জীবনগান গাহে কে যে

জীবনগান গাহে কে যে

বিয়েটা সহজে হবে না। বাড়ি থেকে পালাতে হবে, কাউকে না জানিয়ে! 

 নাবালিকা? ধুস, বেশ বড়ো হয়ে গেছে সে। গান তো সেই কোন ছোট্ট বয়েস থেকেই  থেকেই শিখছে। বাবার কাছেই শেখা, আর সব ভাইবোনদের সঙ্গে। নিয়ম করে রেওয়াজ, ভোরবেলায় উঠে গলা সাধতেই হবে। কড়া নির্দেশ ছিল বাবার। সব কথাই শুনেছে সে। বাবা চলে গেলেন তখন সে দশ বছরেরও হয়নি। হঠাৎ করে চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল। তারা চার বোন, এক ভাই, তাছাড়া মা। খাবে কী? দিন চলবে কেমন করে? বাবা বলতেন, “এই তানপুরার উত্তরাধিকার দিলাম তোমাদের, যত্ন করে রেখো।” তা না হয় হল, তারা পাঁচ ভাইবোনের কেউই খারাপ গায় না। গান তাদের রক্তে। মঙ্গেশকরদের তানপুরার যোগ্য উত্তরাধিকারী সবাই। কিন্তু তানপুরা দিয়ে তো পেট চলবে না? সে দেখে মায়ের, বড়দিদির মুখ শুকনো। সে দেখে চার বছরের বড়ো দিদির যুদ্ধ, গান গেয়ে সংসার চালাবার লড়াই। তাকেও একদিন ডেকে নিল, মারাঠি কোন এক ছবির গান রেকর্ড করতে হবে। দশ বছরের বালিকা সে ভয়ে কেঁপে অস্থির! প্লে ব্যাক করতে হবে? কাঁপা কাঁপা গলায় দিদির সঙ্গেই ডুয়েট গাইল, ‘চলা চলা নভ বালা।‘ 

গান গাইতে, রেওয়াজ করতে তার ভালো লাগে। এই তো আজ কতদিন হল বাবা চলে গেছে, তাই বলে রেওয়াজে এতটুকু ফাঁকি দিয়েছে সে? ঊষালগ্নে প্রথমে ওমকার ধ্বনির রেওয়াজ, তারপর মন্দ্র সপ্তকে ধীরে ধীরে সুর বসানো। কোনোটাই বাদ দেয়নি। 

সাজতে ভালোবাসে সে। বাড়িতে সবাই সাদা রঙের শাড়ি পরে, ঢালা সাদা খোলের পাড়ওলা শাড়ি। দিদি তো সাদা ছাড়া কিছু ছুঁয়েও দেখবে না। তার ভালো লাগে গোলাপি রং, আকাশের মত নীল রঙের শাড়ি। 

একঢাল লম্বা চুল তাদের সব বোনেদের। শখ হল ছোট চুলে কেমন মানায় দেখবে! পাড়াতেই একটা এংলো ইন্ডিয়ান চুল কাটার দোকান, ছেলেদের চুল কাটে, লুকিয়ে লুকিয়ে একদিন সেখানে গিয়ে চুল কেটে এল। বাড়ি আসার পর জুটল মায়ের হাতের উত্তমমধ্যম ঠেঙানি, কিন্তু তাতে সে মোটেই দমে যায়নি!     

সবই সে মানিয়ে নিতে পারে, ভালো লাগে না শুধু দিদির সঙ্গে তুলনা। সেও বড়ো হয়েছে, ভিড় ট্রেন ধরে গাদাগাদি করে বোম্বে শহরে যাবার মত বড়ো, শহরে গিয়ে গানের জন্যে দরজায় দরজায় ঘোরার মত বড়ো, গান গেয়ে সংসারের কিছুটা সুরাহা করার মত বড়ো! 

ততদিনে দিদি পায়ের তলায় একটু জমি পেয়েছে। গান গাইছে, প্লেব্যাক গান। সংসারটা একটু থিতু হয়েছে। অনেক সুরকার দিদিকে গান দিচ্ছেন। দিদির সুরেলা গলার প্রশংসা করছেন। আর তাকে উপদেশ দিচ্ছেন, “দিদির মত গাও দেখি, তবে তো গান পাবে!” 

সেও চেষ্টা করছে, খুবই চেষ্টা করছে। কিন্তু তার গলার আওয়াজটাই যে অন্য রকম! দিদির মত নিটোল গোল আওয়াজ নয়। সে কি তার দোষ? 

ধুস! দোষ হবে কেন? নিজের মনেই ভাবে সে, ছোটো বোন হলেই কি সব কিছু দিদির মত হতে হবে? এই যে দিদি কম কথা বলে, দরকার ছাড়া কথা প্রায় বলেই না, আর সে নিজে হল বকতিয়ার খিলজি, কথা বলতে ভালোবাসে, তাতে কার কী ক্ষতি হল? সব মানুষই কি এক ছাঁচে ঢালা হবে না কি? দিদির মত গলা না হলে সে গান পাবে না? 

ভাবে আর গুমরে গুমরে থাকে মনের মধ্যে। গান যে একটা দুটো পাচ্ছে না তা নয়। চুনারিয়া বলে একটা ছবি রিলিজ করল। দিদি প্লে ব্যাক করল, গীতা দত্ত দিদিও গাইলেন। সেও একটা গান পেল। এরকমই চলছে। যেন সবার খাওয়া হয়ে গেলে হাঁড়ির তলার দুটি ভাত তার জন্যে রেখে দেওয়া আছে। কিশোরী মন বিদ্রোহ করে – কেন, কেন সবাই তাকে পিছনে রাখবে? সে বয়েসে ছোটো, তাই বলে জীবনে সব কিছুতেই ছোটো হয়ে থাকতে হবে? শুধুই ছায়া হয়ে? অনুসরণ করেই দিন যাবে? 

কিশোরী মনের ভাবনাগুলো ভাগ করে নেবে, এমন কেউ নেই। বাড়িতে সবাই দিদির অনুগত, দিদির রোজগারে সংসার চলে। কার কাছে মন খুলবে সে? 

না না, একজন আছে। দিদির কাজকর্ম বেড়েছে, তাই একজন সেক্রেটারি রেখেছে। মানুষটা বয়েসে ঢের বড়ো কিন্তু তার সঙ্গে মেশে বন্ধুর মত। তার গলার, তার গানের প্রশংসা করে। বলে, “তোমার গলায় যা আছে তা কারুর গলায় নেই। আজ না বুঝলেও দুদিন পরে ঠিকই বুঝবে সবাই। তোমাকেই ডেকে নেবে গান গাইতে, দিদিকে নয়। আমি তোমায় সেই জায়গায় পৌঁছে দেব!” 

কেমন যেন ভয় ভয় করে এসব শুনে। আবার ভাবে, বয়েসে কত বড়ো, কত অভিজ্ঞতা, উনি কি আর ভুল কথা বলবেন? 

মানুষটা যেদিন বিয়ের কথা পাড়ল, ছুটে পালিয়েছিল সেখান থেকে। এ কী করে হয়! দিদি মেনে নেবে না, কক্ষনো না!  

“মরো তাহলে পচে, দিদির খিদমত খাটো আর ফেলে দেওয়া ঝড়তিপড়তি গানগুলো গেয়ে জীবন কাটাও!” মুখ বেঁকিয়েছিল গণপতরাও ভোঁসলে। 

রাত জাগে কিশোরী মেয়েটা, ভাবে সে যে নিজেও চায় উড়ান দিতে, বিরাট বটগাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে সূর্যের আলোয় একান্ত নিজস্ব কয়েকটি সবুজ পাতা মেলতে। 

“আমি রাজি!” মনস্থির করে ফেলে ষোলোবছরের বিদ্রোহী মন। 

‘জীবনগান গাহে কে যে, সুর বুঝি না যে’ – সুর বোঝা না গেলেও জীবনের এ ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য তার নেই!

মঙ্গেশকর পরিবার হতবাক হয়ে গিয়েছিল যখন বাড়ির চতুর্থ সন্তানটি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিলো দিদির সেক্রেটারিকে, বয়েসে যে দ্বিগুণ, মাইনে যার মাসে মাত্র একশোটি টাকা! দিদি সব সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে ফেলল। ছোট বোনের মুখ দেখল না আর। মঙ্গেশকর পরিবার ভুলে যেতে চেষ্টা করল একটা গোলগাল, হাসিখুশি, বেশি-কথা-বলা ষোলো বছরের মেয়েকে, যে স্বপ্ন দেখে গান গেয়ে একদিন অনেক নাম করবে। 

আশালতা দীননাথ মঙ্গেশকর থেকে রাতারাতি আশা ভোঁসলে। গানের বাড়ির মেয়ে থেকে বোরিভেলির এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বৌ।  স্বামী, দেওর, শাশুড়িকে নিয়ে বড়সড় সংসার। কুয়ো থেকে জল তোলা, বাসন মেজে রান্না করা, সংসারের সবরকম দেখভাল, আর তার পর গান। না, গান ছাড়েনি, ছাড়ার প্রশ্নও ওঠেনি। গণপতরাও তাকে, তার গানকে সম্পূর্ণভাবে নিজের অধিকারে রেখেছে। জানা অজানা সুরকারদের কাছে নিয়ে যায়, যে যা গান দেয় আশা নির্বিচারে সেগুলো গাইতে থাকে।  গান গেয়ে যে উপার্জনটুকু হয়, সংসার নামের মরুভূমি তা নিমেষে শুষে নেয়। বছর না ঘুরতেই কোলে সন্তান। ঘরের সব কাজ সেরে, একমাসের দুধের শিশুকে বাড়িতে রেখে সে ট্রেন ধরে। কাজ পেতে, গান পেতে, হোক না সে অন্যের ফেলে দেওয়া গানের চিরকুট! তার উপার্জনেই সংসার চলে, অন্যের নেশার জিনিসের যোগান হয়। যেভাবেই হোক টাকা রোজগার করতেই হবে, উপায় নেই!   

জীবন তার জান্তব দাঁত নখ বার করছে, বাস্তব পৃথিবী সমস্ত নিষ্ঠুরতা চেনাচ্ছে এক এক করে। সে সহ্য করে যাচ্ছে, একাই। লড়ে যাচ্ছে প্রাণপণ, হাল ছাড়া তার ধাতে নেই। প্রতিজ্ঞায় অটল, নিজের পথ নিজেই কেটে নেবে – “মেরা গানা মেরা হোনা চাহিয়ে!” সুফলও পাচ্ছে। ও পি নায়ার, সি রামচন্দ্রের মত সুরকার নিজেদের সৃষ্টির জন্য তার গলাকে বেছে নিচ্ছেন। নিজের চেষ্টায়, দেশবিদেশের গান শুনে আর সেগুলো কাজে লাগিয়ে এক সম্পূর্ণ অন্য ঘরানার গায়কী তৈরী করছে সে। প্রথাগত ভারতীয় গানের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমী ধারার সূক্ষ্ম নাটকীয়তা। জ্যাজ, ল্যাটিন বিটস, ক্যাবারে – সব শোনে আর নিজের গলায় তুলে নেয় সেগুলো। ছোট্ট থেকেই সে কারমেন মিরান্ডার গান শুনতে ভালোবাসে। সুরের সেই ভোকাল রেসোনেন্স বা গলার কম্পন নিয়ে আসে নিজের গানে। এলভিস প্রিসলির নিঃশ্বাসের কাজ ব্যবহার করে প্লে ব্যাক করার সময়। বরাবরই সে খুব ভালো আওয়াজ নকল করতে পারে। সেই ক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে। গান যেন হয়ে উঠছে মঞ্চ থেকে নেমে এসে শ্রোতার সঙ্গে মুখোমুখি আলাপচারিতা! সেই অন্যরকম গান শ্রোতার কাছে কদর পাচ্ছে। গান হিট হচ্ছে। 

অন্যদিকে ঘরে অশান্তি বাড়ছে। মানসিক অত্যাচার তুঙ্গে। একটি মেয়েও হয়েছে তার, দ্বিতীয় সন্তান।  অর্থ উপার্জন, সংসারের কাজ, চার বছরের মেয়ে আর দশ বছরের ছেলের দেখভাল সে একাই করে। তাতেও রেহাই নেই। তানপুরার তার শেষে একদিন ছিঁড়ল। “বাউল হল যে সকল রাগিনী” – ছেলেমেয়ের হাত ধরে আর অনাগত তৃতীয় সন্তানকে শরীরে নিয়ে বোরিভেলির রাস্তায় এসে দাঁড়াল সাতাশ বছরের আশ্রয়হীনা এক যুবতী, তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে, সঙ্গে নেই কোনো অর্থ, কোথায় যাবে জানা নেই।  

এর বহু বহু যুগ পরে আশা ভোঁসলে তাঁর নব্বইতম জন্মদিন উপলক্ষে স্টুডিওতে এসেছেন। প্রবাদপ্রতিম গায়িকা, বহুমুখী বিস্তার, আশি বছরেরও বেশি সময় ধরে নানাধরণের গান গেয়েছেন। বিশ্বের সৰ্বাধিক সংখ্যক গান রেকর্ড হয়েছে তাঁরই গলায়। The most recorded artist of all time. পরনে প্রিয় নীলাম্বরী। মুক্তোর লম্বা মালা, খোঁপায় ফুল, বড় টিপ আর কাজলের চিরচেনা সাজ। 

“ওয়াহ! ইতনা কুছ পার করকে ম্যায় আয়ি হুঁ আজ!” মুখে চিলতে হাসি। আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে জীবনকে মুখোমুখি একটা লড়াই দেওয়ার হাসি।

“নারীশক্তি, নারীশক্তি” – শোনাচ্ছেন তাঁর উপলব্ধি – “শক্তি সব মেয়েরই ভেতরে আছে, মেয়েরা চিনতে পারে না। একবার চিনতে পারলে তারা কী না করতে পারবে!” 

“আপনি নিজে কবে বুঝতে পারলেন আপনার এই শক্তির কথা?” 

সঞ্চালিকার প্রশ্নে বেশ কিছুক্ষন চুপ করে রইলেন। দৃষ্টি হারিয়ে গেল সামনে, মনে মনে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন যেন। 

“কাফি লেট হুয়া, একটু দেরি হল।” থামলেন কয়েক মুহূর্ত। 

“যেদিন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম, ছেলেমেয়ের হাত ধরে একলা মা, ভাবছিলাম কোথায় যাব, কী করব – সেদিনই এই বুঝতে পারার শুরু। আমাকে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল, সঙ্গে ছিল শুধু এই গানের গলা। তা দেখ, থেমে তো থাকিনি, একলা হাতে তিনজনকে বড় করেছি, ভালোমন্দ বুঝতে শিখিয়েছি। স্কুলে পাঠিয়েছি, খাবারের ব্যবস্থা, জামাকাপড়ের তদারকি করে কাজ করতে গেছি। ওদের জন্যেই তো গান গেয়েছি, কাজ করেছি, পরিশ্রম করেছি – প্রচুর পরিশ্রম। ওদের বড় করতে টাকার দরকার ছিল। তাই যা কাজ পেয়েছি, নির্বিচারে করেছি। যত পারি গান গেয়েছি, গেয়েই গেছি। ভালোমন্দ ভাবিনি। কোনও কোনও গান মানুষের ভালো লেগেছে, তখন আশা ভোঁসলের নাম জেনেছে সবাই।”  

“তবে কারোর কাছে কোনোদিন হাত পাতিনি, মাথা নোয়াইনি, জানো?” নব্বই বছরের পরিণত চোখদুটো ঝিকিয়ে উঠল, “কক্ষনো কোনো সাহায্য চাইনি, দয়া চাইনি, একটা পয়সাও নিইনি। নিজের জীবনের ভার, নিজের কাজের দায় নিজের কাঁধেই বয়েছি। এই আমার শক্তি, আমার আত্মসম্মান।” 

‘জীবনগান গাহে কে যে, সুর বুঝি না যে…’ গেয়েছিলেন তিনি। কে বলে তিনি সুর বোঝেন না? জীবনগানের সব সুর তাঁরই সঙ্গে আজ অমরত্ব পেল।

তথ্যসূত্র: আশা ভোঁসলের দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকার, সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কথোপকথন, দূরদর্শন আর্কাইভ থেকে

বিদ্যায় প্রযুক্তিবিদ, পেশায় কনসালট্যান্ট, নেশায় লেখিকা। নিউ জার্সির পারসিপেনি শহরের বাসিন্দা । শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুকালের সিরিয়াস চর্চা আছে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর A গ্রেড শিল্পী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *