ভারতে বিজ্ঞানশিক্ষার পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান – ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্স

অমিতাভ প্রামাণিক

[লেখক পরিচিতি: ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা। পেশায় গবেষক, নেশায় pun-দোষ আছে। আদতে রসায়নের ছাত্র, কিন্তু শখ ইতিহাসের বইপত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করা আর ছড়া লেখা। ‘হাফ সেঞ্চুরির পর’ নামে একটা ছড়ার বই আছে। সংস্কৃত ছন্দ, রবি ঠাকুর, ভারতীয় দর্শনে বৈজ্ঞানিক উপাদান – এইসব নিয়ে চর্চার বিশেষ শখ। নিয়মিত লেখেন পরবাস, ম্যাজিক ল্যাম্প, জয়ঢাকের মত ওয়েব ম্যাগাজিনে। ]

গৌরচন্দ্রিকা

১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে জুলাই কলকাতার বৌবাজার স্ট্রিটে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার যখন প্রায় আক্ষরিক অর্থেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণাগার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অভ সায়েন্স’ স্থাপন করলেন, সিমলের দত্তবাড়ির নরেনের বয়স তখন মাত্র সাড়ে তেরো বছর- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটান ইনস্টিট্যুটের ছাত্র সে। প্রেসিডেন্সি কলেজ (এখন ইউনিভার্সিটি) থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (এখন স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে পাশ্চাত্য দর্শন ও ইয়োরোপের ইতিহাস পাঠ করে স্নাতক হওয়ার পাশাপাশি নরেনের উৎসাহ শুধু ভারতীয় দর্শন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, এবং শরীরচর্চাতেই ছিল না, তিনি সে সময়ের তাবড় দার্শনিক ও যুক্তিবিদদের রচনাবলি পাঠ করতেন, যাদের মধ্যে ছিলেন হিউম (David Hume), হেগেল (Georg Wilhelm Friedrich Hegel), সোপেনহয়ার (Arthur Schopenhauer), কোঁত (Aguste Comte), মিল (John Stuart Mill), ডারউইন (Charles Darwin) প্রমুখ অন্যান্যরা। হার্বার্ট স্পেনসারের (Herbert Spencer) বিবর্তনবাদ পাঠ করে তাঁর সঙ্গে চিঠিপত্র বিনিময় করেছিলেন তিনি, ‘শিক্ষা’ নামে বঙ্গানুবাদ করেছিলেন তাঁর লেখা ‘Education: Intellectual, Moral, and Physical’ নামের বইটার। ভারতীয়দের দিয়ে ভারতে ভারতীয়দের জন্যে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণাকেন্দ্র নির্মাণ-বিষয়ক মহেন্দ্রলালের জ্বালাময়ী বক্তৃতাগুলো কলকাতার শিক্ষিত মহলে খুব হয়ত ফলপ্রসূ হয়নি সে সময়, কিন্তু নরেন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে তার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন।

কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (বিজ্ঞানের চাষ) আর সায়েন্স অভ কাল্টিভেশন (চাষের বিজ্ঞান) দুটো আলাদা জিনিস, কিন্তু অনেকেই দুটোকে গুলিয়ে ফেলেন। আমি নিজে এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলাম। যাঁরা এর নাম সম্বন্ধে অবহিত নন, তাঁদের এই নাম বললে অনেকেই ভাবতেন আমি কৃষিকাজের ওপর গবেষণা করছি। বস্তুত ‘কাল্টিভেশন অভ সায়েন্স’ শব্দবন্ধটি এই প্রতিষ্ঠানের বাইরে খুব বেশি ব্যবহৃত হতে দেখিনি।

১৮৯৩ সালে নরেনের গায়ে সন্ন্যাসীর বেশ। রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য পরিব্রাজক হয়ে উত্তর, পশ্চিম হয়ে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করে দেখলেন আসমুদ্র হিমাচলের তৎকালীন অবস্থা। বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও রাজা-মহারাজারা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। মাদুরাইতে অবস্থানকালে খবর এল আমেরিকার শিকাগোতে আসন্ন বিশ্ব ধর্মমহাসভার, শিষ্যরা তাঁকে সেখানে যোগদানের জন্যে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। তাঁরাই প্রস্তাব দিলেন এ জন্যে অর্থসাহায্যের। খেতড়ির মহারাজা তাঁর নাম দিলেন বিবেকানন্দ। স্বামী বিবেকানন্দ বোম্বাই থেকে জাহাজে উঠলেন, সে জাহাজ যাবে জাপানের নাগাসাকি। ইয়োকোহমা থেকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার হয়ে তাঁকে পৌঁছাতে হবে শিকাগো।

ইয়োকোহমা থেকে ভ্যাঙ্কুভার যাওয়ার জাহাজে তিরিশ বছর বয়সী স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে আলাপ হল চুয়ান্ন বছর বয়সী এক স্বদেশী ব্যবসায়ীর, তাঁর নাম জামশেদজি টাটা। বাবার রপ্তানির ব্যবসায় যোগ দিয়ে তিনি ব্যবসা বাড়িয়েছেন, জাপান, চিন, ইওরোপ, আমেরিকায় ভারতীয় দ্রব্য রপ্তানীর লাইসেন্স তাঁদের, তার সিংহভাগ হচ্ছে আফিমের ব্যবসা। বিদেশে বহুবার ঘুরে তিনি উপলব্ধি করেছেন, ভারতীয় সূতিবস্ত্রের অতীত ঐতিহ্য এখনও অবলুপ্ত হয়নি, চেষ্টা করলে তাকে আবার জাগিয়ে তোলা যেতে পারে। তিনি বিনিয়োগ করেছেন সূতিবস্ত্রে,  অনেক কাপড়ের কল খুলেছেন, ব্যবসা বেড়েছে। এখন তাঁর ইচ্ছা, দেশে লৌহ ও ইস্পাতের মত ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবসা শুরু করবেন। তার হাল হকিকৎ জানতেই তাঁর এই বিদেশযাত্রা।

জাহাজে তাঁদের মধ্যে একাধিক সাক্ষাতে কী কথাবার্তা হয়েছিল, তা অনুমানের বিষয়। একজন তুমুল কর্মযোগী অধ্যাত্মবাদী যুবক, অন্যজন উচ্চাকাংক্ষী প্রৌঢ় ব্যবসায়ীর মিলনক্ষেত্র সম্ভবত আধ্যাত্মিক শক্তিকে ব্যবসায়ের উপযোগী কর্মযোগে প্রবাহিত করার উপায়সন্ধান। জামশেদজি নিঃসন্দেহে তাঁর কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, স্বামীজিও সে প্রসঙ্গে তাঁর মতামত জানিয়েছিলেন। মহেন্দ্রলাল-প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগারের নামের ‘কাল্টিভেশন অভ সায়েন্স’ শব্দবন্ধটা যে সেই আলোচনায় ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল এই ঘটনার পাঁচ বছর পরে। কলকাতায় স্বামীজির নামে এক চিঠি গেল বম্বেতে টাটাদের এসপ্লানেড হাউস থেকে, যার বয়ান এই রকম –

Esplanade House, Bombay. 23rd Nov. 1898

Dear Swami Vivekananda,

I trust, you remember me as a fellow-traveller on your voyage from Japan to Chicago. I very much recall at this moment your views on the growth of the ascetic spirit in India, and the duty, not of destroying, but of diverting it into useful channels. I recall these ideas in connection with my scheme of Research Institute of Science for India, of which you have doubtless heard or read. It seems to me that no better use can be made of the ascetic spirit than the establishment of monasteries or residential halls for men dominated by this spirit, where they should live with ordinary decency and devote their lives to the cultivation of sciences – natural and humanistic. I am of opinion that, if such a crusade in favour of an asceticism of this kind were undertaken by a competent leader, it would greatly help asceticism, science, and the good name of our common country; and I know not who would make a more fitting general of such a campaign than Vivekananda. Do you think you would care to apply yourself to the mission of galvanizing into life our ancient traditions in this respect? Perhaps, you had better begin with a fiery pamphlet rousing our people in this matter. I would cheerfully defray all the expenses of publication.

With kind regards, I am, dear Swami

Yours faithfully, Jamshetji Tata

এই চিঠির প্রতিলিপি দিয়ে পরে বেশ কিছু লেখালিখি হয়েছে, যার কিছু অংশ অতিরঞ্জিত। অনেকে দাবি করেছেন, টাটার শিল্পভাবনার কথা জেনে স্বামীজিই টাটাকে ভারতে বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করতে উৎসাহী করেছিলেন এবং টাটা বিবেকানন্দকে সর্বাধ্যক্ষ হিসাবে এই গবেষণাকেন্দ্রের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে স্বামীজি স্বাভাবিক কারণেই রাজি হননি। এটা একেবারেই ঠিক নয়। ওপরের চিঠিতে (যা আমি আন্ডারলাইন করে দিয়েছি) পরিষ্কার লেখা আছে, বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্রের পরিকল্পনা (স্কিম) টাটারই। তিনি বিবেকানন্দকে অনুরোধ করেছিলেন এই পরিকল্পনার ব্যাপারটা প্রচার (ক্যাম্পেন) করতে, সম্ভবত বিবেকানন্দ-সুলভ একটা জ্বালাময়ী প্রবন্ধ ছাপিয়ে, যার সমস্ত খরচ টাটা বহন করবেন।

টাটার লেখা সেই চিঠির পরে স্বামীজি ও জামশেদজি টাটার আর কোনো সাক্ষাৎ বা চিঠিপত্র আদানপ্রদানের কোনো নথি নেই। দুজনেই এর পর আর বেশি বছর বেঁচেও ছিলেন না। টাটার স্বপ্ন সফল করেছিলেন তাঁর যোগ্য সহকারী বুর্জরজি পাদশা (Burjorji Jamaspji Padshah)। এ গল্পের ইতিহাস অতি চমকপ্রদ।

ভারতে বিজ্ঞানের প্রসার ও জামশেদজি টাটা

কৃষির ওপর সর্বাত্মক গুরুত্ব ছেড়ে পৃথিবী তখন শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। শিল্পে নবজাগরণে-উদ্যোগী ইওরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথাবার্তা বলে জামশেদজি অনুধাবন করেছিলেন, ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যে প্রয়োজন অন্তত দুটো ভারী শিল্প স্থাপন করা – লৌহ-ইস্পাত এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন। অন্যান্য শিল্প স্থাপন করতে হলে, তার কলকারখানা তৈরি করতে গেলে, এ দুটো আগে দরকার। এবং এই দুই শিল্পকে দাঁড় করাতে গেলে দরকার উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের, যার জন্যে প্রয়োজন এক আধুনিক গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা। টাটার মনে এই ধারণার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল এবং তিনি তা কাজে রূপায়িত করতে মানসিক প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। এই তিন অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্নই কালক্রমে সফল হয়েছিল, তিনটেই রূপায়িত করেছিলেন বুর্জরজি পাদশা। কিন্তু এর জন্যে টাটার দরকার ছিল এক বড়সড় মরাল সাপোর্ট, যা তিনি পেয়ে গেলেন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভাষণ থেকে।
ব্রিটিশ ভারতে আধুনিক শিক্ষাপ্রসারে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উঠেছিল রামমোহনের সময় থেকেই। ১৮২৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর রামমোহন লর্ড আমহার্স্টকে লিখেছিলেন:

If it had been intended to keep the British nation in ignorance of the real knowledge, Baconian philosophy would not have been allowed to displace the system of the schoolmen, which was the best calculated to particulate ignorance. In the same manner the Sanskrit [রামমোহনের বানানে Sangscrit] system of education would be best calculated to keep this country in darkness, if such had been the policy of the British Legislature. But as the improvement of the native population is the object of the Government, it will consequently promote a more liberal and enlightened system of instruction, embracing mathematics, natural philosophy, chemistry and anatomy with other useful sciences, which may be accomplished with the sum proposed by employing a few gentlemen of talents and learning educated in Europe, and providing a college furnished with the necessary books, instruments and other apparatus. In representing this subject to your Lordship I conceive myself discharging a solemn duty which I owe to my countrymen and also to that enlightened Sovereign and Legislature which have been extended their benevolent cares to this distant land, actuated by a desire to improve its inhabitants and I therefore humbly trust you who will excuse the liberty I have taken in thus expressing my sentiments to your Lordship.

সেই দাবি পূরণ হতে লেগে গেল বেশ কয়েক দশক। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা, বম্বে ও মাদ্রাজে প্রতিষ্ঠিত হল ভারতের তিন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়। এর পর বহুদিন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বলতে এদেরই বোঝাত, পরের পঞ্চাশ বছরে স্থাপিত হয়েছিল লাহোরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাহাবাদের সেন্ট্রাল কলেজ পরিণত হয়েছিল এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৮৮৯ সালে বম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ভাষণ দিচ্ছিলেন বম্বের তৎকালীন গভর্নর ডোনাল্ড ম্যাকে (Donald Mackay), যাঁকে লর্ড রে-ও (11th Lord Reay) বলা হ’ত। তিনি বললেন:

It is only by the combined efforts of the wisest men in England, of the wisest men in India, that we can hope to establish in this old home of learning, real universities which will give a fresh impulse to learning, to research, to criticism, which will inspire reverence and impart strength and self-reliance to future generations of our and your countrymen.

এই ভাষণ টাটাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং এর তিন বছরের মধ্যেই, ১৮৯২ সালে, তিনি উচ্চশিক্ষার জন্যে বিলেত যাওয়ার ব্যবস্থা করতে টাটা স্কলারশিপ চালু করেছিলেন। এই স্কলারশিপও ছিল অদ্ভুত – এই অর্থ টাটা কাউকে অনুদান হিসাবে দিতেন না, দিতেন ধার হিসাবে, যদিও এর জন্যে কোনো সুদের ব্যাপার ছিল না, ধার পরিশোধের জন্যে কাউকে চিঠি পাঠানো হত না এবং কেউ এই ধার পরিশোধ করেছিলেন, এমন কথাও জানা নেই। টাটা বলতেন, অনুদান জিনিসটা আত্মমর্যাদায় আঘাত করে, তিনি চান না ছাত্ররা আহত মর্যাদা নিয়ে লেখাপড়া করুক। সে সময় উচ্চশিক্ষার জন্যে বিদেশ যাওয়ার একটি কারণ ছিল ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগদানের ইচ্ছা। স্কলারশিপ চালু করার সময় থেকে টাটার মৃত্যু পর্যন্ত যতজন ভারতীয় আই.সি.এস. হয়েছিলেন, তাঁদের এক-পঞ্চমাংশ ছিলেন টাটা স্কলারশিপ পাওয়া ছাত্র।
লর্ড রে-র বক্তৃতা (১৮৮৯) এবং টাটা স্কলারশিপ চালু করা (১৮৯২) দুটোই স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের (১৮৯৩) আগের ঘটনা এবং টাটার মধ্যে তখনই বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের বীজ ছিল। ১৮৯৬ সালে তিনি লর্ড রে-কে এই মর্মে একটা প্রস্তাব পাঠান। টাটা কোম্পানির হেড অফিস বম্বেতে, টাটা ভেবেছিলেন বম্বেই হবে এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত জায়গা। একে বড় করে তুলতে হলে সরকারকে – ব্রিটিশ সরকারকে – দায়িত্ব নিতেই হবে। টাটা যদি এই প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যে নিজের নাম ঢোকান, তাহলে সরকার এর দায়িত্ব নিতে রাজি না হতেও পারে, সুতরাং তিনি তা হতে দেননি। সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি স্থানীয় গভর্নরকেই বেছে নিলেন, যাঁর বক্তৃতা কয়েক বছর আগেই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
কিন্তু লর্ড রে নিজে যাই বলুন, জামশেদজির প্রস্তাবে তিনি সাড়া দিলেন না। জামশেদজি বুঝে গেলেন, অল্পায়াসে এই প্রকল্প রূপায়িত হওয়ার নয়। এর জন্যে প্রয়োজন ব্যাপক প্রস্তুতির – আরও ওপর মহলে তদ্বিরের এবং দেশব্যাপী এই পরিকল্পনার ব্যাপক প্রচারের যাতে জনগণের চাপ শাসক সরকার অনুভব করতে পারে।
এরই ফল ১৮৯৮ সালের নভেম্বরের সেই ঐতিহাসিক স্বামী বিবেকানন্দকে লেখা চিঠি। স্বামীজি তখন শিকাগো ধর্মমহাসম্মলনে ভাষণ দিয়ে আমেরিকাবাসীর হৃদয় জয় করেছেন এবং আমেরিকা ও ইওরোপের বিভিন্ন স্থানে আরও ভাষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। দেশ-বিদেশে তাঁর পরিচিতি ক্রমবর্ধমান। তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে সুদূর লন্ডন থেকে সে বছরেরই গোড়ার দিকে ছুটে এসেছেন এক আইরিশ তরুণী। এমন মানুষ, যিনি তাঁর পরিকল্পনার কথা জানেন, তাঁর প্রকল্পের প্রচারে কিছু লিখে দিলে তা ফলপ্রসূ হওয়ার আশা অনেক বেড়ে যাবে। দেশের মানুষ এর দাবিতে মুখর হবে।

স্বামী বিবেকানন্দের সমর্থন

জামশেদজিকে এই চিঠির উত্তর স্বামীজি দিয়েছিলেন কিনা, তা জানা যায় না। তবে ১৮৯৬ সালে স্বামীজি-প্রবর্তিত ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকার এপ্রিল, ১৮৯৯ সংখ্যার স্বাক্ষরহীন সম্পাদকীয়তে (যার সম্পাদকীয় স্বামীজি নিজে লিখতেন বলে জানা যায়) স্বামীজি টাটার এই পরিকল্পনার সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছিলেন। ঠিক যেমন মহেন্দ্রলাল সরকারের পরিকল্পনার কথা জেনে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গদর্শন পত্রিকায় সে বিষয়ে এক বড়সড় বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়েছিলেন সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে, টাটার কাছ থেকে খরচের তোয়াক্কা না করে বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশন থেকে ছাপানো তাঁর পত্রিকায় লিখেছিলেন –

জামশেদজি টাটার স্বপ্ন ও তৎসংক্রান্ত বুর্জরজি পাদশার পরিকল্পনার সপ্রশংস তারিফ করে স্বামীজি কৃষিবিদ্যা ও বাণিজ্যে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রয়োগের ওপর জোর দেন। স্মরণ করিয়ে দেন, অতীত পদ্ধতি ছেড়ে আধুনিক প্রযুক্তিপ্রসূত যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করলে শক্তিক্ষয়েই মনুষ্যপ্রজাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। প্রকৃতির অভ্যন্তরস্থ জ্ঞান যার ব্যবহারে অস্তিত্বের সংকটে সাফল্য আসে, টাটার পরিকল্পনায় তার আহরণের পথ প্রশস্ত হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করে এর জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থ দান করতে তিনি সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন। পরিশেষে বলেন –

We repeat: No idea more potent for good to the whole nation has seen the light of day in modern India. Let the whole nation therefore, forgetful of class or sect interests, join in making it a success.

এর চেয়ে বড় সমর্থন আর কী হতে পারে!

প্রস্তুতিপর্ব –  সূচনা

স্বামীজিকে চিঠি লেখার সময় দেশের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড এলগিন (James Bruce, 8th Earl of Elgin)। ১৮৯৯ সালের শুরু থেকে ভারতের নতুন ভাইসরয় হলেন লর্ড কার্জন (George Nathaniel Curzon)। কলকাতায় কার্যভার গ্রহণ করতে সে বছরের প্রথম দিন তিনি এসে পৌঁছালেন বোম্বাই বন্দরে, সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা যাবেন। এ খবর টাটার কাছে পৌঁছাতে তড়িঘড়ি তার আগের দিনই এক কমিটি তৈরি করে ভাইসরয়ের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করা হল বম্বেতেই। জামশেদজি টাটার নেতৃত্বে সাত সদস্যের সেই কমিটিতে ছিলেন সহকারী বুর্জরজি পাদশা ছাড়াও মহাদেব গোবিন্দ রাণাডে এবং টাইমস অভ ইন্ডিয়া পত্রিকার সম্পাদক টি.জে. বেনেট (Thomas Jewell Bennett), যাঁর নামে টাইমস গ্রুপের নাম পরে হয় বেনেট, কোলম্যান অ্যান্ড কোম্পানি (Bennett, Coleman & Company Ltd. / BCCL)।

লর্ড কার্জন তাঁদের বিশেষ আশার কথা শোনালেন না। একেবারে হতাশও হয়ত করেননি। বছর দুয়েক পরে ১৯০১ সালে দেশে বিজ্ঞান-গবেষণা ও প্রযুক্তিকেন্দ্র স্থাপন বিষয়ে তাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,

“To start with polytechnics and so on is like presenting a naked man with a top hat when what he wants is a pair of trousers.”
তবে জামশেদজি টাটা এবং বুর্জরজি পাদশাও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। তাঁরা এর মধ্যেই বেশ কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছেন। সেই কাজের দুটো প্রধান অংশ হল, এই বিজ্ঞানকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার মত যোগ্য ব্যক্তি এবং কোথায় স্থাপন করা যায় সেই স্থান নির্বাচন করা। এই দুটো কাজ শুনতে তেমন কঠিন না হলেও উনিশ শতকের শেষপ্রান্তের ব্রিটিশ ভারতে এ সহজ কাজ ছিল না। টাটার আগেই মহেন্দ্রলাল এক বিজ্ঞানকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন, যদিও সেখানে কাজকর্ম সীমাবদ্ধ ছিল শুধুমাত্র প্রবন্ধপাঠ ও ভাষণে। মহেন্দ্রলাল আগাগোড়া দেশীয় ব্যক্তিদের সাহায্য নিয়ে দেশীয় ব্যক্তিদের পরিচালনায় একে চালাতে চেয়েছিলেন, ফলে এর আর্থিক সঙ্গতি ছিল না একেবারেই। যত টাকা চাঁদা উঠেছিল, তার সবই চলে গিয়েছিল ভবন নির্মাণে ও কিছু সামান্য যন্ত্রপাতি কিনতে। একজনও অধ্যাপক নিয়োগের আর্থিক সংস্থান ছিল না, তাই নামে গবেষণাগার হলেও পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্তমূলক গবেষণা তখনও শুরু হয়নি সেখানে। সে সব শুরু হবে চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরামনের যোগদানের পর, ১৯০৭ সালে, আলোচ্য ঘটনাক্রমের বেশ কিছুটা পরে। টাটা সেটা বুঝেছিলেন বলেই প্রথম থেকে ঠিক করেছিলেন, সরকারি সমর্থন ছাড়া একে উদ্দিষ্ট পথে চালনা করা অসম্ভব। সে জন্যেই তিনি পাদশাকে লাগিয়ে দিয়েছিলেন যেন-তেন-প্রকারেণ সরকারকে রাজি করাতে।

প্রস্তুতিপর্ব – ডিরেক্টর নির্বাচন     

এই সব ব্যাপার যখন ঘটছে, সে সময় গোটা তিনেক মহৎ ব্যাপার – ইংরাজিতে বলতে গেলে আক্ষরিকভাবেই নোবল ইনসিডেন্টস – ঘটে গেছে, যাদের নোবেল ইনসিডেন্টস-ও বলা যেতে পারে। এক, ১৮৯৬ সালের ১০ই ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেল (Alfred Bernhard Nobel) মারা গেছেন, মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর বিশাল সম্পত্তির সিংহভাগ দান করে গেছেন এক ট্রাস্টকে, যার সুদ থেকে পাঁচটি বিষয়ে পৃথিবীর সেরা ব্যক্তিদের পুরস্কার দেওয়া হবে। দুই, মার্গারেট নোবল (Margaret Elizabeth Noble) নামে এক আইরিশ যুবতী স্বামী বিবেকানন্দের ভাষণ শুনে তাঁর এমনই ভক্ত হয়ে গেছে যে সে ১৮৯৮ সালের ২৮শে জানুয়ারি দেশ ছেড়ে চলে এসেছে কলকাতায়, স্বামীজি তার নাম দিয়েছেন ভগিনী নিবেদিতা। তিন, ১৮৯৫ সালে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে লর্ড র‍্যালে (John William Strutt, 3rd Baron Rayleigh) ও তাঁর সহযোগী উইলিয়াম র‍্যামজে (William Ramsay) বাতাস থেকে আলাদা করা নাইট্রোজেন আর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি নাইট্রোজেনের ঘনত্বে পার্থক্য লক্ষ্য করে বাতাসে এক নতুন গ্যাসের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছেন, তার নাম দেওয়া হয়েছে আর্গন (ল্যাটিন আর্গস মানে অলস থেকে), রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয়তার জন্যে যাকে বলা হচ্ছে নোবল গ্যাস। এর আগে র‍্যামজে নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড নিয়ে কাজ করছিলেন। পরবর্তী তিন বছরে র‍্যামজে ছাত্র মরিস ট্যাভার্সকে (Morris William Travers) নিয়ে আরও তিনখানা এ রকম নতুন নোবল গ্যাস আবিষ্কার করবেন – ক্রিপ্টন (ক্রিপ্টস মানে লুক্কায়িত), নিয়ন (নিয়স মানে নতুন) এবং জেনন (জেনস মানে অজানা আগন্তুক), এবং নরওয়ে থেকে সংগৃহীত ইউরেনিয়ামের এক অশুদ্ধ আকরিক গরম করে তার মধ্যে চাপা-পড়া গ্যাসে আগেই-জানা হিলিয়াম (হেলিয়োস মানে সূর্য, সূর্যের বর্ণালীতে হিলিয়ামের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছিল আগেই, ১৮৬৮ সালে)। মেন্ডেলিফের (Dmitri Ivanovich Mendeleev) পিরিয়ডিক টেবলে এসব ছিল না, ১৯০২ সালে তিনি এগুলোকে ঢুকিয়ে নিলেন নতুন একটা কলাম তৈরি করে, যার নাম দিলেন জিরো গ্রুপ। একের পর এক নতুন মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করে র‍্যামজে তখন লন্ডনে রসায়নের জগতে এক উদীয়মান নক্ষত্র। বস্তুত ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার চালু হওয়ার পর তিনিই প্রথম ব্রিটিশ রসায়নবিদ হিসাবে এই পুরস্কার পাবেন ১৯০৪ সালে (লর্ড র‍্যালেও পাবেন একই বছরে, পদার্থবিদ্যায়), তার আগের দু-বছরও তাঁকে এই পুরস্কারের জন্যে মনোনীত করেছিলেন প্রাক্তন বা ভবিষ্যৎ নোবেলজয়ীরা।    

খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখা যাক, জগদীশচন্দ্র বসু কেম্ব্রিজ থেকে ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি-বটানিতে ট্রাইপোস (Tripos) করে ১৮৮৩ সালে পদার্থবিদ্যায় ব্যাচেলর্স ডিগ্রি পাশ করেন, সেখানে তাঁর অধ্যাপক ছিলেন লর্ড র‍্যালে। দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করে ১৮৯৫ সালে কলকাতার টাউন হলে জনসমক্ষে তিনি তাঁর বিখ্যাত বেতার তরঙ্গপ্রেরণ সংক্রান্ত পরীক্ষাটি দেখান এবং দু-বছর পরে, একই পরীক্ষা সেখানকার বিজ্ঞানীদের দেখানোর জন্যে, তাঁর যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির হন লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে যেখানে দর্শকের মধ্যে ছিলেন লর্ড র‍্যালে। প্রথম দিকে তিনি ‘দ্য ইলেকট্রিশিয়ান’ নামে এক জার্নালে তাঁর গবেষণার ফল প্রকাশ করছিলেন, ইংল্যান্ডে লর্ড র‍্যালে নিজে উদ্যোগ নিয়ে বসুর গবেষণা প্রকাশ করান ‘প্রসিডিংস অভ রয়্যাল সোসাইটি’তে।

একই সঙ্গে এই অপ্রাসঙ্গিক তথ্যটাও বলে রাখা যাক, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ও এই সময় দেশে ফিরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেছেন, যদিও তিনি বিশ্বাস করেন, বাণিজ্যেই লক্ষ্মীলাভ। ১৮৯২ সালে তিনি নিজ-উদ্যোগে স্থাপন করেছেন বেঙ্গল কেমিক্যালস। ১৮৯৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীনহীন গবেষণাগারে তৈরি করেছেন মারকিউরাস নাইট্রাইট নামে এক নতুন যৌগ, প্রকাশ করেছেন এশিয়াটিক সোসাইটি অভ বেঙ্গল পত্রিকায়, যা লক্ষ্য করে বিস্ময় প্রকাশ করেছে ব্রিটেনের নেচার পত্রিকা। অচিরেই তিনি পরিচিত হবেন মাস্টার অভ নাইট্রাইটস নামে।  

এত কিছু লেখার উদ্দেশ্য এই যে, ইংল্যান্ডে তখন লর্ড র‍্যালে ও উইলিয়াম র‍্যামজের প্রবল সুনাম। ১৯০০ সালে র‍্যালের বয়স ৫৮ বছর, র‍্যামজের ৪৮। পাদশা ও টাটা ব্যবসার খাতিরে লন্ডনে যান অহরহ। আদর্শ গবেষণাগার চালানোর দায়িত্ব দেওয়া উচিত আদর্শ বিজ্ঞানীকে। টাটার স্বপ্ন পূরণ করতে পাদশা যে গবেষণাগারের পরিকল্পনা করছিলেন, তার প্রথম ডিরেক্টর হিসাবে তিনি র‍্যামজেকেই নির্বাচন করে তাঁর সঙ্গে পত্রালাপ শুরু করলেন।

পাদশার এই পত্রালাপ তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় প্রকল্প চালানো সম্ভব নয়, তা তিনি জানতেন। কাজ শুরু করে দেখলেন, গভর্নর জেনারেল আদৌ উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। তিনি তখন ফন্দি আঁটলেন এমন এক পদ্ধতির, যেখানে এর মধ্যে থাকবেন একাধিক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তাঁরা যাই বলুন না কেন তিনি একজনের আশাবাদী কথা অন্যজনকে শুনিয়ে তাঁর মন গলানোর চেষ্টা করবেন। র‍্যামজের সঙ্গে কথা শুরু হতেই তিনি কার্জনকে বলবেন, ‘দেখুন, আপনাদের দেশের এক নম্বর বিজ্ঞানী এই প্রকল্পের ব্যাপারে কত আশাবাদী, তিনি সর্বান্তঃকরণে একে সমর্থন করছেন।’ র‍্যামজেকে বলবেন, ‘দেখুন, আপনাদের শাসক আমাদের সমর্থন দিচ্ছেন, কাজেই আপনার তো এই দায়িত্ব নেওয়াই উচিত।’ এবং দুজনকেই বলবেন, ‘এর আর্থিক খরচের সিংহভাগ বহনের লোক পাওয়া গেছে, কাজেই আপনারা একে সমর্থন করুন।’

কিন্তু অন্যেরা না বুঝলেও ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন ভারত সরকারের হোম ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি এ.এইচ.এল. ফ্রেজার (Andrew Henderson Leith Fraser)। তাঁর কাছ থেকে এক কড়া চিঠি গেল পাদশার কাছে ২১শে মার্চ, ১৮৯৯ সালে।

…In these circumstances the Viceroy desires that you will desist from quoting his name or views in a context in which you have no authority to use them and where their unauthorized use can have no other consequence than to prejudice the future chances of the Scheme.

পাদশা দমলেন না। সেক্রেটারির মত ফালতু লোকজনকে পাত্তা দিতে গেলে তাঁর প্রকল্প অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে। যে খসড়া প্রস্তাব তাঁরা লর্ড কার্জনকে দেখিয়েছিলেন বছরের প্রথম দিন, কার্জন যা দেখে বিশেষ উৎসাহ দেখাননি, তাতে এই প্রতিষ্ঠানের ফ্যাকাল্টি নির্বাচনের ব্যাপারে ১৮৯৯ সালের জুনে এই সংশোধিত প্রস্তাবে তিনি যোগ করলেনঃ

After all the success of a University must depend upon success in securing great teachers. Offers of attractive emoluments and prospects will count for a great deal; but even more will depend upon the machinery employed for selection. It is no disparagement to either official or non-official parties in India to affirm that they are not competent to make appointments.
It is the deliberate advice of Lord Reay and wish of Mr Tata that, as far as possible, distinguished foreigners and Indians who can speak decent English and have other qualifications should be encouraged to accept chairs in the University. As Germans of merit, and many quiet Englishmen, who would be glad to comply if called, would not care to apply in response to advertisements, I’ve taken it upon myself to add the provision that the Senate me send a fourth delegate of its own… to serve of any of these committees. If I were the first such delegate my chief work would be to collect privately a number of such quiet but eminent names.

সে বছরই ১৮ই ডিসেম্বরে র‍্যামজেকে তিনি যে খসড়াটা পাঠালেন বম্বের এসপ্লানেড হাউস থেকে, তার মুখবন্ধে পাদশা লিখলেনঃ

The Scheme unfolded in these pages did not assume its present shape without advice and information ungrudgingly put at my disposal by numerous friends in Europe and India. I have thought it due to these friends to convey to them an assurance that the time and labour they lavished for the encouragement of the Scheme have borne some fruit; and with that object I submit to them this compilation of papers, including the resolution of the Government of India cordially accepting the Scheme. The Indian University of Research has now been launched on its career.

তখনও প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিক হয়নি। ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি অভ রিসার্চ নাম নিয়ে তিনি যে প্রতিষ্ঠানের ‘কেরিয়ার লঞ্চ’ হওয়ার গল্প লিখে র‍্যামজেকে পাঠালেন, তা আদৌ লর্ড কার্জনের অনুমোদন পায়নি। র‍্যামজের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রে পাদশা তাঁকে এমনভাবে চিঠি লেখেন, যেন র‍্যামজেকে কাজটা নিতে অনুরোধ করছেন স্বয়ং কার্জন। র‍্যামজে বুঝতেই পারেননি যে তিনি কার্জনের অনুরোধে ব্রিটিশ সরকারের কাজ করছেন না, কাজ করছেন টাটাদের হয়ে পাদশার জন্যে।

ফলে তিনি পরিকল্পনা রূপায়ণে অনেক বেশি সিরিয়াস। অবশ্য শেষে তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছিলেন এবং পরে নিজে এর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে অনুমোদন করেছিলেন সহকর্মী মরিস ট্র্যাভার্সকে যেন এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।  

প্রস্তুতিপর্ব – স্থান নির্বাচন ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অবদান    

স্থান নির্বাচনের মূল প্রসঙ্গে আসার আগে এই অবসরে বুর্জরজি পাদশা সম্বন্ধে সামান্য দু-কথা বলে নেওয়া দরকার। বুর্জরজি পাদশা বয়সে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঠিক তিন বছরের ছোট, একই দিনে (৭ই মে) তাঁদের জন্ম। তাঁর বাবা জামাস্পজি পাদশা শুধু জামশেদজি টাটার ঘনিষ্টতম বন্ধুদের একজনই ছিলেন না, জামশেদজির কন্যা ধুনবাঈয়ের সঙ্গে বুর্জরজির বিয়ের কথাও পাকা হয়ে ছিল তাদের বাল্যবয়সেই। দুর্ভাগ্যক্রমে মাত্র দশ বছর বয়সে ধুনবাঈয়ের মৃত্যু হয়। বুর্জরজি পরে বাবাকেও হারান। ফলে জামশেদজির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অনেকাংশেই পিতা-পুত্রের মতই।
বম্বের এলফিনস্টোন কলেজ থেকে দর্শনে ডিগ্রি করে বুর্জরজি ইংল্যান্ডে যান। কেমব্রিজেও পড়াশুনা করেছিলেন। দেশে ফিরে ১৮৮৭ সালে করাচির সিন্ধ আর্টস কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। সেখানে জামশেদজির কনিষ্ঠ পুত্র রতনজি তখন পাদশার সঙ্গে থাকতেন এবং তিনি ঐ কলেজের ছাত্র ছিলেন। পাদশা সেই কলেজে পড়াতেন দর্শন, ইতিহাস, ইংরাজি, গণিত। অধ্যাপক থেকে অচিরেই তিনি ভাইস-প্রিন্সিপ্যালে উন্নীত হন। প্রিন্সিপ্যাল হওয়ার কথা ছিল তাঁরই, কিন্তু অন্যায়ভাবে তাঁকে অগ্রাহ্য করে সেই পদ দেওয়া হয় একজন ইংরেজকে। ফলে পাদশা সেখান থেকে পদত্যাগ করেন।
১৮৯৪ সালে বুর্জরজি বম্বে গেলে জামশেদজির আহ্বানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। টাটার মনে তখন তিন স্বপ্ন – ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ও বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র। এ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্যে তিনি পাদশাকে পাঠালেন ইওরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে, পাদশা যেন এ ব্যাপারে এক সুচারু রিপোর্ট তৈরি করে তাঁকে পেশ করেন, এই চুক্তিতে। ১৮৯৮ সালে পাদশা ফিরে আসেন। সে বছরই টাটা বিজ্ঞানকেন্দ্র বিষয়ে স্বামীজিকে চিঠি লেখেন ও তেইশজন সদস্যের এক অস্থায়ী কমিটি বানিয়ে পাদশাকে তার নেতৃত্ব দিতে আহ্বান জানান। এই কমিটিতে তিনি নিজেও ছিলেন। কমিটির প্রথম কাজ হয় স্থান নির্বাচন।
টাটার নিজের শহর বম্বে, স্বাভাবিকভাবেই তিনি ভেবেছিলেন সেখানেই গড়ে উঠবে এই প্রতিষ্ঠান। তিনি এবং পাদশা দুজনেই এলফিনস্টোন কলেজের ছাত্র, তাই ভেবেছিলেন সেটাকেই বানিয়ে ফেলবেন বিজ্ঞানের গবেষণাকেন্দ্র হিসাবে। এমনকি বম্বে বিশ্ববিদ্যালয়কেও করা যেতে পারে। কিন্তু অল্পদিনেই বুঝে গেলেন, ব্যক্তিগত অবস্থান দিয়ে এর বিচার করা উচিত হবে না। কমিটি তাদের বিবেচনা অনুযায়ী ৭৬ জনকে এই বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করল। যদিও অধিকাংশই বম্বের সপক্ষেই মত দিলেন, এর সঙ্গে উঠে এল আরও কতগুলো নাম – কলকাতা, পুনে, কুনুর, নৈনিতাল, এলাহাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, রুরকি এবং আরও দু-একটা ছোট শহর। তারা সাময়িকভাবে এর নাম দিলেন – দ্য ইম্পিরিয়াল ইউনিভার্সিটি অভ ইন্ডিয়া। এই অনুযায়ী তাঁদের খসড়া প্রস্তাব তৈরি হয়, যা তাঁরা দেখিয়েছিলেন লর্ড কার্জনকে।
১৮৯৯ সালের প্রথম দিকে জামশেদজি দক্ষিণ ভারত সফরে যান। সেই সফরের শেষ জায়গাটা ছিল ব্যাঙ্গালোর। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় মহীশূর রাজ্যের দেওয়ান শেষাদ্রি আইয়ারের সঙ্গে। শেষাদ্রি আইয়ার টাটার বন্ধু, টাটাদের কাপড়ের ব্যবসার জন্যে তিনি মহীশূরের উপকণ্ঠে এক রেশমের খামার গড়তে সাহায্য করেছিলেন আগে। তাঁদের এই সাক্ষাৎ গবেষণাকেন্দ্রের স্থান নির্বাচনের পুরো পরিকল্পনাটাই বদলে দেয়।
সে কথা বলার আগে মহীশূর রাজ্যের ও বিশেষ করে ব্যাঙ্গালোরের তৎকালীন অবস্থা সম্বন্ধেও দু-এক কথা বলা দরকার। চার-চারখানা ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের পর অষ্টাদশ শতকের একেবারে শেষপ্রান্তে ইংরেজরা মহীশূর দখল করে। কিছু অঞ্চল হায়দ্রাবাদের নিজামের শাসনাধীনে আসে, কিছু ইংরেজরা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত করে। অতীতের বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অস্তমিত সূর্যের দীপ্তি টিমটিম করে টিঁকিয়ে রেখেছিল ওয়াড়িয়ররা। ইংরেজদের কর প্রদানের বিনিময়ে তা পরিণত হয় করদ রাজ্যে। ১৮৩১ সালে সেই অধিকারও কেড়ে নেয় ইংরেজরা, পঞ্চাশ বছর পর আবার তা প্রত্যর্পণ করে। ১৮৮১ সালে মহীশূরের রাজা চামরাজেন্দ্র ওয়াড়িয়র। বছর তিনেক আগে তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বাণীবিলাস সন্নিধানের, ১৮৮৪ সালে তাঁর গর্ভে জন্ম হয় রাজপুত্র চতুর্থ কৃষ্ণরাজা ওয়াড়িয়রের। দক্ষিণী ভাষায় চার হচ্ছে নাল বা নালকু, তাই চতুর্থ কৃষ্ণরাজাকে বলা হতে থাকে নালওয়াড়ি কৃষ্ণরাজা। ১৮৯৪ সালে রাজা চামরাজেন্দ্র গেছিলেন কলকাতায়। সেখানেই ডিপথেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ তাঁর মৃত্যু হলে মহীশূর রাজ্যে অন্ধকার নেমে আসে।

শেষাদ্রি আইয়ার অতি করিৎকর্মা ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা স্টেটসম্যান – তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে একাধিক প্রকল্প গড়ে উঠেছিল মহীশূর রাজ্যে। ১৮৮৯ সালে ব্যাঙ্গালোরের লালবাগে তিনি নির্মাণ করেন গ্লাসহাউস। ১৮৯১ সালে চালু করেছিলেন মহীশূর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা যা দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রথম। ১৮৯৪ সালে মহীশূরে ভূতত্ত্ব ও ১৮৯৮ সালে কৃষিবিদ্যাবিষয়ক দপ্তর স্থাপন করেন খনিজ ও কৃষির উন্নতির স্বার্থে। কোলার স্বর্ণখনির সঙ্গে রেলপথে যুক্ত হয় মহীশূর তাঁর উদ্যোগেই। পৃথিবীতে যখন খনিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের নজির নামমাত্র, তখন সেই স্বর্ণখনিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যে তিনি শিবসমুদ্রম জলপ্রপাত থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবছেন। দেড় বছরও হয়নি দেশের প্রথম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে দার্জিলিঙের কাছে সিদ্রাপং-এ!
কিন্তু জামশেদজি টাটার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় তাঁর সমস্যা ভিন্ন। গত বছরে এক বিধ্বংসী প্লেগ রোগে ব্যাঙ্গালোরের জনবসতি ছারখার হয়ে গেছে। শহরের পুরনো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলেই এই রোগের প্রকোপ সর্বাধিক। যারা বেঁচে গেছে, তারা খোলা মাঠে ক্যাম্প খাটিয়ে বাস করছে, অপেক্ষা করে আছে কখন এই মহামারীর হাত থেকে নিস্তার পাবে। আইয়ার তখন ব্যস্ত ব্যাঙ্গালোরের বাসবনগুড়ি ও মালেশ্বরম নামে দুটো স্থানে বাসস্থান নির্মাণ করে এই ছিন্নমূল জনতাকে পুনর্বাসন দেওয়ার কাজে। বছর চারেক আগে ১৮ কিলোমিটার দূরের হেসারঘাট্টা সরোবর থেকে জল টেনে শহরে আনার ব্যবস্থা করেছেন। এখন শহর পরিচ্ছন্ন ও বাসোপযোগী করে, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা বিস্তৃত করে এদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। বছরখানেক পরেই রোগের অত্যাধুনিক চিকিৎসার জন্যে তিনি ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল নির্মাণ করবেন।
টাটার পরিকল্পনার কথা শুনে শেষাদ্রি আইয়ার প্রথমেই বললেন,

জামশেদজি, আপনি জানেন জনসাধারণের জীবনযাত্রার উন্নতিতে দেশের যে কোনো বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসংক্রান্ত কাজে মহীশূর রাজ্য যথাসাধ্য সমর্থন করবে। ব্যাঙ্গালোরের সেন্ট্রাল কলেজের (১৮৫৮ সালে নির্মিত) অধ্যক্ষ জন কুককে আমি বছর চারেক আগে লিখেছি, কলেজটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করুন, যা খরচ হবে আমি দেওয়ার ব্যবস্থা করব। কিন্তু ওরা এখনও কোনো উত্তর দেয়নি। আমি আপনাকে প্রস্তাব দিচ্ছি, আপনার গবেষণাকেন্দ্রটা আপনি ব্যাঙ্গালোরে স্থাপন করুন। আমি এর জন্যে ৩০০ একর জমি দেব মহীশূরের রাজার তরফে, এর খরচ-খরচা চালানোর এক অংশও আমি বহন করতে রাজি।

এ তো মেঘ না চাইতেই জল!
সে বছর অক্টোবরে আবার আলোচনা উঠল সিমলায় অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে। ততদিনে খসড়া বদলে ব্যাঙ্গালোর ঢুকে গেছে গবেষণাকেন্দ্রের সম্ভাব্য জায়গা হিসাবে। জামশেদজি, বুর্জরজি, লর্ড কার্জন সবাই আছেন এই আলোচনায়। মহীশূর রাজ্য থেকে এতখানি আর্থিক সমর্থনের প্রস্তাব পেয়ে কার্জন যতটা প্রথমে ছিলেন, আর ততটা বিরোধী নন। তবে ইম্পিরিয়াল ইউনিভার্সিটি অভ ইন্ডিয়া নামটা সরকারের পছন্দ না, তাঁর প্রস্তাব – ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি অভ রিসার্চ। জায়গার জন্যে বম্বে-ব্যাঙ্গালোরের মধ্যে টানাপোড়েন অবশ্য চালু রইল। মহীশূর রাজ্যের প্রস্তাব সত্ত্বেও বম্বের সপক্ষে কথা বলার লোকের অভাব নেই টাটার কমিটিতে। জনসাধারণের অভিমত বম্বের অনুকূলে। টাইমস অভ ইন্ডিয়া, বম্বে গেজেট, ইন্দু প্রকাশ, ইন্ডিয়ান স্পেকটেটর আদি খবরের কাগজগুলো সব বম্বের জন্যেই সুপারিশ করছে।
কিন্তু দুটো জিনিস বম্বের প্রতিকূলে। এক হচ্ছে এর উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, যে পরিবেশে বইপত্তর ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বেশিদিন না টেঁকার কথা। দ্বিতীয়ত এত বড় একটা গবেষণাগার তৈরির কথা চলছে, ঘনবসতির দ্বীপপুঞ্জ বম্বেতে অতটা ফাঁকা জায়গা কই? অপরপক্ষে ব্যাঙ্গালোরের জলবায়ু দেশের সবচেয়ে ভালো আবহাওয়ার শহর উটকামন্ড বা উটির পরেই। কাজেই ব্যাঙ্গালোরকে উপেক্ষা করা ঠিক না। সরকার নির্দেশ দিল একটা কমিটি তৈরির, যারা একজন প্রখ্যাত ইওরোপীয় বিজ্ঞানীকে এ ব্যাপারে নিয়োগ করে তাঁর মতামত চাইবে, সেই অনুযায়ী কাজ হবে। সুযোগ পেয়েই পাদশা র‍্যামজের নাম উল্লেখ করলেন। এতদিন র‍্যামজে ছিলেন টাটাদের নির্দেশক, এর ফলে তিনি উন্নীত হয়ে গেলেন সরকারি কনসালটেন্টে।
১৯০০ সালের জুলাই মাসে র‍্যামজে ভারতে এলেন। তাঁর দীর্ঘ সফরের পুরো খরচ বহন করল জামশেদজির টাটা গ্রুপ। সর্বশেষ খসড়াটা খুব ভালো করে পড়ে একমাত্র নাসিক বাদে খসড়ায় নির্দেশিত সমস্ত জায়গা ঘুরে দেখলেন তিনি। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর রিপোর্ট পেশ করলেন। ইউনিভার্সিটি শব্দটা গবেষণাগারের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না বলে তিনি সেটা বদলে নির্দেশ দিলেন এর নাম ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ রিসার্চ’ রাখতে। লর্ড কার্জন যে সমস্ত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার অনেকগুলোর সম্ভাব্য উত্তর দিয়ে তিনি এই গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে রায় দিলেন। জায়গার জন্যে তিনি পছন্দ করলেন ব্যাঙ্গালোরকে। বললেন বম্বে আর মাদ্রাজ থেকে ব্যাঙ্গালোর কাছে, এর কাছাকাছি আছে লোহা ও অন্যান্য আকরিক এবং সোনার খনি। শেষাদ্রি আইয়ারের শিবসুদ্রম জলপ্রপাত থেকে জলবিদ্যুৎ তৈরির পরিকল্পনায় চমৎকৃত হয়ে র‍্যামজে লিখলেন, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হতে চলেছে ব্যাঙ্গালোরের কাছে। এর জলবায়ু ইওরোপীয় বিজ্ঞানীদের পক্ষে বিশেষভাবে আকর্ষণের কারণ হবে, এর তাপমাত্রা ইংরেজদের পক্ষে গরম নয় আবার দেশীয়দের পক্ষে ঠান্ডাও নয়, সুতরাং বিদেশীদের নিয়োগ করতে বেগ পেতে হবে না। বম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজের মত শহুরে ‘ডিস্ট্র্যাকশন’ এখানে নেই, তাই গবেষণার পক্ষে অনুকূল। আর মহীশূরের দেওয়ানের জমি ও আর্থিক অনুদানের প্রতিশ্রুতি তো আছেই।

র‍্যামজের এই রিপোর্ট সরকার প্রকাশ করলে এর বিরোধিতায় সরব হল – আশ্চর্যভাবে – বম্বে নয়, বরং ব্রিটিশ ভারতের তখনকার রাজধানী কলকাতা। কলকাতার সুধীগণের বক্তব্য, কোন এক ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর যেখানে ইন্টেলেকচুয়াল কোনো সোসাইটি নেই, সেই ব্যাঙ্গালোরে এ রকম একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি একেবারেই অন্যায্য ও ভুল সিদ্ধান্ত। অবশ্য ততদিনে টাটাদের পরিকল্পনা একেবারে শেষের দিকে। তারা সরকারকে জানিয়ে দিল ব্যাঙ্গালোরেই তৈরি হবে এই গবেষণাগার। সরকার তা মেনেও নিল।

কিন্তু সমস্ত ভালো গল্পের শেষে থাকে এক চমৎকারি মোড়। ব্রিটিশ সরকার স্থান নির্বাচন মেনে নিলেও হিসেব করে দেখল, টাটাদের এই পরিকল্পনা রূপায়ণে সরকারের খরচাপাতি মন্দ না। জামশেদজি তাঁর প্রথম খসড়ায় কার্জনের কাছে সরকারি অনুদান হিসাবে চেয়েছিলেন বছরে পাঁচ হাজার পাউন্ড। কার্জন তার উত্তরে ১৯০১ সালে জানান,

“Tata entirely owes it to me that he gets anything; and if he is not wise enough to accept it, I am ready to drop the whole thing tomorrow.”

সে বছরই ৬ই নভেম্বর কার্জন লর্ড র‍্যালেকে এক চিঠিতে জানান, তিনি টাটার এই গবেষণাগার স্থাপনের প্রস্তাবে তেমন রাজি নন।

পরিকল্পনা থেকে যাতে সরকারের খরচ কমানো যায়, এই মর্মে সরকার দুজন সদস্যের এক কমিটি বানিয়ে তাদের নির্দেশ দিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এক রিপোর্ট পেশ করতে। এই দুজনের একজন হলেন টমসন কলেজ অভ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিঙের (Thomason College of Civil Engineering, যার বর্তমান নাম আই.আই.টি. রুরকি) প্রিন্সিপ্যাল জন ক্লিবর্ন (John Clibborn), অন্যজন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডেভিড ম্যাসন (David Orme Masson)। এঁরা দুজনে পাদশার খসড়া, র‍্যামজের রিপোর্ট এবং প্রস্তাবিত জায়গাগুলোর গুরুত্ব বুঝে তাঁদের রিপোর্ট পেশ করলেন ১৯০১ সালের ৫ই ডিসেম্বর। ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ রিসার্চ নামটা তাঁদের কাছে ‘প্রিটেনশাস’ মনে হওয়ায় তাঁরা প্রস্তাব করলেন ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্স’। ছোটখাট দু-একটা সামান্য পরিবর্তন ছাড়া বাকি যে জিনিসটা নজর কাড়ল, তা হচ্ছে অকস্মাৎ ব্যাঙ্গালোরের পরিবর্তে তাঁরা প্রস্তাব করলেন এর পক্ষে উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে – রুরকি! জলবায়ু, স্বাস্থ্য, অবস্থান বিষয়ে তাঁদের রিপোর্টের দুই জায়গার তুলনামূলক অংশটা বেশ চিত্তাকর্ষক –

সেই রিপোর্ট প্রকাশিত হতে তাকে স্বাগত জানাল সমগ্র উত্তর ভারত ও বেঙ্গল চেম্বার অভ কমার্স। পাদশা জানতেন এ রকম কিছু হতে পারে। তিনি তাঁর সমস্ত সহযোগীদের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রেখে চলছিলেন, আলোচনা চালাচ্ছিলেন কী হলে কী করা যায় এই নিয়ে। ম্যাসন-ক্লিবর্নের রিপোর্ট পেশ করার আগেই তাঁর হাতে এসে গেল শেষাদ্রি আইয়ারের পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত প্রস্তাব – মহীশূরের রাজা নালওয়াড়ি কৃষ্ণরাজা টাটাদের প্রস্তাবিত গবেষণাগারের জন্য ৩০০ একর নয়, ৩৭১ একর ১১ গুন্টা জমি দান করবে, তার সঙ্গে দেবে ভবন নির্মাণের জন্য এককালীন ৫ লক্ষ টাকা এবং বছর বছর ৫০ হাজার টাকা।
দুই সম্ভাব্য জায়গার তুলনা নিয়ে এই রিপোর্ট পড়ে এমনকি কার্জনও অবাক হয়ে গেলেন। তিনি এই প্রকল্প নিয়ে সংশয়ে আছেন, তার জন্যে তিনি যে-কোনো অজুহাত দেখাতে পারেন সে ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞানীরাও এ রকম একচোখোমি করবে! এ পড়েই বোঝা যায়, জন ক্লিবর্ন তাঁর কোলে ঝোল টানার চেষ্টায় আছেন। ম্যাসন-ক্লিবর্নের রিপোর্টের প্রত্যুত্তরে ১৯০২ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি তিনি লিখলেন,

“I agree with all the conclusions arrived at. The squabble over the climatic conditions of Bangalore and Rurki [sic] is an interesting illustration of the combined one-sidedness and irascibility of men of science.”

র‍্যামজে-কার্জন-পাদশা

পাদশা অবশ্য লড়ে যাচ্ছেন। এতদিনে র‍্যামজে তাঁকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন তিনি এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। তাঁর পরিবর্তে ম্যাসনকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। অবশ্য পাদশা চাইলে তিনি তাঁর সহযোগী মরিস ট্র্যাভার্সকে অনুরোধ করতে পারেন। র‍্যামজে জানিয়েছেন, ম্যাসন বা ট্র্যাভার্সকে বছরে ১৮০০ পাউন্ড দিয়ে ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে যাওয়া মুশকিল হবে, উপযুক্ত ফান্ড না পেলে তাঁদের হয়ত ভারতীয় কাউকেই নিয়োগ করতে হবে।
পাদশা হাল ছাড়ার পাত্রই নন। তিনি চান আধুনিক গবেষণাগার, বোতল-ধোওয়ার উপযুক্ত লোক দিয়ে যা অসম্ভব। লর্ড কার্জনের কার্যকলাপে তিনি ক্ষুণ্ণ হলেও আশাবাদী। পাদশা লর্ড কার্জনকে অনুরোধ করেছিলেন প্রতিষ্ঠানের শিলান্যাস করার জন্যে, কার্জন সম্মত হননি। ১৯০২ সালের ৮ই অগাস্ট পাদশা আবার র‍্যামজেকে লিখলেনঃ

…We will at once confess to a feeling of disappointment at your last letter which seems to show that we can no longer quote your advice as the most powerful reason for our views. That men like Masson or Travers cannot be attracted to Bangalore on 1800 pounds a year…  and that we should have to look to the men in India worn out by the departmental drudgery of years is perhaps the most unsatisfactory feature Mr. Tata is asked to accept.

A Research Institute staffed by men whose research is of the bottle-washer order is an absurdity.

…The conduct of the Viceroy in declining to lay the foundation stone and yet in visiting the site proposed to be allotted to the Institute makes his veiled hostility more marked than ever. But if we are beaten for the present, we are not dismayed. We cannot give up the idea. We still hold that no sum can be more advantageously expended for the benefit of India than in attempting to bring into existence a scientific milieu in the country.

 

র‍্যামজে যদিও এই পরিকল্পনা রূপায়ণের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন, তাঁর সঙ্গে পাদশার মতামত বিনিময় জারি রইল। শেষাদ্রি আইয়ারের অনুদান উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে গেল রুরকি-সহ অন্যান্য জায়গার। সমস্যা রইল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেওয়ার ডিরেক্টর ও অন্যান্য গবেষক নিয়োগের ব্যাপারে, গবেষণার জন্যে কোন কোন ডিপার্টমেন্ট স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে।

এর মধ্যে প্যাট্রিক গেডেস (Patrick Geddes) নামে একজন স্কটিশ বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ভারতে ঘুরে গেছেন। প্যাট্রিক বহু বিষয়ে জ্ঞানী এবং আচার্য জগদীশচন্দ্রের জীবনীকারও। ১৯০৩ সালের ২৮শে জানুয়ারি তিনি ভগিনী নিবেদিতার কাছ থেকে এক চিঠি পান, যার একটা লাইন বেশ চিত্তাকর্ষক: “The last time I saw Mr. Tata’s secretary, he was quarrelling with Ramsay in order to have yourself named as Principal of the Institute.” অর্থাৎ, পাদশা এঁকেও এই প্রস্তাবিত গবেষণাগারের ডিরেক্টর হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন।

যে কোনো কারণেই হোক, পাদশাকে পছন্দ করতেন না কার্জন। পাদশা সমস্ত ব্যাপারেই কার্জনের চেয়ে জ্ঞানী ও গুণী, তদুপরি তাঁর লেগে থাকার ক্ষমতা অপরিসীম। কিন্তু তাতেই বিরক্ত হয়ে কার্জন চাইছিলেন পাদশা যেন এই প্রকল্প থেকে দূরে থাকে, এঁকে সহ্য করা তাঁর পক্ষে দিন দিন মুশকিল হয়ে উঠছিল। তিনি র‍্যামজেকে চিঠি লিখলেন এই ইনস্টিট্যুটের ব্যাপারে তাঁর ফাইনাল প্রোপোজাল জানতে চেয়ে। র‍্যামজে যেন তাঁকে জানান ভারতে আদৌ বিজ্ঞান গবেষণা সম্ভব কিনা, হলে কোন বিষয়ে, প্রতিষ্ঠানের ফ্যাকাল্টি হিসাবে কাদের নির্বাচন করা যায়, ইত্যাদি। তাঁর চিঠিতে তিনি পাদশার ব্যাপারে তাঁর বিরক্তির কথাও গোপন করলেন না।

১৯০৩ সালের ১১ই জুন র‍্যামজে এক দীর্ঘ চিঠি লিখলেন কার্জনকে। একটা দেশে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা কেমনভাবে শুরু হওয়া উচিত, তা জানাতে তিনি আমেরিকার উদাহরণ দিয়ে লিখলেন:

In America, science such as it is, has been devoted until lately, entirely to the development of a new country; now they are progressing and producing scientific work of value; and India is a new country so far as Industry is concerned and science must first be applied to industry there; it is only later that it can be cultivated for its own sake.

অর্থাৎ তাঁর মতে বিজ্ঞানচর্চা শুরু হওয়া উচিত শিল্পের প্রসারে। এই শিল্প থেকে অর্থ উৎপাদিত হলে তবে তা কেবলমাত্র বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে ব্যয় করা সঙ্গত। বিজ্ঞান ও শিল্পের এই সংযোগে উৎসাহীরাই একমাত্র এই নতুন প্রতিষ্ঠানের ভার নিতে পারে। সুতরাং ফ্যাকাল্টি নির্বাচনে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই প্রসঙ্গে সেই চিঠিতে লিখলেন:  

It is to get men with technical training and to leave to them the entire management of the educational side of the Institute. If three or four first rate men are there, who have had technical experience, things may still develop on what I still venture to think the right lines. If not, you will have few more impractical dreamers like Bose whose papers are not accepted by the Royal Society.

এই বোস হচ্ছেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। এ কথা সত্যি নয় যে জগদীশচন্দ্র বসুর পেপার রয়্যাল সোসাইটিতে পাব্লিশ হত না বা তাঁর তখনকার বিজ্ঞানচর্চার কোনো প্রযুক্তিগত ব্যবহার ছিল না। প্রকৃতপক্ষে একাধিক কোম্পানি তাঁকে তাঁর বেতারতরঙ্গ রিসিভারে উৎসাহী ছিল। কিন্তু এ কথা ঠিক যে আচার্য বসু তাঁর বিজ্ঞানচর্চার বাণিজ্যিকরণে উৎসাহী ছিলেন না, যেটা র‍্যামজের মতে শুধু ভুল তাই নয়, বসু তাঁর মতে একজন ইমপ্র্যাক্টিক্যাল ড্রিমার! টাটার গবেষণাকেন্দ্রের পক্ষে অনুপযোগী।
কিন্তু র‍্যামজে অত্যন্ত খোলাখুলি কার্জনকে জানালেন, পাদশাকে চিনতে কার্জন ভুল করেছেন।

… as regards Padshah, you know this sort of men much better than I do; but in Padshah’s case, I venture to think that you’ve misjudged him. He’s quite sincere and absolutely unselfish. He takes no salary from Tata, gives all his services free. He is a man of high ideals and standards and is often most injudicious. I had to keep him at arm’s length while I was in India. I could give you some instances of his want of savoir faire, but it isn’t worthwhile; all the same, he is really good fellow.

মহেন্দ্রলাল সরকারের প্রতিক্রিয়া

আগেই বলেছি, ১৮৭৬ সালে বিজ্ঞান গবেষণার জন্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও মহেন্দ্রলাল সরকারের ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অভ সায়েন্সে’ গবেষণা শুরু করা যায়নি এই সময় অবধিও। কেবল মাত্র বিজ্ঞানের কোন বিষয়ের ওপর বক্তৃতাই ছিল এর একমাত্র কাজ। প্রথম দিকে বক্তৃতা দিতেন মহেন্দ্রলাল নিজে, ফাদার লাফোঁ (Fr. Eugène Lafont) ও তারাপ্রসন্ন রায়।

অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গতি ছিল না বক্তাদের বেতন দেওয়ার। নামমাত্র চাঁদার বিনিময়ে যে কেউ এসে এইসব বক্তৃতা শুনতে পারত। অন্যান্য কলেজের ছাত্ররাও এই বক্তৃতা শুনতে আসত। তাদের মধ্যে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রও ছিলেন।
১৮৮০ সালে কুমার কান্তিচন্দ্র সিং বাহাদুর বিজ্ঞানসভাকে একটা দূরবিন দান করেন, সেটা তৈরি করেছিল জার্মানির বিখ্যাত দূরবিন-নির্মাতা মেৎর্জ (Georg Merz & Sons)। দরকারি সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করেছিল ইংল্যান্ডের জন ব্রাউনিং (John Browning )। ঋতু পরিবর্তন দেখানোর যন্ত্রপাতি, সূর্য ঘড়ি, সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ, গ্রহ পরিক্রমা ইত্যাদি হাতে-কলমে দেখানোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল। পরের দিকে জগদীশচন্দ্র বসু, আশুতোষ মুখার্জি, মহেন্দ্রনাথ রায়, শ্যামাদাস মুখার্জি, রাজেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতিরা পদার্থবিদ্যায় বক্তৃতা করতেন। রসায়নের ক্লাস নিতেন কানাইলাল দে, তারাপ্রসন্ন রায়, রামচন্দ্র দত্ত, রজনীকান্ত সেন, চুনিলাল বসু প্রমুখ।
এসব সত্ত্বেও মহেন্দ্রলালের মনের গভীরে যে সুপ্ত বাসনা ছিল, যে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেদের গবেষণা দিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞানকে পরিপুষ্ট করবে, আবিষ্কার করবে নতুন তত্ত্ব, নতুন প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে, তা আর হয়ে উঠল না। অ্যাসোসিয়েশনের কাজ কেবলমাত্র বক্তৃতাতেই থেমে রইল তাঁর জীবদ্দশায়। এক এক বছর যেতে লাগল, আর তিনি ক্রমশ অধৈর্য হয়ে যেতে লাগলেন। যেখানে ভেবেছিলেন উদার হস্তে রাজা-রাজড়ারা চাঁদা দেবে, দু’একজন বাদে কেউ উপুড়-হস্তই হতে চায় না। এমনকি একজন অধ্যাপককেও মাইনে দিয়ে পাকাপাকি চাকরি করে দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছাতে পারল না অ্যাসোসিয়েশন।
বিদেশ থেকে খবর আসে ইংল্যান্ডের অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণালব্ধ ফল কাজে লাগিয়ে অমুক কোম্পানি বিশাল কারখানা খুলেছে, সেখানে চাকরি করছে কয়েক হাজার মানুষ। মহেন্দ্রলালের ক্ষোভ বেড়ে যায়। আরে এ তো আমাদের দেশেও সম্ভব ছিল, সম্ভব ছিল এই অ্যাসোসিয়েশনেই। কিন্তু হচ্ছে কই!
দীর্ঘ আঠাশ বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করে, লোকের দরজায় দরজায় টাকার জন্যে ঘুরে, বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞানের উপকারিতার ওপর বক্তৃতা করে, নিজের পেশায় অর্থ-উপার্জনে অবহেলা করে এবং নিজের উপার্জিত অর্থের সর্বস্ব পণ করে মহেন্দ্রলাল যে স্বপ্ন বুনেছিলেন, তা তাঁর অধরাই থেকে গেল। অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি হিসাবে তিনি প্রতি বছর বার্ষিক অধিবেশনে বক্তৃতা করতেন। জীবনের শেষদিকে তাঁর সেই বক্তৃতায় নেমে এলো করুণাঘন বিষাদ। বলেই ফেললেন, আমার এই কাজ শুরু করাই ভুল হয়েছিল। এর চেয়ে নিজের কাজটা মন দিয়ে করলে আমি আজ লাখপতি হতে পারতাম, হয়ত দেশকে সেভাবেই বেশি সেবা করতে পারতাম। অন্যান্য দেশে এরা কতদূর এগিয়ে গেল, আমরা কিছুই করতে পারলাম না।
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মত খবর এল, জামশেদজি টাটার নেতৃত্বে আর একটি গবেষণাগার স্থাপিত হতে চলেছে। টাটার নির্দেশে পাদশা মহেন্দ্রলালের সঙ্গে দেখা করলেন ও তাঁদের পরিকল্পনা জানালেন। টাটা তখনও ব্যাঙ্গালোর সফরে যাননি, শেষাদ্রি আইয়ারের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা তখনও হয়নি। প্রাথমিক খসড়া দেখে মহেন্দ্রলাল আরও অস্থির হয়ে পড়লেন। ১৮৯৯ সালের ২৭শে এপ্রিল অ্যাসোসিয়েশনের ২২তম বার্ষিক সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বললেনঃ

…But while Bengal has thus been neglected of its own Institute of scientific research, it has saluted with a chorus of high commendation the promised munificent donation of Mr. JN Tata of Bombay towards the establishment of a new one.

তাঁর এবং টাটার পরিকল্পনার উদ্দেশ্য যে একই কিন্তু প্রয়োগ ভিন্ন, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, তাঁর পরিকল্পনায় খরচা কম, নিজেদের সাধ্যের মধ্যে, কিন্তু টাটা চাইছেন বিদেশি অধ্যাপক নিয়োগ করতে, যা ব্যয়বহুল। গবেষণার বিষয় নির্বাচনেও দুই প্রকল্পের পার্থক্য আছে এবং তাঁর মতে তাঁর পরিকল্পিত বিষয়সমূহ অধিক যুক্তিসঙ্গত। টাটার পরিকল্পনার শুরুতেই যে ১৩ লক্ষ টাকা এবং তারপর মাসে মাসে ৩ লক্ষ টাকা খরচ, তা তুলতে হলে টাটার নিজের দান ছাড়াও আরও প্রচুর অর্থসাহায্য লাগবে। এ বিষয়ে তাঁর মত –

I have grave doubts about the matter, and must the scheme fall through from want of support? It need not, if it is made less ambitious and less utopian, if it is made to fit in with the exigencies and the circumstances of the country as the Bengal scheme purports to do.

দুই প্রকল্পের নীতিগত পার্থক্য ও আর্থিক ব্যবস্থার তুলনা করে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে টাটাদের প্রকল্পে দেশীয় রাজন্যবর্গ ও সরকার থেকে আর্থিক সহযোগিতা বিষয়ে তিনি তাঁর সন্দেহ প্রকাশ করলেও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর অসীম আনুগত্য থেকে তিনি বললেনঃ

For myself I can honestly say that no one hailed Mr Tata’s project with greater delight than myself. I gave the Honourary Secretary of the Provincial Committee, that excellent young man Mr. BJ Padshah, the warmest reception that I could possibly give. And I am prepared to do anything in my power to make it a success.

সভাস্থ সকলের উদ্দেশে তাঁর নিজের অ্যাসোসিয়েশনে আত্মনিয়োগ করার শেষ অনুরোধ জানিয়ে তিনি তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান চালানোর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে বললেন, আমার বয়স হয়েছে, আমার শরীরে আর শক্তি নেই। আমার যতটুকু সামর্থ্য আমি তার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা চালিয়েছি। “Now my weary lips I close / Leave me, leave me to repose.”

উপসংহার

১৯০২ সালের চৌঠা জুলাই বিবেকানন্দের মৃত্যু হল। মহেন্দ্রলাল সরকার মারা গেলেন ১৯০৪ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি। ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্সের অনুমোদন যখন প্রায় শেষ ধাপে, সেই সময় জামশেদজি টাটারও মৃত্যু হল ১৯ মে, ১৯০৪ সালে। টাটা গোষ্ঠীর হাল ধরলেন জামশেদজির জ্যেষ্ঠ পুত্র দোরাবজি। তিনি ও তাঁর ভাই রতনজি বাবা জামশেদজির স্বপ্নের প্রকল্প রূপায়ণে সচেষ্ট হলেন। অবশ্য এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে লেগে গেল আরও কিছু সময়।

১৯০৪ সালের ১০ই ডিসেম্বর উইলিয়ম র‍্যামজে নোবেল পুরস্কার পেলেন। পরের বছর ৩০শে জুলাই তিনি এক দীর্ঘ চিঠি লিখলেন দোরাবজিকে। মরিস ট্র্যাভার্স রাজি হয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হওয়ার। মরিস ইওরোপের বাইরে যেতে আদৌ উৎসাহী ছিলেন না, কিন্তু বছরে ১৮০০ পাউন্ডের মোটা মাইনের চাকরি এবং নিশ্চিত পেনশন তাঁর সিদ্ধান্ত বদলাতে সাহায্য করেছিল। সে বছরই ১৮ই নভেম্বর কার্জন দেশে ফিরে গেলেন বঙ্গভঙ্গ রূপায়ণ করে, তাঁর জায়গায় এলেন লর্ড মিন্টো। ১৯০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মরিস ট্র্যাভার্সের নাম ঘোষণা করা হল ডিরেক্টর হিসাবে। সে বছরই দোসরা নভেম্বর ফ্রান্সের মার্সেই বন্দর থেকে তিনি ভিক্টোরিয়া নামের জাহাজে চড়লেন ভারতে আসার জন্যে।  

১৯০৭ সালের ১৪ই মার্চ নালওয়াড়ি কৃষ্ণরাজার তরফে মহীশূরের মহারানি বাণীবিলাস শেষাদ্রি আইয়ারের প্রস্তাবিত জমি দান করলেন আনুষ্ঠানিকভাবে। জামশেদজি টাটা দান করে গেছিলেন তাঁর নিজস্ব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক, যার মধ্যে ছিল বম্বের ১৪টা বিল্ডিং ও চারখন্ড জমি।

১৯০৯ সালের ২৭শে মে ব্রিটিশ ভারত সরকারের সেক্রেটারি এইচ.এ. স্টুয়ার্টের (Harold Arthur Stuart) সাক্ষরিত চ্যারিটেবল এন্ডাওমেন্ট অ্যাক্টের এক ভেস্টিং অর্ডারের বলে ইন্ডিয়ান ইন্সটিট্যুট অভ সায়েন্স ভারতের দ্বিতীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল। এর প্রথম গভর্নিং বডিতে ডিরেক্টর ছাড়া ছিলেন পেট্রন হিসাবে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল (তখন লর্ড মিন্টো) এবং ভাইস-পেট্রন হিসাবে একগুচ্ছ গভর্নর ও লেফটেন্যান্ট গভর্নর। এঁরা হলেন মাদ্রাজ ও বম্বের গভর্নর, বাংলা ভেঙে দুভাগ হওয়ায় বাংলা এবং পুববাংলা-আসামের দুজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, ইউনাইটেড প্রভিন্স, পাঞ্জাব ও বার্মার তিনজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, সেন্ট্রাল প্রভিন্স, নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স, কুর্গ ও আজমের-মেবারের চারজন চিফ কমিশনার ছাড়াও বালুচিস্তানের গভর্নর জেনারেলের এজেন্টও!

১৯১১ সালে নালওয়াড়ি কৃষ্ণরাজা ইনস্টিট্যুটের উদ্বোধন করেন। জাতির উদ্দেশে সমর্পিত এই গবেষণাগারের জন্য প্রস্তাবিত জমি দান করার বিবেচনা নিয়ে তাঁর মা যে যুগোপযোগী ও ভবিষ্যৎদর্শী অত্যন্ত বিবেচনার কাজ করেছেন, তা তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি এবং জেনারেল কেমিস্ট্রি – এই দুই ডিপার্টমেন্ট দিয়ে শুরু হয় এই ইনস্টিট্যুটের জয়যাত্রা। অচিরেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তৎসংক্রান্ত সমস্যা, তা সমাধানে আই.আই.এস.সি.-র তলব পড়ে প্রযুক্তিগত সাহায্যের। এবং মরিস ট্র্যাভার্স প্রায় প্রথম থেকেই বিবাদে জড়িয়ে পড়েন দোরাবজি টাটা ও বুর্জরজি পাদশার সঙ্গে এবং ফলে তাঁর সাধের চাকরিটি হারান।

তবে সে অন্য গল্প। শোনাব অন্যদিন।

তথ্যসূত্র –
  1. ১ – IISc Archives.
  2. ২ – P. Balaram, The Birth of Indian Institute of Science, Current Science, Editorial, 10 January 2008, vol. 94. 
  3. ৩ – P. Balaram, The Indian Institute of Science: Marking a Century, Resonance, May 2009, pp. 416-429.
  4. ৪ – B.V. Subbarayappa, History of the Indian Institute of Science, Current Science, 2008, vol. 95, p. 150.
  5. ৫ – E. Arunan, Personal Blog, earunan.org
  6. ৬ –  A public lecture of Prof. P. Balaram in National Centre for Biological Science on this topic

লেখকের অন্য লেখা:

    2 replies on “ভারতে বিজ্ঞানশিক্ষার পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান – ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্স”

    অসাধারণ তথ্যসমৃদ্ধ একটি রচনা। ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞানসাধনার অন্যতম পথিকৃৎ এই শিক্ষা ও গবেষণামূলক সংস্থাটির সঙ্গে বহু ভারতবাসীরই সম্যক পরিচয় নেই, তাদের শুধু চমৎকৃতই নয়, আরো বড় গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত হতে উদ্বুদ্ধ করবে এধরণের প্রবন্ধ।

    আহা, অনবদ্য এক অজানা ইতিহাস যেন পড়লাম!
    আর লেখক কথা দিয়েছেন, মরিস ট্রাভার্স এর কাহিনী বলবেন (লিখবেন?) তা যেন অচিরেই পাই!

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    প্রাচ্যের ফরাসি সুগন্ধি – কেরল

    সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

    আমি ভ্রমণ করতে ভালবাসি, কিন্তু ভ্রমণের কল্পনা করতে আমার আরও ভালো লাগে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) রবিঠাকুর উবাচ। আমাদের মতন ভ্রমণপিপাসুদের বেদবাক্য হয়ে থাকবে চিরকাল। বছরে যদি দু’বার ঘুরতে যাওয়া হয়, বাকি সময় কাটে ভ্রমণ কল্পনায়। সেই সময়ের কথা বলছি যখন বিদেশ ভ্রমণ শুধুমাত্র কল্পনায় বাস্তবায়িত হত। সদ্য চাকরি পাওয়া দু’জন নববিবাহিত মানুষ তাই চেষ্টা করত দেশের […]

    Read More

    গিরিশ ঘোষ : বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের পিতা

    সূর্য সেনগুপ্ত

    যদি মিথ্যা কথায় বাপ দাদার নাম রক্ষা করতে হয়, সে নাম লোপ পাওয়াই ভাল।— মিথ্যায় আমার যেন চিরিদিন দ্বেষ থাকে।–মিথ্যায় আমার ঘৃণা, সে ঘৃণা বৃদ্ধ বয়সে ত্যাগ করবো না গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ‘মায়াবসান’ নাটকে (৪:২) কালীকিঙ্করের সংলাপ, (১৮৯৮) [১] ভদ্রলোক রাত্রে শো হয়ে গেলে একটা ভাড়ার গাড়ি ধরে শুঁড়িখানায় গিয়ে বসতেন। ততক্ষণে অবশ্য তিনি অর্ধমত্ত অবস্থায়। […]

    Read More

    নববর্ষের নতুন প্রভাতে

    ভাস্কর বসু

    সে ছিল এক সময়। তখন পয়লা বৈশাখে প্রভাতফেরি বার হত, আগের চড়ক সংক্রান্তির দিন থেকেই উৎসবের সূচনা হয়ে যেত। গাজনের বাজনা শোনা যেত, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মা’র হাত ধরে চড়কের মেলাতে নতুন জিনিষের আবদার করত। এখন একটু অন্যরকম! বিগত ইংরেজি বছরের দুর্বিষহ স্মৃতিকে পিছনে ফেলে পেরিয়ে এলাম আমরা এই বছরের আরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি সময়। কিন্তু […]

    Read More

    সুকুমার রায়ের নাটক

    সুমিত রায়

    সুকুমার রায়ের (১৮৮৭-১৯২৩) “সুকুমার রায়” হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিলো না। তার প্রথম কারণ হলো তিনি ছিলেন কোলকাতায় রায়চৌধুরী বাড়ীর ছেলে, তাঁর জীবন উনিশ-বিশ শতকের মধ্যে সেতুর মতো। বাংলা সাহিত্য আর সংস্কৃতির কথা ধরলে সেসময়ে ঠাকুরবাড়ীর পরেই এই রায়চৌধুরীদের নাম করতে হয়। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের রাজ্যে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই বাংলাদেশে ছাপাখানা এসে গেছে […]

    Read More

    বীরোল

    রিয়া ভট্টাচার্য

    গ্রন্থঃ বীরোল লেখকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশনাঃ দ্য ক্যাফে টেবল কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা (genre)। অনেক দিকপাল লেখকের লেখনীর ঝরনাধারায় সিক্ত সাহিত্যমাতৃকার এই অংশ। কিশোর উপযোগী সায়েন্স ফিকশন রচনায় বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তাঁরই সাম্প্রতিকতম উপন্যাস গ্রন্থ বীরোল। এই গ্রন্থে আছে মোট দু’খানি উপন্যাস, “নতুন দিনের আলো” ও […]

    Read More
    +