কর্নাটকের হসপেট রেল স্টেশনে পৌঁছলাম ঠিক সময়েই অগাস্ট ২৭, ২০১৪,
দুপুর ১১টায়। মুষ্টিমেয় যাত্রী ট্রেনে ওঠানামা করল। দুমিনিটের
মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল আর স্টেশনে পড়ে রইলাম কেবল মাত্র হায়দরাবাদ
থেকে আসা আমরা ১৪ জনের এক দল যাত্রী। স্বাভাবিক ভাবেই কয়েকজন অটো-রিক্সা
ওয়ালা আর হোটেলের এজেন্টরা আমাদের ঘিরে ধরলো।
ইতিমধ্যে আকাশে ঘোর ঘনঘটার উদয় হয়েই ছিলো। শুনেছিলাম এই অঞ্চলে
বর্ষার আবির্ভাব বেশ কম, কিন্তু কয়েকদিন ধরে কাছেই ঘুরছি, যেখানেই
যাচ্ছি বর্ষা আমাদের অভ্যর্থনা করতে হাজির থাকছে। স্টেশনের কাছাকাছি
হোটেল আছে এ কথা শুনেছিলাম, তাই ইচ্ছা ছিল কয়েকজন মিলে স্টেশন
থেকে বেরিয়ে আগে হোটেলের ব্যবস্থা করে তারপর সকলকে নিয়ে সেখানে
উঠবো আর তার পরেই প্রথম ক্ষেপ ঘোরার বন্দোবস্ত করা হবে। বুঝলাম
তা করতে গেলে বৃষ্টিস্নান নিশ্চিত। তাই হোটেল এজেন্টের মধ্যে একজনের
সঙ্গে কথা বলে স্টেশন থেকে বেরলাম। পরে বুঝেছিলাম কাজটা ভালই করা
হয়েছিল।
ট্র্যাভেল এজেন্ট গঙ্গাধর একই সঙ্গে গাড়িরও মালিক। সকলকেই নিজের
গাড়িতে মাল-পত্র সহ তুলে নিয়ে স্টেশনের ১কিমি দুরেই K.R.K.Residency
হোটেলে নিয়ে গেল। হোটেল আমাদের পছন্দ হলো, উঠলাম সেখানেই। স্নানাদি
করে ১ঘন্টার মধ্যেই ঘুরতে বেরুবো কথা হল। কিন্তু স্টেশন ছাড়ার
পর থেকেই মুষলধারায় যে বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছিল তা তখনও চলছিল। গঙ্গাধরের
কাছে জানলাম যে গত কয়েক দিনই এখানে এমনই অস্বাভাবিক অবস্থা চলছে।
আমরা মুষড়ে পড়লাম। গঙ্গাধর আশ্বাস দিল যে সে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই
আসবে গাড়ি নিয়ে আর বেরোবার মতো অবস্থা হলে আমাদের নিয়ে যাবে, কোথায়
সে তখন অবস্থা বুঝে ঠিক করবে।
স্নান সেরে আর দুপুরের খাওয়া, অর্থাৎ লাঞ্চ, মুড়ি চানাচুর দিয়েই
সারলাম। আমার স্ত্রী ভারতী ও কন্যা, শুভ্রমালা এবং ভগিনী গীতা
এই লাঞ্চেই সন্তুষ্ট। অন্যান্যরা ওই বৃষ্টির মধ্যেই কাছাকাছি এক
রেস্তোঁরায় লাঞ্চ করে এলো। অমি এসে হোটেলের লবিতে বসে বাইরের দিকে
উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন বৃষ্টির প্রকোপ
একটু অন্তত কমবে। ইতিমধ্যে দেখতে পেলাম যে গঙ্গাধর একটা ১৪ আসন
বিশিষ্ট আমাদের পছন্দ মতো টেম্পো ট্র্যাভলার গাড়ি নিয়ে চলে আসলো।
হোটেল অভ্যন্তর বেশ চকচকে কিন্তু সামনের রাস্তা বৃষ্টির জলে ততোধিক
কর্দমাক্ত, পা ফেলতেই কেমন যেন ইচ্ছে করছিল না, হোটেলে ঢোকার সময়ই
অনুভব করেছিলাম। গাছ-পালা রয়েছে আশপাশে, দৃশ্য অবশ্য সাদামাটা।
কি আর করা যায় ওই সাদামাটা দৃশ্য দেখতে দেখতেই আমার শবরীর প্রতীক্ষার
কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল এখানেই পম্পা সরোবর-তীরে গুরু মাতুঙ্গার
আশ্রমে রাম-দর্শনের আশায় তাঁর বহুদিনের প্রতীক্ষার সফলতা আসা রামের
দুঃখের সময় আধার করে। দুই ভাই এসেছিলেন সীতার খোঁজে এই আশ্রমে।
এখানেই ভগবান ভক্তের অনুরোধে (উপদেশে?) সুগ্রীব ও হনুমানের সঙ্গে
সাক্ষাত করেন পাশেরই জনপদ কিষ্কিন্ধায়। ফল? সে কি আর বলার অপেক্ষা
রাখে? আমার বেশ হাসি পেল, কেন শবরীর প্রতীক্ষার কথা মনে পড়ল? এই
প্রতীক্ষার সঙ্গে কি আমার বৃষ্টি থামার প্রতীক্ষা এক রকমের? না
কি এ আমার অন্তরের নিভৃত কোণে কোথাও পৌরাণিক উপাখ্যানের সত্যতার
বিশ্বাস অঙ্কিত হয়ে আছে তারই প্রকাশ? না হলে যে কারণে ‘হাম্পি’
পৃথিবী বিখ্যাত, বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’
আখ্যা লাভ করা ধ্বংসাবশেষের কথা কেন মনে এলো না?
এখনও বর্ষণ সমানে চলেছে। চুপচাপ বসে থেকে ঘুম এসে যাচ্ছে। ঘুম
তাড়াবার জন্যে লবির সামনের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বারান্দা ঢাকা
হলেও বৃষ্টির ছাট আসছে আর মেঝে জলে ভর্তি। তাও সেখানে দাঁড়িয়ে
থেকে চিন্তা করলাম যে আমি বাড়ি থেকে এই দিন যে জায়গাগুলো দেখতে
যাওয়া সম্ভব বলে ভেবে রেখেছিলাম, সময়ের অভাবে সেগুলো মনে হয় দেখতে
যাওয়া যাবে না। এর পরিবর্তে কোথায় যাওয়া সম্ভব হতে পারে ভাবতে
চেষ্টা করতে থাকলাম। এই সুযোগে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ এবং
সংক্ষেপে ইতিহাসের সম্পর্কে আপনাদের বলি। এই তথ্য আমায় সাহায্য
দেবে আমাদের হাম্পি ভ্রমণের বর্ণনা আপনাদের বোঝাতে।
হসপেট রেল স্টেশন, উত্তর-পূর্বে প্রায় ১৩কিমি দূরে অবস্থিত হাম্পির
প্রধান প্রবেশ দ্বার। হসপেট ছোট এক শহর। মোটামুটি তিনটি বংশ ১৩৩৬
থেকে ১৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তালিকোটার যুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাজয় পর্যন্ত
রাজত্ব করেন দক্ষিণের এই সাম্রাজ্যের রাজারা এবং এঁরাই স্থানীয়
ভূমিপুত্রদের শেষ প্রতিনিধি। অর্থাৎ এর পর দক্ষিণ ভারতে যাঁরা
রাজত্ব করেছেন প্রত্যেকেরই বংশের উৎস ছিল বহির্ভারত। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের
কাল নামে এই সময়-কাল বিখ্যাত। বিখ্যাত এই সময়কার বাস্তু শিল্পের
জন্যে। বিখ্যাত এই সাম্রাজ্যের কয়েকজন প্রজাবৎসল ও বীর রাজার জন্যে।
আর বিখ্যাত দ্বিতীয় বংশের রাজা কৃষ্ণ দেব রায়ের রাজত্ব কালে (১৫০৯
থেকে ১৫৩০) দেশ ও দশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্যে।
চিত্র-১, হাম্পির অবস্থান
কর্ণাটক রাজ্যের বেলারি জেলায় হাম্পির অবস্থান (চিত্র-১, হাম্পির
অবস্থান)। হাওড়া, গোয়া (ভাস্কো-দা-গামা), হায়দরাবাদ, মাইসোর, মুম্বাই
ইত্যাদি শহরের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ আছে, হসপেট হয়ে। বাস যোগাযোগও
বেশ ভাল। সে তুলনায় আকাশ পথে যোগাযোগ তেমন ভাল নয়। থাকার যায়গার
অভাব না থাকলেও মরশুমে (অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি) হোটেলের খরচ
বেড়ে যায়। ভারতীয় ভ্রমণার্থীদের তুলনায় বিদেশিদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
গ্রীষ্মের মাসগুলিতে যদিও রাতের উষ্ণতা আরামদায়ক কিন্তু দিনে ঘর
থেকে বেরোনোই এক ঝকমারি। বর্ষাকালে অনেক সময় নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টি
হতে পারে তবে সময় থাকলে প্রকৃতি গাঢ় সবুজে ঢেকে থাকার কারণে দেখে
আনন্দ পাবেন আর দর্শনীয় স্থানগুলো ফাঁকায় উপভোগ করতে পারবেন। সঙ্গে
আবার হোটেলের ও গাড়ির খরচও কম হবে। আর শীত কালে? যদিও ঐতিহাসিক
স্থানগুলোর পরিসর বিরাট, তাও কাছ থেকে মন্দির গাত্রের ভাস্কর্য
দর্শন করা কঠিন হবে। কারণ? বুঝলেন না? আপনার সঙ্গে অসংখ্য দর্শনার্থী
একই কাজ করতে চাইবে। আমার মনে হয় মধ্য পন্থা অবলম্বন করাই শ্রেয়।
অর্থাৎ, বর্ষা আর শরতের মাঝে আর শিত ও গ্রীষ্মের মাঝে এখানে আসা।
হাম্পি পর্বতময় স্থান, মনে হয় ‘টিলা’ময় স্থান বললেই ভাল হয়। তবে
পর্বত বলি বা টিলা বলি, তাদের মাঝে সমতল ভূমির পরিমাণও কম নয়।
বিশেষ করে বর্ষায় সেই মাঠ প্রধানত ধান ক্ষেতে ভরা থাকে। কলা গাছের
সংখ্যাও কম নয়। এই দৃশ্যও কম মনোমুগ্ধকর নয়। টিলাগুলোর বৈশিষ্ট্য
আছে, মনে হয় যেন বিভিন্ন আকারের, তবে বিরাট বিরাট গ্রানাইট চাঙড়
ডাঁই করে কেউ ফেলে রেখেছে, যেমন অনেক সময় রাস্তার ধারে বাড়ি তৈরির
পাথর পড়ে থাকতে দেখা যায়। কিছু কিছু পাথর এমন ভাবে রয়েছে যে তার
পাশ দিয়ে যেতে গেলে বুক ধড়-ফড় করবে এখুনি বোধ হয় গড়িয়ে পড়বে ঘাড়ে
বা মাথায়। এই রকম হলে ফল অবশ্য একই হবে। মনে হয় গ্রানাইট এখানে
এত বেশি থাকার জন্যেই প্রধানত রাজা কৃষ্ণ দেব রায় বেলে পাথরের
বদলে এই পাথর ব্যবহার করেছিলেন তাঁর মন্দির ও প্রাসাদ নির্মাণে।
তবে বেলে পাথরের ব্যবহারও হয়েছে, কয়েকটা বিশেষ কাজে। যেমন বিরাট
প্রস্থ যুক্ত প্রাকারের দুপাশ গ্রানাইট, আর মাঝে বেলে পাথরের ইঁট।
এই ইঁটগুলো পোড়ামাটির নয় তা অবশ্য আমি হলপ করে বলতে পারব না। বেদি
ইত্যাদি ভরাট করার জন্যেও এই ইঁট, এমনকি কয়েকটি মন্দিরের গোপুরমের
শীর্ষেও এই ইঁট ব্যবহার হয়েছে। সেই সব মন্দিরের বর্ণনার সময় এই
কথা আবার উল্লেখ করবো।
চিরকাল কিন্তু এখানকার নাম ‘হাম্পি’ ছিল না। ইংরাজরা ভারতের অনেক
জায়গা নাম ভারতীয় নামের অপভ্রংশ করেছে, তেমনই স্থানীয় কান্নাড়
ভাষায় পম্পার উচ্চারণের হাম্পা বা হাম্পে শব্দটিকে হাম্পি করে
দিয়েছে। পম্পার কথা প্রথমেই একবার উল্লেখ করেছি, পরে আবার কিছুটা
বিস্তার করব ঠিক সময়ে। সাম্রাজ্যের নামানুসারে বিজয়নগর নামেও পরিচিত
এই স্থান।
হোটেলের লবির বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবছিলাম পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে
কোথায় যাওয়া যায়, সেই অবস্থায় আপনাদের রেখে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা
করলাম। ইতিমধ্যে বৃষ্টির প্রকোপ কিছুটা কমেছে দেখে আমরা গঙ্গাধরের
গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ঘড়ি সময় দেখাচ্ছে বিকাল ৪:১৫ মিনিট। শুনলাম
৭টা পর্যন্ত ঘোরা যাবে, অর্থাৎ দিনের আলো থাকবে। তবে আমার মনে
হলো এখনই মেঘের জন্যে দিনের আলোর যা পরিমাণ, ৭টার সময় ...?
কোথায় যাবো? গঙ্গাধরের উত্তর, “দেখেঁ, কহাঁ কহাঁ যা সকতে হয়।”
তাহলে? তাহলে আর কি, দেখা যাক কি কি দেখা যায়। স্টেশন রোড ছাড়ার
অল্প পরেই সুন্দর রাস্তা। চোখ জুড়িয়ে যায় চারি পাশের সবুজের সমারোহ
দেখে। প্রথমেই এসে গাড়ি থামলো হাম্পির আরকিওলজিকাল মিউজিয়ামের
সামনে। ছোটই মিউজিয়াম, তবে মূল্যবান সংগ্রহ। সংগ্রহ সবই হাম্পির
বিভিন্ন মন্দির ও প্রাসাদ থেকে। আমার মনে হলো এই সংগ্রহ হাম্পি
দেখার শেষে হলে চিহ্নিতকরণে সুবিধা হত। বেশির ভাগ আরকিওলজিকাল
মিউজিয়ামে যেমন হয়, ছবি তোলা নিষেধ, এখানেও তাই, তবে মিউজিয়াম
পরিসরে কিছু সংগ্রহ খোলা আকাশের নিচে রাখা, সেগুলোর ছবি নেওয়া
যায়। কাজেই আমি কয়েকটার ছবি নিলাম (চিত্র-২, মিউজিয়ামের বাইরে
১, চিত্র-৩, মিউজিয়ামের বাইরে ২, চিত্র-৪, মিউজিয়ামের বাইরে ৩)।
চিত্র-২, মিউজিয়ামের বাইরে ১
চিত্র-৩, মিউজিয়ামের বাইরে ২
চিত্র-৪, মিউজিয়ামের বাইরে ৩
জায়গায় জায়গায় জল জমা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখা যেতে লাগলো
গ্রানাইটের ছোট বড় টিলা আর ধান ও কলার চাষ। রাস্তার ধারে গ্রানাইটের
মোটা ও চৌকো থাম ও ছাদ সহ কয়েকটা প্রাচীন ঘর দেখতে পেলাম। রাস্তার
ওপর একটা বড় কয়েক তলা বিশিষ্ট পাথরের তোরণ পার করলাম। প্রায় মিনিট
কুড়ি গাড়ি চলার পরে আমরা থামলাম এক ‘কার-পার্কিঙে’। সেখানে সার
দিয়ে অনেক গুলো ব্যাটারি চালিত রিক্সা অপেক্ষারত। ইদানীং এখানে
যেমন রাস্তায় দেখা যাচ্ছে ‘টোটো’, তেমনই গাড়ি তবে এতে রয়েছে দুই
সারির বদলে চার সারি বসার জায়গা। চালকের পাশে দুজন নিয়ে মোট ১৪
জন যাত্রী বসতে পারেন। আর হ্যাঁ, প্রত্যেকটি গাড়ির চালক নয় ‘চালিকা’
রয়েছেন। এই পার্কিঙ রয়েছে হাম্পির অন্যতম বিখ্যাত ‘ভিঠঠল দেব’-র
মন্দিরের প্রায় ১কিমি দূরে। এখান থেকে আমরা আমাদের তেলের গাড়ি
ছেড়ে এই ব্যাটারি চালিত গাড়িতে চেপে মন্দিরের দিকে যাত্রা শুরু
করলাম। মিনিট কয়েক যাবার পরই পথের ডান দিকে দেখা যেতে থাকলো লম্বা
মাঠের মাঝে কিছুটা উঁচু পাথরের মোটা ও বড় বড় টালি বিছানো পথ আর
তার দুই পাশে প্রায় ৩মিটার উঁচু অন্তত ৫০সেমি প্রস্থ বিশিষ্ট চৌকো
থাম সার দিয়ে রয়েছে যত দূর দৃষ্টি যায়। মাঝে মাঝে সেই ‘বারান্দা’
থেকে নামা ওঠা করার জন্যে দুই দিকেই সিঁড়ি রয়েছে। এখানেই ছিল পশু
বাজার যেখানে নাকি প্রধানত বিদেশি ব্যাপারীরা বিজয়নগরে (তবে মন্দির
এলাকা ভিঠঠলপুর নামে পরিচিত ছিল সেকালে) ঘোড়া বেচতে আসতেন। এখনকার
দিনেও এক কিমি দৈর্ঘ্যের একটি চত্বরে একটি মাত্র বাজার কোথায় আছে
জানি না। অবশ্য উল্লেখ্য যে বলা হয় ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ পৃথিবীতে
চীনের পিকিঙ/বেজিঙের জনসংখ্যার পরই বিজয়নগরের জনসংখ্যা (আনুমানিক
৫ লক্ষ) ছিল। একটু সময় লাগলো এই এলাকা বরাবর গিয়ে ভিঠঠল দেবের
মন্দিরের পূর্ব গোপুরমের সামনে পৌঁছতে। এখানে পৌঁছবার আগে এক অদ্ভুত
ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। তখন অন্ধকার হয়ে আসছিল। তাই গরুর পাল রাস্তা
দিয়ে গোষ্ঠে ফিরছিল। দেখতে পেলাম বেশ কিছু গরুর দুটো কানই লম্বা
ভাবে চিরে দিয়ে অল্প রং করাও রয়েছে। কি ব্যাপার কে জানে (চিত্র-৫,
কান-চেরা গরু)। ইউটিউবের এই ক্লিপে এই পর্যন্ত বর্ণনার চলচ্চিত্রায়ন
দেখতে পাবেন।
চিত্র-৫, কান-চেরা গরু
জগত বিখ্যাত মন্দির, কিন্তু সামনে বাগান নেই, অর্থাৎ সাজানো নেই।
মনে পড়ল বাগানে সাজানো খাজুরাহোর মন্দির চত্ত্বরের কথা। উল্লেখ্য
যে খাজুরাহোর মন্দিররাজি এই মন্দির বা বিজয়নগরের মন্দিরগুলি থেকে
অনেক বেশি প্রাচীন। গোপুরমের সামনের জায়গায় বেশ কাদা রয়েছে। কাদার
রং লাল। কাদা বাঁচিয়ে আরকিওলজিকাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়ার টিকিট কাউন্টার
থেকে জন প্রতি ১০ টাকা প্রবেশ মূল্য আর ২০ টাকা ভিডিও ক্যামেরা
চার্য দিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলাম।
চিত্র-৬, ভিঠঠলদেব মন্দিরের গোপুরম ১
চিত্র-৭, ভিঠঠলদেব মন্দিরের গোপুরম ২
মন্দির চত্বরে প্রবেশ করার জন্যে গোপুরমের (চিত্র-৬, ভিঠঠলদেব
মন্দিরের গোপুরম ১, ও চিত্র-৭, ভিঠঠলদেব মন্দিরের গোপুরম ২) নিচে
পৌঁছতেই আমার মনে এক প্রশ্ন জেগে উঠল। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজাদের
কূল দেবতা পম্পাপতি বা বিরূপাক্ষ। বিরূপাক্ষের মন্দিরও রাজধানীতে
আছে সাম্রাজ্য বিস্তারের আগে থেকেই এবং বিভিন্ন সময়ে এঁরা সেই
মন্দিরের উন্নতি সাধনও করেছেন। তা সত্ত্বেও কেন ভিঠঠল বা বিষ্ণু
মন্দিরের বাড়-বাড়ন্ত এখানে এবং বিশেষ করে কৃষ্ণ দেব রায়ের কাছে
এতটা প্রাধান্য পেয়েছে। তা কি সেই সময়ের বৈষ্ণব ধর্ম গুরুদের প্রসিদ্ধির
জন্যেই? বংশের প্রতিষ্ঠাতা হুক্কা (প্রথম হরিহর, খ্রি. ১৩৩৬-৪৩)
এবং প্রথম বুক্কা (খ্রি. ১৩৩৪-৭৯)-দের শাক্ত মতাবলম্বী গুরু শ্রীঙ্গেরীমঠের
বিদ্যারণ্যের আবেশ কি কমে এসেছিল? না কি শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারার
মহামিলন হয়েছিল? অবশ্য দাক্ষিণাত্যেই বিষ্ণু ও মহেশ্বরের যুগপৎ
অবস্থান অনেক প্রাচীনতর মন্দিরেই আছে (প্রধান উদাহরণ রামেশ্বরম
মন্দিরে)। যাই হোক আমার কাছে এই প্রশ্নের সমাধান করার রশদের অভাব
এখন, আদৌ পাবো কি না তাও জানি না। তাই এই চিন্তা সরিয়ে রেখে মন্দির
দর্শনের দিকে মন দিলাম।
যদিও উপস্থিত এই গোপুরমের শীর্ষের বেশ কিছু অংশ আর নেই, অর্থাৎ
ধ্বংস প্রাপ্ত হয়ে গেছে (চিত্র-৬ দেখুন) তাও যা আছে তাতে ভাস্কর্যের
অপরূপ নিদর্শন চোখে পড়ে । ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও দেখা যায় যে এই
শীর্ষ গ্রানাইটের বদলে ইঁট দ্বারা নির্মিত ছিল। অবশ্য গোপুরমের
নিচের অংশ গ্রানাইটে নির্মিত আর তাতে কেবল মাত্র জ্যামিতিক নক্সাই
আছে। পরবর্তী সময়ে দেখেছি অনেক সৌধতেই গ্রানাইট ও ইঁটের আকারে
কাটা বেলে পাথরে ইঁটের সংমিশ্রণেই সেগুলির নির্মাণ হয়েছে। চারি
পাশে খোলা জায়গা থাকার জন্যে মনে হয় এর উচ্চতাও খুব একটা বেশি
নয়। তামিলনাড়ুর প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলির গোপুরমের গায়ে ভাস্কর্যগুলির
চেয়ে উৎকর্ষতায় এগুলো অনেকটাই এগিয়ে। তবে তামিলনাডুরগুলো বেশ চোখে
পড়ে রঙের কারণে, মনে হয় যেন জীবন্ত পুতুল। কিন্তু বিঠঠলদেবের মন্দিরের
গোপুরমের দেয়ালের ভাস্কর্য আপনাকে ভাল করে লক্ষ করে বুঝতে হবে
কেন না রঙের আর রক্ষণা-বেক্ষণেরও অভাব। মনে হয় যেন এগুলোর গায়ে
শ্যাওলা পড়ে আছে। মন্দিরে প্রবেশ করতে হয় গোপুরমের লোহার শিকের
গেট পার করে, যা নিশ্চয় নতুন সংযোজন। বেশ নিচুই পাথরের চৌকাঠ।
তার সামনে ছেদন করে দুই রানি সহ কৃষ্ণদেবরায়ের লেখচিত্র আঁকা,
যা ইতিহাসের স্কুল-পাঠ্য বইয়ে দেখতে পাওয়া যায়। এই রকম জায়গায়
যেখানে সবসময় মানুষ সেই মূর্তি বা ছবি বিশেষ করে সেখানকার রাজা-রানির,
পদদলিত করে যাবে কোনও হিন্দু সৌধে আছে কি না আমার জানা নেই। মুসলিমদের,
বিশেষ করে কবরস্থানে এই ব্যাপার লক্ষ করা যায় অবশ্য। চৌকাঠের দিক
থেকে দৃষ্টি ওপরের দিকে আনলেই বিস্মিত হয়ে গেলাম ১৮০˚ বিস্তারে
বিস্তীর্ণ মন্দির পরিসরে বিভিন্ন সৌধের সমাবেশ দেখে। ভাবলাম বাঁ
দিক থেকে দেখা আরম্ভ করি। তখনই বছর ২৫/৩০-এর এক চাবুকের মতো চেহারার
যুবক গলায় ঝোলানো তার অই-কার্ড আমার দিকে হাতে ধরে এগিয়ে বললও
যে সে কর্ণাটক ট্যুরিসিমের স্বীকৃত গাইড, নাম গিরিরাজ, তাকে কি
আমি এই মন্দিরে গাইড করতে দেব। দরাদরি করে রফা হলো ১৫০টাকা। গিরিরাজ
এই মন্দির সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলে আমাদের নিয়ে গেল সামনাসামনি
একটা সাদামাটা চৌকো বেদির সামনে। জানালো যে তার ওপরে আলোকস্তম্ভ
ছিল মন্দির চত্বর আলোকিত করার জন্য। স্তম্ভটি এখন নেই, ধ্বংসের
কৃতিত্ব অক্রমণকারী বাহমনি সুলতানের। তার পরেই রয়েছে প্রায় ৫/৬মি.
দৈর্ঘ্যের ও ২মি. উচ্চতা বিশিষ্ট বেদি, ‘অষ্টদিশা পিঠ’। পিঠের
চার কোণে আর চার দিকের মাঝে, মোট আটটি হাতির মূর্তি দিক্নির্ণায়ক
রূপে স্থাপিত।
চিত্র-৮, রথ
পরের সৌধটিই গ্রানাইটে নির্মিত ‘রথ’ (চিত্র-৮, রথ)। অনেকে ভুল
করে এটিকে একটি শিলায় খোদাই করা (মনোলিথিক) বলে থাকেন। এই রথটিই
কর্ণাটক ট্যুরিসিম মনোগ্রাম রূপে নির্বাচিত করেছে। ভারতে পাথরে
নির্মিত আরও দুইটি রথ বিখ্যাত, কোণারকের সূর্য মন্দির (মন্দিরটিই
রথের আকারে নির্মিত) আর মমল্লপুরম বা মহাবলিপুরমে রথ। সূর্য মন্দির
অবশ্য ভিঠঠলদেব মন্দির চত্বরের এই রথের তুলনায় অনেক বড়। এই রথ
প্রায় ১২মি. বর্গক্ষেত্রাকার বেদির ওপর নির্মিত ও প্রায় ৯মি. উচ্চতা
বিশিষ্ট। বাহন গরুড়ের সুন্দর মূর্তি সামনে এক প্রকোষ্ঠে দণ্ডায়মান
কিন্তু দেবতা দেখতে পেলাম না। গিরিরাজ এত তাড়াতাড়ি তার ধারাবিবরণী
দিয়ে যাচ্ছে যে তাকে অনুসরণ করে আমার হ্যান্ডিক্যাম চালানোই কষ্টকর
হচ্ছিল তার ওপর চিন্তা করে কোনও প্রশ্ন করা অসম্ভব। রথের ঘোড়া
থাকারই কথা, তাইই ছিল। তবে সেই দুই ঘোড়ার পিছনের অংশই এখন রয়েছে,
সামনের অংশ ভেঙে দিয়ে সেখানে আপাতত দুটি হাতির মূর্তি স্থাপন করা
আছে। বলা হয় যে হাতির মূর্তি পরবর্তী সময়ে অন্য জায়গা থেকে এনে
এখানে বসানো হয়েছে (চিত্র- ৯, ঘোড়া সরিয়ে হাতি বসানো)।
চিত্র- ৯, ঘোড়া সরিয়ে হাতি বসানো, ফটোঃ শুভ্রমালা
এই চিত্রতেই লক্ষ করতে পারবেন যে ঘোড়ার লেজ ও পিছনের পা দেখা
যাচ্ছে এবং পাটাতনের ওপর হাতির মূর্তি সম্পূর্ণ আলাদা নির্মিত।
রথে আরোহণ করার জন্যে পাথর নির্মিত সিঁড়ি ছিল সামনের দিকে, এখন
কেবল তার কঙ্কালই পড়ে আছে। রথের সামনে থেকে এবার পাশে চাকার দিকে
চলে আসি। অন্য দুই জায়গার রথের চাকার সঙ্গে এই রথের চাকার বিশেষ
পার্থক্য আছে। পাথরের রথের চাকা স্থির হবে তাই স্বাভাবিক। কিন্তু
এই রথের চাকা ঘুর্ণয়মান, অন্তত ঘূর্ণন করতে সমর্থ। কৃষ্ণদেবরায়ের
কালে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কুস্তিগিরদের দিয়ে এগুলো ঘোরানো হতো। মানস
চক্ষে অনুভব করলাম চলমান পাথরের রথের সেই অপরূপ ভ্রমণের দৃশ্য।
অবশ্য এখন সিমেন্ট দিয়ে চাকা আটকে রাখা হয়েছে, কেন না যদি ঘোরান
হয়, তা হলে ভেঙ্গে যেতে পারে, ভ্রমণার্থীদের আক্রমণ এখন তো বহুগুণ
বেড়ে গেছে না। কোণারকের রথের চাকার মতো এগুলোয় পাকি বা স্পোক নেই,
সম্পূর্ণটাই ভরাট। কেন্দ্রের কাছে ফুটন্ত পদ্মের পাপড়ির আকার দেওয়া,
তবে বাকি অংশে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা করা আছে। প্রত্যেকটি চাকার
ওপর দিকে ঘূর্ণনের সময় যাতে হেলে না যায় তার জন্যে পাশ থেকে ‘ব্রেক-শু’-এর
মতো পাথরের ব্লক রয়েছে। রথের ভিতর দিকে বেশ কিছু জায়গায় রং করা
রয়েছে, ভাস্কর্যের ওপর ছবির মত করে (চিত্র-১০, রথে ভাস্কর্যে রং),
তবে মনে হলো আরও বেশি জায়গায় রং ছিল কিন্তু উঠে গেছে। বাইরের দিকে
রং ছিল কি না বোঝবার উপায় নেই। রথের ওপরের দিকের আকার কিন্তু শঙ্কুর
মতো নয়, সামান্তরিকের মতো, অবশ্য তল গুলো সমান নয়, ছোট ছোট পিলার
সহ বারান্দার আকার দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে প্রচুর ভাস্কর্য এবং বিভিন্ন
কারুকার্য। ভাষায় বর্ণনার থেকে ছবি (চিত্র-৮) এর আকার অনেক সহজে
বোঝাবে।
চিত্র-১০, রথে ভাস্কর্যে রং, ফটোঃ শুভ্রমালা
আমাদের এই পর্যন্ত দর্শন ইউটিউবের ক্লিপে দেখা যাবে।