কোয়ান্টাম স্তরে নিজের বদল আপনার চারপাশকে বদলে দেবে

কোয়ান্টাম স্তরে নিজের বদল আপনার চারপাশকে বদলে দেবে

প্রথমেই আমরা বোঝার চেষ্টা করব, বাস্তব বলতে কী বোঝায়? বাস্তবতা কাকে বলে? আমরা যা দেখি, তা কি সত্যিই বাস্তব? আমার চারপাশে যেসব বস্তু আছে তা কি সত্যিই কঠিন? একটি বস্তু অসংখ্য অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি। একটা পরমাণুর মধ্যে  সাধারণভাবে ইলেকট্রন প্রোটন নিউট্রন আছে। প্রোটন নিউট্রন কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি। কিন্তু একটি পরমাণুর ৯৯.৯৯৯৯…অংশ ফাঁকা। বাকি অংশ সেইসব মৌলিক কণার কম্পন।  সুতরাং অসংখ্য মৌলিক কণার কম্পন এবং প্রায় একশো ভাগ ফাঁকা অংশ নিয়ে এই বস্তুজগত তৈরি। আর, কম্পন মানেই শক্তির প্রকাশ। তাহলে মূলত বলা যেতে পারে, এই বস্তুজগত শক্তির এক রূপ। একইরকমভাবে আমরা বা  আমাদের শরীরও শক্তির এক রূপ। তাহলে আমার এবং আমাদের চারপাশের ছড়িয়ে থাকা জড় পদার্থের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? আমরা মানুষরা চিন্তা করতে পারি, অনুভব করতে পারি, কিন্তু জড় পদার্থ তা পারে না। তাহলে এই চিন্তা, অনুভব  কী দিয়ে তৈরি!  কোথা থেকে এইসব চিন্তা অনুভূতির জন্ম?  

অনেক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ মনে করেন, আমাদের চারপাশে এক অদৃশ্য শক্তিক্ষেত্র (invisible energy field) ঘিরে আছে। এই এনার্জি ফিল্ড আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। কীভাবে? প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি বস্তু এক ধরনের শক্তি তৈরি করে। আমাদের আবেগ, কম্পন অনুযায়ী এক ধরনের শক্তিক্ষেত্র তৈরি হয়। একটা মানুষের চিন্তা মানুষটার ভেতরে আটকে থাকে না, মহাবিশ্বে সেটা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, যা কিনা বাইরের শক্তির (intelligent field, যা কিনা সর্বত্র বিদ্যমান) সঙ্গে তার একটা প্রতিক্রিয়া হয়। ফলস্বরূপ, আমার আপনার চিন্তা অনুভূতি এই মহাবিশ্বের গঠন পালটে দেয়। প্রতি মুহূর্তে নতুন কোনো সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। এককথায় আমি বা  আপনি কেবল দর্শক নই বরং স্রষ্টা। 

তার মানে, বিষয়টা দাঁড়াল, আমরা এবং আমাদের চারপাশে যা-কিছু আমরা দেখি, সবটাই অদৃশ্য কণার কম্পনের বহিঃপ্রকাশ। বিজ্ঞান বলছে, কণাগুলি সম্ভাবনার জগতে থাকে। আমাদের চিন্তার গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী  কণাগুলির কম্পন হয়, ফলে সম্ভাবনা অসীম কিন্তু আমাদের মনোযোগ বা পর্যবেক্ষণ সেইসব কণার কম্পনের ধারা বদলে দেয়, কণাগুলিকে বাস্তব রূপ দেয়। এখান থেকেই  কোয়ান্টাম অ্যাকটিভিজমের ধারণা করা হয়। কোয়ান্টাম অ্যাকটিভিজম হল, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার নীতিগুলোকে কাজে লাগিয়ে একাধারে নিজেদের পরিবর্তন এবং সর্বোপরি আমাদের চারপাশের সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার একটি পদ্ধতি বা উপায় আবিষ্কার, যেখানে মূল কথা হচ্ছে, (ডঃ অমিত গোস্বামীর মতো বিজ্ঞানীদের মতে) চেতনা (consciousness) বাস্তবতার ভিত্তি, অর্থাৎ আমাদের চেতনাই বাস্তবতা তৈরি করে এবং এর মাধ্যমে আমরা আমাদের পছন্দ এবং ইচ্ছা অনুযায়ী আমাদের নিজেদের এবং আমাদের চারপাশের সমাজে পরিবর্তন আনতে পারি।   

কীভাবে আমাদের পছন্দ বা ইচ্ছাকে আমরা কনট্রোল করতে পারি? মানে, কীভাবে নিজেদের বদলানো সম্ভব? এক শ্রেণীর কোয়ান্টাম পদার্থবিদদের মতে, আমাদের প্রত্যেক ধরনের চিন্তার একটা কম্পন থাকে। আর, চিন্তা করে আমাদের মন। তাই মনের চিন্তার ধরন বা ফ্রিকোয়েন্সি বদলালে বাস্তব পালটে যায়। তেমনি প্রতিটা আবেগের একটা ফ্রিকোয়েন্সি আছে।  সেই আবেগের ধরনও আবার বিভিন্ন। ভয় এবং হতাশা নীচের ফ্রিকোয়েন্সিতে কম্পিত হয়। কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা ওপরের ফ্রিকোয়েন্সিতে কম্পিত হয়। মনের ফ্রিকোয়েন্সি অনুযায়ী বাস্তবতার পরিবর্তন হয়। সুতরাং আমরা আমাদের চিন্তার ধরন বা ফ্রিকোয়েন্সি বদলালে আমাদের চারপাশের বাস্তব সেই মতন পরিবর্তিত হয়। এখন প্রশ্ন হল, কীভাবে আমরা আমাদের মনের ফ্রিকোয়েন্সি বদলাতে পারি? কৃতজ্ঞতা বা ভালোলাগা বা ভালোবাসার চর্চা করতে হবে । ভালো ভালো জিনিস, যেমন একটা সুন্দর জায়গায় ভ্রমণ কল্পনা করুন। তাহলে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে আপনি কম্পিত হবেন।  নেগেটিভ ইনপুট কমান। সেসব আপনার ফ্রিকোয়েন্সি কমিয়ে দেয়। এড়িয়ে চলতে হবে নেগেটিভ মানুষ, সোশ্যাল মিডিয়ার খারাপ খারাপ জিনিস, খারাপ খবর ইত্যাদি। 

আমাদের আবেগ আমাদের ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারণ করে। এবার যেটা  চাইছি, সেটা অনুভূতিতে আনার চেষ্টা করতে হবে, যেন সেটা ইতিমধ্যেই আমরা পেয়ে গেছি। এই অনুভূতি লাভ সাধারণভাবে একদিনে সম্ভব নাও হতে পারে। তবে ঐকান্তিক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর, ধৈর্য ধরে ঐকান্তিক চেষ্টার ফল একদিন পাওয়া যাবেই। তখন ম্যাজিক ঘটবে জীবনে। 

প্রশ্ন হচ্ছে,  প্রতিকূল অবস্থায় কীভাবে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে থাকতে পারি আমরা? উত্তর হল, প্রথমে স্থির হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া নয়। কারণ, অ-স্থির মন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কিছুক্ষণ চুপ থাকা দরকার। এবার ভাবতে হবে বা ভাবা দরকার, এই অবস্থা থেকে আমরা কী শিখতে পারি? 

কোয়ান্টাম ফিজিক্সের এক ধরনের মতবাদ অনুযায়ী অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই, বরং সবই একই সঙ্গে বিরাজ করছে। আমরা শুধুমাত্র একটা মুহূর্তকে ধরে এগোচ্ছি বলে মনে হয়, যেন সময় সামনে এগোচ্ছে। সময় আসলে স্থির, আমরা চলছি।  ভবিষ্যৎ আগে থেকে লেখা নয় বরং প্রতি সেকেন্ডে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নতুন করে লিখতে পারি। আমরা প্রতিদিন হাজার হাজার চিন্তা করি, আর সেই চিন্তাগুলোই আমাদের বাস্তবতা তৈরি করে। বাস্তবতা আমাদের ভেতর থেকেই তৈরি হয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুযায়ী কোনো কণা তার পর্যবেক্ষণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অসংখ্য সম্ভাবনার মধ্যে থাকে। আমার মনোযোগ এবং আমার পর্যবেক্ষণ তার মধ্য থেকে একটি সম্ভাবনাকে বাস্তবতায় রূপ দেয়। অর্থাৎ আমাদের ভিতরের চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারলে আমাদের বাইরের অভিজ্ঞতাও পাল্টে যায়। 

এইভাবে এক থেকে বহুতে ব্যাপারটা সঞ্চারিত হলে এই পরিবর্তনের বিস্তৃতি ক্রমশ বাড়তে থাকে। এককথায় সমষ্টিগত চেতনার শক্তি গোটা পৃথিবী বদলে দিতে পারে। কীভাবে সম্ভব সেটা? আমরা সবাই পরস্পরের সঙ্গে কানেকটেড, আলাদা নই। রকয়েকজন মানুষের ইতিবাচক চিন্তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব আনতে পারে। নিজের জীবন বদলানোর পাশাপাশি আমার আপনার চারপাশের মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে। এরই নাম কোয়ান্টাম অ্যাকটিভিজম।

তথ্যসূত্র:- 

১)  Quantum physics and the power of the mind — Nancy Patterson 

২)  How Quantum Activism Can Save Civilization — Google Search 

৩) Dr Joe Dispenza teachings — Google Search 

৪) Some related links found using Google and You tube

৫ জানুয়ারী ১৯৫৩ কলকাতায় জন্ম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পাঁচ বছর পড়াশোনা। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে পি এইচ ডি। ১৯৯১ – ২০০২ কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন বিষয়ে তারাতলার ইন্সটিটিউট অব হোটেল ম্যানেজমেন্টে অধ্যাপনা। ২০০২ – ২০১৩ কলকাতার নেতাজীনগর ডে কলেজের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে অধ্যাপনা। তারপর প্রথাসম্মত অবসর। অবসরের পর পাঁচ বছর ধরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট লেকচারার। কলেজ জীবন থেকে লেখালেখি শুরু। প্রথমদিকে কবিতা, তারপর নিয়মিত গল্প লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, বইয়ের রিভিউ। এখন পুরো সময়টা কাটে সাহিত্য চর্চায়। ‘কণিকামাত্র’ এবং ‘অণুরেণু’ অণুগল্পের দু’টি সংকলন। ‘গল্প পঞ্চদশ’ পনেরোটি ছোটোগল্পের একটি সংকলন। এছাড়া খুব সম্প্রতি প্রকাশিত একটি উপন্যাস ‘কোভিডের দিনগুলি’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *