মনের মণিকোঠায় মণিশংকর মুখোপাধ্যায়
কংক্রিটের জঙ্গলে জীবনের গান হয়তো বাজতে থাকে নানা সুরে, দেওয়ালে কান পেতে শোনার মানুষ বেশি পাওয়া যায় না। হাতে গোনা যে কয়েকজন মানুষ শোনেন তাঁরা বলে যান ইটের পাঁজরে, লোহার খাঁচায় বন্দি্র শোষণ আর যন্ত্রণার কথা। তবে বিষাদ বেদনার সঙ্গে আনন্দ আর আবেগ মিশিয়ে ইমারত গড়তে খুব বেশি কাউকে দেখিনি। নিপুণ বিশ্লেষণী দক্ষতায় শহরের ইতিকথা লিখে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন যে গুটিকয়েক লেখক তাঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রী মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (১৯৩৩- ২০২৬)। প্রয়াত হয়েছেন সদ্য, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস –
আসলে শংকর মানেই শহর কলকাতার অন্তরাত্মার কণ্ঠস্বর। মায়াবী আলোয় মাখা ভোরের আগমনী, পাখ- পাখালির কলরব, সোনালি ধানখেতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পুবালি বাতাসের আহ্বান, মেঠো পথের ধুলো মাখা সহজ সরল জীবন এখানে অনুপস্থিত। তার বদলে আছে ইট কাঠের কাঠামোতে বন্দি অগণিত মানুষের স্বপ্ন থেকে স্বপ্নভঙ্গের অভিশাপ, প্রকাশিত অথবা অপ্রকাশিত প্রেমের উদযাপন আর গভীর বেদনার ইতিহাস। লেখক শংকরের গল্পের প্লট এই কংক্রিটের মেঝেতেই আসন পেতে বসে রাজার মতো। ভাষার অলংকার রাজকীয় নয় বরং প্রকাশের ভাষা সহজ হয়েও তীক্ষ্ণ, আবেগময় হয়েও সংযত।
তবে লেখক শংকরের রচনার যে বহুমাত্রিক সাহিত্য গুণ সেটুকুই আমার আলোচ্য বিষয় নয়, আবার তাঁর সৃষ্টির সম্পূর্ণতাকে ধরার ধৃষ্টতাও আমার নেই তাই স্থির করলাম ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাস নিয়ে নিজের উপলব্ধিটুকু এই আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখব। কারণ হিসেবে বলতেই পারি, নগর -কাহিনির জয়ধ্বনি পুষ্ট যে কয়েকটি সৃষ্টি পাঠক পাঠিকাদের বিমুগ্ধ করেছে তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’।
বৃহত্তম এই উপন্যাসের পটভূমি ভুবনবিদিত পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলের একটি সরু রাস্তা, যার অদূরেই জন্মেছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখক উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারে। তাঁরই নামাঙ্কিত থ্যাকারে ম্যানসন সাড়ে আটশ পৃষ্ঠার এই বিচিত্র উপন্যাসের পটভূমি, যেখানে পূর্ব ও পশ্চিম মুখোমুখি হয়েও কখনও দ্বিধায়, কখনও লজ্জায়, কখনও কারণে এবং কখনও অকারণে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
ম্যানসনের এক একটি ঘর ঘিরেই গড়ে উঠতে পারে এক একটি উপন্যাস। আধুনিক এপার্টমেন্টের পুরোনো সংস্করণ এই সব ম্যানসন। উপন্যাসে উল্লেখিত ম্যানসন অবশ্য জরাজীর্ণ অথচ অভিজাত বিশাল এক বাড়ি। যে বাড়ির প্রতিটি কুঠুরির ওপর আলোকপাত করেছেন লেখক। লেখকের কলমের খোঁচায় কুঠুরির অন্তর নিঃসৃত সুঘ্রাণ যেমন পাক খেয়েছে শূন্য করিডরে তেমনি মাথা কুটে মরেছে নিঃসীম নিঃসঙ্গতা। লেখক শংকর এই ম্যানসনের ম্যানেজারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সকাল থেকে গভীর রাত্রি পর্যন্ত তৃতীয় নয়ন মেলে প্রতিটি চরিত্রের খুঁটিনাটি, প্রতিটি মানুষের আচরণবিধি, বিচিত্র জীবনযাত্রার নানা ক্রিয়াকলাপ দেখার পর তিনি সেইসব কাহিনি লিখেছেন নিজের বয়ানে যা পড়লে মনে হয় না গল্প কথা।
উপন্যাসের শুরু এইরকম – আমাকে মনে পড়ে কী? সেই কতদিন আগে কলকাতা হাইকোর্টের ছায়ায় ওল্ড পোস্টাপিস স্ট্রীটের আদালতি কর্মক্ষেত্রে এক অপরিণতবুদ্ধি কৃশকায় বালকের সঙ্গে আপনাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তারপর বিনা অনুমতিতে সাহিত্যের আঙিনায় প্রবেশ করে মধুসূদন দাদারূপী এক বিদেশি ব্যারিস্টারের গল্প শুনিয়ে সে নিজেকে ধন্য করেছিল। ছলনাময়ী এই পৃথিবীতে সেই তার প্রথম অনিশ্চিত পদক্ষেপ। …
আসলে অমোঘ এক অনিশ্চয়তা কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই আশ্চর্য উপন্যাস। শূন্য থেকে শুরু, শূন্যে এসে শেষ। আবার নতুন কোনো পথে নতুন করে চলা, সঙ্গী পাঠক পাঠিকারা। পড়লে মনে হবে আদ্যন্ত সামাজিক এক জীবনকাহিনি অথচ টানটান থ্রিলারের থেকে কোনো অংশে কম নয়। ঠুনকো অহংকার, কৃতজ্ঞতা বোধ বা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা কোনোটাই পাঠকের অচেনা নয়। সেইজন্য কেন্দ্রীয় চরিত্রে লেখক নিজেকে রেখে যখন দাবি করেন এই কাহিনি একান্তই তাঁর নিজের পাশ্ববর্তী চরিত্রগুলো সহজেই পাঠকের প্রতিবেশী হয়ে ওঠে।
উপন্যাসের শুরুতে লেখক একজন কলকাতাবাসী বেকার যুবক, পূর্ব পরিচিত, অভিজ্ঞতা ও কিছু মূল্যবোধ পাথেয় করে তাঁর কর্মপ্রাপ্তি ঘটে। কর্ম জীবনে জড়িয়ে পড়ার পর হয় নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়, নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আবার কর্মসংস্থান হারানো। অর্থাৎ শূন্য থেকে শুরু করে শূন্যে গিয়ে শেষ, যেন পূর্ণাঙ্গ এক জীবনের গল্প। সেই কারণেই নগর সভ্যতার এই নব রামায়ণ স্বাধীনতা উত্তর বাংলা সাহিত্যকে অতুলনীয় বিশিষ্টতা দিতে সমর্থ হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
লেখক শংকর তাই আমাদের বড় কাছের, মনের মণিকোঠায় তাঁর অবস্থান।
