গদ্যকবিতার সাবলীলতা প্রসঙ্গে

অমিত চক্রবর্তী

[লেখক পরিচিতি: জন্ম সোনারপুর অঞ্চলের কোদালিয়া গ্রামে। ছাত্রাবস্থায় অনেক লেখা এবং ছাপানো কলকাতার নানান পত্রপত্রিকায়। ১৯৮২ সালে আমেরিকায় আসা উচ্চশিক্ষার জন্য। এখন ক্যানসাস স্টেট ইউনিভারসিটিতে কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের ডিন। লেখা সম্প্রতি প্রকাশিত এই সব ম্যাগাজিনে - যুগসাগ্নিক, অন্যনিষাদ, বাতিঘর অনলাইন, খোঁজ, শব্দের মিছিল, মহাভারত, অপার বাংলা, উত্তর আমেরিকার পত্রিকা উদ্ভাস, এবং আরো অনেক পত্রিকায়। আমেরিকার নিউ জার্সি অঞ্চলের পত্রিকা "অভিব্যক্তি"র কবিতা বিভাগের সম্পাদক। ]

এই মিলেতেই পদ্য মাটি, অলোকরঞ্জন হলে বাঁচাতেন
কিংবা সুনীল অ্যাংলো-সাক্সন হার ছিঁড়ে একটুকরো মুক্তোয় (শক্তি চট্টোপাধ্যায়, “পোকায় কাটা কাগজপত্র”)

অন্ত্যমিলে যদি না হয়, তবে গদ্য কবিতার আকর্ষণ কিসে পাঠকের কাছে, এবং কবিরা কী ভাবে সেই আকর্ষণের দিকে নজর রাখবেন নিজেরা লেখার সময়? অনেকে অবশ্য অন্ত্যমিলের অভাবকে গদ্যকবিতায় ছন্দের অভাব বলে মন্তব্য করেন, কিন্তু সেটা একেবারেই ঠিক নয়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর কবিতার ক্লাস বইতে “ছন্দের সহজ পাঠ” পরিচ্ছেদে এ ব্যাপারে প্রাঞ্জল (এবং রসাত্মক) আলোচনা করেছেন, তাই আমরা সে আলোচনা এখানে টানব না। ওঁর কথাতেই, “কবিতা তো আর কিছুই নয়, শব্দকে ব্যবহার করবার এক ধরণের গুণপনা, ভাষার মধ্যে যা কিনা অন্যবিধ একটি দ্যোতনা এনে দেয়।” এই “দ্যোতনা”ব্যাপারটা সংজ্ঞা দিয়ে ব্যাখ্যা করা মুশকিল, তাই আমরা কয়েকটি উদাহরণ দেখি এর কবিতার অংশ সাজিয়ে–

১)

সমুদ্র, শেষ নেই, শব্দ নেই, শুধু সমুদ্র…
একলা একটা জাহাজ, শুধু সমুদ্র…
কালো-কালো কুয়াশা, ছায়া-ছায়া আলো, শুধু সমুদ্র।
আর এই সমুদ্রে কিনা মাথা তুলল আশ্চর্য সূর্য –
আশ্চর্য, এর চেয়ে আশ্চর্য আর কী –
ট্রামের তোড়, বাস এর শোর, বড়ো রাস্তার পঞ্চাশ গোলমাল,
ভিড়, রোদ্দুর, উঁচু –উঁচু বাড়ি, আপিস-যাওয়া ছুটোছুটি –
মুহূর্তের জন্য কিছু দেখল না স্বাতী, কিছু শুনল না …
দেখল সমুদ্র, শুধু সমুদ্র, আর সেই আলোছাড়া
কালোছায়ার সমুদ্রে সূর্যের আশ্চর্য মাথাতোলা

২)

ও যে অবিন, আমার সর্বনেশে পুরুষ।
ওর শ্রাবণ আকাশের মেঘের মতন গায়ের রঙ
বিদ্যুতের মতন তীক্ষ্ম চেহারা
উঁচু মাথা সোজা করে হেঁটে যাওয়া
আমি শুধু দেখলুম।
চোখ ভরে আমার জল নামল।
বুকের যেখানে দুঃখের পাথর জমে ছিল
হঠাৎ দেখি তার কোথাও ফাটল ধরেছে।
এ কি আমার মুক্তি ? একি আমার আনন্দ?

৩)

জানি নে কেন মনে হয়
এই দিন দূরকালের আর-কোনো একটা দিনের মতো।
এরকম দিন মানে না কোনো দায়কে,
এর কাছে কিছুই নেই জরুরি,
বর্তমানের-নোঙর-ছেঁড়া ভেসে-যাওয়া এই দিন।

বিদগ্ধ পাঠক এর মধ্যে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, উদাহরণ ১) এবং ২) সেই অর্থে কবিতার অংশ নয় – প্রথমটি বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর এবং দ্বিতীয়টি বিমল করের অসময় উপন্যাসের খানিকটা অংশ আমি সাজিয়েছি কবিতার মতন করে। আর তৃতীয়টি কোনো ভূমিকার অপেক্ষা করে না, এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুনশ্চ‘র একটি কবিতা, “সুন্দরের” খানিকটা অংশ।

যদি ভাষার এই দ্যোতনা আসছে “শব্দকে ব্যবহার করবার এক ধরণের গুণপনা” থেকে, তাহলে আমাদের সন্ধান এখন সেই গুণপনাগুলির নির্মাণবিদ্যা বা mechanics নিয়ে। উত্তর আমেরিকার কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে লেখক বা কবি হতে উৎসাহী undergraduate ছাত্ররা (অর্থাৎ যারা BA পড়ছে) অনেকেই 400-level Creative Writing এর ক্লাস নেয় তাদের তৃতীয় বছরে। শব্দকে ব্যবহার করবার গুণপনা এবং তার mechanics তাদের শেখানো হয় ক্লাস হিসেবে। তাই এ ধরনের mechanics এর বিশদ বর্ণনা একটি ছোট প্রবন্ধে করা সম্ভব নয়। আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির সংক্ষিপ্ত আভাস দেব এখানে।

ক) কবিতার প্রথম পংক্তি

আলোচনার আগে পংক্তি আর চরণের তফাতটা বলে রাখা ভাল, কারণ এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি দেখেছি। পংক্তি হচ্ছে কবিতার লাইন আর চরণ হচ্ছে কবিতার বাক্য। এটুকু মনে রাখলেই যথেষ্ট। উদাহরণ স্বরূপ –

বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে,
যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নিচে
রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ

(বিনয় মজুমদার, “ফিরে এস, চাকা,” ১ নম্বর কবিতার অংশ)
এখানে পংক্তি / লাইন = ৩; চরণ / বাক্য = ১

কবিতার প্রথম লাইন বিশেষ গুরুত্ব পায় যে কোনো কবিতায় – সর্বদাই পেয়েছে – তবে ইদানীং চঞ্চলমতি সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, এটির তাৎপর্য যেন বেড়েছে অনেকগুণ। প্রথম লাইন পাঠককে বেঁধে রাখবে পুরো কবিতাটা পড়ার জন্য, এমনই আমরা চাই। তার জন্যে প্রথম লাইনে থাকতে হবে হয় রহস্য বা বিস্ময় অথবা একটি মনভোলানো চিত্রমালা যেটা বাস্তব বা রূপককে বর্ণনা করে। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক –

১) “অষ্টপ্রহর তোমার খবর নিতে আমার কাছে লোক আসছে” (শক্তি চট্টোপাধ্যায়, “আবার একা একা সেই ঘরের পাল্লা দুটোর মতন”) – রহস্য

২) “বকুল গাছের নীচে অকস্মাৎ নেমেছিল প্রেত” (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, “বকুল গাছের নীচে”) – বিস্ময়

৩) “মহিলা সাংবাদিক তাঁর দুই নয়নের নীল কাজল” (অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, “আজ, এই নিখিলে”) – চিত্র, বাস্তব

৪) “সবুজ পাতার মতো ভালবাসা জেগে ওঠে প্রৌঢ়ের গভীরে” (মল্লিকা সেনগুপ্ত, “শ্যাম মহীরুহ”) – চিত্র, রূপক

খ) শব্দের ম্যাজিক

শব্দের ম্যাজিক ছাড়া সেই “গুণপনা” কবি আনবেনই বা কী করে? কিন্তু এখানে একটা ঝুঁকি বা risk লক্ষ্য করি ইদানীং। সোস্যাল মিডিয়ার যুগে, পাঠকের ধৈর্য গেছে কমে। তাই কবিরাও চটকদারি শব্দবন্ধের উপর নজর দিচ্ছেন বেশি, পুরো কবিতাটার গঠন বা বিষয়বস্তুর উপর ততটা নজর না দিয়ে। অণুকবিতা, পরমাণুকবিতা থেকে এক লাইনের কবিতারও ছড়াছড়ি এখন। এটা সামগ্রিকভাবে কবিতার পক্ষে ক্ষতিকারক হলেও হয়তো নতুন একটা ‘টি২০’ ধারাও আসবে কবিতায়, টেস্ট ম্যাচ গঠন বজায় রেখেও। কিছু নতুন পড়া শব্দের ম্যাজিক তুলে ধরি এখানে –

“কুয়াশা বা স্থবির ইন্টারনেট …” (নিলয় নন্দী, “ডিসেম্বরের শহরে।” এইটি একেবারে নতুন কবিতা, আমার সহ-সম্পাদনা করা পত্রিকা “অভিব্যক্তি”র শীত সংখ্যায় (২০২১) প্রকাশ পেয়েছে।)

“মধ্যবিত্ত স্বপ্ন আসলে পাঁচমেশালি ডাল, সাথে সুখের ফোড়ন অল্প” (জয়দীপ লাহিড়ী, “মধ্যবিত্ত স্বপ্ন”)

“মাছরাঙার ঠোঁট থেকে চুরি গেছে অপেক্ষার রোদ ” (চিরশ্রী দেবনাথ, “অন্তরা”)

গ) ভাষার নিজস্ব ছন্দ

প্রত্যেক ভাষার একটা নিজস্ব ছন্দ আছে, শব্দগুলির উত্থানপতন। সেইটিকে ঠিক করে ব্যবহার করতে শেখা। এই উত্থানপতন নিয়মিত তালে হয় না গদ্যকবিতায়, কিন্ত এর অভাবে কবিতা হয়ে পড়ে জোলো, একঘেয়ে। এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছন্দ বইতে যা লিখেছেন তা আবার বিশেষ করে জোর দেওয়া দরকার –

“‘সন্মুখসমরে পড়ি বীরচূড়ামণি বীরবাহু’ — এই বাক্যটি আবৃত্তি করিবার সময়ে আমরা “সম্মুখ” শব্দটার উপর ঝোঁক দিয়া সেই এক-ঝোঁকে একেবারে “বীরবাহু” পর্যস্ত গড়গড় করিয়া চলিয়া যাইতে পারি। আমরা নিশ্বাসটার বাজে-খরচ করিতে নারাজ, এক নিশ্বাসে যতগুলা শব্দ সারিয়া লইতে পারি ছাড়ি না। আপনাদের ইংরেজি বাক্যে সেটা সম্ভব হয় না কেননা আপনাদের শব্দগুলা বেজায় রোখা মেজাজের। তাহারা প্রত্যেকেই ঢু মারিয়া নিশ্বাসের শাসন ঠেলিয়া বাহির হইতে চায়। She was absolutely authentic, new, and inexpressible — এই বাক্যে যতগুলি বিশেষণপদ আছে সব কটাই উচু হইয়া উঠিয়া নিশ্বাসের বাতাসটাকে ফুটবলের গোলার মতো এক মাথা হইতে আর এক মাথায় ছুঁড়িয়া ছুঁড়িয়া চালান করিয়া দিতেছে। প্রত্যেক ভাষারই একটা স্বাভাবিক চলিবার ভঙ্গি আছে। সেই ভঙ্গিটারই অনুসরণ করিয়া সেই ভাষার নৃত্য অর্থাৎ তাহার ছন্দ রচনা করিতে হয়।

তারপর রবীন্দ্রনাথ লিখছেন বাংলা ভাষার চাল-চলন নিয়ে।

আপনি বলিয়াছেন, বাংলা বাক্য উচ্চারণে বাক্যের আরম্ভে আমরা ঝোঁক দিয়া থাকি। এই ঝোঁকের দৌড়টা যে কতদূর পর্যন্ত হইবে তাহার কোনো বাধা নিয়ম নাই, সেটা আমাদের ইচ্ছা। যদি জোর দিতে না চাই তবে সমস্ত বাক্যটা একটানা বলিতে পারি, যদি জোর দিতে চাই তবে বাক্যের পর্বে পর্বেই ঝোঁক দিয়া থাকি। “আদিম মানবের তুমুল পাশবতা মনে করিয়া দেখো”— এই বাক্যটা আমরা এমনি করিয়া পড়িতে পারি যাহাতে উহার সকল শব্দই একেবারে মাথায় মাথায় সমান হইয়া থাকে। আবার উত্তেজনার বেগে [।] নিম্নলিখিত মতো করিয়াও পড়া যাইতে পারে,—আদিম মানবের তুমুল [।] পাশবতা মনে করিয়া দেখো. এই বাংলা-শব্দগুলির নিজের কোনো বিশেষ দাবি নাই, আমাদের মর্জির উপরেই নির্ভর।

আমরা উদাহরণ দিয়ে দেখি গদ্যকবিতায় শব্দগুলির অনিয়মিত উত্থানপতনঃ

১)

আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছে;
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।
যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি,
সেই নারীর মতো
ফাল্গুন আজাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠছে।
(জীবনানন্দ দাশ, “নগ্ন নির্জন হাত”)

২)

কালকে তোমার ডাল ভেঙেছি, ফুল ছিঁড়েছি।
অপরাধের হাওয়ায় ছিল ত্বরিৎগতি
সেই কাঁপুনি ঝাউপাতাতে, ক্ষয়ক্ষতি যার গায়ের ধুলো
(পূর্ণেন্দু পত্রী, “যখন তোমার ফুলবাগানে”)

ঘ) পংক্তিপ্রবাহ

কবিতার লাইন বা পংক্তিগুলো কী ভাবে নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তা গড়ে তোলে, সেটাই একটা কবিতার সাবলীলতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। এই সাবলীলতা গড়ে তুলতে কবির হাতে অনেক মালমশলা, সরঞ্জাম আছে। তাদের মধ্যে কয়েকটার কথা আমি লিখছি নিচে উদাহরণ দিয়ে।

ধারাবাহিকতা (enjambment) – কী ভাবে কবিতার চরণ ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, পংক্তি থেকে পংক্তিতে, যতিচিহ্ন ব্যবহার না করে।

পিতলের বাজুটা গড়িয়ে পড়েছে,
নথ ঝুলছে পর্দায়, তোমার ফেলে যাওয়া
রিস্টওয়াচটা দেয়ালঘড়ি হয়ে উঠেও
এমন করে বাড়ছে যে
একটু পরেই ঘরটা চৌচির হয়ে যাবে
(অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, “মকরসংক্রান্তি”)

এখানে চরণটা লক্ষ্য করুন “তোমার ফেলে যাওয়া” থেকে “চৌচির হয়ে যাবে” অবধি। কোনো যতি নেই এই চরণে কিন্ত এটার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে লাইন শেষ পেরিয়ে। এই পদ্ধতির সঠিক ব্যবহারে শুধু যে সাবলীলতা বাড়ে তাই নয়, কবিতার বিন্যাস বা texture বাড়ে। বিন্যাস বাড়াতে গেলে, প্রথমে তৈরী করতে হয়, stress বা শ্বাসাঘাত আর তার সঙ্গে tension বা টান, একটা চাপা উত্তেজনা। উপরের উদাহরণে, এই টান বা উত্তেজনাটা প্রকট “এমন করে বাড়ছে যে” পংক্তিতে। তারপর সব শেষে সেই টানকে মুক্তি দেওয়া হয়, চরণ ধারাবাহিকতা যেখানে শেষ হয়, যেমন উপরের উদাহরণে “ঘরটা চৌচির হয়ে যাবে” বাক্যাংশে।

অন্যদিকে তুলনা করুন দেবারতি মিত্রের এই কবিতার অংশের সঙ্গে যেখানে enjambment এর ব্যবহার কম করা হয়েছে, এবং তার ফলে আমরা পাই টান বা উত্তেজনার বদলে একটি নিটোল বর্ণনাঃ

কুহেলি-ফরসা মায়ের কোলে
পাথার-কালো শিশু, ওরই ছেলে।
মায়ের খোলাচুল পিঠ ছাপিয়ে,
আঁচলে চাবির থোলো।
(দেবারতি মিত্র, “মা ছেলের গল্প”)

দুটো উদাহরণ দিচ্ছি নিচে পাঠকের নিজের অনুশীলন করার জন্য। প্রথমে লক্ষ করুন, কোথায় ধারাবাহিকতা বা enjambment, তারপর খুঁজুন কোথায় শ্বাসাভাত আর টান, আর সবশেষে বের করুন কী ভাবে সেই টানকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

১)

যে-কোনো ভিড়ের মধ্যে সহসা নিশ্চিত
একটি উজ্জ্বল মুখ অসম্ভব আলো জ্বেলে
আবির্ভূত হবে। নাকি ঠিক আলো নয়, প্রবীণ বিক্ষত
বৃক্ষের উপর জ্যোৎস্না, অলৌকিক সমুদ্রের
সাত লক্ষ ঢেউয়ের ফণার তীব্র।
(আলোক সরকার, “মলিন কৌতুক”)

২)

রোদ উঠলে আলগা হয়ে যাওয়া
গ্রন্থিগুলোর মধ্যে যে নিহিত অন্ধকার
সেখানেও রোদ এসে ছড়িয়ে পড়ে
(হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, “রোদ উঠলে।” এইটি একেবারে নতুন কবিতা,
আমার সহ-সম্পাদনা করা পত্রিকা “অভিব্যক্তি”র শীত সংখ্যায় প্রকাশ পেয়েছে।)

ঙ) গতি

কবিতার গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় বিভিন্ন উপায়ে। তাদের মধ্যে কয়েকটা হল –

ছোট বা বড় লাইনের ব্যবহার

কবিতায় বড় লাইন ব্যবহার করার পথিকৃৎ বোধহয় Walt Whitman (উনিশ শতকের বিখ্যাত আমেরিকান কবি, যার আব্রাহাম লিঙ্কনকে নিয়ে লেখা “O Captain, My Captain” আমাদের সময়ে হাই স্কুলে পাঠ্য ছিল) – একটা কবিতা তুলে ধরছি, যেটা পুরো কবিতাটা এক চরণে, এই কবিতাটায় আমরা ফেরত আসব পরেও আবার।

When I Heard the Learn’d Astronomer
When I heard the learn’d astronomer,
When the proofs, the figures, were ranged in columns before me,
When I was shown the charts and diagrams, to add, divide, and measure them,
When I sitting heard the astronomer where he lectured with much applause in
the lecture room,
How soon unaccountable I became tired and sick,
Till rising and gliding out I wander’d off by myself,
In the mystical moist night-air, and from time to time,
Look’d up in perfect silence at the stars.

বড় লাইনের ব্যবহার কবিতার গতি হ্রাস করতে পারে বা কবিতাকে স্নিগ্ধ করতে পারে। বাংলা কবিতায় এই ধরনের শৈলী পাওয়া যায় অনেকের লেখাতেই। দুটো উদাহরণ দিচ্ছি –

১)

আমি লাল রঙ পরিমিতভাবে সূর্যকিরনের মত সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছি
শঙ্কুর মত ধূসর ছাইরঙের কিছু গ্রাম, কিছু শহর দেখা যাচ্ছে
গড়িয়ে পড়ছে রঙিন ঘাসের ঘোড়া
আমি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি-অনুসন্ধানযানের ওপর শুয়ে প্রতিধ্বনি খুঁজছি।
(শম্ভু রক্ষিত, “চিন্তন”)

২)

লোকজনের স্বভাব-টভাব আজো ঠিক সেইরকম আছে কিন্তু
হক্ কথা বললেও ফুটো খুঁজে অন্দর দ্যাখে
মানতে চায় না, ভেবে দেখবে বলে
হাত চেপে আঁধারের কাছে নিয়ে পকেট পালটায়,
মুখে-মনে, টাকা থেকে চাবি আর চাবি থেকে টাকার প্রসঙ্গ !
(শক্তি চট্টোপাধ্যায়, “আবার একা একা সেই ঘরের পাল্লা দুটোর মতন”)

অন্যদিকে তুলনা করুন মল্লিকা সেনগুপ্তের এই কাব্যাংশটির সঙ্গে, যেখানে ছোট বাক্যাংশ দিয়ে পংক্তি গড়ায়, কবিতার গতি অনেক বেশি।

কুয়াশা ঘিরে নিল, নৌকো ঢেকে নিল, বাতাসে খুলে নিল তন্তুবাস
আমি তো জলনারী, ভীষণ ভয় পেয়ে খুঁজছিলাম কোনও নির্ভর
একটি ডিঙি ছিল আমার সঙ্গিনী, সবুজ ভাগীরথী শিক্ষিকা
আমাকে দিয়েছিল শ্যাওলা পায়জোর, দিয়েছে সারা গায় পলির ঘ্রাণ
তখন ঝড় এল, তখন মেঘ এল, বর্ষাজল যেন নামবয়ে ঘাসে
কিন্তু নামল না, এগিয়ে এল এক কৃষ্ণরূপ মেঘ আমার দিকে
(মল্লিকা সেনগুপ্ত, “সূর্যস্পর্শা”)

ছোট বা বড় পদাংশের (syllable) ব্যবহার

এই বিভিন্ন মাপের পদাংশের ব্যবহার যেমন কবিতার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে কাজে লাগান যায়, তেমনি এ দিয়ে কবিতার ঘনত্বও কমান বাড়ান যায়। পরপর বড় পদাংশ ব্যবহার করলে চরণের ঘনত্ব বাড়ে, যেমনঃ

জানি; পলাতক পাখায় নভশ্চারী
খোঁজা নিষ্ফল নক্ষত্রের ঘাঁটি;
(সুভাষ মুখোপাধ্যায়, “পদাতিক”)

অন্যদিকে কবিতা যেমন চলতে থাকে অশ্বমেধের ঘোড়ার মতন এখানে, তেমনই হাওয়ায় দুলে –

আর কোনও স্বপ্ন নেই, আর কোনও স্মৃতি নেই, শেষ।
আর কোনও দৃশ্য নেই। দৃশ্য থেকে এবারে প্রবেশ –
(মন্দাক্রান্তা সেন, “বর্ষাফলকে গাঁথা হাড়”)

পংক্তির গোড়ায় পুনরাবৃত্তি (Anaphora)

পুনরাবৃত্তি কবিতার বিন্যাস বা texture এর জন্য অপরিহার্য। কিন্তু একটা বিশেষ শৈলীসম্পদ হচ্ছে, পুনরাবৃত্তি করা পংক্তির গোড়ায়। আমরা দেখেছি Walt Whitman এর কবিতায় আগে –

When I heard the learn’d astronomer,
When the proofs, the figures, were ranged in columns before me,
When I was shown the charts and diagrams, to add, divide, and measure them,
When I sitting heard the astronomer where he lectured with much applause in
the lecture room,

চারটি লাইনই শুরু হচ্ছে When শব্দটি দিয়ে, এটি একটি anaphora-র বিশেষ উদাহরণ। Whitman এখানে এই শৈলী ব্যবহার করেছেন, ক্লাসরুমের একঘেয়েমি বর্ণনা করার জন্য।

বাংলা কবিতায় এই anaphora র ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। একটা উদাহরণ নীচে দিচ্ছি –

তুমি তোমাদের সেই হলুদ বাগানে জল দিচ্ছ এখন
এখন তোমার পায়ের পাতায় পড়েছে কাদা জলের ছিটে

এখন তোমার মুখের উপর এসে পড়েছে তালতমালের আলো
(শক্তি চট্টোপাধ্যায়, “তাঁকে চিরদিন পাওয়া যায় না”)

এখানে শক্তির anaphora ব্যবহারে কবিতাটি স্নিগ্ধতায় ভরেছে, একঘেয়েমিতে নয়।

পুনশ্চঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের যে দু লাইন দিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম এই আলোচনা, শক্তি কিন্তু সেই কবিতায় অন্ত্যমিলই ফেরত আনেন তাঁর বিশিষ্ট কায়দায় –

এই মিলেতেই পদ্য মাটি, অলোকরঞ্জন হলে বাঁচাতেন
কিংবা সুনীল অ্যাংলো-সাক্সন হার ছিঁড়ে একটুকরো মুক্তোয়
আমার পিতাঠাকুর শুনেছি এঁটো হাত নিট্ মদ্যে আঁচাতেন
ভোজ্য দ্রব্য বলতে আমার বিউলিডাল, একবাটি সুক্তো।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় “পোকায় কাটা কাগজপত্র”

তথ্যসূত্র

উদ্ধৃতির reference লেখার মধ্যে দেওয়া আছে।
Additional Reference for Teaching 400 Level Creating Writing.
Boisseau, Michelle and Robert Wallace. (2004). Writing Poems, 6th edition. London: Pearson-Longman.

লেখকের অন্য লেখা:

    3 replies on “গদ্যকবিতার সাবলীলতা প্রসঙ্গে”

    খুব সুন্দর আলোচনা। কবিতার বিভিন্ন দিক এভাবে আলাদা আলাদা করে দেখানো কবিতার অগ্রগতি করবে। খুব ভালো কাজ করে চলেছেন। এগিয়ে নিয়ে চলুন এই প্রয়াস।

    অসাধারণ। শেখার জিনিস সুখপাঠ্য করে পরিবেষণ সহজ নয়।

    খুবই মনোগ্রাহী আলোচনা। শিক্ষনীয় তো বটেই। কিন্তু বাংলা ভাষা নিয়ে আলোচনায় “কী” এর ব্যবহার সঠিকভাবে হবে এই আশাটুকু করতেই পারি। নয়?

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    বড় মাপের মানুষটি চলে গেলেন

    শেখর বসু

    মে মাসের একেবারে শেষের দিকে সুজন দাশগুপ্তের একটি ফেসবুক পোস্টে দুঃসংবাদটি জেনে চমকে উঠেছিলাম। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল সুমিত রায় আর আমাদের মধ্যে নেই। ক্যানসারে ভুগছিলেন, অসুখের খবরটি আমি অবশ্য জানতাম না। পরে জেনেছি আমার মতো আরও অনেকেই জানতেন না। সামান্য যে কয়েকজন জানতেন, তাঁদের কাছে নাকি সুমিতবাবুর নির্দেশ ছিল খবরটি যেন অকারণে প্রচার না […]

    Read More

    অগ্রজপ্রতিম

    দিলীপ দাস

    জীবনে এক একটা এমন সময় আসে যখন নিমেষের জন্য চলমান জগত যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। যখন জীবন থেকে কোনো প্রিয়জন বিদায় নেন, তখন এক একটা মুহূর্ত খুব নিষ্ঠুর মনে হয়। সুমিতদার চলে যাবার খবর পেয়ে আমার ঠিক সেই রকমই মনে হয়েছিল। মনটা অসাড় হয়ে ছিল কিছুক্ষণ। জীবনে তো কত মানুষের সাথেই দেখাশোনা হয়, কথাবার্তা হয়, […]

    Read More

    বন্ধু হে আমার

    ভাস্কর বসু

    নতুন ‘অবসর’ পথচলার শুরুতেই এক আকস্মিক আঘাত পেল। ‘অবসর’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শ্রী সুমিত রায় ‘পেয়েছি ছুটি, বিদায় দেহ’ বলে গত ২৬শে মে যাত্রা করলেন অমৃতলোকে। ‘অবসর’ পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই তিনি পত্রিকার সঙ্গে জড়িত। এখনকার যারা লেখক বা সম্পাদক, তাদের অনেককেই তিনি হাতে ধরে নিয়ে এসেছেন। তাঁর নিজের লেখাতেই আমরা জেনেছি কত ঘাম ঝরিয়ে তিনি […]

    Read More

    সুমিতদা, দেখা হল না

    পল্লব চট্টোপাধ্যায়

    সাত বছর আগের ঘটনা। ভাস্করের ফোন বাঙ্গালুরু থেকে, সুমিতদা চান তোমার রামায়ণের উপর আশ্রিত রচনাটা অবসরে প্রকাশ করতে। কোন সুমিতদা, বিকাশ রায়ের ছেলে? আমি অবাক। যদিও জানতাম, যে তাঁর নিজস্ব একটা পরিচয় আছে যা তার নিজস্ব ঔজ্জ্বল্যেই দীপ্তিমান। ধীরে ধীরে জেনেছি তাঁর আর সুজনদার (দাশগুপ্ত) কম্প্যুটারে বাংলা অক্ষর নিয়ে মৌলিক কাজের কথা। সুদূর আমেরিকায় বসে […]

    Read More

    সুমিতদা

    শিবাংশু দে

    পরশু খবরটা শুনে কিছুক্ষণ শূন্যতা বোধ করছিলুম। সম্পূর্ণ ‘অদেখা’ একজন মানুষ, সাক্ষাৎ কথাবার্তা কমই হয়েছে। যখনই কথা হয়েছে ফোনে, তিনি মনে করিয়ে দিতেন তাঁর শ্রবণ যন্ত্র তেমন সহযোগিতা করে না। একটু উচ্চকিত স্বরে কথা বলতে হত হয়তো। তবু কথা হত মাঝে মাঝেই। নয়তো অন্যান্য মাধ্যমে। যে ব্যাপারটা স্পষ্ট বুঝতে পারতুম, আমার প্রতি তাঁর স্নেহ, ‘অপাত্রে […]

    Read More
    +