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বেলা হালদার ছোটোদের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন ‘মেজদিদি’ ছদ্মনামে।

নানারঙের বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান সাজিয়ে তুললেও মনে রাখতে হবে, বেতার সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সে ছিল এক অস্থির সময়। জন্মের পর থেকে কলকাতা বেতারকেন্দ্র নানা ওঠাপড়ার সম্মুখীন হয়েছে। অবশেষে সব অনিশ্চয়তা নির্মূল করে পাকাপাকিভাবে সরকারি পরিচালনায় বেতার সম্প্রচার চালু রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হল ১৯৩২ সালের ৫ই মে। নতুন উৎসাহে নতুন ধারার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন বেতারকর্মীরা।

আবার তাকানো যাক ছোটোদের অনুষ্ঠানের দিকে। ১৯৪১ সালে ‘গল্প দাদার আসরের’ হাল ধরেছিলেন নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। ‘দাদুমণি’ নাম নিয়ে তিনি এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। প্রয়াত যোগেশ চন্দ্র বসুর পুত্র‌ কমল বসু তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন অনুষ্ঠানে তাঁর বাবার দেওয়া নামের ছোঁয়াটি যেন থাকে। ‘দাদুমণি’ নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ সে অনুরোধকে সম্মান জানালেন। ১৯৪৩ সালের অক্টোবর থেকে দাদুমণির ‘গল্পদাদার আসরে’র নতুন নাম হল ‘গল্পদাদুর আসর।’ পঞ্চাশের দশক তখন। বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে ছটা পর্যন্ত সপ্তাহে দু’দিন বসতো গল্পদাদুর আসর।

আকাশবাণীর গল্পদাদুরা

কলকাতা বেতারকেন্দ্র এরপর নাম বদলে ‘আকাশবাণী’ হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নামটি দিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সাল থেকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর নাম পাকাপাকিভাবে রাখা হয় ‘আকাশবাণী।’ ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’ তো ছিলই, পাশাপাশি বেতার পেল কাব্যের সুধামণ্ডিত আরেকটি নাম – ‘আকাশবাণী।’ আজও যে নামে আমরা অল ইন্ডিয়া রেডিওকে চিনি।

‘আকাশবাণী’ তখন শ্রোতাদের মনের আপন ঘর। অনেক অনুভূতির পীঠস্থান। বিদগ্ধ, গুণী মানুষদের কণ্ঠে সমৃদ্ধ অনুষ্ঠানের ডালিতে আকাশবাণীর জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছিল। অনেক বিশিষ্ট মানুষ পরিচালনা করেছেন ‘গল্পদাদু’র আসর। যেমন ধরা যাক জয়ন্ত চৌধুরীর কথা। বিশিষ্ট এই মানুষটি ‘গল্পদাদুর আসর’ পরিচালনা করেছেন বেশ কিছুদিন। তারপর ভয়েস অফ আমেরিকার ডাকে তিনি চলে যান দেশের বাইরে। তাঁর পরিচালনায় এই অনুষ্ঠান এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, রেডিওর ওপ্রান্তে অপেক্ষা করে থাকত ছোটোরা। ঘড়ির কাঁটার স্থির করা সময়ে ইথার তরঙ্গে মিশে যেত কচি-কাঁচাদের মন।

গল্পদাদু জয়ন্ত চৌধুরী তো দেশ ছাড়লেন, কিন্তু দাদু অনুপস্থিত থাকলেও ‘গল্পদাদুর আসর’ বন্ধ হওয়ার উপায় নেই। তাই জয়ন্ত চৌধুরীর পর কিছুদিন প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গল্পদাদুর আসর’ পরিচালনা করেছেন। তারপর ভার নিয়েছিলেন ঘোষক শংকর ঘোষ।

ষাটের দশকে আকাশবাণীতে অস্থায়ী ঘোষক হিসেবে যোগদান করেন এক দীর্ঘদেহী, সৌম্যকান্তি পুরুষ। কণ্ঠটি তাঁর যেন সোনায় মোড়া। ভাব আর আবেগের তরঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যায় শ্রোতাদের। স্পষ্ট উচ্চারণ। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করার ভঙ্গিমা মনোগ্রাহী। সব মিলিয়ে বিরল এক বিশেষত্বের ছোঁয়া। ঘোষকের নাম পার্থ ঘোষ। অল্পসময়ের মধ্যেই নিজের প্রতিভার জোরে বিস্তৃত হল তাঁর কর্মক্ষেত্র। ডাক পড়ল ছোটোদের অনুষ্ঠান পরিচালনা করার। ১৯৬৭ সালে প্রথমবার পার্থ ঘোষ পরিচালনা করলেন ‘গল্প দাদুর আসর।’ বাকিটা ইতিহাস।

প্রথমে অনিয়মিতভাবে পরিচালনা শুরু করলেও, পার্থ ঘোষ অল্প সময়েই আকাশবাণীর জনপ্রিয় গল্পদাদু হয়ে উঠেছিলেন। ছোটোরা আপন করে নিয়েছিল এই গল্পদাদুকে। তাঁর উপস্থাপনার একটি বিশেষ ধরন ছিল। কথা বলার ভঙ্গিমা সাবলীল, স্নেহমাখানো। গল্প বলার আকর্ষণীয় ভঙ্গিটির সঙ্গে কণ্ঠে মিশত অকৃত্রিম ভালোবাসার সুর, ছুঁয়ে যেত ছোটোদের। সৌম্যকান্তি, দীর্ঘদেহী মানুষটির কণ্ঠস্বর মনের ভেতর ঢুকে পড়ত সহজেই। রেডিওর ওপ্রান্ত থেকে ছোটোদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তাদেরই একজন হয়ে উঠতেন। রেডিওতে কান পেতে বাচ্চারা যেন শুষে নিত তাঁর প্রতিটি কথা, তাঁর আদরের সম্বোধন।

কোন কারণে আসরে এই গল্পদাদুকে না পেলেই চিঠি আসা শুরু হতো আকাশবাণীতে। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত আকাশবাণীর গল্পদাদু পার্থ ঘোষ ছোটোদের মন জয় করে এসেছেন। ১৯৮৫ সালে তিনি আকাশবাণীর সিবিএস অর্থাৎ বাণিজ্যিক বিভাগে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন।

এ হেন গল্পদাদুর নিজের ছোটোবেলাটি ঠিক কেমন ছিল?

১৯৪০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পার্থ ঘোষের জন্ম। ছোটবেলা কেটেছিল মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। একটু বড় বয়সে আসেন কলকাতায়। আবৃত্তি চর্চা করতেন ছোটো থেকেই। তাঁর মেসোমশাই স্বনামধন্য অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। একবার নাকি মেসোমশাইকে আবৃত্তি শোনাচ্ছিলেন। তখন তিনি কিশোর।

”পঞ্চ নদীর তীরে”
বেণী পাকাইয়া শিরে”

এই দু’লাইন আবৃত্তি করে অপেক্ষা করে রয়েছেন মেসোমশাইয়ের প্রতিক্রিয়ার জন্যে।

”ধুস! কিস্যু হয়নি!”

ছবি বিশ্বাস বলেছিলেন কিশোর পার্থ ঘোষকে। তবে সমালোচনার সঙ্গে সেদিন সেই কিশোরকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আবৃত্তি চর্চার মূল মন্ত্র।

”আবৃত্তি করতে হলে আগে সেই কবিতার ইতিহাসটা বুঝতে হবে। তবেই তাকে ভেতর থেকে অনুভব করা সম্ভব।”

কৈশোরের এই শিক্ষা আজীবন নিজের মধ্যে লালন করেছেন শিল্পী, এমনটা স্বীকার করেছেন নিজেই।

পার্থ ঘোষ উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। যে কোনো বিষয়েই দীর্ঘ ও গভীর পড়াশোনা করতেন। তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞান অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছে বারবার। সরস কথার জাল বুনে ছোটোদের অনুষ্ঠানে শোনাতেন কত জানা অজানা কাহিনি। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তারা মনে মনে গল্পদাদুর সঙ্গে চলত, ঠিক যেন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা।

পার্থ ঘোষের সঙ্গে একই পংক্তিতে উচ্চারিত হয় যাঁর নাম, তিনি তাঁর জীবনসঙ্গী গৌরী ঘোষ। ১৯৬০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’জনে একসঙ্গে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে একসঙ্গেই আকাশবাণী কলকাতায় যোগদান করেন ঘোষক হিসেবে। দু’জন অসামান্য বাচিক শিল্পী জীবনের পথেও একসঙ্গে হেঁটেছেন।

পুতুল সংগ্রহ করার নেশা ছিল পার্থ ঘোষের। তাঁর এক ঘনিষ্ঠজন বলেছেন, দেশে-বিদেশে আবৃত্তির অনুষ্ঠান করতে গিয়ে তিনি সংগ্রহ করে আনতেন নানান রকমের পুতুল। আদরে, স্নেহে সেই সব পুতুলদের নাম রাখতেন।

শেষ কথা

ব্যারিটোন কণ্ঠের সম্পদে ধনী ছিলেন পার্থ ঘোষ। নিজের কাজকে ভালোবাসতেন সাধনার মতো। সত্তর, আশি ও নব্বই দশক জুড়ে পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষ জুটি আবৃত্তি জগতকে এক অন্য উচ্চতায়  পৌঁছে দিয়েছিল। আবৃত্তিকার জুটি হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলেন তাঁরা। এই যুগ্মকণ্ঠ শব্দজগৎকে দিয়েছে কিছু অমূল্য সৃষ্টি। যুগলে ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ,’ ‘কচ ও দেবযানী,’ আবৃত্তি প্রবাদ হয়ে গেছে। আজও শ্রোতার মননে তা অক্ষয়। 

সেসময় আকাশবাণীর শিল্পীরা বাইরে আবৃত্তি করার অনুমতি পেতেন না। পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষ জুটির জনপ্রিয়তার শুরু রেডিওর সূত্রে। ইথার তরঙ্গ বেয়ে লক্ষ লক্ষ শ্রোতার কাছে মিঠে হাওয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ছিল এই যুগ্ম কণ্ঠের জাদু। শ্রোতারা অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখতে ও শুনতে চান। শ্রোতাদের দাবিতেই আকাশবাণীর সংগীত বিভাগের প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ বিমান ঘোষ তদবির করলেন। বাইরে অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করার ছাড়পত্র মিলল। আবৃত্তির দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি হল। তাঁদের নিজস্ব একক আবৃত্তি ও মিলিত যুগ্মকণ্ঠ দীর্ঘদিন মানুষের শ্রবণকে অধিকার করে রেখেছে।

পার্থ ঘোষের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের একাধিক কবিতা প্রাণ পেয়েছে। ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতার নাটকীয়তায় শ্রোতাদের আচ্ছন্ন করেছেন, ‘শেষ বসন্ত’ ও ‘বিদায়’ আবৃত্তিতে পার্থ মায়া ছড়িয়েছেন, ছুঁয়ে গেছেন হৃদয়। সেই সঙ্গে গৌরী ঘোষের সঙ্গে জুটি বেঁধে বহু আবৃত্তি ও শ্রুতিনাটক করেছেন। তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে ‘প্রেম,’ ‘জীবন বৃত্ত,’ ‘স্বর্গ থেকে নীল পাখি’র মত শ্রুতিনাটকগুলি।

‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ পার্থ ও গৌরী ঘোষের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। কুন্তীর ভূমিকায় গৌরী ও কর্ণের ভূমিকায় পার্থ ছিলেন অনন্য। অসামান্য বোঝাপড়ায় ফুটিয়ে তুলতেন কর্ণ ও কুন্তীর মনস্তত্ত্বের ওঠাপড়া, টানটান আবেগ, অনুভূতি। ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’-এর জন্যে এই জুটিকে ‘আটলান্টিস’ রেকর্ড কোম্পানি থেকে বিশেষ পুরস্কার ‘গোল্ড ডিস্ক’ দেওয়া হয়েছিল।

শান্ত, সৌম্যদর্শন এই মানুষটি তাঁর কাজকে ভালবাসতেন অন্তর থেকে। আকাশবাণীর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। উৎসাহ দিতেন সহকর্মীদের। আদ্যোপান্ত রসিক ছিলেন। কথাতেও যেন সুমধুর ছন্দ থাকত।

কত স্মৃতি তাঁদের ঘিরে। কত গল্প আকাশবাণীর সহকর্মীদের মুখে মুখে ফেরে! 

একবার পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষ ফিরছিলেন একটি অনুষ্ঠান শেষে। ফেরার পথে দুর্বৃত্তের মুখোমুখি হন। স্বভাবে নরম এই দুই শিল্পীকে ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছিল। দুজনেই সেই দুর্বৃত্তের কথা শুনছেন মন দিয়ে। একটু কি ভয় পেয়েছিলেন? জানা নেই, তবে শোনা যায় গৌরী ঘোষ নাকি হঠাৎ করে বলে ফেলেন, “তোমার ‘চ’ ‘ছ’ ‘র’ এর উচ্চারণ একেবারে ঠিক নেই! ইস! একটু শিখে নাও না কেন বাপু!” গৌরী ঘোষের এই কথা সমর্থন করেছিলেন পার্থ ঘোষ। এমনই ছিল বাচিক শিল্পের সঙ্গে তাঁদের নাড়ির টান। ভয়কে ছাপিয়ে কানে এসে লাগল উচ্চারণের অস্পষ্টতা।

সহজ, সরল, স্নেহপ্রবণ মানুষ ছিলেন পার্থ ঘোষ। আকাশবাণী থেকে অবসর নেওয়ার পরেও নিয়মিত চর্চা করতেন আবৃত্তির। অগণিত ছাত্রছাত্রীকে শিখিয়েছেন। শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অতুলনীয়। আবেগ ও মায়া সবসময় ছুঁয়ে থেকেছে তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বরকে। মায়াকে সুরের মতো করে কণ্ঠস্বরে লালন করা এই শিল্পীর জন্যে রইল অন্তরের শ্রদ্ধা।

——

তথ্যঋণ:
পার্থ ঘোষকে যাঁরা দীর্ঘদিন দেখেছেন, এমন কয়েকজন মানুষ সাহায্য করেছেন এই লেখাটি লিখতে। তথ্য দিয়ে ঋণী করেছেন আকাশবাণীর প্রাক্তন ঘোষক মিহিরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নাট্যব্যক্তিত্ব ও পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষের আপনজন চন্দন মজুমদার। 
সর্বোপরি যাঁকে ছাড়া এ লেখা ভিতটিই গড়ে উঠত না, তিনি সৌম্যেন বসু, আকাশবাণীর প্রাক্তন সহ-অধিকর্তা।

ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতাস্বীকারঃ অন্তর্জাল। 

আকাশবাণী কলকাতায় জাতীয় সম্প্রসারক হিসেবে কর্মরত। লেখালিখির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক। শুরু স্কুল জীবন থেকে। পেশাগত সূত্রেও লেখালিখির সঙ্গে জড়িত। যে ভাবনারা অনবরত ভেতরে দাগ কেটে চলেছে তাকেই অক্ষর দিয়ে সাজানোর চেষ্টা। শখ - বেড়াতে যাওয়া, গিটার বাজানো।

Related Articles

3 Comments

Avarage Rating:
  • 0 / 10
  • নয়ন বসু , July 17, 2022 @ 11:46 am

    খুব তথ্যসমৃদ্ধ এবং সুন্দর লেখনী।

  • সুস্মিতা বিশ্বাস , August 4, 2022 @ 5:43 am

    অনেক কিছু জানতে পারলাম লেখাটা পড়ে। এভাবেই হয়তো হয়তো ঐতিহ্য তৈরি হতে থাকে। ❤️

  • SAMIRAN BANERJEE , August 4, 2022 @ 7:13 am

    ভারি সুন্দর লেখা। অমন প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানলাম।

Leave a Reply to নয়ন বসু Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *